সাক্ষাৎকার গ্রহণ : সাথী নন্দী

পুরুষোত্তম সিংহ (১৯৯১) বিশ-একুশ শতকের বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মননচর্চার নানা প্রবণতা নিয়ে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গবেষণা ও লেখালেখি করে চলেছেন। প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে নিজের পাঠ, গবেষণা ও মননচর্চাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। ইতিমধ্যে তাঁর দশটি মৌলিক প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে দুই শতাধিক প্রবন্ধ। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘লিটল ম্যাগাজিন : অভিঘাতের অন্তর্মুখ’, ‘দেশভাগ ও উত্তরের সাহিত্য’, ‘বাংলা ছোটোগল্পে মুসলিম জনজীবন’ এবং ‘সাম্প্রতিক বাংলা উপন্যাসের গতিপ্রকৃতি (২০০০–২০২৫)’। সম্পাদনা ও গবেষণামূলক কাজের সঙ্গেও তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত, এবং তাঁর একাধিক গ্রন্থ ছাত্রপাঠ্য হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছে। গভীর পাঠ, বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি ও নিরবচ্ছিন্ন সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে তিনি সমকালীন বাংলা প্রবন্ধ-সমালোচনার জগতে ক্রমশ একটি পরিচিত নাম হয়ে উঠছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাথী নন্দী

সাথী নন্দী
যারাই এম. ফিল, পিএইচ.ডি. করেছেন বা করছেন তাদের বেশিরভাগই নিজেদের গবেষণার বিষয়কে ছাড়িয়ে অন্য বিষয়ে খুব বেশি মনোযোগী হন না। এক্ষেত্রে তুমি ব্যতিক্রম। এর কারণটা কী?

পুরুষোত্তম সিংহ
একজন প্রকৃত গবেষকের কাজ হল নিরন্তর চর্চা করে যাওয়া। নিরন্তর গবেষণা প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া। যেকোনো ক্ষেত্রের উক্ত গবেষকের কাজ হল সেই ক্ষেত্রের অকর্ষিত ভূমিগুলিকে পাঠকের সামনে তুলে ধরা। যা প্রবাহিত চর্চা থেকে ছিটকে গেছে, যা বৃহত্তর চর্চায় যেকোনোভাবেই হোক অনাবাদি হয়ে আছে, সেগুলি কেন জরুরি এবং তার গুরুত্ব কোথায় তা পাঠকের কাছে তুলে ধরা। আমি সেই কাজটাই করতে চাই, করে চলেছি। সেক্ষেত্রে পিএইচ.ডি. একটা ডিগ্রি বা একটা পথ খুলে দেওয়া। পিএইচ.ডি.এর মধ্যে সীমাবদ্ধ মানে বৃত্তকে বৃহৎ করতে চাইছে না। এমনকি বৃহৎ করার জন্য যে অনবরত পরিশ্রম, মেধা প্রয়োজন তা নেই। আর অধিক পরিশ্রম করে হবেই বা কি। পিএইচ.ডি. করে যা পাবার আমি পেয়ে গেছি। আবার পরিশ্রম করে গবেষণা কেন? প্রমোশনের জন্য সংকলিত (যা সম্পাদিত হিসেবে বর্তমানে কথিত) বই আছে। কিন্তু আমার কাছে নিরন্তর লেখা ছাড়া পথ নেই। চোখের সামনে দেখছি গুরুত্বপূর্ণ লেখক অপাঠিত, অচর্চিত হয়ে আছে। প্রবহমান বঙ্গসাহিত্যচর্চা থমকে যাচ্ছে বা বাজার যা চাইছে, বোঝাচ্ছে, বিগ হাউজ যা প্রমোট করছে তাই সাহিত্য বলে প্রচারিত হচ্ছে। এরবাইরে অজস্র মেধাবী টেক্সট ছিটকে যাচ্ছে, যার মধ্যে বাংলা সাহিত্যের মূল সুর আছে। আমি কী করব? সমস্ত ত্যাগ করে, অর্থনীতির ভিত্তিকে নড়বড়ে করে নিরন্তর লেখায় নেমে যেতে হয়। আমি এই প্রান্ত পরিসরে থেকে যেটুকু পারি, যা পারি তাই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। মাথার উপরে বা সামনে দৃষ্টান্ত হিসেবে রয়েছেন প্রাজ্ঞবান অশ্রুকুমার সিকদার, দেবেশ রায়, তপোধীর ভট্টাচার্য, রবিন পাল, সুমিতা চক্রবর্তী’র মতো ব্যক্তিরা। যাঁরা সারাজীবন সমস্ত কিছু ত্যাগ করে সাহিত্যের প্রবাহিত পথ (কোনটা সাহিত্য আর কোনটা সাহিত্য নয়, কোনটা আলোচনার যোগ্য, কোনটা বাতিল যোগ্য, কোনটা গুরুত্বপূর্ণ আর কোনটা গুরুত্বহীন) চিহ্নিত করে চলেছেন। সেই পথের উত্তরাসূরী বা আজকের চর্চা কোথায়? সেখান থেকে আমি আমার সাধ্যমত কাজ করে যাচ্ছি।

সাথী
প্রায় একশোর কাছাকাছি প্রবন্ধ, ন'টা বই এবং রয়েছে বেশ কয়েকটি সম্পদনামূলক গ্রন্থও। দৈনন্দিন নানা কর্মব্যস্ততা ও এই এত এত বই পড়া ও লেখা—এই পুরো ব্যাপারটাকে কীভাবে এডজাস্ট করো?

পুরুষোত্তম
তথ্যটা আরেকটু বেশি হবে। সেটা অন্যকথা। সে যাক। আমার জীবন সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক। সকাল সাতটা থেকে দশটা পর্যন্ত পড়ে কলেজে চলে যাই। বাড়ি এসে একটু ঘুমিয়ে নেই। মানে মাথাটাকে ঠাণ্ডা করে মনোযোগ বৃদ্ধি করে নেই। সন্ধ্যা থেকে নয়টা পর্যন্ত পড়ে হাঁটতে যাই। বাড়ি এসে সাড়ে দশটা থেকে আবার পড়ি। পড়ার সময় কোনো ফোন ধরা বা অন্যকোনো কাজ নয়। কেউ এলেও আমি পড়া থেকে উঠি না। পড়া সম্পূর্ণ হবে তারপর অন্যকাজ। সে কাজ হলেও হল না হলেও হল। সেজন্য আমার কিছু যায় আসে না, আমার জীবনের কিছু ঘটে না। পড়ার জন্য অর্থনীতির ভিত্তি, সামাজিক ভিত্তি ভেঙে ফেলেছি। আমি সব ত্যাগ করে আপাত অর্থে এক অসামাজিক মানুষ। এখানে আমার মনের অপার আনন্দ। এই আমার পূজাবেদি। এই আমার নৈবেদ্য। অসংখ্য লেখক অপঠিত, অচর্চিত হয়ে পরে আছে। ফলে আমার অবসর নেবার সময় নেই। তাদের একটা মূল্যায়ন হওয়া জরুরি। সব কাজ ফেলে দিয়ে ছন্দ বন্ধ গীত পণ্ড করে পড়ার টেবিলে বসা ছাড়া আমার কাছে অন্য পথ নেই।

সাথী :
নিন্দুকেরা বলেন যে তোমার লেখার কোয়ান্টিটি আছে কিন্তু কোয়ালিটি নেই—তাদের উদ্দেশে কী বলবে?

