সঞ্জতি আপন মনে গজগজ করে। দু দুটো বছর খরার পরে এবার বৃষ্টি হয়েছে ঢেলে। এখন এখনই যদি জমিটায় লাঙ্গল না দেওয়া যায় তাহলে পুরোটা ঢেকে যাবে আগাছায়! আর কাশফুল একবার যদি এঁটে ধরে তাহলে তো কথাই নাই। এমন শেকড় চারিয়ে দেবে যে টেনে তোলে কার সাধ্য! রুখা জমিতে রসের খোঁজ করতে গেলে তাকে তো অনেক গভীরে যেতেই হবে!
ধানচাষের পক্ষে যথেষ্ট বৃষ্টি হলে জমিতে লাঙ্গল পড়ে, বীজতলা বানানো হয়, চারা পোঁতার পর নিড়ানি পড়তেই থাকে, তখন কাশের দফা রফা হয়। খেতের চারপাশের মানুষ সমান কাশগাছ শণের নুড়ির মতো উজ্জ্বল সাদা মাথা যতই নাড়ে, বীজগুলো উড়ে এসে পড়ে ধানক্ষেতের জমা জলে। নেতিয়ে যায়, ভিজে যায় বলে বাতাসে ভেসে যেতে পারে না, বন্ধ হয়ে যায় ওদের বাড়বাড়ন্ত। সেজন্য কথাতেই আছে ধান বেশি তো কাশ কম, কাশ বেশি তো ধান কম!
শরীর খারাপ হয় এমন মেয়েদের তো ক্ষেতের কাজ করতেই দেওয়া হয় না, কিন্তু সঞ্জতির তো অল্প বয়সেই সে সব বালাই চুকেছে। অঙ্গনওয়ারির দিদি হেলথ সেন্টারের ডাক্তারের কাছে যেতে বলেছিল, সঞ্জতি যায়নি ! নিজের শরীর নিয়ে ভাবে না সে, তার মনে একটাই প্রশ্ন, বীজতলা বানানো থেকে ধান রোঁয়া, নিড়ানি দেওয়া, গাছ ফনফনিয়ে বেড়ে উঠলে ওষুধ ছেটানো, সার দেওয়া, ফসল কেটে মাথায় করে ঘরকে নিয়ে যাওয়া, মেশিনে ফেলে পিটাই করা, সব মেয়েরা করতে পারবে, শুধু লাঙলটি ধরবেক নাই কেনে !
ধরতি আবা-র বারণ আছে! উ কাম বিটিছেলাদের লয় ! বলত দুর্গাদাস।
সে বহুদিন আগের কথা, যখন দুর্গাদাস, মানে চোলাই খেয়ে পিলে ফাটিয়ে মরে গিয়ে বৌকে-বিপদে-ফেলে-যাওয়া সঞ্জতির স্বামী, বিয়ের পর পর তাকে ধরতি আবা-র গল্পটি বলেছিল। তখন দুর্গাদাসের মানুষের মতো স্বভাব ছিল, রাতে বৌয়ের বুকের ওপর উঠে সোহাগ করার ফাঁকে সে এইরকম অবাকপানা অনেক গল্প শুনাতো সঞ্জতিকে।
সে কতদিন আগেকার কথা কারও স্মরণে নাই। কোন গ্রাম তাও কেউ জানে না। এক জীবন থেকে আর এক জীবনে কাহিনিটি শুধু মুখে মুখে নেমে এসেছে।
এক বাড়ির সব লোক সাত সাতটা গ্রাম পেরিয়ে অন্য গ্রামের বিহাঘরে গেছে, বিয়ের ভোজ খাবে বলে। তাদের এক অল্পবয়সী মেয়ে গরু ছাগল মুরগি নিয়ে একলা বাড়িতে। ওদেরকেও তো দেখাশুনা করার একটা লোক চাই!
