আমার চেনাজানা মানুষদের মধ্যে অনেকেই আমার এবং বিন্নির ঘনিষ্ট সম্পর্কের কথা জানে। অনেকেই এই ঘনিষ্ট সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে স্বাভাবিকভাবে আমার সঙ্গে কথা বলে। তারা বিচিত্র রকমের কথার মধ্যেও বিন্নির খবর নেয়। খবর জানতে চায় এবং আমাদের বর্তমান সম্পর্কের আরো খবর জানতে চায়। আমাদের সম্পর্ক সম্বন্ধে কত কৌতূহল দেখায়।
এক একজন এক একভাবে নিজেদের কৌতূহল প্রকাশ করে। সকলের কৌতূহলের ওপরই যথাসাধ্য উত্তর দিই। উত্তর শুনে এক একজন এক একভাবে মজা পায়। মিনিটের পর মিনিট ঘণ্টার পর ঘণ্টা এদের সঙ্গে মন খুলে কথা বলি। এদের কাছে মন খুলে দিতে না পারলে আমার কষ্টের সীমা থাকে না।
কথায় কথায় এরা আমার কষ্টের সময় পাশে এসে দাঁড়ায়। বিন্নির সঙ্গে ছোট বড় কত সমস্যার জন্য কতদিন আমার চোখে ঘুম আসে না। এদের কাছে আমি এই সব সমস্তার কথা তুলে ধরার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ি। তারা আমার এই সব সমস্যার কথা শুনে এমন একটা ভাব দেখায় যে এই সব সমস্যা কোন সমস্যাই না। কেউ কেউ আমার এই সব সমস্যা ভুল ধারণা থেকে জন্ম বলে বুঝিয়ে দেয়। কেউ বলে এই সব সমস্যা শুধু আমারই তৈরী। তারা বোঝায় এই সব সমস্যা তৈরীতে বিন্নির কোন হাত নেই।'
তাদের এই ধরনের যুক্তিতে কত সময় আমি আমার সমস্যা থেকে রেহাই পেয়ে যাই। রেহাই পেয়ে এদের উদ্দেশ্যে মনে মনে এদের মঙ্গল কামনা করি। কখনও কখনও সামনাসামনি দেখা হয়ে গেলে গলা জড়িয়ে আদর করে এদের সঠিক যুক্তির উদ্দেশ্যে বাহবা জানাই।
অথচ আরোও এমন কিছু মানুষ আছে যাদের আমি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। সবসময়ই এদের জন্য আমাকে রাস্তায় অতি সতর্কভাবে চলাফেরা করতে হয়। কেননা এদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলেই এরা নানান কথার মধ্যে বিন্নির কথা এমনভাবে টেনে আনে যে কারোর সঙ্গে এইভাবে এক ঘনিষ্ট সম্পর্ক থাকা যেন মহাদোষ।
এই ধরনের সম্পর্ক এদের চোখে এতই খারাপ লাগে যে এরা সর সময়ই ব্যস্ত থাকে কিভাবে এই ধরনের সম্পর্ককে ভেঙ্গে দেওয়া যায়। কেমনভাবে বিন্নির কথা আমার কানে বিষ হয়ে ঢোকে সেই দিকেই যেন এদের চরম খেয়াল। এবং আনন্দ।
এদের এই ধরনের খেয়ালে আমি বেশ মজা পাই। কেমন সুন্দর-ভাবে এরা আমার চেনাজানা বিন্নি থেকে এক অচেনা অজানা বিন্নি নামক মেয়েকে টেনে তুলে আনে। এমনভাবে এক একজন বিন্নিকে বানায় যে মনে মনে এদের এই নতুন বিন্নি বানানোর চেষ্টাকে প্রশংসা করতে বাধ্য হই। তাদের এই ধরনের বানানোর অসাধারণ প্রতিভাকে তারিফ করার জন্য প্রতিটি বানানোয় বিশ্বাসের ছাপ ফোটাই।
এরা সকলেই ধরে নেয় আমি ওদের সব কথা বিশ্বাস করি। আমিও চাই সব সময়ই যেন আমার চোখে মুখে এই বিশ্বাস লেগে থাকে। তাই যখনই এরা বিন্নি সংক্রান্ত কোন মন্তব্য করে আমি ওদের মন্তব্যের পক্ষেই সায় দিয়ে চুপ করে থাকি। আমার চুপ দেখে আমার মুখ দেখে এরা বিন্নিকে ভুলে যেতে বলে।
