বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের সুকদেব কদমেরতল গ্রামটা রাতের বেলা একেবারে অন্যরকম হয়ে যায়। নিঃসঙ্গতা আর নিস্তব্ধতার মধ্যে কিছু বাড়ি থেকে টিমটিম আলো জ্বলে, থেকে থেকে কুকুরের ঘেউ ঘেউ, কখনো কোনো বটগাছের ডালে ঘুমহীন পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ শোনা যায়। তবে আজ শুক্রবার রাতটা অন্যরকম। পুরো এলাকা জেগে আছে ওয়াজ মাহফিলের আলো আর মাইকের তীব্র শব্দের সঙ্গে সঙ্গে। তোতা মিয়ার পরিবারও ওয়াজ মাহফিলে এসেছে। তার স্ত্রী ও একমাত্র ছেলে সাথে। শুধু আইরিন খাতুন, চার বছরের ছোট্ট নাতনি থেকে গিয়েছিল বাড়িতে। যাকে নানাবাড়িতে রেখে তার বাবা-মা ঢাকায় চাকরি করে। সন্ধ্যার পরপরই ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস নাতনির। ঘুমন্ত নাতনিকে ঘরে রেখেই বেরোয় সকলে। তোতা মিয়া ভেবেছিল, বেশিক্ষণ থাকবে না। বড়জোড় ঘণ্টাখানেক।
মাহফিলে তখন বক্তা কোরআনের আয়াত ব্যাখ্যা করছেন। মানুষের ঢল নেমেছে। কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে, আবার কেউ ওয়াজ শুনতে শুনতে সামিয়ানার দিকে তাকিয়ে আছে। তোতা মিয়ার বাড়িটা মাহফিলের জায়গা থেকে একটু দূরে। তারও বহু দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসতে থাকে। পুরুষেরা পাঞ্জাবি-পায়জামা বা লুঙ্গি পরে আসছে, নারীরা বোরকা পরে। ছোট ছোট শিশুরাও দল বেঁধে আসছে, যদিও তাদের আনাগোনা ওয়াজের পাশের দোকানগুলোতে। আজকের বক্তা পটুয়াখালির বিখ্যাত আলেম। সবার কাছে পটুয়াখালির হুজুর নামেই পরিচিত। তাকে নিয়ে আলাদা আগ্রহ, তার বয়ান শোনার জন্যই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। এই মুহূর্তে জাহান্নামের ভয়াবহতা তুলে ধরছেন। মাহফিলের আশপাশে বেশ কিছু দোকান বসেছে। কেউ চা বিক্রি করছে, কেউ জিলাপি বা হালুয়া-রুটি। কিছু দোকানে ইসলামিক বই, তসবিহ, টুপি বিক্রি হচ্ছে। বাচ্চারা এসব দোকানে ঘোরাঘুরি করছে, তরুণরা আশপাশে আড্ডারত, আবার কেউ কেউ ওয়াজ শুনছে। কিছু মানুষ ওয়াজ শেষ পর্যন্ত শুনবে, কেউ আবার কিছুক্ষণ শোনার পর চলে যাচ্ছে। কিন্তু রাত যত গভীর হবে, আসল আলোচনায় ঢুকে পড়বেন বক্তা। কোরআন ও হাদিসে জাহান্নামের আগুনের ভয়াবহতা নিয়ে আলোচনা করছেন হুজুর। ‘মানুষের দুনিয়ার আগুনের সঙ্গে জাহান্নামের আগুনের কোনো তুলনাই হয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের এই আগুন, যা তোমরা জ্বালিয়ে থাকো, তা জাহান্নামের আগুনের সত্তর ভাগের এক ভাগ মাত্র! বুখারি ও মুসলিম শরীফে এসেছে।’ হুজুর সুললিত কণ্ঠে বয়ান করছেন। তারপর ব্যাখ্যা দেন, দুনিয়ার আগুন যতই প্রখর হোক না কেন, জাহান্নামের আগুন তার চেয়ে ৭০ গুণ বেশি আর ভয়ংকর। তিরমিজি শরীফে এসেছে,‘তোমরা কি জানো, জাহান্নামের আগুন কী? তা দুনিয়ার আগুনের চেয়ে ৭০ গুণ বেশি উত্তপ্ত।’এবার আগুনের রঙ ও ভয়ংকর রূপ নিয়ে হুজুর বলেন, ‘দুনিয়ার আগুন সাধারণত লাল বা কমলা রঙের হয়, কিন্তু জাহান্নামের আগুন হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। কালো, যা কখনো নিভবে না এবং যা থেকে কেউ রক্ষা পাবে না। এই আগুন এতটাই তীব্র যে তা মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে গলিয়ে ফেলতে পারে। এটি এমন আগুন, যা শরীরের চামড়া পোড়াবে এবং নতুন চামড়া সৃষ্টি করে আবার পোড়াবে, যাতে তারা ক্রমাগত শাস্তি ভোগ করে।’ একটু জিকির করে হুজুর আবার শুরু করেন, জাহান্নামের আগুন এত বিশাল হবে যে, তার শিখা বিশাল পর্বতের চেয়েও বড় হবে। আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনের সুরা আল-হুমাজায় বলেন, ‘নিশ্চয়ই জাহান্নামের আগুন বিশাল স্তম্ভের মতো উঠতে থাকবে, যা দীর্ঘ সময় ধরে চলবে।’ আয়াতটি আরবিতে তেলোয়াত করে শোনান সাথে সাথে। তারপর জানান, জাহান্নামের উত্তাপ এতটাই ভয়ংকর যে, তা ১০০০ বছর ধরে জ্বলতে জ্বলতে প্রথমে লাল হয়েছে, এরপর আরও ১০০০ বছর ধরে জ্বলতে জ্বলতে সাদা হয়েছে, তারপর আরও ১০০০ বছর ধরে জ্বলে পুরোপুরি কালো হয়ে গেছে। এখন এটি সম্পূর্ণ অন্ধকার ও ভয়ংকর হয়ে গেছে। জাহান্নামের আগুন কেবল চামড়া পোড়াবে না, বরং হাড় পর্যন্ত পুড়িয়ে দেবে। পবিত্র কোরআনে এসেছে, যখন তারা সেখানে নিক্ষিপ্ত হবে, তখন তাদের চেহারা আগুনে পুড়ে বিকৃত হয়ে যাবে, আর তারা সেখানে দুঃখ ও যন্ত্রণা সহ্য করবে। বাংলার সাথে সুরা আল-মুলক-এর ৬ ও ৭ নম্বর আয়াত তেলোয়াত করে শোনান হুজুর। তারপর বলেন, এমনকি এই আগুন শুধু বাইরে থেকে পোড়াবে না, বরং পেটের ভেতর থেকেও জ্বালিয়ে দেবে। আল্লাহ পাক বলেন, ‘তারা জাহান্নামের এমন আগুনে প্রবেশ করবে, যা অন্ত্র-নাড়িভুঁড়ি পর্যন্ত পুড়িয়ে দেবে।’ সুরা মুহাম্মাদ, আয়াত ১৫। এই পর্যায়ে হজুর একটু বিরাম নেন। তখনই গুঞ্জন ওঠে।
