ওরা হাঁটছে গায়ে গা লাগিয়ে, হাসাহাসি করে, ঢলাঢলি করে, লাল ধুলো উড়িয়ে। দুপাশে শালবন, মাঝখানে সরু সিঁথির মতো লাল মোরামের পথ চলে গেছে এক গ্রাম থেকে আর এক গ্রামের দিকে। বনের মাঝে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট আদিবাসী, দেহাতী, গোয়ালাদের কিছু গ্রাম, গ্রাম লাগোয়া চাষের খেতি, জল শুকানো পুকুর, আলের পগাঢ়ে প্রান্তরে দাঁড়িয়ে আছে কোথাও ঢেঙা তালগাছ, কোথাও বা নেড়া পলাশ, শিমুল। বাকি যেদিকে তাকাও খালি বন আর বন।
বুড়ি শকুন্তলাকে পিছনে ফেলে কখনও ফুলমনি এগিয়ে যাচ্ছে, কখনও নতুন বউয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে শকুন্তলা। দলের বাকি মেয়েরা নতুন বউ আর বুড়ির এই রেসারেসি দেখে খিলখিল করে হেসে উঠছে। কেউ বা বুড়িকে রাগিয়ে দেওয়ার জন্য পিছনে ফোড়ন কাটছে, হামদের লতুন বহুটার সাথে তুই পারবিক নাই মাসি। উয়ার সাথে হাঁটতে গেলে তুয়ার পায়ের গিঁড়ে খুলে যাবেক।
শুনে বুড়ি শকুন্তলা চলার ত্বেজ আরও বাড়িয়ে দিয়ে হন হন করে এগিয়ে যায় কয়েকহাত, ইখনও মুই বুড়ি হয়ে যায় নাই গো। ভালো করে সাঁজেগুজে যদি একবার নাচের আসরে দাঁড়হাই ন, সব মরদরা হামার দিকেই ভালবেক। লতুন বহুটার দিকে আর কেউ ভালবেক নাই।
আবার হাসির দমক উঠে, ফুলমুনির শাশুড়ি বলে, তুরা এখন কী দেখছিস মাসিকে, বহুকালে মাসির রূপটো যা ছিলক ন, হামদের ফুলমনিটাকেও হার মানাইতো।
টুকটুকির মা বলল, লতুন বহুটাকে কিন্তুক সেই লাগছে আজ। ও মারে মা, চোখ ফিরানা যায় না গো!
ফুলমনির চোখমুখ লাল হয়ে যায়, দোহায় তুমাদের, আর হামকে লজ্জা দিও না গো!
দিখ-অ দিখ-অ কিমন রাঙা হয়ে যাচ্ছে বহুটা। লজ্জাবতী কন্যা।
লখার বউ বলল, হ রে বহু, তুকে আজকে দারুণ মানাইছে। হামদের লাচ তো কেউ আর দেখবেক নাই, সবাই তুয়ার দিকেই চাঞে থাকবেক।
কড়াশুলি ঢোকার আগে একটা মহুলতলায় ওরা খানিক বসল। সেই দুপুরে বেরিয়েছে দলবেঁধে, সবে বর্গাশোল, লাপিতডাঙা, মাছডোবায় নাচ দেখানো হয়েছে, এখনও পুবে পড়ে আছে ছসাতটা গ্রাম। খাটো দিনের বেলা, খুব তাড়াতাড়ি সন্ধে ঘনিয়ে আসছে। কড়াশুলিটা সেরে আজকের মতো নাচ দেখিয়ে ফিরে যাবে ওরা।