এদিকে হয়েছে কী, বহুদিন রুখার পর নামবি নাম, সেদিনই আকাশ ছাপিয়ে এমন বৃষ্টি নামল, যে অনেকের ঘরে মাটির চওড়া দেওয়াল জায়গায় জায়গায় গলে পড়তে লাগল! আর চারপাশের ধানি জমি জলে থৈ থৈ। সেই একা মেয়েটি তো দৌড়ে গিয়ে ঘরের ঢুকল, মাটির কলসিতে রাখা আগের বছরের বিছন ভেজা মাটিতে ছড়িয়ে দিয়ে বীজতলা বানাল। ক'দিন বাদেই মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এল সবুজ সবুজ চারা, এত জ্যান্ত যেন প্রতি মুহূর্তে ফনফনিয়ে বাড়ছে! হাওয়া বয়, ওদের শরীরে ঢেউ ওঠে, ওরা ফিসফিস করে বলে, হামাদের জমিনে গাঁড়্যে দাও হে, বিটি ! নাইলে হামাদের অকাল মরন হবেক!
মেয়েটি শোনে আর অস্থির হয়ে দুয়ারের ফাঁকে পথের দিকে চায়! এখনও শেষ হলনি বিহা-ঘরের পরব! ঘরের মরদরা না ফিরলে এতো ধানচারা পোঁতার জন্য জমিতে লাঙ্গল দেবে কে! মেয়ে ঘর বার করতে থাকে, এর ওর কাছে কাকুতিমিনতি করে, কিন্তু গ্রামে এমন কোনও হাত-খালি মরদ ছিল না, যে এসে তার জমিতে লাঙ্গল দেবে! এতদিন রুখার পর মারাং বুরুর দেওয়া জলটুকুর সদগতি করতে যে যার যার জমিতে বড়ই ব্যস্ত!
মেয়ে তাই পরদিন আকাশে দমে সিতুম বা কড়া রোদ ওঠার আগে হাঁসমুরগিকে দানা দিয়ে, গরুছাগলের মুখের সামনে জমানো থকথকে মাড়ের গামলা রেখে, দুই বলদ নিয়ে কাঁধে ছোট লাঙ্গলটা চাপাল। শাড়িটাকে ধুতির মতো দুই পায়ের ফাঁকে চালান করে মনে মনে ভাবল, আজ সারাদিন ধরে কাজ করলে অর্ধেকটা জমি তো জব্দ হবে। বাকি অর্ধেকের জন্য তো পরের দিন রইলই। ফিরুক বাড়ির লোক যখন খুশি।
কিন্তু কী আশ্চর্য, জমিতে যত বার সে লাঙ্গল ছোঁয়ায়, অস্থির হয়ে ওঠে বলদ দুটো, জোয়াল নামিয়ে ভেগে যেতে চায়, মাটির ভেতর থেকে গুড়গুড় শব্দ ওঠে, যেন কেউ বিষম রেগে দাপাদাপি করছে। অবাক হয়ে যায় সেই মেয়ে। তাকিয়ে দেখে জমির পাশের পলাশ মহুয়ার গাছ মাথা নেড়ে নেড়ে যেন তাকে এগোতে বারণ করছে, ক্যাঁ ক্যাঁ করে উড়ে যাচ্ছে ভয়-পাওয়া পাখির দল! এইসব অনাছিস্টি কান্ডকারখানা দেখে মেয়ের মনে পড়ে যায়, ছোটবেলায় সে শুনেছিল, ধরতি আবাকে ফেঁড়ে দেয় যে লাঙ্গল সে যেন পুরুষে[র লিঙ্গ,] ধরতির সঙ্গে তার বিহা সারা হলে সিক্ত বীজ [ঢালো,] অন্ধকার গর্ভের গভীরে [তারা] অঙ্কুরিত হবে, শস্যের সন্ততিতে ভরে যাবে মাঠ, সারা পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীর খাদ্যের সংস্থান হবে। তাই পুরুষকেই লাঙ্গল ধরে রাখতে হবে শক্ত মুঠোয়। না হলে ধরতি আবা রুষ্ট হবেন।
এ কথা মনে হওয়া মাত্র সেই সাহসী মেয়ের সারা শরীর বিকল হয়ে গেল। মনের ভুলে, অবস্থার চাপে এ কী পাপ করে বসল সে! তাড়াতাড়ি জোয়াল থেকে বলদ দুটোকে মুক্তি দিয়ে সে লজ্জায় ভয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল মানুষ-সমান কাশবনের ভেতরে। ঘরের লোক সেদিনই ফিরল, হেথা হোথা কত খুঁজে বেড়াল, কিন্তু সেই মেয়েকে আর কোথাও পাওয়া গেল না। তবে এখনও নাকি ভোরের কুয়াশায় দূর থেকে কেউ কেউ দেখতে পায় ছেলেদের ধুতির মতো করে শাড়ি পরা এক মেয়ে, চুলখোলা, কাদামাখা তার সারা শরীর, হুই পাহাড়ের ছায়ায় আচমকা মিলিয়ে গেল! সেই মহা পাতকী!
