কল্লোল লাহিড়ী আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বহুমাত্রিক ও স্বতন্ত্র এক নাম। 'ইন্দুবালা ভাতের হোটেল', 'গোরা নকশাল', 'নাইনটিন নাইনটি: আ লাভ স্টোরি' কিংবা 'বাবার ইয়াশিকা ক্যামেরা'র মতো অনবদ্য সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি পাঠকদের বারবার ইতিহাস, স্মৃতির পুননির্মাণ, উদ্বাস্তু জীবনের বিষাদ আর সম্পর্কের জটিল মনস্তত্ত্বের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর সৃষ্টিশীলতার ক্যানভাসে যেমন রয়েছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক ইতিহাসের গভীর মেলবন্ধন, তেমনি রয়েছে চলচ্চিত্রের সিনেম্যাটিক ভাষাকে সাহিত্যের পাতায় বুনে দেওয়ার অসাধারণ এক দক্ষতা।

দীর্ঘ এই আলাপচারিতায় তিনি অত্যন্ত আন্তরিক ও প্রাঞ্জলভাবে ভাগ করে নিয়েছেন তাঁর শৈশবের দিনগুলো, সিনেমা ও সাহিত্যের সঙ্গে প্রথম পরিচয়, চিত্রনাট্য রচনার চ্যালেঞ্জ, শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা এবং তাঁর গল্প-উপন্যাসের পেছনের অজানা সব প্রেক্ষাপট। শিল্প, স্মৃতি ও জীবনের মেলবন্ধনে সমৃদ্ধ সাক্ষাৎকারটি নিঃসন্দেহে পাঠকের জন্য আনন্দপাঠ হবে। গল্পপাঠের পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন নাহার তৃণা



নাহার তৃণা: 
চিত্রনাট্যকার, চলচ্চিত্র বিষয়ক শিক্ষক, ক্রিয়েটিভ প্রডিউসার, ঔপন্যাসিক-গল্পকার, এতগুলো পরিচয়ের মধ্যে কোন পরিচয়টি আপনাকে বেশি আনন্দ দেয়?

কল্লোল লাহিড়ী: 
প্রত্যেকটি কাজের এক-একটা নিজস্ব পরিচয় আছে। পরিধি আছে। আত্মমগ্নতা আছে। তারসঙ্গে জড়িয়ে আছে নিজের ভালোলাগা, ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা। কাজেই চিত্রনাট্যকার, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, শিক্ষক, ক্রিয়েটিভ প্রডিউসার, নাট্যকার, চিত্রনাট্য পর্যবেক্ষক যাই বলুন না কেন এই প্রতিটা কাজের একটাই মানুষ। কিন্তু ভালোলাগা, ভালোবাসা আর অভিজ্ঞতাগুলো এক একটা কাজের ক্ষেত্রে এক এক রকমের। যা আমার কাছে বেশ চ্যালেঞ্জিং। অনেক কিছু শিখতে পারি প্রতিনিয়ত। এবং এখনও শিখেই চলেছি ক্রমাগত। কাজেই প্রতিটি পরিচয় আমার কাছে সমান গুরুত্ত্বপূর্ণ। আমি প্রত্যেকটি কাজ, যখন যেটা করি মন দিয়ে করার চেষ্টায় থাকি আর সেই জার্নিটাও খুবই উপভোগ করি। কাজেই প্রতিটি কাজের পরিচয় আমাকে আনন্দ দেয় এবং তারসঙ্গে তাদের গুরুত্ত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে। আমাকে এই সময়ে, এই আবহে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। সেটা যেমন আর্থিক ভাবে তেমনই নিজের ভাবনা চিন্তার প্রতিফলনের দিক থেকেও।

নাহার তৃণা: 
আপনি ‘হ্যালো কলকাতা’ চলচ্চিত্রের দুইজন চিত্রনাট্যকারের একজন, যদি ভুল করে না থাকি, চিত্রনাট্যকার হিসেবে সেটিই সম্ভবত আপনার প্রথম কাজ। নবাগত হিসেবে কেমন ছিল সেই অভিজ্ঞতা?

কল্লোল লাহিড়ী: 
হ্যালো কলকাতা সে অর্থে আমার প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছবির চিত্রনাট্য। বন্ধু পরিচালক মনোজ মিচিগান একটি চিত্রনাট্য পড়তে দিয়েছিলেন। আমি আমার ভাবনাগুলো বলাতে তিনি আবার সেটি নতুন করে লিখতে দেন। ডিজিটাল যুগের এক্কেবারে প্রথম দিকের ছবি। তবে তার আগেও স্ক্রিনের জন্য অনেক লেখালেখি করতে হয়েছে। এবং সেটা অনেক ধরণের। যাঁরা টেলিভিশনের কাজের সঙ্গে যুক্ত তাঁরা জানবেন। যদিও ছাব্বিশ বছর আগের টেলিভিশন আর এখনকার টেলিভিশনের আকাশ পাতাল পার্থক্য। যাইহোক অভ্যেসটা ছিল। এবং ভালোমতো।

নাহার তৃণা: 
যদি একটু ডিটেলে বলেন তাহলে খুব ভালো হয়।

কল্লোল লাহিড়ী: 
আমি চলচ্চিত্র বিদ্যার ছাত্র ছিলাম। জীবনের প্রথম কাজ শুরু করেছিলাম একটি নতুন স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলে প্রোগ্রাম প্রডিউসার হিসাবে। কাজেই নিজের অনুষ্ঠান সেই সময়ে নিজেই পরিচালনা করতে হতো, স্ক্রিপ্ট নিজেই লিখতে হতো, এমনকি পরিচালনাও। দুহাজার সালের প্রথম দিকে ‘আকাশ বাংলা’ আমাদের সবার কাছেই ছিল পুণে ফিল্ম ইন্সটিটিউটের মতো। আমাদের মাথার ওপরে যে দাদারা ছিলেন সেই সৌরভদা, কৃষ্ণদা, রাহুলদা আমাদের প্রচণ্ড সব দামি দামি মেশিন নাড়াচাড়া করার সুযোগ দিয়েছিলেন। নিজের মতো অনুষ্ঠান নির্মাণেরও। শর্ত ছিল ছবিটা যেন ভালো ওঠে, শব্দ যেন শোনা যায় আর নানা রকমের সব আইডিয়া। কাজেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় যদি আমার ফিল্মের তাত্ত্বিক এবং ঐতিহাসিক ভীত তৈরি করতে, ছবির পাঠ নিতে এবং বিশ্ব সিনেমার দরজা খুলে দিতে সাহায্য করে থাকে তাহলে আমার প্রথম চাকরির পরিসর আমাকে যত্ন করে শিখিয়েছে হাতে কলমে কাজ করার অনুশীলন। এক ঝাঁক তরুণ সেই সময় যাঁরা কাজ করছিলেন আজ অনেকেই তাঁদের নিজের কাজে খুবই সফল এবং স্বনামে প্রতিষ্ঠিত। কাজেই খাতায় কলমে হ্যালো কলকাতা থাকলেও স্ক্রিনের জন্য লেখালেখি শুরু হয়েছিল তারও অনেক আগে। বরং হ্যালো কলকাতা যখন লিখি তখন আর চাকরি করি না। নিজেই নিজের মতো কাজ করে বাঁচার চেষ্টার পথে পা বাড়িয়েছি সবেমাত্র।

নাহার তৃণা 
লেখক কল্লোল লাহিড়ীর প্রথম লেখা কোথায়-কবে প্রকাশিত হয়? কোন ধরণের লেখা ছিল সেটি?

কল্লোল লাহিড়ী 
সেটা একটা মজার ঘটনা। কিছুটা বাবার ইয়াশিকা ক্যামেরাতে লিখেছি। আশির দশকের গোড়ায় সেই সময়কার বামফ্রন্ট সরকার ঠিক করেছিলেন যুব উৎসব পালন হবে। এই উৎসব গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বিরাট করে পালন করা হয়েছিল। একেবারে মিউনিসিপ্যালিটি থেকে শুরু করে ব্লক, জেলা হয়ে রাজ্যস্তর পর্যন্ত। অনেকগুলো বিভাগ ছিল প্রতিযোগিতার। তারমধ্যে যেমন আঁকা, আবৃত্তি, গান, নাচ, তাৎক্ষণিক বক্তৃতা, ক্যুইজ এইসব ছিল, তেমনই তার পাশাপাশি ছিল গল্প লেখা। আমি তখন চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। আমাদের বাড়ির সামনেই ছিল গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড। সেখানে দেখা একটা ঘটনার ভিত্তিতে লিখে ফেলি একটা ছোট্ট গল্প। কিন্তু চোখ বড় বড় করে গল্প বলা আর লেখার মধ্যে তো আকাশ পাতাল তফাৎ। তাও বাবার জোরাজুড়িতে লিখেছিলাম। বাবা সব কাজে প্রচণ্ড উৎসাহ দিতেন দাদাকে, আমাকে এবং তাঁর ছাত্র-ছাত্রীদেরও। সেই গল্প প্রথমে মিউনিসিপ্যালিটি, তারপর ব্লক এবং পরে জেলাস্তরে প্রথম হয়। গল্পটি তারও এক বছর পরে স্কুলের ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল। নিজের নাম প্রথম ছাপার অক্ষরে দেখা একটা বিস্ময়কর ব্যাপার। শুধু তাই নয় বন্ধুরা যখন পড়লো, এমনকি তাদের বাড়ির লোকজনেরা যখন ডেকে বলতো, ভালো লাগতে শুরু করেছিল। এমনকি লাস্ট বেঞ্চ যাদের সঙ্গে পরিচয় ছিল না মোটেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হলো ওই গল্প বলা আর লেখার সূত্র ধরেই। আমার কাছে একটা অচেনা জগতের দরজা খুলে গেল খানিকটা ম্যাজিকের মতোই। যে লাস্ট বেঞ্চের গল্প তারও বহুকাল পরে লিখেছিলাম ‘নাইনটিন নাইনটি আ লাভ স্টোরিতে’। সেখানে আমার জনপদ আর স্কুলটা যেন জ্যান্ত চরিত্র হয়ে আছে। প্রথম গল্প প্রকাশিত হবার পর থেকে আমার স্কুলে থাকা পর্যন্ত যতবার ম্যাগাজিন বেরিয়েছে আমার একটা লেখা থাকতো। পাড়ায় বন্ধুরা মিলে একটা হাতে লেখা ম্যাগাজিন শুরু করেছিলাম খেলার ছলেই। নাম ছিল অঙ্কুর। একটাই সংখ্যা বেরিয়েছিল মনে হয়। কিন্তু সমবেত ভাবে কিছু একটা করছি সেই আনন্দটা তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াতো। ভালো লাগতো লিখতে, পড়ে শোনাতে আর প্রবল ভাবে টেনেছিল সিনেমা, টেলিভিশন। আমাদের ওই ছোট্ট মফস্বলে সেই সময়ে একটা সিনে ক্লাবও ছিল। সিনে গিল্ড বালি। এখনও আছে এবং বেশ ভালো ভালো কাজ তাঁরা করছেন। যা বলছিলাম, সেই আশির দশকের গোড়ায় ততদিনে আমার মাঠে বসে দেখা হয়ে গেছে ‘পথের পাঁচালী’, ‘গুপি গায়েন বাঘা বায়েন’, ‘আকালের সন্ধানে’র মতো ছবি। পাড়ার দাদারা, দিদিরা তখন ফিল্ম ক্লাব নিয়ে মশগুল। আমার শুনতে ভালো লাগতো সেইসব গল্প। দেখতে ভালো লাগতো ছবি। আমাদের বালীর বাসায় পলেস্তারা খসা দেওয়ালে চুপচাপ বসে থাকতেন চ্যাপলিন। এখন ভাবতে অবাক লাগে সেই কবেকার কথা। আমার জেঠুর ছেলে, যিনি আমাদের সঙ্গেই ছিলেন তিনি কোথা থেকে জোগাড় করেছিলেন চ্যাপলিনের সেই পোষ্টারটিকে কে জানে। তার কাছ থেকেই চ্যাপলিনের মজার সব গল্প শোনা। কাজেই একটা আবহ গড়ে উঠেছিল সিনেমাকে ভালোবাসার। অনেক ছোট থেকে ঠিক করেছিলাম ফিল্ম নিয়ে পড়বো। বাড়ির লোকজন কেউ কোনোদিন বাধা দেয়নি। নিরুৎসাহ করেনি। কাজেই সবটাই আমার কাছে ছিল মাঝরাতে জেগে জেগে যাত্রা দেখার মতোই আরামদায়ক। নতুন একটা গল্পের বা সিনেমার প্লটের মতোই। যদিও সেইভাবে তখনও ভাবতে শিখিনি। কিন্তু টুকরো টুকরো স্বপ্ন হাতছানি দিতো। যাদের নিয়ে আমি রাতে ঘুমোতে যেতাম। যারা সবসময় আমার সঙ্গে হাঁটতো। এখনও। না হলে বাঁচতাম কী করে?

