ক'খান মাত্র গয়না আমার সম্বল। ওই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দিনেও পিনি, রাতেও পিনি। ফুলশয্যার রাত যখন সকাল হল, ঘরের দরজা খুলে বেরোতেই শাশুড়ি ড্যাবা ড্যাবা চোখে তাকিয়ে বলে, "হ্যাঁ লো হাভাতের বিটি, কানে নাকে গহনা পিনে ভাতারের বিছানায় সারা রাত সুতেছিলি?"

ফুল্লরা বলে, "তো আপনি নিজের ছেলেকেই সুধান কেন? যখনই খুলতে যাই গহনা, কেঁদে কেঁদে বলে, পিনে থাকো ফুল্লরা, গহনা খুলনাকো, সোনার গহনায় তোমাকে দেবীর মত লাগে!"

এই শুনে চম্পারানি দাসি গোমরা মুখে চুপ করে যায়। হতভাগা ছেলে পেটে ধরেছিল বটে, আদেখলার পুত! এখনই যদি এই হাল, কদিন পর তো বউমা মাগীর পোঁদ শুঁকে শুঁকে বেড়াবে দিনরাত! বাপ-মাকে চিনতেই পারবে নাকো!
না! কিছু না কিছু একটা করতে হয়।
ফন্দি আঁটে আকাশের দিকে তাকিয়ে।

তখন একটু বেলা গড়িয়েছে পশ্চিম পানে। মসজিদে আজান শুরু হয় আচমকা। কয়েকটা কবুতর কোথা থেকে যেন উড়ে এসে, কোথাও না বসে আবার কোথাও উড়ে চলে যায়। চম্পারানি, "মাগো মা!" এই বলে হাই তোলে। আযান গমকে গমকে বাজে। হরি হরি! চম্পা আবারও হাই তোলে, কী যে চমৎকার রান্না করে বউমা, বদের ঝুড়ি ফুল্লরা! কিন্তু মানতে তো হবেই, এই ছুট্টু বয়সেই মেয়েটা বাবু ভাল রান্না শিখেছে বটে। বড় ঘরের মেয়ে বলে কথা। তাতেই বুঝি বেটাটা গলা অব্দি বশ হল! মাগীর ডাঁট দ্যাখ কেনে! ভাতারকে দুই জাঙের ফাঁকে যেন কাবু করে রাখে চব্বিশটা ঘন্টা!

উঁহ! উশখুশ করে চম্পারানি দাসি। চম্পারানির আজকাল খানিক বয়স বাড়ল, মাঝে মধ্যেই নাম-ফাম ভুলে টুলে যায়। একদিন দেখল সাইকেল নিয়ে নবর বেটা গোলক যাচ্ছে হাটের দিকে, একটুখানি এগিয়ে গেছে, নাম ধরে যে ডাকবে ছাই কিছুতেই মুখপোড়ার নামটা মনে পড়ে না। একটা লাউ আর কিছু কচুশাক আনতে দিত। শেষে, "ওই! ওইরে!" বলে চিৎকার করে ডাকতে হল, তাতে নবর ব্যাটা গোলক এল বটে ফিরে কিন্তুক বড্ড ব্যাজার হল। বলে, জেঠি তুমি কি আমার নামটা ধরি ডাকতি পার না?

মনের দুখ কাকে দেখাই বল দিকি। সেই যে বলে না, "সুখে সুখের সাথি/ সুখ পেরোলেই লাথি!" মনের কথা শুনার বড় কি সময় আছে আর কারও।
যাক গিয়ে, থাক। কিন্তু বউমা মাগীকে বেশি বাড় বাড়তে দিলে মাথায় উঠে হাগবে।

