এমনটা এই প্রথম হচ্ছে তা নয়। এর আগেও দুবার হয়েছে। কেন আমার এমন হচ্ছে জানি না। তবে শেলী থাকতে এমনটা কোনও দিনও হয়নি। শেলী চলে যাওয়ার পর...

প্রথমবার যখন হল আমি তখন আমাদের আবাসনের ভেতরে। বাচ্ছাদের খেলার একটা সাজানো ছোট্ট পার্কের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন দিনের আলো কমে গেছে। বাচ্চারাও অনেক ছুটোছুটি খেলাধুলা করে যে-যার নিজের ঘরে ফিরে গেছে। তেমন কেউ ছিল না যে দেখতে পাবে।

দ্বিতীয়বার যখন হল তখন দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারতো, যদি-না দলজিত কৌর জাপটে ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে আমাকে সরিয়ে নিত। সরিয়ে নেওয়ার ঠিক পরের মুহূর্তেই তীব্র হর্ন বাজিয়ে একটা বড় রাক্ষুসে ট্রাক উত্তর থেকে দক্ষিণের দিকে সাঁ সাঁ করে চলে গিয়েছিল। হ্যাঁচকা টানের মুহূর্তে আমার সম্বিত ফিরেছিল। দলজিত জাপটে ধরে টানতে টানতে কিছু বলছিল। ‘তুসি কে কার রাহে হো? কি কোই য়ে করদা হে?’ হ্যাঁ, এমন কিছু একটা বলেছিল। ওর চোখ দুটো বড় বড় – আর ছলছল করছিল। তখনও আমার হাতটা আঁকড়ে ধরে ছিল। আমি স্পষ্ট কাঁপুনি অনুভব করছিলাম ওর হাতে। ওর সমস্ত শরীরটা কাঁপছিল। থরথর করে।

দিনের আলো তখনও ঠিকঠাক ফোটেনি। বাতাসে সবে হিমের পরশ লেগেছে। মৃদু একটা মিষ্টি গন্ধ। শিউলি ফুলের। সাদার্ন বাইপাসে স্ট্রিট লাইট তখনও জ্বলছে। মানুষজনের আনাগোনা শুরু হতে ঢের বাকি। আশপাশের আবাসনগুলো থেকে আমার মতো দুএকজন মর্নিং ওয়াকার। তাও হাতে গোনা। তাদের মধ্যে দুয়েকটা ফুলচোর। আর মাঝে মাঝে দুরন্ত বেগে ছুটে চলা মালবাহী ট্রাক, লড়ি। একটু দূরে একটা চায়ের দোকান। কিছুদিন আগে বেশ কয়েকটা ঝুপড়ি দোকান ছিল এখানে। সরকার থেকে এরকম গজিয়ে ওঠা সকল অবৈধ দোকান ভেঙে দিয়েছিল। তা হলে হবে কি, আবার একটা চায়ের দোকান গজিয়ে উঠেছে। আগামী কিছুদিনের মধ্যে আবার ঝুপড়ি দোকানে গিজগিজ করবে। ভোরবেলায় মূলত আমার মতো, দলজিত বা তার স্বামীর মতো লোকজন এরকম চায়ের দোকানের গ্রাহক। দিনের আলো আরও একটু ফুটলে স্থানীয় লোকজন আর সকালে কাজে যাওয়ার আগে খেটে খাওয়া মানুষের ভিড় হয় এইসব চায়ের দোকানগুলোতে।

দলজিত তখনও হাঁপাচ্ছে। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে ও। আমার বাঁ হাতটা তবুও শক্ত করে ধরে আছে। পেছনে একটু দূরে সুরজিত সিং তাড়াতাড়ি করে হেঁটে আসছে। ওর সঙ্গে ছোট্ট একটা সাদা স্পিট্‌জ কুকুর থাকায় দলজিতের মতো ছুটে আসতে পারেনি। আমি সুরজিতের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ওর হন্তদন্ত হয়ে হেঁটে আসা দেখছিলাম। আমার হাতে শক্ত করে ঝাঁকুনি দিয়ে শুদ্ধ বাংলায় দলজিত বলেছিল, ‘বাইপাসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এটা কি করছেন আপনি, বিপ্লবদা? আপনি আমাকে মেরেই ফেলুন দাদা। উফ... কী দৃশ্যই না আজ দেখতে হতো...’

