রেমব্রান্টের ১৬৫৩ সালের ছবি ‘অ্যারিস্টটল উইথ আ বাস্ট অব হোমার’-এর সামনে দাঁড়ালে পশ্চিমা ঐতিহ্য কথাটা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোর্সের নাম, বইয়ের ভূমিকার গম্ভীর শব্দ কিংবা পুরোনো সভ্যতার ওপর লেখা বক্তৃতার বিষয় বলে মনে হয় না; মনে হয়, সময়ের ভেতর দিয়ে একটি হাত আরেকটি হাতকে ছুঁয়ে আছে, কেউ কাউকে পুরোপুরি চেনে না, তবু সম্পর্কটি ভাঙে না। নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়ামের ঘরে দাঁড়িয়ে একুশ শতকের একজন দর্শক তাকিয়ে আছে সপ্তদশ শতকের আমস্টারডামে আঁকা ছবির দিকে। ছবির ভেতর চতুর্থ শতাব্দী খ্রিস্টপূর্বাব্দের এথেন্সের অ্যারিস্টটল হাত রেখেছেন এমন এক কবির মাথায়, যাঁর জীবনকাল ধরে নেওয়া হয় আরও চার শ বছর আগের। দর্শক, রেমব্রান্ট, অ্যারিস্টটল, হোমার, সবাই এক ঘরে। এই ব্যবস্থায় সময়ের বিশেষ আপত্তি দেখা যায় না। তিন হাজার বছরকে সে ছবির ফ্রেমের মধ্যে গুটিয়ে রাখে, যেমন পুরোনো বাড়ির আলমারিতে দাদা, বাবা ও ছেলের জামা পাশাপাশি ঝোলে, কাপড়ে আলাদা আলাদা ঘামের গন্ধ, কিন্তু ন্যাপথলিনের গন্ধে শেষ পর্যন্ত সবাই একই সংসারের লোক।
ছবিটা আবার একটু অন্য কথাও বলে। অ্যারিস্টটল সেখানে রক্তমাংসের মানুষ। রেমব্রান্ট তাঁকে নিজের সময়ের পোশাক পরিয়েছেন, সাদা ঢোলা জামা, কালো অ্যাপ্রন, মাথায় চওড়া কিনারার টুপি। যেন এইমাত্র পাশের কোনো ঘর থেকে এসে দাঁড়িয়েছেন, হাত বাড়ালে কাপড়ের ভাঁজে আঙুল লাগবে, মুখে বয়সের ছায়া, চোখে হিসাব, শরীরে মানুষের ওজন। বহুদিন পর্যন্ত শিল্প-ইতিহাসবিদেরা নিশ্চিত ছিলেন না লোকটি অ্যারিস্টটল কি না। কেউ কেউ ভেবেছিলেন, রেমব্রান্টের সমসাময়িক কোনো লেখক, হয়তো পিটার কর্নেলিসজ হুফ্ট। এই ভুল হওয়া সম্ভব। কারণ ছবির মানুষটিকে মানুষ বলেই মনে হয়, তার পরিচয় হারিয়ে গেলেও তার মানবজীবন হারায় না।
হোমারের অবস্থা আলাদা। তিনি শাদা মার্বেলের মাথা, একটি শিল্পকর্মের ভেতরে রাখা আরেকটি শিল্পকর্ম, ঠান্ডা পাথরের কপাল, অন্ধ চোখ, ঠোঁটে এমন এক নীরবতা যার সঙ্গে জীবিত মানুষের দৈনন্দিন কোনো ঝামেলা নেই। তাঁর ভাড়া বাকি পড়ে না, সন্তান জ্বরে কাঁদে না, বউয়ের সঙ্গে মনোমালিন্য হয় না, বাজারে অলিভ তেলের দাম বাড়লে তাঁর মুখ কালো হয় না। অ্যারিস্টটল তাঁকে ছুঁতে পারেন, কিন্তু তিনি অ্যারিস্টটলকে ছুঁতে পারেন না। এই পাথরের মাথা মনে করিয়ে দেয়, অ্যারিস্টটলের সময়েও হোমার সম্ভবত একজন যাচাইযোগ্য মানুষ ছিলেন না; তিনি তখনই কিংবদন্তির সংসারে উঠে গেছেন, যেখানে জন্মের তারিখ, বাড়ির ঠিকানা, বাবার নাম, ঋণের পরিমাণ, অসুখের বিবরণ এসব আর দরকার পড়ে না।
অ্যারিস্টটল তাঁর পোয়েটিক্স-এ হোমারকে মহাকাব্য, নাটক ও কমেডির বহু কৌশলের আদিপুরুষ বানিয়েছেন। তাঁর কথায় প্রশংসা আছে, সঙ্গে একটু সন্দেহ। কারণ তিনি লিখেছেন, অন্য কবিদের দক্ষতার সঙ্গে মিথ্যা বলার কায়দা প্রধানত হোমারই শিখিয়েছেন। হেরোডোটাস, যাঁকে প্রথম ইতিহাসবিদ বলা হয়, হোমার ও হেসিয়ডকে গ্রিক দেবতাদের গোটা সংসারের প্রায় প্রতিষ্ঠাতা করে দিয়েছিলেন। দেবতাদের কে কোন কাজ করবে, কার হাতে বজ্র, কার হাতে সমুদ্র, কে বিবাহের দেখভাল করবে, কার মেজাজ কেমন, কার গায়ে কোন বিশেষণ বসবে, মানুষ তাঁদের কেমন আকারে কল্পনা করবে, এইসব নাকি ওই দুই কবিই গুছিয়ে দিয়েছেন।