দলে আছে সদ্য বিয়ে হওয়া বউ থেকে শুরু করে ষাটোর্ধ বৃদ্ধা পর্যন্ত। দশ-বারোজনের একটি দল। প্রত্যেকের পরনে লালপেড়ে সাদা শাড়ি, খোঁপায় গোঁজা ফুল, গলায় ফুলের মালা, হাতে একটা করে কাঁসার থালা ও বাটি। প্রতিবছর এই কালিপুজোর তিনটে দিন গ্রামে গ্রামে ঘুরে গৃহস্থের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সারপা নাচ দেখায় এরা। তাতে খুশি হয়ে গৃহিণীরা ধামায় ঢেলে দেয় চাল, আলু, পেঁয়াজ, খেতের মুলো, বেগুন। পাঁচ টাকা, দশটাকা, বিশটাকা পয়শাও দেয় কেউ কেউ। কেউ বা বোতলে ঢেলে দেয় দশান খানেক সরিষার তেল।
হাসি মশকরায় মেতে থাকলেও ফুলমনির চোখেমুখে ফুটে উঠছে একবার করে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ। একদিকে তার নাচার অদম্য ইচ্ছা, শাশুড়ির জোগানো সাহস, আর একদিকে মরদ দুখু মুর্মুর নিষেধাজ্ঞা। কোনদিকে যে যাবে সে ভেবে পায়নি। মরদের নিষেধ অমান্য করে চলে এসেছে ঠিকই, কিন্তু মনে স্বস্তি নেই তার।
সারপা নাচতে যাবে শুনে কাল রাতেই দুখু শুনিয়ে দিয়েছিল ফুলমনিকে, তুই নাই যাবিক লাচতে। বাবুরা সব কোমর দুলানো দেকবেক, আর ভিখিরির মতো দুটি চাল, ডাল দিয়ে বিদায় করবেক! কী দরকার লোকের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরার! সবাই মিলে একদিন রেঁধেবেড়ে খেতে চাস, ভালো কথা। হামরা কিলাবের ছেলেরা চাঁদা তুলে ফিস্টি করব। সারারাত আনন্দ করব, লাচাগানা করে কাটাব।
খেতে বসে ছেলের এমন কথায় ঘাড় তুলে তাকাল শ্বশুর রাগন মুর্মু৷ বলল, কী বললি দুখু! যারা সারপা লাচতে যায়, তাদের তুয়ার ভিখিরি লাগে? ঘরে চাল-ডাল নাই বলে লাচতে যায় লোকের দুয়ারে? লিজেদের আচার-আচরণগুলো একটু মান্যি কর! সব তো ধুলায় মিশায় গেল।
এগুলো হামদের আচার অনুষ্ঠান বটে বাপ? তুই বল কেনে! দিকুদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে লাচ দিখাইতে হবেক, ইমন পরবের কুথা তো হামি শুনি নাই।
সেই কুন কাল থেকিই তো হামরা করে আসছি। মোদের ঘরের মিয়ারা মা কালীর পুজোটোর সুময় বাড়িই বাড়িই সারপা লেচে আসে, সেরেঞ ধরে । দুগগা পুজোর সময় ছেলেরা দাসাই লাচ, দাসাই যাত্রা করে আসে। আজ তু হঠাৎ ই কুথাটো বলছিস কেনে বাপ!
দুখুর মা বলল, ইবারের দুগগি পুজোয় তু দাসাই লাচতেও গেলিক নাই, পাড়ার সব ছেলেরা গেল্য। বাইরে কাজে গিয়ে কুন ভূতে তুকে ধরল দুখু! ভুলে গেলি? তু হোড় আছিস! তুর বাপ হোড়, তুর দাদু হোড়। রক্তে তুর হোড়ের রক্ত বইছে।
তুয়ারা যাচ্ছিস যা কেনে, ফুলমনি নাই যাবেক লাচতে।
হ, বহুটাকে ঘরে ভরে রেখে দে। পটের রানী বানাইয়ে।