বিশ্বাসের জন্য আমার অনেক কষ্ট হয়। অনেক অভিনয় করতে হয়। এবং আমার এই কষ্ট আমার এই অভিনয় বিশ্বাসকে আরো সুদৃঢ় করার জন্যই বেড়ে ওঠে।
এক এক সময় এই বিশ্বাস তাই এক অসাধারণ রূপ নেয়। বিশ্বাসের জন্য শরীর বদলে যায়। মুখ মলিন এবং বিবর্ণ হয়ে পড়ে। নতুন বিন্নি প্রস্তুতকারকেরা আমার এই মলিন এবং বিবর্ণ মুখ দেখে কেমন চঞ্চল হয়ে পড়ে। তারা বেশ ভালো করেই ধরে নেয় আমি বিন্নির জন্য দারুণ অসুস্থ। অসুখী। আমার এই অসুস্থ শরীরের জন্য একমাত্র প্রধান কারণ বিন্নি।
নতুন বিন্নি প্রস্তুতকারকদের মধ্যে কেউ কেউ আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। তারা আমার এই সমস্যার জন্য ছটফট করে। তারা আমার এই চেহারার কথা চিন্তা করে বিভিন্ন পথ বিভিন্ন উপদেশ আমার সামনে তুলে ধরে।
এই সব উপদেষ্টাদের মধ্যে কেউ নিজের উপদেশের মধ্যে ঈশ্বর-তত্ত্বের কথা বলে। হাত ধরে আমায় অনুরোধ করে ঈশ্বরতত্ত্বের মধ্যে জড়িয়ে যেতে। কোন কিছু ভুলে যাবার জন্য এই তত্ত্ব নাকি এক মহা ওষুধ। নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য এই তত্ত্বের সমতুল্য আর কোন তত্ত্বই নাকি নেই।
কোন উপদেষ্টা আবার স্থানের উপর বিশেষ জোর দেয়। তার কথায় অনেক সময় স্থান বদলেও পুরোনো অনেককিছু নাকি অতি দ্রুত মুছে ফেলা যায়। কেননা বিশেষ বিশেষ স্মৃতি নাকি বিশেষ বিশেষ স্থানের উপর অনেকটা দায়ী থাকে। তাই বিন্নিকে যদি মন থেকে একদম মুছতেই হয় তবে আমার পক্ষে নাকি স্থান বদলই একমাত্র উপযুক্ত এবং নির্ভরযোগ্য পথ।
কেউ আবার খুবই প্রচলিত এক উপদেশের কথা তুলে ধরে। বলা বাহুল্য তার এই প্রচলিত উপদেশটি মদতত্ত্বের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকে। মদের দোষ। এবং যদের গুণ নিয়েই এই মদতত্ত্ব তৈরী হয়।
মদের দোষতত্ত্বে বলা হয় কোন কিছু ভুলে যাবার জন্য অল্পমাত্রায় নিয়মিত মদ খাওয়াও নাকি খুবই ক্ষতিকর। এতে মানসিক দিক দিয়ে একজন খুবই দুর্বল হয়ে যায়। আর তারই ফলস্বরূপ দেখা যায় কেউ কোন কিছু যখন ভোলার চেষ্টায় মেতে ওঠে তার বদলে ঠিক বিপরীত ছবিটাই ফুটে ওঠে। ভোলার বদলে না-ভোলাটাই সেখানে প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। যে জিনিসকে প্রতি সেকেণ্ডে ভুলে থাকতে চাওয়া যায় সেই জিনিসই প্রতি সেকেণ্ডে মনে হাঁটতে থাকে।
অথচ মদের গুণতত্ত্বে ঠিক উল্টো কথা বলা হয়। নিয়মিত অধিক মাত্রায় মদ্যপানে মন খুব প্রফুল্ল এবং সতেজ থাকে। আর এই প্রফুল্ল এবং সতেজ মনকে শিশুমনের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এবং এই শিশুমনই একমাত্র কোন কিছু ভুলে যাবার পক্ষে অব্যর্থ উপায়।