সুরজিত ততক্ষণে পাশে এসে গেছে। কুকুরের লেসটা দলজিতের হাতে দিয়ে ওর ডানহাত আমার পিঠের ওপর দিয়ে জড়িয়ে ধরে নিয়ে আমাকে আস্তে আস্তে চায়ের দোকানের দিকে নিয়ে গিয়েছিল। মুখে বলেছিল, ‘কোই নেই, কোই নেই।’ যেন ছোট্ট একটা শিশু খেলতে খেলতে পড়ে গিয়েছে আর তার বাবা তাকে তুলে নিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছে - এমনই আন্তরিক সুরজিত-দলজিতরা।

দলজিত কিন্তু থামেনি, ‘হায় মেরে রাবা! আজ চোখের সামনে কিছু হয়ে গেলে... ওপরে গিয়ে শেলীদিকে কী জবাব দিতাম আমি!’ সুরজিত ইশারায় দলজিতকে চুপ করতে বলেছিল। এমন একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও দলজিতের মুখে বাংলা শুনতে আমার ভীষণ মিষ্টি লাগছিল। ভবানীপুরের মেয়ে। জন্ম কলকাতাতেই। বাংলা স্বাভাবিক ভাবেই ওর ঠোঁটে আসে।

আমি খুব অস্বস্তিকর একটা পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। কোথা থেকে কী যে হয়ে যাচ্ছে আজকাল। কে জানে দলজিত আর সুরজিত সে সময়ে কি ভাবছিল আমার ব্যাপারে। আমি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছিলাম। বলেছিলাম, ‘দলজিত, আমাদের গুরুমুখী শিক্ষার ক্লাসটা শুরু হলো না। তুমি বলো কবে থেকে আমরা বসবো। আমি কিন্তু সত্যিই শিখতে চাই।’

দলজিত তখনও কাঁপছিল। অন্তত আমার তাই মনে হচ্ছিল। চায়ের দোকানের একটা কোণে সবে বসেছে। আমার কথা শুনে ও হাঁ হয়ে গিয়েছিল। এটা ঠিকই যে বহুদিন আগে এ নিয়ে কথা হয়েছিল আমাদের। কথা হয়েছিল দলজিত আমাকে গুরুমুখী শেখাবে। অমৃতা প্রীতমকে আমি মূল ভাষায় পড়তে চাই। বিশেষ করে ওঁর কবিতাগুলো। আহা! কীসব কবিতা ওঁর। ইচ্ছে ছিল নিজের মতো করে ওঁর কিছু কবিতা বাংলায় অনুবাদ করবো। দলজিত-সুরজিত দুজনেই কবিতা ভালোবাসে। সুরজিতের প্রিয় শিব কুমারের কবিতা। শিব কুমার বটালভ। প্রেমের কবি, বেদনার কবি, নিঃসঙ্গতার কবি। ওঁর কবিতায় পাঞ্জাবের মাটির ঘ্রাণ। বাঙালি কি পড়ে ওঁর কবিতা?

দলজিতের হাঁ হয়ে যাওয়াটাই তখন স্বাভাবিক ছিল। ওর মুখে কোনও রা কাটছিল না। আমার স্পষ্ট মনে হচ্ছিল ও যেন তখন বলতে চাইছিল, ‘বিপ্লবদা, এটা এখন ডিসকাস করার সময়? এক্ষুনি কী হয়ে যেতে পারতো ভেবেছ?’ অথচ ঘটনার আকস্মিকতায় ও কিছু বলতে পারছিল না। ওর প্রতিমার মতো মুখটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সকরুণ চোখে তখন অদ্ভুত স্নেহ আর ভয়। সুরজিত আমার পাশে বসেছিল। আমার বাঁ হাতের ওপরে তখনও ওর ডান হাত। শেলী চলে যাওয়ার আগে শেলী তার ডান হাতটা এমন ভাবেই আমার বাঁ হাতের ওপরে রেখেছিল। ঠোঁটে একটা মৃদু হাসি ছিল - অনেক কষ্ট পিছনে ঠেলে শুধু আমার জন্যেই বেরিয়ে আসছিল। অতি ক্ষীণ উচ্চারণে শেষ কথাগুলো বলছিল। প্রিয় কবিতার শেষ শব্দগুলো...