গত কয়েকবছর ধরেই এমন দেখা যাচ্ছে। গ্রামের ছেলে-ছোকরারা সব ছুটছে চেন্নাই, কেরল, মুম্বাই। গাঁয়েঘরে কাজ নেই। সারাদিন গাধার মতো খেটে যা মজুরি, দক্ষিণ মুলুকে তার ডবল, তে-ডবল। বাইরে পাঁচ মাস ছ'মাস কাজ করে বাড়ি এসে কিছুদিন বসে বসে খায় সব। কেউ বাইক নিচ্ছে, কেউ মাটির ঘর ভেঙে দালান তুলছে। কেউ টোটো কিনছে। আগে এই মোলবাগান, শুকোশোল, বর্গাশোলে খুঁজলে একখানা পাকা বাড়িও চোখে পড়ত না। বছর খানেকের মাথায় অনেক দালান বাড়ি গজিয়ে উঠল। নিজেদের পরব-পালা, পরম্পরা এইসব বহন করার আর কারও গা নেই। ধামসা -মাদলের বদলে এখন বাহা, করমে মাইক-ডিজেবক্স ভাড়া করে আনছে ক্লাবের ছেলেরা। গান চালিয়ে মদ খেয়ে নাচাকোঁদা করছে। দুর্গাপুজোর সময় প্রতিবারেই আদিবাসী পাড়ার ছেলেরা ধামসা মাদল নিয়ে গ্রামে গ্রামে দাসাই নাচতে যায়। এবারে বাইরে থেকে এসে বেশকিছু ছেলে-ছোকরা বেঁকে বসেছে। কালীপুজোর সময় বাড়ির বউরা বাবুদের বাড়িতে বাড়িতে সারপা নাচতে যাক, সেটাও চাইছে না অনেকে।
সবে মাস সাতেক হল বিয়ে হয়েছে ফুলমনির। দুখু তো বাইরে বাইরেই থাকে। পুজোর আগেই চেন্নাই থেকে ফিরে এসেছে। এখন বিষ্ণুপুরে ঢালাইয়ের কাজে যাচ্ছে। সকাল থেকে বেরিয়ে যায়, ফিরতে সাঁঝ হয়ে যায়। পাড়ার মা-কাকিরা যখন ডাকতে গিয়েছিল তখন দোটানায় পড়ে গিয়েছিল ফুলমনি। তাকে দোনামনা করতে দেখে দুখুর মা সাহস জোগায়, ইত ভয়ের কিছু নাই। দুখু বাঘ নকি! যা বইলব্যেক তাই শুনতে হবেক? তু চকেনে হামার সাথে। পাড়ার সবাই যাচ্ছে, তু একা বসে থাকবি নকি ঘরটোতে!
নিজের শাশুড়ি যখন এমন করে বলছে, সাহস পায় ফুলমনি। ভয়টাকে কাটিয়ে বেরিয়ে পড়ে সে। বাপের গাঁয়ে থাকতেও কম নেচেছে! নাচ তো তার রক্তে, শিরায় শিরায়। সোহরায়, বাহা পরবে ধামসা-মাদলের তালে তালে নেচে নেচে কত মাতাল হয়েছে ফুলমনি! পড়ালেখা তো বেশিদূর করেনি। পাড়ার সঙ্গী সাথীদের সাথে শালপাত, কেন্দুপাত তুলে, মোল কুড়িয়ে দিন কেটেছে। আর পরব পালায় মেতে থেকেছে। নাচের কথা শুনলে নিজের মনকে বেড় দেওয়া যায় না।
ধামার চালগুলো বস্তায় ঢেলে, আলু-পেঁয়াজগুলো আলাদা করে নিল টুকটুকির মা। তিনদিনের চাল এককাছে করে, সব টাকা পয়শা হিসাব করে পাড়ার মহুলতলায় চুলহা কেটে আগ জ্বেলে একদিন রান্না হবে খিচুড়ি-মাংস। সবাই মিলে আনন্দ করে খাবে। সেদিন সারারাত নাচাগানা হবে।
বুড়ি শুকুন্তলা তাড়া লাগাল, এবার চকেনে, আর বসে থাইকলে হবেক নাই। বেলা পড়ে আসছে। কড়াশুলিতে অনেকগুলো ঘর।
