মেদিনীপুর সদর থেকে পশ্চিমে পনেরো-ষোল কিলোমিটার দূরে জঙ্গল-লাগোয়া গ্রামে এক চাষির উঠোনের নরম ধুলোয় বাঘের পায়ের ছাপ দেখতে পাওয়া গেল। পায়ের ছাপ দেখতে পাওয়া গেল ঝোরার ভেজা বালিতে, বনের ভিতর দিয়ে চলে যাওয়া শুঁড়ি পথের পাশে। তার আগে অবশ্য জঙ্গলের পথে বাঘ দেখতে পেয়েছে বলে দাবি করেছে অনেকে। কেউ দেখেছে জঙ্গল করতে গিয়ে, কেউ দেখেছে ঝোপ-বসার সময়, আবার কেউ বা হলুদ-কালোর ঝিলিক দেখেছে মর্নিং-ওয়াকের পথে।

প্রথমটা কেউ পাত্তা দিল না। পশ্চিম মেদিনীপুর আর বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার এই জঙ্গলে এখন পাতা ঝরে পড়ে পড়ার সময়, বাঘের বসবাসের উপযুক্ত আড়াল কোথায়? বাঘের জন্য পর্যাপ্ত খাবারও নেই। তাছাড়া, এই দুহাজার আঠারো সালে বাঘ! তাও আবার হ্যাটা-বাঘ নয়, স্যাটা-বাঘ নয়, হায়না নয় হুঁড়ার নয়, নেকড়ে নয় চিতা নয়, একেবারে রয়্যাল বেঙ্গল! আজকাল কমবেশি শিক্ষার আঁচ পোহানো মানুষের সবকিছুতেই অবিশ্বাস। তারা যাচাই না করে কোনও কিছু মেনে নিতে চায় না। ছাপ যে বাঘেরই পায়ের তা নিশ্চিত করে কে বলতে পারে? এদিকের মানুষ তো বাপের জন্মে আসল বাঘের পায়ের ছাপ দেখেনি। উৎসাহী ছেলে-ছোকরারা অবশ্য এঁড়ে তর্ক জুড়ে দিল। আজকাল গুগ্‌ল-এর যুগ, নিজের চোখে সবকিছু না দেখলেও চলে। স্মার্ট-ফোনে সার্চ দিলেই চোখের সামনে ছবির মেলা।

পায়ের ছাপ চোখে পড়তে লাগল আরও নানা জায়গায়। গড়বেতা, গোয়ালতোড়, পিড়াকাটা, লালগড়, বেলপাহাড়ি, এমনকি শহরের কান ঘেঁসে ভাদুতলা আর বাঘডুবিতেও। কোথাও আকাশমণি গাছের বাকলে মিলল নখের দাগ। একটি দুটি ছাগল, বাছুর হারিয়ে যাওয়ার খবরও এল। স্টোরির গন্ধ পেয়ে ততদিনে উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করে করেছে ছোটবড় মিডিয়া। খবরের কাগজে লিখল—বাঘটা এক-একদিনে পনেরো-বিশ কিলোমিটার করে পথ হেঁটে বেড়াচ্ছে। অনেকে বলল, বাঘ একটা নয়, কয়েকটা।

ষাট-সত্তর বছর আগেও এদিকে বাঘ ছিল। এখন জঙ্গল নামমাত্র, গুগল-ম্যাপ দেখলেই বোঝা যায়, দিনদিন ছোট হয়ে আসছে সীমা। ঘন জঙ্গল বলতে কিচ্ছু নেই, এফোঁড়-ওফোঁড় করে চলে গিয়েছে পিচঢালা সড়ক, যত্রতত্র হোটেল-রিসর্ট-রেস্তোরাঁ। জঙ্গল পরিষ্কার করে খেলার মাঠ, চাষের জমি, বসত জমি হাতানোর কাজ হয়েই চলেছে। পঞ্চায়েত সবই জানে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে তাদেরই সমর্থন, প্ররোচনা। পুলিশ বা বন-বিভাগ কিছু জানে না—তা হতে পারে না। গরিবমানুষ পেটের দায়ে চুরি করে গাছ কাটে। সরকারী কর্মীদের পেটের খিদেও তো কম নয়। এখন কথা হল—এমন পরিবেশে বাঘ এল কী করে, কোথা থেকেই বা এল?