নাহার তৃণা: 
আপনার প্রথম উপন্যাস গোরা নকশাল—যেখানে ব্যক্তিগত স্মৃতি, রাজনৈতিক ইতিহাস আর শহরের অস্থিরতা একসঙ্গে মিশে গেছে। এই বইটি লেখার সময় আপনার নিজের ভেতরে কোন প্রশ্নটা সবচেয়ে বেশি কাজ করছিল?

কল্লোল লাহিড়ী: 
অনেক ধন্যবাদ এমন সুন্দর একটা প্রশ্ন করার জন্য। এটা কঠিন প্রশ্ন। অন্তত আমার কাছে তো বটেই। গোরা নকশাল লিখতে বসি একটা মানুষকে সামনে রেখে। যাকে কোনোদিন বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে পারিনি আমরা। যাঁর বাড়ি ফেরার ইচ্ছা ছিল তীব্র। তিনি আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছিলেন। হ্যাঁ অনেক কিছু। তাঁর শেষ শয্যায় সেই অ্যাসাইলামে বসে গোরা নকশালের কথা প্রথম মাথায় আসে। তারসঙ্গে আবছা আবছা ভেসে আসে আমার বাড়িতে আমার না দেখা, জন্মের আগের একটা পোষা পায়রার গল্প। যার নাম ছিল নকশাল। তার সব আজব মজাদার গল্প অনেক ছোটবেলায় আমাদের চারপাশে টুকরো টুকরো হয়ে এর মুখে তার মুখে ঘুরে বেড়াতো। আমরা শুনতাম। অবাক হতাম। সে ছিল স্বাধীন। সে ছিল একক। সে ছিল একটা সময়ের প্রতিভূ। কেমন করে জানি না সে কোথা থেকে আমার সামনে উড়ে বেড়াতে থাকলো। যে মানুষটা আমার সামনে এই মৃত অবস্থায় পড়ে আছে সেও তো ছিল স্বাধীন। একক। আর সমষ্টির বাঁধনে বাঁধা। যারা উড়তে পারতো তারাই কি তাহলে নকশাল ছিল? সেই ছোট্ট টুকনুর মতো আমারও তখন বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করলো আসলে ওটা হলো পায়রাদের টাইটেল। আমার সেই কাছের মানুষটার সৎকার করে এসে প্রথম অধ্যায়টা লিখতে বসি। না তাঁর সঙ্গে সরাসরি নকশাল আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু তারমধ্যে আমার দেখা অনেকের ছায়ায় গড়ে উঠেছিল গোরা নকশাল। যাঁদের আমি দেখেনি, যাঁদের দেখেছি তাঁরা সবাই ভিড় করে জড়ো হয়ে দাঁড়ালেন ডেস্কটপের সামনে। ছোট্ট টুকনু দেখলো আলো ঝলমলে একটা জনপদ আর তার অতীতে ফেলে আসা জীর্ণ সময়কে। কীভাবে সেই সময় একটা প্রাচীন বট বৃক্ষের মতো ডালাপালা প্রসারিত করলো। যে প্রাচীন গাছের ছায়ায় আমরা আশ্রয় নিলাম। আস্তে আস্তে আমার ছোট্ট শহরটা, আমার ছোটবেলায় শোনা রূপকথারা বয়ে আনলো ঢেউয়ের পরে ঢেউ তুলে রক্তের উজান গঙ্গা পেরিয়ে এক আলোড়ন তোলা বিপ্লবের ঠিকানা। সেই ঠিকানাকে অনেক দিন পরে ফিরে দেখলো টুকনু। ফিরে দেখলো এক তথাকথিত সমাজের লেবেল এঁটে দেওয়া হেরে যাওয়া মানুষের পাশে বসে থেকে, তার চোখ দিয়ে। আমি জানিনা আপনার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারলাম কিনা। কিন্তু এরচেয়ে এই মুহূর্তে আমার আর কিছু বলার নেই।

নাহার তৃণা: 
গোরা নকশাল-এ আপনি যে সময়টাকে ধরেছেন সেটা কি আপনার কাছে ইতিহাস, নাকি ব্যক্তিগত স্মৃতির পুননির্মাণ?

কল্লোল লাহিড়ী: 
যে জায়গার ওপর দাঁড়িয়ে আছি সেটার ভিত্তিভূমি তো ইতিহাস। ইতিহাস ছাড়া আমরা চলবো কী করে? ঠিক তেমনই স্মৃতি। স্মৃতি শূন্য মানুষ মানে একবার ভাবুন তো তার কথা। যার কাছে স্মৃতি নেই, ইতিহাস নেই, তারমানে সে যন্ত্রমানব ছাড়া আর কিছু তো নয়। স্মৃতিকে মনে রাখার জন্যই তো এতো লড়াই। গোটা পৃথিবী জুড়ে ইতিহাস আর স্মৃতিকে মুছে ফেলতে পারলে যারা এই পৃথিবীটাকে শাসন করবে ভাবছে তাদের সুবিধে। আর যেটা পড়ছি সেটা কি শুধুই গল্প? উপন্যাস? নাকি তার বাইরেও রয়ে গেছে আরও অনেক কিছু। যেগুলো তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে অনবরত। অনন্তকাল। যে ছোট ছোট ঘটনা, গল্প, গাথার মধ্যে দিয়ে বড় হয়ে ওঠা আমাদের। আসলে আমি বিশ্বাস করি যেখানে দাঁড়িয়ে ‘অবলোকন’ করছি সেই প্রেক্ষাপটে ইতিহাস ছুঁয়ে যাবে, মেঘের মতো ভর করে থাকবে স্মৃতি। তবেই না তির তির করে বয়ে চলা সংকটকে বুঝতে পারবো। তবেই না গল্প আমাকে ফিরতি পথ দিয়ে ঘুরিয়ে দাঁড় করাবে এক বড় দরজার সামনে। যেটা অনবরত খোলার চেষ্টা করে যাবেন লেখক।

নাহার তৃণা: 
নকশাল আন্দোলন নিয়ে বাংলা সাহিত্যে বহু লেখা আছে। গোরা নকশাল-এ আপনি কোন প্রশ্নটা তুলতে চেয়েছিলেন, যা অন্য লেখায় অনুপস্থিত বলে মনে হয়েছিল?

কল্লোল লাহিড়ী: 
আমি কোনো প্রশ্ন তুলতে চাইনি। আমি আমার গল্প বলে গেছি। এই প্রসঙ্গে বলি, কবি রাহুল পুরকায়স্থ আমাকে খুব স্নেহ করতেন। আমার সব লেখা, ছবি, সিরিজ, টেলিভিশনের মেগা সিরিয়াল দেখতেন। শুধু তাই নয় তারপরে ফোন করে বলতেন। শুধু আমার ক্ষেত্রেই না ওনার পছন্দের সবার জন্যই এই স্নেহ ছিল। রাহুলদা এখন নেই। কিছুদিন আগে মারা গেছেন। কিন্তু গোরা নকশাল নিয়ে রাহুলদার কথাটা আমার কানে এখনও বাজে। “তুই তো নকশালদের নিয়ে রূপকথা লিখেছিস”। খুব পছন্দের টেক্সট ছিল রাহুলদার গোরা নকশাল। যতবার দেখা হয়েছে। ততবারই বলেছে। দেবালয়ের সঙ্গে ‘ড্রাকুলা স্যার’ লেখার সময় অনেক কিছু তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছিল। আমাদের সবাইকে খুব ভালোবাসতো। দেখুন এই যে রূপকথার আদলের কথা রাহুলদা বলেছে সেটা যখন লিখছি তখন কিন্তু অতো ভাবনা চিন্তা করে আসেনি। সত্যি না। একটা বছর আটেকের ছেলে সে দেখছে একটা সময়কে, তাদের গায়ে গায়ে ঘেষে থাকা মানুষদের। তাদের সেই ছোট্ট অঞ্চলকে। যেটা একটু একটু করে পালটে যেতে থাকছে। নতুন বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এসেছে। রাজনৈতিক বন্দি হিসাবে যে লোকটা দীর্ঘদিন কারাগারের অন্ধকারে ছিল সে তার ছিন্ন বিচ্ছিন মন নিয়ে অত্যাচারে বিদ্ধ ক্ষত শরীর নিয়ে ফিরছে। আর তার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে একটা ছোট্ট ছেলে। তার জীবনে অনেক প্রশ্ন। অনেক কিছু জানার জন্য ছটফটানি আছে। গোরা নকশাল সেটাকে নিভিয়ে দিচ্ছে না। আরও অনেক প্রশ্নের মতো জিনিস ঠিক সামনে বয়ে চলা নদীর মতোই প্রবাহিত হতে থাকছে। আমরা একটু একটু এগোচ্ছি আখ্যানের অভ্যন্তরে। কিছুটা দেখা। অনেকটা না দেখা। বেশ কিছুটা শ্রুত। অনেকটা অশ্রুত সব গল্পেরা ভিড় করছে। আঁজলা উপছে পড়ছে। ছড়িয়ে যাচ্ছে দিক বিদিকে। এই দেখুন একটা কথার সূত্র ধরে আরও কোথায় কোথায় হারিয়ে যাচ্ছি আমরা। আরও কত কথা ভিড় করছে। দেখুন আমি অন্তত কোনো প্রশ্ন তোলার জন্য কিছু লিখি না। হ্যাঁ মতাদর্শ থাকে। নির্দিষ্ট ভাবনা চিন্তা থাকে। কিন্তু কোনো কিছু আন্ডারলাইন করতে চাই না কোনোদিন। সেটা যদি অজান্তে এসে যায়, কেউ পড়তে গিয়ে উপলব্ধি করেন, তখন না হয় সেটা নিয়ে আলোচনা করা যায়। কিন্তু নির্দিষ্ট প্রশ্ন উত্থাপন করে আমি কোনোদিন কোনো লেখায় প্রবেশ করিনি। এখনও করি না।


নাহার তৃণা: 
গোরা চরিত্রটি কি সম্পূর্ণ কল্পনা, নাকি বাস্তব কোনো মানুষের ছায়া আছে?

কল্লোল লাহিড়ী: 
দেখা না দেখা অনেক চরিত্রের আধারে লেখা। এটা নিয়ে মনে হয় আমরা বেশ কিছুটা আলোচনা করে ফেলেছি।

নাহার তৃণা: 
দেশভাগের অভিঘাত প্রায়শই আপনার লেখায় একটি বিশেষ চরিত্র হিসেবে উপস্থিত থাকে। বিখ্যাত বাঙালি চিত্রস্রষ্টা-লেখক ঋত্বিক কুমার ঘটককে এই বিশেষ কারণে আজীবনই জর্জরিত থাকতে দেখা গেছে। তাঁর ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সরাসরি ভুক্তভোগী। আপনার ক্ষেত্রে একদমই তা নয়। দেশভাগের অনেক পরে আপনার জন্ম; তাসত্ত্বেও দেশভাগের যন্ত্রণা লেখক কল্লোল লাহিড়ীকে নিরন্তর তাড়িয়ে বেড়ায়– এই বিষয়টি নিয়ে গল্পপাঠের পাঠকদের যদি কিছু বলেন?