উপদেশের কথা শুনে আমি প্রত্যেক উপদেষ্টার কাছে অক্ষরে অক্ষরে এই সব উপদেশ পালনের কথা রাখি। এই সব উপদেশ যে আমার কাছে মূল্যবান বস্তু তারা আমার মুখের ভাব দেখে বোঝে। এক একজন আমার পিঠে হাত রেখে আমার আশু মঙ্গলের উদ্দেশ্যে শরীরের উন্নতির উদ্দেশ্যে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে। তাদের এই প্রার্থনার জন্য আমি আমার মুখের ভাবকে প্রশংসা জানাই। আদর করি। এবং ভাবের জন্য আমার গর্বের সীমা থাকে না।
শরীর শরীরের মতোই রেখে। দিই। উন্নতির কোন লক্ষণ সেইখানে ধরে রাখি না। উপদেশও উপদেশের জায়গায় বসে থাকে। একদিনও এই সব উপদেশ পালনের ইচ্ছে হয় না। বরং যত্ন করে এই সব উপদেশ টেবিলে সাজিয়ে রাখি। টেবিলে উপদেশ জমে ওঠে।
নতুন বিন্নি প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে বরং শরীরের অবস্থা আরো খারাপ করে তুলি। আমার এই খারাপ শরীর দেখে এরা ভয়ে আঁতকে উঠে। বিন্নিই যে আমার মাথায় এখন চব্বিশ ঘণ্টার এক সমস্যা আমার চেহারা দেখেই বুঝে যায়।
মুখের কাছে মুখ এনে এরা আমার বর্তমান অবস্থার কথা জানতে চায়। আমি মুখের কাছে মুখ এনে এরা আমার বর্তমান মানসিক অব জানতে চায়। উপদেশ অনুযায়ী ফলের কথা জিজ্ঞাসা করে এদের আমার মানসিক অবস্থার কথা বলি। এমনকি অক্ষে অলদেশ পালন করা সত্বেও যে কোন সুফল হয় না ক্ষরে অক্ষরে সেই কথাও এক সে একজনকে খুবই দুঃখের সঙ্গে জানাই।
আমার দুঃখ শুনে এক একজন গম্ভীর হয়ে ওঠে। কোনো উন্নতির লক্ষণ না দেখে তারা পুরোনো উপদেশ বদল করে নতুন নতুন উপদেশ তুলে ধরে। ঈশ্বরতত্ত্বের কথা ছেড়ে কেউ রাজনীতির কথা বলে। রাজনীতির মধ্যে চব্বিশ ঘণ্টা জড়িয়ে যেতে অনুরোধ করে।
আবার কেউ মদতত্ত্বের বদলে দর্শন দার্শনিকতা এই সব সম্বন্ধে বোঝায়। তার কথায় দার্শনিকরা কিছু উদাসীন প্রকৃতির হয়। এবং এই উদাসীনতার মধ্যে দিয়েই অনেক কিছু জয় হয়। লোভ বা আকর্ষণ সহজে মনে জায়গা পায় না। মন শুধু দর্শনেই মেতে থাকে। আর এই দর্শনই নাকি একমাত্র মুক্তির পথ।
উপদেশ বদল করে এক একজন দারুণ আস্থার সঙ্গে আমার কাঁধে হাত রাখে। নতুন উপদেশ যে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য তাদের কথায় এবং চেহারায় সেই সুর ফুটে ওঠে। তাদের আশ্বাসে আমার মুখ বদলে যায়। আমার চোখ দেখে আমার মুখ দেখে তারা আমার আনন্দ ধরে নেয়। নতুন উপদেশের ওপর যে আমার অগাধ বিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে আমি হাবেভাবে সেই জিনিস বুঝিয়ে দিই।