ফুলমনিও উঠে পড়ে। মরদটা আসার আগেই যদি ঘর ঢুকে যেতে পারে, তাহলে শাশুড়িকে বলে তার নাচতে আসার কথাটা গোপন করা যেতে পারে। কিন্তু কড়াশুলিতে অনেকগুলো ঘর, কথাটা শুনে মনটা একটু ঝিমিয়ে যায় তার।
ফুলমনির দেখাদেখি দলের বাকী মেয়েরাও উঠে পড়ল। শাড়ির আঁচল-টাচল ঝেড়ে ঠিক করে টুকটুকির মা কাঁকালে তুলে নিল ধামাটা। চালগুলো এতক্ষণ সে-ই বয়ে আনছিল। লখাই মান্ডীর বউকে বলল, চালের বস্তাটা টুকু তু লে কেনে ছোটকি, ইতটা পথ হাঁটে আসে কোমরটা দরদ হয়ে গেলেক।
গাঁয়ে ঢোকার মুখে শালবন একটু ফাঁকা হয়ে হয়ে গেছে। এখানে হেথায় সেথায় দুএকটা কেঁন্দ, মহুলের গাছ। ফাগুন শেষে চোত মাসে মোল পড়ার সময় এই গাছগুলো দাগেকড়াশুলির আদিবাসীরাই। যে গাছ যে দেগেরাখে, সেই কুড়াতে পাবে সেই গাছের মোল। গাছ দাগার জন্য মহুলতলাগুলো বেশ চকচকে। ঝোপ-জঙ্গল আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে তলাটা পরিস্কার করে রাখতে হয়।
কড়াশুলির কালিতলায় মাইকে গান বাজছে। রাস্তার ধারে ধারে লাল-নীল দিপিক দিপিক লাইট, টুনি বাল্ব জ্বলছে। গাঁয়ে ঢুকতে প্রথমেই পড়ে কারক পাড়া। একটা উঠানে গিয়ে হাঁক পাড়ল শুকুন্তলা, বলি কই গো মা জননী! আসো কিনে, মোদের লাচাগানাটা দিখে যাও।
গৃহিণী ঘর থেকে বেরিয়ে এল, সাথে তার ছেলের বউ। ওরা বারান্দার দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াল, তুমরা কুন গাঁয়ের নাচুনী গো?
শুকুন্তলা বলল, প্রতিবারেই তো আসি মা জননী। মোরা মোলবাগানের নাচুনী বটি, চিনতে লাইরছ্য!
কত দল আসছে এইসুময়। একটু আগে এসেছিল ভাটপুকুর থেকে। একই শাড়ি, একই সাজ পোশাক, সব গুলিয়ে যায় বাপু, তা এই বউটাকে লতুন লাগছে। কার ঘরে এত ফুটফুটে বউ এসেছে গো! দুগগা ঠাকুরটি যে!
ফুলমনির শাশুড়ির বুকটা ফুলে যায় নিজের ছেলের বউয়ের প্রশংসা শুনে। বলল, হামার বেটার বহু গো। গত চোত মাসে বিহা দিলাম বেটার।
খুব ভাগ্য করে এমন বউ পেয়েছ। নাও নাচো দিনি, নতুন বউ কেমন নাচতে জানে দেখি।
ফুলমনি অস্বস্তিতে পড়ে যায়। সবাই যেভাবে তার রূপের প্রসংশা করছে তার মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে।
শকুন্তলা বলল, দুবার করে কেউ আসবেকনি মা জননী, বছরে এই একবারই আসি তুমাদের পরবে।
না গো ভুল বুঝো না, তুমাদিকে সেই কথা বলিনি। আসবে বইকি।
শকুন্তলা হচ্ছে দলের কর্তি। দলটাকে সাজিয়ে নিল সে। সবাই পর পর গোল হয়ে দাঁড়াল। বাঁ-হাতে কাঁসার থালা, আর ডান হাতে বাটি। যে সেরেঞ ধরবে সে বাজাবে ঝুনঝুনি। শকুন্তলা নির্দেশ দিল, টুকটুকির মা, পেথমে তুই সেরেঞটা ধর কেনে।