বর তো মরেছে, কিন্তু সঞ্জতির জন্য রেখে গেছে এই উপকথা। না খেয়ে মরলেও সে জমিনে লাঙ্গল দিতে পারবে না! সঞ্জতি খালি পেটের উপর ঢিলা হয়ে যাওয়া শাড়ির বাঁধন শক্ত করে, তারপর একমাত্র সঙ্গী টুকু নামের কালো [ম্যারমটিকে] ছাগলটিকে কোলে তুলে বাউড়ি পাড়ায় বড় বাউরির রান্নাঘরের দিকে এগোয়। বগলের তলা থেকে টুকু ডাকে ম্যা ম্যা! সঞ্জতি জানে ওর খুব খিদে পেয়েছে। বাউড়িদের বাড়িতে অনেকগুলো লোক, ভাত হয় পাহাড়প্রমাণ, যদি ফ্যান একটু দেয় তার ছাগলটাকে।
টুকু যখন চক চক করে ফ্যান খায়, সঞ্জতি জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটে, তার পেট মুচড়ে ওঠে। হাঁড়ি চেঁছে শেষ ভাতের দানাটি সে খেয়ে নিয়েছে পরশু রাতে। এখন নিষ্ফলা হয়ে পড়ে থাকা জমির আলের পাশে জন্মানো শাক বা আরা তুলে পেট ভরানোর জন্য সেদ্ধ না করলেই নয়।
বড় বাউড়ির চিরকালের ব্যথা সঞ্জতির উপরে। কতদিন ঝোপেঝাড়ে হাতছানি দিয়ে ডেকেছে তাকে ৷ কি না, দুটো প্রাণের কথা কইবে। সঞ্জতি পাত্তা দেয়নি মোট্টে। নেশায় পড়া পুরুষ মানুষ সব সমান। হাঁড়িয়া আর মহুলের মদ তাও ভালো ছিল, এখন প্ল্যাস্টিকের প্যাকেটে ভরা সরকারি মদের রমরমার কালে লোকে দাঁতে প্লাস্টিক ছেঁড়ে আর গলায় ঢকঢক করে ঢালে। মেয়েরা পোষা পশুপাখিকে আগলে রাখে, পাছে মরদের নেশার টাকা যোগাতে গিয়ে তারা চুপিসারে বিক্রি হয়ে যায়!
সঞ্জতিই তো দুর্গাদাস বেঁচে থাকতে নিজের ক্ষেতে নিড়ানির কাজ করতে গেলেও টুকুকে লম্বা দড়িতে আলের পাশে বেঁধে রাখত। সে নিড়ানি দিত, আর নজর রাখত ছাগলটার ওপর।
এখন ম্যারম কোলে তাকে আসতে দেখে বড় বাউড়ি হাসে, "সঞ্জতি, জমিটো তোর এমনিই পড়্যে থাকবেক? উষারডিহি থেকে ট্র্যাক্টর ভাড়া কর্যে আন। চাষ দে। জল তো আর বেশি দিন থাকবেক লাই।"
বড় বাউড়ি হচ্ছে বাউড়ি সমাজে সবচেয়ে লেখাপড়া জানা পুরুষ, সে কি জানে না ম্যারম সর্বস্ব দুর্গাদাসের বিধবার ক্ষমতা নাই দিনপ্রতি তেরশ টাকা দিয়ে ট্রাক্টর ভাড়া করে! প্রাণে ধরে বিক্রি করতে পারেনি বলে দুর্গাদাসের বলদদুটো ওকেই ভাড়া দেওয়া আছে। মাস গেলে নাকি সঞ্জতিকে একবারে হাজার টাকা দেবে। সত্যি হাজার দেবে নাকি ছ'শ, সে হিসেব তো পরে, এখন সারাটা মাস সঞ্জতি খায় কী! তার মুখে খুব কষ্টের হাসি ফোটে।
"এই দ্যাখো, হাঁইসতে লাগলি কেনে? হাঁসির কথা কী বইললম তুকে? চাষ কইরবি না তো খাবি কি?"
