বিষ্ণু বল নামে এই শহরে এক মহাবল লেখক ছিলেন। ডেভিড ১৯ যে আমলে সংক্রামক ব্যাধি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, সে আমলেই বিষ্ণু বল মারা যান। দুর্বল মানুষের শ্বাসরোধ করে সংক্রামক এই ব্যাধি হত্যালীলা শুরু করেছিল। তবে বিষ্ণুবাবুর মতো অগ্রাধুনিক লেখক কখনও দুর্বল হয়ে ডেভিডের হাতে গলা তুলে দিতে পারেন না। তাই ডেভিডকে কলা দেখিয়ে তিনি হার্ট এটাকে মারা গেলেন।

বিষ্ণু বলের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিন গভীর সম্পর্ক ছিল। কলেজ জীবনে তাঁর লেখার সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে। কিছুদিন পর কলেজ পাড়ার এক সরু গলির মাঝারি মানের এক চায়ের দোকানে সাক্ষাৎ আলাপ হল। ছুরি দিয়ে কেটে কেটে কিছু খাচ্ছিলেন। চেয়ার ফাঁকা থাকায় সামনে গিয়ে বসলাম। খুব মন দিয়ে কাঁটায় গেঁথে কাটলেট মুখে তুলছিলেন। আগে কোনোদিন এত কাছ থেকে কোনো লেখককে কিছু খেতে দেখিনি। সামান্য কাটলেট খাওয়ার পেছনে অসীম একাগ্রতা আর অভিনিবেশ দেখে মুগ্ধ হলাম।

বয়স তখন এমন, যেখানে যা দেখি মনে হয় সেখান থেকেই কত কী শেখার আছে। যা দেখি তাই নকল করার প্রবণতা ভেতরে ভেতরে কাজ করত। একসময় কাটলেট শেষ করে তিনি ডবল-হাফ চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। লেখকের দিকে অপলক তাকিয়ে ছিলাম। সেদিন থেকে আমিও চিংড়ির কাটলেটের ভক্ত হয়ে গেলাম। ভক্ত আমি তারপর লেখক হবার কাজে মন দিলাম।

আমার নাম বিনম্র বেরা। নিজের নাম আমার একেবারে পছন্দ নয়। এমন এলেবেলে নামে লেখালেখি করলে কে মনে রাখবে? মনে রাখার মতো নামের অভাবে লেখা শুরু হচ্ছিল না। তারপর একদিন খবরের কাগজের পাতায় একটা জবরদস্ত নামের দিকে আলটপকা নজর গেল। এমন নাম আগে শুনিনি। লোকটার ফাঁসির সাজা ঘোষণা হয়েছিল। ছবিনাথ লালা নামে লোকটার ফাঁসির সঙ্গে সঙ্গে নামটাও হয়তো মানব সমাজ থেকে মুছে যাবে। এফিডেবিট করে আমি ছবিনাথ লালা হয়ে গেলাম। এবার নতুন উৎসাহে শুরু করলাম।

রোজ একপাতা করে লিখি। এক পাতা লেখা শেষ হলে সেদিন আর এগোতে পারি না। শব্দগুলো কোনো অচেনা অন্ধকার থেকে বেরিয়ে একটা কলসির ভেতর গড়িয়ে পড়ে। শত চেষ্টা করেও সেদিন কলসির অন্ধকার থেকে বাড়তি কোনো শব্দ বাইরে বেরোয় না। অন্ধকারের দশ ইঞ্চি গভীরে প্রতিদিন শব্দের বরাদ্দ এমনই মাপা ছিল।

কলসির কথা কেন মনে হল জানি না। তবে সে জায়গাকে বাক্স বলে ভাবিনি কোনোদিন। শুনেছি কলসিতে দামি দামি জিনিস গোপনে রাখা থাকে। যেমন মোহর থাকে। আর থাকে জল। প্রশ্ন হল, মোহর কি জলের চেয়ে দামি?

"মোহরের থেকে দামি হল জল। তার চেয়েও দামি ওই শব্দ”, বিষ্ণুবাবু আলোচনা প্রসঙ্গে একদিন জানালেন।

আজকাল কলসির তেমন চল নেই। তার বদলে সস্তার রকমারি পাত্র এসে বাজার দখল করেছে। সেগুলো মাঝেমাঝে চেহারা পালটায়। দৌড়ে বাজারে গিয়ে নতুনটা কিনে ফেলি। তবে আমার কাছে শব্দগুলো দামি বলে তার জন্যে বরাদ্দ কলসি।

বিষ্ণু বলকে নিয়ে সেসব দিনে কফিহাউসে গুঞ্জন শুরু হয়েছিল। সেই চাকভাঙা ভোঁ ভোঁ আওয়াজের মধু আমার কানেও ঢুকে পড়ে। বিষ্ণু বল একেবারে আলাদা ছিলেন। আমাদের লেখালেখির শহর যদি ডানদিক বাঁদিকে ভাগ হয়ে যায়, তিনি বাঁদিকে একা দাঁড়িয়ে থাকবেন। আমি চিরকাল বামের ভক্ত। তাই কানে মধু ঢুকতেই বিষ্ণুবাবুকে গুরু বলে মেনে নিলাম।

কফিহাউসে তিনি আমায় হাতে ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন। কোলে সাহিত্য আর প্লেটে কফি নিয়ে কিছু মানুষ সে জায়গায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকত। তাদের মেনুতে চিংড়ির কাটলেটও পাওয়া যেত। তিনি আমাকে প্রায়ই সেই কাটলেট খাওয়াতেন।