পুরুষোত্তম :
বলতেই পারে। স্বাধীন দেশে স্বাধীন মত প্রকাশের স্বাধীনতা সবার আছে। কে বলে, কেন বলে এর কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। অন্তত কেউ আমাকে বলেনি। তোমাকে যদি কেউ বলে সে বিশ্লেষণ করে দেখাক। তাদের উদ্দেশে আমার কিছু বলার নেই। শুধু তথ্য হিসেবে বলতে পারি উত্তরবঙ্গ থেকে অশ্রুকুমার সিকদারের পর পুরুষোত্তম সিংহ ছাড়া কেউ নেই। তথ্য বলছে। আমি কিন্তু বলছি না। বাংলা বাজারে একটা তথ্য প্রচলিত আছে বেশি লিখলে লেখা খারাপ। এমনকি এটা কিন্তু না পড়েই। পড়ার আগেই লেখক সম্পর্কে যদি একটা বিভ্রান্ত ধারণা গড়ে ওঠে তবে সঠিক বিচার হয় না। এমনকি আমাদের সাহিত্যে সমালোচনার সেই বৃত্তটাই নেই। কেন খারাপ, কেন ভুল তাকে কাউন্টার করে যুক্তি সাজানো। অথচ একদা ছিল। ফলে পাঠক ভাগ হয়ে যাচ্ছে। বিভ্রান্ত হচ্ছে। কেচ্ছাকাহিনির লেখক রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের গদ্য দেখেছ? বা তাঁর ‘রোববারের লাইব্রেরি’? তবে বোঝা যাবে মেধা কোথায়? অথচ ‘কাদম্বরীর সুইসাইট’ নোটকে ধরে আমরা তাকে বাতিলযোগ্য ঘোষণা করে রেখে দিলাম। পড়াই হল না। কোয়ালিটি, কোয়ান্টিটি কোথায় হারিয়ে গেল। অথবা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ছোটোগল্প? দেবেশ রায়ের লেখার পরিমাণ তো অনেক। তাই বলে কি খারাপ? আমার যদি কোয়ালিটিই না থাকে তবে সম্পাদকরা অনবরত চেয়ে যাচ্ছে কেন? প্রকাশক অনবরত পাণ্ডুলিপি চেয়ে যাচ্ছে কেন? নিশ্চয় কারণ আছে। যাকগে এসব কথা, সাহিত্য নিয়ে কথা বলা যাক। বরং সেটাই শ্রেয়।

সাথী
তোমার স্পেশালাইজেশন ছিল লোকসংস্কৃতি ও লোকসাহিত্য নিয়ে, অথচ সাম্প্রতিক বাংলা কথাসাহিত্য নিয়েই তোমার চর্চা ও সেখান থেকে নতুন কিছু খুঁড়ে বের করে আনা—এটা আসলে কেন?

পুরুষোত্তম :
কলেজ জীবন থেকে কথাসাহিত্য, কবিতার মধ্যে ডুবেছিলাম। এম.এ. পড়তে গিয়ে দেখি যে টেক্সটগুলো পাঠ্য সেগুলো প্রায় পড়া হয়ে গেছে। মনে হল লোকসংস্কৃতি ও লোকসাহিত্য নিয়ে পড়ি। নতুন বিষয়। পড়তে গিয়ে দেখলাম খুব বেশি জটিল নয়। আবার ফিরে এলাম কথাসাহিত্যে। লোকসাহিত্যের থেকে উপন্যাস বোঝা অনেকবেশি জরুরি হয়ে উঠল। উপন্যাসের বৃহৎ পরিসরের কাছে সময়ের অভাবে পাঠক যেতেই চায় না। সেসব নিয়ে নিরন্তর লেখা তো দূরূহ ব্যাপার। শুধু লেখা নয় কোয়ালিটিফুল লেখা। ফলে এই পরিসরে আমাকে নেমে যেতে হল। শুধু কথাসাহিত্য নয় বাংলা সাহিত্যে যা অকর্ষিত সেখানে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করি। যা বেশকিছু জটিল, যা বাংলা সাহিত্যের আউটসাইডার, যা বিগ হাউস কর্তৃক বর্জিত সেই টেক্সটের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি, বোঝার চেষ্টা করি, সাধ্যমত লেখার চেষ্টা করি। সময়ের সাহিত্যকে নিয়ে সময়েই কথা বলতে হবে। লেখকের রচনার মূল্যায়ন জীবিতকালেই হোক এটা আমি চাই। সমকালের কবিদের নিয়ে বুদ্ধদেব বসু উত্তেজিত ছিলেন। সরোজ বন্দোপাধ্যায় থেকে পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়, অশ্রুকুমার সিকদার থেকে তপোধীর ভট্টাচার্য, রবিন পাল থেকে সুমিতা চক্রবর্তী সময়ের সাহিত্য নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বলে গেছেন, যাচ্ছেন। শঙ্খ ঘোষের গ্রন্থসমূহের বেশিরভাগই তরতাজা তরুণদের উৎসর্গ করা। কেন? সাহিত্যের সময়ের প্রবাহটাকে তিনি আরো নিবিড়ভাবে নিজের কাঁধে করে বইয়ে দিতে চান।

সাথী
আমরা যাঁদের ‘প্রতিষ্ঠিত’ লেখক বলে মনে করি, তুমি তাঁদেরকে এড়িয়ে অল্প পরিচিত লেখকদের নিয়ে গবেষণায় মেতে থাকো—এর রহস্যটা কী?

পুরুষোত্তম
‘প্রতিষ্ঠিত’, ‘অপ্রতিষ্ঠিত’ এর মানদণ্ড কী? যদি উত্তর ‘পাঠক’ হয় তবে বঙ্গীয় পাঠক নিয়েও বিস্তর সন্দেহ, সংশয় আছে। বঙ্গীয় পাঠকের গুণগতমান কোনোকালেই ভালো ছিল না। নাহলে ‘মেঘনাদবধকাব্য’এর প্যারোডি লেখার সাহস হত না। ‘জাগরী’ প্রত্যাখ্যাত হত না। ‘প্রতিষ্ঠিত’, ‘অপ্রতিষ্ঠিত’ নয় আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ টেক্সট। টেক্সট গুরুত্বপূর্ণ হলে আমার আলোচনায় আসে নইলে কোনো সত্যই শিরোধার্য নয়। অন্যদিকে সমসাময়িক লেখকদের নিয়ে চর্চা একটা দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সময়ের সাহিত্য নিয়ে যদি সময়েই কথা না হয় তবে সাহিত্যকেই পিছিয়ে দেওয়া হয়। সাহিত্যের দিগন্ত ও উন্মেষপথ উদ্‌ভ্রান্ত পথহীন হয়ে পড়ে। সেই চর্চাটাই করে যেতে চাই। আপাতভাবে যাকে ‘প্রতিষ্ঠিত’ বলছ তিনি কিছুটা চর্চিত। আমি আমার স্বল্প শক্তি দিয়ে যে লেখক চর্চিত হননি তাকে নিয়ে সরব হই। ফলে সাহিত্যের প্রবাহটা কিন্তু সমানতালে বইয়ে দেওয়া গেল। মানে প্রতিষ্ঠিত, অপ্রতিষ্ঠিত দুই লেখককেই চর্চায় আনা গেল, পাঠকের সামনে তুলে ধরা গেল। এমনি সেই বৃত্তের বাইরের লেখকও যে লেখক তা বাংলা বাজারকে কান ধরে বুঝিয়ে দেওয়া গেল।

সাথী
এই লেখকদের লেখা পড়ে তোমার কেন মনে হল যে এঁদের নিয়ে চর্চা হওয়া উচিত বা বাংলা সাহিত্যে এঁরা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন?

পুরুষোত্তম সিংহ :
আগেই বলেছি আমার কাছে টেক্সট গুরুত্বপূর্ণ। টেক্সটই বিচারের একমাত্র চাবিকাঠি। কোনটা শিল্পিত টেক্সট কোনটা নয়। বাংলা সাহিত্যের ছাত্র হয়ে এবং বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে দীর্ঘকাল ঘরবসতের ফলে শিল্পিত টেক্সট চিনতে অসুবিধা হয় না। যে টেক্সটটি শিল্পিত, যে টেক্সটি প্রচলিত ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন কিছু বলছে, নতুন করে বলতে চাইছে, যে টেক্সটের বিশ্লেষণ ক্ষমতা অনেক বেশি, পাঠককে অনেকবেশি ভাবাতে সক্ষম তা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। জগৎ-জীবন-সময়-রাজনীতি-শিল্প-প্রেম-সেক্স সম্পর্কে তো সবই জানি। একজন লেখক তা কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় ট্রিটমেন্ট করছেন। সেটা লেখা হয়ে দাঁড়িয়েছে কিনা। একজন লেখক সহজ পথ ছেড়ে একটু পরীক্ষা নিরীক্ষায় গেছেন কিনা। সময়-রাজনীতি-সামাজিক ক্রিয়া সম্পর্কে কিছু জরুরি জিজ্ঞাসা উপস্থাপন করেছেন কিনা এসব জরুরি বলে গণ্য হয়ে ওঠে। ‘উত্তরবঙ্গের কথাসাহিত্য’ নিয়ে যখন বই প্রকাশিত হচ্ছে তখন এসম্পর্কিত বই নেই। তথ্য বলছে। সেসব একটা চর্চার জায়গা হয়ে উঠছে। উত্তরবঙ্গের কথাসাহিত্য (অমিয়ভূষণ, সমরেশ মজুমদার, দেবেশ রায়দের বাদ দিয়ে) নিয়ে যে ভাবা যেতে পারে, গবেষণার উপযোগী হতে পারে তা পথ খুলে দিচ্ছে। একজন প্রাবন্ধিকের তো এইখানে সার্থকতা। ঠিক তেমনি ‘দেশভাগ ও উত্তরের সাহিত্য’। কিছু বিচ্ছিন্ন প্রবন্ধ, ইতিহাস, ছিটমহল নিয়ে কথা হচ্ছে বটে কিন্তু সমগ্র হিসেবে একটা পথ খনন করে দিচ্ছে। তেমনি নিত্য মালাকার, সন্তোষ সিংহ বাংলা সাহিত্যের আর পাঁচজন প্রধান সারির কবি থেকে কোনো অংশেই কম নন। শুধুমাত্র প্রান্তিক পরিসরে থাকেন বলে পিছিয়ে থাকবেন তা মন চায়নি। নিত্য মালাকার নিয়ে আমার একক বই প্রকাশের পর প্রথম গবেষণা শুরু হচ্ছে। নিত্য মালাকার নিয়ে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথাগত গবেষণা করা সম্ভব তা ভাবাই হয়নি। তেমনি পীযূষ ভট্টাচার্য নিয়ে কিছু পত্রিকা পূর্বেই কাজ করেছে। কিন্তু তা যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথাগত গবেষণার উপযোগী এসব আমি পথ দেখিয়ে দিচ্ছি। নিরন্তর লেখা, বলা এবং কোনো কোনোক্ষেত্রে গবেষণার সংক্ষিপ্তসারের খসড়া প্রস্তুত করে দেখিয়ে দিচ্ছি কীভাবে গবেষণা সম্ভব। আর আমার জন্মভূমির গুরুত্বপূর্ণ লেখক বাংলা সাহিত্যের মূলস্বর থেকে পিছিয়ে থাকবেন একথা আমি মানতে পারি না। সেই ক্রোধ থেকেই এসব লেখার জন্ম হয়। সমস্ত ত্যাগ করে আমার স্বভূমির লেখককে নিয়ে আমি উন্মত্ত হতে ভালোবাসি।