"টাকা থাইকলে তো তাই দিয়ে হামি চাল কিনে ভাত খেতম রে। ফ্যানের জন্য ম্যারম লিয়ে তুমাদের দুয়ারে আসি?"
বড় বাউড়ি উঠে যায় দড়ির চারপাই থেকে। সঞ্জতির ম্যারমের জন্য একটা ছোট এলুমিনিয়াম বাটিতে খানিক ভাতের ফ্যান নিয়ে আসে। বাটির ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়া ছাগলটার পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে তার চোখ ঝলমল করে, "তুই একটা বোকা রে সঞ্জতি। তিনদিনে চাইর হাজার টাকা ট্র্যাক্টর ভাড়া দিলেও আরও হাজার টাকা বাইচ্যেঁ যাবেক, এমন জিনিস আছে তুর ঘরে। লতুন চাল বাজারে না আসা পর্যন্ত তাতেই তুর চইলে যাবেক রে পাগলি!"
বড় বাউড়ির হাসি হাসি মুখ দেখে সঞ্জতি ভাবতে থাকে কী আছে তার ঘরে! দুটি ছেঁড়া কাথা, কিছু তোবড়ানো এলুমিনিয়াম বাসন, চাল রাখার জন্য ফুটো সেলাই করা বোড়া আর টুকুকে বাঁধার দড়ি ছাড়া আর তো কিছু নাই! তার দাম এত!
তাকে আকাশপাতাল ভাবতে দেখে বড় বাউড়ি টুকুকে সামনের দুপায়ের নিচে হাত ঢুকিয়ে তুলে ধরে। বলে, "ক্যান, এই ম্যারমটা!"
মুহূর্তে তার হাতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সঞ্জতি, উত্তেজনায় হাঁপাতে থাকে সে। শয়তানটার চোখ পড়েছে তার টুকুর ওপর! বেটা নাই, বিটি নাই, স্বামীটা নেশা করতে করতে মরল। থাকার মধ্যে আছে ওই টুকু। সে প্রবল চেঁচায়, "ম্যারম বিক্কিরি নাই গ্যঁ। উ হামার লিজের বিটি। উয়ার বাচ্চা হইলে হামার আর চিন্তা থাইকবেক নাই গ্যঁ ।"
খুক খুক করে ভুঁড়ি নাচিয়ে নাচিয়ে হাসতে থাকে বড় বাউড়ি। সে তো জানে পাঁচটা বাচ্চা হলে দুটো খাবে শেয়ালে, দুটো ধুঁকে ধুঁকে অজানা অসুখে মরবে, আর একটা সঞ্জতি দুশো টাকায় বিক্রি করবে। তাই হাসিমুখেই সে বলে, "দুস শালি, কে কিনবে তোর বাঁজা ম্যারম? ভালা কথা কহিছু, শুইনে যা। লইতন ঝাঁ চকচকে রাস্তা বানাইল সরকার, গ্রামের ভিতর দিয়া এক্কেরে বাঁকড়ো শহর পজ্জন্ত। কত গাড়ি যায়, বাইক ত বাইক, বাস, ট্রাক, হাতি গাড়ি, ছোট গাড়ি। দেইখবি, রাইতের আন্ধারে ঝোপে গা ঢাকা দিয়ে হেতা হোতা বইসে থাকে হামার পাড়ার লোকজন। হাতে হাঁস বা মুরগা। যেই না উ ধার হতে সাঁই সাঁই গাড়ি ছুট্টে আসে, অমনি জীবটিকে গাড়ির সামনে ঠেল্যে দেয়। হেড লাইটের আলোয় চোখ ধান্ধায় আর চাকার তলে চল্যে যায় সেটা! ব্যস ব্রেক মারা গাড়িটাকে ঘিরে ধইরে সে কী লাচন, সে কী লাচন! ইয়ার নাম ফিস্টি। ঘিরে লিবার জন্য ছেলেছোকরাদের হাতে, দুই তিনটা নোট গুঁজে দিলেই দমে খুশি উয়ারা। এক্সিডেনে মরা পশুপাখির রেট সব বান্ধা, ছাগল পাঁচ হাজার, মুরগি আড়াই, হাঁস দুই।"