তাঁর পয়সায় কাটলেট খেতে খেতে একদিন লেখার ক্ষমতা বেড়ে গেল। প্রতিদিন একশো শব্দের জায়গায় তখন দুশো শব্দ লিখতে পারছি। ব্যাপারটা তাঁকে জানালে বিষ্ণুবাবু বললেন, নিজেকে অতটা খরচ করার কোনো মানে হয়? লিখছ লেখো, তবে কম লেখা ভালো। শুধু একটা আরণ্যক বা একটা আউটসাইডার লিখেই ওইসব লেখকেরা স্মরণীয় হয়ে আছেন। বাকিগুলো না লিখলেও কিছু যেত-আসত না। মনে হল জিজ্ঞেস করি, বইপাড়ার পাবলিশারেরা কি সে কথা জানেন? বাকি লেখা তবে নতুন করে ছাপবার আর কী দরকার ছিল? অবশ্য মুখে কিছু বলিনি। কারণ যে বামে থাকে, প্রশ্ন না করে চিরকাল আমি তার।

তখন তো আমি তাঁর মতো জামা-প্যান্ট পরা শুরু করেছি। তাঁরই মতো চুরুট খাওয়াও ধরেছি। সামান্য ক'দিন হল তাঁর কাছে শিক্ষানবিশি শুরু করেছি। তিনি যা বলতেন তাই মাথা পেতে নিতাম।

বিষ্ণু বল আরও বললেন, তুমি ঠিক কি হতে চাইছ শুরুতেই স্থির করে নাও।

"আমি তো আপনার মতো হতে চাই," মুখ খুলে একথা বলবার সাহস হল না।

মাথা-নিচু মৌন আমাকে দেখে বিষ্ণু বল তাঁর বলায় বেশ জোর দিলেন, "ভালো করে লেখো। বুঝলে, লিখে যাও। লেখো, তোমার হবে।"

এতে আমার দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল। তবে এমন উপদেশ পেয়ে হাত আর কলম দুটোই হাত ব্রেক টেনে চালানো গাড়ি হয়ে স্লো মোশনে শোভাযাত্রায় বেরল। লিখতে বসে কলসির ভেতর উঁকিঝুঁকি মেরে দেখি। সঞ্চয় একেবারে তলানিতে ঠেকেছে। সব কথা তাঁর কাছে খুলে বলতাম। তিনিও নিনিষ্ট হয়ে সেসব শুনে নিদান দিতেন। বিষ্ণুবাবু বললেন, "শোনো বলি, শব্দ যদি কম পড়ে, কম কম খরচ করো। বাক্যগুলো ভেঙে সরল করো।"

আমার খাতার পাতায় ধ্যাবড়া পেটমোটা বাক্যেরা ওমনি লজ্জায় কালো হয়ে কুঁকড়ে ভেঙে এতটুকু এতটুকু হয়ে গেল। তিনি বললেন, "লেখার শরীরে গাদা গাদা যুক্তাক্ষর আর তৎসমের ভিড় পাবলিক অনেক চেখে দেখেছে। তাই এখন বাদ দেবে ওইসব চটপটা আওয়াজ। বাজার থেকে আইন করে রক্তচক্ষু শব্দবাজি তুলে নেওয়া হচ্ছে। সবুজ শব্দবাজির মতো নিরাপদ আইনসম্মত শব্দের রাস্তা তোমার খুঁজে নেওয়া চাই। রচনা ফুলঝুরি কিংবা রংমশালের মতো হওয়া উচিত। তৎসম নয়, দেশের মানুষকে সবুজ দেশজ আনন্দ সরবরাহ করবে।"

বিষ্ণুবাবু আমার দুঃখের কথা এতটা গভীরে গিয়ে ভাবতে পেরেছিলেন।

আমিও লেখাকে সবুজ করে তোলার জন্যে উঠেপড়ে লাগলাম।

এদিকে লেখা নিয়ে তাঁর সঙ্গে আমার কচ্ছপ খরগোসের সবুজ দৌড় শুরু হয়ে গেল। আমি একশো লিখি তো তিনি পাঁচশো লেখেন। আমি দুশো লিখলে তিনি হাজার। হাজারে-বিজারে তিনি লেখাকে জড়িয়ে ধরেন।

গল্পের খরগোস যেমন শুনেছি, রাস্তার মোড়ে মোড়ে মেয়ে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। আর সেই ফাঁকে কচ্ছপ কেল্লা মেরে আগে চলে যায়। অথচ এখনে খরগোস দৌড়ল তো দৌড়ল। কচ্ছপ পিছিয়ে পড়ল তো পড়ল। কফিখানায় শুঁড়িখানায় দোচালায় আটচালায় মাচা-সাহিত্যে সাঁচা-সাহিত্যে সর্বত্র শ্রী বিষ্ণু বল খরগোস হয়ে আগে চললেন।

দু-চার বছর এমনি কাটল। ক'বছরের অক্লান্ত চেষ্টায় কায়ক্লেশে ঘেমে-নেয়ে আমার একখানা বই বেরল। সাত হাজার ছশো ন-টাকা খরচ হল তাতে। একটু কম-বেশিও হতে পারে। এইরকম সময় পাশের বাড়ির রিমঝিমের কাকা বাঁকাদা আমাকে তার ব্যবসার পার্টনার করবে বলে প্রস্তাব দিল। বললে, "শুধু লেখালেখি করলেই হবে? তোকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।" রিমঝিমও কাকার কথায় ভারি খুশি। সে সময়ে রিমঝিমের ব্যাপারে আমার ক্রাশ ছিল।

সে বললে, "কাকার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাও। ব্যবসার কাজে বাড়িতে যাতায়াতের রাস্তা খুলে গেল। এবার আমাদের লাইন ক্লিয়ার।"

শুধু তার স্বার্থেই আনি নিমরাজি হই। নিজের পায়ে দাঁড়াব বলে ভোররাতে ঘুম থেকে উঠে সাড়ে-তিনটের ফার্স্ট বাস ধরে বাঁকাদার পেছন পেছন সুন্দরবনের ভেড়ি এলাকায় চলে গেলাম। রিমঝিম তার শোবার ঘরের জানলা একটুকু ফাঁক করে ঘুমচোখে হাত নেড়ে বিদায় জানাল।

