পাহুড়টার দিকে নিস্পলক তাকিয়ে আছে রুইতন। ওপরের দিকে পাদুটো তুলে ঘাড় এলিয়ে পড়ে আছে পাহুড়টা। চোখ দুটো স্থির। এক সপ্তাহের হেরফের। অনাদি মাহাত ঘুর ঘুর করছিল রুইতনের পাশাপাশি। দ্বিতীয় বার এসে নতুন একটা অজুহাত দিয়ে পঞ্চাশ টাকা দাম বাড়িয়ে বলল, শুন রুহিতন। মুর লিজের কুছু কুঁকড়া খাবার লালচ লাই। বিটি আর জামাই ছেনাটা এসেছে। তুমার বৌদিদি বইল, বিটি বইলছে জামাইয়ের নাকি কুঁকড়া খাতে সাধ হছে। তাই বলছি, পুরাই তিনশ দুবো। বেলায় বেলায় ছাড়ি দাও। অমনিতেই কুঁকড়া ছাড়ানো বিঁজায় ঝকমারি। হুদহুদা গরম জলহে ডুবাও, পালক ছাড়াও। তার উপর আগুন সেঁকা করে কাঁটা পালক উপড়াও। তায় আবার সময় গড়হালে আরো বিপত্তি। পাহুড় হুয়ে যায় কাঠের লাগান শক্ত।
রুইতন নিস্পৃহ চোখে অনাদির দিকে তাকিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে থুতু ফেলল। থুতু ফেলার ঝোঁকটা বোধহয় প্রবলই হয়ে গেছিল। গালের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল খইনির দলাটা। জিভ খারিয়ে মুখটা বিকৃত হয়ে যায়। অনাদি কী বুঝল কে জানে। সে কেটে পড়ল গুচ্ছের হতাশা নিয়ে।
রুইতন আবার পাহুড়টার দিকে তাকায়। পাহুড়ের নিস্পলক ঘোলাটে চোখের দিকে তাকিয়ে ভাবে, গত ধুলাটে যার দাম উঠেছিল সাড়ে চার হাজার এখন তার দাম মাত্র তিনশো! তার চাইতে খত খালেই তো ফেলে দিলে হয়। গোবরে মিশে খতে জোর হবে। আধ মণ হলেও ফলন বাড়বে। পাহুড়টা হাতে তুলে নিয়ে ধুলাট থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে রুইতন অনুভব করল কী হালকা হয়ে গেছে লালমনি! লালমনি, কথাটা মনে হতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। পেছনে ফেলে আসা ধুলাটে তখন সোল্লাসে হল্লা উঠেছে কালা ভুতিয়া, কালা ভুতিয়া! বিষাদের হাসি হেসে ডান হাত পকেটে ঢুকিয়ে টিপা ফোনটা বের করে কল লাগালো। কানে লাগিয়ে শুনতে পেল রিং হচ্ছে। ও পাশে, হিলো বলতেই রুইতন বলল, টুকু গরম জল বনা। বলেই ফোনটা কেটে দিয়ে হাঁড়িয়া ভাটিতে ঢুকে পড়ল। তার ডান হাতে শক্ত করে ধরা মরা লালমনি।
দুই.
লোকে বলে বটে হাঁড়িয়া ভাটি, আবগারি লাইসেন্সটাও তাই কিন্তু ভাটিতে আজকাল হাঁড়িয়া মেলা ভার। হাঁড়িয়া বানানোর ঝক্কি ক’জন সামলাতে পারে? তার চেয়ে ভালো চুল্লু। ট্রেকারের বাতিল টিউবে করে আজকাল চুল্লু ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে গ্রামে। তার সাথে পরিমাণ মত জল মিশিয়ে গ্লাসে গ্লাসে বেচলে তিনগুণ লাভ। কুন্তির চালায় বসে পর পর দু গ্লাস সাঁটিয়ে রুইতন ভাবছিল, শালা! মানুষ মরলে লাশ কত ভারি হয়ে যায় অথচ পাখি মরলে হালকা! না, চুল চেরা হিসাব রুইতনের জানা নেই কিন্তু অনেকবারই মড়ার মাচানে কাঁধ রেখেছে সে আর বয়েছে মোরগের লাশ তাতেই তার এমন বিশ্বাস। আসলে মানুষ পাপের বোঝায় অমন ভারি হয়ে যায়। পাখি তো কোনো পাপই করে না তাই জীবন ঝেড়ে ফেলে সে হালকা।