কিন্তু হোমার নিজে কোথায় থাকতেন, কবে জন্মেছিলেন, কার কাছ থেকে গান শিখেছিলেন, সত্যিই অন্ধ ছিলেন কি না, এসব বলতে গেলেই প্রাচীন সূত্রগুলোর গলায় কাশি ওঠে। প্রচলিত কাহিনি বলে, তিনি অন্ধ ছিলেন, কিওস দ্বীপে জন্মেছিলেন, সেখানকার মহাকাব্য আবৃত্তিকারীদের একটি গোষ্ঠী নিজেদের হোমেরিদাই, অর্থাৎ হোমারের সন্তান বলে পরিচয় দিত এবং তাঁর সরাসরি বংশধর হওয়ার দাবি করত। প্রমাণ চাইলে ঘরে হঠাৎ নীরবতা। হোমারের নামে লেখা প্রাচীন জীবনী আছে, কিন্তু তার অনেক ঘটনাই এমন যে পড়লে বোঝা যায়, জীবনীকার কবিকে যতটা পাননি, তার চেয়ে বেশি বানিয়েছেন।
হেরোডোটাস হিসাব করেছিলেন, হোমার তাঁর সময়ের চারশো বছর আগে বেঁচে ছিলেন। এই হিসাব ধরলে কবির সময় খ্রিস্টপূর্ব নবম শতক। কিন্তু হেরোডোটাস নিজেই বলে দিয়েছেন, কথাটা তাঁর নিজস্ব ধারণা, হাতে বিশেষ প্রমাণ নেই। অন্য প্রাচীন লেখকেরা হোমারকে খ্রিস্টপূর্ব ১১০০ থেকে ৮০০ সালের মধ্যে যেখানে সুবিধা হয়েছে সেখানে বসিয়েছেন। ঐতিহাসিকেরা এই দীর্ঘ কালকে গ্রিসের অন্ধকার যুগ বলেন। ইলিয়াড-এর রাজাদের পুরোনো প্রাসাদ ততদিনে ভেঙে পড়েছে, মাইসেনীয় জগত শেষ, এথেন্স ও স্পার্টার নগররাষ্ট্র এখনো শক্ত শরীর পায়নি, যে নগরসভ্যতাকে আমরা প্রাচীন গ্রিস বলে চিনি তার রাস্তা, বাজার, আদালত, নাট্যমঞ্চ তখনো তৈরি হচ্ছে না। লিখিত নথি নেই। নথি না থাকার অর্থ সম্ভবত সেই সময়ের গ্রিকেরা লেখাপড়ার ব্যবস্থাই হারিয়ে ফেলেছিল।
তাহলে হোমারের পক্ষে বারো হাজার কিংবা ষোলো হাজার পঙ্ক্তির মহাকাব্য লেখা সম্ভব হলো কেমন করে? এই প্রশ্নের পুরোনো জবাব ছিল সহজ। কেউ একজন তো লিখেছে। ইলিয়াড আছে, ওডিসি আছে, অতএব একজন লেখক ছিলেন। তাঁর নাম হোমার। মানুষটি সম্পর্কে আর কোনো দলিল না থাকলেও বই দুটোই তাঁর জন্মসনদ, তাঁর সমাধিফলক, তাঁর পাসপোর্ট, তাঁর একমাত্র সাক্ষী।
উনিশ শতকে এই সুবিধাজনক ব্যবস্থার ভেতর পণ্ডিতেরা লম্বা লম্বা ছুরি ঢোকাতে শুরু করলেন। বাইবেল নিয়ে তখন ইউরোপে নতুন ধরনের অনুসন্ধান চলছে। ধর্মীয় ঐতিহ্য বলত, মোসেস তাঁর নামে পরিচিত পাঁচটি গ্রন্থ লিখেছেন। ভাষা, পুনরাবৃত্তি, ঘটনার অসামঞ্জস্য, ঈশ্বরের আলাদা নাম এবং বিভিন্ন যুগের চিহ্ন দেখে গবেষকেরা বললেন, এই বইগুলো এক ব্যক্তির রচনা নয়; বহু উৎস, বহু কণ্ঠ, বহু সময়ের লেখা পরে সেলাই করে এক শরীর বানানো হয়েছে। সেই সেলাইয়ের দাগ একবার চোখে পড়লে আর অদৃশ্য করা যায় না।
একই অস্ত্র হোমারের শরীরেও লাগানো হলো। শুরু হলো ‘হোমারিক প্রশ্ন’। ইলিয়াড ও ওডিসি কি একজন ঐতিহাসিক কবির রচনা? নাকি ছোট ছোট গান, যুদ্ধের কাহিনি, বীরদের মৃত্যু, দেবতাদের ঝগড়া, নাবিকদের ভয়, ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষা, এইসব বহু কবির মুখে বহু শতাব্দী ধরে ঘুরে বেড়িয়ে পরে একত্র হয়েছে?
