পুরুষোত্তম সিংহ
সক্রিয় রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ, রাজনীতির দিশাহীন অবস্থা থেকে নিজের মুক্তি এবং অস্তিত্বের হতাশাপরায়ণ সংকট থেকে বাংলা গল্পে প্রবেশ করেছিলেন অভিজিৎ সেন (১৯৪৫)। রাজনীতির মধ্য দিয়ে যে সমাজ বদলের আকাঙ্ক্ষায় ঘর ছেড়েছিলেন, বাম রাজনীতির কোলাহলে বারবার নতুনের দিকে ঝুঁকে সমাজ পরিবর্তনের ভাবনায় মশগুল হয়েছিলেন, কিন্তু সমস্ত ক্ষেত্রে দিশাহীন, মতাদর্শহীন হয়ে জীবনের পরিত্রাণ খুঁজতে গল্পে পলায়ন করেছিলেন অভিজিৎ সেন। সাতের দশকে বাংলা গল্পের ফর্ম নিয়ে যখন তুমুল ভাঙচুর চলছে, গল্প আন্দোলনের নানা খুঁটি দানা বাঁধছে, নকশালি নৈরাজ্যের আরেক স্বরূপ হাংরি গদ্যের ভাষাগত ইস্তেহারে প্রকাশ পাচ্ছে তখন তিনি গল্পই লিখতে চেয়েছিলেন। খুব জোরের সঙ্গে, প্রজ্ঞা, বীক্ষণের সঙ্গে গল্পই নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। শুধু তাই নয় গল্প নিয়ে যে তুমুল ভাঙচুর, গল্পহীনতা, প্রথাবিরুদ্ধতা, না-গল্পের দিকে যাত্রা ন্যারেটিভকে আক্রমণ করে নিজেকে যেমন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে গেছেন, তেমনি বাতিল সরণিতে পড়ে গেছেন। সাতের দশকের সূচনাতেই ছদ্মনামে (অরিজিৎ ছদ্মনামে প্রথম গল্প ‘বিস্ফোরণ’ (‘কালি ও কলম’, ১৯৭১) নিজের আত্মপ্রকাশ ঘটালেও উত্তরণের পথ খুঁজে পাচ্ছেন না বলে বারবার থমকে যাচ্ছেন। সাতের দশকে অভিজিৎ সেনের লিখিত গল্পগুলি হল—‘বিদ্যাধরী’, ‘কণ্ঠনালী’, ‘ধানপোকা’, ‘তৃতীয় স্থানাধিকারী চতুর্থ ব্যক্তি’, ‘চোর’, ‘পরীক্ষিত পাহানের সন্ধান’, ‘মর্যাদা। সেই দশকে ‘মধুপর্ণী’, ‘কৃন্তন’ পত্রিকায় এইসব গল্প প্রকাশ পেলেও নিজের জয়যাত্রার সূচককে জানান দিচ্ছেন না। বলা ভালো নিজের প্রজ্ঞা, দর্শন, রাজনৈতিক বোধ ও সমাজ বাস্তবতার রোমন্থন এই পর্বে অভিজিৎ সেন প্রস্তুত করছেন। আটের দশকের প্রারম্ভিক পর্বের সূচনায় ‘রহু চণ্ডালের হাড়’ (১৯৮৫) এর মতো শ্রেষ্ঠত্বের খতিয়ান আমরা যেমন পেয়ে যাব তেমনি ধীরে ধীরে পাব ‘দেবংশী’(১৯৮১), ‘ক্ষেত্রপাল’ (১৯৮৫) সহ বেশকিছু স্বতন্ত্রচিহ্নিত গল্প। যা একজন গল্পকারের দীক্ষিত পথকে স্বমহিমায় ঘোষণা করে। ‘দেবাংশী’ (১৯৯০), ‘ব্রাহ্মণ ও অন্যান্য গল্প’ (১৯৯৫), ‘অভিজিৎ সেনের ছোটগল্প’ (১৯৯৬), ‘পঞ্চাশটি গল্প’ (২০০০), ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’ (২০০৫), ‘দশটি গল্প’ (২০০৮), ‘ঈশানী মেঘ ও অন্যান্য গল্প’ (২০০৮), ‘দেবাংশী ও অন্যান্য গল্প’ (২০১১), ‘সেরা পঞ্চাশটি গল্প’ (২০১৪), ‘বারুণীস্না ও অন্যান্য গল্প’—এইসব গল্পসংকলন আমরা ইতিমধ্যে পেলেও এই প্রাজ্ঞ গল্পকারের গল্পসমগ্র এখানো প্রকাশিত হয়নি। বলার আর অপেক্ষা রাখে না বাংলা বাজার ও প্রকাশনীর এই উদাসীনতা বাংলা গল্পের সমূহ ক্ষতির চিহ্নায়ক।
“ইদানিং আমি আমার গল্পের মধ্যে কিছু ‘গল্প’-ও রাখতে চাই। লক্ষ্য করেছি সাধারণ পাঠকের গল্প পড়ার ঝোঁক বেশ কিছুটা কমে গেছে। এর একটা প্রধান কারণ বাংলা আধুনিক গল্পে ‘গল্পে’র-আকর্ষণ কমে গিয়ে একধরনের মস্তিষ্কের ব্যায়ামচর্চার পরীক্ষা-নিরীক্ষা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। মস্তিষ্কচর্চা ব্যাপারটা যে পরিমাণে স্থান দখল করে নিয়েছে, গল্প সেই পরিমাণে উচ্চাঙ্গের হয়ে উঠছে না। আমি পরিস্কারভাবে বলতে চাই, বাংলা গল্পে যাঁরা এই ধরন আমদানি করছেন বা চর্চা করছেন, তাঁদের মনন তেমন উচ্চাঙ্গের নয়। ব্যতিক্রম খুব কমই চোখে পড়ে। ফলে একধরনের স্তাবক-নির্ভর আত্মপ্রসাদ এইসব গল্পের লেখকেরা যেমন নিজেরা কিছু পাচ্ছে না, তেমনি তাদের পাঠকেরাও। উপরন্তু বাংলা গল্প তার শত্রু বাড়াচ্ছে। কাফকা-কামুর এদেশী উত্তরসূরীরা বুদ্ধিচর্চা ও মননশীলতায় লজ্জাজনক রকমের পশ্চাদপদ। কাজের তাদের লেখা গল্প অধিকাংশ ক্ষেত্রে যৌনতা নিয়ে উচ্ছ্বাস এবং আড়ম্বরটাই বড় হয়ে উঠতে দেখি।”—অভিজিৎ সেন/ ‘গল্প বিষয়ে ভাবনাচিন্তা’/ ‘উত্তরাধিকার’/ ডিসেম্বর ১৯৯৬।
সাতের দশকে গল্পবৃত্তে প্রবেশ করা তরুণ লেখকদের অনেকেরই ভরসাযোগ্য আশ্রয় হয়ে উঠেছিলেন মহাশ্বেতা দেবী। সেই সাহচার্য, স্নেহ, প্রশ্রয় থেকে বঞ্চিত হননি অভিজিৎ সেনও। বৃত্তকে গল্প করেও অভ্যন্তরীণ শিল্পকলাকে কীভাবে নান্দনিক সুষমায় ভরপুর করে তোলা যায় তার সহজাত কবচকুণ্ডল নিয়েই গল্প আসরে অভিজিৎ সেন প্রবেশ করেছিলেন বলেই প্রথম থেকেই মননশীল পাঠকের নজরে ধরা পড়ে যান। আমাদের উপমহাদেশের বৃহত্তর সংস্কৃতি যা মহানগরের প্রদর্শিত বিজ্ঞাপন থেকে অনেক দূরে প্রান্তের জলা জঙ্গলে মগ্ন-অর্ধমগ্ন অবস্থায় সংস্কারে-কুসংস্কারে নিত্য প্রবাহিত তা ধরেই জীবনের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য যা প্রকৃতপক্ষে দেশকালের সৌন্দর্য তা যে মাত্রায়, যে বিভঙ্গে প্রতি পদক্ষেপে নির্মিত হতে দেখি তা বাংলা গল্পের শরীরে জীবন্ত বিগ্রহ হয়ে বেঁচে থাকবে আরেক শতাব্দীতেও। বহুস্বরিকতার বিবিধ ভাষ্য, অন্তর্বিশ্বের নানা চোরাটান, অস্তিত্বের হ্যাঁ-না দ্বন্দ্ব, অন্তঃকলহ ও নিসর্গের কাব্যময় আস্তরণ যে ক্রিয়ায় প্রতিফলিত হয় তা বাংলা গল্পের ভাঁড়ারে বহু মণিমুক্তা প্রস্ফুটিত কমলে উজার করে দেয়।
অন্তর্দর্শনের পাশাপাশি লেখা যে অভিজ্ঞতার অফুরন্ত ভাণ্ডারের পাঠশালা তা আমরা নানাভাবে প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেয়েছি। কোনো কোনো লেখক নিজের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতাকে পুরোমাত্রায় ব্যবহার করেছেন। বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের ডাক্তারি জীবনের অভিজ্ঞতা, চারুচন্দ্র চক্রবর্তীর (জরাসন্ধ) জেলর জীবনের অভিজ্ঞতা, অভিজিৎ সেনের ব্যাংকে কর্মের অভিজ্ঞতা, অমর মিত্রের কানুনগো জীবনের অভিজ্ঞতা, তপন বন্দ্যোপাধ্যায়, ভগীরথ মিশ্রের আমলা জীবনের অভিজ্ঞতা বাংলা গল্পের সম্পদ। বলা ভালো বাংলা গল্পকে নানা অচেনা বাঁকে নিয়ে গেছে। তেমনি নিজস্ব ভূগোলে অবস্থানরত প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে পুরোমাত্রায় ব্যবহার করেছেন নলিনী বেরা, সৈকত রক্ষিত, আফসার আমেদ, জয়া মিত্র, হিরণ্ময় গঙ্গোপাধ্যায়, সোহারাব হোসেন, আনসারউদ্দিন, নীহারুল ইসলাম, শতদল মিত্র। আবার রাষ্ট্রীয় অত্যাচার, নকশাল, কারগার বরণ, গৃহত্যাগের অভিজ্ঞতাকে গল্পের তলদেশ দিয়ে পুরোমাত্রায় বইয়ে দিয়েছেন অভিজিৎ সেন, রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়, জয়া মিত্র, কিন্নর রায়, মধুময় পাল, দেবজ্যোতি রায়।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভানুমতি উচ্চারণ করেছিল—ভারবতর্ষ কোনদিকে? সেই ভারত নামক দেশ কি কেবলই পিছিয়ে যাচ্ছে? একুশ শতাব্দীর দুই দশক অতিক্রান্ত সময়ের অভিজিৎ সেনের ‘ব্রাহ্মণ্য’ (অনুষ্টুপ, ১৯৯১) গল্প যখন পুনর্পাঠের বিশ্লেষণে দেখি তখন এই ধারণা আরো প্রকট হয়। ‘অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো/সেই তো তোমার আলো/ সকল দ্বন্দ্ববিরোধ-মাঝে জাগ্রত যে ভালো/ সেই তো তোমার ভালো।’ সভ্যতার ক্রমেই পশ্চাত অবতারণে একজন দায়বদ্ধ কথাকার কী করতে পারেন? দেশ সমাজ স্বজাতি স্বগোষ্ঠীর মধ্যে মায়া ছাড়ানো ছাড়া। কুসংস্কার, বিভ্রান্ত ধারণা, ব্রাহ্মণ্যবাদ, জাতপাতের সংস্কার থেকে মানুষকে মুক্ত করে জীবনের দীক্ষিত আলো দেখানো ছাড়া। অথচ রাজনৈতিক ইশারায়, ভোটযুদ্ধে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার তাগিদে যে জাতপাতের বিভাজন ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী তার শেষ কোথায়? একটা দেশ দাঁড়িয়ে থাকে অনেক বিশ্বাসে, অনেক ধর্মবিশ্বাসে, অনেক দার্শনিক মতবাদের উপর। আমাদের দেশে নানা ধর্ম-জাত-শ্রেণি-গোষ্ঠীর মানুষ নানা বিভাজন সত্ত্বেও এতকাল একটা যুথবদ্ধভাবে টিকে আছে কেবল পারস্পরিক সাহচার্য ও সহানুভূতিতে। সেখানে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিভীষিকা যেমন আছে তেমনি কেউ কেউ ব্রাহ্মণ্যবাদকে ভেঙে দিয়ে মানুষের জীবনস্রোত ফেরাতে চেয়েছে। কোনো জাতির সকলেই ভালো বা মন্দ নয়। যেমন আজ সমস্ত সন্ত্রাসবাদের জন্য মুসলিমকে শূলে চড়ানো হচ্ছে তেমনি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাসাহিত্যে দেখব ব্রাহ্মণ্য সমাজের অভাবী চিত্র। অভিজিৎ সেন উপমহাদেশের সংস্কৃতির গভীর বলয়ে নানাভাবে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছেন নানাভাবে। তা ‘বিদ্যাধরী ও বিবাগী লখিন্দর’, ‘ছায়ার পাখি’, রহুচণ্ডালের হাড়’, ‘স্বপ্ন এবং অন্যান্য নীলিমা’ উপন্যাসে যেমন বিবিধ আঙ্গিকে এসেছে তেমনি এসেছে গল্পে। অভিজিৎ সেন প্রথম জীবনের তিন দশকের গল্পে উত্তরবঙ্গের জনজীবন-লোকায়াত সংস্কার-লোকসংস্কৃতি-লোকভাষা-গোষ্ঠীজীবনের নানামুখি প্রতিচ্ছবিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু সাতের দশকে লিখতে আসা লেখকদের থেকে অভিজিৎ সেনের একটা তারতম্য আছে। শুধু কাহিনি অপেক্ষা তিনি উপমহাদেশের গভীরে বয়ে যাওয়া মিথ, সাংস্কৃতিক নির্যাস, জাতিতত্ত্বের গভীর পাঠ, বদলে যাওয়া গোষ্ঠীবিন্যাসের প্রবাহিত স্রোতের মধ্যে নানা দ্বন্দ্বমূলক বয়ানে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-জাতি-শ্রেণিকেন্দ্রিক সত্যে বুনে দেন। ব্রাহ্মণ্যবাদ সমাজকে নিষ্পেষণ করলেও সমাজের উন্নতিতে কি কিছুই ভূমিকা গ্রহণ করেনি? আবার যে ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণের কাছেই হাত পাতল তার কি অপরাধ হল? জাতপাত শ্রেণিদ্বন্দ্ব নিয়ে সামাজিক যে অভিশাপ, যার একাধিক বৃত্ত প্রহরে প্রহরে মানুষকে লাঞ্ছিত করে, এমনকি সমস্ত শ্রেণির মধ্যেই একটা দান্দ্বিক বস্তুবাদ যা জীবনকে কলুষিত করছে তার থেকে মুক্তির খোঁজে পথে নেমেছেন অভিজিৎ সেন এই গল্পে। দেশভাগে বা তারও পূর্বে আমাদের দেশে নানাভাবে জাতি রূপান্তর ঘটেছে। যা আমরা নানাভাবে পাব অভিজিৎ সেনে, পরবর্তীতে পীযূষ ভট্টাচার্যে। জাতি রূপান্তরে ব্রাহ্মণ-কায়স্থ-শূদ্র কোন শ্রেণি থেকে কোন বিভাজনে পৌঁছে গেছে কেউ জানে না। অথচ আমরা প্রত্যেকেই নিজেদের জাতিকুল নিয়ে দম্ভে মেতে আছি, নীচু জাতিকে হেয় করছি। এমনকি শিক্ষিত ভদ্রবৃত্তের মধ্যেও জাতিচেতনা নিয়ে নানা সংকট আছে। যে গোরার উত্তরণ ঘটেছিল ভারতীয় চেতনায় সেই পাঠ সময়ান্তরে নানাভাবে বিক্ষিপ্ত হচ্ছে, নতুন পাঠ গড়ে উঠছে, কেউ কেউ শুদ্ধচেতনার পথ নির্মাণ করেও কোথাও কোথাও ধাক্কা খাচ্ছে। তেমনি সব ব্রাহ্মণ জীবনের মূল স্রোতে ফিরতে পারেনি। অভিজিৎ সেনের ‘ব্রাহ্মণ্য’ গল্পে নচিকেতা ও পাঁচু দুইজনই ব্রাহ্মণ। নচিকেতা ব্যাংকে কর্মরত, পরিবার মধ্যবিত্ত হলেও পাঁচু যজমানিতে মত্ত, একেবারে দরিদ্রশ্রেণির ব্রাহ্মণ। এমনকি পাকুয়া রাইনগর যা গল্পের পটভূমি সেখানে পাঁচু ছাড়া কোনো ব্রাহ্মণই নেই। অথচ দরিদ্র কায়স্থ, শূদ্র, দলিত মানুষ ব্রাহ্মণকে শ্রদ্ধা করে। অভিজিৎ সেন অনুপস্থিত শিল্পকে বেশি করে গুরুত্ব দেন। আবার উপস্থিত শিল্পের মধ্যে যে দান্দ্বিক অবস্থা লুকিয়ে আছে তা টেনে বের করেন। নচিকেতার স্ত্রী কাবেরী কায়স্থ। ফলে নচিকেতার পরিবারে স্ত্রীকে অপমানিত হতে হয়েছে। আবার নচিকেতা কর্মসূত্রে যখন এই অঞ্চলে এসেছে তখন তাঁর স্ত্রীকে ব্রাহ্মণ ধরে নিয়েই সকলে পদধূলি চেয়েছে, কৃপা প্রার্থনা করেছে। যা মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে কাবেরীর মধ্যে। ব্রাহ্মণ না হয়েও ব্রাহ্মণের মর্যাদা লাভ করে সে পাপবোধে ভোগে। আবার পরে চিঠিতে জানা যায় কাবেরীর পরিবার কায়স্থও নয় সদগোপ। যা তাঁকে আরো দ্বন্দ্বে নিয়ে যায়। কাবেরী এই মিথ্যাচারিতার সঙ্গে আপোস করতে চায় না। নচিকেতা আবার গ্রামীণ মানুষের চিরকালীন বিশ্বাসে আঘাত দিতেও চায় না। যে কাবেরী শ্বশুরঘরে কায়স্থ বলে প্রাপ্য সম্মান পায়নি, এমনকি হেয় হয়েছে সেই কাবেরীই পৃথক অঞ্চলে ব্রাহ্মণের মর্যাদা পেয়েও দ্বিধারত। একদিকে পাপবোধ অন্যদিকে ঘৃণাবোধ নিয়ে লেখক জীবনের গভীরতলে নেমে যান। মানুষকে মুক্ত করতে, মানুষকে শুদ্ধ করতে, মানুষকে সেবা দিতে, মানুষকে আনন্দে রাখতে, মৃত্যুমুখী মানুষকে আরো একটু আনন্দ দিতে মিথ্যার সঙ্গে আপস কোনো পাপের জন্ম দেয় না। নচিকেতা তো নানাভাবে ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রকেই ভেঙে ফেলতে চায়। আবার ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রকে শ্রদ্ধা করে একটা জনপদ যদি আনন্দ পায়, পবিত্র হয়, জীবনের সুখ শান্তির অন্বেষণ করে সেখানে আঘাত দেবার প্রয়োজন নেই। অভিজিৎ সেন পাঠককে এক দার্শনিক সত্যে উপনীত করেন। দেশকালের গভীর ক্ষতকে স্পর্শ করেও জীবনের পবিত্রতার সুর চিহ্নিত করেন। সেখানে গোষ্ঠী-শ্রেণি-রাজনীতির শোষণ আছে, তবুও আবহমানকালের মানুষ একটা সুরে বাঁচছে, বেঁচে এসেছে। অভিজিৎ সেন সেই সুরেই আরো একটু মায়া ছড়িয়ে দেন।
“কম্যুনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে থাকার ফলে শ্রেণীসংগ্রামের দায়ও নিজের ভিতরে উপলব্ধি করেছি এবং জাগরুক রাখার চেষ্টা করেছি। এই আদর্শে আমার ‘দেবাংশী’র গল্পগুলো এবং সেই প্রথমদিকের অধিকাংশ গল্প লেখা হয়েছিল। শ্রেণী এবং সমাজের প্রতি একটা দায়বদ্ধতা চিন্তায় প্রধান স্থান অধিকার করেছিল। ফলে যাই লিখি না কেন, তার ভিতরে শ্রেণীসংগ্রামের ঠিক, ভুল আরোপিত এবং ইচ্ছাপূরণের ব্যাপারটাই প্রধান হয়ে উঠত। সাতের দশকের টালমাটাল রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় এবং অব্যবহিত পরে এই প্রভাব অস্বাভাবিক তো নয়ই, বরং শ্রেণীসংগ্রাম যদি সেসময়ের লেখায় না আসত সেটাই হত ইতিহাসের দিক থেকে একধরনের পিছুটান।”—অভিজিৎ সেন/ ‘গল্প বিষয়ে ভাবনা চিন্তা’/ ‘উত্তরাধিকার’/ ডিসেম্বর ১৯৯৬।
