একদম গাছ চিনিনা আমি। পাখী না। ফুলও না। তবু আমি যেহেতু কবিতা লিখি, আমার কবিতায় দেবদারু, অর্জুন, নীলকণ্ঠ, গুলমোহর এসব শব্দ সহজেই এসে পরে। আশিসদা এ নিয়ে কট্টর সমালোচনা করতেন এবং প্রতিবারই আমি বা আমরা [সবারই শব্দ ব্যাধি স্বীকৃত] কবির মানসচক্ষু ইত্যাদি বলে সে সব পুরোপুরি নস্যাৎ করে ফেলি। এখন ১৭ এর যুবক নই যেহেতু, কবি বলে পরিচিত হতে হলে আগের মত গর্ব্বের বদলে লজ্জা পাই। সোজাসুজি মনে হয় গাল দিচ্ছে। তবু অঙ্গীকার করে লাভ নেই, প্রতি হপ্তাতেই কিছু না কিছু লিখি সে সব কিছুকেই ভাল লেখার প্রস্তুতি বলে মনে করি। আত্মতুষ্টিতে ভুগি। আর এসময় এক ধরণের দুঃখ বোধে ভুগি, না চেনার দুঃখে। গাছ না। ফুল না । এক ধরণের অপরাধ বোধ কাজ করে। আমার ছোট ছেলে এখনও ভাল করে কথা কইতে পারে না । আগামী এক বৎসর পর মুখে খই ফুটবে এবং সে যখন তার কচি হাত তুলে জিজ্ঞাসা করবে, বাবা ওটা কি গাছ বা ওটা কোন্‌ তারা, তখন কি উত্তর দোব এই ভেবে আশঙ্কিত হই।

এই ভাবে আশঙ্কায় ও অস্বস্তিতে দিন কাটে। সেদিন পড়ন্ত বেলা। মাঠে জমাটি শিশুর দঙ্গল। হঠাৎ করে কলেজের পুকুরের ধারে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা গাছের দিকে চোখ পরে। বড্ড আহত হই এবং আমার ব্যথার অংশীদার করার জন্য বাড়ীতে ঢুকেই সে খবর দিই—‘বুলা, কলেজের মাঠের সেই গাছটা তোমার মনে আছে ?’— বুলা আমার স্ত্রী খুউব স্মার্ট এবং প্রম্পট। জো-কে পোষাক পরাতে পরাতে উত্তর দেয় কোন গাছ? কলেজের মাঠে তো একাধিক গাছ আছে । 'না—না, তুমি বুঝতে পারছ না কোন গাছটা, সব চেয়ে সবুজ আর বড় যেটা’

আম গাছ?

‘না না ঐ যে কি যেন নাম। [মোটেও নাম জানতাম না আমি ]’ পুকুরের ধারের সেই খুউব সুন্দর গাছটা।

—পুকুরের কোন দিকে ?

আমি সূর্য্যের দিকে মুখ ঠিক করে, বাম ডান হিসেব করে উত্তর দিই

—দক্ষিণ দিকে মনে নেই ? কালুদের বাড়ীর পেছনে।

—ওমা, ওই খুউব বড় গাছটা, আমাদের গরমের দুপুরের গাছ ? কি গাছ গো ওটা ?

—গরমের দুপুরের গাছ।

—যাঃ তাই আবার হয় নাকি ? ওটা তো আমি নাম জানিনা বলে বল্লাম।

—আমিও তো জানি না বুলন।

—বারে, তুমি যে কবিতা লেখ।

হয়তো বুলনের এটা সরল সিদ্ধান্ত। তবু নিজের হীনমন্যতায় আমার এটাকে নিপাট খোঁচা মনে হয়। বড় অস্বস্তিতে কাটে সারাটা সন্ধ্যে বেলা। চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে, জো-কে আদর করতে করতে আমি স্মৃতি হাতড়াই, নাম খুঁজি। যেন আমি জানতাম। আসলে আমার জানা উচিত ছিল। কারণ খুউব কৈশোরে এই গাছের তলায় বসে পেয়েছিলাম নিষিদ্ধতার স্বাদ; নিয়ম ভাঙার সুখ। যৌবনে এখানেই চরম বকুনতুড়ে আমি, আমরা কজন এবং এক দীর্ঘ দোল পূর্ণিমা রাতে এখানেই বুলনকে প্রথম স্পর্শের সুখ। তারপর রোজ দুপুরে আমরা দুই শালিখ। মৃণাল, পল, রাজা, জহর—ওরা কি জানে? কাকেও জিজ্ঞেস করি, অনেক দিন কোনও যোগাযোগ নেই। তবে কেমন যেন স্থির বিশ্বাস আমার, ওরা নিশ্চয়ই জানে। একই ঢালাই সবাই কিনা।