এই যে লালমনি, এই সিজনে ছ’ছটা কুঁকড়া মেরে জিৎকার হয়েছিল। তিনটা ধুলাট লড়ার পরই যার রেট উঠেছিল সাড়ে চার হাজার এখন তার দাম মাত্র তিনশো! দু-কেজির এই লালমনি থেকে এই সিজনে তার এখনও অবধি কামাই হয়েছে পাঁচ হাজার। শুধু যে কুঁকড়া মেরেছে এমনটা তো নয়,ধুলাটে লালমনির ওপর বাজি ধরার ভাগও পেয়েছে সে। গত সপ্তাহে সেই বাজির কমিশন বাবদ তার কামাই হয়েছিল পাক্কা দেড় হাজার। আর দুটা ধুলাট করতে পারলেই আদুরিকে একটা বাজু গড়িয়ে দিতে পারত কিন্তু লালমনি সে সুযোগ দিল না। নিজে মরে যেন তাকেও মেরে গেল। কিন্তু কেন আড়াই কিলো ওজনের ঝিঁজরাটার কাছে লালমনি হেরে গেল তার ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছে না রুইতন। রোগা ফিনফিনে লালমনির তো গদা ঝিঁজরার ওপর দিয়ে যাওয়ার কথা।
বালিভাসার হাট থেকে দুশো টাকায় দুমাসের সাঁড়া বাচ্চাটা কিনেছিল সে। নতুন ছাড়ানো পাকা তেঁতুলের মত তার রঙ তাই নাম রেখেছিল লালমনি। আট মাসেই লড়াইয়ের লায়েক হয়ে গেছিল কিন্তু রুইতন আরও দু’মাস সময় নিয়ে পৌষের ধুলাটে নামিয়ে ছিল তাকে। বাছাই ভুল হয়নি তার। প্রথম ধুলাটেই বাজিমাত করেছিল তিনটা কুঁকড়া মেরে। লম্বা লম্বা ঠ্যাং আর ছিপছিপে গড়ন কিন্তু তবুও ঝুঁকি নিত না রুইতন। ফি ধুলাটের তিন দিন আগে থেকেই শুকনো লঙ্কা আর শুঁটকি মাছ খাওয়াতো লালমনির বাড়তি চর্বি ঝরানোর জন্য। ধুলাটের আগের দিন রাত থেকে কোনও খাবার নয় শুধু সকাল বিকাল দশ বারো ফোঁটা করে রসি। ব্যাস্! তাতেই চাঙ্গা লালমনি। বাড়ি থেকে ধুলাটে আসা অবধি তার এবারও চাদরের তলায় রেখেছিল লালমনিকে। না হলে পথে ঘাটে তাগাড়াই কোনো কুঁকড়া দেখে লড়াইয়ের আগেই ভয় পেতে পারে। তারপরও!
ভাবনায় ডুবে গেছিল রুইতন। ভাবাটা দরকার। চুলচেরা বিচার না করলে কাঁতকার ধুলাট থেকে জিৎ ছিনিয়ে আনতে পারে না। তাহলে দোষটা কী তারই ছিল? রুইতন উল্টো দিক থেকে ভাবার চেষ্টা করে। ধুলাটে কুঁকড়াই লড়ে বটে কিন্তু লড়াইটা তো কাঁতকারকেই করাতে হয়। শুধু তো কুঁকড়ার ঠ্যাংয়ে কাঁত বাঁধলে চলে না। সময় মত কুঁকড়াকে তোলা এবং ফের লড়াইয়ে এগিয়ে দেওয়াই কাঁতকারের আসল কাজ। কাঁতকার ছাড়ার আগেই কুঁকড়টা যদি হাত ফসকে ধুলাটের মাটি ছুঁয়ে ফেলে তবে প্রতিপক্ষ ওই টুকু বাড়তি সুবিধা পেয়ে যায় সেক্ষেত্রে…সে কী তাহলে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল? হঠাৎই একটা বিষয় মাথায় চলে এল। বাড়ি থেকে বেরুনোর সময় একটা দৃশ্যটা মনে পড়ে যায়। কাঁদলে দাঁড়িয়ে কাঁথের মাটি দাঁতে কাটছিল যমুনা। তেমন কিছু নয় কিন্তু তার সঙ্গে কয়েকদিন আগের একটা ঘটনা কেমন মিলে যাচ্ছে। সে দিন যমুনা তাকে আড়াল করে বমি করছিল না! জিজ্ঞেস করতে বলেছিল, ইসিড মিসিড হইছে মুনে হয়। কিন্তু এখন মেলাচ্ছে রুইতন। মেলাচ্ছে যমুনার বমি করা আর দেওয়ালের মাটি খাওয়া। হুঁ! মনের মধ্যে ইটাই ঘুট ঘুট করছিল বলেই কিনা হাত থেকে আগেই হড়কে গেছিল লালমনি। হঁ, ঠিক বটে কিন্তু শালোর বেটাটা কে? কুন হারামজা ঘটালো কাণ্ডটা। মাথার মধ্যে আগুন ঝরছিল রুইতনের। ততক্ষণে পাঁচ গ্লাস সাঁটিয়ে দিয়েছিল সে। লালমনিকে কুন্তির দিকে ছুঁড়ে দিয়ে ভাটি থেকে বেরিয়ে এলো। আকাশে তখন তিন ঘড়ির চাঁদ। ভুলে গেল কাকে যেন গরম জল করে রাখতে বলেছিল। ভুলে গেল বাড়ির রাস্তা নাকি ইচ্ছা করেই কুনা বাদিয়ার কুঁড়েটায় ঢুকে গেল সে। শেকড় সহ উপড়ে ফেলতে হবে বিষাক্ত ঝাড়টা। শালোর ব্যাটা সিঁদ কাঁটা। বিড়বিড় করছিল রুইতন।
তিন.