কল্লোল লাহিড়ী: 
স্বাধীনতা ও দেশভাগের ঠিক আঠাশ বছর পরে আমার জন্ম। ধরে নিচ্ছি তার আরও পাঁচ বছর পরে যখন টুকরো স্মৃতিগুলো মনে রাখার মতো অবস্থা হয় সেইসময়টা আমার জীবনে একদম আশির দশকের গোড়ার দিক। ভাবুন গোরা নকশালের টুকনুর বয়েস। সেই বয়সে যেসব ছিন্নমূল মানুষগুলো যেমন তারমধ্যে আমার ঠাম্মা, মনি (পিসি), আমার জেঠু আমার বড়মা, কাকা এঁরা আমার আর দাদার চারপাশে ঘুরে বেড়াতেন। তাঁদের গায়ে জড়ানো ছিল আমার আর দাদার না দেখা দেশের একটা ছায়া। আমাদের ছোট্টবেলাটা কেটেছে এই মানুষগুলোর গায়ে গা লাগিয়ে। এঁদের গল্প, কথায়, রান্নায়, আদরে, মন কেমনে। এঁদের মধ্যে সিংহভাগ তার কয়েক বছরের মধ্যেই আমাদের চারপাশ থেকে চিরকালের জন্য চলে যাবেন। কিন্তু পড়ে থাকবে কোথাকার কোন খুলনার কলাপোতা নামের এক অজ পাড়া গাঁ। তার একটা ডোবা পুকুর। সেই পুকুর পাড়ে একটা কাঁচা মিঠে আমগাছ। গোয়ালে হরিমতি নামের এক গাই। তার ছোট্ট দুষ্টু বাছুর। একটা তুলসী তলা। সবে কুয়াশা নামতে থাকা সন্ধ্যেয় টিমটিম করে জ্বলা একটা মাটির প্রদীপ। ভরা বর্ষায় কপোতাক্ষের ওপর দিয়ে পাল তোলা নৌকায় পিসির প্রথম শ্বশুর বাড়ি যাওয়া। রথের মেলা। আমসত্ত্ব দেওয়া। অষ্ট প্রহরের নাম সংকীর্তন। তিন মহিলার আঁধার রাতে দেশ ছাড়ার গল্প। আরও কত কি! যেগুলো আমি বা দাদা কেউ কোনোদিন দেখিনি। যেগুলো ছিল আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু কারেন্ট অফের রাতে এই গল্প গুলোই ছিল সেই না দেখা দেশটার রূপকথা। আমার দাদা সাদা কাগজের ওপরে প্যাস্টেল কালার দিয়ে এঁকেছিল মনির গল্পের ফলসা গাছটাকে। যেখানে ফল ধরে মেঘ ঘনিয়ে থাকতো। তারও অনেক পরে এক বন্ধুর বাড়িতে প্রথম ফলসা গাছ দেখি। এমনও দেখতে হতে পারে একটা গাছ? এতো সুন্দর। চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম গাছটার নিচে অনেকক্ষণ। কবেকার মরে যাওয়া মনির গল্পটা ঘুরে ফিরে হন্ট করে যাচ্ছিল।

আমাদের চারপাশে জড়িয়ে থাকা মানুষরা যে সব সময় দেশ দেশ করে হাহাকার করেছেন তেমনটা নয়। কিন্তু তাঁদের গল্পগুলো শুনলে মনে হতো একটা ছোট্ট বাসায় দশ ফুট বাই দশ ফুটের সংসারে যে মানুষগুলো আছে তাঁরা খুব একটা সুখে নেই। থাকতে পারে না। কারণ তাঁদের এটা বাড়ি নয়। বাসা। তাঁদের ছড়ানো ছেটানো হাত-পা মেলে বেঁচে থাকার স্পেসটা এখন আর নেই। তাঁরা এখন কেউ নতুন ধান উঠলে গোলা ভরে না। ঢেকিতে চাল কোটা হয় না। তাঁদের নিজস্ব কোনো গাছ নেই। পুকুর নেই। নিজের বলতে পড়ে আছে শুধু স্মৃতি। তাঁরা নানা বর্ণে সেগুলো গল্পের মতো বলে চলতেন। আমার বাবা অনেক ছোট্টবেলা থেকে এদিকে তাঁর কাকার কাছে মানুষ হয়েছেন। কাজেই বাবার কাছে দেশ বলে তেমন কোনো অভিঘাত ছিল না। যতটা ছিল তাঁর চারপাশের লোকজনের। তবুও কি রিফিউজি স্ট্যাম্পটা ভালো লাগতো তাঁর? মোটেই না। বাবা ছিলেন খুব শান্ত প্রকৃতির। বেশি কথা বলতেন না। দিদি, কাকা, বন্ধু অনেকের সংসারে ঘুরে ঘুরে তাঁকে মানুষ হতে হয়েছিল। অনেক ছোট্ট বয়সে নিতে হয়েছিল বিরাট সংসারের দায়িত্ব। আমি যখন বাবাকে দেখি তখন বাবা খুবই অসুস্থ। আমার যখন চব্বিশ বছর বয়েস তখন বাবা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। অমানসিক খাটনি তাঁর শরীরে বপন করেছে রোগ। খুব কষ্ট করে তাঁকে সংসার করতে হয়েছে। তারসঙ্গে দুই ছেলেকে মানুষ করা। অনেক পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে যখন খুব ভালো করে পরিচয় হবে ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে, নীতার সঙ্গে, সীতার সঙ্গে কোথাও যেন মেঘে ঢাকা তারা থেকে কোমলগান্ধার হয়ে সুবর্ণরেখার ছায়া দেখতাম ওই বালীর বাড়ির বাসাটায়। আধো আলো আধো অন্ধকারে একটা তক্তপোষের ওপর ঘাড় নিচু করা বাবাকে দেখে মনে হতো আমি একটা খণ্ড বিখণ্ড দেশকেই যেন দেখছি। বাবা নতুন শতাব্দী দেখে যেতে পারেনি। তার আগেই আমি আর দাদা মিলে অস্থি ভাসিয়ে দিয়েছিলাম গঙ্গায়। আমাদের জীবনের একটা বিরাট পর্বের সমাপ্তি ঘটছিল।

এটা যদি ভাবি শুধু আমার পরিবারের গল্প তাহলে ভুল হবে। এপার ওপার মিলিয়ে হাজার হাজার মানুষের গল্প। এর অনেকটা ধরা আছে আমাদের বাংলা সাহিত্যে। এক বিপুল সংখ্যক লোককে শুধু স্বাধীনতার নামে দেশভাগ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। একটা মহাদেশকে দু টুকরো করার কষ্ট যারা পুইয়েছে এটা তাঁরা তাঁদের পরিবারের অন্তর্গত প্রবাহে রক্ত স্রোতের মতো মনে রাখবে চিরদিন। মনে রাখবে সেইসব অলিখিত ইতিহাস। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গল্পগুলো। এগুলো কোনোদিন ভুলে যাবার নয়। ভুলে গেলে ইন্দুবালা দুই বাংলায় এইভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারতেন না। জনপ্রিয় হতেন না। ইন্দুবালা হইচইতে সিরিজ হবার পর আমাদের যিনি অন লাইন প্রডিউসার ছিলেন বিনোদ ভাল্লা, তিনি পাঞ্জাবি, দিল্লিতে বাড়ি। তাঁর কাছে ফোন আসতে থাকে পাঞ্জাব থেকে। তাঁদের ভালো লাগতে শুরু করেছে ইন্দুবালাকে। তাঁরা কানেক্ট করতে পারছেন দেশভাগ তার যন্ত্রণা আর উদ্বাস্তু তকমাটাকে। তাঁরা মনে করতে পারছেন তাঁদের সামনে দেখা তাঁদের পরিবারের মানুষের এমন লড়াইকে। মনে আছে ঋত্বিক ঘটকের কোমলগান্ধার ছবি থেকে আমার খুব প্রিয় একটা সংলাপ ধার নিয়েছিলাম ইন্দুবালা লেখার সময়। অনসূয়াকে একজন সংগ্রামী শিক্ষক কিছু পয়সা চাঁদা চাওয়ার পর বলছেন, আপনারা থাকুন। আপনারা থাকলে আমরাও থাকবো। ইন্দুবালাকেও সেই রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে খেতে আসা নকশাল ছেলেটি বলে, “কমরেড ইন্দুবালা আপনারা ভালো থাকুন। আপনি ভালো থাকলে আমরাও ভালো থাকবো”। দেখুন একটা উপন্যাস লেখার বপনে কোথা থেকে চলে আসছেন জসীমউদ্দীন, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিষাদসিন্ধু, মহাভারতের গল্প। ইন্দুবালার রক্তের সঙ্গে প্রবাহিত হচ্ছে খাদ্য আন্দোলন, নকশাল আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, ইন্দুবালাকে মনে হচ্ছে একটা সীমানাহীন দেশ, তাই না? রান্নার নানাপদে কি তিনি সাজিয়ে দিচ্ছেন না বাঙালির স্মৃতি আর ইতিহাসকে? তার গল্প, তার গাথা, তার লক্ষ্মীর পাঁচালি, মুক্তিযোদ্ধার ব্যাগের মধ্যে জমাটবাঁধা রক্তের সঙ্গে স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখা পতাকা। আর ইন্দুবালার সঙ্গেই কি এসে পড়ছে না আমার ঠাম্মা, দিদা, রাঙা, বড়মা, মনি আমার মা এবং পৃথিবীর অগণিত মানুষের কণ্ঠস্বর?

যখন লিখতে বসলাম দেখলাম এঁরা সবাই অজান্তেই কি করে যেন আমার কিপ্যাডে এসে জড়ো হচ্ছেন। আর বলে চলেছেন নিজেদের গল্প নিজের মতো করেই। আমি শুধু টাইপ করে যাচ্ছি যেন। আমি মনে করি এই উপমহাদেশের মারাত্মক ঘটনা দেশভাগ। যে আগুনের তাপ এখনও আমাদের সবার গায়ে এসে লাগে। একটু গভীর ভাবে ভাবলেই বোঝা যাবে। কাজেই সেই বিষয়টি আমাকে তাড়া করবেই। সে গোরা নকশাল হোক, ইন্দুবালা কি বাবার ইয়াশিকা ক্যামেরা। নিস্তার নেই।

নাহার তৃণা: 
‘ইন্দুবালা ভাতের হোটেল’ উপন্যাসটিকে স্রেফ সমকালীন উপন্যাস হিসেবে চিহ্নিত করলে উপন্যাসটির প্রতি অবিচার করা হয়, আপনি এমন মতামতের প্রতি সমর্থন জানাবেন?

কল্লোল লাহিড়ী: 
একটা লেখা শেষ হয়ে প্রকাশিত হওয়ার পরে সেটা নিয়ে পাঠকরা কি ভাবছেন সেটাই বড় কথা। এখানে আমার কিছু বলার নেই। সময় এবং পাঠকরাই এর সবথেকে ভালো উত্তর দিতে পারবেন।


নাহার তৃণা: 
ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-এর সাফল্য কি আপনার লেখার দৃষ্টিভঙ্গিকে কোনোভাবে বদলেছে?

কল্লোল লাহিড়ী: 
সচেতন করেছে। দায়িত্ব আরও বেড়েছে। আর বয়সের সঙ্গে সঙ্গে লেখা পালটে যায়। ভাবনা চিন্তাও। তবে একই রকম লেখা লিখতে চাইনি কোনোদিন। চাপ ছিল অনেক। আরও একটা ইন্দুবালা লেখার। কিম্বা ইন্দুবালার মতোই আরও অনেক কিছু। কিন্তু না। একটা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেক রাস্তায় সেটা গিয়ে মেশে। আমিও একটা রাস্তায় হাঁটছি। তার বাঁক পড়ছে। দিগবদল ঘটছে। আমিও তেমন ভাবে চলেছি। এখনও পর্যন্ত আমার পাঁচটি বই প্রকাশিত হয়েছে। সেই বইগুলোর কনটেন্ট দেখলেই হয়তো বুঝতে পারবেন তারা একে অপরের থেকে কতটা আলাদা। তার কনটেন্ট ফর্ম সব কিছুই।

নাহার তৃণা: 
চলচ্চিত্রের শিক্ষক হিসেবে নতুন লেখকদের কোন শক্তি বা দুর্বলতা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে?