এখানে লিখতেই পারতাম, রিমঝিমকে দেখলেই আমার শরীর ঝিমঝিম করে। কিন্তু বিষ্ণু বল আমায় পইপই করে সাবধান করেছিলেন, "লেখায় লঘু রসিকতা প্রয়োগের লোভ সম্বরণ করবে। ছ্যাবলা-হাবলা লঘু মিল সর্বদা পরিত্যাজ্য। এসব দেখলে বোকান্যাকা জনগণ বাহবা দেবে ঠিকই। তারপর তারা তোমাকে ভুলে যাবে।"

আমার কিন্তু সত্যি সত্যি শরীর কেমন করত। তবু লেখা যাবে না, তাই সেসব কথা এখানে আর লিখলাম না।

ভোররাতে কচি-হাতি টেম্পো করে ভেড়ির মাছ এনে বংশী মিত্তিরের বাজারে উগরে দিয়ে হাতে কাঁচা টাকা পেতাম। কেমন যেন ঘোর লেগে গেল। তবে আমিও বিষ্ণু বামের চেলা, বাম নয় 'বল'। তার সঙ্গে কফিহাউসের এক-টেবিলে বসে চিংড়ির কাটলেট ওড়াই। সেই আমি বংশীবাবুর বাজারে চিংড়ি বেচি কেমন করে? কেউ দেখে ফেললে কি বলবে।

কেউ দেখেনি। অথচ বিষ্ণুবাবু স্বয়ং একদিন বললেন, "তোমার জামা-কাপড় থেকে কেমন যেন মাছের গন্ধ ছাড়ছে। লেখালেখি ছেড়ে আজকাল কি বিয়েবাড়ির ক্যাটারিং-এ হাত পাকাচ্ছ?"

ভারী অস্বস্তিতে পড়ে বাঁকাদার সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ত্যাগ করলাম। বাঁকাদা আমার ব্যবহারে অসন্তুষ্ট হলেন। রিমঝিমদের বাড়ি আমার জন্যে নিষিদ্ধ পাড়া হয়ে গেল। নিষিদ্ধ ঘোষণা হতে সে পাড়ার প্রতি আকর্ষণ আরও বাড়ল। তবে বিষ্ণু বল সব শুনে বললেন, "ও পাড়ায় বেশি ঘোরাফেরা ভালো নয়। মন দিয়ে লিখে যাও।"

মনে খুব দুঃখু হল। ক'দিন মাছের ব্যবসা আর রিমঝিম নিয়ে ভালোই কাটছিল। লেখালেখি দূরে চলে গিয়েছিল। আজ হঠাৎ চারদিক শূন্য মনে হল। শূন্য মনে শান্তি আর আরাম পেতে ইচ্ছে হয়। শান্তি কোথাও নেই। পাশের বাড়ির পিসিমার নাম শান্তি রাখা হয়েছিল, সেও যাট সত্তর বছর আগে। শান্তি পিসিমা নাকি বাবার সঙ্গে ছাদের আলসেতে বসে পা দোলাতে দোলাতে মোগল ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতেন। বাবা তো ইতিহাসে খুব ভালো ছিলেন। তবে পরে কর্পোরেশনের চাকরিতে ঢুকে মাথা থেকে ইতিহাসচেতনা হলকে পড়ে যায়। বাবা জীবনে কোনোদিক দিয়েই শান্তি পাননি। শান্তি পিসিকে কে পেয়েছিল কে জানে। আমাদের জন্যে শান্তি এখন দক্ষিনারঞ্জনের রূপকথায় ঢুকে গেছে। দক্ষিণারঞ্জন মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে সোজা কফিহাউসে চলে গেলাম। সেখানে গেলেই পুরনো বন্ধুদের কাউকে না কাউকে পেয়ে যাব। হয়তো তারাও সেখানে শান্তির আশায় প্রতিদিন গাঁদি পাকিয়ে বসে থাকে।

নিজের দুঃখ ভুলব বলে এইসব দুঃখভরা মুখগুলোর পাশে বসে পড়ি। যখন প্রথম এ জায়গাটায় যাতায়াত শুরু হয়, একজন একেবারে কানের কাছে চাপা স্বরে বলেছিল, "কিসের এত কষ্ট? তোমাকেই প্রথম বলছি, বোলো না কাউকে। এরা সারাদিন তাপেক্ষায় থাকে। পকেটে লেখালেখি ভরা থাকে। মুখগুলো দেখ, এক-একটা যেন বন্দুকের নল। ওরা বিশ্বাস করে, পকেটে বারুদভরা কার্তুজ রয়েছে।"

"বাবদ কেন? অপেক্ষাই বা কিসের?"

সে বলল, "তাদের বিশ্বাস, একদিন ঠিক কেউ এসে লাল-নীল মারুতি ভ্যানে তাদের নড়া ধরে ঠেসে তুলে নিয়ে যাবে। তারা হতে পারে কোনো বড় মাসিক-এর মেসে সম্পাদক। হতে পারে কোনো মেজো সাপ্তাহিকের অবসরপ্রাপ্ত পরামর্শদাতা। তারপর একদিন সেখানে তারা নতুন করে শুরু করবে। দৈনিকে সাপ্তাহিকে মাসিকে এইসব লেখকেরা বারুদ নিয়ে ছড়িয়ে পড়বে।"

আমি বলেছিলাম, "পুরোটা একটা গুপ্ত রোগের মতো শোনাচ্ছে। গোপন সন্ত্রাসবাদীরা শুনেছি এমনই হয়।"