সাথী
এই যে নতুন নতুন লেখকদের তুমি আবিষ্কার করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছো, সেক্ষেত্রে লেখক নির্বাচন কীভাবে করে থাকো?

পুরুষোত্তম
একই উত্তর ঘুরে ঘুরে আসছে (হে পাঠক ক্ষমাপ্রার্থী)। ওই টেক্সটই বিচারের মাপকাঠি। কোনো লিটল ম্যাগাজিনে একটা গল্প পড়ে চমকে গেলাম। সেই লেখক ধরে খোঁজ চালিয়ে দেখলাম যে এ আমার উপযোগী লেখক। পড়া শুরু হল। নিরন্তর চর্চার ফলে একটা বৃত্ত তৈরি হয়। সেই বৃত্তই জানান দিয়ে দেয় কোনটা পড়ার উপযোগী। দীর্ঘদিন ধরে চর্চার ফলে বাজার আপনার রুচি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়ে যাবে। তখন সেই বৃত্তের লেখক, পাঠক, সম্পাদক আপন করে নেন। কখনো প্রবন্ধ লিখিয়ে নেন। আমি যেহেতু অলস নই, আর সম্পাদকের ডেডলাইন অনুসারে লেখাটা সাপ্লাই দিতে পারি তাই সম্পাদক আমাকে হাতছাড়া করতে রাজি নন। ফলে গুরুত্বপূর্ণ টেক্সটের খোঁজ পাওয়া অসম্ভব নয়। তেমনি আমিও জানাই কোনটা ভালো লাগল, কেন ভালো লাগল। আমি তো কলকাতা থেকে অনেকদূরে থাকি। এখানে তো কলেজস্ট্রিট নেই যে বাজারে গিয়ে বই দেখব। ফলে অনেক টেক্সটেরই খোঁজ পাওয়া যায় না। আবার জীবন নিয়ে আক্ষেপ করতেও রাজি নই। যা পাচ্ছি তা দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। যা পাচ্ছি না তা অন্যকেউ কাজ করবে এই বিশ্বাস রাখি। আমি তো বাংলা সাহিত্যের ছাত্র তাই সমগ্র অংশটাই আমার চর্চার বিষয় হয়ে ওঠে। লেখক অপেক্ষা সেই লেখকের লেখা। গুরুত্বপূর্ণ লেখাটি নিয়ে বন্ধুদের জানাচ্ছি। বন্ধুরাও, বিশেষ করে অগ্রজরাও তার পাঠ সমীক্ষার বৃত্ত থেকে আমাকে উজাড় করে দিচ্ছেন।

সাথী
আচ্ছা একুশ শতকের বাংলা উপন্যাস কোন পথে যাচ্ছে অর্থাৎ উপন্যাসের বিষয়, ভাষা ও আঙ্গিকের ক্ষেত্রে কী কী পরিবর্তন তোমার চোখে পড়েছে যদি বিস্তারে বলো...

পুরুষোত্তম
হ্যাঁ একুশ শতকের উপন্যাস তার নব্যপথ খুঁজে নিয়েছে। উপন্যাস তো সময়ের প্রতিনিধি। সময় বদলের সঙ্গে সঙ্গে সময়ের মানুষ, রাজনীতি, ভাষা, সংস্কৃতি সব বদলে যায়। তার সামগ্রিক বদলটাই উপন্যাস বহন করে চলে। বিংশ শতকের উপন্যাস থেকে একুশ শতকের উপন্যাস পৃথক। বিংশ শতকের ন্যারেটিভকে সে অতিক্রম করে আসার চেষ্টা করেছে। আধুনিক যুগ অতিক্রম করে উত্তর আধুনিক যুগ চলে এসেছে। যদিও গত শতকের শেষদিক থেকেই উত্তর আধুনিকতা নিয়ে উত্তাল ঢেউ এসেছিল কিন্তু তার প্রয়োগ এই শতকে এসে ব্যাপকমাত্রায় শুরু হয়েছে। দেবেশ রায়, রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়, সাধন চট্টোপাধ্যায়, রমানাথ রায়, সুবিমল মিশ্র, অভিজিৎ সেন, রামকুমার মুখোপাধ্যায়, অমর মিত্র, কিন্নর রায়, ভগীরথ মিশ্র, নলিনী বেরা, সৈকত রক্ষিত, অনিতা অগ্নিহোত্রী, অহনা বিশ্বাস, তৃপ্তি সান্ত্রা, তৃষ্ণা বসাক, প্রতিভা সরকার, রবিশংকর বল, মধুময় পাল, অলোক গোস্বামী, পীযূষ ভট্টাচার্য, মলয় রায়চৌধুরী, অজিত রায়, সব্যসাচী সেন, শুভংকর গুহ, দেবর্ষি সারগী, চিরঞ্জয় চক্রবর্তী, আনসারউদ্দিন, সোহারাব হোসেন, রাজা সরকার, সুকান্তি দত্ত, আশিস মুখোপাধ্যায়, তপনকর ভট্টাচার্য, গৌতম মুখোপাধ্যায়, স্বপন পাণ্ডা, হিরণ্ময় গঙ্গোপাধ্যায়, বিপুল দাস, দেবজ্যোতি রায়, অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়, সঞ্জীব নিয়োগী, প্রলয় নাগ, বনমালী মাল, রিপন হালদার, শতদল মিত্র, শান্তনু ভট্টাচার্য, সাদিক হোসেন, মণিশংকর, অনির্বাণ বসু, অনুপম মুখোপাধ্যায়রা বিচিত্র বীক্ষণে, বিচিত্র ভাষায়, বিচিত্র উপস্থাপনে, জটিল তাত্ত্বিকভাষ্যে উপন্যাসের নব্য পরিমণ্ডল গড়ে তুলছেন। বহু নাম বাদ চলে গেল, পাঠক ক্ষমাপ্রার্থী। উপন্যাসের ভাষা যেমন বদলে গেছে তেমনি আকারও বদলে গেছে। আজ নভলেট আর নভেলের তেমন প্রভেদ নেই। আজকের উপন্যাস অনেকবেশি তাত্ত্বিক অনেক বেশি প্রশ্নপ্রবণ। বিশ্ব রাজনীতি তার এক্তিয়ারে ঢুকে গেছে। তা অনেকবেশি আক্রমণাত্মক। সংস্কৃতির পরিবর্তনশীলতা চিহ্নিতকরণে তা অনেকবেশি দায়িত্বশীল। সহজপাচ্য রগরেগ প্রেম, যৌনতা, থ্রিলার লেখাও আছে। আমি সেদিকে যাচ্ছি না। পাঠক হিসেবে আমি উপন্যাসের যে সমীকরণে বিশ্বাস করি তা ধরেই বলছি। উপনিবেশ অতিক্রান্ত একুশ শতকের বাঙালি ঔপন্যাসিক আজ শিকড় সন্ধানে আত্মমগ্ন হয়েছে। উপনিবেশের হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতিকে সে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। দেবেশ রায়, ভগীরথ মিশ্র, রামকুমার মুখোপাধ্যায়, নলিনী বেরা, কিন্নর রায়, সোহারাব হোসেনদের দেশজ-লোকজ ঘরানা বাংলা উপন্যাসের মোড় ফিরিয়েছে।

সাথী
আর এই সময়ে দাঁড়িয়ে যে সমস্ত গল্প লেখা হচ্ছে সেখানেও কী বিংশ শতাব্দীর শেষ তিন দশকের তুলনায় খুব বেশি পরিবর্তন চোখে পড়ছে?