কল্লোল লাহিড়ী: 
অনেকদিন শিক্ষকতা করেছি। টানা দশ বছর। সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিনে আমি গোটাটা কাটাতাম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের হার্ডিঞ্জ বিল্ডিং এর একদম ছাদের ঘরে সিনেমা নিয়ে পড়াশুনোয় অনেক অনেক তরুণ ছাত্রদের সঙ্গে। ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজের সেই ঘরটাকে আমরা আদর করে ডাকতাম চিলেকোঠার ঘর বলে। আর্লি সিনেমা থেকে শুরু করে এখনকার সিনেমার ক্লাসগুলো খুব উপভোগ করতাম। কারণ চলচ্চিত্রের ক্লাসে শেষ কথা বলে কিছু হয় না। সাহিত্যেও তাই। আমার মনে হয় সব বিষয়েই। আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক, ছবি দেখা। ভালো সময় কেটেছে। অনেক কিছু শিখেছি আমার ছাত্রদের কাছ থেকে, তাদের কতটা দিতে পেরেছি জানি না। বাংলাদেশেও টানা এক বছর চিত্রনাট্যের কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছিলাম। সেখানেও ছাত্রদের কাছ থেকে শিখেছি অনেক। বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছাত্ররা কত রকমের আইডিয়া নিয়ে আসতো। সারাদিন, দিনের পর দিন আমরা শুধু লেখা নিয়ে কথা বলেছি। তখনও তো আমার একটা উপন্যাসও প্রাকশিত হয়নি। কিন্তু টিভির জন্য, সিনেমার জন্য লিখে চলেছি।

আমার মনে হয় লেখার দুর্বলতা লিখতে লিখতে বোঝা যায়। ত্রুটিও। সেগুলো কীভাবে ধরবো বা বুঝবো আমরা নিরন্তর তা নিয়ে আলোচনা করতাম। অন্যের লেখা পড়তাম। তার সঙ্গে সিনেমা দেখা, নাটক দেখা কত কি যে চলতো। এইভাবেই সমবেত ভাবে বুঝেছি। এখনও সেই চর্চা জারি আছে। তবে সময় কমে এসেছে, তার পরিধিও। সেই সময়ের ছাত্ররা এখন যখন তাদের কাজ দেখতে ডাকে। দেখায়। পড়ায়। তখন মনে খুশির তুফান ডাকে। চোখ বলে চল জল থৈ থৈ খেলি।

এখন অনেক অনেক তরুণ লেখক অসাধারণ সব লিখছেন। যেগুলো হাতে আসে পড়ি। বন্ধুরা পড়ায়। চমকে উঠি। কি সুন্দর লেখেন হামিরউদ্দীন। কি সুন্দর লেখেন জগন্নাথ মন্ডল। একের পর অসাধরণ বই উপহার দিচ্ছেন শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য। ফেলুদা, ব্যোমকেশ, কিরিটী পড়া বাঙালির কাছে সম্পূর্ণ অন্য ফর্মে, অন্য মেজাজের থ্রিলার ফিরিয়ে দিয়েছেন শাক্যজিৎ। কবিতার ডালি নিয়ে আরও কত নতুন নতুন কবি পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, মেদিনীপুর, বালুরঘাট আরও কত প্রত্যন্ত জেলা থেকে লিখছেন। কিছু কিছু সাহিত্য সভাতে যাওয়ার সুযোগ পেলে চুপটি করে এক কোনে বসে তাদের লেখা শুনতে ভালো লাগে। তাদের সঙ্গে গল্প করতে। কত নতুন চিন্তা ভাবনা, নতুন কনটেন্ট নিয়ে গোটা দেশ জুড়ে সবাই কাজ করছেন। অনুবাদ করছেন লেখা। আমি তো বাংলা ভাষা ছাড়া অন্য কিছু জানি না। তাই অবাক হয়ে পড়ি সেইসব। এঁরা সবাই আমার শিক্ষক। আমি শিখে চলি। এর শেষ নেই। থাকতে পারে না।

নাহার তৃণা: 
চলচ্চিত্রের ভাষা ও সাহিত্যের ভাষা—আপনার কাছে কোথায় মিল, কোথায় ফারাক?

কল্লোল লাহিড়ী: 
দুটো সম্পূর্ণ আলাদা মাধ্যম। একটা পড়া। আর একটা দেখা। আর সেই দেখার ভাষা লেখায় ফুটিয়ে তোলাটাই একজন চিত্রনাট্যকারের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের কাজ। এটা শুধু কয়েক লাইন লিখে বোঝানো যায় না। সাহিত্য ও সিনেমার ভাষা নিয়ে বলতে গেলে গোটা দিন চলে যায়। চিত্রনাট্যের কর্মশালায় আমরা এর সূক্ষাতিসূক্ষ্ম বিষয় নিয়ে আলোচনা করতাম। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে, আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ঋতুপর্ণ ঘোষের সঙ্গে একটা চিত্রনাট্যে সহযোগী হবার। ঋতুদা তখন ঠিক করছিলেন ‘চোরাবালি’ গল্প অবলম্বনে একটা ছবি করবেন। খুব ইচ্ছে হয়েছিল তাঁর ব্যোমকেশ নিয়ে ছবি করার। তখন আমি নিয়মিত টিভির জন্য লিখছি। সিনেমার জন্য লিখছি। খুব যে বেশি কাজ করছি তেমন নয়। কিন্তু একটু একটু করে পরিচিতি বাড়ছে। সেইসময় বাসু চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে রূপালীদের সঙ্গে একটা ছবির কাজ করছিলাম। ঋতুদা সেখানে তাঁর সহযোগী পরিচালক দেবুদার কাছ থেকে খবর পেয়ে আমাকে ডাকেন। তাঁর সঙ্গে কাজের সুযোগ দেন। সেটা আমার কাছে একটা বড় পাওয়া ছিল। শেখার দিক থেকেও।

সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রে পরিগ্রহণের নানা বিষয় থাকে। অনেক দিক নিয়ে ভাবতে হয়। সেগুলো এর আগে নানান বইতে পড়েছি। শুনেছি। দেখেছি। কিন্তু হাতে কলমে কাজ করতে গিয়ে অনেকটা শিখলাম। যে রানী চরিত্র মূল গল্পে মাত্র একটা লাইনে ছিলেন সেই চরিত্রকে ঋতুদা নিয়ে এলেন একদম সামনের সারিতে। করলেন মুখ্য চরিত্র। তিন দিনে ঋতুদা চিত্রনাট্যের প্রথম ড্রাফট শেষ করেছিলেন। ওই তিন দিন আমার কাছে ছিল সবচেয়ে মনে রাখার মতো ক্লাস। আমাকে নিয়ে আদৌ ঋতুদার কোনো সুবিধে হয়েছিল কিনা জানি না। কিন্তু আমার সারা জীবনের জন্য অনেক কিছু শেখা হয়ে থাকলো। ওই তিনটে দিন আমার কাছে ভীষণ ভাবে স্মরণীয়।

দেখুন সাহিত্য এবং চলচ্চিত্র একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। একটাকে ছাড়া আর একটা ভাবা যায় না। সম্প্রতি প্রকাশিত তরুণ মজুমদারের ‘সিনেমা পাড়া দিয়ে’ বা ‘নক্সীকাঁথা’ যাঁরা পড়েছেন তাঁরা জানেন কীভাবে একজন পরিচালককে আকৃষ্ট করে গল্প।

সেই গল্প যদি সাহিত্য থেকে পরিগৃহিত হয় তাহলে তার একটা অন্য মাত্রা যোগ হয় বইকি। আর সাহিত্য সিনেমা থেকে নেয় তার সিনেম্যাটিক ল্যাঙ্গুয়েজ। সেগুলো যাঁরা লেখার মধ্যে বুনে দিতে পারেন সেটা হয়ে যায় এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। কোথাও কোথাও মিরাকেলের মতো। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের আত্মজীবনী ‘জীবন রহস্য’ পড়তে গিয়ে অবাক হয়েছিলাম। আখতারুজ্জামানের খোয়াবনামা। গৌরকিশোর ঘোষ। আরও অনেক আছেন। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। ভাবুন মার্কেজের কথা। তাঁর গোটা মাসের সাহিত্য ও সিনেমা বিষয়ক কর্মশালা ধরে রাখা আছে একটা বইতে। অনুবাদ করেছিলেন তরুণ ঘটক। ‘কেমন করে গল্প লিখতে হয়, চিত্রনাট্যের কর্মশালা’। মার্কেজ তো চলচ্চিত্রেরও ছাত্র ছিলেন। বলে গেছেন বইটিতে চলচ্চিত্র সম্পাদনা শেখাটা কীভাবে কাজে দিয়েছিল পরবর্তী কালে লেখালিখির জন্য। বইটা চলচ্চিত্র এবং সাহিত্যের ছাত্রদের অবশ্যই পড়া উচিত। দেখুন এটা এই স্বল্প পরিসরে আলোচনা করার বিষয় নয়। এই কথা প্রসঙ্গেই মনে পড়ে গেল সত্যজিতের চারুলতা নিয়ে বিতর্ক। সেখানে সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা এবং সাহিত্যের ওপর লেখাগুলো খুবই গুরুত্ত্বপূর্ণ। ঋত্বিকের বাড়ি থেকে পালিয়ে, অযান্ত্রিক, মেঘে ঢাকা তারা, তিতাস একটি নদীর নাম, রাজেন তরফদারের গঙ্গা, তপন বাবুর নির্জন সৈকতে। আরও কত কত উদাহরণ যে আছে। এই ছোট্ট পরিসরে এটা আলোচনা করা মুশকিল।

নাহার তৃণা: 
বাবার ইয়াশাকি ক্যামেরা’ গল্পে ক্যামেরাটা যেন শুধু একটি বস্তু নয়, এক ধরণের স্মৃতি-ধারণের যন্ত্র, আবার দেখার এক বিশেষ পদ্ধতিও। এই কাহিনি লিখতে গিয়ে আপনার নিজের ‘দেখা’—চলচ্চিত্রের ছাত্র, শিক্ষক ও লেখক হিসেবে—কীভাবে বদলে গিয়েছিল?

কল্লোল লাহিড়ী: 