গোবিন্দ গুড় কফিহাউসের পুরনো বন্ধু। কবে থেকে আলাপ হল ভুলে গেছি। কফিহাউস এমন জায়গা যেখানে আলাপের প্রথম দিন মনে রাখা যায় না। তবে 'কাতলা' নামের একজনের পেছনে লাগতে লাগতে সে বিখ্যাত হয়েছিল। কাতলার আসল নাম কী? নামের আবার আসল-নকল কী? কেউ বলেছিল, কাতলা নামের স্টিকার পিঠে লাগিয়ে কাতলার জন্ম হয়। কাতলা কফি হাউসে ঢুকলেই গোবিন্দ 'কাতলা' 'কাতলা' বলে চেঁচিয়ে উঠত। গোবিন্দর গলা শুনে বাকিরাও 'কাতলা' 'কাতলা' বলে হাততালি দিত। তখন শুরু হতো কাতলার সঙ্গে গোবিন্দর চোর-পুলিশ খেলা। কফিহাউস জুড়ে টেবিলগুলোর ফাঁক-ফোকর দিয়ে দুজনে দৌড়ত। কারো কাপ উলটে যেত। কারোর আধ-খাওয়া মোগলাই হাত ফসকে অন্যের প্লেটে গিয়ে পড়ত। মোগলাই হারিয়ে সেই লোকটা গজগজ করতে করতে কফিহাউস থেকে বেরিয়ে যেত। একসময় দেখতাম কাতলা আর গোবিন্দ ভাগাভাগি করে প্লেটে ঢেলে ঢেলে কফি খাচ্ছে।

কাতলা ভালো কবিতা লিখত। একসময় বিরক্ত হয়ে কাতলার বদলে, অন্য কি একটা নাম নিয়েছিল। তবু তার কবিতার নিচে সেই নাম কেউ ছাপল না। সকলে বলল, নাম পালটে দিলে তার লেখা কেউ চিনতে পারবে না। কাতলা নামের দ্যুতি চারিদিকে এতটা ছড়িয়েছিল যে কবিতা তাতে চাপা পড়ে যায়। লোকে বলে সে কারণেই কাতলার কবি হওয়া হল না।

এদিকে গোবিন্দ গুড় আর কিছু হতে না পেরে শেষ পর্যন্ত লেখক হয়ে গেল। তার এগোনোর শৈলী অনেকটা কচ্ছপের মতো লাগত। কখনো তুরতুর করে এগোত। তারপর দুম করে থেমে যেত। কিছুদিন গোবিন্দ যে বেঁচে আছে তাই বোঝা যেত না। কফিহাউসে আমাদের পরের পরের ব্যাচ এমনও বলতে পারত, কে গোবিন্দ? তাতে অবশ্য গোবিন্দর কিছু এসে যেত না। তার ঠিক পরের ব্যাচের তারাও রুমালে চোখ মুছে বলত, গোবিন্দটা ছিল।

তবে প্রতি বছরই বরাদ্দের শীতঘুম থেকে ফিরে এলে তাকে হঠাৎ চোখে পড়ে যেত। সকলে দেখত, গোবিন্দ হাঁটতে শুরু করেছে। সে আবার বেশ লিখতে শুরু করেছে। সেসব লেখা গোবিন্দ নিজে আমাকে পাঠিয়ে দিত। এ সময়ে আমাদের ঘনিষ্ঠতা আবার জমে জেলি হয়ে যেত।

এমন এক পর্যয়ে গোবিন্দ একদিন ডিজ্ঞেস করলে, "বিষ্ণু বলের নতুন উপন্যাস 'বিপ্লবের আগাপাশতলা' পড়েছিস?"

উৎসাহ দেখিয়ে বললাম, “বিষ্ণু বলের যে কোনো লেখার আগাপাশতলা আমার পড়া।”

শুনে গোবিন্দ মুচকে হাসল।

তারপর আমরা একে অন্যের কথায় হেসে গেলাম। যে যার মতো ভেসে গেলাম।

পরের দিন গোবিন্দ আবার হারিয়ে গেল।

তখন গরমের সবে মুখপাত। কলকাতার রাস্তায় পিচ এবার গলবে গলবে ভাব হয়েছে। প্রতিদিন কলায় কলায় কফিহাউসের টেবিল ফাঁকা হচ্ছে। আর কয়েকমাস পরে পুজো। দরখাস্ত দাখিল না করেই কফিহাউসের কবি ও লেখকেরা হঠাৎ ছুটিতে গেলেন। এতবড় অপেক্ষার দালান একেবারে ফাঁকা হয়ে গেল। বেয়ারারা এইসব অনুপস্থিতি ভারী ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখতেন। এমন আলগা সময় হাতে পেয়ে টেবিলে পাগড়ি নামিয়ে তার মাথায় তালপাতার বাতাস লাগাতেন।

যারা ছুটিতে গেল, তারা ঘরে বসে লিখছিল। এই দলে গোপনে গোবিন্দ ছিল। সে নাকি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। তার দরজা-জানলা বন্ধ ছিল। গোবিন্দ কবিতা লিখেছিল বইশা, ছোট বড় মিলিয়ে গোটা বোলো গল্প; আরোও ছোট গল্পটল্প ছিল খান পঁচিশেক। তার লেখার ভার ক্রমশ বাড়তে থাকায় বড় গল্পের দু-চারটেকে নাতিদীর্ঘ উপন্যাসে উতরে দিতে হয়েছিল।

তাঁর হাতে সময়ের বড় অভাবের দিন ছিল সেটা। খাবার সময় ছিল না, শোবার সময় ছিল না, প্রাতঃকৃত্যের সময় ছিল না। সে এটা করতে করতে লিখত, ওটা করতে করতে লিখত, সেটা করতে করতেও লিখত। তাই লেখার মধ্যে এটা-ওটা-সেটা ঢুকে পড়ে লেখা থেকে বিশ্বমানের মশলাদার খুশবু বেরত।

এই সময়টা বন্ধ জানলা একটুকু ফাঁক করে নিজের লেখা গোবিন্দ বাইরে উড়িয়ে দিত। গ্রাম মফস্বল দেশ শহর, প্রায় ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে লেখারা ঘুরে ঘুরে উড়ে বেড়াত। ফেসবুক নামে বাইরের ঘরের সোফায় বসে এত কিছু জানতে পারতাম। সে জায়গাটায় ইচ্ছে হলেই আমরা তো ঘরের কথাটথা হামেশাই ফাঁস করে দিই।

পুজোর পারণ ভঙ্গ হলে সকলের মতো গোবিন্দও বাইরে এল। দেখলাম ও কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।

গোবিন্দ বলল, "তোর বিষ্ণু বল এ বছর অনেক লিখেছে। তুই কি করলি বল?"