‘অ্যায় জিসম মুখদা য়ে
তান সবকুছ মুখ জানদায়ে
পার চেতেয়াঁ দে তাগে
কায়েনাতি কণা দে হুন্দে
ম্যায় উনহা কণা নু চুনাঙ্গি
তে তেনু ফির মিলাঙ্গি’

কুকুরটা পায়ের কাছে কুঁইকুঁই করছিল - সম্ভবত আমার চোখে জল দেখে। সুরজিত আমার হাতটা আরও একটু শক্ত করে, আরও খানিকটা আন্তরিকভাবে ধরে রেখেছিল। কেউ একজন হাঁক দিয়ে বলছিল, ‘তিন চায়ে দেনা ভাইয়া।’
***
আজ যা হচ্ছে সেটা তৃতীয় বার।
তখন ভোর। আলো ফোটেনি। বছরের এই সময়টা আমার প্রিয়। গাঢ় কুয়াশা, আলোকে আরও একটু ঘুমিয়ে থাকতে বলেছে। রাস্তায় বেরোলে টুপটাপ শিশির ঝরে পড়ার শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। আবাসন থেকে সাদার্ন বাইপাস পর্যন্ত রাস্তাটা সাত-আটশো মিটার। এই সময় রাস্তাটা নির্জন। সবুজ গাছপালা, ঘরবাড়ি, দোকানপাট কুয়াশা মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে। দূরে কোথাও একটা ঘুঘু ডাকছে। নৈঃশব্দ্য আর মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসা ঘুঘু পাখির ডাক - আমার কৈশোরের ভোরবেলা যেন। এই রাস্তাটি আমাকে স্মৃতি-কাতর করে তোলে। আমার গ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয়। শৈশব কেটেছে যে গ্রামে।

কুয়াশার একটা ধূসর আস্তরণ রাস্তার সামনে শান্ত ভেসে বেড়াচ্ছে। বাঁ পাশে লাহিড়ীদের পুকুর। ওপাশটা কুয়াশায় ঢাকা। পুকুরের ডানপাশে একটা খেজুর গাছ। মনে হয় সদ্য ঠিলি পাতা হয়েছে। পুকুরের জলের ওপর হেলে আছে খেজুর গাছের মাথাটি। যেন জলের আয়নায় নিজের মুখটা দেখে নিচ্ছে। দুটো সাদা বক গুঁড়ির ওপর এসে বসল। পুকুর পেরিয়ে গেলে বড় রাস্তা আর দূরে নয়। রাস্তার একটা বাঁক পেরলেই সাদার্ন বাইপাস। বাইপাস ছুঁয়ে আবার উল্টো রাস্তায় ঘরে ফেরা। রাস্তার বাঁকে একটা মাদার গাছ। মাদার গাছের নিচের মাটিটা ভিজে। গাছের পাতা থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরে পড়ছে। শিশির? শিশির নয়। এমনই একটা মাদার গাছ ছিল রাস্তার বাঁকে। ঘরে ফেরার রাস্তা যেখানে। এখনও কি আছে সেই গাছ? সেই বাঁশবাগান। ফেরা হয় না কতদিন।

‘ফিরবি না বিপ্লব?’ স্পষ্ট অথচ ফিসফিস করে কেউ যেন বলল। আশপাশে কেউ নেই জানি, তবুও একবার পিছন ফিরে দেখলাম। যেন আমার অবচেতন থেকে, আমারই মাথার গোপন কোনো অন্ধকার থেকে ডাক এলো। কারা যেন ফিসফিস কথা বলে মাথার ভেতর আজকাল। অদ্ভুত কোলাহল। তারপর হঠাৎই শান্ত হয়ে যায়। অখণ্ড নীরবতা।

