প্রশ্নটা মায়ের কাছে নতুন কিছু না। তার কাছেও না। প্রতিটা চাকরির ইন্টারভিউয়ের পরেই মা এই প্রশ্নটা করে। অতি স্বাভাবিক প্রশ্ন। গত দেড় বছর ধরে সে প্রায় একশোটা ইন্টারভিউ দিয়েছে এরকম। একটাতেও হয়নি এতদিন। মায়ের প্রশ্ন শুনে সে আজ কিছু একটা বলতে গেল। পারল না।
পরশুদিন ডাল রান্না করতে গিয়ে মায়ের হাতে ফোস্কা পড়েছিল। পরশুদিনের ফোস্কা আজ আরও টাটিয়ে উঠেছে। সকাল সাড়ে এগারোটায় রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে একবার 'হয়েছে' জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে মা সেই ফোস্কার উপর বেশ কয়েকবার হাত বুলিয়ে নিল। এটা যেন মায়ের কাছে একটা খেলার মতো। মাঝেমাঝেই রান্না করতে গিয়ে গরম ডাল বা তেল ছিটে গিয়ে ফোস্কা পড়ে যায়। ভূমণ্ডলের নানা আড়াল থেকে লজ্জা-পাওয়া তারার কায়দায় সেই ফোস্কাগুলো মায়ের শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে মুখ বের করে থাকে। ফোস্কাগুলোকে মা কখনও গেলে দেয় না। নিজের মতো বাড়তে দেয়। সেগুলো ক্লান্ত, রুগ্ন হয়ে পড়লে, তাদের ভিতর মৃত্যুর স্পষ্ট আভাস ফুটে উঠলে ওদের নিয়ে ছাদে ওঠে। কখনও কখনও বিকেলের দিকে হাঁটতে বেরোয়। নিজের পাতের রুটির থেকে এক টুকরো রেখে দেয়। জীবনের নানা তীক্ষ্ণ, রূঢ় হিংসা থেকে ফোস্কাগুলোকে বাঁচিয়ে চলতে পারলেই যেন মায়ের মুক্তি! কী আছে এই ফোস্কাগুলোর মধ্যে? তা বোধহয় কেবল মা-ই জানে। অথবা, জানে না! এই পৃথিবীর অনেক জানার মধ্যে ছোট্ট একটু ফোস্কার অজানার উপর হাত বুলোতে বুলোতে অল্প বয়সে বিধবা হয়ে যাওয়া ওর মা কাঁপতে থাকে। মায়ের গলার কাছে দুটো ফোস্কা এখন। সেগুলো শুকিয়ে এসেছে। হাতেরটা নতুন। এই ফোস্কাগুলো হয়, আবার শুকিয়েও যায় স্বাভাবিক নিয়মেই। কেবল একটি বাদে। বহু পুরনো সেই ফোস্কাটা রয়েছে মায়ের পিঠের একটু উপরের দিকে। খুব বড় মতো। সে জানে, তার মা সেই ফোস্কাকে ভুলতে পারেনি কখনও। তার মায়ের কাছে মনে রাখবার মতো এত স্মৃতিই নেই যে ওই ফোস্কাটাকে ভুলতে পারবে! ফোস্কাটা শুকিয়ে গিয়েও শুকিয়ে যায় না! বছরের পর বছর ধরে একইভাবে রয়ে গিয়েছে। ফোস্কাটাকে মা দেখতে পায় না। সে জানে, মা দেখতে চায়ও না। এই ফোস্কাটা মায়ের সঙ্গেই বড় হয়েছে। ছাদ থেকে শোওয়ার ঘর, রান্নাঘর থেকে উঠোন করেছে। নানা আঁধার ও আলোর মধ্যে মায়ের সঙ্গেই থেকে গিয়েছে সেটি।
'কী রে, কী হল আজ? বল কিছু! আজও হল না তো'? মা ফের প্রশ্নটা করল। তবে, প্রশ্নের পর আর দাঁড়াল না। আজ বোয়াল রান্না হচ্ছে ওদের বাড়িতে। ব্যস্ততা বেশি। সর্ষে দিয়ে রান্না করবে মা। ওরা দুজনেই বোয়াল মাছ খেতে খুব ভালবাসে। ধীরে ধীরে ভাত দিয়ে মেখে অনেকক্ষণ ধরে খায়। ফোস্কা বাঁচিয়ে খেতে হয় বলে মায়ের সময়টা একটু বেশি লাগে। বাড়িতে বোয়াল মাছ মানে একটা উৎসব। ছোটবেলা থেকেই দেখছে কারণে-অকারণে বাড়িতে বোয়াল মাছ রাঁধা হয়। আর বোয়াল মাছ হলেই মায়ের সে কি