আমি বললাম, "আমার শীত কিংবা গরম কিছুই লাগে না। পুজো-বিসর্জনও লাগে না। তোদের মতো কারণে-অকারণে গোপনেও যেতে পারি না।"

"টিকে থাকতে গেলে গোপনে না গেলে তোকে ক্রমাগত লিখে যেতে হবে।"

কেমন করে কী করি বুঝে উঠতে না পেরে বললাম, "আমি তো এমনই আছি। হয়তো থেকেও যাব আরো কিছুকাল।"

এমন সময় বাজারে শীতের গাজর উঠল। শরীর সচেতন ছেলে-বুড়ো গাজরের চোদ্দোরকম মন দিয়ে খাওয়া শুরু করলেন। আর, সকলের কাছের মানুষ জনার্দন সেনাপতি এ বছরের সেরা লেখাটা লিখে ফেলেছেন বলে লোকমুখে বাজার গুলিয়ে উঠল।

গোবিন্দ জানতে চাইল, "জনার্দনের সঙ্গে তোর আলাপ আছে?"

"আমি জনার্দনকে চিনি না।"

"চিনি না বললে তো হবে না। যদি না চিনিস তুই জনার্দনের বাড়ি চলে যা। সঙ্গে একগোছা ফুল আর একহাঁড়ি রসমালাই নিবি। তাকে বলবি তার লেখা তোর ভালো লেগেছে।"

"জনার্দনের লেখা আমি পড়িনি।"

গোবিন্দ বলল, "তোর এত দেমাক কিসের? বিষ্ণু বলের শিষ্য হতে পারিস। জনার্দনও ফেলনা নয়। যেতে না পারিস যাবি না।"

"আমার কাছে জনার্দনের কথা যত কম বলিস ততই ভালো।"

"ইচ্ছে না হয়, যাবি না তার বাড়ি। ফেসবুকে জনার্দনের একটা ফ্যান একাউন্ট রয়েছে। সেখানে ঢুকে পড়। সকালে বিকেলে সেখানে আত্ম-বিজ্ঞাপনের পশরা সাজানো হয়। ভুরি ভুরি লাইকের ছররা ছুড়তে থাকে উন্মাদ ফ্যান-ফলোয়ারের দল। তুইও লাইক ছুঁড়ে দে। বিটলভাই-বিপ্রদাসের মালাই চমচমের মতো গলে গিয়ে জনার্দনের সুড়সুড়ির পূর্ণকুম্ভে খানিকটা মালিশ ঢেলে দে।"

"তুই এখন যা।"

ঘাড় ধরে না তাড়ালেও, কথা না বাড়িয়ে গোবিন্দ চলে গেল। আমার কথায় গোবিন্দ একটুও খুশি হয়নি। দু'চার দিনের মধ্যে সে রটিয়ে দিল, "বিষ্ণু বল ছাড়া ছবিনাথ আর কারো লেখা পড়ে না।"

"গোবিন্দ এটা তুই কী করলি?"

সে বলল, "বিষ্ণু বলের সঙ্গে তুই পনের বছর ছায়ার মতো লেগে আছিস। আর কারো লেখা পড়বি কখন? আর কারোকে জানবার তোর সময় নেই। তোর লেখার ওপর এখন বিষ্ণু বলের ছায়া লেগে গেছে।"

"কী করে বুঝলি বল?"

"সকলে তাই বলছে।"

গোবিন্দ কখন 'সকলে' হয়ে গেল। দরকারে সকলেই আবার গোবিন্দ হয়ে যাবে।

"তোর লেখা বাক্যগুলো বিষ্ণু বলের মতো হয়ে যায়। সে যেখানে কমা দেবে সেখানে তুইও দিবি। সে থামতে বললে, তুইও বাক্যকে দাঁড়ি টেনে থামাবি।"

এত বলেও গোবিন্দ থামল না। বলল, "এত কথা বলতাম না। কিন্তু ছায়া যখন চরিত্র হয়ে উঠল, তখন সকলে বলা শুরু করল। তাই আমিও বললাম।"

জিজ্ঞেস করলাম, "যদি আমি জনার্দনের লেখা পড়তে পারতাম?"

"তাহলে তোর ওপর জনার্দনের ছায়া পড়ত। তখন তুই জনার্দনের মতে লিখতিস।"

"তখন সকলে কী বলত?"

"কিছু বলত না। তখন লোকে তোকে সমঝে চলত।"

"আর জনার্দনের ছায়ার কী হবে?"

"জনার্দন বিষ্ণু বল নয়। জনার্দনের লেখা ছায়ার ছায়া, তার ছায়া। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে যাওয়া ধারাবাহিকতা সেখানে। তা হল ছল-সাহিত্যের মতো বিশেষত্বহীন ও নির্গুণ, তরলের তরল, প্রয়োজনে আরও স্বচ্ছ তারল্য তার, কোনো কোনো অষুধের মতো, লাগাতে পারলে লেগে যায়। সে সকলের মতো লেখে। লেখালেখি অমনই হওয়া উচিত বলে অমনই তো লেখা হয়। লিখতে লিখতে সে লাগিয়ে দিয়েছে। এখন বৃন্দগানের ধুয়োর মতো যদি সকলে তাকে অনুসরণ করে লেখে, তবে সকলেই পরম্পরার স্বপক্ষে রয়েছে। এতে কোনো কথা হবে না। সাহিত্য দৌড়বে।"

আমার রাগ হচ্ছিল। ভাবে কী ও আমায়? মুদিখানার খাতা লেখার তরিকা শিখিয়ে গোবিন্দ জিতে যাবে?