আর ঘরের কর্তা তো মুখে দই জমিয়ে ভেড়ার পারা ঘুরঘুর করে। পরের ঘরের মেয়ে এসে যে শ্বাশুড়িকে মুখের চোপা করে, তুমি ঘরের মালিক, বেটার বাপ, দুটো রা কাড়তে পার না মুখে। জাঁকিয়ে চারটা কথা কইলেই তো বড়লোকের বিটি একটু থমকে যায়। সে কথা কে বুঝাবে মুখপুড়া মিনসে কে।
***
বাবাজি অনন্তদাস মহারাজ বললেন, এই পেসাদ টুকু নিয়ে যা আঁচলে বেঁধে, চম্পা, কাল ভোরবেলা বাসি মুখে ছেলেকে খাওয়াবি আর একঢোক গঙ্গাজল দিবি। সব ঠিক হয়ে যাবে।
বাবা, ছেলে কি মায়ের কোলে ফিরবে আবার, বাবা?
ফিরবে আবার কী রে! দু দিনের লেগে মতিভ্রম বৈ তো নয়! মায়ার কাজল কেটে যাবে, যা বললুম করগে যা!
বাবা, ওই বেটির বাপে যে গহনা দিয়েছে গা ভরে, তারই যে গুমোর যায় না, ভাতারের ঠিনে রেতের বেলায় গহনা পিনে বিছানায় যায় নিলজ্জ মাগী!

বাবাজি মৃদু হাসেন, ওরে, ওটাই তো মায়াজাল। গহনা তো বিছানার বাধা, তোর গাধাটা কিছু বলে না?
ও আবার বলবেকী বাবা, সেই তো শুনছি গা থেকে গহনা খুলতি দেয় না, সে কথা আবার ওইটুকু মেয়ে, পরের ঘরের দজ্জাল ছুঁড়ি, রগর করে, খোঁচা মেরে, আমাকে বলে! আর আমার বর যে একটা বিহিত করবে সে উপায় নাই, মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকে।

চম্পারানির গুরুদেব খানিক চোখ মুদে থেকে গলার স্বর নামিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, আচ্ছা, বিছানায় গহনা কি মানায় রে চম্পা? নর-নারীর মধ্যিখানেওইসমস্ত ঝনর-মনর বাধা হয়ে যায় না? নিঝঞ্ঝাট না হলে ভালবাসা হয়?

চম্পারানি গুরুর মুখে এই কথা শুনে চুপ করে থাকে, জবাব ভেবে কিনারা করতে পারে না। অনন্তদাস আবার বলে, দুটি শরীরের মাঝে আর কিছু থাকলে সোয়াদ পাওয়া কি যায়, হ্যাঁ? যায়?

তখন চম্পা উত্তর করে, তোমার মুখে আমার সামনে এসব কথা হলি পরে শুনতি কেমুন লাগে গো মহারাজ! কইয়ো নাকো এমন কথা, আমার গা যেন কেমন করে...।
গা বলতে?
মনে হয় শরীর গো মাহারাজ...
শরীর, নাকি মন রে চম্পা?
না গো, শরীর...
তবে আয় দেখি, তোর গায়ে কী হচ্ছে অসুবিধা একটু পরীক্ষা করে দেখি আয়...
ছিঃ বাবাজি, এমন বল্লে, আর আমি তোমার কাছে একা একা আসব না, ছেলের বাপকে সাথে লিয়ে আসব!

তখন অনন্তদাস অতর্কিত বেসামাল হৃদয়াবেগ সামলে সতর্ক হয়ে ওঠেন। অতিরিক্ত সতর্কতায় "হরি হে, মাধব!" বলে ডাক দেন। আরও বলেন, "যাই হোক, শুনো তবে, তুমি আমার শিষ্যা, এসব কথা গোবিন্দর বাপ নিমাইকে যেন বলতে যেও না!"