যাই হোক, বাঘ তো বাঘই, ফলে জঙ্গলমহলের দিকে শহুরে বাবুদের আনাগোনা একেবারে কমে গেল। বাবুদের নানারকম আমোদ-ফুর্তির নিত্য যোগান চাই ঠিকই, কিন্তু প্রাণের ঝুঁকি আছে এমন কিছু থেকে তারা শতহস্ত দূরে। স্থানীয় প্রশাসন সাধারণ গেরস্থকেও বারবার সাবধান করে দিল। বাজার-হাট বা ইস্কুল-পাঠশালা যেতে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে শর্টকাট করা চলবে না। জঙ্গলে গরু-ছাগল চরাতে নিয়ে যাওয়া চলবে না। জঙ্গলে ঝোপ-বসতে যাওয়া চলবে না, ব্যবহার করতে হবে বাড়ির শৌচালয়। কটা দিন, কত দিন সেটা নির্দিষ্ট করে বলা হল না, থাকতে হবে সাবধানে।

জেলা-দপ্তরের বড় কর্তারা আপসোসের সুরে বলল, মাত্রই বছর সাত-আট জঙ্গলমহলটা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল, আবার কী যে নতুন আপদ এসে হাজির হল কে জানে! কাছাকাছি টাউন যেমন মেদিনীপুর ঝাড়গ্রাম বা গড়বেতা-বিষ্ণুপুরের কোনও কোনও শিক্ষিত অবিশ্বাসী বলল, ওসব বাঘ-টাগ কিচ্ছু নয়, তেনারাই আবার শক্তি সঞ্চয় করে ফিরে এলেন কিনা দেখো! তাদের আড়াল করতেই হয়তো গ্রামের মানুষ বাঘের গপ্পো ভাসিয়ে দিয়েছে হাওয়ায়।

আনন্দবাজার পত্রিকা, ২ মার্চ ২০১৮
লালগড়ের জঙ্গলে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার!
নিজস্ব সংবাদদাতা

আতঙ্ক আর সন্দেহ দানা বাঁধছিল বেশ কয়েক দিন ধরেই। বন দফতরের কর্তাদের অবশ্য দাবি ছিল, লালগড়ের জঙ্গলে বাঘ থাকতেই পারে না। কিন্তু, গ্রামবাসীরা জানিয়েছিলেন, বাঘই দেখেছেন তাঁরা। প্রমাণ স্বরূপ মাটিতে দেখিয়েছিলেন টাটকা পায়ের ছাপ। কিন্তু, একদা মাওবাদী অধ্যুষিত লালগড়ে মাঝেমধ্যে হাতির দেখা মিললেও বাঘের দেখা তো দূর, বাঘের কথাও শোনা যায়নি কস্মিনকালে।

সন্দেহ দূর করতে লালগড়ের জায়গায় জায়গায় বসানো হয়েছিল ‘ট্র্যাপ ক্যামেরা’। বন দফতরের পাতা সেই ক্যামেরাতেই শুক্রবার দেখা দিল একটা পূর্ণবয়স্ক রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার।

শেষপর্যন্ত বনদপ্তরের অফিসিয়াল ঘোষণা—হ্যাঁ, সত্যিই বাঘ এসেছে বনে। এবং একটা নয়, অন্তত চার-পাঁচটা বাঘ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে জয়পুর থেকে জাম্বনি। জঙ্গলের আশেপাশে বসবাস করে থাকা গৃহস্থেরা তো ভয় পেলই, মিডিয়ার লাগাতার এক্সক্লুসিভ কভারেজের দৌলতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল সারা রাজ্যে। সন্ধেবেলা চ্যানেলে-চ্যানেলে আলোচনাসভা বসল। এলেন বনমন্ত্রকের লোক, শাসক ও বিরোধী দলের নেতারা, পরিবেশ-আন্দোলনের কর্মী, সমাজবিদ্যার অধ্যাপক, প্রাণীবিজ্ঞানী, পুলিশের প্রাক্তন আধিকারিক, এমনকি অবসরপ্রাপ্ত সেনা-কর্তাও। অনেক তর্কবিতর্কের শেষে মোদ্দা কথা যা দাঁড়াল তা হল—এমন জঙ্গল যেখানে মানুষের রোজের যাওয়া-আসা, যেখানে এলাকার অর্থনীতি, অগ্রগতি, উন্নয়নের প্রশ্ন জড়িত সেখানে বাঘের দাপাদাপি কিছুতে মেনে নেওয়া যায় না।