প্রথমে কেউ বুঝে উঠতে পারে নি। দূর থেকে আগুনের কুণ্ডলী দেখে অনেকে ঠাহর করার চেষ্টা করছিল। আগুনের লেলিহান শিখা আকাশের দিকে উঠে যেতে দেখে কেউ একজন চিৎকার করে বলে, ‘আগুন! আগুন!’ মুহূর্তেই ভিড়ের অভিমুখ আগুনমুখি হলো! গ্রামের লোকজন দৌড় দিল সেই দিকেই। আব্দুল হান্নান তোতা মিয়া ছুটে এলেন, তার পরিবারের অন্যান্যরাও। এসে দেখেন, পুরো বাড়ি আগুনের বিশাল এক দাবানল হয়ে উঠেছে—চারটা ঘর একযোগে আগুনময়। ধোঁয়ায় চারপাশ ভরে গেছে, চোখে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। চারদিকে শুধু চিৎকার আর চিৎকার। কেউ একজন বলে, ‘ভেতরে কেউ আছে?’ তোতা মিয়ার মনে তখন বজ্রাঘাত হলো। ঘরের ভেতরেই ছিল! তার নাতনি! আইরিন! তিনি পাগলের মতো দরজার দিকে ছুটলেন, কিন্তু গরমে ধাতব তালাটা লাল হয়ে গেছে, খোলা সম্ভব না। কয়েকজন লাঠি নিয়ে দরজা ভাঙার চেষ্টা করল, কেউ পানি আনতে দৌড় দিল। তৎক্ষণে দুনিয়ার আগুন পুরো বাড়িটাকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরেছে যে, ভেতরে ঢোকা অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
আগুন নিভে গেছে। পোড়া গন্ধ বাতাসে, ধোঁয়া এখনো মাটির কাছ থেকে সরেনি। গরম ছাইয়ের স্তূপের সামনে শূন্য দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন; যাদের বাড়িটা ছিল, যাদের ঘর, আসবাব, স্মৃতি, বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল এখানে ছিল। এখন সেখানে শুধু কালো ছাই, কাঠের ভস্ম, আর পুড়ে পুড়ে যাওয়া অনেক অবশেষ।
চারদিকে মানুষের ভিড়। আশপাশের গ্রাম থেকেও লোকজন এসেছে, কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে ধ্বংসস্তূপের দিকে। কেউ ধীরে ধীরে হেঁটে চারপাশ দেখছে, কেউ দাঁড়িয়ে ফিসফাস করছে, এই আগুন কীভাবে লাগল! কেউ কেউ কথা তুলল, একরাতে তাদের গ্রামেও এমন আগুন লেগেছিল, তারা কীভাবে সামলেছিল, কতটা ক্ষতি হয়েছিল।
তোতা মিয়ার বিবি বিলাপ করছে। সেই সুর পাশ কাটিয়ে কেউ একজন পোড়া ঘরের ধ্বংসাবশেষ হাতড়ে কিছু বের করার চেষ্টা করছে—একটা ছবি, একটা লোহার বাক্স...। কেউ চোখে পানি ফেলছে, আবার কেউ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কিছু বলার শক্তিও পাচ্ছে না। কিছু মানুষ মোবাইল বের করে ছবি তুলছে, ভিডিও করছে। কেউ ফেসবুকে লাইভ চালু করেছে। কেউ হয়তো এই ঘটনা নিয়ে বড়সড় গল্প বানিয়ে বলবে অন্যদের, গুজব ছড়িয়ে দেবে—সেই মোতাবেক প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিসের লোকজন শেষবারের মতো পরীক্ষা করছে ধ্বংসস্তুূপ। কয়েকজন ফিসফিস করে বলছে, হয়তো শর্ট সার্কিট, আবার কেউ বলছে, শত্রুতা!
মানুষ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে, কিন্তু ধ্বংসস্তূপের সামনে থেকে কয়েকজন সরে না। তাদের দৃষ্টি শূন্য, চারপাশের কোলাহল তাদের কানে পৌঁছায় না। কিছুক্ষণ আগ পর্যন্ত এখানে একটা বাড়ি ছিল, একটা সংসার ছিল। এখন পোড়াবাড়ি।
দুই.