রাস্তার বাঁকটা পেরোলে মাত্র কুড়ি-পঁচিশ মিটার দূরত্বে সাদার্ন বাইপাস। জনহীন শিশিরাদ্র পথে হাঁটতে হাঁটতে মাদার গাছ পেছনে ফেলে রাস্তার বাঁক পেরিয়ে এলাম। ভোরের আলো অনেকটা স্বচ্ছ এখন। একটা জলো হওয়ার গন্ধ নাকে আসছে। নদীর হাওয়া যেমন। রাস্তার বাঁ পাশে একটা জীর্ণ, ভাঙা নৌকা পড়ে আছে। কালো পাঁজরের হাড় যেন। বহুকাল আগে মৃত কোনো প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর কঙ্কালের মতো শুয়ে রয়েছে। বুকে করুণ শিশির জমে আছে। ঘুঘু পাখির ডাক ও নির্জনতার মধ্যে দিয়ে আরও একটা-দুটো পা। সামনে একটা নরম শান্ত ও শ্রান্ত নদী শুয়ে আছে। ওপার নিবিড় কুয়াশায় ঢাকা। আমি ধীর পায়ে নদীপাড়ে এসে দাঁড়ালাম।

এ নম্র ধূসর নদী আমার বহুদিনের চেনা। ঐ দূর উত্তর থেকে এসে এই যে ছোট্ট বাঁক নিয়ে দক্ষিণ দিকে সুদূর কুয়াশায় মিলিয়ে গেছে - এ আমার প্ৰিয় জলাঙ্গী। জল অঙ্গ যার। আমার শৈশবের সঙ্গী। আমার নদী। আমার প্রথম সাঁতার। কত ঝাঁপাঝাঁপি। বন্ধুদের সাথে সাঁতরে ওপার-এপার। নদীপাড়ের সবুজ খেত। নরম কচি বাখারি খাওয়া। কত কত অমলিন স্মৃতি। আমার সাথে সাথে ওর বয়সও বেড়েছে যেন। বুড়ো পাকুড় গাছটার তলায় এসে দাঁড়ালাম। ভোরের নরম আলোয় প্রাণ ভরে শ্বাস নিলাম। জলাঙ্গীর সেই চেনা গন্ধ। বাড়ি থেকে বেরিয়ে কলকাতা শহরে চাকরি করতে চলে আসার আগে বৃদ্ধ পাকুড় গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, ‘ফিরে আসবো এই তো কটা দিন।’ কাকে বলেছিলাম? এ বৃদ্ধ গাছটিকে? জলাঙ্গী নদীটিকে? আমার গ্রাম বকুলতলাকে? না কি নিজেকেই? ‘এই তো কটা দিন’ মানুষের শেষ হয় না; জীবন শেষ হয়ে যায় তবুও ‘এই তো কটা দিন’ শেষ হয় না। আমার শেষ হয়নি। অথির নৈঃশব্দ্যে ডুবে যায় মানুষ, নিবিড় ও অসহ্য কোলাহলে ডুবে যায় মানুষ তবু ফিরে যাওয়ার চেনা বাঁক মানুষ ভুলে যায়।

নদীর ওপার ভালো করে দেখা যায় না এমন ক্ষীণ আলোয়। তার ওপর কুয়াশার ধূসর আস্তরণ। একটু বাদে কুয়াশা কেটে গেলে নরম রোদ মাটিতে এসে পড়লে ওপার দেখা যাবে। ধান কেটে নেওয়া শূন্য মাঠ দেখা যাবে। এখন কুয়াশার মধ্য দিয়ে ওপারের একটা ক্ষীণ আভাস ছাড়া কিছু বোঝা যাচ্ছে না। এভাবে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি জানি না। এই অপূর্ব অনুভূতি - এ দৃশ্য ফেলে রেখে আমার কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। হয়তো অনেকক্ষণ চলে গেছে বা হয়তো বেশিক্ষণ হয়নি। আজ আলোফোটার তাড়া নেই। একবার নদীর দক্ষিণ প্রান্তে তাকালাম। তারপর উত্তরের দিকে। দূরে কী যেন একটা ভেসে আসছে। এ নরম আলোয় ভালো করে বোঝা যায় না। আমি অলস চোখে তাকিয়ে রইলাম। সাদা মতো কিছু একটা। এত দূর থেকেও বোঝা যায় ওটা খুব ছোট কিছু নয়।