কিন্তু লোধাশুলি, ধেড়ুয়া বা ঝিটকা অঞ্চলের মাকড়া-পাথরের মতো গাঁওবুড়োদের গলায় আবার ভিন্ন সুর। তারা বলে, হুঁ-হুঁ বাবা, এই না হলে বন! বাঘ ছাড়া কি বন মানায়? বাঘ হল বনের রাজা!

আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৫ মার্চ ২০১৮
তিনি থেকেও নেই, না থেকেও আছেন
রাহুল রায়
...
দিগন্তে ডুব দেওয়া সূর্যের দিকে গড় করেন যুগল। তার পর বিড়বিড় করে অস্ফুট আদিবাসী মন্ত্রে বলেন— ঘরের মানুষ ঘরে ফিরেছে, তার হাত ধরেই জঙ্গলমহলে ফিরবে অপার সমৃদ্ধি।

পুণ্যাপানি গ্রামের হীতেন হেমব্রমের বয়স হয়েছে। তবে, এখনও পুরনো জঙ্গলমহলের সেই অগম্য বনটুলির কথা ভাসা-ভাসা মনে আছে তাঁর। ... পড়শি গ্রামের গাঁওবুড়া যুগলের কথাটা একটু ভেঙে বুঝিয়ে দিচ্ছেন তিনি, ‘‘বনে বাঘ থাইকল্যে বন বাঁইচবেক, ই তো সহুজ কথা!’’

লালগড় থেকে সারেঙ্গা, শালবনি থেকে সিমলাপাল— বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল জুড়ে আদিবাসী সমাজ তাই বাঘের প্রত্যাবর্তনে যেন হারানো সুপবনের স্বপ্ন দেখছে।

পোডিয়া গ্রামের মা, অলি বাস্কে তাঁর বছর পাঁচেকের ছেলেকে পইপই করে সাবধান করছেন, ‘‘বিররে তাড়ুপ মেনায়া!’’ (মনে রাখিস, বনে বাঘ আছে)।

সিমলাপালের জঙ্গুলে রাস্তাটা যেখানে বেমক্কা বাঁক নিয়ে নেঘাচর গ্রামের দিকে গড়িয়ে গেছে, সেখানেই মালতী কিস্কুর সঙ্গে দেখা। বাঘের ভয়ে, দিন দশেক ঘরে বেঁধে রাখার পরে, প্রায়-উপোসি ছাগলগুলো নিয়ে একটু চরাতে বেরিয়েছেন। বিকেল ফুরিয়ে আসছে দ্রুত, সোল্লাসে বাসায় ফিরছে পাখপাখালি। এলোমেলো ছড়িয়ে যাওয়া ছাগলের পালকে জড়ো করার ফাঁকে মালতী বলছেন, ‘‘ডর লাগে ঠিকোই, তবে, তাড়ুপ তো মুদের ভগবানও বটিস!’’

নতুনডিহি গ্রামের অবসর নেওয়া স্কুলশিক্ষক গোরাচাঁদ মুর্মু মনে করিয়ে দিচ্ছেন তাঁর সাক্ষাৎ ব্যাঘ্র-ভূতের অভিজ্ঞতাটা। ‘‘সে বড় ঘন বন ছিল বটে নতুনডিহিতে,’’ তাঁর গলায় হারানো দিনের ছমছমে স্মৃতি টাটকা হয়ে উঠছে। ফেউ-ডাকা রাতে বাপ-ঠাকুরদা মনে করিয়ে দিতেন, ‘‘হুই দেখ বাঘ বিরাইলো!’’