পুরুষোত্তম
অবশ্যই পরিবর্তন চোখে পড়ছে। তার ভাষা, বীক্ষণ, উপস্থাপন, মুন্সিয়ানা সম্পূর্ণ ভিন্ন। হ্যাঁ পুনরাবৃত্তিও কম নেই। যদিও আগেই বলেছি টেক্সটই আমার কাছে গ্রহণযোগ্য। ফলে বহু লেখক বাতিলও হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বায়ন, ভোগবাদ, পুঁজিবাদ, উত্তর আধুনিকতা, তার রাজনীতির ভয়াল কালো অন্ধকার তার সাহিত্যকেই বদলে দিয়েছে। সময় যত ক্রূর লোভী অন্ধকারময় ধ্বংসাত্মক হবে তার সাহিত্যও তত শক্তিশালী, প্রবল হবে। সময়কে ছিন্নভিন্ন করে আজকের বাংলা গল্প এগিয়ে চলেছে। সে অনেকবেশি দায়বদ্ধ। সেক্স-যৌনতা-দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন-অন্ধকার-মধ্যবিত্ত ট্যাবু-রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস-প্রেম-পরকীয়া-ভণ্ডামি-শঠতাকে সে বিচিত্র কায়দায়, বিচিত্র ভাষায়, বিচিত্র মুন্সিয়ানায় উপস্থাপন করে চলেছে। বিশ্বায়ন-ভোগবাদ-পুঁজিবাদের ভয়াল অন্ধকার বাংলা গল্পকে আরো খতরনাক করে তুলেছে। শুধু গঠনরীতি বদল নয় জাদুবাস্তবতা, মায়াবাস্তবতা, কুহক বাস্তবতা বাংলা গল্পের মানদণ্ডকে ভিন্ন সমীকরণে নিয়ে গেছে। সময়ের রাজনীতির যত পচন ধরে তার সাহিত্য তত তীক্ষ্ণ হয়। বাংলা গল্পে তার সমস্ত পরিসর ভেঙে আজ যেমন আক্রমণাত্মক তেমনি পরিশীলিত সমীকরণ ভেঙে বিশ্বসংসারকে পাঠকের কাছে তুলে দিয়েছে। অ্যাবসার্ড, প্লট নিয়ে ভাঙাচোরা, ছিন্নসূত্র, অবভাসের নতুন ছক, উপস্থাপনের অভিনব ভঙ্গি বাংলা গল্পকে নবমাত্রা দান করেছে। শহীদুল জহির, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, আশিস মুখোপাধ্যায়, চিরঞ্জয় চক্রবর্তী, অলোক গোস্বামী, সুকান্তি দত্ত, শুভংকর গুহ, সব্যসাচী সেন, স্বপন পাণ্ডা, কণিষ্ক ভট্টাচার্য, সাদিক হোসেন, অনির্বাণ বসু, ইন্দ্রাণী দত্ত, বনমালী মাল, শান্তনু ভট্টাচার্য, শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য, শমীক ষান্নিগ্রাহী, অলোকপর্ণা, শুভ্র মৈত্র ইত্যাদি প্রভৃতি অজস্র নাম মনে ভেসে আসছে। প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র অভিপ্রায়ে বাংলা গল্পকে নতুনখাতে বইয়ে দিচ্ছেন।

সাথী
এ সময়ের বাংলা গল্প-উপন্যাসের প্রবণতা বা বৈশিষ্ট্যগুলো আসলে কী?

পুরুষোত্তম
এইসময়ের উপন্যাসে দেশভাগের একটা প্রবণতা রয়েছে। একুশ শতকে জীবনীকেন্দ্রিক উপন্যাস লেখার একটা প্রবণতা এসেছে (সমীরণ দাস, অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী, অভিজিৎ চৌধুরী)। কেউ কেউ ফর্ম নিয়ে অধিক সচেতন (মলয় রায়চৌধুরী, সুবিমল মিশ্র, অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়)। বাঙালির শিকড়ের খোঁজে নেমেছেন কেউ কেউ। সেখানে দেশীয় কথনরীতির ফর্মকে বেছে নিয়েছেন (দেবেশ রায়, ভগীরথ মিশ্র, রামকুমার মুখোপাধ্যায়, সোহারাব হোসেন, স্বপন পাণ্ডা)। যৌনতা নিয়ে বাঙালির ট্যাবুকে ভেঙে ফেলেছেন কেউ কেউ। বলা ভালো যৌনতা-ক্ষমতা-সন্ত্রাসকে নানা আঙ্গিকে বুনন করেছেন (মলয় রায়চৌধুরী, সুবিমল মিশ্র, অজিত রায়, অনুপম মুখোপাধ্যায়, অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়, সঞ্জীব নিয়োগী)। অস্তিত্ববাদ নিয়ে অধিক সচেতন (অলোক গোস্বামী, সব্যসাচী সেন, অশোক অধিকারী, তপনকর ভট্টাচার্য) একুশ শতকের নিম্নবর্গের জীবনচিন্তা, বিবর্তন নিয়ে বিশেষ ভাবনা দেখেছি অভিজিৎ সেন, ভগীরথ মিশ্র নলিনী বেরা, সৈকত রক্ষিত, শুভংকর অহনা বিশ্বাস, মণিশংকর, লুৎফর রহমানের মধ্যে। ভাষা নিয়ে বিশেষ ভাবনা দেখেছি দেবেশ রায়, রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়, মধুময় পাল, লুৎফর রহমান। সংবেদনশীল, শুভচেতনা, কল্যাণবোধের আখ্যান লিখেছেন আনসারউদ্দিন, চিরঞ্জয় চক্রবর্তী, সোহারাব হোসেন। রাষ্ট্রকে সরাসরি আক্রমণ করে আখ্যান রচনা করেছেন সুবিমল মিশ্র, মধুময় পাল, রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবজ্যোতি রায়। বিশ্বায়ন, পুঁজিবাদ, ভোগবাদ, সময়ের বিবর্তন নিয়ে বিশেষ ন্যারেটিভ গড়ে তুলেছেন সাধন চট্টোপাধ্যায়, অমর মিত্র, সুবিমল মিশ্র, দেবর্ষি সারগী। নারীদের কথা নিয়ে বিশেষভাবে সরব হয়েছেন অনিতা অগ্নিহোত্রী, অহনা বিশ্বাস, তৃষ্ণা বসাক, সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তন্বী হালদার। প্রান্তিক নারীদের কথা পাই অহনা বিশ্বাস, আয়েশা খাতুনের লেখায়। আছে বাজার চলতি ধারা। তৃতীয় ভুবনের লেখকদের ন্যারেটিভে আরেক সমস্যা ও প্রবণতার কথা লক্ষ করা যায়। এসব নিয়ে বিস্তারিত লিখেছি, আমার বিভিন্ন প্রবন্ধগুলি পড়লেই পাঠকের সম্পূর্ণ ধারণা হয়ে যাবে। পাঠককে বলব ‘ট্রাপিজ’ পত্রিকায় আমার ‘সাম্প্রতিক বাংলা উপন্যাসের গতি-প্রকৃতি’ প্রবন্ধটি পড়ে নিতে।

সাথী
সাতের দশকে যে সমস্ত কথাসাহিত্যিকদের আবির্ভাব হয় তাঁদের বেশিরভাগই ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েও লিখে চলেছেন। ফলে তাঁদের পূর্বের ও এখনকার লেখার মধ্যে বিষয়ে বা ভাষায় পার্থক্য খুঁজে পেয়েছো? পেলে সেটা কীরকম?