একদলকে বলা হতো ইউনিটারিয়ান। তাঁদের যুক্তি, এমন বিশাল স্থাপত্য, এত চরিত্র, এত নাটকীয় উত্তেজনা, এত নির্ভুল বৃত্ত, একজন অসামান্য কল্পনাশক্তির কবি ছাড়া সম্ভব নয়। অন্য দল অ্যানালিস্ট। তাঁরা ভাষার গায়ে নখ বসিয়ে আলাদা আলাদা স্তর খুঁজতেন, কোথায় গল্প ভেঙেছে, কোথায় চরিত্র আগের কথা ভুলেছে, কোথায় অস্ত্রের যুগ বদলে গেছে, কোথায় একটি ঘটনা আরেকটির সঙ্গে ঠিক বসছে না। তাঁদের টেবিলে হোমারের মহাকাব্য একটি সম্পূর্ণ শরীর না, মর্গে রাখা দেহ, পাঁজরের হাড় গুনে গুনে দেখা দরকার কোনটা কার।
এই তর্কে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম গ্ল্যাডস্টোনও নেমেছিলেন। চারবার প্রধানমন্ত্রী হওয়া লোক, সরকারি কাজের বিরতিতে তিন খণ্ডের স্টাডিজ অন হোমার অ্যান্ড দ্য হোমেরিক এজ লিখে ফেললেন ১৮৫৮ সালে। গ্ল্যাডস্টোন নিশ্চিত ছিলেন, তর্ক শেষ। কবিতা দুটি দূর অতীতের উপহার, কিন্তু তার পেছনে আছে পরিকল্পনাকারী একটি মন। সেই মনের মালিক হোমার, যুগে যুগে যাঁকে কবিদের পিতৃপুরুষ বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সাহেব রায় দিয়ে উঠেছিলেন, আদালত ভেঙে সবাই ঘরে যাবে এমন সময় দেখা গেল, আসল সাক্ষী এখনো ঢোকেনি। সেই সাক্ষীর নাম মিলম্যান পারি।
আমরা হোমারের জন্মতারিখ জানি না, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর সময় মোটামুটি নির্দিষ্ট করে বলা যায়। উনিশ শ ত্রিশের দশকের শুরুতে হার্ভার্ডের এক তরুণ অধ্যাপক দুটি প্রবন্ধ লিখলেন, নাম এত নিরীহ যে লাইব্রেরির তাকেও সম্ভবত কেউ চমকে ওঠেনি : “স্টাডিজ ইন দ্য এপিক টেকনিক অব ওরাল ভার্স-মেকিং।” এই শুকনো শিরোনামের নিচে পারি তিন হাজার বছরের একজন কবিকে মেরে ফেললেন।
পারি বললেন, হোমারের কবিতার প্রকৃতি বোঝা যায় কেবল তখনই, যখন স্বীকার করা হয় এর ভাষা মৌখিক, সূত্রনির্ভর এবং বহু পুরোনো ঐতিহ্যের সৃষ্টি। ইলিয়াড ও ওডিসি কোনো টেবিলে বসে লেখা বই ছিল না। তাদের প্রথম জীবন কাগজে নয়, মানুষের মুখে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম নামহীন গায়ক সুর, ছন্দ, স্মৃতি ও প্রস্তুত বাক্যের সাহায্যে কাহিনি পরিবেশন করেছে; প্রতিবার কিছু রেখেছে, কিছু বদলেছে, কিছু বাড়িয়েছে, কিছু ভুলেছে। এই বহমান কাজের মধ্য থেকে ধীরে ধীরে মহাকাব্য দুটি এমন রূপ পেয়েছে, যাকে পরে লিখে স্থির করা হয়েছে।
পারি প্রথম ব্যক্তি নন যিনি মৌখিক উৎসের কথা বলেছিলেন। তাঁর আগেও অনুমান ছিল। পারির কাজ অনুমানটাকে মাপজোক করে দেখানো। খুনের অস্ত্রটি তিনি কবিতার ভেতর থেকেই বের করেছিলেন।
তখন তাঁর বয়স ত্রিশ। ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে জন্ম, বাবা একটি ওষুধের দোকান চালিয়ে বিশেষ লাভ করতে পারেননি। গ্রিসে গিয়েছিলেন জীবনে একবার, তাও দুই মাসের জন্য। অথচ বার্কলেতে ছাত্র থাকার সময় গ্রিক ভাষা তাঁকে এমনভাবে ধরে ফেলেছিল, যেমন ইলিয়াড-এর দেবতারা পছন্দের বীরের ঘাড়ে হাত রেখে তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেয়। আমেরিকার সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার এমন এক যুগ ছিল, যখন ওষুধের দোকানদারের ছেলেও স্কুলে লাতিন এবং কলেজে গ্রিক শিখে নিতে পারত। তাঁর বোন পরে বলেছিলেন, কথিত গ্রিক ভাষার সৌন্দর্য, তার গম্ভীরতা এবং বেঁচে থাকার ব্যাপারে গ্রিকদের তীব্র আনন্দ পারিকে টেনেছিল।
তাঁর পেশাগত জীবন প্রায় পনেরো বছর। প্রথম গ্রিক পাঠ থেকে ১৯৩৫ সালে তেত্রিশ বছর বয়সে আকস্মিক মৃত্যু পর্যন্ত। কোনো বই প্রকাশ করেননি। প্রবন্ধও হাতে গোনা। জীবনের শেষ কয়েক বছরে যুগোস্লাভিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে স্থানীয় গায়কদের গান রেকর্ড করেছিলেন। সেই গান তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি হতো, পুরোনো গল্প নতুন করে জন্মাত, আর পারি তার মধ্যে হাজার হাজার বছর আগের হোমারীয় পরিবেশনার কৌশল দেখতে চেয়েছিলেন।
মৃত্যুর সময় তাঁর গবেষণার সম্পদ হার্ভার্ডের একটি ঘরে পড়ে ছিল সাড়ে তিন হাজার অ্যালুমিনিয়াম ডিস্ক হয়ে। কেউ ঠিকমতো শোনেনি। রেকর্ডের গায়ে ধুলো, কাগজে নম্বর, বাক্সের ভেতর মানুষের কণ্ঠ বন্দী, গবেষক মৃত। এই অবস্থায় জ্ঞানও অনেক সময় পুরোনো আসবাবের মতো, উত্তরাধিকারীরা বুঝতে পারে না ফেলে দেবে, রাখবে, না বিক্রি করবে।