দপ দপ করছে মাথাটা। ঘাড়ের শিরা টনটন করছে। পায়ের শিরা খাল মেরে বসে আছে। সবচেয়ে বড় কথা সে এখন কোথায় এটাই বুঝতে পারছে না রুইতন। প্রথমেই নজর পড়ল মাথার ওপর একটা ফ্যান ঘুরছে। ঘটাং ঘট, ঘটাং ঘট শব্দ হচ্ছে। চারপাশ থেকে ভেসে আসছে মৃদু কোলাহল। বাতাসে গন্ধ ওয়ালা গুলা সাবানের গন্ধ। সব কিছু বেবাক ভুলে গেছে সে। সে কী আদি অনন্তকাল ধরে এখানেই শুয়ে আছে? মাথাটা তুলে চোখ দুটো ইদিক উদিক ঘুরালে হয়ত জায়গাটা চিনা যেতে পারে ভেবে, মাথাটা উঁচু করার চেষ্টা করতেই টাল খেল। হাঁ হাঁ করে উঠল একটা মেয়েলি গলা। হায় হায় কর কী? খপরদার! চুপচাপ পড়ি থাকো। মুটে লড়াচড়া করবে লাই। ডাগদারবাবু বারণ কইরছে। গলাটা যমুনার! ডাগদার বাবু মানে সে কী এখন সদর হাসপাতালে শুয়ে? শুয়ে শুয়েই বড় বড় করে চোখ মেলল সে। যমুনা তার শিয়রে বসে। তার আঙুল নাড়াচাড়া করছে রুইতনের চুলের ভেতরে।
চাঁপা ডুরে শাড়ি পরেছে যমুনা, ঘটি হাতা ব্লাউজ। মাথায় মস্ত সিঁদুরের টিপ। তার ওপরে ঝুঁকে চুলে বিলি কাটছে যমুনা। যমুনার পুরুষ্টু বুক সন্ধি থেকে ভেসে আসছে আতর আঘ্রাণ! ‘আজ লিয়ে দু’রাত আইর তিন দিন বেঁহুশ ছিলে তুমি। সেই যে স্মরণ কর তোমার বাহ্যি শুরু হ’ল….’ একটু একটু মনে পড়ছে রুইতনের, রেতে বাহ্যি শুরু হল। সাথে শূল বেদনা। এগারো বারো তেরো কতবার বাহ্যি গেছিল সে? রুইতন একটু একটু ঘাড় নাড়ে। সেই ঘাড় নাড়া দেখে যমুনার মুখে যেন দুশ্চিন্তা কেটে যাওয়ার স্বস্তি। মুট আঠারো বারের বেলায় তুমি ছামু দুয়ারে আছড়ে পড়লে গো। নুক নস্কর জুগাড় করি মটর ভ্যানে তুমাকে সদরে আনা হল। বলি হ্যাঁগা ইত মাল কউ খায়? একটা সাঁড়ার লেগে লিজের জীবনটা দিতে গেছিলে। যমুনা হাসে।
রুইতনের সব কেমন গুবলেট হয়ে যায়। পাঁচ গ্লাসেই ইমন অবস্থা তো হবার লয়। সে একবার আট গ্লাস অবধি পচাই গিলে মাইল ছাড়ানো পথ হেঁটে আদুরির বাড়ি গেছিল। সেদিন কী যেন একটা ঝামেলা হয়েছিল যমুনার সাথে আর ঝামেলা হলে তার আদুরি চাই। সেদিন তার পা টলেনি, বেচালও হয়নি সে। অথচ মাত্র পাঁচ গ্লাসেই.. তখুনি মনে পড়ে গেল, আদুরিকে গরম জল করে রাখতে বলেছিল। সেখানে গিয়ে পাহুড়ের পালক ছাড়িয়ে কেটে কুটে মাংস রান্নার কথা কিন্তু যায়নি। সে সোজা ঢুকে গেছিল কুন্তির ভাটিতে তারপর কুনা বাদিয়ার ঘরে। তারপর, তারপর! রুইতন ভাবার চেষ্টা করে। তার শীর্ন জীর্ণ দুর্বল হাতটা ডান কোমরে চলে যায়, কোমরের গ্যাঁটে কী যেন ঠাওর করার চেষ্টা করে।