ছি: ছি:! বড় বাউড়ির নিষ্ঠুর কথা শুনে কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ফিরল সঞ্জতি। তারপর সারা রাত টুকুকে বুকে জড়িয়ে ধরে খিদেয় ছটফট। ও তো তাও ঘাসপাতা মুখে দেয়, তার কপালে তো ভাতের ফ্যানটুকুও জোটে না। কিন্তু টুকু যে তার আপন বিটির সমান। তার সব কথা বোঝে, গায়ের সঙ্গে লেপ্টে থাকে সবসময়, কিছুক্ষণ না দেখলে ম্যা ম্যা ডাকে পাড়া মাথায় করে। উঠোনে পড়ে থাকা মরচে পড়া লাঙ্গলের দিকে তাকিয়ে সঞ্জতির চোখ জলে ভরে ওঠে! বড় বাউরি যে কহিল, তার টুকু বাঁজা, সেটিই কি ঠিক নাকি তবে? দু দু বার পাল খাইয়েছে সে ছাগলটাকে, একবারও বাচ্চা পেটে আসেনি। দু বারের পর পাশের গ্রামের গোবৈদ্যের কাছে নিয়ে গেলে ল্যাজের নিচটা ভালো করে দেখে বলেছিল, "হামার বুদ্ধিতে নাই কুলাইছ্যেঁ । করঞ্জ আর নিমফুলের তেল দিয়া মাড়ভাত খাওয়া। দ্যাখ কী হয়!"
তখনও দুর্গাদাস বেঁচে ছিল। মুখ বাঁকিয়ে বলেছিল, "কী বিহা করলম, কী ঘর পাঁইতলম! বৌ-বিটিটাও আঠকুঁড়া, ম্যারমও তাই!"
তা মুখে যা আসে বলুক, লাঙ্গল দিত ভালো লোকটা! মদের চাপে শরীর কাঠির মতো, তবু অভ্যাসেই লাঙ্গলের ফলা সর্বশক্তি দিয়ে গেঁথে দিত নরম মাটিতে, বলদ দুটো প্রাণপণে টেনে নিয়ে যেত। বাদবাকি কাজ তো সবই সঞ্জতির ঘাড়ে! বীজতলা বানানো থেকে রোদে শুকনো করা সেদ্ধ ধান চালকলে নিয়ে যাওয়া অবধি।
তবুও সেইদিনগুলিই ভালো ছিল। পেটের ভেতরের নাড়িভুঁড়ি গুলিয়ে ওঠা সামলাতে সামলাতে সঞ্জোতি ভাবে। শরীরে এতো কষ্ট ছিল না। খাটো, ঘরের লোকের পাতে আরা-ভাত তুলে দাও, নিজে পেট পুরে খাও, তারপর ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে সুখে নিদ্রা যাও। না কোনও পেট কামড়ানি, না কোনও খারাপ স্বপন। টুকুকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে এক ঘুমে রাত কাবার করে সঞ্জতি যখন সকালে ঘুম থেকে উঠত, তখন তার মুখখানা ঝলমল করছে পুব আকাশে গড়ান দেওয়া চান্দো-র মতো!