দুদিন পরে এক রোববার সকালে বুধাদাকে জিজ্ঞেস করি। সংসারী হয়েছি জেনে উনি আমায় মিষ্টি করে জিজ্ঞেস করেন— ‘কেনরে কবি, কিনবি ?” আমি চূড়ান্ত খোঁচা খেয়ে পিঠটান দিই। দ্রুত পায়ে। চলতে চলতে দেখি সব ফাঁকা জায়গা কেমন ভরে যাচ্ছে। এই সেদিনই তো এখানে ব্যাডমিন্টন খেলার কোর্ট কাটা ছিল। এখন নতুন বাড়ীর সব কাঠামো। বাঁশের মাথার মাচান। চীপস। আর খাঁড়া দাড় করানো বাঁশের মাথায় কাকতাড়ুয়া। এতদিন জানতাম জমিতেই মানুষ ওসব ঝোলায়। পশু-পাখি অশুভ আত্মার হাত থেকে ফসল রক্ষার জন্য। ইদানীং মানুষের ঈর্ষায় কি কংক্রীটেও ফাটল ধরে? বুধাদার হাত থেকে পালিয়ে আসতে আসতে কলেজের সীমানায় এসে পরি, আর অধ্যক্ষের কোয়ার্টার পেরোতে যেয়ে মাথায় তড়িৎ গতিতে কুঞ্জলালের নাম এসে পড়ে। গেল দুইবার শীতে আমাকে রোজ খেজুরের রস খাইয়ে ছিল ও। একদিন তাড়িও বা। ছোট বোন সুমির কাসির জন্য মার কথা মত কতদিন বাসব পাতার খোঁজে এসেছি এই পরিত্যক্ত বাসায়। কলেজে নতুন কেউ কার্যভার গ্রহণ না করার জন্য পরিত্যক্ত আবাসনটি যেন কোনও পুরুষ সিংহের প্রতীক্ষায়। মাঠে লাগানো আলু, কপি এসবের দেখা শোনা করত কুঞ্জলাল। সময় মত মাঠের ফসল ঘরে উঠে গেলো। বর্ষায় জমে গেলো জল। ব্যাঙেদের প্রকাশ্য প্রেমালাপ। আমাদের মত ছেলে ছোকরার টইটুম্বর জুয়ো খেলার দুপুর এখানে। এসবের পাশাপাশি ও থেকে গেলো এখানে। রাজার মতো। খাটো ধুতিতে। নীল ডোরা কাটা গামছায় । অসম্ভব বড় বড় চৌকো হলদে দাঁতের শোভায়। এখনও আমার মরে যাওয়া গাছটার নাম জানা হয়নি। মাথায় পোকা ঘুরছে। আর মাঠ পেরিয়ে কোয়ার্টার পেরোতে যেয়ে আমার বুক কথা বলছে। কুঞ্জলাল। ওই তো ঠিক জানবে কোন গাছে কোন কথা। প্রেম। কুঞ্জলাল খাটুয়া মাটির শরীর। ওর এই বয়সেও অম্বলের রাত নেই, খুধামান্দ্য নেই, হার্ট অ্যাটাক নেই। কানে লাল সুতো বাঁধা বিড়ি। হাতে চকচকে কাস্তে বা দা। ছাতু পান্তা খেয়ে ঘাসের আঁটি মাথায় নিয়ে আমাদের তালিমারা যৌবনকে লাথি মেরে রাজার মতো সে চোর কাটা ভরা মাঠ পেরিয়ে। বাবলার ডাল ভেঙ্গে দাঁতন করে। কোয়ার্টারে ল্যাট্রিন থাকলেও মাঠ পেরিয়ে নির্জনে বসে গালে হাত দিয়ে রেলগাড়ী দেখে। পুরনো দুপুরে কলেজ চত্বরে আড্ডা দিতে দিতে কতদিন দেখেছি বনবাদাড় জড়িয়ে ও কখনও বা সাফ করছে আর কখনও বা আড়ি পাতছে নতুন ফসলের খবর জানার জন্য। আমি নিশ্চন্ত জেনেছি সে আমার চেয়ে ভাল করে মেঘেদের বাতাসের সময়ের গন্ধ জানে। গন্ধে স্পর্শে ও ঠিক বলে দেবে কোন মাটিতে কোন ফসল কোন জঙ্গলে কালমেঘ, হেলঞ্চার গাছ। মেঘের ওড়াওড়ি দেখে বৃষ্টির খবর ও দেবে ঠিকঠাক। অথচ কবিতা লিখবে না কাগজে কলমে—আশ্চর্য।