কিছুটা সময় বাহিত হল। আমি স্থির তাকিয়ে ছিলাম ভাসমান বস্তুটির দিকে। একটা কলার ভেলা। ধীরে অতিধীরে জলাঙ্গীর স্রোতের সাথে ভেসে আসছে। ভেলার ওপরে একটি মৃতদেহ - সাদা চাদরে মোড়া। কার দেহ? এ ভাবে...! নদীর প্রায় মাঝ বরাবর মন্থরতম গতিতে ভেসে আসছে। শীতের জলাঙ্গী যেমন মন্থর তেমনি কলার ভেলাটি ভেসে আসার গতি। আরও একটু সামনে এসেছে। একটি নারীর মৃতদেহ। গলায় গাঁদা ফুলের মালা, পাপড়ি, রজনীগন্ধা, মাথার কাছে এক গোছা ধূপকাঠি। কিছু নিভে গেছে। কিছু জ্বলছে এখনও। মুখটা স্পষ্ট হল আরও একটু। ফ্যাকাশে - নীল। বোন, আমার বোন প্রভা - প্রভার মৃতদেহ ভেসে যাচ্ছে জলাঙ্গীর জলে! এ দৃশ্য দেখবো ভাবিনি তো! চিনতে পেরে ছুটে নদীতে নেমে পড়তে চাইলাম, অথচ পা-দুটো অসাড়। হাঁটুগুলো কাঁপছে। নদী তীরে বসে পড়ব ভাবলাম, তাও পারছি না যেন। হৃদকম্পন বেড়ে চলেছে। গলা শুকিয়ে আসছে যেন। হে মা ফিরিঙ্গী কালী, এ কী দৃশ্য? কী দৃশ্য দেখালে তুমি?

চারিদিকের এই শব্দহীনতা আমাকে গ্রাস করছে। এ আকস্মিক শোক আমার হৃদয়ে ক্রমাগত ধাক্কা দিচ্ছে। আমার চোখের সামনে দিয়ে আমার বোনের দেহখানি ধীরে ধীরে দক্ষিণগামী হচ্ছে। আমি ইতস্তত একবার

চারিদিকে তাকালাম। কেউ কি আছে কাছাকাছি? একবার দক্ষিণের দিকে তাকালাম - একবার উত্তরের দিকে। তখনও বুঝিনি আরও বিস্ময় অপেক্ষা করছে আমার জন্য!

নদীর উত্তর প্রান্ত থেকে আরও কিছু একটা ভেসে আসছে। একই রকম ভাবে। সাদা কিছু। তবে কি আরও একটি মৃতদেহ! কে জানে! প্রভার মৃতদেহ জলাঙ্গীর শান্ত স্রোতে এখন দক্ষিণগামী। ধীরে ধীরে চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছে। এতো আদর, ভালোবাসা, কলহ, এতো পার্থিব লোভ সব একে একে পিছে ফেলে ঐ দেখো চলে যাচ্ছে সে।

বিয়ের পর থেকেই শেলীর সাথে ওর সম্পর্কটা কিছুতেই ভালো হয়নি। ওর মনের সংকীর্ণতা, সম্পত্তির লোভ আমাদের থেকে ওকে অনেক দূরে করে দিয়েছিল। শেলীর মিসক্যারেজের সংবাদ ওকে পৈশাচিক আনন্দ দিয়েছিল বলে শুনেছি। বাবা-মার যা কিছু স্থাবর-অস্থাবর, ওর তাতে ভীষণ দৃষ্টি। দাদা দূরে থাকে, দাদা নয় আমি তোমাদের কাছে আছি, আমিই তোমাদের দেখছি, এমনটা সবসময় প্রতিপন্ন করতে চাইতো মা-বাবার কাছে। তাতে সফলতা পেয়েছিল। মা-বাবাও ভাবতে শুরু করেছিল, প্রভাই তাঁদের শেষ জীবনে দেখাশোনা করবে, পাশে থাকবে। বিপ্লব দূরে থাকে। বিপদে আপদে ও তো আসতেও পারবে না। বউমা আসতে দেবে না। ছেলেকে আঁচলে বেঁধে রেখেছে যে।

