পুরুষোত্তম সিংহ

বাংলার তৃতীয় ভুবনের গল্পকারদের মধ্যে প্রথমেই মনে আসে মিথিলেশ ভট্টাচার্য, রণবীর পুরকায়স্থ, শেখর দাশ, স্বপ্না ভট্টাচার্য, ঝুমুর পাণ্ডের কথা। এইসব গল্পকাররা নিজেদের সচেতন উপস্থিতি দ্বারা নিজস্ব ভূগোলকে যেমন সমৃদ্ধ করেছেন তেমনি ভৌগোলিক বৃত্তায়নকে চিহ্নিত করেও বৃহত্তর বাংলার কথাকার কীভাবে হয়ে ওঠে সম্ভব তা প্রমাণ করেছেন। যদিও পথটা সহজ ছিল না। আজ সামগ্রিক বঙ্গসাহিত্যে এইসব কথাকাররা চর্চিত হলেও দুই দশক আগে সম্পূর্ণ অচেনা। কেবলমাত্র লিটল ম্যাগাজিন নির্ভর করে, নিজস্ব ভূগোলের গুটিকয় পাঠক নির্ভরশীলতায় সাহিত্যের আজীবন নির্বাসনে কাটাতে হয়েছে। বঙ্গভাষা সাহিত্যের কেন্দ্রীয় পাঠক বা মহানগরের পাঠক বঙ্গভুবনের চারপাশে কী লেখা হচ্ছে তা যেমন নজর দেয়নি, তেমনি এঁরাও যে গল্পকার, বঙ্গভাষা সাহিত্যেরই দলিল সেই চিহ্নায়নেও নীরব থেকেছে। ‘তৃতীয় ভুবন’, ‘অপর ভুবন’ ইত্যাদি চিহ্নায়নে বাংলা ভাষাসাহিত্যকেই যেন একটা বিভাজনের সীমারেখায় দাঁড় করিয়েছে। যে সামগ্রিকতার পরিসর প্রয়োজন ছিল তার বদলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিভাজনে নিজের জাতিসত্তার বৃহত্তর পাঠকেই তুচ্ছাতিতুচ্ছ করে নিজেরই সমূহ সর্বনাশ ডেকে এনেছে।

মিথিলেশ ভট্টাচার্য (১৯৪৬-২০২৫) প্রথম থেকেই সচেতন দীপ্তচেতনা, মননশীলতা, সংগঠিত বোধ ও উপস্থাপনের অভিনবত্বে নিজের জাত চেনাতে সক্ষম হয়েছিলেন। সাহিত্য যে যথার্থ নির্মাণের সৃজনশীল প্রয়াস, জীবনের ভাঙন-গড়নের অভিসম্পাতকে নতুন দিগন্তের অপত্যাশিত সৌন্দর্যে প্রতিষ্ঠার নব্য ধারাপাত—সে সম্পর্কে মিথিলেশ ভট্টাচার্য প্রথম থেকেই সচেতন ছিলেন বলেই নিজের উপস্থিতি প্রগাঢ়ভাবে জানান দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। জীবনের তিমির অভিযান, সন্ত্রস্ত সময়ের কথকতা, আলেখ্যকে সীমা-সীমাতীতে ভাসমান করার ঐশ্বরিক দক্ষতা এবং জীবনের অবগুণ্ঠনকে প্রতিমুহূর্তে নতুন বিভঙ্গে উন্মোচন একজন শক্তিশালী গল্পকার হিসেবে তাঁকে প্রতিষ্ঠা দিতে বাধ্য করেছিল। গত শতকের ছয়ের দশকের শেষে ‘অনিশ’ (১৯৬৭) পত্রিকায় তাঁর গল্প প্রথম প্রকাশিত হলেও সাতের দশক থেকে নিয়মিত গল্প পেয়েছি। সে তুলনায় গল্পগ্রন্থের সংখ্যা নিছকই কম। তাঁর গল্পগ্রন্থগুলি হল—‘কক্ষপথ’ (২০০৩), ‘চৈত্রপবনে’ (২০০৮), ‘আত্মকথা’ (২০১১) ‘স্বপ্নপুরাণ’ (২০১৬), ‘মিথিলেশ ভট্টাচার্যের ছোটগল্প’, ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’ (২০২২)।