উৎসাহ! ও নিজেই বাজার করে আনে সাধারণত। মাঝেমাঝে মা-ও যায়। তবে, অল্প। আজ ইন্টারভিউ। তাই খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে ও বাজারে চলে গিয়েছিল। দু'কেজি মতো বোয়াল কিনে এনেছে। অর্থাৎ, ওর অজান্তে বাড়িতে বোয়াল আসেনি! নিজেই নিয়ে এসেছে! অথচ, মা রান্না শুরু করার সময় হাসি হাসিমুখে ওর ঘরের দরজার সামনে এসে জানিয়ে গেল, 'আজ বোয়াল রাঁধছি'! যেন এই কথাটা ও জানতই না মা বললে! দেখতে দেখতে মনে হয়, একমাত্র বোয়াল মাছ রাঁধা ছাড়া মায়ের জীবনে তীব্র আনন্দের আর কোনও কারণই তেমন বেঁচে নেই আর। ও চাকরি পেলে অবশ্য একটু আনন্দ পাবে বোধহয়! পাবে কি? পাবে বলেই তো মনে হয়! তবে, ওর বারবার মনে হয়, মা যেন ধরেই নিয়েছে, ও কখনও আর চাকরি পাবে না। বা, পেলেও ইন্টারভিউ দিয়ে পাবে না। দেড় বছর ধরে লাইন দিয়ে একের পর এক অসাফল্যের কথা শুনতে শুনতে সে নিজেও এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে যে, ইন্টারভিউ দিয়ে যে চাকরি পাওয়া যেতে পারে, সেই ধারণাটাই মন ও মাথা থেকে মুছে যাওয়ার জোগাড়!
সে কোনও উত্তর না দিয়ে মায়ের দিকে চেয়ে থাকে।
গেটে শব্দ হল।
বেলা বারোটা বাজতে যায়। কে এল এখন, তা তারা দুজনেই জানে। মুকুল সেন। তার বাবার সঙ্গে নকশাল করত। ও 'মুকুল কাকা' বলে। চুয়াত্তর বছরের মুকুল কাকার এখন আর কিছুই মনে নেই তেমন। নিজের এক সময়ের অন্তরঙ্গ বন্ধুর কথাও ভুলে গেছে। তবু, বছরের পর বছর ধরে বেলার দিকে তাদের বাড়িতে আসে। ঘণ্টাখানেক থাকে। ও টিভিতে রফির গান চালিয়ে দেয়। মুকুল কাকা চুপ করে চোখ বন্ধ করে শোনে। তার মা চা এনে দিলে মায়ের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকতে থাকতে চা'টা খায়। মা সামনে বেশিক্ষণ দাঁড়ায় না।
তার বাবার থেকে মা পনেরো বছরের ছোট। লেদ কারখানায় কাজ করত বাবা। মদ খেয়ে বাড়ি ফিরত প্রতি রাতে। মা'কে মারত। সে তখন খুবই ছোট। তবু, স্পষ্ট মনে পড়ে, মা'কে মারার সময় কী এক অসহ্য রাগে কাঁপতে থাকত তার মদ্যপ বাবা। এক সময় উদাত্তকণ্ঠে সমাজ বদলের ডাক দেওয়া সেই মানুষটাকে তখন চেনা যেত না। কটা চোখ দুটো জ্বলে উঠত। মুখের আকার পুরোপুরি চৌকো হয়ে যেত। চুপ করে মাথা নিচু করে বসে থাকত মা। একটু কুঁজো হয়ে যেত। সেই কুঁজো পিঠের উপর সপাং সপাং করে বেল্টের বাড়ি। তারপর সিগারেটের ছ্যাঁকা দিত ঠিক বেল্টের বাড়ি পিঠের যেখানটা মারত, সেখানটায়। শরীরটা শক্ত করে বসে থাকত মা। সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়ার সময়ে মুখ দিয়ে একটা শব্দ করত। অনেক পরে একবার পুরুলিয়ায় ঘুরতে গিয়ে এক জাতীয় ছোট পাখির শব্দ শুনে তার মনে হয়েছিল, বহু বছর আগের রাতে তাদের খাবার টেবিলের পাশে কুঁজো হয়ে বসা মা বেল্টের বাড়ি খেতে খেতে ঠিক এভাবেই শব্দ করত। মায়ের পিঠের জায়গাটা ফোস্কায় ফোস্কায় কালো হয়ে গিয়েছিল। একটু দূর থেকে দেখলে মনে হতো সাতাশ-আঠাশ বছরের রোগাটে ফর্সা তরুণীটি পিঠে ছোট একটা ভীমরুলের চাক নিয়ে বসে আছে।