বাঘ ভারী রহস্যময়, কেউ স্পষ্ট করে দেখতে পায় না। না ভীরু ফাঁকিবাজ সরকারী কর্মী, না জঙ্গল করতে যাওয়া দেহাতি মেয়েপুরুষ। একদিন দেখা দিয়ে বাঘ ঘাপটি মেরে থাকে পাঁচ-সাত দিন, কেউ তার খোঁজ পায় না। লোক বলাবলি করে, ঘরের বাঘ ঘরে ফিরে গেছে। কেউ বলে বড়সড় শিকারের পর বাঘ কদিন বিশ্রাম নিচ্ছে। আঁতেল মাতব্বর গোছের মানুষ বলে, বাঘ আগেও ছিল না, এখনও নেই। আছে কেবল বাঘের ভয়।

বনের মানুষের বন ছাড়া চলে না। পেটের দায়ে কেঁদ-পাকা, মহুল, পিঁপড়ের ডিম, কুড়কুড়ি ছাতু বা শুকনো কাঠপাতা কুড়োতে বনে যাদের যেতেই হল তারা ফিরে এল নিরাপদে। মাত্রই একজন-দুজন, তারা শতাংশের হিসেবে আসে না, তারা চোখ পাকিয়ে শোনায় বাঘের মুখোমুখি পড়ে যাওয়ার গপ্পো। কেউ দেখায় বাঘের আচমকা আক্রমণের ফলে তৈরি হওয়া শরীরের টাটকা ক্ষত, কপালের জোরেই নাকি বেঁচে ফিরতে পেরেছে। তাদের মুখের গল্প, ক্ষতস্থানের ছবি সাতকাহন করে ছাপা হয় শহরের কাগজে।

বড়বড় পুলিশ কর্তারা খুব গোপনে এদিকের থানাগুলোতে ফোন করে খোঁজ নিলেন—কোথাও কোনও পোস্টার মেলেনি তো?

আনন্দবাজার পত্রিকা, ৯ এপ্রিল ২০১৮
শিয়রে ভোট, বাঘের হদিস পেতে নয়া দল
নিজস্ব সংবাদদাতা

এই দেড়-দু’মাসে বাঘ ধরতে কম চেষ্টা হয়নি জঙ্গলমহলে। অবশ্য বাঘবন্দি এখনও হয়নি। শিয়রে আবার পঞ্চায়েত ভোট। সব দিক দেখে বাঘের গতিবিধির উপর নজর রাখতে বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে জঙ্গলমহলে। সেই দল কাজও শুরু করেছে। এক সূত্রে খবর, দফতরের রূপনারায়ণ বিভাগে দু’টি দল গঠন করা হয়েছে। লালগড়, গোয়ালতোড়, গড়বেতার বিস্তীর্ণ জঙ্গল এই বিভাগের আওতাধীন। বাঘ ধরতে আর কত সময় লাগবে? পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলাশাসক জগদীশপ্রসাদ মিনা বলেন, “বন দফতরকে বলেছি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাঘ ধরতে হবে।” জেলার এক বনকর্তার কথায়, “একাধিক বিশেষ দল গঠন হয়েছে। ওই দল সব খোঁজখবর রাখছে। নিশ্চয়ই কিছু হবে!”

স্পেশাল বাহিনী গড়া হল বনদপ্তরের কর্মী আর পুলিশ মিলিয়ে। সরকার বলল, বাঘের গায়ে যেন আঁচড়টি না লাগে, পাকড়াও করতে হবে জীবিত অবস্থায়। বাহিনীর নাম শুনলেই বনচর মানুষের মনে পড়ে যৌথ-বাহিনীর কথা, মদ আর মাংস ছাড়া যাদের চলে না। সেসব দিনের কথা মনে পড়লে এখনও বুক দুরুদুরু করে এদিকের মানুষের। বাহিনী হল সভ্যতার রক্ষক, তাদের কোনও দোষ দেখা চলে না। তাদের যেন সাতখুন মাফ।