সাতের দশকেই ‘নষ্টশশা’, ‘কক্ষপথ’, ‘ছারপোকা’ গল্প নিজের যথার্থ উপস্থিতি প্রমাণ করেছেন না-কাহিনির এই কথাকার। টানা কাহিনি অপেক্ষা সীমা থেকে সীমাতীত, অবাস্তবের ভিতর বাস্তব, সীমান্তিক দলিলকে আলোড়নের বদলে দৃশ্য-অদৃশ্য বাস্তবে যে গল্পধর্ম নির্মিত হয় তার নির্ভরযোগ্যতা অনেকখানি। ‘নষ্টশশা’ গল্প অন্ধকার হতে আলো, আলোর ভিতর অন্ধকার, উজ্জীবন, ফসল ফলানো, আত্মভূকের আত্মকথা, হরিণীর তছনছ, নিধুবনের ক্রমাগত নষ্টস্মৃতি রোমন্থন, জীবনের সংলাপে ক্রমাগত চড়াই উতরাই রেখে যে গোলার্ধ নির্মিত হতে দেখি তা বাংলা গল্পের ভিন্নস্বর। স্বপ্নময় বাস্তব, বাস্তবের বিবিধ তরঙ্গে নাশকতার নিশানা অথচ তা ক্রুদ্ধ নয়, মিস্টিসিজম, বোধের উন্মত্ত তরঙ্গে জীবনের যে পরিসর নির্মিত হতে দেখি তা শক্তিশালী গল্পকারেরই মজবুত সোপান। গল্পহীন গল্প রচনা করেছেন মিথিলেশ ভট্টাচার্য। জীবনানন্দ উত্তর যুগে বসে কাহিনির একটানা বুননকে ভেঙে ফেলেছেন। উত্তর আধুনিক যুগে বসে কাটা কাটা সংলাপে বিন্দু থেকে বৃত্তে, বৃত্ত থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অণুবৃত্তে ছড়িয়ে পড়েছেন। গল্পতরঙ্গে একাধিক চরিত্র, একাধিক সমস্যা, একাধিক সত্য, একাধিক উন্মোচনকে কেন্দ্র করে অবক্ষয়িত সময়ের নশ্বর সত্যকে ঝুলন্ত সত্যে ছেড়ে দেন। তা গল্পই আবার গল্পের সমান্তরাল ভাবমূর্ছনা সেখানে নেই। বহু অস্তিত্বের বহু সমীকরণে সময়ের অভ্রান্ত সত্য জীবনকে যেমন প্রতিমুহূর্তে ছিন্নভিন্ন করছে তেমনি জীবন কোথাও পলাতক, কোথাও আতোতায়ী। মিথিলেশ ভট্টাচার্যের গল্প পৃথক পৃথক করে বিশ্লেষণ ভিত্তিহীন। প্রকৃতপক্ষে তা একটা অসমান্তরাল দৃশ্য। দৃশ্য ভেঙে নব দৃশ্য, দৃশ্যের ভিতর অসম্ভব কারুকাজ, বোধ-মনস্তত্ত্বের চূড়ান্ত সমীক্ষা, গদ্যের একটা অস্পষ্ট আস্তরণ যা ক্ষণে ক্ষণেই রূপবদল করে—সেখানে পাঠক নীরব দর্শক। গল্প যে শিল্পের উত্তীর্ণ স্তর, গল্প যে শিল্পের আলেখ্য, গল্প যে শিল্পের পরিমিত রোদ্দুর তা তিনি পাঠককে দেখান। পাঠক কেবলই প্রত্যক্ষদ্রষ্টা হয়ে দেখেন গল্পের স্তারান্তর ক্ষণিক বৃত্তেই কতভাবে, কত প্রকরণে ভোল বদলে সক্ষম হচ্ছে। ‘কক্ষপথ’, ‘একটি অবাস্তব ঘটনার খসড়া’, ‘অজগরটি আসছে তেড়ে’, ‘সৌরকলঙ্কে তার ছায়া’, ‘জোছনা কেমন ফুটছে’ গল্পে তা ব্যাপক আকারে প্রতিষ্ঠা পেয়ে চলে। গত শতকের সাত-আটের দশকে বাংলা গল্পের রূপমোহ বাস্তব যখন গোপন লয়ে পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছিল আশিস মুখোপাধ্যায়, তপনকর ভট্টাচার্য, দেবর্ষি সারগী, সোমক দাস, শহীদুল জহিরের হাতে তখন নিজের কক্ষপথটি গড়েও মিথিলেশ ভট্টাচার্য আড়ালে পড়েছিলেন। যথার্থ পর্যবেক্ষণের অভাবে জানাই হয়নি এক শক্তিশালী গল্পকারের অনন্ত দক্ষতার কথা।

“আমি কি আদৌ লেখক? কেন লিখি এই কথা পাঠক সমক্ষে তুলে ধরার যোগ্যতা আমার আছে কি? নেই, কেননা আমি লেখক নই, লেখার জগতে একজন শিক্ষানবিশ, একজন পাথর-ভাঙা দিন-মজুর, শস্যক্ষেত্রের চোরা ইঁদুরের মতো আমি সকল ঘটনাপ্রবাহ আর অনুভূতির ভিতর তুর তুর করে ছুটে বেড়াই সেই শৈশবকাল থেকে বলতে গেলে, ইস্কুল পালানো আর সারাদিন আপনার মনে বাঁশি বাজানোর বয়েস থেকে হন্যে হয়ে ছুটে যাই প্রকৃত লেখার পেছনে; একেবারে অকস্মাৎ থেমে দাঁড়াই, পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাই, লক্ষ করি অনেক দূরে এসে পড়েছি, কিন্তু তা ভ্রম, আসলে প্রথম দিন আমি যেখানে ছিলাম সেখানেই থেমে আছি।”—মিথিলেশ ভট্টাচার্য/ ‘কেন লিখি’/ ‘শতক্রেতু’—১৩৮৩।

মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা, ব্যক্তির চিন্তাস্রোত, ব্যক্তির অবসাদ, ভাবক্রিয়াকে মিথিলেশ ভট্টাচার্য অদ্ভুত কায়দায় নির্মাণ করেছেন। গল্পের অবয়বে নানা পরিসর যা অস্তিত্বকে নানা দিগন্তে চালনা করে, কখনো বিপর্যস্ত করে, উন্মাদের পাঠশালায় ব্যক্তি সঠিক-ভুলের বদলে একটা চিন্তারাজ্যে ভাসমান থেকে কখন কোন ক্রিয়ায় পর্যবসিত হয় নিজেই জানে না—মানব অস্তিত্বের এইসব ক্রিয়াকে গল্পকার নানা সমীকরণে পরিমাপ করে নেন। চেতন-অবচেতন-অর্ধচেতন, স্বপ্নাকাঙ্ক্ষা, বাস্তবের ভাঙনক্রিয়া, নশ্বর সত্যের এপিঠ-ওপিঠ, ভোগবাদ, যৌনক্রিয়া মিলে অস্তিত্বের প্রস্তুরীভূত সত্যকে যে খণ্ডলয়ে তরান্বিত করেন তা একজন গল্পকারের দক্ষতাকে নানাভাবে প্রমাণ করে। গল্পকে ক্ষুদ্র অবয়বে রেখেও জীবনের গহনতলে জমে থাকা আর্তনাদ, ব্যক্তি অভিজ্ঞান, জীবনস্পৃহা, পাওয়া-না পাওয়ার দ্বন্দ্ব মিলে অস্তিত্ব যে চোরাস্রোতে ডুবে যায় এবং পাক খায় তার অনন্ত বিন্দুকে যে পরিধিতে উপস্থাপন করেন তা বাংলা গল্পের এক পৃথক ধারা। মনে পড়ে ‘গোপাল যখন বিচারক’, ‘কেশবলালের ভূমিকা’, ‘জগৎ পারাবারের তীরে’, ‘কর্কটকান্তি’ গল্পের কথা। আবার ‘দৌড় ৪০’ গল্পে স্বাধীনতার ভক্তিগীতি, উচ্চারিত সত্য আর যাপিত সত্যের ফারাক যে ফর্মে নির্মিত হয় তা গল্পের সম্পদ। মনে পড়ে নলিনী বেরার ‘আজাদী’ গল্পের কথা। দুইজন গল্পকার পৃথক সত্যে ভাসমান। স্বাধীনতার সকালে নলিনী বেরা এক অভাবী বালিকার ক্ষুধার সত্যে জোর দিয়েছেন, যা স্বাধীনতার সমস্ত স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষাকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে। মিথিলেশ ভট্টাচার্য দুই বিপরীত চিত্র এনে স্বাধীনতার সত্য স্পষ্ট করেছেন। একদিকে স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে নেতার ভাষণে দেশচেতনা, অন্যদিকে বাজারে সবজির আগুন দামে সাধারণ মানুষ দিশাহারা। সংলাপের পর্বান্তরের মধ্য দিয়ে জীবনের দলিল রচিত হয়। স্বাধীনতার কাঙ্ক্ষিত সৌরভে সম্পদের সুষম বণ্টনের বদলে পুঁজিবাদের ক্রমবিকশিত রূপে জীবনের বিপর্যয় বহু পথে ধাক্কা খেয়েছে। নেতাদের ফাঁপা বুলি, জনগণের ত্রাহিত্রাহি চিলচিৎকারে স্বাভাবিক সত্য বিঘ্নিত হয়েছে প্রতিমাত্রায়। সেই পৈশাচিক সত্যকে সংলাপের বিরোধাভাসে লেখক ধরে রাখেন। এক বয়ান দ্বারা যখন একটি সত্য গড়ে উঠছে তখনই ভিন্ন বয়ান সেই সত্য ভেঙে দেয়। বানিয়ে তোলা সত্য, কৃত্রিম সত্য, সত্যের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অন্ধকারের স্বরূপ যে চিহ্নায়নে গড়ে ওঠে তা গল্পকারের দক্ষতাকে প্রমাণ করে নিঃসন্দেহে।

আসামের উদ্‌বাস্তু সংকট, দাঙ্গা, বাঙালি বিপর্যয়, স্থানীয় সংঘর্ষ সব কিছুরই প্রতিনিধিত্ব করেছে মিথিলেশ ভট্টাচার্যের গল্প। তবে তা নিছক গল্প নয়। সমাজ জীবনের গভীর তলদেশের সংকট, হিন্দু-মুসলিমের ক্রোধানল, মানুষের অন্ধকার দিক, উৎপাদিত বোধের অবমূল্যায়ন যে সময় সন্ত্রাসের জন্ম দেয় তা যে বয়ানে নির্মিত হয় তা গুরুত্বপূর্ণ। ‘একটি অবাস্তব ঘটনার খসড়া চিত্র’ গল্পের বয়ানে পাই—

“এক নৃশংস প্রাণঘাতী দুঃস্বপ্নের মতো শহরের উপকণ্ঠে আমার দৈত্যাকৃতি বায়বীয় শরীরের উপস্থিতি—নিঃসাড় পদসঞ্চার। একটি ক্ষুদ্রতম ছিদ্র, তুচ্ছাতিতুচ্ছ ফিকির। তথাকথিত ‘শান্তির দ্বীপ’ বরাকভূমে তীব্র অস্থির এক আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে। উথাল-পাথাল করে দিতে পারে নিস্পৃহ, সহ্যসীমা অতীত থ্যাঁতামুখ মরা ইঁদুরের মতো নিস্তরঙ্গ জীবনযাপন প্রণালী। মাত্র ক-‘দিন আগে ইউ.পি.-বিহার হয়ে ক্ষুধার্ত পশুর সমূহ হিংস্রতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম অসমের অন্যতম ক্যানসার শহর হাইলাকান্দির একরত্তি দুর্বল বুকে—টালমাটাল বারুদগন্ধী পরিবেশ ছিল আমার সম্পূর্ণ অনুকূলে।” (‘একটি অবাস্তব ঘটনার খসড়া চিত্র’, শ্রেষ্ঠ গল্প, চিন্তা, প্রথম প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০২২, পৃ. ৪০)

অবাস্তব ঘটনার খসড়াচিত্রে দেশকালের সংকটকে স্পষ্ট করতে চেয়েছেন লেখক। হিন্দু-মুসলিমের মিলিত সহাবস্থানে সংগঠিত হামলা কীভাবে প্রতিরোধ সম্ভব হয়েছিল তার খতিয়ান গল্প। মিথিলেশ ভট্টাচার্যের গল্পধর্ম হল বহুচরিত্রের চিত্রশালা। বহু চরিত্রকে সংগঠিত করে বয়ানকে বারেবারেই বিচ্ছিন্ন করে দেন। সেখানে গদ্যের ভাস্কর্য একটা আস্তরণ গড়ে তোলে। কখনো কাব্যময়-চিত্ররূপময় গদ্য ভাস্কর্যে জীবনের অবগুণ্ঠনকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এপিসোডে ভাসমান রাখেন। কোথাও স্বল্পকথনে দ্রুত বাঁক বদলে জীবনের গভীর সত্যকে গ্রথিত করে দেন। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অবয়ব ধরেই একটা গল্পশরীর গড়ে ওঠে। চরিত্র কখনো বিভ্রান্ত, উত্তেজিত, কোলাহলময়, কখনো হঠকারি। আবার জীবনের বিন্যাসকে কখনো খণ্ড খণ্ড দ্রবণে পৃথক করেও একটা বিক্ষিপ্ত কিন্তু সামগ্রিক বিন্যাস রেখা এঁকে দেন।