আপনার এই সুন্দর প্রশ্নটায় আমার মনে পড়ে গেল খুব প্রিয় একজন পরিচালক ক্রিস্তভ কিয়েসলস্কির প্রথম ছবি ‘ক্যামেরা বাফ’কে। তারকভস্কির সিনেমা সংক্রান্ত খুব গুরুত্ত্বপূর্ণ বই ‘sculpting in time’। সময়ের ভাস্কর্যকে। জন বার্জারের ‘ways of seeing’। সিদ্ধার্থ ঘোষের ‘ছবি তোলা- বাঙালির ফটোগ্রাফি চর্চা’। ছাত্রাবস্থায়, এবং তারপরেও যখন পড়াই, এখনও যখন চর্চা করি এগুলো তো আমাদের কাছে চিরন্তন টেক্সট। আসলে এই ‘দেখার’ রকমফের নিয়ে পৃথিবীতে নিরন্তর চর্চা হয়ে চলেছে। এই যে বাস্তবের প্রতিরূপায়ণ এবং তার সজ্জা, তার সঙ্গে উঠে আসছে গল্প। ক্যামেরা শুধুই কি তখন একটা আধার? যন্ত্র বিশেষ? ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের হাত ধরে যার ভারতে আগমণ। কালীঘাটের অলিতে গলিতে যখন মাথায় ধামা নিয়ে সেই কোন আদ্দিকালে ফেরিওয়ালা হেঁকে যেত “চেহারা উঠাইবেন? চেহারা?” সেইখান থেকে শুরু করে এই সময়ের ফোনের ক্যামেরা। সময় পাল্টাতে থাকে, মানুষ, তার সংস্কৃতি তারসঙ্গে পালটে যেতে থাকে ইমেজ। একজন ফিল্ম স্টাডিজের ছাত্র হিসাবে খুবই ইন্টারেস্টিং একটা বিষয়। এবং সেই বিষয়ের বিনির্মাণও। যদিও ‘বাবার ইয়াশিকা ক্যামেরা’ বইটিতে কোনো তত্ত্বগত বিশ্লেষণ নেই। তার অবকাশও ছিল না। কারণ আমি ফিরে দেখতে চাইছিলাম সেই রাস্তাটাকে যে রাস্তায় একটা নিন্ম মধ্যবিত্ত পরিবার টিকে ছিল টুকরো টুকরো স্বপ্ন নিয়ে। সেটা নিছকই বেঁচে থাকার স্বপ্ন নয় বরং তার নিচে তিরতির করে বইছিল জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কঠোর কঠিন সংগ্রাম। যার বাড়িতে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। মুদির দোকানে টাকা বাকি থাকে। যে স্কুল মাস্টারের বাড়ির লোকেরা আধখানা ডিম পেলেই খুশি তার বাড়িতে জাপানের ইয়াশিকা ক্যামেরা একটা পাইন কাঠের ছোট্ট বাক্সতে আছে এটা বেশ বড় ব্যাপার ছিল। বাইরের মানুষের কাছে নয় তাদের নিজেদের কাছে। ঠিক সেই সময়ে বাড়িতে রবীন্দ্র রচনাবলী থাকার মতোই। কোথা থেকেও অল্প কিছু টাকা পয়সা জোগাড় করতে পারলেই বাবা রিল কিনতেন ছবি তোলা হবে বলে। সেই ক্যামেরা কখনও হ্যারিকেনের আলোয়, শীতের দুপুরে, গরমের ছুটির রান্নাঘরে, বাড়িতে আসা আত্মীয় স্বজনের ছবি ক্লিক ক্লিক করে তুলে বেড়াতে থাকলো। দাদা বললো, “জানিস তো ভাই ওটা আসলে ক্যামেরার ভাষা, বলছে ঠিক ঠিক”। কিন্তু কোনটা ঠিক বোঝা যেত না। পলেস্তারা খসা সেই পরিবারে এই আনন্দটা ধাক্কা মেরে এগিয়ে নিয়ে যেত। বিপুল তরঙ্গ তুলতো মনে। হা পিত্যেশ করে বসে থাকতে হতো কবে নেগেটিভ ডেভালপ হবে। কবে সেগুলো প্রিন্ট হয়ে আসবে ধর্মতলা থেকে আর কবে আমরা আবার সেই অন্ধকার ঘুটঘুটে রাতে লম্ফ বা হ্যারিকের আলোয় সবাই ঝুঁকে পড়ে দেখবো আমাদেরই প্রতিনির্মাণ। এই বিমূর্ততার গল্প কোথায় পাবো বলুন? আমার বাবা খুব যত্ন করে রেখে গিয়েছিলেন ছবিগুলো। তার নেগেটিভ। সাতাশ বছর বাবা নেই। কিন্তু এখনও ইয়াশিকা আছে। ছবিগুলো আছে। এইগুলো নিয়ে মাঝে মাঝে টুকরো টুকরো লিখতাম। সুপ্রকাশের কর্ণধার শ্রেয়ান বলেছিল, উৎসাহ দিয়েছিল একটা বই করার। আমার মনে হয় আমার এই ‘দেখা’ শুধু আমার দেখা নয়। এটা সমষ্টির। প্রজন্মের পর প্রজন্মের। না হলে এতো পার্সোনাল একটা জার্নি কি করে অনেকের জার্নি হয়ে যায়? বইটা প্রকাশের পরে অনেকে ফিরে দেখেছেন তাঁদের পরিবারের ইয়াশিকা ক্যামেরাকে। তাঁদের সেই ‘ঘুমিয়ে পড়া অ্যালবাম’কে। শঙ্খ ঘোষের এই বইটাও কি আমাদের এক অন্য পথের, অন্য দেশের, অন্য সময়ের ঠিকানার কথা বলে না? যে দেশ আমরা নিজের মনে লালন পালন করি। ভেসে বেড়াই তার উন্মুক্ত আকাশে।

নাহার তৃণা: 
এই কাহিনির ‘ক্যামেরা’ যেন বাবার অনুপস্থিত উপস্থিতি। আপনার লেখায় ‘অনুপস্থিতি’ কি সচেতনভাবে ফিরে ফিরে আসে?
কল্লোল লাহিড়ী: 
আমি আজ আছি বলে উনি নেই। দিনের আলো ফোটে বলেই রাতের অন্ধকার থাকে। জোয়ারের অপর দিকেই থাকে ভাঁটা। বন্যার উলটো পিঠে খরা। এগুলো যেমন চিরন্তন সত্য তেমনই অনুপস্থিতির উপস্থিতিটাও। সব সময়ে সচেতন ভাবে আসে না। আমার ক্ষেত্রে তো নয়ই। অতো মাপ জোক করে লিখতে পারি না কোনোদিন। যা লিখতে বসি লেখা হাত ধরে অন্যদিকে নিয়ে যায়। তখন নিজেকেই প্রশ্ন করতে হয় এটাই লিখতে চেয়েছিলাম তো? সেটা সৃষ্টির আরও এক অন্যরকমের আনন্দের মুহূর্ত। এই বইটাতে আমার নিজের খুব কাছের মানুষদের কথা আছে। একটা দেখা আছে। এই দেখার মাঝে কোথাও প্রচ্ছন্ন ও প্রকটে আমার বড় হয়ে ওঠা বালী গ্রামটা আছে। আর আছে ওই যে টুকরো টুকরো স্বপ্ন। যে স্বপ্ন আরও একটা লেখা নিয়ে ভাবতে সাহায্য করে। হ্যাঁ আপনার প্রশ্নের মতোই অনুপস্থিতির উপস্থিতিতে। এই প্রতিরূপায়ণ আমাদের এক ধরণের বিনির্মাণের দিকেও যায়। তখন আর সরল রৈখিক পথে গল্প বলা থাকে না। তারমধ্যে অনেক স্তর তৈরি হয়। বাবার অনুপস্থিতিটা তখন বাবার দেখায় পরিণত হয়ে যায়। বাবার দেখা, আমার দেখা, আমাদের দেখা, একটা অঞ্চলের দেখা এবং উলটো দিকে পাঠকের দেখাটাও বিভিন্ন স্তর পরিক্রময়ায় কাজ করে। আবার কখনও ঠিক তার বিপরীতে একটা ছবিও দেখতে শুরু করে লেখককে, পাঠককে। এই প্রক্রিয়াটা বেশ মজার। ভালোলাগার। অনেক কিছু দেখতে দেখতে আবিষ্কার করার মতো এক পথ।

নাহার তৃণা: 
আপনার প্রেমের উপন্যাসে প্রেম যেন শুধু দু’জন মানুষের সম্পর্ক নয়—বরং স্মৃতি, অভিবাসন আর হারিয়ে যাওয়া ঘরেরও গল্প। প্রেমকে এত ‘নীরব’ ও ‘অন্তর্মুখী’ভাবে উপস্থাপনার এই ভঙ্গিটি কি আপনার আয়ত্ত কৌশল বিশেষ, না কি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তা উপস্থিত হয়?

কল্লোল লাহিড়ী: 
আমার মনে হয় লেখার সঙ্গে আপনা আপনিই চলে আসে। তার কনটেন্ট এবং ফর্মের প্রয়োজন অনুযায়ী। প্রেম খুবই ব্যক্তিগত অনুভূতি। এবং জোরালো। সেটা অন্তর্মুখী তো বটেই। তার একটা ঘর পাওয়ার চাহিদা থাকে। ঘর হারানোর ভয়। তার স্মৃতি থাকে। অভিবাসনও। ভাবুন তো এই পৃথিবীতে কত মানুষ একে অপরকে বলেছে “আমি তোমাকে ভালোবাসি”। তার থেকেও অনেক মানুষ হয়তো বলেছেন, “তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারবো না”। কত মানুষ হয়তো তার ভালোলাগা এবং ভালোবাসার কথা বলতেই পারেনি যাকে একদিন বলবো বলে ভেবেছিল। কিম্বা যারা স্বপ্ন দেখেছিল একদিন একটা সংসারের। ভেবেছিল দুজনে থাকবে। আসলে “আমি তোমাকে যেমন ভাবে দেখি, তুমি আমাকে তেমন ভাবে দেখো না”। অথবা “তুমি আমাকে যেমন ভাবে দেখো ঠিক তেমনটি নই আমি”। কিছুক্ষণ আগে আমরা ‘দেখা’র বিষয়ে আলোচনা করছিলাম না। প্রেমে এই ‘দেখা’ জিনিসটাও কিন্তু খুব গুরুত্ত্বপূর্ণ একটা বিষয়। একটা দৃষ্টি- যা বিদ্ধ করছে সব সময় একে অপরকে। যা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আবার কখনও তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। এই দেখা আর না দেখার মিশায় এক অন্তর্গত দ্বন্দ্বে প্রেম জন্মায়। প্রেম ভাঙে। রক্তাক্ত হতে হয় মানুষকে। সবটাই প্রেমকে নিয়ে, প্রেমের তাগিদে। আমার কাছে প্রেম মানে অবশ্যই দুটো মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি। কিন্তু তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, স্মৃতি, সরণ, প্রতিসরণ আরও কত কি! প্রেম আসলেই মারাত্মক ক্ষেপণাস্ত্রের থেকেও ভয়ঙ্কর একটা জিনিস। প্রেমকে তাই রাষ্ট্রও ভয় পায়। প্রেমকে শত যুদ্ধেও জেতা যায় না। প্রেমের কিছু লিখতে হলে যেমন ভালোলাগে তেমনই ক্ষয় হয় নিজের অন্তরেই। একটা কষ্ট, একটা বিষাদ আনন্দ ঘিরে ধরে। তারসঙ্গে হয়তো নীরবতাও। “এসেছ প্রেম এসেছ আজ কি মহা সমারোহে…”। আমার প্রেমকে মুক্তি হিসেবে দেখতেও ভালো লাগে মাঝে মাঝে। ‘ঘুমিয়ে পড়ার আগে’ উপন্যাসে প্রেম মুক্তি দিয়েছিল। কিন্তু সেটা কিসের বিনিময়ে তা ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে বইকি।

নাহার তৃণা: 
‘নাইনটিন নাইনটি: আ লাভ স্টোরি’, উপন্যাসে প্রেম যেন শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়—বরং রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিষিদ্ধ আকাঙ্ক্ষা আর ঘরছাড়া হওয়ার ভয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক বিপজ্জনক যাত্রা। উপন্যাসে প্রেমকে এমন ঝুঁকির মুখে দাঁড় করানোর পেছনে কোন ধরণের ভাবনা কাজ করেছিল?

কল্লোল লাহিড়ী: 
যে সময়টাকে ধরে তিরতির করে কাহিনি এগোচ্ছিল সেই সময়টা ছিল উত্তাল। আপাতভাবে দেখলে মনে হবে খুবই নিস্তরঙ্গ। কিন্তু যে ছেলে মেয়েগুলো কেন্দ্রে ভর করে ছিল তাদের বয়সটাও সেই উত্তাল সময়েরই প্রতিভূ। শরীরের বাইরে এবং ভেতরে অনেক কিছু ভাঙছে গড়ছে। কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের মতো চূর্ণ বিচূর্ণ হচ্ছে মনে মনে। বার্লিনের পাঁচিলের মতো ভেঙে পড়ছে চারপাশের আদর্শ। নিজের দেহটাকে নিজের কেমন অচেনা লাগছে। শারিরীক চাহিদাগুলোও। তার মাঝে শিকারের ছদ্মবেশে হানা দিচ্ছে মাধ্যমিক পরীক্ষা। আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে সুন্দর লাগছে না। ব্রণগুলো যেন ফুটে বেরিয়ে আসতে চাইছে চামড়ার ভেতর থেকে। একটা মজতে থাকা নদী, একটা কবেকার পুরনো সিনেমা হল, স্কুলের লাস্ট বেঞ্চ, পার্টি অফিসের লেনিনের ছবি আর সেই যে কেয়োকার্পিন তেলের মিষ্টি গন্ধ ভাসিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে তাদের। একটা শরীর আর একটা শরীরের মধ্যে লুকিয়ে পড়ার হাতছানি দিচ্ছে। তারমধ্যে ফাস্ট পার্সন ন্যারেশানে এগিয়ে চলছে গল্প। এখানে সমপ্রেম যেন এই সময়টারই ঝড়ের আভাস। সমাজ যাকে নিষিদ্ধ করেছে তার দিকে চলার হাতছানি। কোন রকম কাউকে কিছু না বলে, অভিযোগের আঙুল না তুলে কয়েকটি ছেলে মেয়ের হারিয়ে যাওয়ার গল্প। একটা সময়েরও নয় কি? যে সময়কে কিংশুক ফিরে দেখছে অনেক দিন পরে রাজ্যটার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পালা বদলের সময়ে?

