ভাবি, আমরা একটু হেঁটে আসি।

মুজাম্মেল বারান্দায় বসা খোরশেদাকে বলে। উত্তর-দক্ষিণে লম্বা বারান্দা, আবার বসবার ঘরও। বারান্দা-সংলগ্ন তিনটে বেডরুম, এক সারিতে। মাঝের বেডরুমে বড় ভাবি খোরশেদা, উত্তর পাশে দুই ভাইঝি মানতাহা ও মানহা, আর দক্ষিণের বেডরুমে মুজাম্মেল ছুটিতে এলে থাকে। মুজাম্মেলেরও এক মেয়ে। ছুটিতে এলে সেও মুজাম্মেলের ভাইঝি, তার কাজিনদের সাথে একসাথে উত্তরের রুমে থাকে।

খোরশেদা ফজরের নামাজ পড়ে ঘরের দরজা খুলে দিয়েছে। কয়েকদিন খুব গরম পড়ছে। বিদ্যুৎ সংযোগ আছে বাড়িতে। কিন্তু সে সংযোগে বিদ্যুৎ রাতের ভেতর দু-তিনবার যায় আসে। একবার গেলে ঘণ্টার উপরে আসার খবর থাকে না। লোডশেডিং আর লোডশেডিং। আজ রাতেও একবার বিদ্যুৎ গেছে। খোলা দরজা দিয়ে ঘরে আলো আসছে। ভোরের ঠান্ডা হাওয়া আসছে। খোরশেদার মনে হচ্ছে ঘরে জমে থাকা সব উষ্ণতা ভোরের হাওয়ায় দূরীভূত হচ্ছে। ঘর শীতল হচ্ছে।

মুজাম্মেল হাঁটতে যাবে শুনে খোরশেদা বলে, একটু বসো। ঘর ঝাড়ু দিয়ে দেই।

মুজাম্মেলের সাথে তার বউ সাবিনাও আছে। ফজরের নামাজ পড়েই খোরশেদা ঘর ঝাড়ু দিয়ে দেয়। কোনো কোনো দিন নামাজের পর কোরান শরিফ পড়ে। সোমবার রোজা রাখে। সেদিন ফজরের নামাজের পর নিশ্চিতভাবেই কোরান শরিফ পড়বে। আজ রাতে অতিরিক্ত গরম পড়েছে। গরমে ভালো ঘুম হয়নি। ফজরের নামাজ পড়ে সোফায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল। তার স্বামী দেলোয়ার নামাজ পড়ে আবার শুয়েছে। শহরে চাকরি করে সে। ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করে। অফিস খোলা থাকলে ফজরের নামাজের পর আর ঘুমাতে পারে না। আজ মে দিবসের বন্ধ, তাই নামাজের পর ঘুমাচ্ছে।

ঘর ঝাড়ু দিতে দিতে খোরশেদা বলে, বাসি ঘর থেকে সকালে বের হওয়া ভালো না।

বাসি ঘর মানে সকালে ঝাড়ু না দেওয়া ঘর। মুজাম্মেলের বের হতে চাওয়ায় সে তাড়াতাড়ি ঘর ঝাড়ু দিয়ে নেয়। বারান্দা ঝাড়ু দেওয়া শেষ হলে বলে, এবার যেতে পারো।

মুজাম্মেলরা ঘর থেকে বের হয়। বাইরে সজনে ফুলের মতো সকালের আলো। ফজরের জামাত ভেঙেছে অনেকক্ষণ। মুসল্লিরা ঘরে ফিরে গেছে, প্রাত্যহিকতায় ফিরে গেছে, ফিরে গেছে দিনের কাজে। লম্বা ঘাটা পেরিয়ে মুজাম্মেলরা রাস্তায় ওঠে; মুজাম্মেল আর তার স্ত্রী সাবিনা। রাস্তায় ইট বসানো, ডবল ইটের রাস্তা।

মুজাম্মেল জিজ্ঞেস করে, কোন দিকে যাবে?

সাবিনা সেলোয়ার-কামিজ পরে বেরিয়েছে। মাথায় ওড়না দেওয়া। সে বলে, এমনভাবে বলছে যেন আমি সব চিনি। তুমি যেদিকে নাও।

আসলেই তো, সাবিনা এ গ্রামের কিছু চেনে না। বিয়ের কত বছর হয়ে গেল! সামনের আগস্ট মাস এলে চৌদ্দ বছর পূর্ণ হবে। শুধু গ্রামের নাম জানে, গোলাবাড়িয়া।

মুজাম্মেল বলে, তাহলে চলো ঘাটঘরের দিকে যাই।

ইটের রাস্তা ধরে তারা পশ্চিমের দিকে হাঁটতে থাকে। রাস্তায় এখনো লোকজন কম। দু পাশের বাড়িগুলোর বাসিন্দারা আড়মোড়া ভাঙছে। আড়াইলের, খোঁয়াড়ের দরজা খুলে দিচ্ছে। উনুনের বাসি ছাই তুলে নিচ্ছে। এ পাশে কিঞ্চিৎ ঘন বসতি। এরপর ছাড়া ছাড়া, বিচ্ছিন্ন বাড়িঘর। সেসব ছাড়িয়ে গিয়েও রাস্তা আছে, রাস্তা চলে গেছে ঘাটঘর। কিন্তু আর কোনো বাড়িঘর নেই। জমি আর জমি। তাতে ধানের সিজনে ধান, ডালের সিজনে ডাল, সবজির সিজনে সবজিক্ষেত হচ্ছে। যেন আলাদা সিজনে জমি আলাদা আলাদা রঙের জামা পরছে।

স্লামালিকুম দাদা। কখন আসছেন?