পারির সঙ্গে যুগোস্লাভিয়ায় গিয়েছিলেন তরুণ সহকারী আলবার্ট লর্ড। শিক্ষক মারা যাওয়ার পর লর্ড বাকি জীবন এই রেকর্ড, নোট, ধারণা, পদ্ধতি গুছিয়েছেন। ১৯৬০ সালে তাঁর দ্য সিঙ্গার অব টেলস প্রকাশিত হলে মৌখিক কবিতা বোঝার ধরন বদলে যায়। হোমার-বিশেষজ্ঞদের কাছে পারি ও লর্ডকে আলাদা করা কঠিন; একজন কঙ্কাল খুঁজেছেন, অন্যজন তাতে স্নায়ু, মাংস ও চলাচলের ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
পারির জীবন নিয়ে জীবনী লেখা সহজ নয়। তিনি প্রায় এক শতাব্দী আগে মারা গেছেন। সাক্ষাৎকার নেওয়ার মতো জীবিত সহকর্মী নেই, নতুন ডায়েরির বাক্স হঠাৎ কোনো চিলেকোঠা থেকে বের হয়নি। জীবনীকারকে তাই ওকল্যান্ডের রাস্তা, বিংশ শতকের শুরুর ক্যালিফোর্নিয়া, বিশের দশকের প্যারিস, সরবোনের ছাত্রজীবন, বাড়িভাড়া, ট্রেনযাত্রা, আবহাওয়া, পুরোনো পাড়ার বিবরণ দিয়ে ফাঁক ভরতে হয়।
তাঁর স্ত্রী মেরিয়ানের ১৯৮১ সালের একটি সাক্ষাৎকার থেকে দাম্পত্যের কিছু কথা জানা যায়। তারা খুব ঘনিষ্ঠ ছিল না। মেরিয়ান চব্বিশ, মিলম্যান একুশ, গর্ভধারণের পর বিয়ে। মেরিয়ানের স্মৃতিতে পারি নাকি বলেছিলেন, এটাই শিশুর শুরু এবং তাঁর নিজের শেষ। তাঁদের এক ছেলে, এক মেয়ে। কথাটার মধ্যে তরুণ স্বামীর আতঙ্ক, দায়িত্বের বিরক্তি, অথবা গবেষণার পথে সংসারকে বাধা মনে করার নিষ্ঠুরতা, কোনটা কতখানি ছিল বোঝা যায় না। মানুষের মুখ থেকে বেরোনো একটি বাক্য বহু বছর পর বিধবার স্মৃতিতে যে রকম থাকে, তাতে শব্দের সঙ্গে দুঃখের মরচে লেগে যায়।
এই বিয়ের কথা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে পারির মৃত্যুর জন্য। ১৯৩৫ সালের শেষ দিকে তিনি হঠাৎ হার্ভার্ড থেকে ছুটি নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় যান। মেরিয়ান তখন মায়ের আর্থিক সংকট সামলাচ্ছেন। বে এরিয়ায় কিছুদিন থাকার পর তারা সান দিয়েগোতে পারির বোনের কাছে যাওয়ার পথে লস অ্যাঞ্জেলেস শহরের একটি হোটেলে রাত কাটায়। স্যুটকেসে খুঁজতে গিয়ে পারির সঙ্গে রাখা লোড করা পিস্তল থেকে গুলি বেরিয়ে তাঁর হৃদপিণ্ডে লাগে।
তেত্রিশ বছরের একজন পণ্ডিত, হোটেলের ঘর, স্যুটকেস, পিস্তল, স্ত্রী, বুকের গুলি, এতগুলো জিনিস একসঙ্গে থাকলে গুজব স্বাভাবিকভাবে জন্মায়। আত্মহত্যা? খুন? দাম্পত্যের শত্রুতা? গোপন কারণ? কিন্তু তাঁর জীবনে আত্মহত্যার প্রস্তুতির চিহ্ন পাওয়া যায়নি, মেরিয়ানেরও হত্যার কোনো উদ্দেশ্য ছিল বলে প্রমাণ নেই। ঘটনাস্থলের পুলিশ দ্রুত দুর্ঘটনা বলেছিল। তাঁদের সন্তানরাও পরে লিখেছে, বাবার চরিত্র ও মৃত্যুর নির্দিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনায় দুর্ঘটনাই যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা।
সহকর্মীদের স্মৃতিতে পারি আবেগপ্রবণ মানুষ ছিলেন না। হার্ভার্ডের একজন বলেছিলেন, তাঁর শত্রু ছিল না, বন্ধুও অল্প; বন্ধুত্ব প্রত্যাখ্যান করতেন না, দরকার অনুভব করতেন না। তাঁর একটি ধারণা ছিল, সেই ধারণার পেছনে যাওয়ার জন্য নিজেকে তৈরি করেছিলেন, সেটাই তাঁর জীবন। মানুষটি যেন নিজের চারপাশের সম্পর্ককে পাতলা করে পুরো শরীর দিয়ে একটি প্রশ্ন শুনছিলেন: হোমারের কবিতা এমন কেন? প্রশ্নটি অবশ্য প্রাচীনকাল থেকেই পুরোপুরি ঘুমিয়ে ছিল না।
প্রথম শতকের গ্রিক লেখক প্লুটার্ক লিখেছিলেন, ইলিয়াড ও ওডিসি সম্পূর্ণ কবিতা হিসেবে টিকে থাকার পেছনে স্পার্টার প্রাচীন আইনদাতা লাইকার্গাসের ভূমিকা ছিল। এশিয়া মাইনর ভ্রমণের সময় তিনি দেখেন, কবিতাগুলোতে রাষ্ট্র, শাসন, শৃঙ্খলা ও আনন্দের এমন শিক্ষা আছে যা গ্রিসে নিয়ে যাওয়া দরকার। তখন বিভিন্ন মানুষের হাতে কবিতার বিভিন্ন অংশ ঘুরছিল, কোথাও এক টুকরা, কোথাও আরেক টুকরা। লাইকার্গাস সেগুলো নকল ও সংকলন করে দেশে নিয়ে যান।
লাইকার্গাস নিজেও আধা-ঐতিহাসিক, আধা-কিংবদন্তির মানুষ। স্পার্টার কঠিন সামরিক শিক্ষা, ছেলেদের দলবদ্ধ জীবন, পুরুষদের সাধারণ ভোজনশালা, দীর্ঘ সামাজিক অভ্যাসের সব কৃতিত্ব তাঁর নামে জমা হয়েছে। গ্রেগরি নাগি দেখিয়েছেন, বহু সমাজে দীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানকে পরে একজন সংস্কৃতি-নায়কের কাজ বলে প্রচার করা হয়। বহু প্রজন্মের শ্রম, সংঘর্ষ ও পরিবর্তনকে এক ব্যক্তির নামে দিলে গল্প বলা সহজ হয়, কর্তৃত্বও বাড়ে। লাইকার্গাস হয়তো কখনো ছিলেনই না।
হোমারের ক্ষেত্রেও কি একই ঘটনা ঘটেছে?