পুরুষোত্তম
ভাষা তো ক্ষমতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। সময় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। যে সময়ের মূল্যবোধ, জীবনচেতনা পচে যায়, ভাঙন ধরে তার ভাষাও পচে যায়, বিকৃত হয়ে যায়। আবার তেমনি পচা দগ্ধ সময়ের আলেখ্য অঙ্কন শুদ্ধ ভাষায় অসম্ভব। দুর্বৃত্তায়নকে ক্রোধী ভাষায় আক্রমণ করতে গিয়ে ভাষার স্তর যেমন বদলে যায় তেমনি ভাষার শুদ্ধ কাঠামোও ভেঙে যায়। তেমনি বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাষার মাত্রাকাঠামো সংযুক্ত। যেমন ধরো অমর মিত্র গত শতকের সাতের আটের দশকে যখন জমি, জমি সংলগ্ন মানুষ, জমিকে কেন্দ্র করে গ্রাম্যজীবনের রূপরেখা যখন অঙ্কন করছেন তখন জমি-বর্গা-সেটেলমেন্টের আইনি পরিসর-দলিল-পরচা-খতিয়ানের ভাষা এসে যাচ্ছে। সেই লেখক যখন একুশ শতকে এসে ‘ভুবনডাঙা’ আখ্যান লিখছেন তখন ফেসবুকের ভাষা ব্যবহার করছেন। এখানে বিষয়ের সঙ্গে ভাষা বদল জরুরি হয়ে উঠছে। আবার স্বপ্নময় চক্রবর্তী যখন ‘চতুষ্পাঠী’ আখ্যান লিখছেন তখন সংস্কৃত চর্চা, উপমা, টোলর যে ভাষা ব্যবহার করছেন তেমনি এ শতকে এসে ‘গণমিত্র’ যখন লিখছেন তখন চিকিৎসা বৃত্তের ভাষা ব্যবহার করেছেন। নলিনী বেরা গতশতকের লেখায় সুবর্ণরেখা তীরবর্তী অঞ্চলের লোকায়ত কথ্য ভাষা ব্যবহার করছেন, সেই লেখক এ শতকে এসে যখন ফ্রান্স নিয়ে লিখছেন তখন ভাষা ভিন্ন। গত শতকের সাতের দশকে লিখতে আসা সাধন চট্টোপাধ্যায়, ভগীরথ মিশ্র, ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, নলিনী বেরা, কিন্নর রায়, অমর মিত্র, আশিস মুখোপাধ্যায়রা এখনও লিখে চলেছেন। ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায় যেহেতু একই বৃত্তের মধ্যে (ডায়মন্ডহারবার সংলগ্ন সুন্দরবন ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল) সারাজীবন রয়েছেন তাই ভাষার তেমন বদল ঘটেনি। আবার আশিস মুখোপাধ্যায়রা শুরু থেকেই ভাষার মধ্যে একটা ঘোর, মগ্নতা, রূপক, সংকেত ব্যবহার করে ভাষার একটা নির্দিষ্ট মানদণ্ড বাজায় রেখেছেন, তা আজও বজায় আছে। সেটাই তাঁর ফর্ম বলা যেতে পারে। পীযূষ ভট্টাচার্য এক কাব্যময়তায় গভীর মগ্নতায় উপনিবেশ-উপনিবেশ উত্তর ইতিহাস-ভূগোল-সংস্কৃতি-মিথ-ইতিহাস মিলেমিশে নতুন ভাষা গড়ে উঠেছে। আবার স্বপ্নময় চক্রবর্তীর লেখায় প্রথম থেকেই ব্যঙ্গ বিদ্রুপ, শ্লেষ, ঠাট্টা লক্ষ করে এসেছি। তা সময় অন্তর আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। শতদল মিত্র আলগা চালে অনড়ম্বরভাবে ব্যঙ্গ শ্লেষে মধুর ভাষা বয়ন করেছেন। যা আমাদের আঘাত করে না ঠিকই কিন্তু লক্ষ আমরাই। তাঁর গ্রামজীবনের লেখা থেকে মেটিয়াবুরুজকেন্দ্রিক আখ্যানের ভাষা ভিন্ন। আবার রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায় যখন শংকর বসু নামে লিখেছেন তখন সাধারণ ভাষাতেই লিখেছেন। কিন্তু এ শতকের ভাষায় মজা মশকরা, শ্লেষ বিদ্রুপে ভরিয়ে দিয়েছেন। যত দিন যাচ্ছে মধুময় পালের ভাষা সচেতনতা তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেখানে যেমন মাধুর্য আছে তেমনি অন্ধকারকে তীব্র কাষাঘাতে আক্রমণ আছে। অথচ তা এমনই পেলব, এমনই সৌন্দর্যময় যে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।

সাথী
অমর মিত্রের কথাসাহিত্য নিয়ে তো তুমি গবেষণা করেছো, জানতে ইচ্ছে করছে অমর মিত্র তাঁর সমসাময়িকদের থেকে কোথায় আলাদা? আর বর্তমান সময় দাঁড়িয়ে অমর মিত্রের লেখার প্রাসঙ্গিকতাই বা কোথায়?

পুরুষোত্তম
এর জন্য পাঠককে বলব আমার পিএইচ.ডি থিসিসের উপসংহারটা পড়ে নিতে। সেখানে খুব গুছিয়ে লিখেছি। গুগল খুঁজলেই তা পাওয়া যায়। অমর মিত্র এই সময়ে দাঁড়িয়ে একজন উল্লেখযোগ্য কথাকার। বলা যেতে পারে আজকের বাংলা কথাসাহিত্য যে বরিষ্ঠ কথোয়ালদের উপর দাঁড়িয়ে আছে তাদের মধ্যে অন্যতম। প্রসঙ্গত একইসঙ্গে স্মরণীয় সাধন চট্টোপাধ্যায়, ভগীরথ মিশ্র, অভিজিৎ সেন, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, কিন্নর রায়, নলিনী বেরা, মধুময় পাল, রামকুমার মুখোপাধ্যায়, অনিতা অগ্নিহোত্রী, সৈকত রক্ষিত, সদ্য প্রয়াত পীযূষ ভট্টাচার্য। আট, নয়ের দশক ধরে বহু লেখক ধীরে ধীরে আসবেন। সঙ্গতভাবেই স্মরণ করতে হয় মধুময় পাল, রবিশংকর বল, আনসারউদ্দিন, সোহারাব হোসেন, শুভংকর গুহ, সুকান্তি দত্ত, সমীরণ দাস, গৌতম মুখোপাধ্যায়, অনিশ্চয় চক্রবর্তীদের কথা। অমর মিত্র বিচিত্র বিষয়সজ্জা, বিচিত্র ভঙ্গি, ভাষা কাঠামো, দেশকাল সময় সম্পর্কে নিপুণ জ্ঞান পৃথক করে তুলেছে। ইতিহাস, মিথকে বিনির্মাণে নব্য বয়ানে ভাসিয়েছেন। জমি দানপত্রের যে আইনি ভাষা গল্পের ফর্ম হতে পারে তা তিনিই প্রথম দেখিয়েছিলেন। ছিটমহল নিয়ে প্রথম উপন্যাস লিখেছেন এইবঙ্গে। ময়মনসিংহ গীতিকাকে আলেখ্যে রেখে নব্য ফর্মের উপন্যাস লিখেছেন। ‘ধনপতির চর’, ‘অশ্বচরিত’ বিশ্বসাহিত্যে স্থান পাবার উপযোগী। ‘দশমী দিবসে’, ‘ধ্রুবপুত্র’ বাংলা সাহিত্যে অন্যতম ক্লাসিক উপন্যাস। প্রত্যেকটি লেখকের বিষয়গুণ, উপস্থাপন, ভাষা, জীবনদৃষ্টির উপর আখ্যান যেমন দাঁড়িয়ে থাকে তেমনি স্বতন্ত্রতা স্পষ্ট হয়। কর্মজীবনের জমি-মানুষ-সেটেলমেন্ট-খতিয়ান-বর্গা-আইনি অভিজ্ঞতা বিস্তরভাবে কাজে লাগিয়েছেন। সেইসঙ্গে বিচিত্র ফর্মে যেমন লিখেছেন তেমনি সময়ের বিবিধ সত্যকে নানাভঙ্গিতে উপস্থাপনের দক্ষতা তাকে পৃথক করে তুলেছে। সময়ের সঠিকমাত্রাকে তিনি বিবিধ বয়ানে যেমনভাবে সাজিয়েছেন তা আজকের বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁকে অন্যতম গ্রহণযোগ্য কথাকারে পরিণত করেছে। তবে শুধু অমর মিত্র নিয়ে বললে হবে না উপরে যে নামগুলো বললাম এবং আরো পূর্বে যে নামগুলো বলেছি তারা সকলেই বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম কথাকার। আজকের বাংলা কথাসাহিত্যের তিনি অন্যতম অভিভাবক বলতে চাই। তিনি যেভাবে অনুজ ও সমকালের লেখা পড়েন এবং জানান তা বঙ্গসাহিতের বিশেষ উপকার করে। অন্যরা সমানভাবে এই কাজ চালালে বাংলা সাহিত্য আরো লাভবান হত।

সাথী
বাংলা কবিতা নিয়েও তোমার বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রয়েছে। তোমার দৃষ্টিতে কবিতার বাকবদল কীভাবে হচ্ছে?