আসলাম হুজুর মুজাম্মেলকে সালাম দেয়। সাইকেলে চড়েনি সে, হাতে ধরে চালিয়ে আসছিল।

গতকাল বিকালে আসলাম।

কদিন থাকবেন?

না, কাল চলে যাব। একদিন বন্ধ পেলাম। আপনি কৈ যান?

টিউশনিতে যাই। হারুন ভাইর ছেলেরে পড়াই।

আসলাম হুজুর পাশ কেটে চলে যায়। মুজাম্মেল সাবিনাকে বলে, আসলাম হুজুর ইমাম। মসজিদে নামাজ পড়ায়।

নীল পাঞ্জাবি পরেছে হুজুর। আর লুঙ্গি। মুজাম্মেল আসলাম হুজুরের চলে যাওয়া পথের দিকে ফিরে দেখে। তাকে এখন আর দৃষ্টির ভেতর দেখা যাচ্ছে না।

মুজাম্মেল বলে, আসলাম আমাদের কাছারিতে থাকত। মসজিদের ইমাম হয়ে আসার পর কোথায় থাকবে প্রশ্ন আসলে আমাদের কাছারিতে থাকা ঠিক হয়। আসলাম অনেকদিন পর গ্রামের বাইরে থেকে আনা ইমাম।

সাবিনা ঔৎসুক্য নিয়ে মুজাম্মেলের কথা শুনছে। মুজাম্মেল কথা বলছে, একই সাথে হাঁটছেও। জোরেই হাঁটছে। এভাবে হাঁটলে আধ ঘণ্টার ভেতর হয়তো ঘাটঘরে পৌঁছে যাবে তারা। কাছারিঘর সাবিনাও দেখেছে। এখনো আছে বাড়ির সামনে। একপাশে ঢেঁকি, বাকি অংশ স্টোররুম। দড়ি টাঙিয়ে বৃষ্টির দিনে কাপড়ও শুকাতে দেওয়া যায়।

মুজাম্মেল বলে, কাছারির সামনে চাপাকল তো দেখেছ। সেই চাপাকলে খাবার পানি নিতে আসত আসমা। একানব্বইয়ের ঘূর্ণিঝড়ের পর পাবলিক হেলথের পক্ষ থেকে এই ডিপ টিউবওয়েল দিয়েছিল।

সাবিনা বলে, আসমা চাপাকলে পানি নিতে আসত, তাতে কি?

কলতলা পাকা করে দিয়েছিল বাবা। কাছারির দরজার সামনেই কলতলা। পানি নিতে আসা বউ-ঝিরা প্রায় সবাই বয়স্ক হলেও আসমা তখন এইট কি নাইনে পড়ে। সেই আসমার সাথে প্রেম হয় আসলামের।

বিয়ে হয়েছিল? সাবিনা জানতে চায়।

আসমার বিয়ে হয় কলেজে ওঠে। আসলাম হুজুরের সাথে।

বেশ হলো তো! লাভ ম্যারেজ!

সেও কম হাঙ্গামা হয়নি। আসমার বাবা জাফর কোনোভাবেই দেবে না। দুয়েক জায়গায়, অনেক দূরে দূরে, এই ধরো নড়ালিয়া, মায়ানী, জোরারগঞ্জ গিয়ে ছেলে দেখে আসে। কিন্তু ছেলেপক্ষ মেয়ে দেখার তারিখ দিয়ে আর আসে না। বলে, মেয়ের মা হিন্দু।

মেয়ের মা হিন্দু? সাবিনার কণ্ঠে বিস্ময় আর প্রশ্ন।

তারা তখন গ্রামের চৌহদ্দির বাইরে চলে এসেছে। ছোট বাজারের মতো সে জায়গা। সামনে দিঘি। দিঘির উত্তর পাড়ে ১৯১৩ সালে স্থাপিত প্রাইমারি স্কুল। এখান থেকে রাস্তা চলে গেছে ঘাটঘরের দিকে। নাক বরাবর রাস্তা ঘাটঘরের। আরেক রাস্তা গেছে উত্তর দিকে। সৈয়দপুর, কমরালী, সাহেরখালী হয়ে শান্তিরহাট পর্যন্ত। সামান্য সামনে গেলে লোহার ব্রিজ, সেখান থেকে সেই রাস্তা শুরু। বাজারের মতো জায়গাটা এখনো নীরব, দোকানপাট খোলেনি।

মুজাম্মেল বলে, বাম দিকে গেলে কয়াল বাড়ি পড়বে। কয়ালরা এখন নামের সাথে কয়াল লিখে না, সাতচল্লিশের আগে থেকে লিখে চৌধুরী। আমার বাবার বন্ধু ছিল সুবিমল চৌধুরী, কয়াল বাড়ির। এক ব্যাচে ম্যাট্রিক পাশ করেছে। সেই বাড়ির অমল চৌধুরীর মেয়ে লিপিকাকে বিয়ে করেছিল জাফর। জাফর আলাপি রসিক ছেলে ছিল।

রাস্তার দুপাশেই এখন কেবল জমি আর খেজুরগাছ। পরুলক্ষেতে হলুদ ফুল ফুটে আছে। ঢেঁড়শক্ষেতেও হলুদ ফুল। আর সব ধানক্ষেত। সাবিনা মুগ্ধতা নিয়ে পরুল ফুল দেখছে। চাঙ্গের উপর ঝুলতে থাকা পরুল দেখছে।

সে জিজ্ঞেস করে, জাফরের সাথে লিপিকার পরিচয় কী করে হলো?