টুকটুকির মা সেরেঞ ধরল :
মোড়ো সিং মোড়ো নিন্দ
কুলি রেনাঃ হেনা।
দান আয়ো, দান আয়ো—
তা: কি দো দান আয়ো।
কুলহি রেগে কুন দুই এ আয়ো।
ঝুমার মায়ের সেরেঞের সাথে সাথে পুরো দলের মেয়েরা কাঁসার থালাটির তলায় ডানহাতের বাটিটি ঠুকে ঠুকে তাল দিয়ে ধুয়া ধরছে: মোড়ো সিং মোড়ো নিন্দ… ধীর লয়ে পায়ের পাতা এগোচ্ছে, আর পেছচ্ছে। কখনও সাপের চলার মতো বক্রাকারে দলটা ভেঙে সোজা হয়ে যাচ্ছে। ধুয়া শেষ হলে আবার পরের লাইন গাইছে টুকটুকির মা। হাতে তার একটি স্টিলের ঝুনঝুনি, সেটিও বাজছে নাচের তালে তালে।
এক একটি বাড়িতে একটি করে গানে নাচছে ওরা, এইভাবে আজ খান ত্রিশেক বাড়ি ঘোরা হয়েছে। গান শেষ হলে গৃহিনী এক থালা চাল এনে ধামায় ঢেলে দিল।
এর পরের যে উঠোনে ওরা পা দিল, সেখানে পর পর তিনটি বাড়ি, একটাই উঠোন। তিনবাড়ির মানুষ জড়ো হয়েছে চারপাশে। আশেপাশের বাড়ির বউ-ঝিরাও ভিড় জমিয়েছে। চাষিবউ বলল, একটাই উঠোন বলে একটা গানেই নেচে চলে যাবে, তা হবেনি বাপু, তিনটে বাড়ি তুমাদিগে তিনটে গান গেয়ে নেচে যেতে হবে।
এ কী আবদার! ফুলমনি ভেবেছিল একটা বড় সেরেঞ ধরবে হয়তো, তিন বাড়ির মানুষ যখন এককাছেই আছে। কিন্তু সে গুড়ে বালি!
এবার ফুলমনির শাশুড়ি যে সেরেঞটি ধরল, তার বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায়—
এখনই উঠোন ঝাঁট দাও, পরিস্কার করো।
সুন্দর রঙ দিয়ে ঘরবাড়ি সাজাও।
দেওয়াল লেপো, খামার লেপো।
শুভ অতিথি আসছে যে!
নতুন ফসল এসেছে মাঠে,
ধন্য হলো এই আমাদের মাটি,
ধন্য হলো সিংবঙা (সৃষ্টিকর্তা)–র দয়া।
চাষির ঘরে ফিরে এল হাসি,
এই আনন্দ সবাই মিলে ভাগ করে বাঁচি...
হো হো ধন্য হল এই আমাদের মাটি গো…ধন্য হল এই আমাদের মাটি।
নাচ শেষ হলে চাল-ডাল, কেউ কেউ দশটাকা পাঁচটাকা পয়শাও দিল এখানে। একটি বাড়ির টালির ওপর চাল কুমড়ো ঝুলছিল, গৃহস্ত সেটি কেটে দিল। এক বাড়ির একটি বউ প্লেটে করে আনল কিছু সাউনাড়ু আর ঘটি ভরা জল। বলল, একটু জল-নাড়ু খেয়ে নাও গো তুমরা, পুজোর সময় গৃহস্থের বাড়িতে এলে।
জল খেয়ে ওরা একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছিল। ফুলমনী বলল, আমার বাপের গাঁয়ের উধারে এই সুময় সোহরায় হয়। আমাদের উদিকে সারপা লাচে তো একটা কাঠের সারপা থাকে, সারপার দড়িতে টান দিলেই ফটাং ফটাং শব্দ উঠে, ইখানে তুমহরা শুদুই কাঁসার থালা আর বাটি লিয়ে লাচো?