অভিজিৎ সেন জীবনের দ্বান্দ্বিক বাস্তবতাকে বারবার প্রাধান্য দিয়েছেন। প্রাইমেটিভ সোসাইটির মধ্যে যে ভাববাদ, কর্মবাদ, জন্মান্তরবাদ, ব্রাহ্মণ্যবাদ, ধর্মীয় বিশ্বাস-সংস্কার, কমিউনিস্ট চেতনা দ্বন্দ্বের জন্ম দেয় তাই তাঁর কেন্দ্রবিন্দু। উত্তর উপনিবেশ বলয়ের মধ্যেও আমাদের গ্রামদেশ ডুবে আছে অন্ধবিশ্বাসে, সংস্কারে, বিশ্বাসে, ধর্মান্ধতায়। অভিজিৎ সেন তা আঘাত করে ভেঙে ফেলতে চান না। আঘাত করলেও আবার সেই সমূহ সত্যের কাছেই ফিরে আসেন। একটা জনগোষ্ঠী বছরের পর বছর ধরে সেই জীবনচেতনায় বিশ্বাস রেখেছে। এমনকি বিশ্বাস রেখে জীবনের আলো-বাতাস, চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারাকে উপভোগ করতে চাইছে। বামফ্রন্ট সরকারের পত্তনের পর গ্রামবাংলায় কমিউনিস্ট রাজনীতি বহুক্ষেত্রে সেইসব ধর্মমোহকে ভেঙে ফেলতে বদ্ধপরিকর হলেও কোথাও যেন আটকে যাচ্ছে—এই দ্বন্দ্বই বহুগল্পের মূলসূত্র। সেখানে কথকতার ধরনের একটা আভাস থাকলেও কথকতা নেই। তা বৈশ্বিক গল্পেরই ইস্তেহার কিন্তু সংলাপে আঞ্চলিকতার ঘ্রাণ পুরোমাত্রায় ভরপুর। ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে মূল্যবোধের পাঠ আছে। অভিজিৎ সেনের বয়ানে মনসামঙ্গলের স্কেচ নানাপন্থায়, নানামাত্রায় ফিরে এসেছে। ‘বিদ্যাধরী ও বিবাগী লখিন্দর’ উপন্যাস থেকে ‘বালা লখিন্দর’, ‘লখিন্দর ফিরে আসবে’, ‘দেবাংশী’ গল্পের কথা মনে আসে। অভিজিৎ সেন সমাজের ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া মিথ-জীবনবিশ্বাস-জীবনধর্মকে বহুমাত্রিক বিশ্লেষণে উপস্থাপন করেন। জীবনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে যে ধর্মবিশ্বাস, লোকায়ত জীবনচেতনা তার নির্মোহ বাস্তবকে যেমন স্পষ্ট করেন তেমনি অভ্রান্ত বিশ্বাসকে ভেঙে ফেলেন না। তবে আমাদের জীবনধর্মই কি পিছিয়ে যাচ্ছে? আধুনিকতার জয়যাত্রার সমূহ পথ নির্মাণ করেও অভিজিৎ সেন থমকে যান। সম্পূরক বাস্তবতায় তা নির্মিত হচ্ছে না। সেই কৃত্রিমতায় অভিজিৎ সেনের বিশ্বাস নেই। আর্টের থেকেও অভিজিৎ সেন বেশি জোর দেন মানুষের জীবনধর্মে, জীবনবিশ্বাসে। গল্পকে পাঠক প্রিয়তা করে তোলার জন্য বা গল্পের তাৎপর্যপূর্ণ বাঁক আবিষ্কারের জন্য গল্পের মোড় ঘোরানোয় তিনি বাজিমাত করতে চান না। বরং একটা সুপরিকল্পিত জীবনচেতনার পাঠ নির্মাণ করেও, চরিত্র নিজস্ব জীবনচেতনা, জীবনধর্মে বিশ্বাস রেখেও মানুষের প্রয়োজনে ধ্রুববিশ্বাসকে ভেঙে ফেলেন। ‘লখিন্দর ফিরে আসবে’ (শারদ তিস্তাতোর্ষা, ১৯৯৬) গল্পে গল্পকথক বিজ্ঞানচেতনায় বিশ্বাসী হয়েও, পিতা ডাক্তার ও কমিউনিস্ট রাজনীতিতে বিশ্বাসী হয়েও, তন্ত্রমন্ত্র-সংস্কার থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়েও মানুষের ভিত্তিহীন বিশ্বাসকে প্রাধান্য দেন—
“আমার বাবাকে তো বারদুয়েক তুমি দেখেছ। পুরানো আমলের এল.এম.এফ ডাক্তার। চিকিৎসক হিসাবে খ্যাতি ছিল। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা, আজীবন মার্কসবাদী, কোনও ধরনের ধর্মীয় বুজরুকি, ভেলকি, গুরু পূজাপার্বণের ধার ধারেননি। আমার জন্মের আগেই আমাদের বাড়ি থেকে লক্ষ্মীর পাঠ উঠে গেছে। যখনকার কথা বলছি, তখন তাঁর শেষ বয়স। প্রত্যক্ষ ডাক্তারি কিংবা রাজনীতি দুই থেকেই সরে এসেছেন।
আমি বাবাকে বললাম, বলেন কী আপনি? পা-ধোয়া জল খেতে দেব?
বাবা খুব সংক্ষেপে বললেন তা দিলেন না হয়, কী যায় আসে তাতে?” (সেরা পঞ্চাশটি গল্প, দে’জ পাবলিশিং, প্রথম প্রকাশ, এপ্রিল ২০১৪, পৃ. ২৭৩)
ব্রাহ্মণ তার ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রকে বিসর্জন দিলেও সমাজ তার ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক ধারণাকে বিসর্জন দিতে পারেনি। এমনকি সমাজের পিঠে ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক মানসিকতা এমনভাবে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে ব্রাহ্মণ মানুষও তা দূর করতে পরাস্ত হচ্ছে। অভিজিৎ সেন একদিকে ব্রাহ্মণ্যবাদের উদারতান্ত্রিকতা অন্যদিকে অবক্ষয়িত সমাজের রক্ষণশীলতার দ্বন্দ্বকে প্রাধান্য দিয়েছেন। উপনিবেশ অতিক্রম করে যে নব্য উপনিবেশবাদ গড়ে উঠল, যার বৃহত্তর সাংস্কৃতিক জীবনচেতনায় তন্ত্র-মন্ত্র-সংস্কার-বিশ্বাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যা কোনোভাবেই উৎপাটন করা যাচ্ছে না তার গভীর গভীরতর সংকট ও আশাবাদ গল্পকে ভারতীয় চেতনায় উত্তীর্ণ করে। আমাদের দেশ তন্ত্র-মন্ত্র-সংস্কার-বিজ্ঞান-ধর্ম-যুক্তিবাদ-মার্কসীয়চেতনা-বিবিধ দার্শনিক মতবাদে পরিপূর্ণ। সেখানে ছোটোখাটো মতভেদ, গণ্ডগোল হলেও একটা বহমান জীবনস্রোত আছে। সেই বহমান জীবনস্রোতই অভিজিৎ সেনের গল্প।
‘লখিন্দর ফিরে আসবে’ গল্পে গল্পকথকের কৈশোরের বন্ধু কমল সাধু একদা তান্ত্রিক হয়ে ওঠে। এমনকি তন্ত্র-মন্ত্র-ঝাড়ফুঁক-শিকড়বাঁকর দ্বারা ভাতকাপড়ের অন্নসংস্থান করে। গল্পকথক এপর্যন্তও বন্ধুত্ব টিকিয়ে রেখেছিলেন। একদা নদী দিয়ে পচা লাশ ভেসে যায়। সেই লাশকে নাকি সে বাঁচিয়ে তুলতে পারবে এমনই দাবি করে। এমনকি নদীতে সেই পচা লাশকে কেন্দ্র করে এক বৃত্তায়ন গড়ে তোলে যা মনসামঙ্গলের সমানুপাতিক। মানুষ বিশ্বাসও করে। এরপর গল্পকথক কমল সাধুর সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখেনি। হুট করে একদিন গল্পকথকের বাড়িতে একজন উপস্থিত হয়ে পায়ের জল ভিক্ষা চান। এই পায়ের জল খেলে নাকি অসুস্থ শিশু আরোগ্য পাবে। গল্পকথক প্রথমে রাজি না হলেও পরে পিতার নির্দেশে দিয়েছেন। যদিও পিতা ছিলেন একদা ডাক্তার, কমিউনিস্ট মতাদর্শে বিশ্বাসী। মানুষের প্রার্থনার কাছে পিতা মতাদর্শ, বিজ্ঞানচেতনাকে বিসর্জন দিয়েছেন। গল্প শেষে জানা যায় কমল সাধুই এই ব্যক্তিকে গল্পকথকের কাছে পাঠিয়েছেন। এও কি প্রতিশোধ স্পৃহা না সংস্কারকেই মুখ্য করে তোলার বাসনা? আর সেই সংস্কারের কাছেই কি উদারনৈতিক মতবাদ, কমিউনিস্টচেতনায় বিশ্বাসী, ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রে অবিশ্বাসী মানুষের পরাজয়? কে জয়ী আর কে পরাজিত? প্রাইমেটিভ সোসাইটির কাছে কি বিজ্ঞানচেতনা পরাজিত হচ্ছে না মানুষকে জয়ী করার তাগিদেই লেখকের এই চেতনা? অভিজিৎ সেন দেশজাতি মানুষ গোষ্ঠীকে ভালোবাসার বয়ান গড়ে তুলেছেন। আর সেই বয়ান কোন গহনতল দিয়ে কোন ইশারায় কোন ক্ষণে ডুবে যায় কোন ক্ষণে ভেসে ওঠে তা গভীরতর পাঠ ছাড়া বোঝা অসম্ভব।
‘দেবাংশী’, ‘ব্রাহ্মণ্য’ গল্পেই প্রমাণ হয়ে গিয়েছিল অভিজিৎ সেন এক জাত গল্পকার। গল্পসরণির যে মানচিত্র ও মনচিত্র তিনি আট-নয়ের দশকে গড়ে তুলেছিলেন তা থেকে আর পিছু হাঁটতে হয়নি। এমনকি সচেতন পাঠকের মননে বদ্ধমূল ধারণা গড়ে উঠেছিল অভিজিৎ সেন কোন আখ্যান লিখতে পারেন। বাংলা গল্পের পালাবদলে ‘ব্রাহ্মণ্য’, ‘দেবাংশী’ যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অভিজিৎ সেন ব্যক্তি মানুষের সংকট থেকে গোষ্ঠীর হালচালকে যেমন গুরুত্ব দিয়েছেন তেমনি গোষ্ঠী কীভাবে ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল এবং ব্যক্তি কীভাবে গোষ্ঠীর ভিতর হারিয়ে যাচ্ছে তার দ্বান্দ্বিক ধারাপাত যে বয়ানে নির্মাণ করেন তা প্রশংসার দাবি রাখে। আধার থেকে আধেয়, দেববাদ থেকে বাস্তববাদ, জমি-মানুষের সংকট, দৈববিশ্বাস যে ক্রিয়ায় সংযুক্ত থাকে তা উপনিবেশ উত্তর গ্রাম্যদেশের সংবাদ যে চোরাটানে বুনন করে তার নান্দনিক মূল্য বড় গভীর।
“সাধারণত এমন অভিজ্ঞতা হয় না। হয় বিষয় বিহ্বলতায় রুদ্ধশ্বাস হয়ে পড়ি। আর নয় টেকনিকের টক্কর বাজিতে দিশাহারা। সেই অনাত্মীয় জগতে ঘুরতে ঘুরতে যখন অভিজিৎ সেনের মতো গদ্যকাহিনীকারের জগতে ঢুকে পড়ি তখন মনে হয় নির্বাসন ঘুচল—পুনর্বাসিত হলাম। অভিজিৎ সেনের পঞ্চাশটি গল্পের সংকলনটি পড়তে পড়তে আমার প্রাথমিক পাঠ-প্রতিক্রিয়াটি এইরকম। অভিজ্ঞতা গল্প নয়, বৌদ্ধিক মারপ্যাঁচও গল্প নয়। বাস্তবতার সঙ্গে পাঞ্জা ধরতে গিয়ে লেখক যখন একই সঙ্গে প্রতিহত ও অভিনিবিষ্ট, আশ্লিষ্ট এবং প্রত্যাখ্যাত তখনই বাস্তবতার পুনরোন্মোচন ঘটে, পুনঃপুনরোন্মোচন ঘটে।”—সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়/ ‘গল্পের আঙ্গিকে জীবনবোধের সারাৎসার।’