অমল চৌধুরী বর্মায় ছিল অনেক দিন। ব্যবসা করত। ৬৫ সালে দেশে আসার পর আর যায়নি বর্মা মুল্লুকে। বর্মা থাকতেই অনেক জমি কিনেছিল। তার জমির চাষ তদারকি করত জাফর। সেই আসা-যাওয়া থেকে প্রেম।

কয়াল কি? টাইটেল? সাবিনা জানতে চায়।

কর্মকার, সাহা, ঘোষের মতো কয়ালও টাইটেল, পদবী। যারা লবণ মেপে রাখত তারা হলো কয়াল। এ এলাকায় একসময় লবণ হতো। একটু উত্তরে গেলে ভগবানপুর পাবে, এখন লোকজন বলে ভগনপুর। আর এই এখান থেকে এক মাইল দক্ষিণে গুলিয়াখালী, সব ছিল নিমকমহল। এখন যেমন নদীর পাড়ে পাড়ে সব বালিমহল, তোলা বালি স্তূপ করে রাখে, এখানেও হয়তো সেই সময় লবণ স্তূপ করে রাখত।

এসব কোন আমলের গল্প বলছ? সাবিনা জানতে চায়।

এই ধরো নবাবি আমলের শেষ, কোম্পানি আমলের শুরু।

এসব বলতে বলতে মুজাম্মেল নিজের ভেতর কেমন হারিয়ে যায়। আকাশে এখনো মেঘ আছে। ধোঁয়ার মতো মেঘ, কচি আখের পাতার মতো মেঘ। পাশ দিয়ে কৃষ্ণকায় কিশোর ৪/৫টা মহিষ নিয়ে যাচ্ছে।

এই জনপদে একসময় লবণ চাষ হতো। সমুদ্রের পানিকে জাল দিয়ে তৈরি হতো লবণ। সাদা সোনা। মোবারকঘোনা, ভগবানপুর, গুলিয়াখালী, আলেকদিয়া, রাজাপুর, সলিমপুর, বাঁশবাড়িয়া ১৭৭৫ সালের জরিপে এ রকম দশটা জায়গায় লবণের গোলা ছিল।

এখনকার সীতাকুণ্ড মীরেরশ্বরাই, তখনকার নিজামপুর পরগনায়। শহরের পতেঙ্গায়ও লবণের গোলা ছিল, এখনো বলে সল্টগোলা। নভেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত হতো লবণের উৎপাদন। লবণের কন্ট্রাক্টর থাকত বাঁশবাড়িয়ায়। মুজাম্মেল ভাবে, এ রাস্তা ধরেই কি লবণ বোঝাই মহিষের গাড়ি, গরুর গাড়ি লবণের গোলায় যেত?

সাবিনা হাঁটতে হাঁটতে সামান্য সামনে চলে গেছে। খাইয়ের উপর বলাইগাছ, তাতে হলুদ ফুল। সে ফুল দেখছে। বলাইগাছের ফুলও ঢেঁড়শের ফুলের মতো।

সাবিনাকে ডাক দেয় সে। বলে, আমাদের গ্রামের নাম জানো?

জানি তো। গোলাবাড়িয়া।

গোলাবাড়িয়া মানে এখানে লবণের গোলা ছিল। লবণের গোলা থেকে গ্রামের নাম গোলাবাড়িয়া। পাঁচ হাজার মনের উপর লবণ রাখা যেত একেক গোলায়।

তারা এখন গ্রাম আর ঘাটঘরের মধ্যবর্তী দূরত্বে। রাস্তার পাশে রাজাখালী খাল। খালপাড়ই রাস্তা। পাড়ে কেরাংগাছ, বাবলাগাছ, বইগোটাগাছ, বলাইগাছ। এই খালে জোয়ার-ভাটা হয়। খাল আর রাস্তার দু পাশেই ইরিধান। আরো দক্ষিণে, বিলের ভেতর রাস্তা দেখিয়ে মুজাম্মেল বলে, ওই রাস্তার নাম ইসলামাবাদী সড়ক।

ইসলামাবাদী সড়ক? কোন ইসলামাবাদী? সাবিনা জানতে চায়।

ইসলামাবাদী মানে মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী।

কী বলো? উনার বাড়ি তো চন্দনাইশে, আড়ালিয়ায়। আড়ালিয়া চর থেকে আড়ালিয়া গ্রাম, শঙ্খ নদীর পাড়ে। শহরের কদম মোবারক মসজিদের পাশে কবর। উনার ছেলে শাজাহান কমান্ডার আমার বড় চাচার বন্ধু ছিলেন। মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার। লোকজন চেনে শাজাহান কমান্ডার নামে।