দুশ্চিন্তা মুলতুবি রাখতেই হল আপাতত, নিরুপায় মানুষ, বাহিনী মোতায়েন হল আবার। বাঘের উপস্থিতিতে বনের মর্যাদা বৃদ্ধি পায় ঠিকই, কিন্তু সেসব কিছুটা রোম্যান্টিকতার ব্যাপার। গৃহস্থ মানুষের খুব বেশি রোম্যান্টিক হলে চলে না। ছেলেপুলে গরু-ছাগল নিয়ে বাঘের কবল থেকে বাঁচতে হবে তো! তাই বরাবরের মতো বাহিনী হাতে পেয়ে গেল অব্যর্থ এক অস্ত্র। গরিব ছাপোষা মানুষের ভয়ের মতো ধারালো অস্ত্র আর কীই বা হতে পারে!
...........
তারপর একদিন, জঙ্গলের গভীরে মোরামের একটা অপ্রশস্ত খাদের মধ্যে মিলল আগুনরঙা সেই রয়্যাল-বেঙ্গলের লাশ।

কে মারল, কীভাবে মারল?

কেউ বলল রোগ ছিল বাঘটার, কেউ বলল আত্মরক্ষার জন্য হিংস্র শার্দূলকে গুলি করতে বাধ্য হয়েছে পুলিশ। অনেকে বলল, ওসব গল্প, স্রেফ ফাঁদে ফেলে খুন করা হয়েছে। সরকার বলল, অপরাধীরা রেহাই পাবে না, গঠিত হবে তদন্ত-কমিশন।

বনদপ্তর হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। দুতিন মাসের ত্রাস আর উৎকণ্ঠার অবসানে কর্মীরা পিকনিক করল শালবনের ছায়ায়। গল্প ফুরিয়ে যাবার পর ক্যামেরার ফোকাস অন্যত্র সরিয়ে নিল মিডিয়া।

আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৫ এপ্রিল ২০১৮
বাঁচানো গেল না বাঘুতকে, শুরু আক্ষেপ
কিংশুক গুপ্ত
চৈত্র সংক্রান্তির সকালে গাঁয়ের গরাম থানে লৌকিক উপাচারে বাঘুতের (বাঘের দেবতা) পুজো করছিলেন সন্তোষ মাহাতো। মহুল গাছের তলায় পোড়া মাটির হাতি-ঘোড়ার ছলনে বাঘ দেবতার উদ্দেশ্যে আতপ চাল-গুড়-দুধ-দুর্বা ঘাসের নৈবেদ্য নিবেদন করে বর্ষীয়ান সন্তোষবাবু জানালেন, বল্লম খুঁচিয়ে বাঘুতকে মেরে ফেলার মতো হীন কাজকে কখনওই সমর্থন করা যায় না।

ঝাড়গ্রামের চুবকা অঞ্চলের ঘোড়াজাগির গ্রামের ‘লায়া’ (লৌকিক পূজারী) সন্তোষবাবুর মতো জঙ্গলমহলের আদিবাসী-মূলবাসীরা বাঘের মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না।

সন্তোষবাবু বলেন, “... বাঘুত তো আমাদের প্রাচীন দেবতা। তাঁকে বাদ দিয়ে গরাম থানের পুজো হয় না। সেই বাঘুতকেই কিছু মানুষ মেরে ফেলল!” বিনপুরের বাঘাশোল গ্রামের প্রবীণ চাষি খগেন মাহাতো বলেন, “এলাকার গ্রামের নাম থেকেই বোঝা যায়, এক সময় এখানে বাঘ ছিল। আমরা বাঘুতকে মানি। তাই বাঘের এই মৃত্যু আমাদের কাছে খুবই বেদনাদায়ক।”

বিনপুরের বসন্তপুর গ্রামের গরাম থানের দেহুরি (পূজারি) ৮০ বছরের মন্টু গায়েন বলেন, “এই এলাকায় প্রায় একশো বছর পরে বাঘের আগমন ঘটেছিল। কিন্তু আমরা দেবতাকে রক্ষা করতে পারলাম না।”

নগরের অগোচরে, আবার বেশ কিছুদিন মনমরা হয়ে থাকল সারা জঙ্গলমহল। যুদ্ধে রাজা পরাজিত ও নিহত হলে প্রজাদের অবস্থা যেমন হয়, বনবাসী নরনারীদের বুকে থম মেরে থাকল পরাজয় আর অপমানের গ্লানি। ·