ধীরে ধীরে এই ভাবে আমার হাতে প্রচুর উপদেশ আসতে থাকে। উপদেশ জমে জমে উপদেশের এক স্তূপ আমার মাথায় গড়ে ওঠে। এত সব মূল্যবান উপদেশ হাতে জমা থাকে বলে এক এক সময় গর্বে আমার বুক ফুলে ওঠে। এত সব এব দামী উপদেশ কি করা যায়, কি করি সেই চিন্তাতেই আমার এখন ঘুম হয় না। দিনরাত শুধু এই উপদেশের মধ্যে দিয়ে আমার সময় কেটে যায়। অথচ এত সব মূল্যবান উপদেশ আজকের দিনে কারোর হাতে থাকা মানে এক বিরাট সম্পত্তি। এই জমান উপদেশের মধ্যে দিয়েই যে কেউ বিখ্যাত এবং ধনী হতে পারে। তাই এই উপদেশের জন্য আমার মন সব সময় ছটফট করে। শুধু ভাবি কি করা যায় কি করি।
উপদেশের সাহায্যে আমি এক ভবন খুলি। এই ভবনের নাম রাখি উপদেশ ভবন। উপদেশ ভবনের কল্যাণে আমার মন আজ বেশ শান্ত। কেননা বহু চিন্তা এবং পরিশ্রম ক্ষয় করে এই ভবন খোলা হয়।
এই ভবনে প্রতিদিনই আমি সন্ধ্যার সময় বসি। উপদেশ বিক্রি করি। যারা যারা উপদেশ কিনতে আসে তারা প্রত্যেকেই প্রেম বিষয়ক কোন না কোন সমস্যার রুগী। এই সব রুগীরা করুণ মুখে আমার ডাকের জন্য অসীম ধৈর্য্যের সঙ্গে অপেক্ষা করে। আমি একে একে নাম ধরে রুগীদের ডাকি। আমার খুব সামনে ছোট এক টুলে এদের বসতে বলি। তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে রোগের কথা জানতে চাই। রুগীরা রোগের কথা বলে। রোগের কারণ বলে। সমস্যার কথা বলে।
সমস্যার কথা শুনে কিছুক্ষণ চিন্তা করে আমার প্যাডের সাদা কাগজে সমস্যা অনুযায়ী উপদেশের নাম এবং নির্দিষ্ট এক নম্বর লিখে রগীর হাতে কাগজটি তুলে দিই। তুলে কিছুটা দূরে বসা আমার তরুণ কর্মচারীর কাছে যেতে অনুরোধ করি। কাগজ নিয়ে রুগীরা আমার কর্মচারীর কাছে যায়। এবং কাগজটি দেখায়। কর্মচারী কাগজে আমার লেখা নির্দিষ্ট উপদেশ-নম্বর বেশ ভালো করে পরীক্ষা করে।
শেষে নিশ্চিন্ত মনে পাশের লম্বা আলমারির তাকের কাছে চলে যায়। হাত বাড়িয়ে থরে থরে সাজানো বিভিন্ন উপদেশের খাম এবং খামের নম্বর থেকে নির্দিষ্ট নম্বরের উপদেশের খামটি টেনে নেয়। নিয়ে রুগীর কাছে ফিরে এসে খাম সমেত হাত তুলে বলে এই আপনার উপদেশ। ভিতরের কাগজে সব পরিষ্কার লেখা আছে।
প্রতি খামের ওপরেই উপদেশ অনুযায়ী দাম লেখা থাকে। রুগীরা থাম হাতে নিয়ে দাম মিটিয়ে কিছুটা হাসিমুখে তারপর ভবন থেকে বেরিয়ে যায়।
এই সব সাদা খমের ভিতরের কাগজে সমস্যা অনুযায়ী উপদেশের কথা খুব বিশদভাবে লেখা থাকে। এবং সব কথার নিচে লাল কালিতে দুটো কথা এই সব কাগজে সব সময় লেখা থাকে। এক, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন। দুই, অক্ষরে অক্ষরে উপদেশটি পালন করুন।
উপদেশ ভবনের জন্যে আমায় সব সময় সতর্ক থাকতে হয়। শুধু ভাবি উপদেশের অভাবে এই ভবন যেন বন্ধ হয়ে না পড়ে। কেননা এই ভবন মানেই উপদেশ। উপদেশ ছাড়া এই ভবন সম্পূর্ণ অন্ধকার। অচল। সবসময় যাতে আমার হাতে এই ধরনের মূল্যবান উপদেশ ভরা থাকে আমার লক্ষ্য থাকে শুধু সেইদিকেই। শুধু সেইদিকেই আমি আমার খেয়ালকে তীক্ষ্ণ করে রাখি। আর এই তীক্ষ্ণ খেয়ালই আমায় হাত ভরে উপদেশ উপহার দেয়। উপদেশ ভবনকে বাঁচিয়ে রাখে। ·
[রচনাকাল জুলাই, ১৯৮১]

0 মন্তব্যসমূহ