সাবিনার বাপের বাড়ি চন্দনাইশে। মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর নাম ছোটবেলা থেকে শুনেছে। সারা ভারতে কংগ্রেসের পরিচিত নেতা ছিলেন। যাত্রামোহন সেন, যতীন্দ্রমোহন সেনের বাড়িও চন্দনাইশের বরমায়। কলকাতায় কংগ্রেসের রাজনীতির তাঁরা বড় নিয়ন্ত্রা ছিলেন।

মুজাম্মেল বলে, সীতাকুণ্ড আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন তিনি। তখন এখানে খামারবাড়ি ছিল উনার। তার স্মৃতিতে রাস্তার নাম ইসলামাবাদী সড়ক।

এ রাস্তার মাথাতেই ঘাটঘর। সামনে টেক, রাস্তার বাঁক। টেক পেরুলেই ঘাটঘর চোখে পড়বে। টেকে একসারি তালগাছ লাগানো। সংখ্যায় পাঁচটা হবে। গাছের নিচে সবুজ ঘাস।

সাবিনা বলে, তোমার গ্রাম না হলে এখানে বসা যেত। তার তালগাছের নিচে ঘাসে বসতে খুব ইচ্ছে করছে।

মুজাম্মেল ডান হাত উঁচিয়ে দেখায়, ওই যে দেখ ঘাটঘর।

এখান থেকে পরিস্কার ঘাটঘর দেখা যাচ্ছে। সামনে আসলে বেড়িবাঁধ। খালে স্ল্যুইচগেট। তিনটে কপাট দেখা যাচ্ছে। রাস্তা সোজা উঠে গেছে বাঁধের উঁচুতে, টপে। রিকশায়, গাড়িতে বাঁধে উঠে পড়া যায়। মুজাম্মেল আর সাবিনা বাঁধের উপরে ওঠে। স্ল্যুইচগেটের পরেও রাজাখালী খাল। খাল সোজা পড়েছে সন্দ্বীপ চ্যানেলে। স্ল্যুইচগেট-সংলগ্ন খালের দক্ষিণ পাড়ে চায়ের দোকান, জেলা পরিষদের যাত্রীছাউনি। দক্ষিণ পাড় ধরেই একটা রাস্তা চলে গেছে কেওড়া বাগানের দিকে।

মুজাম্মেল বলে, এখান থেকে দিনে দুইবার, সকাল আর অপরাহ্নে ট্রলার যায় সন্দ্বীপের গাছুয়া। আবার গাছুয়া থেকে ফিরতি দুই ট্রিপ আসে। জোয়ারে ট্রলার চলে আসে স্ল্যুইচগেটের নাম্বায়। আর ভাটাতে ট্রলার নোঙর করে, দাঁড়ায় খালের মুখে। রাজাখালী খালের মোহনায়।

এই সকালেও কয়েকজন যাত্রী এসে যাত্রীছাউনিতে বসে আছে। চায়ের দোকানে ঢুকে মুজাম্মেল জিজ্ঞেস করে, ট্রলার কয়টায় ছাড়বে মুরব্বি?

দোকানদার বলে, ট্রিপ দশটায়।

মাটির তন্দুলে নানরুটি বানাচ্ছে আঠারো-উনিশ বছরের একটা ছেলে। সাবিনা বলে, নাস্তার জন্য নানরুটি নিয়ে নাও।

মুজাম্মেল দুটো করে ধরে ঘরের সবার জন্য রুটি অর্ডার করে।

সাবিনা দোকানদারকে জিজ্ঞেস করে, এটার নাম ঘাটঘর হলো কেন?

দোকানদারের নাম মীর হোসেন। সে বলে, সন্দ্বীপ যাবার ঘাট আছে। ঘাটে চা-নাস্তা খাবার, বসে বিশ্রাম নেওয়ার ঘর আছে। সেজন্য ঘাটঘর।

সাবিনা বলে, সুন্দর বলছেন। ঘাট আর ঘর একসাথে।

দোকানি ছেলেটা তন্দুলে রুটি মারছে। সাবিনা স্ল্যুইচগেটের উপর এসে দাঁড়ায়। দাঁড়ায় রাজাখালী খালের মাঝ বরাবর। দাঁড়িয়ে দূরের সমুদ্র দেখার চেষ্টা করে। এ সময় হাতের ব্যাগে শব্দ হয়। তার মোবাইল বেজে ওঠে। মেয়ে রুদবা ফোন করেছে।

রুদবা বলে, তোমরা কোথায় বড়মা জানতে চাইছে।

সাবিনা বলে, আমরা কাছেই আছে। আসছি। নানরুটি নিয়েছি। বড়মাকে বল রুটি বানাতে হবে না।

ফোন রেখে মুজাম্মেলকে বলে, আমাদের রুটি বানানো হলে ঘরে চলো। বড় ভাবি ডাকছে।

বাঁধের উপর দুটো রিকশা এসে দাঁড়িয়েছে। ঘাটঘরে সন্দ্বীপ যাবার যাত্রী নিয়ে এসেছে। একটা রিকশা নিয়ে তারা বাড়ির দিকে যাত্রা করে।

দুই.
নাস্তা শেষ করে নিজেদের ঘরের খাটে এসে বসে মুজাম্মেল। পাখা চলছে। পাখার নিচে বসেছে সে। এই সকালেই সূর্য উষ্ণতা ছড়াচ্ছে। গরম লাগছে। মুজাম্মেল আসার খানিক পরে সাবিনাও ঘরে এসেছে।

সাবিনা বলে, তুমি দেখেছ আমরা আসার পর বড় ভাবি কেমন মুখ বেজার করে রেখেছিল?