যতদূর জানি মাস চারেক আগে গাছ থেকে পড়ে ঠ্যাং ভেঙ্গেছিল। সুতরাং ঘরে বা বারন্দাতেই হয়তো মাদুর পুঁটুলি সংসার সহ ওকে পেয়ে যাবো। এইভাবে গেট খুলে ভেতরে ঢুকি। আর আমাকে চিরকালের মত অবাক করে সে হাতের পাকা বাঁশের লাঠিখানাকে উঁচু করে কুলগাছ নাড়া দেয়। চেহারায় একটু পলি পড়েছে এই যা। কিন্তু এমন কিছু দুর্ব্বল বুঝি না। কে বলবে এই লোকটাই খেজুর গাছের মাথা পরিষ্কার করতে যেয়ে একদম ওপারে চলে যাবার অবস্থা হয়েছিল। পাড়ার ছেলেরাই জোর করে হাসপাতালে নিয়ে গেল। কমপাউণ্ড ফ্রাকচার কিন্তু শত চেষ্টাতেও ওকে কিছুদিনের জন্য হাসপাতালে রাখা যায়নি। বাচ্চু, খিস্তী করে বলেছিল,—‘‘শালা, হাসপাতালে থাকবি নাতো একা একা কোথায় থাকবি ? তোকে দেখবে কে?’’

“এ তুই বেশী বকিস না, আমি ও ঠিকই থেকে যাব"

“ভাই কে বুলোব’।

বংশীলাল এসেছিল সাত দিন পরে। সাতদিন ছেলেরাই দেখেছে আর মুখের সুখ করেছে। কলেজ থেকে অনেক দিন ধরেই সবাই চেষ্টা করেছিল। ওকে মাইনে দিয়ে মালী বা কেয়ার টেকার করে রাখার। ও ব্যাটা শাকসব্জী বেচবে, রস বেচবে, সব্জী তুলবে আধপেটা খেয়ে থাকবে, তবুও দেমাক এমন চাকরী করবে না। বাপী একদিন তেড়ে মেরে ধরেছিল ওকে, এ্যাই—তোকে যে তখন কলেজ থেকে কেয়ার টেকার হতে বল্ল, হলিনা কেন ? দিব্যি মাস গেলে টাকা পেতি।

—এই তো দালান ঘরে আছি, বেচছি খাচ্ছি ও গুলান অফিসের ইয়াতে আমার কাম নাই— নোকর হই না।’’

—উঃ, দিমাক কত, খাবি কি শালা ?

—পাটের কাম লিব —ইটা উঠা করব—উ চলে যাবে ঠিক।

—মরবি তুই ।

—বুললেই হ’ল ।

সত্যি সত্যি বুললেই হয়নি। দিব্যি টিকে আছে দেখছি। মাঝে দুদিন এসে দেখে ছিলাম দুই ভাই দিব্যি সে কল্কে টানছে… খিক্‌ খিক্‌ হাসি।

— কি করিস বুড়া ? আছিস কেমন?

—লাগছে ভালই। দ্যাশের কথা বলি।

পায়ে বাঁধা ব্যাণ্ডেজ। ছেঁড়া কাঁথা। ধুদ্দুরে পরনের কাপড়। পাশে উদোম গায়ে বসে থাকা ভাই। প্যাটের ব্যামো হলে কি কি দাওয়াই লাগে—মনিহারীর মেলায় কেমন বেলেল্লা নাচ— ত্যালতেলা গায়ে মহিষের গলায় সবুজ পুঁথির মেলা, আহা গ্‌। দিদিনের হাতের সেই ঝিটকিনি ফুলের বড়া আশ্চর্য সুরে এইসব গালগল্প শুনছিলাম তখন। তারপর বেশ দীর্ঘ দিন কেটে গেল। ব্যাঙ্কের নতুন প্রোগ্রাম রূপায়িত করতে যেয়ে আক্ষরিক কলুর বলদ আমি। গাছের মৃত্যু ও তার ভূত মাথায় না চাপলে হয়তো ওর খোঁজ পড়ত না হয়তো। অন্তত এত তাড়াতাড়ি নয়।

বেশ রঙ ধরা কুল। গুচ্ছের ওর মুখে। গুচ্ছেক নীচে। আমাকে দেখে ছেলে মানুষী হেসে জানায়।

—ঝালনুন দিয়ে বেশ লাগে বুঝলা?