প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘দেবী’ গল্পের পরিণতি ঘটেছিল দেবীর আত্মহত্যায়। দৈবী মহিমা থেকে আত্মরক্ষা পেতেই সে আত্মহত্যা করেছিল। অভিজিৎ সেনের ‘দেবাংশী’ (বর্তিকা, ১৯৮১) গল্পে দেবাংশী সারবান লোহার আত্মহত্যা না করলেও সংকট আরো প্রবল। অভিজিৎ সেন আরো বড় পরিসরে ভেবেছেন। সময়ের সমস্যাকে গল্পের অভ্যন্তরে নিপুণভাবে বুনে দিয়েছেন। প্রভাতকুমারের গল্প পরিবারকেন্দ্রিক হলেও অভিজিৎ সেন গোষ্ঠীকেন্দ্রিক। গোষ্ঠীর বৃহত্তর সমস্যাকে অভিজিৎ সেন মিথের তরঙ্গে ভাসিয়েছেন। গত শতকের সাত-আট-নয়ের দশকের বাংলা গল্পে জমি-মানুষ-ভাগচাষি-বর্গাদার-জমিদার/মহাজনের শোষণের ইতিবৃত্ত নানামাত্রায় চলেছে। মনে পড়ে প্রফুল্ল রায়, মহাশ্বেতা দেবী, সাধন চট্টোপাধ্যায়, ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়, অমর মিত্র, সোহারাব হোসেন, আনসারউদ্দিনের কথা। মহাশ্বেতা দেবী যেখানে জমিদার-কৃষকের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক নির্মাণে, অমর মিত্র যেখানে জমির পরিধি-ব্যাস-ব্যাসার্ধের সঙ্গে কর্মময় শ্রমজীবি মানুষের রুটি রোজগারের সম্পর্ক নির্মাণে জোর দেন সেখানে অভিজিৎ সেন মহাজন-ভাগচাষিকে নির্মাণ করেন মিথের তরঙ্গে। প্রকৃতপক্ষে সমাজ বাস্তবতার সঙ্গে মিশে থাকা সংস্কার-বিশ্বাস-লোকায়ত উৎসব-পালাপার্বণকে কেন্দ্রে রেখে তিনি জীবনের গতিবিধিকে পরিমাপ করে নেন। গত শতকের ছয়-সাত-আটের দশকে লিখতে আসা প্রফুল্ল রায়, মহাশ্বেতা দেবী, সাধন চট্টোপাধ্যায়, ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়, অমর মিত্র, নলিনী বেরা, সৈকত রক্ষিতের গল্পে লোকায়াত উৎসব-বিশ্বাস-সংস্কার এলেও সেখানে দ্বন্দ্বময় আভরণ তেমন নেই। একটা জীবনচিত্র, কখনো নিম্নবর্গের মানুষের প্রতি ঝোঁক, কখনো লোকায়ত উৎসবকে কেন্দ্র করে বেঁচেবর্তে থাকা মানুষ নির্মাণে বাজিমাত। অভিজিৎ সেন বেশি বেশি করে গুরুত্ব দেন মিথ সংলগ্ন বাস্তবতা। অথবা দৈব আভরণকে কেন্দ্র করে বেঁচে থাকা মানুষের জীবনচিন্তায়। এমনকি তা অনিবার্য হয়ে ওঠে গ্রহণ-প্রত্যাখ্যানের দ্বন্দ্বে, সংকট-সম্ভাবনার সমূহ প্রশ্নে।
‘দেবাংশী’ (‘দেবাংশী’ গ্রন্থে প্রথম প্রকাশে তা উপন্যাস বলে চিহ্নিত হলেও পরবর্তী গল্পসংকলনে তা গল্প বলেই চিহ্নিত হয়েছে) গল্পের সারাবান লোহার দেবাংশী হয়ে কিছু রোজগার করেছিল, দিন ভালোই চলছিল। কিন্তু একদা দেবত্ব থেকে মুক্তি পেতে চায়। কেননা তাকে কেন্দ্র করে যে দেবত্বের আবরণ গড়ে উঠেছে, যা মানুষের ভালোমন্দের দুইয়েরই অংশীদার তা থেকে নিজেকে বিচ্যুত করে শান্তিতে থাকতে চায়। একদা যে দেবত্বের বেশ ধারণ করে কিছুটা আনন্দ পেয়েছিল, কিছুটা অর্জন করেছিল আজ সেই দেবত্বের খোলসই তাঁর মনস্তাত্ত্বিক সংকটের কারণ হয়ে উঠেছে। গল্পের দীর্ঘ পটভূমিতে আছে জমিদার-কৃষকের বৃত্তান্ত, জমিদারের জমি হস্তান্তর, কৃষকের সর্বস্বহারা বৃত্তায়ন এবং তা থেকে মুক্তি পেতে দেবত্বে নির্ভরশীলতা। এমনকি সারবান লোহার নিজেও জানে সে দেবাংশী নয় কিন্তু তাকে কেন্দ্র করে যে গোষ্ঠীর আবরণ গড়ে উঠেছিল তা থেকে সে কোনোভাবেই মুক্তি পাচ্ছে না। সেতু বর্মনের সঙ্গে জমিদার দৈত্যারি মণ্ডলের যখন জমি নিয়ে বিবাদ চলছে তখন সেতু জমি রক্ষা করতে দেবাংশীর কাছে গিয়েছিল। এমনকি দেবাংশী সারবান লোহারের পিতার জমি গ্রাস করেছিল দৈত্যারি পিতা রঘুনাথ মণ্ডল। একদিকে সেতু বর্মনের দৈববিশ্বাস, সারবান লোহারের দেবত্বের আবরণ, অন্যদিকে জমিদার দৈত্যারি মণ্ডলের আধিপত্য এবং দেবত্বে অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে জমি-মানুষ, শ্রেণি-শ্রেণিহীনের যে সম্পর্ক ও সংকট নির্মিত হয় এবং তা মনসামঙ্গলের সঙ্গে যে অধিদৈবিক ক্ষমতাতত্ত্বের বিন্যাসে গড়ে ওঠে তা বাংলা গল্পের সম্পূর্ণ নতুন পরিসর। দেখে নেওয়া যাক গল্পের বয়ান—
“বিষহরির ভর হলে, বিষহরি নিজে কথা কয় মালিক। মঁয় তো নিমেত্ত।’
‘বেশ, কিন্তু বিষহরি যদি খালি জোতদারের বিপক্ষে কথা হয়, তো সিটাতে বড়ো একতরফা বিচার হয়, দেবোংশী।’
‘এর জবাব মঁয় কি দিমো, মালিক?’
‘জবাব তো তুমাকই দিবার হোবে। আদালতের আর্জি যদি বিষহরির দরবারেৎ লিষ্পত্তি হয়, তবি বিবাদীর জবাবও শুনবা হোবে। লয়তো সদাগর চান্দোর মতো মঁয়ও তো বিষহরিক্ ‘ব্যা-খাকী কানী’ কমো!’
সারবান শিউরে উঠেছিল। দু’হাত কপালে ঠেকিয়েছিল সে। এ মানুষটা কার সাথে বিবাদ করতে চায়? তাও কি সম্ভব?’
সে বলে, মালিক, আর্জি জানবার হক্দার তো বেবাক মানুষ। মাওয়ের কাছেৎ আর্জি জানাবেন, মাওয়ের আদেশ নিজকানে শুইনে পেত্যয় মানবেন।” (দেবাংশী, শ্রেষ্ঠ গল্প, দে’জ পাবলিশিং, প্রথম প্রকাশ, ডিসেম্বর ২০০৫, পৃ. ৩৬)
জমিদারের এই বিবাদের পর কাকতালীয়ভাবে দৈত্যারি সর্পদংশনে মৃত্যু হয়। সকলেই ভেবে নেয় দেবাংশী সারবান লোহারেরই তা দৈবীমহিমা। গ্রামের সকলেই দেবাংশীর প্রতি বিশ্বাস রাখে। ভক্তি আরো বৃদ্ধি পায়। গরিব মানুষ জীবনের একমাত্র সহায়, আশ্রয়দাতা, পরিত্রাণকর্তা হিসেবে দেবাংশীকে ভাবে। বিত্তবান কুকর্মের অংশ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। মনস্তাত্ত্বিক সংকটে ভোগে দেবাংশী সারবান লোহার। সে নিজেই তাঁর পিতার জমি জমিদারের কাছ থেকে উদ্ধার করতে পারেনি। অথচ গ্রামের মানুষ তাঁর দেবত্বে আস্থাশীল। গল্পটি জমিদারের তিন প্রজন্মের। রঘুনাথ-দৈত্যারি-বিনোদ। সময় বিবর্তনে অপশাসনের ভোল বদল হয়েছে। গ্রামের মানুষ সেই তিমিরেই থেকে গেছে। একদা দেবাংশী হয়ে সারবান লোহার যে আনন্দ পেয়েছিল আজ নিজেই দেবত্বের খোলস ত্যাগ করতে চাইছে। আধার থেকে আধেয় বড় হলে তা বুঝি যন্ত্রণাকাতর হয়—
“মানুষকে সে জানিয়ে দেবে যে সে দেবাংশী নয়। দেবতা তার দেহ আর অধিকার করে নেই। কোনোদিন ছিল কিনা, তাও সে জানে না। কোনো শক্তি তার নেই, আধার ছেড়ে চলে গেছে অলৌকিক। এখন সে মানুষ, আগেও ছিল মানুষ, একজন সাধারণ মানুষ সারবান লোহার। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়ও তার মনে হয়েছিল যে শরীরের আক্ষেপকে ঢাকবে কী দিয়ে। দেবতা যদি সত্যিই তার দেহকে আশ্রয় করতে চায়, তবে সে আটকাবে কী করে? এ দ্বন্দ্বের সুরাহাও সে করতে পারেনি তখন।” (তদেব, পৃ. ৪৫)
বিনোদের কাছে সেতু বর্মনের মেয়ে বারুণী ধর্ষিত হয়ে যখন দেবাংশীর কাছে বিচার চাইতে গিয়েছে তখন সে মানুষের কাছেই বিচারের দায়িত্বভার তুলে দিয়েছে। দেবত্বের খোলস থেকে নরদেবতার শিরোধার্যের মধ্যে গল্পের উপসংহার ঘটেছে। দেবতার তুলনায় গ্রামীণ মানুষের গোষ্ঠীচেতনা, সম্মিলিত প্রয়াসই মানুষকে বাঁচাতে পারে তা লেখক মুখ্য করে তোলেন। তবে সমাজের গায়ে যে দৈব বিশ্বাস আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে তাও তিনি কেন্দ্রে রাখেন। অভিজিৎ সেন বহুমুখী চিহ্নায়নের কথাকার। জীবনের অনিবার্য সূত্রকে কেন্দ্রমুখী করেও বৃত্তের ব্যাস কোন কোন গোলার্ধে কতখানি এবং কীভাবে ছড়িয়ে আছে তার নান্দনিক উদ্ভাসন গল্পকে শিল্পের উচ্চস্তম্ভে পর্যবসিত করে। চিনিয়ে দেয় বাঙালি সমাজের বুকে জমে থাকা বহুস্তরের কথা। এমনকি স্তরান্তরের মধ্য দিয়ে বাঙালির কথাসেতুর পরম্পরা কতভাবে নির্মিত হওয়া সম্ভব।
দুই.