বুড়ি শুকুন্তলা বলল, নানান গাঁয়ে নানান লিয়ম মা, মোদের ছোটো গাঁ, ইখানে তো বাঁদনা, সোহরায় হতে দেখিনি। হয় পশ্চিমে।
ঝুমার মা বলল, দুখুর বউ ঠিকহেই বলেছে মাসি৷ পুরুলিয়ায় হামার এক বহিনের বাপলা হইচে, উধারে ইখন বাদনা পরব, সোহরায় হয় ধুমধাম করে। ধান কাটার পরেই গোয়ালের গরু-মোষকে চান করিয়ে, শিঙে তেল, কপালে সিঁদুর দিয়ে, ঘর-বাড়িতে আলপনা এঁকে ধুমধাম করে পুজো দেওয়া হয়। গরুখুঁটা,গাইবান্ধা, গরু জাগানো ধুমধামের শেষ নাই বাপু।
ফুলমনি বলল, এই সেরেঞগুলো কিন্তুক হামদের ওইধারে সোহারায়েই গাওয়া হয়।
কী জানি বাপু, হামরা মুক্ষুসুক্ষু মানুষ, মা কালীর পুজোটার সুময় মোরা সারপা লেচেই তো আসছি। ইসুময় মোদেরও মনে আনন্দ ফুর্তি হয়, লাচাগানা করি।
কারক পাড়ায় নাচ দেখিয়ে দলটা রায়পাড়ার দিকে হাঁটা লাগাল। রায়পাড়ায় ঢোকার আগে গাঁয়ের মাঝে পড়ে কালীতলা। অনেক মানুষের ভিড় সেখানে। ছোটখাটো একটা মেলার মতোও বসে গেছে। বেশকিছু দোকানপাট বসেছে। মনোহারী, বাচ্চাদের খেলনা, আইসক্রিম, তেলেভাজা। রাস্তার পাশে একটা মাঠে বাঁশ-পাটা দিয়ে মাচা বাঁধা মঞ্চ। রাতে সেখানে হবে ড্যান্স হাঙ্গামা। বক্সে গান বাজছে, মাঠে কয়েকজন ছেলেছোকরা নাচছে জামা খুলে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে।
ফুলমনিদের দলটা যখন মঞ্চের পাশ দিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছিল, তখন দুজন ছোকরা নাচতে নাচতে এগিয়ে এল, ওই, দাঁড়াও দাঁড়াও। দাঁড়াও তুমরা।
শকুন্তলা রুখে দাঁড়াল, পিছনে বাকি সবাই।
বল কেনে!
এত তাড়া কীসের! আমাদের সাথে একটু লেচে যাও।
ছেলেটার মুখ থেকে ভক ভক করে মদের গন্ধ বেরচ্ছে। পাশের ছেলেটা ওকে ঠেলে সরিয়ে দিল, তু চুপ কর প্যাংটে, আমি কথা বলছি।বলে সে একেবারে মোড়লের মতো কাছে এগিয়ে এল। ফুলমনি ভয়ে পিছিয়ে যায় কয়েকহাত। সবাই তার দিকেই কেমন করে দেখছে।
শুনো মাসি, তুমরা ইস্টেজে চেপে নাচ দেখাও। আমরা সবাই মিলে টাকা দুবো।
বুড়ি শুকুন্তলা এবার ঝাঁঝিয়ে উঠল, সরে যা বুলছি, হামরা মাচায় চেপে লাচি না।
বুড়ির কথা শুনে তেতে গেল ছেলেছোকরার দল। আরও কয়েকজন এগিয়ে এল, কেনে নাচবে নাই, আমরা কি মাগনাই নাচ দেখব বলেছি? ইখানে আগে নাচ হবেক, তারপর পাড়ায় ঢুকতে দুবো।
ফুলমনিকে ইঙ্গিত করে একটা ছেলে বলল, তুমরা নাচবে নাই তো, ইয়াকে দিয়ে যাও, ই নাচুক, তুমরা পাড়া থেকে ঘুরে আসো। কী মামনি, তুমি তো ছুকরা আছো, সব গানেই তো নাচতে জানো, আমাদের সাথে একটু নেচে যাও।
ফুলমনির শাশুড়ি এবার তেঁড়ে এল, হেই ছুড়া, হামদের পথ ছাড় বলছি। ড্যাব ড্যাব করে কী ভালছিস, চোখগুলোয় গিঞ্জারে দুবো।
প্যাংটে নামের ছেলেটি এবার কুঁদি মেরে এসে ফুলমুনির হাত ধরে টানতে গেল, ফুলমনি হাতটা ঝিনে ছাড়িয়ে নিয়ে ঠাঁস করে এক চড় দিয়ে দিল। অনেকক্ষণ ধরেই রেগে ফুঁসছিল ফুলমুনি। সঙ্গে সঙ্গে একটা হৈচৈ শুরু হয়ে গেল। কালীতলা থেকে গন্ডগোলের গন্ধ পেয়ে কিছু মানুষ ছুটে এল। বয়স্ক মানুষও দুচারজন এসেছে।
কী হয়েছে মাসি? এখানে ঝামেলা কীসের!