সেই প্রথম বিষ্ণু বলকে এড়িয়ে গেলাম। আজকাল তেমন আর কফিহাউসে যান না। তাঁকে এড়িয়ে থাকা যাবে ভেবে কফিখানাতেই ঢুকে গেলাম।

আজ গোবিন্দ নেই। তবে চেনা মুখ অনেক রয়েছে। একদল চেনামুখের পাশে গিয়ে বসে পড়ি। তারা নিজেদের মধ্যে কী একটা বিষয় নিয়ে কথা বলছিল। তাদের বিষয়ের ভেতর ঢুকতে চাইলাম। তারা নিজেদের বিষয় খুলে আমাকে নিল না। কিছু পরে পাশের টেবিলে ঢুকে পড়ি। সেখানে মাথা কেন, নাকটুকুও গলানো গেল না। ক্রমাগত অন্য অন্য টেবিলের দিকে সরে যাই। গ্লাসের পর গ্লাস জল খেয়ে পেট ফুলে ওঠে। একসময় দেখি প্রতিটি টেবিলেই গোবিন্দ বসে আছে। এত গোবিন্দ কোথা থেকে এল? তাদের একজনও আমার দিকে ফিরে তাকাল না।

এত ঝড়ঝাপটা সহ্য করে কিভাবে বাঁচা যায়। নতুন কোনো রাস্তা খুঁজছিলাম। সাহিত্যে মহামারী মাঝেমাঝেই ফিরে আসে। আমাদের পাঠকেরা সেসব দিনে বুঝতেও পারেন না কতখানি মারী ও মড়কের সঙ্গে তাঁরা ঘর করেন। কিন্তু হঠাৎ একদিন দেশের আলানে-বালানে মানুষের শরীরে অন্য এক মহামারী অতর্কিতে হানা দিল। আচমকা অদৃশ্য এক পোকার আক্রমণে বিষ্ণু বল মারা গেলেন।

মারা যাবার আগে টানা সাত দিন সাদা ব্যান্ডেজে মুড়ে লেখককে বিছানায় ফেলে রাখা হয়। অতবড় লেখককে এমন অবস্থায় দেখা বেশ কষ্টের। ডাক্তারের পরামর্শমতো আর কোনো লেখককে তাঁর কাছে ঘেঁষতে দেওয়া বারণ ছিল। অসুখটা নাকি বেছে বেছে তাদেরও শরীরে সংক্রামক হয়ে জাপটে ধরছিল। তবে তিনি বেছে বেছে ফোন ধরছিলেন। এসব কারণে তাঁকে এ অবস্থায় ফোনে পেয়ে যাই।

হাসপাতাল থেকে দেওয়া প্রাতরাশে তখন কাটলেট খাচ্ছিলেন।

বললেন, "এটাই হয়তো আমার জীবনের শেষ কাটলেট।"

তিনি জানতেন না আমাকে বলা ওই কথাগুলো অন্য কারো কাছে তাঁর শেষ কিছু বলা। পরে মনে হয়েছে সেদিনের সেসব কথা সত্যিই শেষ বাণীর মতো শুনিয়েছিল।

বলেছিলেন, "অসুখের যদি কোন অবয়ব থাকে, তবে তা মোটেই সুশ্রী হতে পারে না। এখানে হাসপাতালের নার্সেরা আমার অসুখ বাড়িয়ে তুলেছে। বয়সের কারণে তাদের সকলকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো উচিত।"

বলেছিলেন, "ভালো লেখা দুপুরবেলার সূর্যের মতো মাথার একেবারে ওপরে থাকে। তার ছায়া হয় না। কোনকিছুর ওপর তার ছায়া পড়ে না। তাই তাকে নকল করাও যায় না।"

তাঁর শেষ কথা ছিল, "আমি সারাজীবন চিংড়ি খাওয়া পছন্দ করেছি। আমার পছন্দ ছিল বাগদা, তোমার পছন্দ তাই অবধারিত গলদার দিকে ঝুঁকে গেছে। আমাদের মিল এখানে, আমাদের তফাতও এই জায়গায়।"

তাঁর মৃত্যুপত্র আমি দেখেছি। কারণ হিসেবে সেখানে হৃদযন্ত্র বিকল হওয়ার কথা লেখা আছে। দু'একজন অনুরাগী সেই মৃত্যুর সুযোগে ক'দিন গলায় কাছা ধারণ করে ঘুরে বেড়াল।

এতে আরও একা হয়ে গেলাম। লেখালেখি বন্ধ হবার উপক্রম হল। তবে চিংড়ির কাটলেট খাওয়া চালিয়ে যাচ্ছিলাম। এটুকু আনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করার কোনো মানে হয় না।

প্রকাশক একদিন আমায় ডেকে পাঠালেন। তাঁর সামনে কয়েকটা রোগাসোগা বইয়ের কয়েকশো কপি জড়োসড়ো হয়ে পড়ে ছিল। বইগুলো আমিই লিখেছিলাম।

প্রকাশক বললেন, "একটা বইও বিক্রি হল না। আর রাখবার জায়গা নেই। এদের আপনি নিয়ে যান।"

'আমি বললাম, "তাকিয়ে দেখুন। বইগুলো আপনার কাছে আরও ভালোবাসা পাবে বলে কেমন উৎগ্রীব হয়ে রয়েছে।"

বলবার মতো আর কোনো বিষয় ছিল না।

আমার কথা শুনে প্রকাশকের কপালে বিরক্তির ঘাম ফুটে বেরল। তিনি বললেন, "এভাবে ভাবার কোনো কারণ নেই। আগে বই আমাকে জাগিয়ে রাখত। তখন জেগে থাকবার জন্যে বই পড়তাম। আজকাল বই হাতে নিলেই ঘুমিয়ে পড়ি। তাই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছি। বুঝতে পারছেন কেন আপনার বইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক তৈরি হয়নি।"

চমকে উঠিনি বলে কথার পিঠেই সে কথার উত্তর দিলাম, "সকলেই জানে সেসব। গোপনতা হারিয়ে যে কোনো কথা আজকাল বাতাসে উড়ে বেড়ায়।"

প্রকাশক একতরফা বলে যেতে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি বললেন, "আপনার বইগুলো আপনার লেখা নয়।"

এবার আমাকে চমকে উঠতে হল।

তিনি বললেন, "একটা কথাও আমার নয়। গোবিন্দ বলেছে।"

"গোবিন্দ এখানেও পৌঁছে গেছে?"