অভিজিৎ সেন মানুষের মূল্যবোধ, জীবনচেতনা, জীবনবিশ্বাসকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তা সঠিক-ভুলের মধ্য দিয়ে একটা দান্দ্বিক ধারাপাত গড়ে তুলেছেন। এক সত্তা মানবিক, উদার, নৈতিক হলেও অন্য সত্তা কোথাও নড়বড়ে। এই যে চিন্তার সংকট যা গ্রামীণ জীবনে অতিমাত্রায় প্রবল, সেখানে চরিত্রের একটা দাম্ভিকতা, কোথাও অনিয়ন্ত্রিত ভাবাবেগ, জীবনের এককেন্দ্রিকতাকেই মুখ্য করে তোলার মধ্য চরিত্রের সীমাবদ্ধতা যে মাত্রায় বিরাজ করে তা গভীর সমাজবাস্তবতার খোঁজ দেয়। অভিজিৎ সেন মানুষের শুভচেতনা, কল্যাণবোধ, আলোর উৎস সন্ধানে আস্থা রাখেন। গল্পের প্রকরণ দেশজ ঘরানার। আবার সেই বৃত্তান্ত চিরঞ্জয় চক্রবর্তী, সোহারাব হোসেন থেকে পৃথক। চিরঞ্জয় চক্রবর্তী যে মূল্যবোধ, শুভচেতনার পাঠ গড়ে তোলেন তা মূলত মধ্যবিত্তজীবনকেন্দ্রিক। সোহারাব হোসেন গল্পকে বারবার শিল্পের উত্তরণে নিয়ে যেতে চান। অভিজিৎ সেন বাস্তব-নির্মোহ বাস্তব-সংস্কৃতির বাস্তবের মধ্য দিয়ে প্রান্তদেশীয় সংবাদ, কোলাহলের মধ্যে অন্তজ সংস্কৃতির জীবনবোধ শিল্পিত বিন্যাস এঁকে দেন। নবারুণ ভট্টাচার্য, রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায় যেখানে প্রলেতারিয়েত নিয়ে অনবরত খিস্তি খেউড়ে, সংঘর্ষে, ব্যবহারে মত্ত থাকেন সেখানে অভিজিৎ সেনে আঞ্চলিক সংলাপে খিস্তি থাকলেও জীবনভাষ্যে তা পৃথক। রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়, নবারুণ ভট্টাচার্যের প্রান্তজন শহরতলির, অভিজিৎ সেন নেমে গেছেন পাড়াগাঁর উপনিবেশে। জমি-ভাগচাষি-বর্গাপ্রথা-থান-মন্দির-দেববাদ-লোকায়ত উৎসব-দেশীয় মদ-জমির শ্রেণিচরিত্র-ফসল-হাট-মজুর নিয়ে দেশের পেটের ভিতর আরেক দেশের সন্ধানে।
“বাজিকরদের দীর্ঘ পদযাত্রায়, ধামান সাঁইয়ের ডাকে, দেবাংশীর আহ্বানে, কুশলীর নবজাতক সন্তানের প্রবল চিৎকারে, করাতের কাছে মহাবৃক্ষের নত দেখি অস্বীকৃতি জ্ঞাপনে অভিজিৎ সেন হাজার বছরের বন্দি মানুষের স্বাধীনতার স্পৃহাকে ঘোষণা করেন। মানুষের সঙ্ঘবদ্ধ চেতনায় এই স্পৃহা সুপ্ত হয়েছে, এই মানুষের ভাষায় এর খোঁজ পাওয়া যায়, তার গানে, তার শ্লোকে, তার প্রবাদে এরই প্রকাশ। তার সংস্কার ও সংস্কার ভাঙা, তার বিশ্বাসে ও বিশ্বাস ঝেড়ে ফেলা—এসবের ভেতর যে-দ্বন্দ্ব তার মূলে মানুষের মুক্তির কামনা। অতীত থেকে বর্তমান, বর্তমান থেকে, ভাষা থেকে, গান থেকে, শ্লোক থেকে ও পুরাণ থেকে, বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব থেকে মানুষ অবিরাম শক্তিসঞ্চয় করে চলেছে। এই শক্তি-অনুসন্ধানের কাজে নিয়োজিত শিল্পী অভিজিৎ সেন।”—আখতারুজ্জামান ইলিয়াস/ ‘অভিজিৎ সেনের হাড়তরঙ্গ’/ ‘সংস্কৃতির ভাঙা সেতু’।
বাংলা ভাষায় ‘ব্রাহ্মণ্য’, ‘দেবাংশী’, ‘ক্ষেত্রপাল’ এর মতো গল্প লেখা হয়েছিল একথা যেন আমরা কখনো বিস্মৃত না হই। বাংলা গল্পের আধুনিকতার জয়পাতাকা উড়ান অভিযানে আরো বেশি বেশি করে প্রয়োজন অভিজিৎ সেন চর্চার। অন্তর্বাস্তব-বহির্বাস্তব, শ্রেণিচরিত্র, প্রান্তদেশের নিপুণ সংবাদ, সংবাদের তলদেশ দিয়ে মিথ-পুরাণ-ধর্মসংস্কৃতিকে বইয়ে দেওয়া, মানুষের ধর্মবিশ্বাসের আড়াল দিয়ে মূল্যবোধের পাঠ বজায় রাখা এবং বৃহত্তর জীবনের খোঁজে চরিত্রের যথার্থ বিকাশ—বাংলা গল্পের এক মাইলফলক। ‘ক্ষেত্রপাল’ (মহানগর, ১৯৮৫) গল্পের যে জীবনচেতনা তা শুধু চরিত্রের দ্বন্দ্বময় আবরণ নয়, একটা গোটা সমাজের যৌথপাঠের নান্দনিক ভাষ্য। কৃষিকে কেন্দ্র নানা গল্পের ফরমান আমরা সাত-আট-নয়ের দশকে প্রফুল্ল রায়, মহাশ্বেতা দেবী, অমর মিত্র, রামকুমার মুখোপাধ্যায়, আবুল বাশার, আফসার আমেদ, সোহারাব হোসেন, আনসারউদ্দিনে পেয়েছি। কোথাও কৃষক-জমিদারের বিরোধ, কোথাও মূল্যবোধের সংকট, কোথাও ধর্মের উদারতান্ত্রিকতা, কোথাও সম্প্রীতির সত্য, কোথাও দানপত্রের আইনি ভাষা, কোথাও জমির চরিত্রকে কেন্দ্র করে জীবনের ফরমান জানান দেবার অভিপ্রায় সেদিনের গল্পে ছিল নতুন পরিসর। আবার জল সংকটের কথা নানাভাবে পেয়েছি সৈকত রক্ষিতের বয়ানে। গত শতকের সবুজ বিপ্লব পরবর্তীকালে যে কৃষিতে জোয়ার এসেছিল, গ্রাম বাংলার অর্থনীতিতে একটা বিপুল পরিবর্তনের ইঙ্গিত গড়ে উঠেছিল, বামফ্রন্ট সরকারের ভূমিবণ্টন, বর্গপ্রথায় দরিদ্র মানুষের যে মুখে হাসি ফুটেছিল সেই পটভূমি সেদিনের বাংলা গল্পের পরিসর বদলে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। মহাশ্বেতা দেবী, অমর মিত্র, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, আবুল বাশার, আফসার আমেদ, রামকুমার মুখোপাধ্যায় প্রত্যেকেই নিজের নিজের অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে, নিজের নিজের জীবনবোধকে কেন্দ্র করে নতুনত্বের সুর শুনিয়েছিলেন। অভিজিৎ সেন কর্মসূত্রে উত্তরবঙ্গের বিশেষ করে দুই দিনাজপুর, মালদা সংলগ্ন অঞ্চলকে পটভূমিতে রেখে ধর্মীয় সংস্কৃতি, মিথের হাতছানি ও লোকায়ত সংস্কৃতির পরম্পরাকে ধরে গল্পের জাদু বুনে গেছেন। আলোচ্য গল্পের ক্ষেত্রপাল অত্যন্ত মূল্যবোধ সম্পন্ন মানবিক চাষি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাকে তুলসী লাহিড়ীর ‘ছেঁড়াতার’ নাটকের মহিমের উত্তরপুরুষ ভাবা যেতে পারে। প্রভেদও আছে। এখানে দুর্ভিক্ষ বা ভাববাদ নেই। ক্ষেত্রপাল অভিরাম শিক্ষিত নয়। তাঁর জীবনে নারীর কোনো মূল্য নেই। অভিজিৎ সেন গল্পকে ভাসিয়েছেন মাঠতরঙ্গে। মেঠো মানুষের জীবনবোধ ও জীবনচেতনার উৎসারিত অভিযানে। তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য জমিতে ভালো ফসল ফলানো। জীবনের ধ্যান জ্ঞান কর্মকাণ্ড সবই জমিকেন্দ্রিক। সে জানে জমিতে ফসল হলেই বৃহত্তর মানুষকে বাঁচানো সম্ভব। শুধু মানুষ নয়, নিসর্গের সমস্ত পশু-পাখি-প্রাণীকেও বাঁচানো সম্ভব। ফসল অন্তঃপ্রাণ অভিরামের জীবনচেতনা এমন—
“অভিরাম শুধু জানে জমি। তার রক্তের উচ্চাশা, আনন্দ আভিজাত্য, উত্তেজনা শুধু জমিকে কেন্দ্র করে। জমির জন্যই সঞ্চিত তার যাবতীয় অনুরাগ, ভালবাসা, ক্ষমতা। কেননা, জমি হল স্থিতি, জমিই স্থায়িত্ব আবার জমিই জীবনের অর্থ। আমার অস্তিত্বের অর্থ কী? আমার অস্তিত্বের অর্থ জমিকে ক্রমাগত ফলবতী করা। জমিকে তোয়াজ কর, জমিকে রক্ত দেও, বীর্য দেও, জমি তোমাকে সহস্রগুণ করে ফেরৎ দেবে। এই যে গতবছর মারিকার পাথারে সে সাতাশ-আটাশ মন ধান মেরেছে, আর কেউ তেমন পেরেছে? সৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ফসল। সফল কি কবেল মানুষের জন্য? মানুষ খাবে, পশু খাবে, পাখ-পাখালি, কীটপতঙ্গ সবার জন্য শস্য ফলায় অভিরাম।” (সেরা ৫০টি গল্প, তদেব, পৃ. ৩১)