লাইকার্গাসের গল্পে ইঙ্গিত আছে, ইলিয়াড ও ওডিসি একসময় বিচ্ছিন্ন অংশে চলত। এথেন্সে একই কাজের কৃতিত্ব দেওয়া হয় খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের শাসক পেইসিস্ত্রাতোসকে। বলা হতো, ছড়িয়ে থাকা হোমারীয় কবিতাগুলো তিনি প্রথম বর্তমান ক্রমে সাজিয়েছিলেন। তিনি গ্রেট প্যানাথেনাইয়া উৎসবে এমন প্রতিযোগিতাও চালু করেন, যেখানে র্যাপসোডরা পালা করে মহাকাব্য দুটি পুরো আবৃত্তি করত। একজন যেখানে থামবে, পরেরজন সেখান থেকে ধরবে; মানুষের গলা বদলাবে, কাহিনি চলবে।
বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ছিন্ন পাণ্ডুলিপি আবার জোড়া লাগানোর গল্প আছে। পারস্যের মহাকাব্য শাহনামা দশম শতকের শেষে ফেরদৌসি লিখেছিলেন, এ বিষয়ে ঐতিহাসিক সন্দেহ অল্প। কিন্তু কাব্যের ভেতর ফেরদৌসি নিজেই বলেন, পুরোনো কাহিনি হারিয়ে গিয়েছিল, জ্ঞানী মানুষেরা ছড়ানো অংশ কুড়িয়ে আবার একত্র করেছেন। নাগির মতে, এই ধরনের কাহিনিকে ঘটনার সাংবাদিক বিবরণ হিসেবে পড়া ঠিক নয়; এটি এমন একটি মিথ, যা দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা দেয়। বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্নভাবে বলা গল্প এক সময় সংগ্রহ, সম্পাদনা ও মান্য রূপ পায়, তারপর সেই মান্য সংস্করণকে বহু দূরের অতীতে ঠেলে দেওয়া হয়, যেন শুরু থেকেই তার শরীর অখণ্ড ছিল।
১৭৯৫ সালে জার্মান ভাষাতত্ত্ববিদ ফ্রিডরিখ অগুস্ট উলফ প্রোলেগোমেনা টু হোমার প্রকাশ করে বললেন, মহাকাব্য দুটি বর্তমান আকারে একবারে রচিত হওয়া সম্ভব নয়। অন্ধকার যুগের ভেতর থেকে এক ব্যক্তির মাথা থেকে হঠাৎ এত উজ্জ্বল, সুসংহত, বিশাল দুই কাজ বেরিয়ে এসেছে, এই বিশ্বাস তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাঁর ধারণা, সাক্ষরতা গ্রিসে ফিরে আসার আগে শতাব্দীর পর শতাব্দী ছোট কবিতা মুখে মুখে তৈরি ও প্রচারিত হয়েছে; পরে সম্পাদকরা সেগুলো জোড়া দিয়েছেন। তিনি একটি সহজ তথ্যও দেখালেন: হোমারের কবিতায় কেউ পড়ে না, কেউ লেখে না।
উলফের তত্ত্ব জার্মান জাতীয়তাবাদের নতুন আবহে পছন্দ হলো। ফরাসি বিপ্লবের বিশ্বজনীন দাবির বিপরীতে জার্মান চিন্তকেরা জাতি ও সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য খুঁজছিলেন। হোমার যদি এক ব্যক্তি না হন, তাহলে ইলিয়াড ও ওডিসি একজন কবির ব্যক্তিগত কীর্তির বদলে পুরো গ্রিক জনগোষ্ঠীর আত্মার প্রকাশ হিসেবে পড়া যায়। লেখককে সরালে জাতি লেখকের চেয়ারে বসে।
সমস্যা ছিল, বাইরের কোনো নির্ভরযোগ্য দলিল নেই। ফলে কবিতার শরীরকেই নিজের জন্মের সাক্ষ্য দিতে হবে।
হিব্রু বাইবেলের ক্ষেত্রে বহুসংখ্যক লেখক ও সময়ের চিহ্ন তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। কোথাও শুকনো বংশতালিকা, কোথাও যুদ্ধের বিবরণ, কোথাও ভবিষ্যদ্বাণীর আগুন, কোথাও প্রেমের গান। ইলিয়াড ও ওডিসি বাইরে থেকে এত বিচ্ছিন্ন দেখায় না। পুরো কাব্য একই ছন্দে, ড্যাকটিলিক হেক্সামিটার, প্রতি পঙ্ক্তিতে ছয়টি ছন্দগুচ্ছ। বিশেষণের পুনরাবৃত্তি সর্বত্র: শাদা-বাহু হেরা, দ্রুতপদ অ্যাকিলিস, মদির-অন্ধকার সমুদ্র। একই ধরনের বাক্য, একই ধরনের নাম-সহ বিশেষণ, একইভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতি, জাহাজ ছাড়া, ভোজ, ঘুম, সকাল হওয়া। ফলে মনে হয়, একটি কণ্ঠ দীর্ঘ সময় ধরে একই সংগীত বাজিয়েছে।