মিথিলেশ ভট্টাচার্যের নিজস্ব সুর ‘ছারপোকা’ গল্পে মেলেনি। নিম্নবিত্ত পরিবারে রাতের অন্ধকারে ছারপোকার অত্যাচারে এক দম্পত্তির অতিষ্ঠ হবার কাহিনি। বিপিন-লীলা নামক দম্পতির ভাঙাচোরা জীবনে রাতের অন্ধকার আরো অসহ্য হয়ে ওঠে ছারপোকার বিবিধ স্থানে বিবিধ সময়ে দংশনের নিমিত্তে। নিম্নবিত্ত জীবনের অভাবী চিত্রের বর্ণিল রূপচিত্র এখানে ফুটে উঠতে দেখি। মিথিলেশ ভট্টাচার্য অন্তর্দৃষ্টিতে কবি। তাঁর গদ্যে কবিসত্তার চিহ্ন জুড়ে আছে। জীবনানন্দ দাশ উত্তর যুগে কাব্যগন্ধী গদ্যে জীবনের ঘাম রক্ত তিনি বুনেছেন। জীবনের ক্লেদ-বিষন্নতা-নৈরাজ্য নিয়ে যেমন আক্রমণাত্মক হন তেমনি কখনো গদ্যে মিস্টিসিজম তৈরি করে বয়ানকে ভাসিয়ে দেন। সেই গদ্যে একটা আশ্চর্য সুর আছে। জীবনের রোমন্থনকে যে কাব্যিক সুরলহমায় বুনে দেন তা বাংলা গল্পের এক অনন্ত পথ। দেবেশ রায় পরবর্তী সময়ের ভাষায় মিস্টিসিজমের মায়া নানাভাবে আবিষ্কার করেছেন মিথিলেশ ভট্টাচার্য, সোমক দাস, অনিশ্চয় চক্রবর্তী। অনন্ত বিশ্বের সমূহ ধারাপাতকে এইসব কথাকাররা টানা গদ্যে ভাসিয়ে দিয়েছেন। আবার সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, কমল চক্রবর্তী, নবারুণ ভট্টাচার্যের যে ধারা তা দেখতে পাব অজিত রায়, মধুময় পাল, দেবজ্যোতি রায়, সব্যসাচী সেন, অলোক গোস্বামীর মধ্যে। বাংলা সাহিত্যে যন্ত্র নিয়ে নানা গল্প লেখা হয়েছে। মনে পড়ে স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘সতর্কতামূলক রূপকথা’ গল্পগ্রন্থের কথা। যন্ত্রের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নিয়ে তিনি একের পর এক গল্প লিখেছেন। অমর মিত্রের ‘আগুনের গাড়ি’ উপন্যাসে দেখি রেলকে কেন্দ্র করে একটা জনপদের গল্পগাথা, লোকশ্রুতি, ইতিহাস কীভাবে বেঁচে আছে। সুবোধ ঘোষের ‘অযন্ত্রিক’ গল্প যেমন তেমনি মিথিলেশ ভট্টাচার্যের ‘জগৎ পারাবারের তীরে’ গল্প। সুবোধ ঘোষের গল্পে ছিল ভাঙা গাড়ির প্রতি ভালোবাসা, এ গল্পে একটা অ্যাম্বাসেডারে দাদা-ভাই দশরথ-মনোরথ ভ্রমণে বেরিয়েছে। অ্যাম্বাসেডার জলপাই রঙের জিপ গাড়িকে প্রায় অতিক্রম করে যাচ্ছে। দুই ভাই গাড়ির জানালা দিয়ে জগত পারাবারের অনন্ত রহস্য উপলব্ধি করছে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে ঐশ্বরিক জীবনবোধ, চরাচরব্যাপী সৌন্দর্যকে উপলব্ধির ক্ষমতা, অস্তিত্বকে ক্লেদ বিষন্নতা থেকে মুক্ত করে নিসর্গের উদারচেতনায় ভাসিয়ে দিয়ে নির্মল করা নান্দনিকতা তেমনি মিথিলেশ ভট্টাচার্যের চরিত্রও ডুবে যায় নিসর্গের অরূপরতনে। এক সুরেলা কাব্যগন্ধী গদ্যে জীবনের অনন্ত সত্যকে তা স্পর্শ করে চলে। দেখে নেওয়া যাক গল্পের বয়ান—

“সমস্ত পৃথিবী জুড়েই চলছে এই ক্ষমতার লড়াই। অর্থ আর বীর্য নিয়ে প্রবল, প্রাণান্তকর টানাহেঁচড়া। এখন পৃথিবীতে লড়াকু মানুষের অভাব নেই। মায়ের পেট থেকে বাচ্চা মাটিতে পড়ে প্রথম যে-ভাষায় কাঁদে তার সহজ-সরল অর্থ হচ্ছে ‘মা আমি লড়াইয়ে যাব!’ পৃথিবীজুড়ে মানুষ এখন ইন্দ্রিয়-নির্ভর। দীর্ঘকাল ধরে মানুষের রিপু অশাসিত হয়েছে। রিপু-শাসনের সাধনায় সিদ্ধ পুরুষেরা অনেককাল হল বানপ্রস্থে চলে গেছে। তাদের সন্ধান জানে না কেউ।” (‘জগৎ পারাবারের তীরে’, তদেব, পৃ. ৬৬)