পুরুষোত্তম :
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্য বদলে যায়। তার ফর্ম, বিষয়সজ্জা, আঙ্গিক, উপস্থাপন, দৃষ্টিভঙ্গি সব বদলে যায়। তেমনি কেউ কেউ সময়ের থেকে এগিয়ে থাকে, এগিয়ে ভাবে। আবার কেউ কেউ চর্বিতচর্বণে ভেসে যায়। নয়ের দশকের কবিতা থেকে শূন্য দশকের কবিতা বদলে গেছে। আবার শূন্য দশক থেকে প্রথম দশকের কবিতা বদলে গেছে। কবিতার ভাষা, শব্দ উপমা বদলে গেছে। আবার সাতের, আটের দশকে লিখতে আসা কবিরাও এখন লিখছেন। ফলে একজন কবি তো সারাজীবনই ফর্ম, বিষয়, ভাষা, উপস্থাপন, নান্দনিকতা নিয়ে ভাবেন, এমনকি বদলে বদলে যান। আবার অনেক কবির এক একটা স্টেজ থাকে। জয় গোস্বামীর যে কবিতা গত শতকে পেয়েছি তা আজ আর নেই। এমনকি আজ জয় গোস্বামী, সুবোধ সরকার কী লেখেন তা নিয়ে বেশ সন্দিহান। এমনকি আজ তার কাব্যমূল্য কোথায় তা তো খুঁজে পাই না। গুজরাট, কেরালা, উত্তর প্রদেশে কিছু হলে সঙ্গে সঙ্গে রাজকবির মতো কবিতা লিখে ফেলেন অথচ রাজ্যে ঘোরতর অন্যায়, অত্যাচার চোখেই পড়ে না। আবার সন্তোষ সিংহ জীবনের প্রতিটি পর্বে কবিতার এক একটা স্টেজে, ফর্মে বিচরণ করছেন। নিত্য মালাকারের কবিতায় প্রথম দিকে যে আত্মঘাত, নৈরাজ্যবাদ, ভাষার মাধুর্য, জিঘাংসা বৃত্তি, অবক্ষয়বাদের বিরুদ্ধে তীব্র আর্তনাদ পরের দিকে তা এক রোমান্টিসিজমে ভেসে গেছে। রাজা সরকারের কবিতায় যে নৈরাজ্যবাদী চেতনা, অন্তর্ঘাত, সময়ের নির্মম সন্ত্রাসকে তীব্র আক্রমণ, অন্ধকার, সময়কে শুশ্রূষা দেবার প্রবল চেষ্টা তা আজকের কবিতায় একটা শুভবোধে, আত্মচেতনা জাগরণে, জীবনযুদ্ধের জয়-পরাজয়ের ভাষ্যে ভেসে গেছে। আবার জহর সেনমজুমদারের কবিতায় ফর্ম, অস্তিত্ববাদ, জিজ্ঞাসা, জীবননাট্যের বহুরূপী বৃত্তায়নের বারবার বদল ঘটেছে কিন্তু লোকায়ত শব্দবিন্যাসের কিন্তু খুব বেশি বদল ঘটেনি। বাঙালি জীবনের আবহমান সত্য, মিথ, লোকায়ত বাংলা, বাংলাদেশের জীবনপ্রণালীর অন্তরের আর্তনাদকে তিনি বড় বেশি টেনে ধরেন। অভিধানিক শব্দকে বাংলা কবিতার ঘর-বাহিরে সাজিয়ে দেন। আবার যৌনতার ভাষা, যৌনতার অলিগলি, খিস্তি খেউড়ে বাংলা কবিতার ভিন্ন গড়ন গড়ে তুলেছেন মলয় রায়চৌধুরী, সব্যসাচী সেন, অনুপম মুখোপাধ্যায়। অবশ্যই স্মরণ করতে হবে রোদ্দুর রায়ের মোক্সা কবিতার কথা। নৈরাজ্যবাদ, অন্ধকারচেতনা, জগৎ জীবনের কদর্যরূপকে দেখার অভিপ্রায়ে কবিতার শরীর থেকে আবেগাত্মক ভাষা ত্যাগ করে নিটোল রূপ দান করেছেন শৈলেশ্বর ঘোষ, অরুণেশ ঘোষ, দেবজ্যোতি রায়। কবিতার অন্তর্ঘাত সেখানে অনেক বেশি। রণজিৎ দাশ থেকে অরণি বসু, তপোধীর ভট্টাচার্য থেকে সুধীর দত্ত, অমর চক্রবর্তী থেকে বিভাস রায়চৌধুরী, প্রজিত জানা থেকে সৈয়দ কওসর জামাল, ঋজুরেখ চক্রবর্তী থেকে হিন্দোল ভট্টাচার্যের ভাষা, কাব্য মাধুর্য বারেবারে বদলে যাচ্ছে। এইমুহূর্তে অজস্র নাম মাথায় আসছে—আশিস সরকার, কৌশিক জোয়ারদার, বিজয় দে, অনুরাধা মহাপাত্র, বল্লরী সেন, তৈমুর খান, মলয় রায়চৌধুরী, প্রবুদ্ধসুন্দর কর, উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায়, রাণা রায়চৌধুরী, শতানীক রায়। আমি বিচ্ছিন্ন কিছু নাম বলে গেলাম। এঁদের ধরে ধরে, দশক ধরে ধরে দেখানো যায় কবিতার ভাষা, ফর্ম, জীবনচেতনা, কাব্যবোধ কীভাবে বদলে যাচ্ছে।

সাথী
বর্তমানে বাংলা সাহিত্যের যে পরিসর, সেখানে দাঁড়িয়ে তুমি কোন কোন লেখকদের নিয়ে আশাবাদী?

পুরুষোত্তম :
অনেক নাম করা যায়। কিন্তু করছি না। কেন? কারণটা বলি। আজ থেকে সাত আট বছর আগে এক তরুণ লেখক নিয়ে আমি খুব উৎসাহিত হয়ে পড়েছিলাম। বইটি নিয়ে লিখলাম, মানুষজনকে পড়ালাম, বললাম কিন্তু কিছুদিন পর তিনি বিজেপি রাজনীতিতে যোগ দিলেন। আশাহত হলাম। একজন দরিদ্র লেখক নিয়ে আমরা তখন ভীষণ উত্তেজিত, তার সংকট নিয়ে কথা বলছি, রাজ্য সরকারের কাছে আবেদনও জানানো হচ্ছে, হঠাৎ করে তিনি তৃণমূল রাজনীতিতে দাঁড়িয়ে বিধায়ক হয়ে গেলেন। কাকে নিয়ে আশাবাদী হবেন? এখানে নাম ঘোষণা করার পর দেখা গেল তিনি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাষ্ট্র, ক্ষমতা, অনৈতিকতার পূজারি হলেন। তখন তো আমাকে দোষারোপ করবেন আমার পাঠকরা। তবে একজন লেখক যে রাজনীতিই করুক যদি ভালো লেখেন তবে বাংলা সাহিত্যের পক্ষ নিয়ে সোচ্চার হওয়া যায়। যেমন ধরুন দেবেশ রায় আমার প্রিয় লেখক। অথচ ব্যক্তিজীবনে অনেক অসংগতি আছে, রাজনীতি, স্বার্থ, উদ্দেশ্য নিয়ে অনেক দ্বিচারিতা আছে। সেসব বাদ দিয়েও তিনি আমার প্রণম্য লেখক। বাংলা উপন্যাসের প্রয়োজনে বারেবারে পড়া উচিত দেবেশ রায়। আবার ধরা যাক মলয় রায়চৌধুরীর কথা। বাংলা উপন্যাসের এক জবরদস্ত ঔপন্যাসিক মলয় রায়চৌধুরী। প্রবন্ধের ক্ষেত্রে নতুন চিন্তাভাবনা জোগানদাতা। অত্যন্ত মেধাবী এবং সাহিত্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সাহসী। অথচ হাংরি আন্দোলন নিয়ে তিনি বড় বেশি মিথ্যা কথা বলেন। কীভাবে মেলাবেন? কীভাবে আশাবাদী হবেন? আবার চাকরি ছেড়ে লিখতে এসে অজিত রায় ‘ধানবাদের ইতিহাস’ লেখার জন্য মাফিয়াদের অত্যাচারে ঘর ছাড়তে হল। পাঠক কতটুকু সাহায্য করল? কেবল অর্থের অভাবেই অকালে চলে গেল বাংলা গদ্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। পাঠক হিসেবে আমরা কী করতে পারলাম? বাংলা বাজারে তো লিখে ভাত কাপড়ের সংস্থান হয় না তাই একজন লেখকের বিচ্যুতির জন্য কতখানি অপরাধী করা যায়? যায় কি? আবার মধুময় পাল, শুভংকর গুহ, সব্যসাচী সেনরা সমস্ত আর্থিক অনটন দূরে রেখে কলম যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। সাধারণ মানুষের মতো লেখকও তো রক্ত মাংসের জীব। তবে সে কখন লোভে আত্মমর্যাদা বিসর্জন দেয় কে জানে। বরং বলা যেতে পারে লেখকের তুলনায় লেখকের লেখা নিয়ে বেশি আশাবাদী হওয়া যায়। আবার কেউ কেউ সারাজীবন সৎ থেকে গেছেন। নিজের প্রতিবাদী আবস্থান বজায় রেখেছেন। রামকুমার মুখোপাধ্যায়, মধুময় পাল, কিন্নর রায়, অমর মিত্র, অলোক গোস্বামী, শুভংকর গুহ, সুকান্তি দত্ত, অনিশ্চয় চক্রবর্তী, প্রজিত জানা, সৈয়দ কওসর জামাল, অনিতা অগ্নিহোত্রী, অহনা বিশ্বাস, সব্যসাচী সেন, কৌশিক জোয়ারদার, স্বপন পাণ্ডা, অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়, অনুপম মুখোপাধ্যায়। আরো একাধিক নাম করা যায়।