অভিজিৎ সেন গল্পকে বৃহৎ পটভূমিতে নিয়ে যান। নায়ককে গোষ্ঠীর অভ্যন্তরে রেখেও গল্পের ডালপালা ছড়িয়ে চলেন। গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ সংবাদ, বিবাদ, দ্বন্দ্ব, সমাজ-অর্থনীতির পরিকাঠামো নির্ণয় করেও তিনি ব্যক্তির মূল্যবোধ, জীবনবিশ্বাস অটল রাখেন। অভিরামের জীবনে স্ত্রীর কোনো মূল্য নেই, স্ত্রীকে বারবার গ্রাম্য খিস্তি করছে অথচ মাঠের প্রতি তাঁর ধ্রুব বিশ্বাস। বোরো চাষকে কীভাবে সফল করা যায়। প্রকৃতির প্রতি অনন্ত বিশ্বাস, আকাশের শূন্যের দিকে স্বপ্ন এঁকে দেওয়া, গ্রাম্য তান্ত্রিক শিলদার বর্মনের কাছে কেবলই জীবনের উদ্দেশ্য জেনে নেওয়া এবং নানা বাধা বিপত্তির মধ্য দিয়ে কৃষকের শেষ হাসি ফোটানোয় জীবনের যে কথকতা নির্মিত হয় তা বাংলা গল্পের সাফল্যের হাসি। হ্যাঁ অভিজিৎ সেন বাংলা গল্পকে পরিশুদ্ধ করেছেন সময়ের ধ্রুবসত্যকে মেনে নিয়েও। গত শতকের সাত-আটের দশকে যখন ক্রমাগত জমি-মানুষ-ফসল বৃত্তান্ত বাংলা গল্পে উঠে এসেছিল, যা এক ধরনের পাঠক-সমালোচকের কাছে ক্লান্তিকর, সেইমুহূর্তেও ওই পরিসরের মধ্যে থেকেও কীভাবে বাজিমাত করতে হয় তার সিদ্ধহস্ত কারিগর অভিজিৎ সেন। সাহিত্য তো জীবনবোধের পাঠশালা। পাঠককে একটা সত্য সুন্দর জীবনচেতনার উদ্ভাসনে দীক্ষিত করা। সময়ের আক্রোশকে ধরেও, সময়ের অন্ধকারকে ডিঙিয়ে জীবনের শুদ্ধতার স্বর পরিমাপ করা। আজ কৃষক অভিরামের মুখে আনন্দের হাসি, সাফল্যের হাসি। যে হাসি প্রকৃতপক্ষে এই নিসর্গ চরাচরের হাসি। হ্যাঁ ঈশ্বরের হাসি। কমিউনিস্ট জীবনচেতনায় বিশ্বাসী হয়েও জীবনের ধর্মমোহকে যে পবিত্রতায়, সূক্ষ্মতায় অভিজিৎ নির্মাণ করেন তা বাংলা গল্পের স্বচ্ছতার মায়াদর্পণ। দেখে নেওয়া যাক অভিরামের সেই পরিতৃপ্তির বয়ান—
“একটা বড় আকারের ঘাসফড়িং লাফ দিয়ে এসে তার বুকের উপর বসে। অভিরাম আলগোছে হাত দিয়ে ধরে তাকে। নিমপাতার থেকেও প্রাণবন্ত শিরা বহুল পাখনা দুখানা সে তার লম্বা ঠাং দিয়ে ঘষে আনন্দ ধ্বনি তোলে। সবুজ মরকতমণির মতো চোখ দুটি দিয়ে যেন বলে, মালিক, আমরা আইসে গেছি। অভিরাম ছেড়ে দেয় পতঙ্গটাকে। সে আবার ঝাঁপ দিয়ে পড়ে পুষ্ট ধানের ছড়ার উপরে। অভিরাম সন্দেহে বলে, খা, খা।
মাথার উপর দিয়ে একঝাঁক টিয়া উল্লাসধ্বনি করে একটা অসম্ভব বাঁক নিয়ে এধার থেকে ওধারে চলে যায়। যেন বলে যায়, ম্যালিক, আমরা আসলাম, আমরা আইসে গেলাম। অভিরাম আকাশে হাত তুলে হাসে আয়, আয়।
সামনের আলের উপর দুটি আলকেউটে অভিরামের পায়ের শব্দে মাথা তুলে চক্র দেখায় মাথায়। তারপর আল ছেড়ে নেমে চলে যায় একপাশ দিয়ে। অভিরাম ক্ষমায় হাস।” (তদেব, পৃ. ৫৬)
গল্পভূমিতে একাধিক চরিত্র, একাধিক দ্বন্দ্ব, একাধিক অভিসম্পাত, একাধিক মনস্তত্ত্ব, একাধিক রূপরেখা রেখেও গল্প ক্ষেত্রপালে শিরোধার্য হয়ে ওঠে। মাঠই এ মাটির আখ্যান গড়ে দেয়। মনে পড়ে সোহারাব হোসেনের উপন্যাসের নাম—‘মাঠ জাদু জানে’। মাঠ যেমন প্রত্যাখ্যান করে তেমনি প্রত্যাবর্তনও ঘটায়। চাই শুধু মূল্যবোধ, শুভচেতনা, জীবনবিশ্বাস, উদারনৈতিক ধর্মবোধ ও কল্যাণচেতনা। আর অভিরামের তা ছিল বলেই সে সাফল্যের হাসি হেসেছে। এইসব গল্প মার্কসীয়চেতনার ফসল নয়। জীবনের স্বচ্ছচেতনার বয়ান। জীবনকে আন্তরিকভাবে দেখার ঔদার্যবোধ, মানুষের প্রতি মমত্ব ও সহানুভূতিপ্রবণ হয়েও নিরপেক্ষ জীবনদৃষ্টি গল্পকে উচ্চ শিল্পমূল্যে বেঁধে দেয়।
গত শতকের সাত-আট-নয়ের দশকের বাংলা গল্পে নিম্নবিত্ত-নিম্নবর্গের অভাবী জীবন সংগ্রাম, মূল্যবোধের অবক্ষয়, জমিকেন্দ্রিক বৃত্তান্ত, অভাবের নিমিত্তে মুসলিম পরিবারে তালাক, পেটভাতা, সন্তানকে রাখালিতে পরিণত করার বয়ান নানাভাবে মহাশ্বেতা দেবী, অভিজিৎ সেন, অমর মিত্র, আবুল বাশার, আফসার আমেদ, সৈকত রক্ষিত, নলিনী বেরার গল্পে পেয়েছি। সেদিনের অভাবের কবলে মানুষের মূল্যবোধের অবক্ষয়, সংবেদনহীনতা, ভালোবাসার পরাজয়, জীবনের অস্থিরতায় বিভ্রান্ত মানস প্রবণতা কীভাবে জীবনকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল সেই বৃত্তায়ন বাংলা গল্পের বাস্তবতান্ত্রিক ধারাকে মজবুত করেছিল। অমর মিত্রের প্রথম পর্বের গল্প ‘মেলার দিকে ঘর’, ‘পার্বতীর বোশেখ মাস’ গল্পে দেখেছি অভাব কীভাবে মূল্যবোধের পতন ঘটিয়ে দিচ্ছে। অভিজিৎ সেনের নানাগল্পে সেই জীবনের সংকট চিহ্নিত হতে দেখি। অভিজিৎ সেন যেহেতু গল্পই শোনাতে চান, গল্পই নির্মাণ করতে চান তাই জীবনবোধের ভাঁজে ভাঁজে বিবেক দংশনের পাঠ গড়েও শুদ্ধচেতনায় ফিরিয়ে আনেন। ‘ছোলেমান ও মেরুনের গল্প’ (শারদীয় অন্যদিন, ১৯৮৮) গল্পে অভাবের তাড়নায় ছোলেমান স্ত্রীকে তালক দিতে চাইলেও, তালাক দেবার জন্য স্ত্রীকে শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে দিতে বেরিয়েও পথ থেকে ফিরে এসেছে। বিলে অভাবী মানুষের মৃত্যু জীবনবোধের গোপন দরজা খুলে দেয়। ‘ছোলেমান ও মেরুনের গল্প’ হয়ে ওঠে যাত্রাপথের গল্প। যেমন ছিল অমর মিত্রের ‘গাঁওবুড়ো’। স্ত্রীকে তালাক দেবার ভাবনার মধ্যে ছোলেমানের মূল্যবোধহীনতার সূত্র পাওয়া গেলেও তাকে দোষারোপ করা যায় না। জীবনের তীব্র অভাব থেকে স্ত্রীকে বাঁচাতে সে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চেয়েছিল। তবে সোলেমান কি পরাজিত পুরুষ? অভাবের তাড়নায়, কেবল নিজে বাঁচতেই স্ত্রীকে ঘরহারা করে দিচ্ছে? নাকি অভাবে জীবনের স্বাভাবিক বোধ, ভালোবাসা, দায়িত্ব লোপ পেয়েছে। সেই দায়িত্ব-কর্তব্য-বোধকে লেখক ফিরিয়ে এনেছেন নিসর্গের উদার আকাশের দীক্ষিত সত্যে। বিলে অভাবী নারীর মৃত্যু সোলেমানের জীবনবেদকে যেমন ছিন্নভিন্ন করে দেয় তেমনি জীবনাভিজ্ঞতায় প্রজ্ঞ করে তোলে। আবার ‘গণ্ডি’ (১৯৮১) গল্পের পতিতাবধূ শেফালি স্বামীর ঋণ শোধের প্রতিজ্ঞার মধ্য দিয়ে নবমূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করে। ব্যাংক ম্যানেজার যখন ধরেই নিয়েছে এই ঋণ শোধ হবার কোনো পরিসর নেই, স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রীর কাছ থেকে কাগজপত্র সই করিয়ে নতুন ম্যানেজারকে বুঝিয়ে বিদায় নেবে। তখন ম্যানেজার নিখিলের ধারণাকে ভেঙে দেয় পতিতা শেফালি। অভিজিৎ সেন বহির্বাস্তবের কাহিনি গড়ে তুলতে তুলতেই অন্তর্বাস্তবে পৌঁছে যান। মানুষের মূল্যবোধ, জীবনবীক্ষার এক স্তরকে ধরে নিয়ে কাহিনি গড়তে গড়তেও নিজেই পিছিয়ে আসেন। গ্রাম্য মানুষের কুটিলতার নানাচিত্র শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দেখিয়েছেন। আবার সেই মানুষই বদলে যায় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদার জীবনবোধ ও আস্তিক্য দর্শনে। অভিজিৎ সেন মানুষের ক্লেদ-রক্ত-ঘাম-বিবমিষা-সংকট-অভাব থেকে একটা রূপচিত্র গড়ে তুলে একটা পরিণতি ভাবলেও চরিত্রের ঐশ্বরিক বিন্যাস, জীবনের ঔদার্যবোধ সেই পরিসর ভেঙে দেয়। জীবনের অনন্ত অভিযানের শিল্পী অভিজিৎ সেন। ঈশ্বরীতলার মানুষকে তিনি মোহমুক্ত করেও জীবনের স্থির বিশ্বাসে অটল রাখেন। কেউ কেউ গল্পকথককেও ভুল প্রমাণ করে দেয়।
তিন.