আর এখন? পেটে জ্বালা, বুকে জ্বালা, মাথা সর্বদা ঝিমঝিম। টুকুর মতো ঘাসপাতা চিবাতে পারলে, মাড়ে চুমুক দিতে পারলে বোধহয় আর ক'টা দিন বাঁচা যেত! তারপর তো লোকের ধানখেতে নিড়ানি দেবার লোক লাগবে, ধান কাটার কামলা লাগবে, আঁটি বাঁধা ধান ঝাড়াই মেশিন পর্যন্ত পৌঁছে দিবার জন লাগবে। তখন মেলাই কাজ, আর কাজ মানেই ভাত, ভাত মানে পুষ্টি, রোদ খাওয়া চারাগাছটির মতো আনন্দে ঝলমল করে ওঠা! চোখ বুজে সেইসব দিনের কথা ভাবার চেষ্টা করে সঞ্জতি, কিন্তু বদলে তার ওয়াক ওঠে, টক জল উঠে এসে মুখ ভরিয়ে দেয়।
ওবেলা সে রেশন দোকানে গিয়েছিল। আঙুল-ছাপ মেলেনি বলে তাকে চাল দেয়নি শিবনাথ হালদার! সত্যি মিলেছে কি মেলে নাই, বলে দেবার লোক কোথায়! শিবনাথ যা বলবে তা-ই মেনে নিতে হবে। তবু একবার ঝাঁজিয়ে উঠেছিল সঞ্জোতি, "কাজের হাতে আঙুলের ছাপ কখনও এক থাইকতে পারে! ঘসায় ঘসায় তা পাইল্টে যাবেক নাই ?"
উত্তরে শিবনাথ একবার ঠান্ডা চোখে তার দিকে তাকাল, তারপর বলল, "উ টা কি দেখা যাছ্যেঁ রে সঞ্জোতি?"
শিবনাথের চোখ তার বুকের দিকে। ব্লাউজ তো ঘরে পরেই না সে, বাইরে পরার এটাও জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। শশব্যস্তে আঁচল টেনে ছেঁড়া জায়গা ঢাকে সঞ্জতি, লাইনে তার পেছনে দাঁড়ানো লোকগুলোর মুচকি হাসি দেখে তার চোখে জল চলে আসে। মরদটো তার নেশা করত বটে, কিন্তু সে বেঁচে থাকতে পেটে ভাত ছিল, এই ভাবে হেনস্থা করার আগে লোকে দুবার ভাবতো।
অন্যের ব্যাগে পাল্লা মেপে চাল ঢালতে ঢালতে শিবনাথ তাকে বলে, "সাঁঝের বেলায় ঘরকে আসিস। বৌকে বইলব একটা পুরানা বেলাউজ যেন তুকে দেয়।"
শালা, কুকুরের বাচ্চা, বলদের গোবর, ধরতি আবা-র শাপ লাগুক তোকে, সাঁঝের বেলায় তুয়ার ঘরকে যাবেক সঞ্জতি! উলটে জাহির থানে তোর মরণ কামনা করবেক। বিড়বিড় করে এইসব বলতে বলতে সে ফিরে আসে ঘরে, খিদেয় অবশ হওয়া হাতে বুক চাপড়ায়, হায় গ্যঁ, সাতকুলে কেউ নেই, যার দুয়ারে সে যেতে পারে দু মুঠো ভাতের আশায়।
টুকু কেবল অবোধ চোখ তুলে সঞ্জোতির কান্না দেখে আর থেকে থেকে ম্যা ম্যা বলে ডেকে ওঠে। তাকে আদর করার জন্য মাথা নিচু করলে খরখরে জিভ দিয়ে সে চেটে নেয় মানুষ-মায়ের চোখের জল!
রাত নামে। ঘরের পেছনের পুটুসবনে কোন জন্তু যেন খচরমচর করে! দ্বারকেশ্বর নদীর তীরের কালো পাহাড়গুলোর বেশির ভাগকেই ক্রাশার খেয়ে নিয়েছে। যে দু তিনটি এখনও দেখা যায়, অন্ধকারে তাদের মাথায় তারা ঝকমকে আকাশ। ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের মতো তারার কুন্ডলি এ মাথা থেকে ও মাথা! উ সব কুন্ডলি মন্ডলির নামধাম সঞ্জতি নাই জানে। মাথা উঁচু করে সে শুধু দেখতে পায় পূজা মন্ডপে দিকুরা যেমন ছোট বড় তারের আগায় টুনি লাগায়, তেমনি অদৃশ্য সুতোয় যেন ঝুলে আছে অজস্র তারা। কোনটা একটু উঁচুতে, কোনটা একটু নিচে!