"একা গোবিন্দ নয়। সে একটা সংগঠন তৈরি করেছে। সেখানে সকলের নামই গোবিন্দ। তারা সকলেই এককথা একইরকমে বলে।"

এতগুলো গোবিন্দের সামনে আমি একা। সামনে পড়ে থাকা কয়েকশো বই তুলে নিয়ে যেতে হবে। প্রকাশকের কথার ভেতর লেখার সঙ্গে সঙ্গে যেন নিজেকেও লুকিয়ে ফেলার নির্দেশ ছিল।

যতক্ষণ না বইগুলো প্রকাশকের সামনে থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ তিনি বলে যাবেন বলে স্থির করেছিলেন। "বিষ্ণু বলের লেখার ছায়া আপনার লেখার শরীরে ঢুকে গেছে। আগে জানতাম আপনি তার মতো চুল আঁচড়ান, তার মতো পোশাক পরেন; চিংড়ির কাটলেট তার মতোই আপনারও প্রিয় খাবার। জানতাম না এর পরেও তার লেখা ছায়া হয়ে আপনার লেখাকে খেয়ে ফেলেছে। যতদিন মানুষের মনে বিষ্ণু বলের লেখা জেগে থাকবে ততদিন আপনার লেখালেখির আর কোনো মানে হয় না।"

এতগুলো বই তাঁর সামনে থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব মনে হচ্ছিল। কিভাবে এর প্রতিবাদ করব ভাবছিলাম। ভেতরে ভেতরে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় শরীর আরও দুর্বল লাগছিল।

'বিষ্ণু বলের লেখা থেকে তিনটে জায়গার উল্লেখ করুন।" এবার বেশ জোর দিয়ে তাঁকে বলি। শেষ চেষ্টা করে দেখতে চাইছিলাম। "এমন তিনটে জায়গার কথা বলুন, যা ছায়া হয়ে আমার লেখায় লুকিয়ে রয়েছে।"

"ছায়াও বলা চলে না, একেবারে একই, সমরূপ। দুজনের লেখায়ই দেখা যাবে নায়করা সিঁড়ির তলায় নায়িকাকে চুমু খাচ্ছে। দুজনের রচনায় কোনো না কোনো চরিত্র আকাশে উড়ে যাচ্ছে। তারা পরে ফিরে আসে কিনা, দুজনে কোথাও সেসব পরিষ্কার করেননি।" বলবার সময় তিনি আমার চোখের দিকে না তাকিয়ে হাতের ফাইলের মধ্যে কী খুঁজছিলেন।

তিনি থেমে গেলেন। আমিও ভেবে নিশ্চিন্ত হলাম যে তৃতীয় কোনো নমুনা এখনও তাঁর হাতে পৌঁছয়নি। কিন্তু আমাকে ভুল প্রমাণ করে তিনি বলে উঠলেন, "এসব কথা আমার নিজের নয়। গোবিন্দরা আমাকে জানিয়েছে। আর গোবিন্দরা যা বলে ঠিক বলে। আজকের দিনে গোবিন্দদের হাতেই সাহিত্য বেঁচে রয়েছে। তৃতীয় কথাটি হল, দুজনের লেখাতেই নায়কেরা কোনো না কোনো পরিস্থিতিতে শারীরিকভাবে বামন হয়ে গেছে।"

আমার একটু অভিমান হল। সেটা গোবিন্দ কিংবা বিষ্ণু বল, নাকি প্রকাশক ভদ্রলোকের ওপর, তা বলতে পারি না।

তিনি বললেন, "তিনটে মাত্র উদাহরণের কথা জানতে চেয়েছেন। আমি আরও অনেক বলতে পারি। তবে এতেই যা প্রমাণ হবার হয়েছে।"

"আপনি জনার্দন সেনাপতির লেখা পড়েছেন?"

"আমার কথা তো আগেই বলেছি। আমি পড়ি না। শুনেছি জনার্দনের লেখায় আলাদা করে কোনো একজনের ছায়া নেই। সে বিশেষ কোনো ছায়ার তোয়াক্কা করে না। তার লেখা বই দিশি ফুলকপির মতো ধ্রুপদী। হাজার বছরের পরম্পরা মেনে জনার্দন কাজ করে। যারা এগুলো নিয়ে সত্যিই ভাবে তাদের জন্যে জনার্দনের লেখা আলাদা করে পড়বারও দরকার হয় না। দেশের নব্বইভাগ বইয়ের আলমারিতে তার বই সাজানো থাকে। তবে বিষ্ণু বলের মতো তিনদিনের ক্রান্তিকারী নিয়ে আলোচনার জায়গা এটা নয়।"

শেষের দিকে তাঁর বলা কথায় উত্তেজনা অনেকটা জুড়িয়ে এসেছিল। মুখের ভাব দেখে মনে হচ্ছিল আমাদের বহুদিনের সম্পর্ক এখনও পুরোপুরি নষ্ট হয়নি।

তিনি বললেন, "গোবিন্দকে যতটা হৃদয়হীন ভাবছেন, সে কিন্তু তা নয়। আমাকেও তেমন কিছু ভেবে নেবেন না। আপনি যাতে নতুন করে শুরু করতে পারেন, তা নিয়ে আমরা অনেক ভেবেছি। নিজেদের মধ্যে বিস্তর আলোচনা করেছি।"

যে কোনো অন্ধকারের সুড়ঙ্গ দিয়ে কিছুটা এগোলে আধখানা পাকা করমচার মতো সূর্যের লালচে আলো ছড়িয়ে পড়ে।

তিনি গোবিন্দকে ডেকে পাঠালেন।

আমি বললাম, "আহা, এসবের কী দরকার ছিল। আমি জানি, গোবিন্দ এখন সবে ঘুমিয়েছে।"

যা ভেবেছি, ঠিক তাই। চোখ রগড়াতে রগড়াতে গোবিন্দ এল।

তার কথায় তাকে বেশ আন্তরিক মনে হল। বলল, "এসব নিয়ে ছবিনাথ, একদম চিন্তা করিস না। আমরা একটা কমিশন গঠন করেছি। তিনজনের কমিশনে আমি আর প্রকাশক স্যার ছাড়াও সবার প্রিয় মানময়ীদি রয়েছেন।

"মানময়ীদি কেন?"