চম্পারানি বিষয় লঘু করে, ও পুনর্বার সমস্ত ছন্দ ফিরিয়ে দিতে গলবস্ত্র হয়ে গুরুদেবকে পেন্নাম ঠুকে আঁচলে পেসাদ নিয়ে "না গুরুদেব, আমার আর তোমার মাঝে যে কথা হল, সে আর বাইরে যাবে না" এত বলে ধীরে ধীরে বেরিয়ে যায়।
***
"গহনা সবই কি সাথে এনেছ ফুল্লরা?"
বউয়ের আদুল গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে গোবিন্দ জিজ্ঞাসা করে, "সব গহনা বোকার মত সাথে পাঠায়নি তো তোমার মা-বাবা? সামান্য এনেছ এখানে, তাই তো? বেশিটাই ওখানে আছে, তোমার বাবার ঘরে?"

এতক্ষণ আদুল গায়ে পুরুষের হাত বুলিয়ে দেওয়া বেশ আরাম দিচ্ছিল। কিন্তু, আজ, এখন, ভাতারের প্রশ্নগুলো ধাপে ধাপে যেমন যেমন বেরিয়ে এল, ফুল্লরার দেহে গোবিন্দর হাত বিস্বাদ হয়ে উঠল। মনে বিষ উথলে উঠেছে, শরীর এখন শরীরকে ঘেন্না পাচ্ছে।

"কথা কয় না কেন রে সুন্দরী বউটা?" গোবিন্দ আদর করে থুতনি ধরে নাড়া দেয়। ফুল্লরা সেই হাত আলতো করে সরিয়ে দেয়।

গোবিন্দ চালাক মাল, মনের ভিতর হালকা ধাক্কা খায়। ফন্দি ভাবে, পাঁয়তারা কষে, কিন্তু খ্যালা শুরুতেই ভেস্তে দিলে মুশকিল আছে। অনেক দূর যেতে হবে এখন, জিততে হবে রাধামাধবের কৃপায়, হরি হে। হরিনাম জপা তার বাপের কাছ থেকে জিভে এসেছে। হরিনামে জিভ শুদ্ধ হয়।

তার মা তাকে ঢেমনা ভাবে, বিশেষ করে বিয়ে হবার পর থেকে। ভাবে, বউটা বুঝি গিলে খেয়েছে মগজ, হাতের থেকে অনেক মাইল বেরিয়ে গেছে বেটা। সেই আফসোসে যখন তখন গালমন্দ পাড়ে। নোংরা কথা বলে। বউয়ের সাথে শুবে না তাই বলে নাকি, হ্যাঁ! লাথাবে নাকি সারাবেলা নতুন বউটাকে, মায়ের মুখে হাসি ফুটাতে! এ আবার কেমন কথা!

গোবিন্দ কি অতই বোকা। মনে তারও কি রকমারি ফিকির বাসা করে না? একটু তর সইছে কেবল, রয়ে-সয়ে আছে, লেখাপড়া জানা, পয়সাবালা ঘরের মেয়ে হে বাপু, গহনা কি পয়লা রাতেই শরীর থেকে ছিনিয়ে নিবে নাকি! ধীরে ধীরে নারীর দেহে সুখ দিতে দিতে তাকে বশে আনাটাই রীতি। মিছা রক্তপাত করতে যাবে কেন। পেটের তলে নিয়ম করে সুখ দিলে নারী এমনি এমনি নেতিয়ে পড়বে। হাঙ্গামায় যাবার দরকারটা কী। মা ওসব বুঝলে তো।

তাছাড়া মায়ের জিম্মায় সমস্ত ছাড়বেই বা কে, হ্যাঁ? অত ন্যাকা হয়ে থাকলে দুনিয়ায় দু মুঠো অন্ন জুটবে না। শ্বশুর বাড়ির থেকে যাকিছু এল, সেসবে হক তো তারই বেশি। বেশি তো বেশি, সে তো বটেই, আসলে, ভেবে দেখলে পুরোটাই তো তারই হক! গহনা দিয়ে এই শেষের কালে মরার বয়সে মায়ের আবার কাজ কী।

কিন্তু ফুল্লরা এখন একটু কেমন বেজার হল বুঝি, চালাক ছোঁড়া গোবিন্দ বউয়ের আদুল গায়ে হাত বুলিয়ে অল্প অল্প টের পায়, যেন কোথাও সুর মিলছে না, কথা কেটে গেছে, স্বাদ ফুরালো হঠাৎ করে। নিশ্চিত হবার জন্য বলে, "বেশ করেছিস বাবু, সব গহনা একসাথে আনতে নেই। ধীরে ধীরে আনবিখন..."