মুজাম্মেলের তা নজরে এসেছে। খোরশেদা ভাবি কেমন ম্লান করে রেখেছিল মুখ। মনে হচ্ছিল চাপা রাগ, অসন্তুষ্টি চেপে রেখেছে। ঘাটঘরের দোকান থেকে আনা নানরুটি ভাবিকে বুঝিয়ে দিয়েছিল। তাতে কি একটু প্রসন্ন হয়েছিল তার মুখ?

মুজাম্মেল বলে, খোরশেদা ভাবি বেজার হলো কেন? মনের ভেতর চাপা রাগ, অসন্তুষ্টি জাগছে কেন?

সাবিনা বলে, কি জানি। সকালে আমরা ঘুরতে গেলাম আর উনি রান্নাঘরে নাস্তা বানাচ্ছেন, এজন্য হতে পারে।

মুজাম্মেল ভাবে, হতে পারে। খোরশেদা ভাবির মনের গতিক, ভেতরের ভাবনা সাবিনা ভালো বুঝবে। নারীদের মনের জগৎ, ভাবনার জগৎ নারীরা ধরতে পারে।

সাবিনা বলে, রুদবাকেও ভাবি নানা বিষয় জিজ্ঞেস করেছে।

কী রকম? কী কথা?

ঘটনা এ রকম : সাবিনা আর মুজাম্মেল হাঁটতে বের হবার পর রুদবা দক্ষিণের ঘরে আসে। তার বাবা-মার থাকার ঘরে। না পেয়ে এসে বসে সামনের বারান্দায়। খোরশেদা তখনো সেখানে বসে ছিল। খোরশেদা রুদবাকে তখন তার খালারা তাদের বাসায় আসে কি না, তার মামিরা আসে কি না জিজ্ঞেস করে, খোঁজখবর নেয়। জানতে চায় তারা তার মামিদের বাসায় বেড়াতে কেমন যায়।

সাবিনার কথা নীরবে শোনে মুজাম্মেল।

চট্টগ্রাম শহরের রহমতগঞ্জে থাকে তারা। মেয়ে খাস্তগীর গার্লস স্কুলে পড়ে। মুজাম্মেল চাকরি করে সিটি কর্পোরেশনের রেভিনিউ সেকশনে। তার শ্বশুরদের আত্মীয়-স্বজন, তার দুই সম্বন্ধী থাকে জামালখানে। মুজাম্মেলের ভাই দেলোয়ার চাকরি করে চট্টগ্রাম বন্দরে। বাড়ি থেকে ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করে।

সকালে তারা ঘাটঘরে ঘুরতে যাওয়ায় খোরশেদা ভাবির মনে কি ঈর্ষা কাজ করছে? মুজাম্মেল ভাবে। সাবিনার মনেও কি সে ঈর্ষার প্রভাব পড়ছে? তার ভেতর কি চাপা রাগ, অসন্তোষ জন্ম নিচ্ছে?

মুজাম্মেল ঘর থেকে বেরিয়ে উঠানে আসে। নাস্তা খাবার আগে আগে দেলোয়ার ভাই গোসল করেছে। খোরশেদা তার বদলানো লুঙ্গি, গামছা ধুয়ে উঠানে টানানো তারে শুকাতে দিচ্ছে।

মুজাম্মেল বলে, বড় ভাবি, আজ বিকালে দেলোয়ার ভাইকে নিয়ে বাজারে ঘুরে আসেন।

কাপড় শুকাতে দিতে দিতে খোরশেদা তার দিকে তাকায়। মুজাম্মেল কি বলল তা বুঝে উঠতে পারে না সে। জিজ্ঞেস করে, কী বললে ছোট ভাই?

মুজাম্মেলকে খোরশেদা ছোট ভাই বলে ডাকে।

সে বলে, আজ বিকালে দেলোয়ার ভাইকে নিয়ে বাজার থেকে ঘুরে আসেন।

মুজাম্মেল তাকে বাজার থেকে ঘুরে আসতে বলছে? বাজার মানে প্রায় তিন মাইল দূরের উপজেলা সদর, কাঠগড় বাজার। বাড়ি থেকে পাঁচ মিনিট হাঁটলেই গোলাবাড়িয়া প্রাইমারি স্কুল। তার সামনে থেকে টেক্সি যায়। আবার ব্যাটারি রিকশায় করেও যাওয়া যায়।

কেন ছোট ভাই? বাজারে কি তোমার কোনো কাজ আছে? কোনো কিছু কেনা লাগবে?