সাথী :
তুমিতো লিটল ম্যাগাজিন-এ লেখক। বর্তমান সময় দাঁড়িয়ে লিটল ম্যাগাজিন- এর প্রয়োজনীয়তা কতটা অনুভব করছো?

পুরুষোত্তম :
লিটল ম্যাগাজিনের প্রয়োজনীয়তা ছিল, আছে, থাকবে। লিটল ম্যাগাজিন তো লেখক তৈরির আঁতুড়ঘর। সে রাষ্ট্রের বিরোধী অবস্থানে থাকে। একজন লেখকের রাষ্ট্র বিরোধী আখ্যানের জন্য তো লিটল ম্যাগাজিন জরুরি। রাষ্ট্রের যাবতীয় দুর্বৃত্তায়ন তো বাজারি পত্রিকা প্রকাশ করতে পারে না কেননা তার মূল উদ্দেশ্য ব্যাবসা। কিন্তু লিটল ম্যাগাজিন বাণিজ্য উপেক্ষা করে রাষ্ট্রকে যেমন আক্রমণ করে তেমনি সাহিত্যের প্রকৃত অবস্থান বজায় রাখে। পরীক্ষা নিরীক্ষা করার যথার্থ স্থল লিটল ম্যাগাজিন। লিটল ম্যাগাজিন ঝুঁকি নিতে জানে। সমান্তরাল সংস্কৃতির বিপরীতে গিয়ে সে নতুন কিছু করতে চায়। যদিও আজ বহু লিটল ম্যাগাজিন সমান্তরাল সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে উঠেছে। বাণিজ্যিক পত্রিকার ধরতকতা মার পেরেক হয়ে উঠেছে। তবে এখনো ধৈর্যশীল, মেধাবী, নিরীক্ষণমূলক সম্পাদক আছেন। আসলে লিটল ম্যাগাজিনই সাহিত্যের ধারক বাহক। চর্বিতচর্বনের বিরুদ্ধে গিয়ে সে নতুন কিছু করার ক্ষমতা রাখে। সে পথ দেখায়। সংকটও আছে। লিটল ম্যাগাজিনের পাশে আজ ট্যাগ লিস্ট সংযুক্ত বিবিধ জার্নাল বাজারে এসেছে। যা একধরনের পাঠক মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, ছাত্র দ্বারা চলছে। বিশেষ সংখ্যা সমন্বিত জার্নাল পাঠকের রুচিবোধকে যেমন সীমিত করে দিচ্ছে তেমনি সেখানে সৃজনশীল সাহিত্য অনুপস্থিত। এযাবৎকাল সাহিত্যের প্রতিস্পর্ধী স্বর কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনই গড়ে তুলেছে। তোমার জেলার অমিয়ভূষণ মজুমদারের সারাজীবনের লেখালেখি কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনকেন্দ্রিক। তোমার জেলার জীবতোষ দাস কখনো রিকশা চালিয়ে, ফুটপাতে দোকান দিয়ে ‘রোবট’ পত্রিকা প্রকাশ করে গেছেন। আজকের সব্যসাচী সেন কীভাবে পত্রিকা প্রকাশ করে জানো? নিজে অন্যের দোকানে ডি.টি.পি করে। নিজের রক্ত বিক্রি করে, অন্যের বাড়িতে ভৃত্যের কাজ করে অর্জিত অর্থ দিয়ে পত্রিকা প্রকাশ আমাদের লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাস। যতদিন বাংলা সাহিত্য থাকবে ততদিন লিটল ম্যাগাজিনের প্রয়োজনীয়তা থাকবে। তবে আজ লিটল ম্যাগাজিন বেশ সংকটের মুখে। গোটা সাহিত্যের বাজারই তো সংকটের মুখে। হ্যাঁ ব্যাবসা হচ্ছে, লিটল ম্যাগাজিনও ব্যাবসা করছে বেশ ভালোই। আসলে পাঠকের অভিরুচি বদলে গেছে। মানুষের সামনে বিনোদনের নানা উপকরণ চলে এসেছে। আজ একদল সম্পাদকের কাছে লিটল ম্যাগাজিন হল চ্যানেল তৈরির হাতিয়ার। এসব বাদ দিয়েও আজও লিটল ম্যাগাজিন তার দায়বদ্ধতা পালন করে যাচ্ছে। আমি তো বেশ উজ্জীবিত। আশাহত হবার কোনো কারণ দেখি না।

সাথী
আচ্ছা বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে রাজনীতি বিষয়টাকে তুমি কীভাবে দেখছ?

পুরুষোত্তম
আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে রাজনীতি মূল্যবোধহীন দুর্বৃত্তায়ন পঙ্কিল ব্যাভিচারে পরিপূর্ণ। ন্যায়নীতি, আদর্শ, জীবনচেতনা বলে কিছু নেই। আছে ক্ষমতায় টিকে থাকতে ভিত্তিহীন কিছু পরিকল্পনা। যা শুধু হাস্যকরই নয় ভবিষ্যতহীন। একটা নীতিহীন, আদর্শহীন, রাজনৈতিক দর্শন শূন্য, হঠকারী, ধর্মীয় ভেকধারী সরকার চলছে রাজ্যে ও কেন্দ্রে। যার মূল লক্ষ ক্ষমতায় টিকে থাকা ও পুঁজিবাদের বিকাশ। সব সরকারেরই কিছু ভালো গুণ থাকে, থাকে কিছু অসৎ প্রবৃত্তি। এই দুই প্রবৃত্তির মধ্যে যদি ব্যালেন্স না থাকে তবে তা সাধারণ মানুষের কাছে ভিলেন স্বরূপ হয়ে যায়। এখন প্রশ্ন হল এই সরকার আমার কাছে খারাপ, অন্যদের কাছে ভালো। আমি যেভাবে জীবনকে দেখি, জীবনের উদ্দেশ্য বুঝি, জীবনের আধুনিকতা বুঝি, দেশ-কালের উন্নয়ন বুঝি তা থেকে অন্যদের ভাবনা পৃথক। সেখানে আমি ঠিক অন্যরা ভুল বা অন্যরা ঠিক আমি ভুল তা কতখানি গ্রহণযোগ্য, প্রাসঙ্গিক এ নিয়ে সন্দেহ আছে। মনে পড়ছে আশিস মুখোপাধ্যায়ের এক গল্পের কথা। আমার লেখাকে ভালো না বললে আমিও তোমার লেখাকে ভালো বলব না। আমার লেখা না পড়লে তোমার লেখাও পড়ব না। এই জালে কোনটা সত্যিই প্রকৃত ভালো লেখা তুমিও জানবে না আমিও জানব না। গণতান্ত্রিক পরিসরটাই নেই। বিরোধী রাজনীতির পাঠটাই উঠে গেছে। প্রশাসন ও সরকার আজ মিলেমিশে একাকার। এ অপরকে ব্যবহার করছে। স্বাধীন বৃত্তি, স্বাধীন সত্তা নেই। বাংলার রাজনীতি আগে এত কলুষিত হয়নি। কোথাও আশার আলো নেই। ধর্মীয় মেরুবিভাজন, মানুষ ভাগের রাজনীতি চলছে। শুভবুদ্ধি সম্পন্ন নাগরিকের সংখ্যা হাতে গোনা। এই যে গণতন্ত্রহীন বিরোধীহীন রাজনীতি সেখান থেকে বাংলার ভবিষ্যৎ কোথায় যাবে ভাবলেই ভয় লাগে। যদিও ইতিমধ্যেই অনেকটাই ভেঙে গেছে। বাংলার আকাশে আজ কালো ধোঁয়া। আমরাই দায়ী। পশ্চিমবঙ্গ বা ভারত নয় গোটা পৃথিবীর রাজনীতিই আজ সংকটের মুখে। দক্ষিণপন্থী রাজনীতির যত বাড়বাড়ন্ত হবে তত সাম্রাজ্যবাদ বৃদ্ধি পাবে। মানুষের সংকট ততই বৃদ্ধি পাবে।

সাথী
যে বিপন্ন সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি সেখানে নীতি-আদর্শ এই শব্দগুলো হাস্যকর। তবুও জানতে চাই তুমি কোন রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করো এবং কেন?