ফুল্লরা আচমকা উঠে বসে গায়ে কাপড় টানে। "সব গহনা মানে কী গো! যত ভরি গহনা যৌতুক নিবে বলেছিল তোমাদের বাড়ি থেকে সেটুকু সবই তো এনেছি!"

গোবিন্দ চুপ করে থাকে। কত ভরির কথা হয়েছিল মনে করার চেষ্টা করে। পাঁচ, সাত নাকি দশ! শেষ অব্দি কত ভরিতে রফা হয়েছিল উত্তেজনায় এখনই মনে পড়ে না, মায়ের কাছে পরে কথায় কথায় জানতে হবে। সাবধানে, চারিদিকে শালা নানা কিসিমের ফাঁদ। আর নতুন বউটার মনে একবার সন্দেহ ঢুকে গেলে আজকাল উল্টা কেস খেয়ে যেতে কতক্ষণ। বিয়ে করে লাভবান হতে না পারলে কোন বোকা মানুষ ওসব ঝামেলায় যায় বল দেখি। দান-খয়রাত করতে চাইলে মন্দিরের বাইরে ভিখারির বাটিতে দুটো পয়সা ফেললেই তো হয়, তার জন্য বিয়ে করার কী আছে।

গলা খাকারি দিয়ে, মোলায়েম করে তখন ঠাণ্ডা মাথায় বলে, "যাক গিয়ে যাক। ওসব তো বড় কথা নয়। আমরা দুটিতে ফুলের মত ফুটে থাকব সংসারে, সারা জীবন হাসব খেলব, এটাই তো হরিমাধবের কাছে চেয়েছি রে।"
ফুল্লরা উত্তর দেয় না।
গোবিন্দ মনমরা হয়ে যায়।

ফুল্লরা তবু চুপ থাকে, আর গোবিন্দর মনমরা ভাব বেশ টের পায় ও খুশিই হয়, আবার কান্না পায় ভেবে যে বিয়ের সামান্য কদিনের মাথায় এই তবে ছিল কপালে, স্বামী গহনার লোভে ছল-চাতুরী শুরু করে বিয়ের সুখটাই ভেঙে দিবে! বিয়ে ভাঙা তো অনেক দূরের কাহিনি, সুখ ভাঙা মানে মন ভাঙা। চারিদিক যেন ডাঙা হয়ে গেল, জল নাই, ডাঙায় ছটফট লাগে, শ্বাস নিবে কোথা!

চম্পারানি দাসি ছেলে-বৌমার বন্ধ দরজার দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে গাল পাড়ে, "আদিখ্যেতার শেষ নাই! মাগী-মরদে দিনের বেলা দরজায় খিল এঁটে সুতবে কেন বাপু। আমরা কি সংসার করিনি, আমাদের কি জুয়ান বয়স ছিল না কোনও দিন। আমরা কি বাচ্চা বিয়োইনি! রাতের বেলা স্বামী স্ত্রী এক ঘরে খিল এঁটে সুতবে, সেটা সবাই জানে। তাতে দোষের কিছু নাই। কিন্তু দিনে এসব অধম্ম করে কোন ঘরের বিটি লো! সে যে কথায় আছে না, দিনে শুলে ভাতারের ঠাঁই, সেই সংসারে শান্তি নাই!"
***
সকাল সকাল বাপ-বেটা নিজেদের ফার্নিচারের দোকানে চলে গেলে চম্পারানি দাসি আর ফুল্লরা, তখন মুখোমুখি জলখাবার খেতে বসে। গোটা মুসুর সেদ্ধ আর ঘরে ভাজা মুড়ি। কাঁচালঙ্কা, তেল, পিঁয়াজ।
রুচি করে খা কেন রে বউ, ওরম ইলিম ঢিলিম করিস কেন? ফুল্লরার রকম দেখে চম্পা বলে।
ভিতরে যে ঢুকছে না মা, মনে হয় হজম হয়নি রাতের খাবার। ফুল্লরা মোলায়েম সুরে উত্তর দেয়।
সে আবার কী, জুয়ান বয়স, হজম হয়নি আবার কী কথা! রাতে ঘুম হয়নি নাকি!
বলেই, সংযত হয় চম্পা। ফুল্লরাও চুপ করে থাকে।