অভিজিৎ সেন বরেন্দ্রভূমির সমাজ-অর্থনীতি-রাজনীতি-সংস্কৃতি-লোকায়ত পুরাণকে সামনে রেখে প্রথম তিন দশকের আখ্যান বিবর্তিত করেছেন। কমিউনিস্ট রাজনীতির নানা পরম্পরা ও সংকট দেখেছি ‘স্বপ্ন এবং অন্যান্য নীলিমা’, ‘নিম্নগতির গঙ্গা’ উপন্যাসে। গল্পের ক্ষেত্রেও নানাভাবে কমিউনিস্ট-কংগ্রেস দ্বন্দ্ব, জাতির নৃতাত্ত্বিক ভাষ্য, ব্রাহ্মণ্যবাদের সংকট ও সম্প্রসারিত রূপ, বরেন্দ্রভূমির বিল-নদীঘাট নিয়ে দ্বন্দ্ব, রাজমহলের গঙ্গা ধরে মহানন্দা-কালিন্দ্রীর নানা বাঁকে মানুষের জীবন-জীবিকার সংকট, কৃষিবাসী মানুষের আর্থ-সামাজিক পরিসর, হিন্দু-মুসলিমের গোত্রান্তর, মিশ্রজনজাতির সম্প্রীতি ও সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক কৌশলের মধ্যে জীবনের দ্বন্দ্বময় উদ্ভাসনকে গুরুত্ব দেন। এই বরেন্দ্রভূমিতে একদিকে দেশভাগে উদ্বাস্তু আগমন, অন্যদিকে রাজমহল থেকে মৈথিলি ব্রাহ্মণসহ জনজাতির একটা স্রোত নেমে এসেছে। মিশ্র সংস্কৃতির পাশাপাশি পদবির আড়াল দিয়ে জাতিতত্ত্বের গভীর পাঠ যেমন আছে, তেমনি বাঙালির ইতিহাসের এক নিগূঢ় সংকেত আছে। সেই সংকেতকে ধরেই জীবনের পলি দূর করে জাতির ঐতিহাসিক, নৃতাত্ত্বিক পাঠ গড়ে তুলেছেন অভিজিৎ সেন, পীযূষ ভট্টাচার্য। তেমনি গঙ্গা ভাঙনের যে প্রাবল্য সেখানে জীবনের উত্থান-পতনের নানাগল্প। সাংবাৎসরিক গৃহহারা মানুষের নিত্য নৈমিত্তিক কোলাহলে নিসর্গের যেমন নানা আবরণ লুকিয়ে থাকে তেমনি চর দখল, বসতি স্থাপন, ভিটমাটি হারানোর মধ্যে এক গভীর রাজনীতিও বর্তমান। সেই রাজনীতিকে বৃহৎ পরিসরে নির্মাণ করেছেন অভিজিৎ সেন, তৃপ্তি সান্ত্রা। পরের দিকে শুভ্র মৈত্র, শুভজিৎ ভাদুড়ী। অভিজিৎ সেন সেই ইতিবৃত্ত নির্মাণ করেও মানুষকে শুদ্ধ করেন। চিরঞ্জয় চক্রবর্তীর গল্পে শুদ্ধতার যে পরিসর তা মূলত জ্ঞানতাত্ত্বিক। অভিজিৎ সেন চরিত্রকে রাজনীতি-অর্থনীতি-জনসংস্কৃতির গভীরে নিমগ্ন করেও একটা জীবনবোধে উপনীত করেন। চরিত্র নিজের শুদ্ধতার মধ্য দিয়ে জীবনের জয়গান গেয়ে যায়। ‘সাংসদ গণপতি মিশ্র’ (২০০০) গল্পে গ্রাম্য রাজনীতি, ভোটে জেতা, ক্ষমতা দখল, ক্ষমতা ভোগ, নীচুতলার কর্মীদের খুন-জখম, সব ছিনিয়ে নেওয়া, হিন্দু-মুসলিমের বিভেদ রাজনীতি, রাজনৈতিক শিবিরের পক্ষ-বিপক্ষের মধ্যেও জীবন সায়হ্নে গণপতি মিশ্র এক উপলব্ধিতে পৌঁছে যায়—
“আমি আশা করব এই সংসদ পাঁচ বছর টিকবে। পাঁচ বছর যদি না টেকে, আর আমি যদি ততদিনে না মরে যাই, আমাকে আবার দাঁড়াতে হবে। দাঁড়াতে এবং আবার জিততে হবে। এসব আমার এবং এই দেশটার ভবিতব্য। আমরা নির্বাচন লড়ব, জিতব, ভাগাভাগি করব, আর আমাদের সাধের এই প্রজাতন্ত্র পচবে, পচে গন্ধ ছড়াবে। ক্রমশ আমার, আমার মতো আরোও অনেক এবং অনেক পরিবার কিংবদন্তি হবে, নির্বাচনে অমোঘ হয়ে উঠবে। তোমার সংস্পর্শে থেকে কেন জানি না, আমার মৃত্যুভয় চলে গেছে।” (সেরা ৫০টি গল্প, তদেব, পৃ. ৩৬৮-৩৬৯)
অভিজিৎ সেনের গল্প উপলব্ধির নির্মাণ। গল্পকে তিনি জীবনবীক্ষায় পরিণত করেন। দেশের সমাজ-অর্থনীতি-মিথ-লোকায়ত সংস্কৃতি-খাদ্যাভ্যাস-জনসংস্কৃতিকে ধরেই জীবনের আরেক ফাল্গুনের গল্প শোনান। যেখানে অস্তিত্ব একটা শুদ্ধচেতনায়, মূল্যবোধ, জীবনদর্শনে উপনীত হয়।
শিল্পীর জীবন নিয়ে নানাগল্প লেখা হয়েছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শিল্পী’ থেকে সমরেশ বসুর ‘ষষ্ঠ ঋতু’, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর ‘খালপোল ও টিনের ঘরের চিত্রকর’, আনসারউদ্দিনের ‘শিল্পী’ গল্পের কথা মনে আসে। ব্যতিক্রম নন অভিজিৎ সেনও। ‘দেহাত্মতত্ত্ব’ (২০০৭) গল্পে তিনি বাউলশিল্পী সোনামণি দাসীর শিল্পচেতনাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। শিল্পী সমস্ত অপমান, নির্যাতনের মধ্যেও শিল্পকর্মেই মুক্তি পায়, জীবনের আনন্দ পায়। বাংলা গল্পের বিবিধ গল্পকার শিল্পীর শিল্পচেতনাকেই নানাভাবে প্রাধান্য দিয়েছেন গল্পে-উপন্যাসে। শিল্পের ধর্মকে মুখ্য করে জীবনের সৌন্দর্য সন্ধানে আত্মমগ্ন হয়েছেন। অভিজিৎ সেনও সেই প্রবণতাকেই ভিত্তি করে গল্প পরিবেশন করেছেন। অভিজিৎ সেন সম্প্রীতির সত্যে যেমন বিশ্বাস রাখেন তেমনি দেশকালের গভীরতলদেশের সংবাদ আহরণে মত্ত থাকেন। আজকের বাঙালি জাতিতত্ত্বের গভীরে বয়ে যাওয়া জীবন নিকেতন কেমন ছিল। আজকের বাঙালি মুসলিমের অনেকেই হিন্দু ছিল। কেউ কেউ স্বভূমি টিকে থাকতে, কেউ কেউ উদ্বাস্তু হয়েও নানাভাবে গোত্রান্তর ঘটিয়েছে। যে বয়ান বারবার পীযূষ ভট্টাচার্যের নানা আখ্যানে পাব, তাই ধরা দেয় অভিজিৎ সেনের ‘কাক’ (১৩৯৯) গল্পে। কাকের হিন্দু বাড়ি-মুসলিম বাড়ির ভাত খাওয়া, গল্পকথকের স্বদেশ অন্বেষণ, দাসমশাইয়ের টিকে থাকা, মানিক মিয়াঁ, রাঙাদিকে সামনে রেখে উপমহাদেশের গভীর ক্ষতকে স্পর্শ করেন। বৃদ্ধ দাসমশাই ও মানিক মিয়াঁ আজও কাকের পক্ষপাতিত্ব নিয়ে বেঁচে আছে। কাক এখানে শ্রেণিতত্ত্বের রূপক। কাক এখানে টিকে থাকা ও স্বভূমি ত্যাগের রূপক। কিন্তু শেষে রাঙাদি গৌর দাস ও নিতাই দাসের যে গল্প শোনায় সেখানে আর বুঝতে অসুবিধা হয় না টিকে থাকতে একভাই ধর্মত্যাগ করেছিল। দেশভাগকেন্দ্রিক এই ধর্ম রূপান্তরের বয়ান অমর মিত্রের আখ্যানেও নানাভাবে মিলবে। আমাদের কথাকাররা উপমহাদেশের বুকে জমে থাকা ক্ষতকে যেমন স্পর্শ করেছেন তেমনি জাতিতত্ত্ব-নৃতত্ত্বের নানা পাঠ আবিষ্কার করেছেন। যা কালচারাল স্ট্যাডির ক্ষেত্রে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। অভিজিৎ সেনের উপন্যাসে নদীর একটা বড় ভূমিকা আছে। মনে করা যেতে পারে ‘অন্ধকারের নদী’ (১৯৮৫), ‘বিদ্যাধরী ও বিবাগী লখিন্দর’ (১৯৯৫), ‘মেঘের নদী’ (২০০২), ‘নিম্নগতির নদী’ (২০০৬) উপন্যাসের কথা। গল্পের ক্ষেত্রে নদী-বিল-খাল-নালা নানাভাবে এসেছে। গল্পের ক্ষেত্রে তিনি নদীর থেকেও বেশি জোর দিয়েছেন বিল, নদীর বিচ্ছিন্ন শাখাকে। জলের কথা অভিজিৎ সেনের গল্পে নানামাত্রায় দেখি। মনে করা যেতে পারে ‘জল’, ‘পাথরে জলের বিন্দু’, ‘মাছ’, ‘লখিন্দর ফিরে আসবে’, ‘নৌবাহার’, ‘ছোলেমান ও মেরুনের গল্প’, ‘পদ্মার ইলিশ’ গল্পের কথা।
অভিজিৎ সেন কালান্তরের কথাকার। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন বিংশ শতকের প্রথমার্ধের সামগ্রিক বিন্যাসকে শক্ত পাটাতনে বেঁধেছিলেন তেমনি অভিজিৎ সেন দ্বিতীয়ার্ধের প্রান্তিক পরিসরের সমাজ-অর্থনীতি-রাজনীতির ভাঙন ও সম্প্রসারিত বৃত্তকে একটা ভিত্তি দান করেন। বামফ্রন্টের উত্থান, বর্গাপ্রথা, ভূমিবণ্টন, সবুজবিপ্লব, নকশাল আন্দোলনের রেশ, জমিদার উচ্ছেদই সেইসময়ের দেশকাল, মানুষের সংবাদ আহরণ। ছয়-সাত-আটের দশকের কথাকাররা অধিক পরিমাণে জমি-মানুষ-চাষ নিয়ে মত্ত হওয়ার কারণই হল তখন গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়েই এই ভূমিবিপ্লব চলছে। তার বহুমাত্রিক জিঘাংসা, ভাঁজে ভাঁজে জীবনের নানামাত্রিক সংবাদ, জমির তলদেশে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস খননের মধ্য দিয়ে দেশকালের যে চিত্র গড়ে ওঠে তা শুধু বাংলা গল্পের সম্পদ নয় ইতিহাসেরও নথি। সেই নথিনামাই বহন করে চলে অভিজিৎ সেনের ‘শিশুপাল’ গল্প। রামকুমার মুখোপাধ্যায়ের দুঃখহরণ গ্রাম্য মানুষদের কাছে দুখে হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এ গল্পের দেউনিয়া ঢিলা মণ্ডল নিজের প্রকৃত নামই ভুলে গেছে। দুঃখহরণ দুখে হলেও লেখক প্রকৃত নাম স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন কিন্তু ‘শিশুপাল’ গল্পের দেউনিয়া ঢিলা মণ্ডল বাল্যকালে রাখালি থাকা অবস্থায় এই নাম অর্জন করে। প্রকৃত নাম জানা যায়নি। এমনকি পুরাতন দলিলেও ঢিলা মণ্ডলই নাম পাওয়া যায়। প্রকৃত নাম বৃদ্ধ বয়সে সে আর স্মরণ করতে পারে না। গল্পের বিস্তৃত পরিসরে তেভাগা থেকে বর্গাপ্রথা, কমিউনিস্ট উত্থান, কমিউনিস্ট রাজনীতির পরিসর যেমন আছে তেমনি জমির চরিত্র, মহুরি, জে.এল.আর.ও, দলিল-পর্চা-খতিয়ান নিয়ে জমিকেন্দ্রিক মানুষের সামগ্রিক বৃত্তায়ন আছে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নবীন-প্রবীণের দ্বন্দ্বের মতো এখানেও প্রাচীন দেউনিয়া ঢিলা মণ্ডল নব্য দেউনিয়া দানী সিংহরায়ের কাছে পরাজিত হয়ে টিকে আছে। কালের ক্ষেত্রে এই পরাজয় প্রত্যাশিত, নব্যকাল তার সমগ্রমাত্রা নিয়ে নতুনের দিকেই ঝুঁকে থাকে। সেই নতুনও একদিন পুরাতন হবে। আর এই পর্বান্তরকে লেখক ভাসিয়ে দেন মিথের ভেলায়। দ্বন্দ্বময় বিন্যাসের মধ্য দিয়ে গত শতকের সাত-আটের দশকের সামগ্রিক সমষ্টিচিত্র বয়ানে ভেসে আসে—