দৈর্ঘ্যও সামান্য নয়। ইলিয়াড প্রায় ষোলো হাজার পঙ্ক্তি, ওডিসি বারো হাজারের বেশি। এত চরিত্র ও ঘটনার মাঝেও প্রতিটি কাব্যের কেন্দ্রীয় কাঠামো শক্ত। ইলিয়াড দশ বছরের ট্রয়যুদ্ধের সবকিছু বলে না; শেষ বছরের অল্প কয়েক সপ্তাহে অ্যাকিলিসের ক্রোধকে কেন্দ্র করে ঘোরে। ওডিসি পুরো যুদ্ধকে পেছনে রেখে একজন মানুষের ঘরে ফেরার পথ ধরে। তবু নিবিড়ভাবে পড়লে জোড়ের দাগ দেখা যায়।
বার্নার্ড নক্স দেখিয়েছিলেন, ইলিয়াড-এর গ্রিক ও ট্রোজানরা প্রধানত ব্রোঞ্জের অস্ত্র ব্যবহার করে, যা খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ সালের আগের নিকটপ্রাচ্যের যুদ্ধজগতের চিহ্ন। লোহা সেখানে দুর্লভ ও মূল্যবান। প্যাট্রোক্লাসের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার খেলায় অ্যাকিলিস পুরস্কার হিসেবে এমনই একটি লোহার ঢেলা দেয়, যা বিজয়ীর পাঁচ বছর চলবে। কিন্তু অন্য এক জায়গায় ট্রোজান তীরন্দাজ প্যান্ডারাস লোহার তীরের ফলা ব্যবহার করে। ছুড়ে দেওয়ার পর যে তীর ফিরে পাওয়া যায় না, তাতে দুর্লভ ধাতু লাগানো কঠিন। এই বিবরণ এমন যুগের স্মৃতি, যখন লোহা এত সাধারণ হয়ে গেছে যে শত্রুর দিকে ছুড়ে ফেলা যায়। একই কবিতার মধ্যে দুই প্রযুক্তির সময় পাশাপাশি শুয়ে আছে।
ভাষার অবস্থাও তেমনি। হোমারীয় গ্রিক বিভিন্ন অঞ্চল ও শতাব্দীর উপভাষার মিশ্রণ। এমন শব্দ ও ব্যাকরণ আছে, যা খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের এথেন্সের ছাত্রদের কাছেও পুরোনো ও দুর্বোধ্য লাগত। নক্স বলেছিলেন, এই ভাষায় কোনো মানুষ কোনোদিন কথা বলেনি।
তাহলে এই ভাষা কে বানাল? পারির প্রধান আবিষ্কার এখানেই। তিনি দেখলেন, হোমারীয় কবিতার সবচেয়ে চোখে পড়া দুটি বৈশিষ্ট্য, ছন্দ ও পুনরাবৃত্ত বিশেষণ, আলাদা অলংকার নয়; তারা একই যন্ত্রের দাঁত।
গ্রিক একটি বিভক্তিমূলক ভাষা। বাক্যে কাজ বদলালে নামের রূপ বদলে যায়। অ্যাকিলিস কর্তা হলে এক রূপ, কর্ম হলে আরেক রূপ। শব্দের রূপ বদলালে তার দীর্ঘ ও হ্রস্ব ধ্বনির বিন্যাসও বদলে যায়, ফলে হেক্সামিটারের পঙ্ক্তিতে তাকে বসানোর জন্য আশপাশের শব্দ আলাদা হওয়া দরকার।
পারি অসংখ্য পঙ্ক্তি মেপে দেখালেন, কোনো বীর, দেবতা বা দেবীর নামের নির্দিষ্ট বিভক্তি এবং পঙ্ক্তির নির্দিষ্ট অবস্থানের জন্য সাধারণত একটি নির্দিষ্ট বিশেষণ-সমষ্টি তৈরি আছে। কবি যখন ‘দ্রুতপদ অ্যাকিলিস’ বলেন, প্রতিবার অ্যাকিলিসের দৌড়ানোর ক্ষমতা নিয়ে ভাবেন না। যখন আখিয়ানদের কখনো শক্ত-বর্ম-পরা, কখনো দীর্ঘকেশী বলা হয়, সেই মুহূর্তের অর্থের চেয়ে ছন্দের ফাঁক গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তুত বাক্যগুলো বিভিন্ন আকারের কাঠের টুকরার মতো; যে ফাঁক, সেখানে যে টুকরা ঠিক বসে, গায়ক সেটি তুলে নেন।
হোমারীয় ভাষা দিয়ে হোমারীয় ছন্দ তৈরি হয়নি; দীর্ঘ মৌখিক ছন্দচর্চাই এই বিশেষ ভাষাকে বানিয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী গায়কেরা ছন্দ রক্ষা করতে করতে শব্দ বেছে, পুরোনো রূপ ধরে, বিভিন্ন উপভাষা থেকে উপযোগী অংশ নিয়ে একটি কৃত্রিম কাব্যভাষা গড়েছেন। তার ভেতর যুগের পর যুগ জমে আছে, যেমন পুরোনো শহরের গলিতে মোগল আমলের দেয়ালের গায়ে ব্রিটিশ আমলের জানালা, তার পাশে পাকিস্তান আমলের টিন, তার ওপর স্বাধীনতার পর লাগানো কেবল টিভির তার।