মুড়িতে কাঁচালঙ্কা ডলতে গিয়ে হঠাৎ ফুল্লরা এলোমেলো ছুটে বাইরে গিয়ে চোখ কপালে তুলে বমি করতে শুরু করে।

চম্পা মুড়ির বাটি ফেলে উঠে গিয়ে নতুন বউয়ের হাবভাব দেখে। তারপর ঘটিতে জল নিয়ে এগিয়ে দেয়। দিতে দিতে বলে, "বাপের ঘর থেকে পেট লিয়ে এলি নাকি লো! গায়ের হলুদ এখনও উঠল না, বমি আবার কিসের!"

বমির তরাসে ফুল্লরা এলোমেলো, খানিক দুর্গন্ধ গ্যাস বমির উপরদম চাপে পেছন দিয়েও নির্গত হয়, হয়ে কিছু শান্তি হয়, তবু জগৎ যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে আছে, বুকে-মুখে একটু বাতাস পেলে জানে আরাম হয়, তা নয়, শ্বাশুড়ি মাগী এমন প্রসঙ্গ টানল, মনে ইচ্ছে হয় বটি দিয়ে দুখান করে ফ্যালে। এই কদিনেই হাড়ে আগুন দিয়ে ছেড়েছে। ডাইনিটাকে নিয়ে সারাজীবন কাটাবে কেমন করে রে বাবা!

"বিহার আগে থেকেই সুতা-সুতি করিস নাকি লো? পুরুষ ছিল কেউ জীবনে নাকি লো হারামজাদি!"
"আপনি থেকে থেকে মুখ দিয়ে হাগেন কেন মা? ভাল কথা কি মনে আসে না আপনার? এই এখন মুড়ি খেতে দিলেন আবার এই এখন গালমন্দ করছেন যে!"
"বাপের বাড়ি থেকে পেট এনেছে যে হারামির বিটি তাকে কি পুজা করব? নাকি? আমার সচ্চরিত্র বেটাটার জীবন বেকার করে দিলি তো? মা গো! হরি হে...! কোন না কোন খানদনের রক্ত এখন আমার ঘরে ঘুরবে!"

ফুল্লরা তখন হঠাৎ মা গো বাবা গো বলে চিৎকার করে মড়া-কান্না জুড়ে দেয়।
***
সন্ধ্যাবেলা ফার্নিচারের দোকান থেকে ঘরে ফিরে গোবিন্দ তুলকালাম লাগিয়ে দেয়। গোবিন্দর মুখচোরা, নিরীহ বাপ থতমত খেয়ে ড্যাবড্যাব তাকিয়ে আমতা আমতা করে। চম্পারানি দাসি ছেলের কাণ্ড দেখে বিবর্ণ মুখে হাঁ করে থাকে আর ছুটে গিয়ে বরকে বলে "এখনও চুপ করে সাধু সেজে লেজ গুটিয়ে থাকবে? ছেলেকে যে ওই মাগী পুরোই বশ করে নিল গো এই দুই দিনের ভিতর! আমার নামে মিছে কথা লাগিয়ে কী লঙ্কাকাণ্ড বাধাল দেখছ না!"