"তোকে একটা সুযোগ দেব বলে ভেবেছি। এরকম পরিস্থিতিতে তাঁকে বাদ দিয়ে আর কার কথা ভাবব?"

"মানময়ীদি একটা মেয়েদের স্কুল চালান বলে জানতাম।"

"শুধু মেয়ে কেন, মেয়েরা থাকলেই সেখানে ছেলেরাও জুটে যায়। তাই ছেলেদের সমস্যা নিয়েও তাঁর অভিজ্ঞতা অগাধ।" গোবিন্দ আমাকে আশ্বস্ত করতে চাইল। - "তবে স্কুলে কী একটা গুঁড়ো দুধ কেলেঙ্কারি ঘটায়, স্কুলের পরিচালনা বর্তমানে প্রশাসকের হাতে নাস্ত হয়েছে। আর তিনিও সাময়িক অব্যহতি পেয়েছেন। তাঁর চেয়ে যোগ্য মানুষ আর কে হতে পারে। সম্প্রতি তিনি সাহিত্যে সরস্বতী উপাধিও পেয়ে গেছেন।"

আমার মুখ দিয়ে বেরোল," তবে তো হয়েই গেল।"

পরীক্ষার দিন তারা তিনজন আমার বাড়ি এল। তাদের অভিপ্রায়ের এই মানবিক দিকের প্রশংসা না করে পারা যায় না। নিজের লেখা কবিতা পাঠ করে মানময়ীদি কমিশনের কাজ শুরু করলেন। বাকি দু'জন হাততালি দিল। আমাকে বলা হল, "তোমার পক্ষে বিষ্ণু বলকে বাদ দেওয়া সহজ নয়। তবু আশা রাখি, আশা কখনো ফুরোয় না। আমাদের হাতে এক ঘণ্টা সময় রয়েছে। এই সময়ের ভেতর তুমি বিষ্ণু-টিষ্ণু ভুলে গিয়ে একপাতা নিজের মতো করে রচনা লেখো। ছোটবেলা থেকে অনেকবার লিখেছ। তাই তোমাকে বিষয় দেওয়া হল 'গরু'। আমরা বিশ্বাস করি, বিষ্ণু বলের গরুর থেকে তোমার গরু আলাদা হবে। তোমার সময় শুরু হচ্ছে এখন।"

উত্তর পত্র হাতে ধরিয়ে তারা তিনজনে পাশের ঘরে চলে গেল। এক ঘন্টা সময় দেওয়া হয়েছে। কুলকুল করে ঘামছিলাম। আমি কি পারব? বিষ্ণু বল আজ নেই। কিন্তু তাঁর ছবি এখনো ঘরের দেয়ালে ঝুলছে। ঝুলে ঝুলেও তিনি আমার ওপর কড়া নজরদারি করে চলেছেন।

রিমঝিমও আমার জীবন থেকে এমনি একটা দুর্বল পেরেকে লটকে আছে। এতদিন যাও বা ভেবেছিলাম, একদিন হবে। একদিন বইয়ের পাহাড় ঠিক বিক্রি হয়ে মাটিতে মিশে যাবে। চারিদিকে অনথিভুক্ত ঠিকেদারের দল কতরকমে পাহাড় কেটে সাফ করে দিচ্ছে। আর প্রকাশক পারবে না? এমন কিছু ঘটে গেলেই রিমঝিমের পেছনে পেছনে তার বাবা পর্যন্ত হলুদ গাঁদার মালা হাতে আমাদের বাড়ি ছুটে আসবে।

আঁকশির মতো ওই একপাতা গরুর রচনায় লেগে, আমার ভবিষ্যৎ কোনোরকমে ঝুলছে। আজ না পারলে ফাঁসি যাওয়া আসামি ছবিনাথ লালার নাম কাল ইতিহাস থেকে মুছে যাবে।

টেবিলে অনেক নুড়িপাথর পড়ে আছে। সেগুলো পেপারওয়েট হিসেবে ব্যবহার করি। অনেকে বলে, ওগুলো পাথর নয়, শালগ্রাম শিলা। শুভ কাজে শালগ্রাম শুভ বার্তা বয়ে আনে। এক টুকরো শালগ্রাম উত্তর পত্রের ওপর চাপা দিয়ে পাশের কলঘরে স্নান করতে গেলাম। অনেকটা দুশ্চিন্তা অনেক দুর্ভাবনা জলের সঙ্গে শরীর বেয়ে নেমে গেল।

তাড়াতাড়ি বাইরে এসে টেবিলে বসি। হাতের সময় দ্রুত কমছে।

টেবিলের ওপর তাকিয়ে চমকে উঠলাম। সেখানে গরুর রচনা লেখা এরমধ্যেই শেষ।

কে লিখে গেল? সামান্য আট-দশটা লাইন। অথচ অক্ষরের ভেতর থেকে সচল একটা গরুর চেহারা ল্যাজ নেড়ে বেরিয়ে আসবে বলে খুঁটি ওপড়ানোর উপক্রম করছে। এমন এলেমদার গরু কে এখানে রেখে গেল?

দেয়ালে বিষ্ণু বলের ছবি মিটমিট করে তারাদের মতো খিল্লি ছুঁড়ছিল।

পাশের ঘর থেকে তিনজন ভরপেট কথা নিয়ে, বলবে বলে দৌড়ে এল। গরু ততক্ষণে উত্তরের পত্র বটপাতা ভেবে চিবিয়ে খেয়ে জাবর কাটতে শুরু করেছে।

এবার সে ঘুরে দাঁড়াল। তিনজনই তার শিংয়ের নাগালে।

কিছু বলবে কী, এইসব দেখেশুনে বরাত পাওয়া তিন বিচারকের দু-পাটি করে ধারাল দন্তমালা, চোখের সামনে ঝুরঝুর করে খসে পড়ল। ·