এই আখ্যান ঝুঁকিপূর্ণ তো বটেই। এক্ষেত্রে দোলাচলতা শুধু প্রেমের নয়। লেখকেরও। কারণ ততদিনে পাঠকের মনে ইন্দুবালা বেশ ভালো রকমের জায়গা করে নিয়েছে। আমি যখন এই ভাবনার কথা বলি আমার প্রকাশক শ্রেয়ানকে, কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলেছিল, “ লেখো। তবে মনে রেখো ইন্দুবালার পর তোমার এই উপন্যাস। সবাই আশা নিয়ে থাকবে তুমি আর একটা ইন্দুবালা লিখবে”। ঝুঁকি নিয়েছিলাম। জয়াদি (জয়া মিত্র) প্রচণ্ড সাহস দিয়েছিল। ভেতরে ভেতরে রক্তাক্ত হচ্ছিলাম। ঝিরঝিরে বরফ বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে থাকা লেনিন দাঁড়িয়ে ছিলেন কিছুটা দূরেই। মন্টুর ডেড বডি ভাসছিল পাঁচতারা হোটেলের সুইমিং পুলের নীল জলে। আর আকাশে ভিড় করেছিল ভুতুম পেঁচার দল। যারা বাতাসের হালকা স্তর কেটে উড়ে যাচ্ছিল ঘিঞ্জি শহরের একটু দূরে খাবারের আশায়। সাক্ষী থাকছিল সব কিছুর। প্রথমে পুজো সংখ্যা, তারপরে বই হিসেবে প্রকাশিত হবার পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া জুটেছিল। মারাত্মক সমালোচনাও। তারমধ্যেও বেশ কিছু মানুষের ভালো লেগেছিল। তাঁরা লিখেও ছিলেন। তারপর বেশ নীরবতা। সম্প্রতি বইটা নিয়ে দেখছি তরুণ প্রজন্মের কয়েকজন পড়ে আবার লেখালিখি শুরু করেছেন। অনেকে ভিডিও ব্লগে বলেছেন। বইটার প্রিন্টিং কপি শেষ হয়ে গিয়েছিল। এই বই মেলাতে আবার নতুন করে মুদ্রণ হয়েছে। ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে কারো কারো সঙ্গে হয়তো কানেক্ট করতে পারছি। কিন্তু ওই যে এক জিনিস লিখতে চাইনি। ধরাবাঁধা পথে হাঁটতে ভালো লাগে না যে। তাই ঝুঁকি তো থাকবেই। ভালোবাসায়। স্বপ্ন দেখায়। বেঁচে থাকার প্রতিটা পদক্ষেপে। কিংবা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায়।

নাহার তৃণা: 
এই উপন্যাসে প্রেম যেন সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক প্রতিবাদ। প্রেমকে আপনি কি সচেতনভাবে রাজনৈতিক করে তুলেছিলেন?

কল্লোল লাহিড়ী: 
রাজনীতি বলতে আমরা সাধারণত কোনো দল বা দলীয় পতাকার তলায় থাকা মানুষদের কথাই বেশিরভাগ সময়ে ভেবে থাকি। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক পার্টির কথা এখানে বলা নয়। লেখক যে সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছেন সেই সময়টা তো একটা বিরাট রাজনীতির অংশ। নানাভাবে, নানা দিক থেকে তার ব্যাখ্যা করা যায়। ওই যে অনেকে বলেন না আমি রাজনীতি করি না। এরচেয়ে বড় মিথ্যে কথা আর কিছু আছে বলে মনে হয় না। আসলে ওই আবার রাজনীতি বলতে এখনও আমরা বুঝি পার্টি, পলিটিক্স। দলীয় পতাকা। কিন্তু রাজনীতির আধার এতো ছোট তো নয়। নব্বই দশকের কথাই ভাবুন না গোটা পৃথিবীটা আমূল পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তিগত দিক থেকে শুরু করে মানুষের জীবন ধারণ সমাজ সংস্কার সব কিছুই। অনেক দিন ধরে চলে আসা ধ্যান ধারণা গুলোয় ফাটল দেখা দিচ্ছে। যেগুলো ধ্রুব সত্য বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল সেগুলো টুপ টুপ করে খসে পড়ছে। বহুজাগতিক সংস্থাগুলো হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ছে দেশে। পালটে যাচ্ছে পাড়া, শহর, একটা দেশ। আস্ত পৃথিবীটাই। তারমধ্যে কতকগুলো ছেলে মেয়ে যাদের বয়স মাত্র ষোলোর কোঠায় তারা বুঝে নিতে চাইছে একে অপরকে। বুঝতে চাইছে ভালোবাসাকে। সম্পর্কগুলোকে। কাজেই তাদের বেঁচে থাকার মধ্যে সম সময় উঁকি দেবে। এই বিশ্ব রাজনীতির জোয়ার তাদের গায়ে লাগতে বাধ্য। সেটারই আঁচ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে গোটা উপন্যাস জুড়ে। প্রেম তখন আর দুই মানুষের ভালোবাসার মধ্যে আটকে থাকছে না। তার অভিমুখ গুলোও পরিবর্তিত হচ্ছে। তাদের সামনে যা কিছু আসছে তারা সেটা মানতে পারছে না। কাজেই প্রতিবাদ আসছে। কখনও সোচ্চারে। আবার কখনও বা হুলোর মতো চরিত্রের মাধ্যমে নিরুচ্চারে। যে প্রকৃতির সঙ্গে কথা বলে। শকুনের ভাষা বুঝতে পারে। যে সব কটা প্রশ্নের উত্তর জানা থাকা সত্ত্বেও শুধু পাস করার মতো নম্বরের উত্তর দেয়। এই শান্ত ছেলেটা একদিন কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে চলে যায়। তাকে আর কোনোদিন খুঁজে পাওয়া যায় না। এটা অবশ্যই তার সিস্টেমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। যে মেয়েটা পচা একটা ছেলেকে ভালোবাসে বলে তার বাবা ক্ষমতার বলে ছেলেটাকে লক-আপে পোরে সেই মেয়েটিই সবার সামনে বাবার বিরুদ্ধে গিয়ে ছেলেটার হাত ধরে। ভালোবাসা জিতে যায়। এই বিপ্রতীপ ঘটনাগুলোই আমাদের এমন একটা সময়ের সামনে দাঁড় করায় যাকে অস্বীকার করতে পারি না। আর এই ছোট্ট ছোট্ট প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ গুলোই জমাট বাঁধে। পরিপূর্ণতা পায় উপন্যাসের শেষে। এই উপন্যাসে প্রত্যেকটা চরিত্র তাদের নিজের জায়গা থেকে বেশ কিছু প্রশ্ন তোলে। আর কে না জানে প্রশ্নকে ভয় পায় সবাই। লেখক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রও।

নাহার তৃণা: 
নয়ের দশকের ভাঙন—বার্লিন ওয়াল, সোভিয়েত পতন, এইসব বৈশ্বিক ঘটনাকে দু’জন মানুষের প্রেমের গল্পে জুড়ে দেবার পেছনে কোনো দর্শন কাজ করেছিল কি?

কল্লোল লাহিড়ী: 
আমার মনে হয় আগের দুটো প্রশ্নের উত্তরে আমরা এই বিষয়টা নিয়ে বেশ খানিকটা আলোচনা করে ফেলেছি। তবুও বলি যে পরিসরের মধ্যে দুটো মানুষ তাদের দুজনের দিকে এগিয়ে চলেছে সেই পরিসর এখানে খুবই রাজনৈতিক। আবারও বলি দলীয় ঝাণ্ডা ধারী রাজনীতি নয়। মিছিলে গিয়ে স্লোগান দেওয়া নয়। এরচেয়েও একটা বড় প্রেক্ষিত আছে। যার শিকার সম সময় এবং পৃথিবী। উপন্যাসে দুটো সময় এখানে পাশাপাশি চলে। কখনও মিশে যায়। কোনো কোনো চরিত্র প্রচণ্ড জান্তব হয়ে আর একটা শরীরকে চিনতে চায়। এমন ভাবে যেখানে অপর পক্ষের ক্ষয় অনিবার্য। আসলে এই ক্ষমতাশীল ও ক্ষমতাহীনতা একে অপরকে টক্কর দেয়। লোভ বাসা বাঁধে অগোচরে। আর যারা মানিয়ে নিতে পারে না তারা হারিয়ে যায়। ওই সিনেমা হলটার মতোই। হুলোর মতোই। মন্টুর মতোই। একটা সময়ের হারিয়ে যাওয়ার প্রতিভূ হয়ে ওঠে বিস্মৃতি।

নাহার তৃণা: 
‘ঘুমিয়ে পড়ার আগে’ নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সুপরিচিত কবিতাসংকলন থেকে আপনার উপন্যাসের নামকরণ। এমন নামকরণের পেছনের গল্পটা যদি সংক্ষেপে বলেন?

কল্লোল লাহিড়ী: 
এটা যে খুব সচেতন ভাবে করেছি তেমনটা নয়। বরং উপন্যাসের নায়কের নিয়তির সঙ্গে এর সাযুজ্যের কথা ভেবেই নামকরণ। প্রকাশক মিত্র ঘোষের কর্ণধার নূরদা তাঁদের সাহিত্য পত্রিকা ‘কথা সাহিত্যে’র পুজো সংখ্যায় লেখার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া অরাজকতায় দম বন্ধ হয়ে আসছিল। আমাকে তার থেকে মূক্তির পথ দেখিয়েছিল তূর্য। ঘুমিয়ে পড়ার আগে সে আমাকে বলে গিয়েছিল তার গল্পটা। খুব কম সময়ের মধ্যে লিখে ফেলেছিলাম।

নাহার তৃণা: 
এতে রূপকথার নরম আলো আর রাষ্ট্রের ভয়াবহ অন্ধকার—এই দুই বিপরীত সুরকে আপনি একই প্রেমকাহিনির ভেতর পাশাপাশি দাঁড় করিয়েছেন। এই উপন্যাসে প্রেমকে এত রাজনৈতিক ও বিপজ্জনক করে তোলার প্রয়োজন কেন অনুভব করেছিলেন?