না, আমার কোনো কাজ নেই। বাজারে তো এখন অনেক নতুন নতুন মার্কেট হয়েছে। মেয়েদের রেখে তো যেতে পারেন না। আজ যান, ঘুরে আসেন। আমরা তো ঘরে আছি।

মুজাম্মেলের কথা সত্যি। উপজেলা সদরে নতুন নতুন মার্কেট হয়েছে। শপিংমল হয়েছে। সিকোরোক্স সিটি নামে পাঁচতলা মার্কেট হয়েছে। লিফট বসেছে। চেইন সুপারশপের শাখা খুলেছে সেখানে। আর আশ্চর্য, সেসব দোকান থেকে ভ্যাট দিয়ে লোকজন জিনিসপত্রও কিনছে।

খোরশেদা প্রথমে যাবে না ভেবেছিল। তার কেমন লজ্জা লজ্জা লাগছে। সংকোচ লাগছে। আবার যেতেও মন চাইছে। পরে দেলোয়ারকে বলে, ছোট ভাই বলছিল আমরা আজ বিকালে কোথাও থেকে ঘুরে আসি। মেয়েরা ঘরে থাকবে।

দেলোয়ার খোরশেদার কথা শুনে হেসে ফেলে। কিঞ্চিৎ অবাকও হয়। খোরশেদা কখনো ঘুরতে যাবার আবদার করে না। কোনো কিছু দরকার পড়লে মেয়েদের নিয়ে কাঠগড় বাজার থেকে কিনে আনে। জিজ্ঞেস করে, কোথায় ঘুরতে যাবে?

এই ধরেন কাঠগড় বাজারে যেতে পারি। সবাইকে চা-নাস্তা দিয়ে আসরের নামাজ পড়ে বের হলাম।

দেলোয়ার জলচৌকিতে বসে আছে। মাথার চুলে বাটা মেহেদি লাগিয়ে দিচ্ছে খোরশেদা। গলা শুনেই দেলোয়ার বুঝে তার মনে কেমন ফুর্তি ভাব, খুশি খুশি ভাব।

দেলোয়ার বলে, যেতে পারি। নামাজের পরেই বেরোই তাহলে।

নামাজের পরেই খোরশেদা আর দেলোয়ার বের হয়। খোরশেদা আজ শাড়ি পরেছে। সচরাচর বাড়ির বাইরে বেরুনোর সময় সে বোরকা পরে। বোরকা পরে না কোনো বিয়েশাদিতে গেলে। আজ কোনো বিয়ে শাদির অনুষ্ঠান না থাকলেও সে বোরকা পরেনি। টেক্সি স্ট্যান্ডে এলে দেলোয়ারকে বলে, ব্যাটারি রিকশা নেন।

খোরশেদার কি আজ পাশাপাশি রিকশায় চড়তে ইচ্ছে করছে? স্ট্যান্ডে দাড়ানো টেক্সি তাদের উঠবার জন্য ডাকে। কাঠগড় বাজার পর্যন্ত লোকাল টেক্সি যায়। দেলোয়ার রিকশা আসার জন্য অপেক্ষা করে। খানিক দাঁড়াতেই খালি ব্যাটারি রিকশা আসে।

কি দাদা, ভাবিরে নিয়ে বাজারে যাবেন? নরউন নবি জিজ্ঞেস করে।

নরউন নবি রিকশা ড্রাইভার। রিকশা চালানোর সাথে বিয়েশাদি, খানা মেজবানির পাকও করে, বাবুর্চি। দেলোয়ার খোরশেদাকে চেনে। তাদের বাড়ির অনুষ্ঠানের রান্না সে করে।

বাজারে কিছু কেনাকাটা আছে। খোরশেদা জবাব দেয়।

আসলেই যদি পায় কিছু জিনিস কিনবে সে। রুটি বেলার কাঠের বেলুন, মেয়ের পাজামার কাপড় আর কিছু কসমেটিকস।

প্রাইমারি স্কুল আর গোলাবাড়িয়ার ছোট বাজার পেরিয়ে গেলে টানা বিল। খুব বড় বিল না, বিশেষ করে চওড়ায়। এ পাশ থেকে ওপারের হাজারি রোড, সেন বাড়ি, সেন বাড়ির সামনের পাল বাড়ি চোখে পড়ে। আর বিলের ইরি ধান। রাস্তার দুপাশে নতুন নতুন ভিটা উঠছে। কয়েক দিন পরেই হয়তো এ ভিটাতে বাড়ি উঠবে। এ রাস্তা দিয়ে মাসে দুয়েকবার খোরশেদার যাওয়া লাগে। মেয়েদের স্কুলে যায়। কখনো মুদি দোকান, স্বর্ণের দোকানে যায়। বাপের বাড়ি যে দারোগাহাট, সেখানেও যেতে হয় প্রায় মাসে। বাবার অসুখ, কদিন না গেলে মন টানে। কিন্তু দেলোয়ারের সাথে এক রিকশায়, কোনো কাজ ছাড়া কখন একত্রে বেরিয়েছে তা মনে করতে পারে না। সে দেলোয়ারের দিকে তাকায়। দেখে দেলোয়ার তার দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের ভেতর কি প্রেমের অনুভূতি জাগছে? খোরশেদার প্রতি দেলোয়ারের প্রেম অথবা দেলোয়ারের প্রতি খোরশেদার প্রেম জাগছে?

খোরশেদারা এখন বিল এলাকার মধ্যখানে। রাস্তার এক পাশ দিয়ে বারিয়াখালী খাল গেছে। সামনে ব্রিজ। সে ব্রিজ পার হলে বিল এলাকা শেষ হবে।

নরউন নবি জিজ্ঞেস করে, দাদা বাজারে নামবেন? নাকি নামার বাজার নামিয়ে দিব?