মিথিলেশ ভট্টাচার্য যে দক্ষ গল্পকার তা তাঁর ভাষা সচেতনতা বারবার জানান দেয়। উপস্থাপনের অভিনবত্ব, প্রতি গল্পেই নতুন নির্মাণে এগিয়ে যাওয়ার অভিপ্রায়, গদ্য-পদ্যের মিশ্রণে ভাষার অবভাসকে বারবার স্বচ্ছ ভারমুক্ত করার প্রাণবন্ত চেষ্টা সময়ের একজন অব্যর্থ ভাষ্যকার হিসেবে তাঁকে বারবার জানান দিয়েছে। গত শতকের আট-নয়ের দশকের গল্পে মিথিলেশ ভট্টাচার্য এক অনিবার্য গল্পকার। কাহিনিকে ভেঙেচুরে, কাহিনিকে প্রায় অস্বীকার করে জীবনের আহ্লাদকে যে সীমা-অসীমের দ্বন্দ্বে বেঁধে দেন তা একজন দক্ষ ভাষাশিল্পীকেই চিনিয়ে দেয় বারেবারে। প্রথম থেকেই তাঁর ফর্ম সচেতনতা চোখে পড়ার মতো। গল্পশরীরে হরেকরকম কারুকার্য, গল্পদেহে বিবিধ বাঁক, নির্মাণের উপর অসম্ভব জোর এবং ভাষার বিবিধ ছাঁচ অস্তিত্বকে নানা নাশকতায় যেমন বুনে দেয় তেমনি অস্তিত্ব নাশকতাকে অতিক্রম করে যায়। সময়ের নৈরাজ্যকে স্পর্শ করেও গল্প অভ্যন্তরে তা নিভন্ত রাখেন। মিথিলেশ ভট্টাচার্য গল্পে নিবিড় বর্ণনায় আস্থা রাখেননি। গল্পকে তিনি নির্মাণ করেছেন তির্যক বিন্দুতে। বহুরৈখিক উদ্ভাসনে জীবনের নাশকতাকে যে বিন্দু থেকে বিন্দুতে রূপান্তর করেন তা বাংলা গল্প শরীরে নতুন রক্ত সঞ্চালনকে তীব্র করে। মিথিলেশ ভট্টাচার্য সূক্ষ্মতার শিল্পী। পরিমিত শৈল্পিত বিন্যাসে ক্ষুদ্র অবয়বে জীবনের পরাকান্ত রোদ্দুরকে কীভাবে ধরে দেওয়া সম্ভব তার জবরদস্ত শিল্পী। সেখানে হাতিয়ার করেছেন কাব্যগন্ধী গদ্যের মুন্সিয়ানা ও দ্রুত সংলাপে জীবনের চোরাটানের রূপান্তর। ‘সৌরকলঙ্কে তার ছায়া’ গল্পের সূচনা এমন—

“প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা হাড্ডিসার, নীরক্ত হিমমাখা, স্বপ্নহীন এক বুক চিরে দেখা। অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। হা অভ্যাস! মানুষ তোমার বড়ো বশংবদ ক্রীতদাস। একটি বাড়ির গভীর কালো দীর্ঘ ছায়া যখন অন্য আরেক সিঁদুর মাখানো বাড়িকে পূর্ণাগ্রাসে উদ্যত, রক্তে তখন ‘জলকে চল্‌’ চাঞ্চল্য। কত বৃথা এই চঞ্চলতা—অনুসন্ধিৎসা—অন্বেষণ—সুপ্রিয়র মতো কে জানে! চূর্ণ আঁধার যখন চিলের ডানার মতো চুপে গভীর নীলকে কালচে সীসাবর্ণ করে দেয়, বুকে তখন তিরবেঁধা পাখির আর্ত আকুলতা—আর নিশ্চষ্ট থাকা যায় না!” (তদেব, পৃ. ৭৫)

গোটা গল্প জুড়ে গল্পকথক সুপ্রিয়র আত্মসমীক্ষা। সেখানে নিম্নবিত্তের সংকট, উদ্‌বাস্তু সংকট, গৃহহারা সংকট, অভুক্ত মানুষের সংকট আছে। আছে খুন-মার্ডার-ধর্ষণ। নৈরাজ্যবাদ, বাঁচার আর্তনাদ, অস্তিত্ব নিয়ে বিবিধ প্রশ্ন ও সংশয়। সবই চলছে দ্রুততালে। কখনো লেখকের কাব্যগন্ধী গদ্যের অফুরন্ত দৌড়ে। কখনো সংলাপের চোরাটানে। গল্পের সমাপ্তি এমন—

“আমরা চাই একটুকরো জমি। ছোট্ট একটি বাড়ি। পরিস্রুত জীবাণুহীন জল। ঘুম থেকে উঠে এককাপ চা। এক মুঠো মুড়ি। দু’ মুঠো কাকরহীন, ধানহীন চাল। মসৃণ রেশন ব্যবস্থা। ছোট্ট একটি চাকরি। দুধ, মাছ, ডাল, সবজি, ওষুধ, কেরোসিন। পায়ে চলার জন্যে ফুটপাত। দূরপাল্লার জন্যে নিয়মিত সিটিবাস। বসার সিট। একটু আমোদ-প্রমোদ। স্বাচ্ছন্দ্য। নিরাপত্তা।

আমরা চাই না মেকি রাজনীতি, রক্তবিপ্লব। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। আণবিক বোমা। ক্ষমতা। শোষণ। অন্তর্ঘাত। সেক্‌স। ভায়োলেন্স। মস্তানি। ইতরতা। অশালীনতা। ভেজাল। দারিদ্র। লটারি!” (তদেব, পৃ. ৮০)

কোন সত্যে মিথিলেশ ভট্টাচার্য আমাদের পৌঁছে দিতে চান? বুঝতে আর অসুবিধা থাকে না ভাত কাপড়ের সংস্থান নিয়ে বাঙালির সুস্থজীবনচিন্তার ধারাপাতটি এঁকে দিতে চান। কিন্তু আসামের বাঙালি মৃগয়ায় তা কতখানি সত্য? মিথিলেশ ভট্টাচার্য এইসব গল্প যখন লিখছেন তার দুই দশক পরে আসামের বাঙালির মাজা যখন ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেওয়া হচ্ছে, বাঙালির শিকড়কেই উপড়ে ফেলার সমূহ চক্রান্ত করা হচ্ছে তখনও একজন ভবিষ্যতদ্রষ্টা গল্পকার জীবনের মায়া ছড়িয়ে যাচ্ছেন। বিচ্ছেদ, বিভেদ, নৈরাজ্যকে ছিন্নভিন্ন করেও চেতনার পরশ দ্বারা জীবনকে সংগঠিত করতে চাইছেন। মিথিলেশ এক স্বপ্নপ্রবণ গল্পকার। অথচ তাঁর জন্ম হয়েছে এক স্বপ্নহীন দেশে। এমনকি আজীবন নির্বাসন কাটাতে হয়েছে বধ্যভূমিতে। সেই রণক্লান্ত ভূমির পৈশাচিকতা, হানাহানি, সার্বিক ক্ষতকে স্পর্শ করেও তিনি মানবসভ্যতাকে পৌঁছে দিতে চান সৃষ্টি সৌরভের উল্লাসে।