নিমাই বলে, "এত সব ঝঞ্ঝাট আমার আর ভাল লাগে না, তোরা সংসার কর, আমি বরং সন্ন্যাসী হয়ে পথেপথে ঘুরে বেড়াই!"
আ মোলো, ওদিকে বউমা সকাল থেকে বমি করছে থেকে থেকে আর বাবু সংসার ফেলে বিবাগী হবেন!
বমি?
তা নয়ত কী বলছি? বমি কেন করে বুঝতে পারছ না? সেই কথা বলেছি বলেই তো তোমার গুণধর বেটা আকাশ মাথায় তুলেছে! যেন কেটেই ফেলবে আমাকে!
বমি তো গ্যাস অম্বল হলে হয়, এতে রাগের কী আছে! আর তুমিই বা খাপছাড়া অনাসৃষ্টি কী বকছ বল তো!
আমি খাপছাড়া কথা বলছি, নাকি তুমি একটা গবেট লোক?
শুনলাম তুমি নাকি নবর ব্যাটা গোলকের নাম ভুলে তাকে "ওই! ওইরে!" বলে সম্বোধন করেছ? পাগল আমি, নাকি তুমি হয়েছ!

তখন চম্পারানি বলে, বয়স হয়েছে, ছোঁড়া-চেংড়া মানুষের নাম ভুল হলে কি ফাঁসি দিবে নাকি!

সিধাসাধা নিমাই হঠাৎ বিচ্ছিরি রকমের আঁশটে হয়ে ওঠে, বলে, "ও... বয়স হয়েছে, তাই না? ওদিকে রসের গুরুদেবের সাথে সময়ে অসময়ে ফষ্টি করতে ছুটে যাচ্ছে আশ্রমে, তাই না? তোমার শরীর দেখে এমনি এমনি গুরুর বুকের ভিতর সুড়সুড়ি উঠছে? বয়স হয়েছে, না?"

এই কথা শুনে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য শ্রীমতি চম্পারানি দাসি তার ছেলেকে চিৎকার করে ডাকে, যে ছেলে একটু আগেই মায়ের গুষ্টি উদ্ধার করছিল আর, এমন কি, মাকেই মা তুলে গালিগালাজ করছিল পাষণ্ড, সেই ছেলে ছুটে এলো আর তখন চম্পা তাকে বলল যে দ্যাখ দ্যাখ ব্যাটা আমার কপাল, তোর বাপ আমার এই বুড়ি বয়সে আমাকে গুরুদেবের নামে কলঙ্ক দেয়!

এত শুনে গোবিন্দ হাঃহাঃ করে হাসে, যেন এবার পাগলই হয়ে যাবে আর তেড়ে এসে মায়ের চুলের মুঠি ধরে গলায় ব্লেড ঠেকিয়ে কসাইয়ের মত হাবভাব করে।

তখন নিমাই থরথর করে কাঁপে। দূর থেকে ঘটনা প্রত্যক্ষ করে আর মনেমনে ভাবে, যদি কোর্টে সাক্ষ্য দিতে যেতে হয় তাহলে ছেলেকে বাঁচানোর জন্য কথা বলবে নাকি সত্য বলবে।

তখন কিন্তু ফুল্লরা ঘরের ভিতর থেকে, যেন এইমাত্র তাকে আসরে নামতে হবে, যেন স্ক্রিপ্ট লেখাই ছিল এবং এই লোকগুলো সেই স্ক্রিপ্ট মেনেই কাজ করছে, ফুল্লরা এসে যাত্রাপালার অভিনেত্রীর মত ঝাঁপিয়ে পড়ল গোবিন্দ আর চম্পারানি দাসির মাঝে।
বলল, "স্বামী! মায়ের গায়ে হাত দিলে আমি তোমার ভাত খাব না স্বামী!"