হা দিখো গো, হামরা তুমাদের পাড়ায় যাচ্ছিলাম লাচতে, ইয়ারা হামদের বলে মাচায় চেপে লাচতে হবেক! পথ আগলে দাঁড়হাইছে। মোদের বহুটাকে খারাপ খারাপ কথা বুইলছে। হাত ধরে টানাটানি করছে, বুইলছে ইয়াকে দিয়ে যাও।
শুকুন্তলার কথা শুনে কমিটির জনা দুয়েক লোক উত্তেজিত হয়ে ছেলেদুটির কলার চেপে ধরল। চড়-থাপ্পর দিয়ে যাচ্ছেতাই অপমান করতে লাগল। একজন হেঁকে বলল, এই কে আছিস মাইকটা বন্ধ কর।ছুটে এল আরও মানুষজন। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে একটা হট্টগোলের সৃষ্টি হয়ে গেল।
পরিস্থিতি জটিল হয়ে যাচ্ছে দেখে কমিটির একজন লোক অনুরোধ করল, তুমরা যাও মাসি, আমরা দেখে নিচ্ছি ব্যাপারটা, কত মরদ হয়েছে সব। এই কে আছিস ইয়াদের বাপদিকে ডাক।
ভিড় থেকে একটু সরে এল ওরা। ফুলমনি হিঁসুরে হিঁসুরে কাঁদছে। বলল, মুই আর নাই যাবক লাচতে। মুই বাড়ি যাবক।
টুকটুকির মাও সায় দিল, হ্যাঁ, লতুন বহু ঠিকয়েই বুলেছে, সাঁঝ হয়ে গেলেক, আজ আর লাচবনি। জঙ্গলের পথ, ইতটা ফিরতে হবেক ইখনও!
এইরকম একটা ঘটনা সবার মনকে বিষিয়ে তুলেছে। নাচার ইচ্ছাটাই নষ্ট হয়ে গেছে সবার। ওরা ফিরে যাচ্ছিল, এমন সময় একজন বয়স্ক মানুষ পিছু ডাকল, শুনো মাসি।
শুকুন্তলার দেখাদেখি পুরো দলটাই থমকে দাঁড়াল। দেখল নিমাই মস্টার। তাদের গ্রামের ইস্কুলে পড়াতে যায়। এই কড়াশুলিরই মানুষ।
বলো কিনে মাস্টার।
দেখো, যা হয়েছে, যা ঘটেছে ওদের হয়ে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। খুবই মর্মাহত। দয়া করে গাঁয়ে ফিরে এটা কাউকে বলো না তুমরা। বুঝতেই তো পারছ ছেলেমানুষ, মদ খেয়ে সব মাতাল হয়ে গেছে, কী বলতে কী বলেছে। তুমাদের মরদরা শুনলে বিশাল ঝামেলা হয়ে যাবে দুই গাঁয়ের। আমরা তো বাপু কুনুদিন তুমাদের অসম্মান করিনি। প্রতিবছর পুজোর সুময় তুমরা আসো, তাতে আমাদের কত ভালো লাগে। বাড়ির মেয়ে-বউরা নাচ দেখে। এটাই তো মেলামেশা। পাশাপাশি থেকে একে অপরের পরব-উৎসবে সামিল হওয়া।
ছি ছি মাস্টার! তুমহি ক্ষমা চাইছ কেনে! জোড় হাতটো নামাও বুলছি।ফুলমনির শাশুড়ি মিনতি করে।
মাস্টার থামে না, তুমহাদের গানের মানেগুলো আমি জিজ্ঞেস করি ছাত্রদের। স্কুলে রান্নার লোকটা আছে না, বুধনলাল, ও আমাকে তুমাদের সেরেঞের বাংলা মানেগুলো বুঝিয়ে দেয়। তুমরা তো আমাদের কুনুদিনও ক্ষতি চাওনি, সারপা নাচে তুমরা গৃহস্থের কল্যান চাও, ভালো ফলন হলে প্রকৃতির কাছে, গবাদী পশুর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।