নামহীন সংলাপের উপর জোর দিয়েছেন মিথিলেশ ভট্টাচার্য। যেমনভাবে জোর দিয়েছেন সমরেশ রায়, সোহারাব হোসেন, কল্যাণ মণ্ডল। কখনো গল্প নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষায় মেতে থাকেন। বাংলা গল্পের আধুনিকতার তরঙ্গ অভিযান কত পথে আনা সম্ভব তা নিয়ে মত্ত থাকেন। আসামের আঞ্চলিক ভাষা, স্থানীয় সংবাদ-সমস্যা গল্পের ভূগোলে যেমন জানান দেন তেমনি নানা ইঙ্গিত, মেটাফোর, সংবাদপত্রের কার্টিং, গল্পমডেলে নানা পরিবর্তন ঘটিয়ে এক বৈশ্বিক গল্পকার হয়ে ওঠেন। আখ্যানের মধ্যে সংবাদপত্রের কার্টিং এনে দেশকালের খবর জানান দিয়ে গল্পকে নতুন ভাষ্যে উপনীত করেছেন সুবিমল মিশ্র, রামকুমার মুখোপাধ্যায়, স্বপন পাণ্ডা। মিথিলেশ ভট্টাচার্যের ‘কর্কটকান্তি’ গল্পে দারিদ্র্য নিয়ে সমীক্ষা, সংবাদপত্রে প্রান্তজনের মৃত্যু সংবাদ এবং সেই বিবরণকে ধরে জীবনের গভীর তলদেশের সংবাদ গল্পকে নব্যমাত্রা দান করে। ভোগবাদ, পুঁজিবাদের দিনদুনিয়ায় প্রান্ত উচ্চবিত্ত দ্বারা যেমন বর্জিত হয়েছে তেমনি উচ্চবিত্তের সাফল্য, প্রদর্শনের পথে প্রান্ত ব্যবহৃত হয়েছে। ‘তর্পণ-বিধি’ গল্পের প্রেক্ষাপট ১৯শে মে। বরাক উপত্যাকা ভাষা সৈনিকদের জন্য শহিদ বেদি বানানোর নামে কৃত্রিম দেশভক্তির আড়ালে যে মুনাফার সংবাদ, ‘কর্কটকান্তি’ গল্পে দারিদ্র্য নিয়ে গবেষণা, প্রান্তজনের কর্মহীনতা, অফিসে কর্মচ্যুতির আরেক গোপন ফাঁদ, অভাবী মানুষ মহাজনের সুদে নাজেহাল এবং মণীন্দ্র দাসের স্ত্রীর অনাহারে মৃত্যুর মধ্যে জীবন-সভ্যতার বিভীষিকা যে মাত্রায় নির্মিত হয় তা দেশকালের খোঁজ যেমন জানান দেয় তেমনি একজন দক্ষ গল্পকারের গল্প উপস্থাপনের অভিনবত্ব প্রমাণ করে।

উত্তর আধুনিক সময়ে গল্পরীতিতে নতুন উদ্ভবনী শক্তি প্রয়োগ করে একজন বিচক্ষণ গল্পকার হয়ে উঠেছেন মিথিলেশ ভট্টাচার্য। সুবিমল মিশ্র, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, রমানাথ রায়, দেবেশ রায় পরবর্তী সময়ে আরেক আধুনিকতার সন্ধানে মত্ত হয়েছেন মানিক চক্রবর্তী, আশিস মুখোপাধ্যায়, শহীদুল জহির, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, ওয়েসি আহমেদ, তপনকর ভট্টাচার্য, দেবর্ষি সারগী, সোমক দাস, পীযূষ ভট্টাচার্য, শুভংকর গুহ, রবিশংকর বল, মিথিলেশ ভট্টাচার্য, রণবীর পুরকায়স্থরা। বাংলা গল্পযাত্রা কালে কালে নানা ভঙ্গিতে পরিবর্তিত হয়েছে। বিবিধ গল্প আন্দোলনের (শাস্ত্রবিরোধী, নিমসাহিত্য, অঙ্কভাবনা) ইস্তেহার ধরে যেমন গল্পের ভোল বদল ঘটেছে তেমনি কেউ কেউ সেই আন্দোলনের মধ্যে যুক্ত না হয়েও নিজস্ব ভঙ্গিতে সচেতন উপস্থিতি জানান দিয়েছেন। কথকতা, স্মৃতি, ইতিহাস, আঞ্চলিক ভাষা, কাব্যগন্ধী গদ্য, অস্তিত্বহীন সংলাপ, বিচ্ছিন্ন ঘটনা সমষ্টি, আর্থ-সামাজিক ভাষ্য, মিথ-সংস্কৃতির রূপান্তর যে সীমা-সীমাতীতের দ্বন্দ্বে উপস্থিত হয় তা বাংলা গল্পের আধুনিকতাকে ভিন্ন বাঁকে প্রতিষ্ঠা করে। ‘চৈত্রপবনে’ গল্পে ধর্মসংস্কৃতি-কথকতা-স্মৃতির রোমন্থন মিলে সময় ও জীবনবাস্তবতা যে ভঙ্গিতে নির্মিত হয় তা বাংলা গল্পের অপর স্বরকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে ভিন্ন সোপানে। গত শতকের ছয়-সাত-আটের দশকে পশ্চিমবঙ্গে যখন বিভিন্ন গল্প আন্দোলন সংগঠিত হচ্ছে তখন কলকাতা নামক কেন্দ্র থেকে বহুদূরে আসামের প্রান্তভূমিতে মিথিলেশ ভট্টাচার্য, রণবীর পুরকায়স্থ, শেখর দাশরা ভিন্ন গল্পপ্রকরণে ডুবে আছেন। ‘নিম সাহিত্য’র বিমান চট্টোপাধ্যায়, অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়, সুধাংশু সেন, মৃণাল বণিক, রবীন্দ্র গুহদের নিয়ে বঙ্গীয় পাঠকের যে হইচই তেমনভাবে আমরা দৃষ্টি দেইনি ‘শতক্রতু’ পত্রিকাকে সামনে রেখে মিথিলেশ ভট্টাচার্য, রণবীর পুরকায়স্থ, শেখর দাশ, স্বপ্ন ভট্টাচার্যদের নব্য গল্পের প্রকল্পকে। যেহেতু সুনির্দিষ্ট ইস্তেহার প্রকাশ করে তারা গল্পকে জানান দেননি, অত্যন্ত ভদ্রতা বিনয়ের খাতিরে বাজারকেন্দ্রিকতাকে কোনোভাবে আক্রমণ করেননি তাই গভীর প্রত্যয়যোগ্য উচ্চারণও তেমন পাঠযোগ্য হয়ে ওঠে না।

মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সত্যকে ধরে মিথিলেশ ভট্টাচার্য যে জারণ ঘটনা তা বাংলা গল্পের বহুরৈখিক পটচিত্রকে ভিন্নসুরে প্রতিষ্ঠা করে। ক্ষমতাতত্ত্ব, পুঁজিবাদ, বণিকবৃত্ত, ভোগবাদ জীবনের অভ্যন্তরে যে সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটাচ্ছে এবং প্রতিমুহূর্তে মানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলছে সেই রহস্য গল্পবিভঙ্গে নানাসুরে পরিমাপ করে নেন। মিথিলেশ ভট্টাচার্য প্রথম থেকেই একটা সুনির্দিষ্ট সমীকরণ গড়তে সক্ষম হয়েছিলেন বলে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এমনকি কোনো গল্পেই তিনি পুনরাবৃত্তি ঘটাননি। কাহিনি প্রবণতাকে প্রায় ধসিয়ে দিয়ে জীবনের অমোঘ ঘ্রাণকে তির্যক ব্যঞ্জনায় যে নিপুণ তুলিতে লিপিবদ্ধ করেন তা বাংলা গল্পের প্রথাবিরুদ্ধ পদযাত্রা। ‘অজগরটি আসছে তেড়ে’ গল্পে মিথ-বন্যপ্রাণী সংকট-পুঁজিবাদ-ক্ষমতাতত্ত্ব-বিজ্ঞাপন-শিল্পীর জীবন-ব্যক্তির অস্তিত্ব সংকট যে মাত্রায় যে বিন্যাস নির্মিত হয় তা জীবনের স্তরায়ণকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ জানায়। ফ্রাঙ্কো ক্রাফোর ‘ডে ফর নাইট’ চলচ্চিত্রকে সামনে রেখে তনুময়-অভীক-তরুণের পারস্পরিক সংলাপ, জীবনের গভীর তত্ত্বকে জানার পিপাসা, শিল্পীর জীবন-বাস্তবের জীবনের মাত্রাভেদ আবার সময়ের নাশকতাকে অতিক্রান্ত করতে গিয়েও থমকে যাওয়ার মধ্যে যে গল্পের ভাঁজ রচনা করেন তা দুর্ধর্ষ। মিথিলেশ ভট্টাচার্য গল্পকে বাজিয়েছেন জীবনের গূঢ়ত্বকে জানার অনিবার্য সোপানে। আবার অভিজিৎ সেন, স্বপ্নময় চক্রবর্তী যে দ্বান্দ্বিক বাস্তবতাকে প্রাধান্য দেন তা থেকে মিথিলেশ ভট্টাচার্য পৃথক। তিনি সংশয়ের সত্যে জীবনের মানচিত্রে মেঘের গর্জন শুনিয়েও নিস্তব্ধ বর্ষণে গল্পের মাটিকে ভিজিয়েও সৃষ্টির ফসল ফলান না। বাংলা গল্পের যে শক্তমাটি যেখানে গল্পকাররা দুমড়ে মুচড়ে জীবকে অতিমাত্রায় শনাক্ত করে, জীবনকে কটাক্ষ, আক্রমণ করে নিজেদের জয়পতাকা উড়িয়েছেন সেখানে এক নির্বাসিত গল্পকার মিথিলেশ ভট্টাচার্য। গল্প বুননের ক্ষেত্রে কিছুটা মিল আছে সোমক দাসের সঙ্গে। কিন্তু সোমক দাসের অভিজ্ঞান, দেবর্ষি সারগীর উপলব্ধির নির্মাণ মিথিলেশ ভট্টাচার্যে নেই। তিনি গল্পকে চালনা করতে চান কাব্যের মাত্রা ধরে সাহিত্যতত্ত্বের নিপুণ অভিজ্ঞানে। সীমা-অসীম, শূন্যতা, মিস্টিসিজম, অব্যক্ত, চিহ্নতত্ত্ব, সংকেত মিলিয়ে জীবনের আলোছায়াকে যে মাত্রায় পর্যবেক্ষণ করেন তা বাংলা গল্পের এক শক্তিশালী পদযাত্রা।