গোবিন্দ পুনরায় হাঃহাঃহাঃহাঃহাঃহাঃ করে দমকে দমকে হেসে জবাব দেয়, "ওগো আমার প্রিয়া! তোমায় যে মাগী বাপের বাড়ি থেকে পেট করে শ্বশুর বাড়িতে ঢুকেছ বলেছে, সেই মুখরা নারীর জন্য কেন দুঃখ কর! আমাকে বাধা দিওনা, আমি এই রাক্ষাসির সংহার করব!"

তখন ফুল্লরা তার শ্বাশুড়িকে বুকে জড়িয়ে ধরে ঘরে তুলে নিয়ে যায়। যেতে যেতে বলে, “না স্বামী, না! শত অপরাধ করলেও ইনি তোমার মা!” চম্পারানি দাসি অজ্ঞান হবার ভাণ করে।
আর গোবিন্দ "বাঁড়ার বাআল!" বলে ধপ করে উঠোনে বসে পড়ে।

আর নিমাই যথাস্থানে হাত রেখে ধীরে ধীরে চুলকায় আর থরথর করে নিয়ম মাফিক কাঁপে। এমন হইচই হলে তার কথা হারিয়ে যায়।

যবনিকা পতন।
****
বউমা অজ্ঞান-প্রায় শ্বাশুড়িকে জড়িয়ে ধরে ঘরে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে সবকিছু আবার চুপচাপ হয়ে যায়। কী মন্তর করল নিমাই বুঝতে পারে না। গোবিন্দও গল্প বুঝতে চেষ্টা করে। দিন আবার আগের মত শুরু হয়।

...এতগুলো সোনার গয়না নিমাই বাপের জন্মে দেখেনি। না দেখলে কী, সে বড় দ্বিধায় জীবন কাটায় আর কোনও বিষয়েই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। একটা গলার, একটা নাকের, এক জোড়া কানের, হাতের। আঙুলেও আছে। পায়েরটা অবশ্য রূপার। এসব ভাবে আর বেশ লাগে। লাগলে তার কী, যার গহনা সে বুঝবে, তার স্বামী বুঝবে আর বুঝলে বুঝবে শ্বাশুড়ি, চম্পা। চম্পা বুঝলেই তারও বুঝেফেলা হয়, আলাদা করে আর নিজে ঝঞ্ঝাট বুঝতে যাবে কেন। বেটার বিয়ে দিয়ে নগদ আর গয়না এসেছে ঘরে, বড়লোকের বিটি আরও আনবে থরে থরে, সময় তো আর ফুরিয়ে যাচ্ছে না।

এছাড়া আরও ব্যাপার আছে। বেহাইয়ের আমের, লিচুর বাগান। সেখান থেকে বছরের ফল বস্তা বোঝাই করে আসবে নিশ্চয়। চাল আসবে, খেসারি মুসুরি ছোলা ভুট্টা সবই মেয়ের জন্য পাঠানোর রেওয়াজ থাকে। আসবে বইকি, অত উতলা হবে কেন। সোনার মুরগি, মায়ে-বেটায় একদিনে কেটে ফেলার জন্য মাথায় সংসার তুলেছে! বোকা হলে যা হয়।

কিছুদিন পর একদিন রাতের বেলা চম্পারানি দাসি নিমাইয়ের কাছে ফিসফিস করে কাহিনি ফাঁদে, "বউ বলেছে, সে ছেলেমানুষ, নিজের কাছে গহনা রাখার সাহস পায় না, বুঝলা? আসলে মেয়েটা মন্দ নয়। আমাদের গোবিন্দ ছোঁড়া একটু বেশি গোঁয়ার, কচি মেয়েটাকে কথায় কথায় শাসায়। ও আবার কী ধরণ! তুমি ছেলেটাকে শাসন করতে পারনি ছেলে বয়স থেকে, কেমন বিগড়ে গেছে না!"
"বউ তবে গহনা তোর কাছে রেখেছে?" নিমাই মিনমিন করে জানতে চায়।
"সে কোথায় রেখেছে না রেখেছে পুরুষ মানুষ পুরুষ মানুষের মত থাক কেনে! অত জেনে হবে কী? বাপ-বেটা শুধু গহনার দিকে নজর!"
"তাহলে গহনা রাখলি কোথা? তোর গুরুদেবের পায়ে রেখে আসিসনি তো? হ্যাঁ রে হারামজাদি!"