ডক্টরাল অভিসন্দর্ভে পারি বিশাল টেবিল ও ছক দিয়ে এই বিন্যাস দেখালেন। তখনো পুরো কথা উচ্চারণ করেননি। তাঁর শিক্ষক ফরাসি ভাষাতত্ত্ববিদ আঁতোয়ান মেইয়ে বুঝে গিয়েছিলেন ফল কোথায় যাবে। তিনি লিখলেন, কবিতাগুলো আবৃত্তির জন্য তৈরি এবং প্রাচীন মৌখিক আধা-তাৎক্ষণিক সৃষ্টির ওপর দাঁড়ানো।
লেখক যদি টেবিলে বসে প্যাপিরাসে লিখতেন, তাঁর প্রস্তুত বাক্যের এমন কঠোর ব্যবস্থা দরকার হতো না। তিনি থামতে পারতেন, কাটতে পারতেন, আবার লিখতে পারতেন, একটি শব্দ বদলে আরেকটি বসাতে পারতেন। কিন্তু শ্রোতার সামনে দাঁড়ানো নিরক্ষর গায়ক থামতে পারেন না। তাঁর সামনে মূল পাণ্ডুলিপি নেই, মুখস্থ করার জন্য স্থির পাঠ নেই, শ্রোতারা অপেক্ষা করছে, সুর চলছে, হাতের তারে ধ্বনি উঠছে। পরের ঘটনা ভাবতে ভাবতে ছন্দ চালিয়ে নিতে তাঁর প্রস্তুত বাক্য দরকার। সূত্র তাঁর স্মৃতি, ছন্দ, সময় কেনার উপায় এবং কবিতা তৈরির কারখানা।
পারি লিখেছিলেন, যে সমাজে পড়া ও লেখা নেই, সেখানে কবি সূত্র দিয়েই পঙ্ক্তি বানায়; তার অন্য উপায় থাকে না। এই কথা বইয়ের পাতায় রেখে দিলে তত্ত্ব থাকত। পারি তার জীবন্ত নমুনা খুঁজতে যুগোস্লাভিয়া গেলেন।
১৯৩৩ সালের প্রথম সফর ছোট ও হতাশাজনক। ১৯৩৪-৩৫ সালের দ্বিতীয় সফর দীর্ঘ, ফলপ্রসূ এবং তাঁর জীবনের সবচেয়ে তীব্র অভিজ্ঞতা। দোভাষী নিকোলা ভুয়নোভিচকে নিয়ে গ্রাম থেকে গ্রাম, সরাইখানা থেকে সরাইখানা ঘুরে তারা জিজ্ঞেস করতেন, এখানকার সেরা গুস্লার কে? গুস্লার হলো এমন গায়ক, যে এক তারের গুস্লে বাজিয়ে মহাকাব্যধর্মী কাহিনি গায়। যন্ত্রের শরীর ম্যাপল কাঠ, তার ঘোড়ার লোম, গায়ে ভেড়া বা খরগোশের চামড়া। মানুষের গলা, কাঠ, পশুর চামড়া, ঘোড়ার লোম, পুরোনো যুদ্ধ, সব মিলে সন্ধ্যার সরাইখানায় ইতিহাস শুরু হয়।
পারির বিশেষ রেকর্ডিং যন্ত্রে দুটি টার্নটেবল ছিল, ফলে এক ডিস্ক শেষ হলে আরেকটি চলত, গান থামাতে হতো না। গায়ক ঘণ্টার পর ঘণ্টা বীরদের কাহিনি বলত। মুসলমান যোদ্ধা, খ্রিস্টান রাজপুত্র, বন্দিত্ব, প্রতিশোধ, প্রেমিকা, বিবাহ, ঘোড়া, দ্বন্দ্ব, সীমান্ত, মাথা কাটা, ঘরে ফেরা। অ্যাকিলিস ও হেক্টর দূর দেশ থেকে এলে এই গল্পের ভেতর বসতে বিশেষ অসুবিধা হতো না।
পারি একই কাহিনি বিভিন্ন গায়কের মুখে রেকর্ড করতেন। ‘দুলিচ ইব্রাহিমের বন্দিত্ব’ কাহিনিতে মুসলমান বীর দুলিচ ইব্রাহিম এক খ্রিস্টান রাজপুত্রের কারাগারে বন্দী, এদিকে তার প্রেয়সীর বিয়ে ঠিক হয়েছে অন্যের সঙ্গে। বন্দীর দুঃখ দেখে রাজপুত্র তাকে ছেড়ে দেয়। দুলিচ ঘরে ফিরে আসে, বহু অধিনায়ক ও ডিউকের সঙ্গে লড়ে প্রেমিকাকে উদ্ধার করে। এই গল্পে ওডিসি-র সঙ্গে অদ্ভুত সাদৃশ্য আছে, সরাসরি ধার নেওয়ার প্রমাণ ছাড়াই। ওডিসিউসের ঘরে শতাধিক পাত্র, দুলিচের সামনে বহু যোদ্ধা। ওডিসিউসকে চিনে ফেলে তার বুড়ো কুকুর আর্গস, দুলিচকে চিনে তার প্রিয় ঘোড়া। মানুষ দূর দূর দেশে একই উদ্বেগ বহন করে: পুরুষ ঘরে ফিরবে কি না, নারী অপেক্ষা করবে কি না, পশু মালিককে চিনবে কি না, অনুপস্থিতির মধ্যে বাড়ি কার হয়ে যাবে।
হার্ভার্ড লাইব্রেরিতে পারি ও লর্ডের কিছু রেকর্ড এখন শোনা যায়। শব্দে আঁচড়, ধাতব খসখস, গুস্লের একটানা গুঞ্জন, মাইনর সুরে কথা ও গানের মাঝামাঝি কণ্ঠ। আধুনিক কানে মনে হয়, কবিতা ও সংগীত আলাদা পেশা হওয়ার আগের কোনো ঘর থেকে আওয়াজ আসছে। লর্ড লিখেছিলেন, এই গান শুনলে মনে হয় ওডিসি, অথবা তার মতো প্রাচীন গান, মানুষের ঠোঁটে এখনো জীবিত, প্রতিবার নতুন, প্রতিবার একই।