ইতদিন পাশাপাশি আছি, কুনুদিন তো ইমন হয় নাই মাস্টার। ইখনখার ছেলেছুকরাদের কী যে হল!দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল ফুলমনির শাশুড়ি। তারপর বলল, তুমার কুনু চিন্তা নাই মাস্টার, কাউকে বলবনি। সাঁজ হয়ে গেছে। আজ হামরা আসি কেনে।
হ সাবধানে যাও, কাল আমাদের পাড়ায় এসো কিন্তু।
শকুন্তলা আগে হাঁটে, পিছু পিছু দলের বাকী সবাই। কড়াশুলিকে পিছনে ফেলে, কাষ্টসাঙাকে ডাইনে রেখে বনের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছাবে ওরা মানিক বাজার, তারপর মোলবাগান। ফুলমনির বুক ঢিপ ঢিপ করে ওঠে। এতক্ষণে বোধহয় মরদটা চলে এসেছে। বাড়ি ফিরে যখন দুখু দেখবে মা বউ দু'জনেই নাচতে বেরিয়েছে, তেতে লাল হয়ে যাবে দুখু। সেই আঁচের সামনে কী করে দাঁড়াবে ফুলমনি? দুখুর কাছে কী জবাব দেবে সে! তার ওপর আবার যদি এই ঘটনাটা কানে যায়!
চারপাশে নেমে এসেছে অন্ধকারের চাঁদর। দূরের মাইকের আওয়াজও এখন ক্ষীণ। নির্জন নিস্তব্ধ বনের পথ, ফুলমনির কেমন ভয় ভয় লাগে।
মা শুইনছ?শাশুড়ির গায়ে গা লাগিয়ে হাঁটে ফুলমনি।
বুল কেনে।
মোর ডর লাইগছ্যে মা।
কীসের ডর?
ইতক্ষণে মুনে হয় তুমার ছেলে চলে আসেচে।
মুই তো আছি, তুর কুনু ডর নাই।
শাশুড়ি অভয় দিলেও ফুলমনির মাথায় শত চিন্তার ঝড়। আজকের মতো রক্ষা করো মারাংবুরু। মনে মনে মারাংবুরুর কাছে প্রার্থনা করে ফুলমনি।
পায়ের শব্দে পথের মাঝ থেকে আচমকা কোনও শেয়াল দৌঁড়ে ঢুকে যায় বনের গহীন অন্ধকারে। রাতজাগা পাখি ডানা ঝাপটে ওঠে কোথাও। ফুলমনির মনে এখন নানান চিন্তা। মরদটার কাছে কি সব কথা তার খুলে বলা দরকার! বললে দুখুর রক্তে আগুন বয়ে যাবে। দুই গ্রামের মধ্যে একটা বিশাল ঝামেলা লেগে যাবে। নিমাই মাস্টারের বলা কথাগুলো এখনও কানে বাজছে ফুলমনির। পাশাপাশি বাস, একে অপরের পরব-পালায় যদি সবাই মিলে আনন্দ করে তাহলে ক্ষতি কী! ফুলমনি তো আমোদ ফুর্তি করেই বেঁচে থাকতে চায়। যখন সে পায়ের তালে পা মিলিয়ে নাচে, তখন শরীরে মনে কেমন একটা মাতন লাগে। নেশা লেগে যায়। তখন সব দু:খ কষ্ট, পাওয়া, না পাওয়ার ব্যথারা মিলিয়ে যায়। প্রশ্নটা মনে জাগলেও দুখুর রাগার্ত মুখটা ভেসে উঠতেই ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে ফুলমনি। আজকে যদি দুখুর হাত থেকে বেঁচেও যায় কাল কি তাকে আর সারপা নাচতে পাঠাবে?
কাঁসার থালা আর বাটিটাকে শক্ত করে আঁকড়ে বুকে চেপে ধরল ফুলমনি, তারপর অন্ধকারে পা ফেলে সাপের মতো সড় সড় করে দলের সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে লাগল। ·

0 মন্তব্যসমূহ