চম্পা মিটিমিটি হাসে। আজ আর নিমাইয়ের এমন খোঁচা মারা কথায় রাগ করে না। বরং বলে, "অত জানতে হবে না গো। ঘরের গহনা ঘরেই আছে। সে যে কথায় আছে না, পোঁদে থাকলে গু, বাঘ করে না টুঁ। সেই এখন হয়েছে বউমা মাগীর।"
"আর বমি করেছে?"

চম্পা এই কথার উত্তর দেয় না।
"গোবিন্দ এখন বউমার কাছে শোয়?"
এই কথারও উত্তর দেয় না চম্পা।

তখন নিমাই চুপ করে গেলে কিছু পরে চম্পারানি দাসি নিজে থেকেই বলে, গুরুদেব একটা তেল দিয়েছেন কদিন হল, বৌমার গায়ে মাখিয়ে দিবার জন্য। আমি আদর করে সেই তেল ওকে মাখিয়ে দিই রোজ। বলেছি, এই তেলে শরীরের সব জ্বালাপোড়া ঠিক হয়ে যাবে।

নিমাই বিরক্ত হয়ে বলে, এইসব ঢঙের কথা শুনে আমি কী করব, হ্যাঁ?
শুনোই না, ওই তেলে এমন গোপন দুর্গন্ধ আছে যে, পুরুষ মানুষ কাছে যেতে চাইবে না। আমাদের গোবিন্দ কাছে যেতে গিয়েও আবার মুখ ফিরিয়ে নিবে।
এ আবার কী কথা! ছেলে-বউমার মধ্যে ফাটল ধরিয়ে কিসের সুখ হবে তোর?
হবে না? এবার চম্পা গলা তোলে, হবে বইকি! ভিন্ন মরদের সাথে শুয়ে যে মাগী পেট লিয়ে আমাদের ঘরে এসে ঢুকল, তার সাথে শুবে কেন আমার বেটা?

নিমাইয়ের আবার হাত পা কাঁপতে থাকে। এই রকম সৃষ্টিছাড়া কথা শুনলে বড় নার্ভাস হয়ে পড়ে, পৃথিবীটা চিনতে পারে না। তার আর কথা বাড়ানোর সাহস হয় না।
***
সকাল বেলা ফার্নিচারের দোকানে যাবার জন্য বাপ-বেটা জলখাবার খেতে বসে। চম্পারানি দাসি খেতে দেয়।

গোবিন্দ মুড়ি চিবাতে চিবাতে বলে, "বুঝলা বাবা, তোমার বউমা বলছিল, আমাদের ঘরে নতুন সদস্য হলে শ্বশুরমশাই তাকে তিন ভরি সোনার গহনা আর একটা ছয় বিঘার আমের বাগান লিখে দিবে।"

এই কথা শুনে নিমাইয়ের আবার বুক ধুকধুক করে ওঠে, ঠোঁট কাঁপে আর হাতের মুড়ি থরথর করে।
চম্পারানি দাসি বেটার বাটিতে আরও এক হাতা মুসুর সেদ্ধ দিতে দিতে বলে, "মেয়েটার লেগে আজ বাড়ি ফিরার সময় একটা হরলিকের বোতল লিয়ে আসিস। শরীলটা ওর দুব্বল হয়ে গেছে। হরলিক খেলে শরীলে বল পাবে। ·