'একটু বোয়াল খেয়ে যাবে নাকি আজ দুটো ভাত দিয়ে? তোমার ভাইপো এনেছে। সর্ষে দিয়ে কষা কষা করে করছি'। মুকুল কাকার দিকে চেয়ে থাকে ওর মা। মুকুল সেনের সঙ্গেও ওর মায়ের বয়সের ফারাক প্রায় পনেরো বছরেরই। এই পনেরো বছরের ব্যবধানের মধ্যবর্তী শূন্যস্থানে বোয়াল কষা খেয়ে যাওয়ার আবদারটি একটু জিরিয়ে নিল প্রথমে। তারপর আনন্দে লাফিয়ে উঠে যাবতীয় হাওয়া, রোদ্দুর, বৃষ্টি, দিকহীন সমতল মাঠ, কৃষিক্ষেত্রকে স্পর্শ করার উদ্দেশ্য নিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল। সেই জায়গাটার দখল নিল তারপর রফির 'এহেসান তেরা হোগা মুঝ পর'...
ডাইনিং রুমের কাঠের চেয়ারে মুকুল কাকা বসে আছে। নানা অসুখে, স্মৃতির প্রায় পুরোটাই হারিয়ে এক সময়ের ডাকাবুকো নকশাল এখন জবুথবু। মেঘের মতো লঘু মনে হয় তাকে। মুকুল কাকাকে দেখলেই বারবার একটা দৃশ্যের কথা মনে পড়ে যায় ওর। বাবার মৃত্যুর কয়েকদিন বাদের সেই ঘটনা। দুপুরবেলা। মুকুল কাকার দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে মা। ব্লাউজ-হীন পিঠে মারের দগদগে দাগ আরও বিচ্ছিরি, আরও কালো দেখাচ্ছে। সেই দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে আছে একদা নকশাল মুকুল সেন। হাত দুটো নিজের কোলের উপরে রাখা। কোনও কথা নেই কারও মুখে। মুকুল কাকার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। এই দৃশ্যটার কথা মনে পড়লে ওর ভিতরের সমস্ত চন্দনবন, সমস্ত গোলাপবাগান পুড়ে খাক হয়ে যায়। মনে হয়, এর থেকে বেশি কষ্টের দৃশ্য ও এত সামনে থেকে আর কখনও দেখেনি। এর থেকে বেশি ভালবাসার দৃশ্যও না।
'পুকারতা চলা হুঁ মেঁ' গাইছে মহম্মদ রফি। সে ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়ায়। কুয়োটার সামনে গিয়েও দাঁড়িয়ে রইল খানিকক্ষণ। একটা চাকরি আজ ও পেয়ে গিয়েছে! অবশেষে, একটা চাকরি! তবে, ওদের এই ছোট্ট শহরে থেকে সেই চাকরি করা যাবে না। যেতে হবে বাড়ি থেকে প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরের অন্য এক বড় শহরে। গত ত্রিশ বছর ধরে ওর আর মায়ের এই ছোট শহর, যেখানে রোদের সময়ে রোদে আর বৃষ্টির সময়ে বৃষ্টিতে মগ্ন হয়ে থাকে পৃথিবী। যেখানকার ভাষার খানিকটা মানুষের, খানিকটা পাহাড়ের, খানিকটা জঙ্গলের। রাতে মশারি টাঙালে বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মাসের হাওয়ায় যার ভিতরে মলিন হয়ে ধরা থাকে চাঁদ আর যেখানকার মানুষদের কিছুতেই স্বার্থপর বলে মনে হয় না- সেই জায়গা ছেড়ে চলে যেতে হবে ভেবে ওর কষ্ট হল। মা'কে রেখে যেতে হবে, এ কথা ভেবেও কষ্ট পেল সে। অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও নতুন অফিস একজনের বেশি গাড়িভাড়া দিতে পারবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। আর দিলেও বা কী! তার মা তো এই বাড়ি ছেড়ে কোনওদিন আর যাবে না!