দেলোয়ার খোরশেদার দিকে তাকায়। তার বউকে কি কালো বলা যায়? অথবা আরেকটু ছাড় দিয়ে শ্যামলা? সে ভাবে তার বউয়ের চেহারায় বড় মায়া আছে। আকর্ষণ আছে। তাকে খুব টানে।

খোরশেদা বলে, নামার বাজার নামিয়ে দিও ও ভাই।

ব্রিজ পেরুলেই উপজেলা হেডকোয়ার্টারের যে গোছানো, শহুরে ভাব তা এসে পড়ে। ব্রিজের পাশেই খালপাড়ে নায়েক শফির ভাড়া ঘর। নায়েক শফি পৌরসভার মেয়র ছিলেন। তারপর স্ট্যান্ডার্ড ল্যাবরেটরির বিল্ডিং, ফুটবলার স্বপন সেনদের মার্কেট, বাঁশের বাজার। আর নামার বাজারে নামলে রিকশা নামিয়ে দেবে বৌদ্ধবিহারের সামনে।

খোরশেদা রিকশা থেকে নেমে বলে, চলেন, আগে সিকোরেক্স সিটিতে যাই।

কেমন উচ্ছ্বাস, ফুর্তি তার গলায়। অন্য সময়ের মতো ম্রিয়মাণ, ম্লান গলা না।

সিকোরেক্স সিটিতে আগে কেন? দেলোয়ার বলে।

ওখানে নাকি নতুন দোকান হয়েছে। সব পাওয়া যায়। আর মার্কেটটার করিডোর কত বড়।

দেলোয়ার বোঝে, সুপারশপ মীনাবাজারের শাখা এসেছে। খোরশেদা সেটা দেখতে চাইছে। আগে আগে খোরশেদা হাঁটে। নামারবাজার থেকে বাইপাস সড়কে উঠে একটু গেলেই মার্কেট।

কেমন যেন নরম আলো, নারকেলের সরের মতো নরম আলো চারপাশে। বাইপাস রোডের ডিভাইডারে হলুদ রাধাচূড়া ফুল ফুটে আছে। কোথাও কোথাও রক্তকরবী। মার্কেটের পার্কিং প্লেসে বড় কৃষ্ণচূড়াগাছ। গোড়া পাকা করা, যেন চাইলে কেউ বসতে পারে।

খোরশেদা বলে, চলেন কৃষ্ণচূড়াগাছের নিচে বসি।

দেলোয়ার লজ্জা পায়। বলে, আশেপাশে কত চেনা লোক। দেখলে কী ভাববে?

হেঁটে এসে তো ক্লান্ত হয়ে গেলাম। সামান্যক্ষণ বসি। কেমন হাওয়া দিচ্ছে।

তারা দুজন কৃষ্ণচূড়াগাছের নিচে বসে। তাদের দেখেই যেন কোথা থেকে ঝালমুড়িওয়ালা আসে। দুটো ঝালমুড়ি নেয় দেলোয়ার। তাদের মধ্যে কোনো ব্যস্ততা নেই, তাড়াহুড়ো নেই। সব কিছু চেখে চেখে, চিবিয়ে চিবিয়ে, টিপে টিপে দেখছে যেন, সেরকম ভঙ্গি।

ঝালমুড়ি খেয়ে তারা মার্কেটে ঢোকে। সুপার স্টোরে যায়। মানহা, মুনতাহা, রুদবার জন্য চকলেট কেনে। সুপার স্টোরে স্টেক করা মালের নানা সারিতে ঘোরে। দেলোয়ারকে খোরশেদা বলে, কোনো কিছু তো আর বাদ নেই। দাড়িকানা মাছও আছে।

তবে তাদের খুঁজতে থাকা রুটি বানানোর বেলুন সেখানে পায় না। নিজের জন্য খোরশেদা কিছু কসমেটিকস কিনে।

সুপারশপ থেকে বেরিয়ে তারা মার্কেটের নানা ফ্লোরে ঘোরে। পাঁচতলা মার্কেট। আসলে কি আর কিছু কিনবে খোরশেদা? সে হয়তো কেবল দেখছে। সাথে দেলোয়ার আছে, তার আনন্দ হচ্ছে। এক ধরনের পুলক, তৃপ্তি হচ্ছে।

এ সিকোরেক্স সিটির জায়গায় একসময় তিনতলা বিল্ডিং ছিল। লোকজন বলত নূর বিড়ি কোম্পানির বিল্ডিং। কেউ কেউ বলত সোনালি ব্যাংক বিল্ডিং। দোতলার পুরো ফ্লোরে ছিল সোনালী ব্যাংক। বিল্ডিং ছিলো নূর বিড়ি কোম্পানির মালিক নূর আহম্মদের। নূর বিড়ির অফিস, কারখানা ছিল নিচে। সে কারখানায় খোরশেদার বড় মামা আলম ম্যানেজার ছিল। খোরশেদা কোনো কোনো মাসে আসত সেই মামার কাছে। কেন আসত? তার বাবা ফোন করে হয়তো কোনো খবর দিত। কথা বলত। মার্কেটে হাঁটতে হাঁটতে সেইসব কথা, স্মৃতি মনে পড়ে তার। তারা নানা দোকান ঢুকছে। শাড়ির দোকান, থান কাপড়ের দোকান।

বাইরে আলো বিদায় নিয়ে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। মার্কেটের বাইরে দোকানের রাস্তায় লাইটগুলো জ্বলে ওঠে। মাগরিবের আজান হয়। খোরশেদা এবার মার্কেট থেকে বেরিয়ে আসে। রাস্তায় ফুচকার দোকান পড়ে।

দেলোয়ার বলে, ফুচকা খাবে?