বুঝলাম। হাত বাড়িয়ে বলি–দে দুটো দে, সারলি কবে।

—লাগছে তা বিশ দিন— বেশীও হবে না।

তারপর পা ঠিকমত জোড়া লাগল কিনা। এবার মাছের চাষ করেছিস কিনা এসব দিয়ে কথা এগোয়। বক্‌ বক্‌ করেও জমে থাকা জঞ্জালে আগুন লাগায়। আমি আস্তে আস্তে করে একটু লজ্জায় অস্বস্তিতে শুধাই—

—হ্যাঁরে, ঐ যে গাছটা কাটছে, ওটা মরলো কেন কি হয়েছিল?

—কুনটা পুকুর পাড়ে?

—হ্যাঁ-হ্যাঁ কাটছে যেটা।

–ও তো শুকিয়ে গেলো। রমরমা গাছ ছিল বড়ো।

—কি গাছ ছিলরে এটা?

—উ তো শিরীষ গাছ লাগে, কিনতা কি, কিন্তু বেচা যে হয়ে গেল।

—দাম কত হল?

—নশো টাকা ।

-শস্তায় পেলো।

-হ্যাঁ, শুধাও ক্যানে?

—ভারী সুন্দর ছিলরে গাছটা। খুউব খারাপ লাগছে আমার।

—হ্যাঁ, ছায়া ছিল খুব — রমরমা গাছ। তা কাঠও তো মেলা হবে।

আমি হতবাক হই। আহত হই ওর বেহিসেবী মনোবৃত্তি দেখে। হ্যাঁরে হারামজাদা ইল্লৎ—তুই যে সারাদিন গাছে গাছে কথা বলিস ফুলফোটার খবর জানিস, অতবড়ো জলজ্যান্ত মানুষের মত গাছটা শুকাল একটুও কষ্ট হ’লনা তোর? ফের বলিস কাঠও হবে মেলা। এ জন্যই বলে ছোটলোক। রাগ চাপতে না পেরে বলি—

—তবে তো সব গাছ মরে যাওয়াই ভাল।

—তা ঠিক লয়। ফলন্ত গাছের সঙ্গে মারা গাছের তুলনা ?

জানতাম ওর ডবকা বৌ ভুগেভুগে অর্থব হয়ে মারা গেছে। ওর নির্লিপ্ত ভাব দেখে ওকে আঘাত করার বাসনা প্রবল হয়ে ওঠে। বলি

—পল্টু কথায় কথায় বলছিল তোর বৌ বলে খুউব সুন্দরী ছিল।

—অমন গতর দেখি নাই এক্ষনো।

—কবে মরে গেলরে?

—অত্তো মনে নাই—তবে জোয়ান বৌ ছয় ছেলের মা…

—কাঁদলি খুব?

—না ওর মরাই ভাল ছিল।

—কেন?

—বীমারিতে ধরল যে ছয় মাস তক্‌। উ ব্যাঁচে থেকে কি হত বল?

ভবেছিলাম কান্নাকটি করবে, তা না অকপট স্বীকারোক্তি। অস্বস্তিতে কথা ঘুরিয়ে নিই,—তোর ভাই কবে গেল?

—সে তো দ্যাড় মাস পার—সুজা হয়ে ঠারতে পরি নাই তখন—

—একা একা এখানে বসে কি করতি ?

—ক্যানে তেলকুচা লতার দুলুনি দেখতাম।

—তাতে কি?

—ইঃ কচি মেয়ের ঠোঁট যেন।

রোববারের ক্লান্ত দুপুর তখনও। ঠিকেদারের তদারকিতে কাঠকাটা। এইমাত্র প্রিয় নিহত গাছের নাম জেনেছি আমি। মাঠ জুড়ে অলস কাঠ-কাটার শব্দ। দুলুনি। অস্পষ্ট এক মাদকতায় আবার কবিতা খুঁজে আসি। মাঠজুড়ে তেলকুচা লতা, তেলকুচা লতার দুলুনিতে কিশোরীর ঠোঁট।

কুঞ্জলাল একবিন্দু কবিতা লেখে না। তবুও। ·