কী খুঁজছ গো কাঁতকার? যমুনা হি হি করে হাসিতে ফেটে পড়ে। বুধহয় কুঁচের শিকড় খানা ? রুইতনের বুকটা ছ্যাঁত করে উঠে। ওই জন্যই তো বলেছিলাম অত মাল কউ খায়? তুমার ট্যাঁক থেকে খসে পড়েছিল শিকড়টা। বাব্বা! ইকেবারে তিন গাঁট। আমাকে পুরা সগ্গে পাঠানার পাকাপাকি ব্যবস্থা করেছিলে বল? ভাব ইকবার, আমি এক গাঁট খুলে পিষে সাত ছটাকের মাত্র দু’ছটাক মধুর সংগে মিশাই তুমার চায়ের গিলাসে দিয়েছিলাম। তাতেই তুমি হেগে মুতে ইকাকার আর তিন গাঁট খেলে আমার কী হত আর আমার পেটের টার? হঁ কাঁতকার, মিছা কুথা বুলব লাই, বইললে বাসুকি মাতা শাপ দিবেন। মিয়া মানুষের ধুলাটেও তুমি মানুষটা ভালই লড় । সি লড়াইয়ে শরীরে বড় সুখ! হাগরির মতো সেই সুখে ডুবে মরেও আশ মিটে না কিন্তু ভগমান তুমাকে ইক জেগায় মাইরে রেখেছে। তুমার দুষ লাই। নাহলে আদুরি কী মা হত লাই? বিচারির ভাগ্য দিখ না ভাতারে ছিনা দিতে পারল না নাঙে। লুকে জানে সে বাঁজা কিন্তু আমি তো জানি বিয়ের আগে দু’দুবার পেট খসাছে সে? কেন জানি জানো ? সেই পেট খসাইছিল মুর বাপ, বঁচা হাড়ি, বাদিয়ার বাদিয়া। তুমার কুনা বাদিয়া যাকে গুরু মানে! আর তুমি সাঙাৎ আসছ বঁচা হাড়ির মিয়ার সাথে লইড়তে! তার মা হওয়া ঘুচাতে? কেন কাঁতকার, আমার দুষটা কুথায়? তুমার বাপ হতে লাই বলে কী আমার মা ডাইকটা শুনার মন লাগে লাই?
চোখ দুটো বন্ধ করে যমুনার কথা শুনছিল অবশ রুইতন। যমুনা বলছিল, আর ইকটা কথা শুনে রাখ কাঁতকার, মুন দিয়ে শুনে রাখ, কুঁচের ফল, কুঁচের শিকড় ঘাঁটে ঘুঁটেই মুরা বড় হচি। সাধ কইরলে তিনটা কুঁচ বিচি বেটে ঘসে তুমার মালের সংগে মিশাই তুমাকে উপরে পাঠাতে পারতম কিন্তুক আমার ছেনা ই পিথিবীটায় কী বিন বাপে আসবে? আর হাজার হোক তুমি আমার সাঙা করা ভাতার। তাই ভাবলাম, থাক। ফির যদি বিগড় কর তুখন দিখা যাবে। আমি গাছও লই আর মাছও লই যে লুকে আমার ফুল ফুলকা ছিঁড়ে ছুঁড়ে কাড়ে কুড়ে লিয়ে লিবে আর আমি ভ্যাল ভ্যালায়ে চায়ে রইব! উমের মুরগি কাক চিলকে ডরায় না আর আমি তো বঁচা হাড়ির ঝি। রুইতনের মনে হচ্ছে যমুনার গলায় যেন সাপের হিসহিসানি। তার ইচ্ছা করে, খুব ইচ্ছা করে সাপিনীর চোখ দুটো একবার দেখে কিন্তু তার চোখটা কেমন ঘোলাটে হয়ে আসে, পাহুড়ের চোখের মতো। ·

0 মন্তব্যসমূহ