খোরশেদা তো খাবার জন্য সম্মতই ছিল। তারপর তারা থান কাপড়ের দোকানে যাবে, কাঁচাবাজারে যাবে। কলেজ রোডে থান কাপড়ের কোকারিজের দোকান দেখতে দেখতে সুন্দর কাঠের বেলুন পেয়েও যাবে। সকালে মুজাম্মেল আর সাবিনাকে হাঁটতে বেরুতে দেখে তার মনের ভেতর অজান্তেই ঈর্ষা তৈরি হয়েছিল। হাঁটা তো উসিলা, আসলে তারা বেরিয়ে ছিল ঘুরতে। ইচ্ছা হচ্ছিল নিজেরাও ঘুরতে যাবার। কেবল মনে হচ্ছিল, কতদিন দেলোয়ারের সঙ্গে সে কোথাও যায়নি, বেরোয়নি। সামাজিকতার ভেতরেও, সংসার ভেতরেও নিজেদের দাম্পত্য একান্ত যাপনের কিছু সময় তো কখনো কখনো লাগে। আজ অনেকদিন পর সে সময় এসেছে।

আজকের দিন সবকিছু ধীরেসুস্থে, রসিয়ে রসিয়ে, আনন্দ নিয়ে দেখবার দিন যেন খোরশেদার।

তিন.
সাবিনা আর মুজাম্মেল বাড়ির উঠানে বসে আছে। প্লাস্টিকের চেয়ার ঘর থেকে বের করে এনেছে। সাবিনা ভাবে, শহরের সবুজগুলো কেমন বিচ্ছিন্ন, ছাড়া ছাড়া। আজ সকালে যে টানা সবুজ দেখেছে, তাতে চোখে যেমন আনন্দ হয়েছে, তেমনি মনেও। সে বলে, বাসায় গেলে একটা নাকফুল কিনতে হবে।

মুজাম্মেল বলে, কিনবে।

নাকফুলের কথাতেই যেন সাবিনার বিয়ের ওড়না আর টিকলির কথা মনে পড়ে। কতদিন আগের কথা সেসব। বিয়ের নতুন ওড়না আর টিকলি না কিনে ধার নিয়েছিল বড় ভাবি খোরশেদার কাছ থেকে। সাবিনা সে কথা জানত না। সে ধরে নিয়েছিল ওড়না আর সোনার টিকলি তার। মুজাম্মেলও সে কথা তাকে কখনো বলেনি। রান্না করতে করতে খোরশেদা একদিন তাকে সে কথা বলল। মুজাম্মেল তখন বৃহস্পতিবার বাড়ি আসে। সারা সপ্তাহ থাকে চট্টগ্রাম শহরে। সাবিনাকে তখনো শহরে নেয়নি। তার গহনা থাকত তার শ্বশুর মকসুদ আলির কাছে।

দুপুরে খাবার পর সাবিনা তার শ্বশুরের কাছে যায়। বলে, বাবা, বিয়ের সময় বড় ভাবির কাছ থেকে টিকলি আর ওড়না নিয়েছিলেন নাকি?

শ্বশুর তার কথা শুনে বিহ্বল হয়ে পড়ে। আধুলির মতো রোদ বাইরে।

শ্বশুর জিজ্ঞেস করে, তুমি কীভাবে জানো? তোমাকে কি বড় বউ বলেছে?

সাবিনা বলে, না বাবা। বড় ভাবি বলেনি। শোনেছি।

সেদিনই শ্বশুর থেকে ওড়না আর টিকলি নিয়ে বড় ভাবি খোরশেদাকে ফেরত দিয়েছিল। কোনো কারণ ছাড়াই সাবিনার এসব কথা মনে পড়ে। উঠানে হাওয়া দিচ্ছে। দূরের ঝোপে জোনাকি উড়ছে। সাবিনা ভাবে, একেক জায়গায় বসবাসের একেক রকম সুুখ, একেক রকম আয়াস।

তার এসব ভাবনার ভেতর, মগ্নতার ভেতর রিকশাটা যেন উঠানে চলে আসে। দেলোয়ার আর খোরশেদা রিকশা থেকে নামে।

মুজাম্মেল বলে, কেমন ঘুরলে ভাবি?

খোরশেদা কিছু বলে না। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে হাসে। ঘরের আলোতে দেখা যায়, তার চোখে সমুদ্রের পানিতে রোদ পড়ে চিকচিক করার মতো আনন্দ চিকচিক করছে। ·


লেখক পরিচিতি : শোয়ায়েব মুহামদ। জন্ম ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থানার হাসনাবাদ গ্রামে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনে কর্মরত। প্রকাশিত বই : ঘুড়িযাত্রা, নাচের পুতুল, দার ম্যানরিক, গুমরাহ।