টুকু তার ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে ঘুমায়, ম্যারম ঘুমোলে যে নাকে এমন ফ্যাঁতরফোঁতর আওয়াজ করে, টুকুকে না দেখলে বিশ্বাস যেত না সঞ্জতি। দোরের বাঁশ লাগাবে বলে সে ওঠে, আর সোজাসুজি তার চোখ আটকে যায় ঘরের সামনে তার আগাছায় ঢাকা পোড়ো জমিটার দিকে। প্রাণটা হায় হায় করে ওঠে সঞ্জতির! একজন মানুষের সারা বছরের পেটের ভাত দিয়েও আরও বেশি দিত জমিনের টুকরাটা, শুধু যদি লাঙ্গল দিবার একটা পুরুষ মানুষ থাকত! হায় রে সঞ্জতি, হায় রে তোর সমাজের রিতনিত! হায় রে তোর বিটিজনম! চোখের জল গড়িয়ে এসে তার কন্ঠার হাড়ের কুয়ায় জমতেই থাকে।
হঠাৎ উঠোনের কোণে সবুজ ঘাসের মধ্যে কী যেন তারার আলোয় চকচক করে ওঠে! ওহো, ওটা দুর্গাদাসের লাঙলের ফলা, যেটুকুতে এখনও জং ধরেনি! একহাতে দোর ধরে, অন্যহাত কোমরে রেখে সেইদিকেই একদৃষ্টে চেয়ে থাকে সঞ্জতি। থাকতে থাকতে তার মনে হয় ফলাটা তাকে ডাকছে, আয়, আয় সঞ্জতি, হামাকে মুঠায় ধইরবি আয়!
বহুদিন আগে যে মেয়েটি পাগল হয়ে কোথায় চলে গিয়েছিল, সে যেন এসে দাঁড়ায় নিষ্ফলা জমিটির প্রান্তে। কালা পাহাড়ের দিক থেকে হু হু করে ছুটে আসা ক্রাশারের ধুলো মাখা হাওয়া তার ধুসর চুলকে ধুসরতর করে দেয়, খুলে লণ্ডভণ্ড করে উঁচুতে উড়িয়ে দিতে থাকে গাছ থেকে ঝুলে থাকা লতাগুল্মের মতোই! তার পরনে বিটাছেল্যাঁদের মতো কাছা দিয়ে পরা শাড়ি, উপরের অনাবৃত দেহাংশ কী এক অপূর্ব সৌষ্ঠবে পরিপূর্ণ! যেন স্বয়ং ধরতি-আবা! উন্মুক্ত বক্ষভান্ডারে মজুত রয়েছে সারা পৃথিবীর পুষ্টি!
সেই নারী হাতছানি দিয়ে সঞ্জতিকে ডাকে। নিশির ডাক পাওয়া মানুষের মতো ঘোরের ভেতর সেইদিকে এগিয়ে যায় সঞ্জতি, ঘোরের মধ্যেই দেখতে পায় তার হাতে উঠে এসেছে মৃত দুর্গাদাসের লাঙ্গল! বাতাসে তার গায়ের গন্ধ পেয়েই বোধহয় বড় বাউড়ির গোহাল থেকে হাঁক দেয় তার বন্ধক রাখা বলদ দুটো, "হাম্বা, ওম্মা, লিয়ে যা হামাদের ইখেন থেকে!"
বুভুক্ষুর আবার রিতনিত! দানাপানি না পাওয়া প্রাণী আবার মহা পাতকী! যেন দৈবাদেশ পেয়েছে সে, এইভাবে নির্ভয়ে লাঙ্গল তুলে জমির দিকে এগোয় সঞ্জতি, খসিয়ে দেয় বুকের আঁচল, পায়ের ফাঁকের ভেতর দিয়ে ঘুরিয়ে গুঁজে নেয় সেটাকে পেছন দিকে। নি:শব্দে অন্যের গোহাল থেকে নিজের বলদ দুটোকে গলার দড়ি খসিয়ে নিয়ে আসে। যেন সে শস্যের বপন থেকে কর্তনের প্রথম ঈশ্বরী, চাষবাসের আবিষ্কর্ত্রী সেই আদিম মানবী, এইভাবে অনায়াসে আল টপকে ক্ষেতে নেমে যায় সঞ্জতি! ·

0 মন্তব্যসমূহ