কল্লোল লাহিড়ী: 
অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল একটা রোম্যান্টিক অ্যাকশান থ্রিলার লেখার। একটা ছেলে চোখ বন্ধ করে সামনের লোকটাকে অনায়াসেই ঘায়েল করতে পারে। এই শিক্ষা সে কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে আয়ত্ত করেনি। বরং তার ছোট্টবেলায় ক্যারাটে শিখতে যাওয়া বন্ধু টুবলু তাকে শিখিয়েছিল। তূর্য মারকুটে নয়। গুন্ডা নয়। সে একজন গিগ কর্মী। পৃথিবীতে তার একমাত্র আত্মার আত্মীয় সবজি বিক্রি করা ঠাকুমা আর ফাদার হেমব্রম। কিন্তু একটা রাত্রের ঘটনা তার জীবনে সব কিছু পালটে দেয়। নাকি তার অনেক আগেই পালটে দিয়েছিল সেই মেয়েটি যে একটা বাড়িতে লুকিয়ে পড়তে ভালোবাসতো। যার সঙ্গে হঠাৎই দেখা হয়ে গিয়েছিল তূর্যর। গল্পটায় থ্রিলারের এক আবহ গড়ে ওঠে। কিন্তু থ্রিলার বলতে যেভাবে আমরা সুতোর পর সুতো খুলে জট ছাড়াই এটা তেমন নয়। শাসক আর শোষিতের একটা লুকোচুরি খেলা বোনা আছে গোটা উপন্যাস জুড়ে। আর একটা স্তরে আছে তূর্যের ঠাম্মার মুখে শোনা রূপকথার গল্প। এক ধরণের ফ্যান্টাসি। উপন্যাসটা লেখাটার সময় যেমন অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ঠিক তেমনই দুজন প্রিয় চলচ্চিত্র পরিচালকের কাজে। একজন তাকাশি মিকে অন্য জন কিম জে উন। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ঘুমিয়ে পড়ার আগে থেকেও আমার বেশি মনে ছিল গৌরকিশোর ঘোষের ‘তলিয়ে যাবার আগে’র কথা। আসলে ক্ষমতাধারী যাঁরা তাঁরা মনে করেন এই পৃথিবীটা তাঁদের। তাঁরা যা আদেশ করবেন তাই হবে। তেমনটাই হয়। সেটাই প্রচলিত। তবুও মাঝে মাঝে তূর্যের মতো কেউ কেউ থাকে। যারা এখনও সপাটে দাঁড়াতে পারে ক্ষমতার বিরুদ্ধে। অন্যায়ের প্রতিবাদে। একটা সিনেমার মতো স্বপ্ন দেখায় অনাগত ভবিষ্যত। এটা লিখেছিলাম অনেকটা সিনেমার মতো করেই। আমার এই ফর্মটা খুব ভালো লাগে। আমি যেন এটার মধ্যেই বাঁচি। বাঁচতে ভালো লাগে।

নাহার তৃণা: 
‘ইন্দুবালা ভাতের হোটেল’ ওয়েব সিরিজে আপনার উপন্যাসের নীরবতা, স্মৃতি আর অভিবাসনের ব্যথাকে দৃশ্যভাষায় রূপ দিতে হয়েছে। সাহিত্য থেকে পর্দায় যাওয়ার এই রূপান্তরে কোন জায়গাটাকে সবচেয়ে কঠিন মনে হয়েছিলতা—চরিত্র, সময়, নাকি ইন্দুবালার অন্তর্গত নীরবতা?

কল্লোল লাহিড়ী: 
এটা আমাদের কাছে এক দীর্ঘ পথের যাত্রা ছিল। আমার, দেবালয়, এবং গোটা টিমের কাছে। যখন থেকে ইন্দুবালা লেখা শুরু করেছি মানে উপন্যাস, তখন থেকেই দেবালয় আমাকে বলে রেখেছিল ও বইটা নিয়ে কাজ করতে চায়। আমি যেন কাউকে না দিই।


আমার নিজস্ব ব্লগ ‘লিখতে বসে’ তে লিখতে শুরু করেছিলাম অন্য অনেক লেখার মতোই। অনেকে সেই লেখা নিয়ে নিজেদের পোর্টালে রাখেন। গল্পপাঠও রেখেছিল। একজন নবীন প্রকাশক সুপ্রকাশের শ্রেয়ান প্রথম এসে ইন্দুবালা ভাতের হোটেল ছাপানোর আগ্রহ দেখায়। তখনও আমার লেখা শেষ হয়নি। আমরা তখনও জানতাম না বইটি এতোটা পাঠক প্রিয় হবে। কোভিডের প্রথম ফেজে যখন গোটা পৃথিবী ঘর বন্দি ঠিক সেই সময়ে ইন্দুবালা প্রথম পা রাখেন কলেজস্ট্রিট পাড়ায়। আর তারপরেরটা ইতিহাস হয়েই থাকবে হয়তো আমাদের অনেকের কাছে। তারও বেশ কয়েক বছর পর যখন সিরিজ হওয়ার কথা চূড়ান্ত হয় তখন আমাকে বলা হয়েছিল চিত্রনাট্য লেখার। কিন্তু আমি লিখিনি। যে মানুষটা আমার মধ্যে খুব গাঢ় ভাবে মিশে আছেন তাঁকে লেখা কঠিন ছিল। কোনো এক দুর্বলতা আমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। লেখার টিমে থাকলেও লিখলাম না। বরং সেটার দায়িত্ব নিলো আমারই ছাত্রী এবং দেবালয়ের সহযোগী পরিচালক তৃষা নন্দী এবং দেবালয় নিজে। গোটা টিমটায় আমি ছিলাম এক নীরব পর্যবেক্ষক। যে আছে। কিন্তু থেকেও নেই।

আমি সিরিজের কোথাও কোনো বিষয়ে বাধা দিইনি। দিতে চাইনি। আমি দেবালয়ের চোখ দিয়ে দেখতে চাইছিলাম ছবির ইন্দুবালাকে। সেই কাজে দেবালয় খুব সফল এবং প্রচণ্ড দায়িত্ব আর আন্তরিকতার সঙ্গে এবং কি প্রচণ্ড চাপের মধ্যে থেকে তাকে কাজটা করতে হয়েছে। কিসব অসাধারণ গান লিখেছে। যা ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিটি বাংলা ভাষাভাষি মানুষের মুখে মুখে। তরুণ প্রজন্মে। যদি সত্যি সিরিজ নিয়ে কথা বলতে হয় তাহলে সেটা দেবালয়ের বলা উচিত। আমার নয়। আমি খুব খুশি দেবালয়ের ইন্দুবালা দেখে। আমি তাদের প্রত্যেকের কাছে কৃতজ্ঞ।

নাহার তৃণা: 
নির্মিত সিরিজটিতে ইন্দুবালার রান্না, গন্ধ, স্মৃতি, এসব দৃশ্যমান করতে পরিচালক ও টিমের সঙ্গে আপনার সহযোগিতা কতটা বদলে দিয়েছিল গল্পের টোন?

কল্লোল লাহিড়ী: 
খুব বেশি গল্প পাল্টায়নি। শুধু শুটিং এর কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রের পরিগ্রহণে কিছু কিছু নিয়ম থাকে। সেগুলো ছাড়া আমাদের সবার মধ্যে মহীরুহের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন ইন্দুবালা। জড়িয়ে ছিলেন তিনি আমাদের সবার সঙ্গে। শুটিং এর সময়ে প্রত্যেকের কাছে ইন্দুবালার বইটি ছিল। যখন যা মনে হচ্ছে সবাই আমাকে এসে জিজ্ঞস করছিল। সেটা খাবার থেকে শুরু করে পোশাক পরিচ্ছদ। অনেক গুণী মানুষ জড়িয়ে ছিলেন এই প্রজেক্টের সঙ্গে। পোশাক পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে সেট। কিন্তু তার পরেও তাঁরা এসে এসে জানতে চেয়েছেন। আমি প্রতিদিন শুটিং এ থাকতাম। দেবালয়ের সঙ্গে বহুদিন কাজ করছি। কাজেই টিমটাও তো আমাদেরই। ওটা আমার নিজের বাড়ির মতো। এখন যখন দেবালয় ছবি করে, সিরিজ করে তখনও এক দু দিন না গেলে আমারও মন খারাপ হয়। অন্যদেরও। দেবালয় এবং তার টিম একটা অসাধ্য সাধন করেছে। আমি প্রত্যেকের কাছে কৃতজ্ঞ।

নাহার তৃণা: 
ওয়েব সিরিজের দর্শকপ্রিয়তা কি আপনাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে—কোন গল্প পর্দায় কীভাবে কাজ করে?

কল্লোল লাহিড়ী: 
বহুদিন ধরে দৃশ্যমাধ্যমে কাজ করছি। দর্শক প্রিয়তা নিয়ে তেমন ভাবে ভাবিনি। আগে নিজেদের কাছে ভালো লাগছে কিনা সেটা অনেক বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। সেখান থেকে মনের জোর আসে। আর তারসঙ্গে আরও অনেকের ভালো লাগলে সেটা ছড়িয়ে পড়ে বৃষ্টির মতো। খুশির আনন্দে। ভালোলাগার আন্তরিকতায়। দর্শকের শুভেচ্ছায়।


নাহার তৃণা: 
আপনার সার্বিক লেখালিখিতে রাজনীতি কখনোই আলাদা কোনো প্রেক্ষাপট নয়; বরং চরিত্র/জীবনের ভেতরেই মিশে থাকে। ‘গোরা নকশাল’ থেকে ‘ঘুমিয়ে পড়ার আগে’, আপনার লেখায় রাজনীতি কীভাবে এত স্বাভাবিকভাবে প্রবেশ করে? এটি কি আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রতিফলন, নাকি সময়ের অনিবার্যতা?

কল্লোল লাহিড়ী: 
আমার মনে হয় ব্যক্তিগত তো বটেই। তবে তার থেকেও কোন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। কী দেখছি চারপাশে। এই নিয়ে আগেই আমরা অনেক বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

নাহার তৃণা: 
আপনার গল্পে রাজনীতি কখনোই স্লোগান নয়; বরং মানুষের ভয়, ঘরছাড়া হওয়া, নিষিদ্ধ প্রেম, রাষ্ট্রের চোখরাঙানি—এইসবের ভেতর দিয়ে আসে। আপনি কি সচেতনভাবে ‘রাজনৈতিক বাস্তবতা’কে চরিত্রের ব্যক্তিগত জীবনের অংশ করে তোলেন?

কল্লোল লাহিড়ী: 
একজন ব্যক্তি তিনি তো এই পরিসরের বাইরে নন। চরিত্ররাও নয়। তার শেকড় থাকে আরও গভীরে। সমাজ, সংস্কৃতির অন্দরে।

নাহার তৃণা: 
নয়ের দশকের ভাঙন, শহরের অস্থিরতা, রাষ্ট্রের নজরদারি—এইসব বিষয় আপনার লেখায় বারবার ফিরে আসে। আপনি কি মনে করেন একজন লেখকের রাজনৈতিক সময়বোধ থাকা জরুরি?

কল্লোল লাহিড়ী: 
অবশ্যই। রাজনৈতিক বোধ না থাকলে কী করে চলবে?

নাহার তৃণা: 
আপনার লেখালিখিতে দৃশ্যভাষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ—উপন্যাস হোক বা ওয়েব সিরিজ। স্ক্রিপ্টরাইটিং-এ কোন জায়গাটা আপনাকে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জে ফেলে—দৃশ্য নির্মাণ, নাকি সংলাপের সংযম?

কল্লোল লাহিড়ী: 
আমার কাছে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জ হলো আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি কিনা। জায়গাটাকে। চরিত্রগুলোকে। যদি দেখতে পাই তাহলেই লিখতে পারবো। সেটা উপন্যাস হোক কি চিত্রনাট্য। একজন চিত্রানাট্যকার ছবিটির প্রথম দর্শক হন। তিনি না দেখলে পরিচালককে কীভাবে দেখাবেন? তারপরে গোটা টিম। এরপরে অসংখ্য দর্শক। এটা না একটা বড় আলোচনার পরিসর ছোট্ট করে বলতে গেলে এইটুকুই।


নাহার তৃণা: 
সাহিত্যের ভাষা এবং স্ক্রিপ্টের ভাষা, দুটোই আপনার হাতে শক্তিশালী। কোন মুহূর্তে আপনি সিদ্ধান্ত নেন যে একটি দৃশ্য ‘লেখা’ নয়, বরং ‘দেখানো’ উচিত?

কল্লোল লাহিড়ী: 
চিত্রনাট্য মানে ছবির ভাষা। তার এক নিজস্ব চলন থাকে। তারমধ্যে সাহিত্য ফ্লেভার নিয়ে আসতে পারে। কাজেই ‘লেখাটা’ এখানে লিখে রাখতে হবে তাই। ‘দেখানোটা’ সবচেয়ে জরুরি। লেখা সেই দেখানোটার কাজ করে। সাহিত্যের নয়। চিত্রনাট্য তাই পড়তে অনেকের ভালো লাগে না। আবার কেউ কেউ ভালোবাসেন।


নাহার তৃণা: 
চিত্রনাট্যে চরিত্রকে খুব কম শব্দে দাঁড় করাতে হয়। এই সংযম কি আপনার সাহিত্যকেও প্রভাবিত করেছে?

কল্লোল লাহিড়ী: 
সিনেমা আমার প্রথম ভালোবাসা। আমি ছোট থেকে যে পরিমাণ বই পড়েছি তার থেকেও বেশি ছবি দেখেছি। ছবি আমার লেখাকে নিয়ন্ত্রণ করে। চলচ্চিত্রের ভাষার প্রতি আমার এক ধরণের দুর্বলতা আছে। আমি সেটা কাটাতে পারি না। চাইও না।

নাহার তৃণা: 
আপনি বহু বছর ধরে স্ক্রিপ্ট লিখছেন। এখনকার ওয়েব সিরিজের দর্শক কি লেখককে নতুন ধরণের গতি ও কাঠামো ভাবতে বাধ্য করছে?