বাংলা গল্পের প্রকরণকে এক উচ্চস্তরে প্রতিষ্ঠা করেছেন মিথিলেশ ভট্টাচার্য। গল্পের ভিতর অসম্ভব কারুকাজ, গদ্যকে শিল্পের সোপানে তরান্বিত করার বহুবিধ প্রয়াস, ন্যারেটিভকে তীক্ষ্ন ও না-কথনের মধ্য দিয়ে জীবনের বিরোধাভাসকে স্পর্শাতীত সৌন্দর্যে ভাসমানের যে প্রত্যয় দেখি তা বাংলা গল্পের নান্দনিক পরম্পরাকে স্বচ্ছ নিখাদ করে তোলে। গল্পকে প্রতিনিয়ত নতুন বিভঙ্গে রূপদান, সময়ের আঁচকে নিপুণ ভঙ্গিতে গল্পশরীরে বুনে দেওয়া, অস্তিত্বের প্রশ্নময়-বিভ্রান্ত সত্তার মধ্যে বহুমুখী প্রবণতার অন্বেষণ, এমনকি জীবনের পারম্পর্যে প্রতিনিয়ত যে বৃত্ত রচিত হচ্ছে এবং ভেঙেও যাচ্ছে তার গূঢ়ার্থ কারণ অনুসন্ধান যে নির্মাণে উপস্থিত হয় তা শুধু কালান্তরের কথকতাকে প্রতিষ্ঠা করে না বাংলা গল্পের স্বয়ম্ভু আত্মাকেও নির্মাণ করে। যে প্রত্যয় বারবার হাসান আজিজুল হক, দেবেশ রায় পরবর্তী সময়ে শহীদুল জহির, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, ওয়াসি আহমেদ, নাসরিন জাহান, আশিস মুখোপাধ্যায়, দেবর্ষি সারগী, শুভংকর গুহ, রবিশংকর বল প্রমাণ করেছেন সেখানে এক জবরদস্ত শিল্পী মিথিলেশ ভট্টাচার্য। ক্ষুদ্র অবয়ব, দ্রুত পরিসর বদল, রূপকের দোটানা, গদ্যকে পরিসর অনুসারে বদল, শুভচিন্তার অন্বেষণ, শুভচিন্তাকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্ধকারের আঁচ এবং সেই উত্তপ্ত আগুন থেকে অস্তিত্বকে কীভাবে বাঁচানো সম্ভব তার নির্মোহ নির্মাণ এমনই সংবদেনশীল এবং মস্তিষ্কপ্রবণ যা মননশীল পাঠককে মুগ্ধ করে। ‘শেয়ালগুলো’ গল্পের সময় পরিসর—‘১৯৯২ এর কোনও শীতার্ত অঘ্রাণ’। ধরে নেওয়া যেতে পারে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পটভূমি। এক শেয়ালের চিৎকারে যেমন সব শেয়াল গর্জে ওঠে, ভেড়ার পাল যেমন অন্ধগতিতে ছুটে যায় তেমনি দাঙ্গাবাজও। তনুময় ও মকবুলকে সামনে রেখে হিন্দু-মুসলিমের সংকট, মুসলিম পল্লির অন্ধকার, ক্রমাগত শেয়ালের আওয়াজ যা অবিকল মানুষের মতো এবং জীবনের প্রেম-ভালোবাসা-সম্প্রীতি নিয়ে যে ঊষর মেরুর গল্প শোনান তা বাংলা গল্পের সম্পূর্ণ অচেনা ধারাপাত। এমনকি মিথিলেশ ভট্টাচার্যের যে বয়ান তার সঙ্গে আবহমান বাংলা গল্পের মিল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বয়ানকে দুরূহ না করেও জীবনের পরিমিত ছন্দে জীবনের গল্প কত বিভঙ্গ নির্মাণ করতে সক্ষম যা প্রকৃতপক্ষে একজন আখ্যানকারের প্রশ্নাতীত দক্ষতা তা মিথিলেশ ভট্টাচার্য প্রমাণ করে গিয়েছেন ছয় দশকের গল্পজীবনে।

দেশভাগের সত্য উচ্চারিত হয়েছে ‘জন্মভূমি, পুনশ্চ’, ‘ফকিরচন্দ্রের ভিটেমাটি’, ‘হরণ বা নির্বাসন পর্ব’ আখ্যানে। আবার দেশভাগকে কেন্দ্র করে যে বৃহত্তর সংকট, সেই রোহিঙ্গাদের কথা এসেছে ‘অথ ‘মহাসেন’ কথা’ গল্পে। দেশভাগের খণ্ড সত্য, জন্মভূমির স্মৃতি, নব্য উদ্‌বাস্তু রোহিঙ্গাদের সংকট, রাষ্ট্র কর্তৃক উচ্ছেদ অভিযান, আসামের উদ্‌বাস্তুদের প্রবহমান চিত্রে ক্ষণে ক্ষণে উদ্ভাসন আছে। দেশকালের সংকট চিহ্নায়ন, রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্র উদ্‌ঘাটনে গল্পগুলি জরুরি হলেও গল্পের আধুনিকতা নির্মাণে তেমন বিচক্ষণতা চোখে পড়ে না।

গত ছয় দশকের গল্পজীবনে গল্পহীন গল্প দিয়ে শুরু করলেও কখনো কখনো কাহিনির অবতারণা ঘটিয়েছেন। মিথিলেশ ভট্টাচার্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্মাণশিল্প। জীবনকে দেখার স্বচ্ছ দৃষ্টি, জীবনের গভীরসজ্জায় বিরাজমান অকথিত সত্যের নির্যাস উদ্‌ঘাটন, বিচ্ছিন্ন সত্যকে ধরে বয়ানকে সম্পূর্ণতার দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রাণবন্ত চেষ্টা একজন স্বতন্ত্র গল্পকার হিসেবে চিহ্নিত করে। মিথিলেশ ভট্টাচার্যের গল্প অস্থিরতার পাঠ। সম্ভাব্য পরিণতি বা পাঠককে মুগ্ধতার স্বরূপ একটা চিরন্তন বোধে উপনীত করতে তিনি গল্প গড়েন না। তাঁর গল্প চিন্তার গভীর স্তর থেকে উঠে আসা বহুরৈখিক সত্তার বিরোধাভাস। তাত্ত্বিক সত্যকে ধরেই জীবনের নির্যাসকে অসমান্তরাল বিন্যাসে রোমন্থন। ·