এসবের আগে। হঠাৎ করেই ঘর থেকে একটা শব্দ এলো, একটা ছোট্ট বিস্ফোরণের মতো! বৈদ্যুতিক তারের কোথাও কিছু একটা গোলমাল হয়েছে। মুহূর্তেই চিড়িক চিড়িক শব্দে স্পার্কিং শুরু হলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আগুনের একটা ছোট্ট শিখা ধোঁয়া ছড়িয়ে দিল চারপাশে। বাতাসে পোড়া তারের গন্ধ ভেসে এলো। কেউ দেখল না কীভাবে সেই আগুন ধীরে ধীরে দাউ দাউ করে পুরো ঘরটাকে গ্রাস করল। কাঠ, টিনে গড়া ঘর যেন মুহূর্তেই শিখার গ্রাসে চলে গেল। এভাবে পরপর চার ঘর। মূল বসত ঘরের ভেতরে আইরিন ছিল। আগুনের শ্বাসরুদ্ধকর উত্তাপে তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছিল। ঘুমের ঘোরে ছোট্ট শরীরটা একবার কেঁপে উঠল, কিন্তু সে বুঝতে পারল না কী ঘটছে। ঘরের দরজা বন্ধ। বাইরে থেকে তালা দেওয়া। দগ্ধ হচ্ছে কাঠ। ধোঁয়ার সাদা-কালো কুণ্ডলী ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। ঘরের ভেতরে এক কোণে চৌকিতে ছোট্ট একটা শরীর কুঁকড়ে যাচ্ছে। আইরিন। মাত্র চার বছর বয়স তার। সে ঘুমিয়েই ছিল। নরম বিছানার এক পাশে গুটিসুটি মেরে, গভীর এক শিশুসুলভ স্বপ্নের মধ্যে হারিয়েই গিয়েছিল হয়ত। কিন্তু হঠাৎ কী যেন একটা টের পেল! প্রথমে ওর ছোট্ট নাকটা বিরক্ত হলো। ধোঁয়ার এক অদ্ভুত ঝাঁঝালো গন্ধ... চোখের পাতাগুলো ভারী হয়ে আসছে, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সে কাশতে শুরু করল। কঁক কঁক! কাশির দমকে সে উঠে বসল। তার ছোট্ট চোখ দুটো ঘরের চারপাশে ঘুরে বেড়াল। আলো কমে গেছে। একটা লালচে-কমলা আভা চারপাশে দুলছে। হঠাৎ! একটা চিড়িক চিড়িক শব্দ। বিদ্যুতের তার থেকে ছোট্ট একটা আগুনের ফুলকি; সেটাই মুহূর্তে লাফিয়ে উঠল, কাঠের আলমারিটায় ধরল। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড; আগুনের ছোট্ট শিখাটা দাউ দাউ করে ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে! আইরিন হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তার ছোট্ট মাথার মধ্যে কিছুই ঢুকছিল না। সে কি দৌড়াবে? কার কাছে যাবে? নানি? নানা? মামা? কিন্তু কেউ নেই! তারা যে ঘরে নেয়, এমনকি বাড়িতেও নেই তাও সে জানত না। ছোট্ট মনের আফসোস, সে শ্বাস নিতে পারছে না, অথচ কেউ কেন আসছে না। অন্যসময় একটু পড়ে গিয়ে ব্যথা পেলে নানা কোল থেকে নামাতে চায় না। সে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু ধোঁয়ার চাপে গলাটা শুকিয়ে গেছে। গরমে তার মুখের চামড়া যেন পুড়ে যাচ্ছে, চোখের পাতা ভারি হয়ে আসছে। সে হাত বাড়িয়ে কিছু একটা ধরতে চাইলো। কিন্তু তখনই এক জ্বলন্ত বাতাসের ঢেউ এসে ওর ছোট্ট গালটায় লাগলো। ‘আহহহহহ!!!’ প্রচন্ড ব্যথায় ওর মুখ বিকৃত হয়ে গেল! হাত তুলে গালটা ধরল, কিন্তু হাতও যেন আগুনে ঝলসে যাচ্ছে! তার পায়ের কাছে তপ্ত কাঠের টুকরো পড়ল, গায়ের জামায় আগুন লেগে গেল। সে ঘরের এক কোণ থেকে আরেক কোণে ছুটে যেতে চাইল, কিন্তু চারদিক আগুনে ঘেরা! শ্বাস নেওয়া দুষ্কর হয়ে উঠল, বুকের মধ্যে তীব্র একটা জ্বালা অনুভব করল। তাপমাত্রা বাড়ছে। শরীরের ওপর চরম চাপ আসছে। আইরিন তখনও জানে না, সে যাচ্ছে কোথায়। সে শুধু অনুভব করছে একটা অসহ্য যন্ত্রণা! তার ছোট্ট চামড়া ফেটে যাচ্ছে, পোড়া ঘ্রাণ পাচ্ছে বাতাসে। গায়ের জামাটাও ছাই হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। সে আবার চিৎকার করতে চাইল। কিন্তু এবার শব্দ বেরোল না। তার কণ্ঠস্বর আগুনের ভয়াল গরমে নিঃশেষ হয়ে গেল। পায়ের তালুতে ফোসকা পড়ছে। ব্যথায় সে ঝাঁকি খেলো, পা তুলতে চাইল, কিন্তু পারল না। শরীরের শক্তি যেন কোথায় হারিয়ে গেছে! তখনও সে ভাবছে, কেউ না কেউ আসবে। নানা? নানি? মামা? কেউ তার চিৎকার শুনছে না কেন! কিন্তু না... দরজাটা বাইরে থেকে তালা দেওয়া। আগুনের গনগনে শব্দ আর বাইরে ওয়াজ মাহফিলের মাইকের আওয়াজ—তার ক্ষীণ কণ্ঠস্বরের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। আর তখনই তার চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যেতে লাগল। শরীরের আর কিছুই অনুভব করতে পারছে না সে। তার গায়ের চামড়া আগুনে পুড়ে একদম সংবেদনহীন হয়ে গেছে। শ্বাস নিতে পারছে না। ভেতরে তখন ছোট্ট আইরিনের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। তার চারপাশে আগুনের তীব্র তাপ, ধোঁয়ার চাপে তার চোখে পানি এসে গেছে। খুব কাশি পাচ্ছে, কিন্তু দিতে পারছে না। পানির পিপাসা পেয়েছে। ছোট্ট বুকটা যেন ফেটে যেতে চাইছিল। একসময়, কোনো এক মুহূর্তে, সে আর কাশল না। তার ছোট্ট শরীরটা নিথর হয়ে আসছে ক্রমে। একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস। শেষ নিঃশ্বাস। তারপর? সব শান্ত। সব নিস্তব্ধ। আইরিনের ছোট্ট শরীরটা নিথর হয়ে গেল। তার চারপাশে শুধু আগুনের লেলিহান শিখা। দুনিয়ার আগুন!
ফায়ার সার্ভিস আসতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। যখন তারা এসে আগুন নেভাল, তখনও ঘরের ভেতর থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছিল। কেউ সাহস করে ভেতরে ঢুকে দেখল, ছোট্ট একটা নিঃসাড় শরীর মাটিতে পড়ে আছে। চারদিকে তখন নিস্তব্ধতা। আগুন নিভে গেছে, কিন্তু শোকের আগুন? শিশু আইরিন আর নেই। তার ছোট্ট দেহের উপর দিয়ে চলে যাওয়া অগ্নিশিখার সেই ভয়ংকর মুহূর্তটা কেউ কেউ অনুভব করার চেষ্টা করছিল। শিখার শেষ অগ্নিশিখার মতো, আইরিনও কি এক মুহূর্তের জন্য উজ্জ্বল হয়েছিল আগুনের ভেতরে? তারপর নিভে গেল!
তিন.