কল্লোল লাহিড়ী: 
দৃশ্য মাধ্যেমের ভাষা প্রতি নিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। বিশেষ করে গত দশ বছরে আমূল পরিবর্তন হয়েছে। কাজেই যাঁরা দৃশ্যের ভাষা নিয়ে কাজ করেন তাঁদেরও ক্রমান্বয়ে পাল্টাতে হচ্ছে। আমরা হচ্ছি সেই জেনারেশন যারা পাড়াতে একটা টিভি দেখেছি। তারপর সেখান থেকে অনেক টিভি। একটা সিনেমা হল। একটা বাড়িতে ফোন। আর এখন ভাবুন সবার হাতে হাতে ক্যামেরা। ফোন। প্রত্যেকে এক একজন ক্রিয়েটার। সবাই কিছু না কিছু গল্প সেটা রিলের মাধ্যেমেই হোক বা টুকরো দৃশ্যে বলে যাচ্ছেন। এদের থেকে আপনি আলাদা কি দিতে পারছেন যা লোকে সিরিজে দেখবে, টিভিতে দেখবে, বা সিনেমা হলে গিয়ে দেখবে। এখনকার স্ক্রিন রাইটারদের কাছে এটা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে হয় আমার কাছে। নিজের কাছেও। এখন তো আবার এক মিনিটের সিরিজও চলে এসেছে। কাজেই বুঝতেই পারছেন কি দ্রুততায় পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে আমাদের দৃশ্যগত ভাবে গল্প বলার আঙ্গিক, তার কনটেন্ট সর্বোপরি ভাষা।


নাহার তৃণা: 
চিত্রনাট্যে সময়, গতি, দৃশ্য সবকিছুই খুব নির্দিষ্ট। এই নির্দিষ্টতার মধ্যে থেকেও আপনি কীভাবে নিজের সাহিত্যিক স্বরকে ধরে রাখেন?

কল্লোল লাহিড়ী: 
চিত্রনাট্যে আমি সাহিত্যিক স্বরকে খুব একটা ধরে রাখতে চাই না। তবে আমার চিত্রনাট্য যারা পড়েছেন বা কাজ করেন তাঁরা বলেছেন আমার লেখা সাহিত্য ঘেষা। সেটা একজন চিত্রনাট্যকারের কাছে সব সময় পজেটিভ দিক নাও হতে পারে। তার কারণ অনেক হতে পারে। এই স্বল্প পরিসরে আলোচনা করা মুশকিল।

নাহার তৃণা: 
চিত্রনাট্য লেখার সময় আপনি কি প্রথমে দৃশ্য ভাবেন, নাকি চরিত্রের আবেগ?

কল্লোল লাহিড়ী: 
কী বিষয় নিয়ে কাজ করছি সেটার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে।

নাহার তৃণা: 
আপনার গল্পে নীরবতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। স্ক্রিপ্টে ‘নীরবতা’ কীভাবে লেখা যায়?

কল্লোল লাহিড়ী: 
ছবির ভাষার সঙ্গে ওটা এসে যায়। শুধু নীরবতা লিখলে নীরব হওয়া যায় না। চরিত্রর ওপরেও নির্ভর করে। সিচুয়েশান। অনেক কিছু। ওই যে বললাম ছবির ভাষাটাই যে একদম আলাদা।

নাহার তৃণা: 
আপনার লেখালিখিতে স্মৃতিময়তা, রাজনৈতিক সময়, শহরের অস্থিরতা সবকিছুই একসঙ্গে মিশে থাকে। আপনার পাঠাভ্যাসে কোন লেখক বা কোন ধরণের লেখা এই বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে অধিক প্রভাবিত করেছে?

কল্লোল লাহিড়ী: 

বাংলা সাহিত্য মণিমানিক্য ছড়ানো। এক দীর্ঘ পথের ইতিহাস। কাকে ছেড়ে কাকে বলবো? খুব বেশি করে যাঁদের লেখার মধ্যে দিয়ে এখন যাচ্ছি তাঁদের মধ্যে আছেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, গৌরকিশোর ঘোষ, সৈয়দ মুজতবা আলী, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধায়, অবধূত, জয়া মিত্র, এছাড়াও ফিল্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাঁদের আত্মজীবনী। সেটাও একটা বিস্ময়কর পাঠ তো বটেই।


নাহার তৃণা: 
আপনি এমন কোনো বইয়ের কথা বলবেন কি, যা আপনার লেখার ভাষা বা দৃশ্যভাষাকে বদলে দিয়েছে?

কল্লোল লাহিড়ী: 
এইরকম ভাবে বলাটা খুব মুশকিল। কারণ নানান দিকের চর্চা এক জায়গায় এসে মিলিত হয়।

নাহার তৃণা: 
চিত্রনাট্য, উপন্যাস, গল্প তিনটি মাধ্যমেই আপনি কাজ করেন। পাঠের ক্ষেত্রে কি আপনি মাধ্যম অনুযায়ী আলাদা আলাদা লেখকের লেখা পড়তে অভ্যস্ত?

কল্লোল লাহিড়ী: 
সেরকম কোনো বাছাই করার পক্ষপাতি আমি নই। লেখাটা পড়তে আমার ভালো লাগছে কিনা এবং তার থেকে কী পাচ্ছি সেটা অনেক বড় হয়ে ওঠে।

নাহার তৃণা: 
কোন চলচ্চিত্রকারের কাজ আপনাকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করে? তাঁর কোন দিকটি আপনাকে বারবার তাঁর কাজের কাছে ফিরে যেতে বাধ্য করে?

কল্লোল লাহিড়ী: 
একজন নয় একাধিক পরিচালকের কাজ ভালো লাগে। আর তাঁদের কাছে ফিরে যাওয়ার কারণ গুলোও ভিন্ন ভিন্ন।

নাহার তৃণা: 
সম্প্রতি পরিমল ভট্টাচার্য তাঁর ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’ উপন্যাসের জন্য আনন্দ পুরস্কার পেয়েছেন। উপন্যাসটি কি আপনি পড়েছেন? উপন্যাসটিকে আপনি কোন ধারায় ফেলবেন?

কল্লোল লাহিড়ী: 
সংগ্রহে আছে। তবে এখনও পড়া হয়নি। পরিমলদা আমার ভালোলাগা লেখকদের মধ্যে অন্যতম।

নাহার তৃণা: 
আপনি সমসাময়িকদের লেখা পড়েন? তাঁদের লেখার কোন দিকগুলো আপনাকে তাড়িত করে?

কল্লোল লাহিড়ী: 
খুব কম পড়া হয়। এমনিতেই আমি পড়াশুনোয় বেজায় কাঁচা। তবে যেটুকু পড়েছি তার দিক থেকে বলতে গেলে বলতে হয় যে নানা রকমের বিষয় নিয়ে কাজ হচ্ছে। এটা এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে খুবই আশার কথা। অনেক তরুণ লেখক অত্যন্ত ভালো কাজ করছেন। অনেক নবীন প্রকাশক নতুন করে ভাবাচ্ছেন। আমরা এই নিয়ে একটু আগেও কথা বলেছি।

নাহার তৃণা: 
বাংলাদেশের সমকালীন সাহিত্য নিয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী? কোন লেখকদের লেখা আপনাকে আকর্ষণ করে বা ভাবায়?

কল্লোল লাহিড়ী: 
তরুণ প্রজন্মের অনেকে অবাক করেছেন। খুব ভালো কাজ হচ্ছে। তবে একজন দুজনের নাম করতে চাই না। আমার আরও পড়া দরকার। তারপর না হয় এটা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

নাহার তৃণা: 
আপনি কি মনে করেন, লেখালিখিতে একটি স্বতন্ত্র ভাষাশৈলী বা স্বর তৈরি করতে পেরেছেন? এই ভাষাশৈলী কি সচেতনভাবে নির্মিত, নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজে নিজেই গড়ে উঠেছে?

কল্লোল লাহিড়ী: 
এটা আমার পাঠকরা হয়তো ভালো বলতে পারবেন।

নাহার তৃণা: 
লেখার কোনো প্লট বা দৃশ্য মাথায় এলে আপনি কি সেটা সঙ্গে সঙ্গে টুকে রাখেন? এই কাজে নোটবই বা কোনো নির্দিষ্ট মাধ্যম ব্যবহার করার অভ্যাস আছে?

কল্লোল লাহিড়ী: 
একটা লেখার বীজ দু-তিন বছর ধরে সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকে। তারপর কোনো একটা সময়ে সেটা লেখার আকার নেয়। সেক্ষেত্রে কোনো রকম নোট বা ভয়েজ রেকর্ড করে এখনও পর্যন্ত রাখিনি। তবে বন্ধুদের বলি। আড্ডায় আলোচনা হয়। তারাও তাদের মনোভাবের কথা বলে। আবছা একটা পথ তৈরি হতে থাকে একটু একটু করে।

নাহার তৃণা: 
আপনার নোট নেওয়ার অভ্যাস কি সময়ের সঙ্গে বদলেছে, কাগজ থেকে ডিজিটাল, নাকি দুটোই সমানভাবে ব্যবহার করেন?

কল্লোল লাহিড়ী: 
আমি বরাবরই কম্পিউটারে বা ল্যাপটপে লিখতে স্বচ্ছন্দ।

নাহার তৃণা: 
রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে বইপড়া বা মাথার কাছে বই রেখে ঘুমানোর অভ্যাস আছে?

কল্লোল লাহিড়ী: 
যে বইটা পড়ছি সেটা সঙ্গে থাকে। সারাক্ষণ। কাঁধের বোঝা যতই ভারী হোক না কেন। কিছু না পড়লেও একটা দুটো বই সামনে আছে দেখলে ভালো লাগে। সঙ্গ করি বলতে পারেন।

নাহার তৃণা: 
এই মুহূর্তে কী পড়ছেন? সাম্প্রতিক কোন বই বা লেখক আপনাকে ভাবাচ্ছে?

কল্লোল লাহিড়ী: 
একদমই ইংরেজি ভাষার চর্চা আমার নেই। বাংলা একমাত্র ভাষা যেটা একটু আধটু আমি জানি। লিখতে পারি। কথা বলতে পারি। বিদেশি সাহিত্যের জন্য তাই আমাকে অনুবাদের ওপর নির্ভর করতে হয়। বাংলা ভাষায় অনুবাদ। এখন বেশ কিছুদিন অনুবাদ সাহিত্যে ডুবে আছি। অসাধরণ সব কাজ করছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস। তাঁরা আমার কাছে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছেন। আমি মুরাকামি পড়েছি প্রায় রাত জেগে। এর আগেও পড়েছি। কিন্তু সেইসব অনুবাদ ভালো লাগেনি। সমুদ্র তটে কাফকা। প্রায় দেড় মাস একটা মোহগ্রস্তের মতো ছিলাম। অর্সলা ল্য গুইন এর আর্থ সি সিরিজের প্রথম উপন্যাস ইরা সিন্ধুর জাদুকর পড়ে মুগ্ধ। এখন অনুবাদ সাহিত্যে ডুবে আছি বলতে পারেন।

নাহার তৃণা: 
লেখালিখি নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

কল্লোল লাহিড়ী: 
কোনো পরিকল্পনা করে কিছুই তো করিনি কোনোদিন। ভাবিনি কোনোদিন উপন্যাস লিখবো। আমার লেখা পড়ে ভালো লাগবে কারোর। আমিও কোনো দিন ইন্টারভিউ দেবো। প্রকাশকরা লিখতে বলবেন। 
আমি ঈশ্বরে বিশ্বাসী। তাই তাঁর কাছে প্রার্থনা এমন ভাবেই যেন শিরদাঁড়া সোজা রেখে হেঁটে যেতে পারি।

নাহার তৃণা: 
গল্পপাঠকে সময় দেবার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনার জন্য অনেক অনেক শুভকামনা রইল।

কল্লোল লাহিড়ী: 
আপনাদেরও আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা। ভালো থাকবেন সবাই। ·