প্রভার মৃতদেহ ক্রমে দক্ষিণের কুয়াশায় মিলিয়ে যাচ্ছে। আমি সেদিকে তাকিয়ে ভাবছি, তবে কি সেসব মিথ্যা ছিল? আদরের বোন, যাকে পরম স্নেহে আগলে রাখতাম। খেলতে গিয়ে আমি সামান্য আঘাত পেলে যার চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল পড়ত। সেসব ভুল ছিল? শৈশবের সেই ভালোবাসা স্নেহ এতটাই পলকা ছিল যে সামান্য পৈতৃক সম্পত্তির লোভের সামনে ঝরঝর করে ভেঙে পড়ল? আমি তো সবকিছুই ছেড়ে দিয়েছিলাম, তবুও কেন সব কিছু ঠিক হল না? সম্পর্ককে লালিত করা, জারিত করার কত চেষ্টাই তো শেলী করেছিল। আমি ওকে বোঝাতে পারিনি, কোনও সম্পর্ক একার চেষ্টায় সুন্দর হতে পারে না। শেলী শুধু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বারবার চেষ্টা করে যেত।

প্রভাকে কুয়াশার মধ্যে একটা ছোট সাদা বিন্দুর মতো দেখাচ্ছে। আমি উত্তরের দিকে তাকালাম। উত্তর দিক থেকে ভেসে আসতে থাকা বস্তুটি আরও একটু কাছে এসেছে। ধূসর কুয়াশাতে অস্পষ্ট তবুও একটা আন্দাজ এখন করা যাচ্ছে। কলার ভেলায় সাদা কাপড়ে মোড়া আরও একটি মৃতদেহ। মন উদ্বেল, অস্থির হয়ে উঠেছে। আজ রোদ উঠবে না মনে হয়, বা উঠলে আরও দেরি করে। ঘুঘু পাখির ডাকটাও এখন শোনা যাচ্ছে না, অপার নৈঃশব্দ্য। আমি স্থির তাকিয়ে রইলাম যতক্ষণ না মৃতদেহটি সামনা সামনি আসে। বাবা। কেমন শুয়ে আছে। কপালে চন্দনের ফোঁটায় কেউ যেন সাজিয়ে দিয়েছে। যত্ন করে সাজিয়েছে রজনীগন্ধার মালা-চন্দনে। ঘুমিয়ে রয়েছে যেন। এই বুঝি উঠে বসবে, আমার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলবে, ‘কবে এলি? এবারও তো পুজোয় এলি না।’ আমি যে কেন যাইনি বাবা, সে অভিমান তুমি কোনও দিনও বোঝার চেষ্টা করোনি। অথচ একমাত্র তুমিই পারতে, তোমার পরিবারকে যত্ন করে ধরে রাখতে।

এ মৃত্যু সংবাদ আমি কেন পেলাম না? কেউ কি তবে আমায় মনে রাখেনি? কারো কি মনে হল না বিপ্লবকে খবর দিই? পর পর দুটো আঘাত। আমি পাথরের মতো চেয়ে আছি কলার ভেলাটির দিকে। করুণ ও ক্ষীণ আলোতেও আমার চোখ ঝলসে যাচ্ছে। আমি এ দৃশ্য নিতে পারছিলাম না। খানিকক্ষণ চোখ বন্ধ করলাম। কত কত পুরনো কথা মনে আসছে। চোখের জল বাঁধ মানছে না। পাশে কেউ নেই সান্ত্বনা দেওয়ার - সামলে নেওয়ার।

বাবার মৃতদেহের পেছনে পেছনে উত্তরের কুয়াশা ভেদ করে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসছে আরেকটি কলার ভেলা। এতক্ষণ খেয়াল করিনি। ফুলে ফুলে সাজানো - ধূপধুনো-অগুরুর গন্ধ মাখা বৃদ্ধার মৃতদেহ। মৃতদেহ ঢাকা দেওয়া সাদা চাদরটা আলগা হয়ে গেছে। ভেলার চারদিকে কয়েকটি কাক উড়ছে। নৈঃশব্দ্য ভেঙে ক্ষীণ স্বরে কা-কা শব্দ ভেসে আসছে। কলার ভেলা থেকে কিছু খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে - উড়ে যাচ্ছে আবার বসছে। আশপাশ থেকে আরও কিছু কাক এসে জুটছে। নৈঃশব্দ্য ছারখার করে এখন শুধু কাকেদের তীক্ষ্ণ তীব্র চিৎকার। আমার মাথা ঝিম ঝিম করছে। মৃতদেহটি নদীর প্রায় ওপার দিয়ে যাচ্ছে। নদীর ওপারে তখন আলো ফুটেছে। ভোরের নরম আলো। কুয়াশা একটু ক্ষীণ। নদীর ওপারে একটি প্রতিমার ভাঙা কাঠামো পড়ে রয়েছে। প্রতিমা নিরঞ্জনের পর নদীপাড়ে তুলে রাখা প্রতিমার বাঁশ আর খড়ের মলিন কাঠামো। কিছুটা পাড়ে তোলা, কিছুটা নদীজলে নিমজ্জিত। কলার ভেলাটি এসে ঠেকল প্রতিমার কাঠামোয়।