নতুন অফিস থেকে জানিয়ে দিয়েছে পরের সপ্তাহের মধ্যেই জয়েন করতে হবে। অর্থাৎ, তার হাতে আর সময় বলতে দিন চারেক। উঠোনে একইসঙ্গে প্রসন্ন ও গুমোট বাতাসের মধ্যে দিয়ে পাশাপাশি ভেসে আসছে মহম্মদ রফির গান ও বোয়াল কষার গন্ধ। চারিদিক থেকে নানা ধরনের আরও ছিন্নবিচ্ছিন্ন শব্দ আসতে থাকে কানে। তার মাথার উপর বেলা সাড়ে বারোটা-একটার অল্প দামের সূর্য। ওদের তিন-চারটে বাড়ি পরেই থাকে মুকুল কাকা। প্রতিদিনই গুটিগুটি পায়ে ঠিকই চলে আসে ওদের বাড়ির পথ চিনে। চুপ করে বসে থাকে। মা আর মুকুল কাকাকে একসঙ্গে দেখার লোভটা সে কিছু সামলাতে পারে না বলে ওদের আশেপাশেই থাকে বরাবর। আজ, এই প্রথমবার, সে বেরিয়ে এসেছে।
তার মনে হল, কিছু না বললেও, সবই আসলে বুঝতে পেরেছে মা। বুঝতে পেরেছে, ছেলে আর থাকবে না। চলে যেতেই হবে চাকরি নিয়ে দূরে। কিন্তু, ছেলের মুখ থেকে সরাসরি কথাটা শুনতে চাইছিল না। দূরের একটা বাড়ির একতলার ছাদ থেকে দড়িতে মেলা সবুজ জামা, হলুদ জামা হাওয়ায় উড়ছে। এখন ওরা দুজন ঘরে। আর কেউ নেই। এই সময়ে মুকুল কাকাকে মা কি তার চলে যাওয়ার কথাটা বলল? সবই ভুলে গেছে মুকুল কাকা। তবু, মায়ের কথাটা কি আর অনুভব করতে পারবে না?
সে সামনে পিছনে ডাইনে বাঁয়ে একবার ঘুরে তাকায়। তারপর মাথা নিচু করে চোখ বন্ধ করে একটা দৃশ্য কল্পনা করে। ছেলেটা চাকরি নিয়ে দূরে চলে যাবে- এ কথা ভেবে কুঁজো হয়ে বসে কাঁদছে তার মা। আর, বহু বছর আগে কোলের উপর রেখে দেওয়া হাত দুটো তুলে অবশেষে মায়ের পিঠের শুকিয়ে যাওয়া ফোস্কাটাকে স্পর্শ করেছে মুকুল কাকা। পৃথিবীর শেষতম সংরক্ষণযোগ্য বস্তু সেই হাত। যা কোনও কুৎসিতকে সহ্য করতে পারে না। ·

0 মন্তব্যসমূহ