“ব্লক অফিস, পঞ্চায়েত, ল্যান্ড রির্ফম, আদিবাসি অফিস, সমবায় সমিতি, ব্যাংক, ইত্যাদি যাবতীয় অফিসের মাধ্যমে বন্যার জলের মত সরকারি টাকা আসছে গরিব মানুষের নামে। আর টাকা যখন আসে, তার সঙ্গে থাকে বণ্টনের কিছু বিধিনিষেধ। কাজেই দানী নিমিত্ত মাত্র, দানী শুধু প্রতীক, দানী রক্তবীজ শিশুপাল, দানী সর্বত্র আছে। অর্থহীন তার অভিমান। অর্থহীন খড় কাটা কাঁচি দিয়ে চুল কেটে কাক-তাড়ুয়া সাজা। অর্থহীন তার গালাগালি, ক্যান্রে শালো, টাকা দিয়া ফের হামার কাছেৎ নাক-কাঁদন? অথবা ওঃ, ভাবিছিলি এংকাই টাকা তোমার তবিলোৎ ঢুকাই দিবে, লয়!” (‘শিশুপাল’, পঞ্চাশটি গল্প, সুবর্ণরেখা, ২০০০, পৃ. ৩৪৫)
সর্বস্বহারা পরাজিত মানুষদের নিয়ে অভিজিৎ সেনের বয়ান হলেও অভিজিৎ সেন পরাক্রান্ত, পলায়নবাদী কথাকার নন। আবার কালের ক্ষেত্রে মানুষকে পরাজিত করেও জীবনবোধে শুদ্ধ করেন। নবারুণ ভট্টাচার্য, রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়, অলোক গোস্বামী প্রলেতারিয়েতকে শেষপর্যন্ত পরাজিতই করেন। জীবনের ধ্রুব সত্যকে নির্মোহ বাস্তবতায় ব্যক্ত করে জীবনকেই যেন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেন এইসব কথাকাররা। অভিজিৎ সেন রণক্লান্ত মানুষের পরাজিত আর্তনাদের মধ্যেও এক জীবনবোধ, ভাববাদ, অহংমুক্ত চেতনা নির্মাণ করে জীবনের আরেক পাঠ নির্মাণ করেন। যা বাংলা গল্পের ভিন্নস্বর।
মানব মনস্তত্ত্বের পাশাপাশি অভিজিৎ সেন গুরুত্ব দিয়েছেন সময়ের বহুরৈখিক প্রবণতা এবং সময়কে বিবিধ শ্রেণির মানুষ কীভাবে উপভোগ ও নির্মাণ করছে তার উপর। সময়ের অনন্তগহ্বরে জমে থাকা পলি তুলে দেখান সময়কে মানুষ কত প্রক্রিয়ায়, কত পরিসরে, কত গতিতে নির্ণয় করে চলে এবং সময় মানুষকে কীভাবে প্রভাবিত করে। কোনো কোনো মানুষ সময়কে গ্রাস করে নিজে এলেমদার হতে গিয়ে যেমন ছিটকে যায় তেমনি সময়ের থাবা কোনো কোনো মানুষ, গোষ্ঠীর মধ্যে এমনভাবে চেপে বসে যে প্রকৃত সঠিক/ভুল চিহ্নিত করতে অক্ষম হয়। কেউ কেউ সেই গোষ্ঠীর মধ্যেই বিরোধ চালায়, কেউ কেউ একা হতে হতে নির্জনে, নিঃসঙ্গতায় চলে যায়। সময়ের এই অভ্যন্তরীণ সংকটকে অভিজিৎ সেন যে বিপুল তরঙ্গে, বিপুল বিভঙ্গে নির্মাণ করেন তা বাংলা গল্পের যথার্থই এক নব্য পরিসর। ‘আইন-শৃঙ্খলা’ গল্পে বর্গা-আধিয়ার-ভূমিবণ্টন-জমি ছিনিয়ে নেওয়া, বোরো চাষ, ব্যাংক লোন, সাধারণ মানুষের লোন ফাঁকি দেওয়া ও জোতদার-কৃষকের বিরোধের চিহ্নায়ন যে মাত্রায় তরান্বিত হয় তা আটের দশকের সময়ের গোপন রহস্যকে নানা সুরে আক্রান্ত করে। একদিকে বহুকালের মৌখিক আইন, মূল্যবোধের পরিসর, অন্যদিকে নব্য আদালতে শ্রেণিহীন-শ্রেণিশত্রুকে কেন্দ্র করে যে বিরোধাভাস নির্মিত হয় তা সময়ের উত্তাপকে শোষণ করেও সময়কেই শুশ্রূষা দান করে। অথবা সময়ের গতিতরঙ্গে জমে থাকা অজস্র বন্ধনজাল যা মৌখিক শর্ত-লিখিত শর্তকে খণ্ডন করেও উপমহাদেশের জীবনচেতনাকে নব্যসুরে চিনিয়ে দেয়। বিগত শতকের তিন দশকের গল্পভূমি থেকে নতুন শতাব্দীতে গড়ে ওঠা গল্পভূমির নানা পরিবর্তন চোখে পড়ে। মনে করা যেতে পারে ‘আনোয়ার খুন হয়েছে’, ‘শিরহাটির পাখিরানিরা’, ‘আয়ুষ্কাম’, ‘বকুলবালা’, ‘ধূমাৎ অগ্নি’ গল্পের কথা।
অভিজিৎ সেন স্বপ্নময় বাস্তবতার কথাকার। জীর্ণ বাস্তবকে, ক্লেদময় বাস্তবকে আর্টের বাস্তবে তিনি পরিচ্ছন্ন সত্যে ভাসমান করেন। দান্দ্বিক বাস্তবের মধ্যে জীবনের পরাগরেণু সন্ধান করে সংশয়ের সত্যের মধ্যেও আনন্দলহরীকে বাজিয়ে চলেন। তিনি বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিচিত্র ধারা, সমরেশ বসু, মহাশ্বেতা দেবী, প্রফুল্ল রায়ের অন্ত্যজচেতনা, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, রমাপদ চৌধুরীর গল্প শোনানোর দীক্ষিত সত্য—এসব অনেকান্তিক সত্যের যথার্থ উত্তরাধিকারী হয়েও অভিজিৎ সেন নিজের স্বতন্ত্র পথ গড়ে নেন। প্রান্তস্থিত গভীর সত্যকে অন্বেষণের ধ্রুব প্রয়াস, রাজনীত-অর্থনীতি-সংস্কৃতিকে ব্যাপক অর্থে আত্মমন্থন, পথে-প্রান্তে-নিসর্গে-বিলে যাপনের উড়গুলানকে ক্রমাগত রোমন্থন করে জীবনের যে অপ্রত্যাশিত সৌরভ প্রফুল্লকাননে ভেসে যায় তা বাংলা গল্পের দিগন্তকে বহুমাত্রায় প্রসারিত করে। যৌনতার অতলদেশে না গিয়েও জীবনের ভালোবাসা, প্রত্যয়ী উচ্চারণ কত নিখুঁত হতে পারে তার এক আশ্চর্য আবিষ্কারক অভিজিৎ সেন। ‘গল্পের রক্তমাংস’ গল্পে শুনতে পাই—
“একটা চমৎকার মোচড়ের জায়গা এসেছে গল্পটায়। রিয়াজের ভেতরের সাংবাদিক গল্পখোর পত্রিকা পাঠকের প্রতিক্রিয়া যেন চোখে দেখতে পায়। তার সামনে যে কাহিনী উন্মোচিত হোল, তা লিখবে, কি, লিখবে না, সে তারই ব্যাপার। বকুলের মনস্তত্ত্ব ঘৃণা বেদনা নিয়েই ফুটে উঠবে। বকুল মহৎই হয়ে উঠবে তার লেখায় এবং পুলিশ ঘৃণ্য। না হলেও মানুষ খাবে কেন? তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তিমতী বিষাদ এবং হতাশা বকুল কোনো রক্তমাংসের মানুষ নয়, সে একটি নিটোল গল্প।” (তদেব, পৃ. ২০৫)
বাস্তবকে নিয়ে সিনেমা, সাংবাদিক রিপোর্ট আর গল্প পৃথক। পূর্বে লেখক সমগ্র কাহিনি শুনিয়েছেন। সেই কাহিনি নিয়ে একজন সাংবাদিক রিপোর্ট তৈরি করবেন, আর কাহিনিই গল্প হয়ে উঠছে। সে কাহিনির মধ্যে সাংবাদিক নিজেও আছেন। অভিজিৎ সেন গল্প লিখলেও আর্টের সন্ধানে বারবার উন্মত্ত হয়েছেন। গল্পের তলদেশ দিয়ে বিছিয়ে দিয়েছেন শিল্পের সুসজ্জিত বাতাবরণ। যা দেশকালের সামগ্রিক সত্যকে ধরেই সাহিত্যের নান্দনতত্ত্বকে যেমন প্রতিষ্ঠা করে তেমনি বিকল্প বয়ানের সন্ধান দেয়। আট-নয়-শূন্য দশকে বাংলা গল্পের পরিসর কীভাবে বদলে যাচ্ছে আখ্যানের নানামাত্রাকে সংগঠিত করে তা অভিজিৎ সেন দক্ষতার সঙ্গে জানান দিয়েছেন। একথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না বাংলা গল্পের পালাবদলে এক স্থিতধী মায়াবাদী গল্পকার অভিজিৎ সেন। বাংলা গল্পকে কীভাবে ভারতীয় সাহিত্যের অগ্রণী প্রতিনিধি স্থানীয় করে তোলা সম্ভব তা অভিজিৎ সেন নানামাত্রায় প্রমাণ করেছেন।
গল্পকে লালন করার অসাধরণ দক্ষতা, গল্পের মধ্যে হাজারো সংবাদ, দেশকালের খতিয়ান এনেও জীবনের তপস্যাভূমিকে জীবন্ত রাখার প্রাণবন্ত প্রয়াস এবং গল্পকে ভাষা-সংস্কৃতি-জাতি-মিথের আঙিনায় ভাসিয়ে কালচারাল ডকুমেন্টেশন করে তোলার অভিনব ভঙ্গি বাংলা গল্পভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে। অভিজিৎ সেন তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠেন গল্পকথকের আশ্চর্য দক্ষতা, গল্পবীণায় নানাভঙ্গি এবং আঙ্গিক সচেতন না হয়েও ভাষার বিবিধ এপিসোডে জীবনের নানামাত্রাকে স্পর্শ করার অনেকান্তিক দক্ষতায়। মানবতাবোধের থেকেও তিনি বেশি গুরুত্ব দেন মানুষের অর্জিত বিশ্বাসে। মানুষের মধ্যে উৎপাদিত বিশ্বাসের রেণু গড়ে তোলার জন্য গল্পের যে বয়ান পর্ব থেকে পর্বান্তরে পৌঁছে যায় তা চেনা হয়েও অচেনা। আবার ভারতীয় বাস্তবতার রূপমোহ খোলস সরিয়ে রক্তমাংসসহ জীবনের ঘ্রাণ যে স্পর্শাভিজানে কেবলই অভিজ্ঞতা সঞ্চার করে তা বাংলা গল্পের এক উচ্চ দার্শনিক অভিলাষ। ·

0 মন্তব্যসমূহ