পারি দেখলেন, মৌখিক পরিবেশনার জগতে কোনো কবিতার একমাত্র আসল পাঠ বলে কিছু থাকে না। একই গায়ককে পরপর দুই দিন একই গল্প গাইতে বললে পঙ্ক্তি বদলে যায়, ঘটনা ছোট হয় বা লম্বা হয়, নতুন দৃশ্য ঢোকে, পুরোনো দৃশ্য উধাও হয়। গায়ক নিজে মনে করেন তিনি একই গানই গাইছেন। তাঁর কাছে পরিচয় শব্দে শব্দে স্থির থাকার মধ্যে নয়; কাহিনির চলন, বীরের নাম, প্রধান বাঁক, সূত্র ও ছন্দে।
পারির দেখা সবচেয়ে প্রতিভাবান গায়ক ছিলেন ষাটের কোঠার আভদো মেজেদোভিচ। তাঁকে দিয়ে একটি পরীক্ষা করা হলো। অন্য গ্রামের একজন গায়ক এমন একটি কাহিনি পরিবেশন করল যা আভদো আগে শোনেননি। একবার শোনার পর তাঁকে গল্পটি বলতে বলা হলো। আভদো পুরো কাহিনি পুনর্নির্মাণ করলেন, দৈর্ঘ্য তিন গুণ করলেন, চরিত্রের সূক্ষ্মতা, অলংকার, অনুভূতি, দৃশ্য, বিরতি যোগ করলেন। লর্ডের মতে, নতুন সংস্করণ আগেরটির চেয়ে ভালো। আভদো মুখস্থ করেননি। তিনি গল্পের কঙ্কাল শুনে নিজের সূত্রভাণ্ডার, কৌশল, অভিজ্ঞতা ও প্রতিভা দিয়ে নতুন শরীর বানিয়েছেন।
এখানেই হোমারিক প্রশ্নের পুরোনো দুই পক্ষের মাঝখানে একটি দুয়ার খুলে যায়।
উলফের পর থেকে তর্কটি ছিল, একদিকে একক প্রতিভাবান কবি, অন্যদিকে নামহীন লোকগায়কদের দীর্ঘ সারি। পারির সূত্র-তত্ত্ব দ্বিতীয় পক্ষকে শক্ত প্রমাণ দিয়েছিল। কিন্তু আভদো দেখালেন, মৌখিক ঐতিহ্য ব্যক্তিগত প্রতিভিকে মুছে দেয় না। সবাই একই সূত্র ব্যবহার করে, সবাই একই পুরোনো কাহিনি পায়, কিন্তু সবার গলায় কাহিনি সমান হয় না। কেউ দশ পঙ্ক্তিতে সেরে ফেলে, কেউ একশো পঙ্ক্তিতে মানুষের চোখ, ঘোড়ার ঘাম, তরবারির ওজন, বন্দীর নিঃশ্বাস, অপেক্ষমাণ নারীর ঘরের অন্ধকার যোগ করে।
প্রাচীন গ্রিক গায়কদের দীর্ঘ ধারায় এমন একজন অথবা কয়েকজন নিশ্চয়ই ছিলেন, যাঁরা অন্যদের চেয়ে শক্তিশালী। তাঁরা পুরোনো যুদ্ধগাথা শুনেছেন, প্রস্তুত বিশেষণ ও দৃশ্যের কাঠামো উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন, তারপর সেই উপকরণ দিয়ে অ্যাকিলিসের ক্রোধ, হেক্টরের মৃত্যু, প্রিয়ামের শোক, ওডিসিউসের মিথ্যা, পেনেলোপির অপেক্ষা, টেলেমাকাসের অস্থিরতা, ক্যালিপ্সোর দ্বীপ, সাইক্লোপসের গুহা, মৃতদের অন্ধকার, ইথাকার বিছানা এমনভাবে নির্মাণ করেছেন যে পরের প্রজন্ম গল্পগুলো ছাড়তে পারেনি।
তাঁদের নাম জানা নেই। গথিক ক্যাথেড্রালের পাথর কাটা, খিলান তোলা, কাচ বসানো অধিকাংশ কারিগরের নামও জানা নেই। তবু গির্জা দাঁড়িয়ে থাকে; দুপুরের আলো রঙিন কাচ ভেদ করে মেঝেতে পড়ে, দর্শক মাথা তুলে তাকায়। হোমারের ক্ষেত্রেও কবির ব্যক্তিগত জন্মসনদ হারিয়ে গেছে, কাজ রয়ে গেছে। পারি মানুষ হোমারকে সরিয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু কবিতার প্রতিভা নষ্ট করেননি। তিনি দেখিয়েছেন, সেই প্রতিভা কোনো নিঃসঙ্গ ঘরে বসে শূন্য থেকে জন্মায়নি; তার পেছনে শত শত মৃত গায়কের কণ্ঠ, বহু অঞ্চলের ভাষা, বদলে যাওয়া অস্ত্র, ভেঙে যাওয়া রাজ্য, অক্ষরহীন স্মৃতি, সরাইখানার ধোঁয়া, উৎসবের ভিড়, বীণার তার, ভুল, পুনরাবৃত্তি, শ্রোতার চাহিদা, আর একই গল্প আবার বলার মানুষের পুরোনো নেশা।
হোমারকে তিনি হত্যা করেছিলেন একজন নির্জন লেখক হিসেবে। তার জায়গায় দেখা গেল অসংখ্য মানুষের দীর্ঘ ছায়া। সেই ছায়ার মধ্যে কয়েকজনের কণ্ঠ অন্যদের চেয়ে জোরালো ছিল, হাতের কাজ শক্ত ছিল, মানুষের দুঃখ দেখার চোখ গভীর ছিল। তাঁদের আলাদা করে চেনার উপায় নেই। তাই তাঁদের সবাইকে মিলিয়ে এখনো আমরা হোমার বলি। ·

0 মন্তব্যসমূহ