মা। ছিন্নভিন্ন ফুলের মালা - আলু থালু সাদা চাদর - অসংখ্য কাকের অসহ্য চিৎকারের মাঝে মা শুয়ে আছে। মৃতদেহ থেকে মাংস খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে কাকেরা। মুখের মাংস খুবলে খুবলে খেয়ে চলেছে। ওঃ কী বীভৎস। আমি হুস্ হুস্ করে তাড়িয়ে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছি। আমার কণ্ঠ থেকে কোনও স্বর মনে হয় বেরিয়ে আসছে না, আসলেও কাকেরা এতোটাই হিংস্র ও বিশৃঙ্খল হয়ে উঠেছে যে অন্য পাড়ে থাকা একটি মানুষকে তোয়াক্কা করার ভাবনা ওদের মাথায় আসছে না।

জলাঙ্গী নদী সাঁতরে কতবার যে এপার ওপার করেছি তার হিসেব নেই। নদী তীরে দাঁড়িয়ে তবু এক পা-ও এগিয়ে যেতে পারছি না। অথচ আমি প্রাণপণে চাইছি সাঁতরে কলার ভেলাগুলোর কাছে চলে যেতে। আমার শরীর অবসন্ন হয়ে আসছে। অপরিসীম ক্লান্তি আমার শরীরে নেমে আসছে। ওপারে কুয়াশা আবার ঘন হচ্ছে। সাদা কুয়াশার মধ্য দিয়ে কেউ এসে কাকেদের তাড়িয়ে দিচ্ছে। একটা কুয়াশায় তৈরি অবয়ব যেমন। যেন বহুকালের পরিচিতা সে। আটকে যাওয়া কলার ভেলাটি আবার বয়ে যাচ্ছে নদীর স্রোতে। কাকেদের বিশৃঙ্খল চিৎকার বাড়ছে। মাথার ভেতরে চিৎকার এতোটাই বেড়ে গেছে যে আমি যন্ত্রণায় মাথাটা দুহাত দিয়ে চেপে ধরেছি। এ কোলাহল বাইরে নয় যেন, মাথার অনেক গভীর থেকে উঠে আসছে। অনেক অনেক মানুষের চাপা কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। ‘ফিরবি না?’ কারা যেন বলছে। আমি স্পষ্ট শুনলাম কেউ বলল, ‘ম্যায় তেনু ফির মিলাঙ্গি।’ নদীর ওপার থেকে কেউ। ‘অ্যায় জিসিম মুখদা য়ে, বিপ্লব...’ আমি ওপারে চোখ তুলে দেখলাম – সে কুয়াশাচ্ছন্ন অবয়বটি যেন একবার আমার দিকে ফিরে তাকালো, আরও ঘন কুয়াশার দিকে হেঁটে যাওয়ার আগে। আমার অবসন্ন শরীর ঠেলে একটা ধাপ এগিয়ে দিতে পারলাম নদীর দিকে। এবং আরও একটি ধাপ। নদীর দক্ষিণ দিক থেকে একটা তীব্র তীক্ষ্ণ শব্দ ধেয়ে আসছে। ঘন মলিন কুয়াশায় ঢেকে আছে চারিপাশ। নদীর উপর দিয়ে ফগ লাইট জ্বেলে সজোরে হর্ন বাজিয়ে ছুটে আসছে একটা রাক্ষুসে ট্রাক। ·