আইরিনের নানা তোতা মিয়া, একটি নাম, এক জীবনের দীর্ঘ ক্লান্তি তার প্রশ্বাসে। সত্তরের কাঁধে গুটিয়ে থাকা একটি নুয়ে পড়া দেহ, যার ভেতরে বয়ে চলে দুর্বোধ্য সময়ের বোঝা। জীবন তাকে কখনো খুশির রঙ দেখায়নি, কখনো আশার আলো দেয়নি। ছোটবেলা কেটেছে দারিদ্র্যের ছায়ায়, যৌবন গেছে সংগ্রামে, বার্ধক্য এসেছে রোগশোকে জর্জরিত হয়ে। তবুও, এতগুলো বছরের যাত্রায় তার একমাত্র আনন্দের উজ্জ্বলতা ছিল নাতনী আইরিন। ছোট্ট নাতনি ‘নানা’ বলে দৌড়ে এসে তার কোল জুড়ে বসত, তখন তোতা মিয়া মনে করত, জীবনে বুঝি এতদিন পর একটু ভালোবাসার ছোঁয়া পেল। যখন সে হাসতো, তার ছেঁড়া জীবনটা যেন একটা সুঁই নতুন বুননের চেষ্টা করছে। ইদানীং তোতা মিয়া মৃত্যুর কথা ভাবলে কেবল একটি দৃশ্য চোখের সামনে ভাসত, সে শুয়ে আছে, নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে থেমে আসছে, আর পাশে বসে আইরিন খিলখিল করে হাসছে, তার নরম ছোট্ট হাত ধরে আছে। সেই হাসিমাখা মুখের দৃশ্য দেখতে দেখতেই যেন সে চলে যাবে অন্য জগতে। কিন্তু আজ! আজ সে কী দেখছে! কী হলো তার সেই শেষ আশাটুকুর? আগুনের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে আকাশে। মানুষের চিৎকার, কান্না, হাহাকার আর তার সামনে পড়ে আছে একটা ছোট্ট পুড়ে যাওয়া দেহ। কালো। একেবারে কয়লা হয়ে গেছে! চোখ দুটো গলে গেছে, হাত দুটো পুড়ে চূর্ণ হয়ে গেছে, মুখের সেই চিরচেনা হাসির চিহ্ন পর্যন্ত নেই। যে মুখ দেখে মরতে চেয়েছিল তোতা মিয়া, সেই মুখ আজ আর পৃথিবীতে নেই! তার কানে সব শব্দ থেমে গেল। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো। শূন্যতার এক গভীর কূপের মধ্যে যেন ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে সে। বুকের ভেতরে ধক করে কেমন একটা যন্ত্রণা, যেন কেউ তপ্ত লোহার রড ঢুকিয়ে দিয়েছে তার দেহের গভীরে। সইতে না পেরে চোখ বন্ধ করে তোতা মিয়া। তখনই ভেসে ওঠে আইরিনের বিকৃত পোড়ামুখ। ‘না... আমি মরতে চাই না... আমি এই দৃশ্য দেখে মরতে পারব না’। তার দুর্বল ঠোঁট কাঁপে, ফেটে যাওয়া চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে পোড়া মাটিতে। তারপর ধপ করে বসে পড়ে তোতা মিয়া। মাথা নিচু হয়ে আসে। ধূসর দাড়ির ফাঁক দিয়ে তার ঠোঁট কাঁপে, কিন্তু কোনো শব্দ বের হয় না। আকাশে তখনও ধোঁয়া উড়ছে, আগুনের লেলিহান শিখা নিভে গেছে আগেই। তোতা মিয়া বসে থাকে নিঃসাড়, পাথরের মতো—জীবনের শেষ আশাটুকু ঘরের মতো ছাই হয়ে গেছে! তার কানে বাজে হুজুরের জাহান্নামের আগুনের ওয়াজ। চোখ মেলে তোতা। দেখে তার সামনে দুনিয়ার আগুন। ·

0 মন্তব্যসমূহ