পুরুষোত্তম
একজন সৎ মানুষের, সৃষ্টিশীল মানুষের, সত্যবাদী মানুষের, মূল্যবোধ সম্পন্ন আত্মজ্ঞানী মানুষের রাজনৈতিক দর্শন থাকতে পারে, কোনো দলীয় রাজনীতি নয়। সাহিত্যিক অলোক গোস্বামীর একটা কথা ভীষণভাবে আমার কাছে প্রাসঙ্গিক ‘আমি যতটা বামপন্থায় বিশ্বাস করি, ততটা বামপন্থী নই’। মার্ক্সীয় দর্শনে বিশ্বাস করি। তবে বাম দলীয় রাজনীতিতে নয়। তবে ভোট বামপন্থীদেরই দেই। তবে বামপন্থার ভুল ক্রটি নিয়ে সরব হতে ভালোবাসি। কংগ্রেস পরিবারে জন্ম নিয়ে যখন পশ্চিমবঙ্গ থেকে বামদলের বিদায়যাত্রা স্পষ্ট হয়ে ওঠে তখন বামপন্থার দিকে আমরা আকৃষ্ট হচ্ছি। আজকের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাম দল ছাড়া অন্যদলের কোনো রাজনৈতিক মূল্যবোধ, দর্শন, নীতি, শিষ্টাচার নেই। বামেরাও যে যথার্থ শুদ্ধ তাও নয়। তবুও কিছুটা হলেও রাজনৈতিক জ্ঞান, নীতিবোধ বামেদেরই আছে। আমি একজন সচেতন মানুষ হয়ে সেদিকেই। আবার পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীদের সমস্ত কার্যকলাপ মেনে নিতে পারি না। সাহিত্যিক অনিশ্চয় চক্রবর্তী যিনি সারাজীবন বাম আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত, পার্টির হয়ে মিটিং মিছিল বক্তৃতা করেছেন, নিজের জীবনের সমস্তটাই বামচিন্তায় জড়িত তিনি নিজের আত্মজীবনীর নাম রাখেন ‘আমার অকমিউনিস্ট জীবন’। বামপন্থী হওয়া তো সহজ নয়। তবুও সেটাই বিশ্বাস করি।

সাথী
রাজ্যে SSC নিয়ে যা হল, হচ্ছে এই বিষয়ে তোমার দৃষ্টিভঙ্গি কী?

পুরুষোত্তম
আজ পনেরো বছর ধরে একটা সরকার চলছে নীতিহীন, আদর্শহীন, নৈতিক ধ্যানধারণাহীন, রাজনৈতিক পন্থাহীন ভ্রষ্টাচারে। বেশিরভাগ নেতামন্ত্রীরা দুর্নীতিতে যুক্ত। কেউ সামাজিকতার তোয়াক্কা না করে এমন এক জীবন যাপন করছে যা ভিত্তিহীন, কুরুচিপূর্ণ। মুখের ভাষার কোনো শিষ্টাচার, সৌজন্য, ভদ্রতা নেই। এরা করবে জনগণের উন্নতি? সরকারি শিক্ষাব্যাবস্থা পুরোপুরি ভেঙে গেছে। স্কুলশিক্ষা প্রকৃতপক্ষে বেসরকারীকরণের দিকে যাচ্ছে। ফলে এসবই হবে। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে কী হবে? বেসিক জায়গাটাই তো ভেঙে যাচ্ছে। SSC নিয়ে এটা হওয়ারই ছিল। শুধু SSC নয় এই পনেরো বছরে রাজ্যে এমন কোনো চাকরি নেই যা স্বচ্ছভাবে হয়েছে। শুধু চাকরি নয় করোপশন, মুনাফা, মাফিয়াগিরি ছোট তলা থেকে সমস্তক্ষেত্রে মজবুত। যেকোনো অফিসে গিয়ে কোনো কাজ করতে গিয়ে দেখ পরিস্থিতি কোথায় চলে গেছে। সরকার দায়িত্ব নিয়ে দিনের পর দিন দুর্নীতি করে যাবে আর কেস হবে না এতো হয় না। সরকার আইনকে মান্যই করবে না, আমিই সরকার মানে আমিই শেষ কথা তা তো গণতান্ত্রিক দেশে হতে পারে না। বহুক্ষেত্রে সম্ভব হলেও কোথাও কোথাও তো আটকে যাবে। সংবিধান যখন বিক্রি হয়ে যায়, দেশের সর্বোচ্চ আদালত যখন বিক্রি হয়ে যায় তখন সাধারণ মানুষের কিছু করার থাকে না। SSC একদল যোগ্য/ বৈধ শিক্ষকের পরিণতি তাই ঘোষণা করছে। সমান অপরাধী পশ্চিমবঙ্গের তামাম শিক্ষকশ্রেণি। তেমন বৃহত্তর আন্দোলন দেখা যায়নি। যেসব ক্ষেত্রে দেখা গেছে তা বাম সমর্থিত। রাজনৈতির ঊর্ধ্বে গিয়ে সার্বিক শিক্ষক সমাজ একত্রিত হয়নি। যেটা অভয়া কাণ্ডে ঘটেছিল। তবুও অপরাধীরা কোথায় যেন ছাড়া পেয়ে গেল। পশ্চিমবঙ্গে আজ ভয়ংকর দুর্দিন। কোথাও আশার আলো নেই। যেন এক নষ্ট ভাগাড়। একদল হিংস্র চিল শকুন বিকট চিৎকারে যেন নাশ করে চলেছে। বেহুলার ঘরে তো একটা সাপ ঢুকেছিল। আজ বেহুলা বাংলার ঘরে শতশত কালনাগিনী ক্রমাগত দংশন করছে। আর বাংলার ভাগ্য পরীক্ষা করছে।

সাথী
অধ্যাপকদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তোমাকে প্রশ্ন তুলতে দেখা গেছে নানা সময়ে। এর পেছনে কী কারণ রয়েছে?

পুরুষোত্তম
শিক্ষককে জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে দেখা হয়েছে এতকাল। আজ সেই সত্যে ভাঙন ধরেছে। শুধু ভাঙনই নয় আজকের অধ্যাপকরা নানা দুর্নীতিতে যুক্ত। মূল্যবোধহীন, মেরুদণ্ডহীন। কেবল ডি.এ এর ক্ষেত্রে উত্তেজিত হতে দেখা যায়। ব্যতিক্রম মানুষ আছেন। পড়াশোনার পাঠটাই উঠে গেছে। পড়াশোনার বদলে পড়নিন্দা, পরচর্চা, ভিত্তিহীন সেমিনার। সেমিনারে আবার খাওয়া দাওয়া, উপহারই প্রধান, বক্তব্যে নতুন চিন্তাভবনা নেই। ব্যতিক্রম আছে। কেউ সরাসরি পার্টি করে আখের গুছিয়ে নিছে। কেউ ক্ষমতা প্রদর্শন করে পদ দখল করে আছে, অথচ সেই পদের উপযুক্ত সে নয়। কাকে দেওয়া হয়েছে রাজার পাঠ? এ যেন শিয়ালের কাছে মুরগি আধি দেওয়ার গল্প। আমি এই সিস্টেমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারি না। ফলে সার্বিক পাঠচর্চা, গবেষণার বৃত্তটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বাংলা সাহিত্যের পরিসর থেকে বহু গুরুত্বপূর্ণ কবি লেখক ছিটকে যাচ্ছেন কেবল চর্চার অভাবে। আমার ক্ষোভ ওইখানে। আর ব্যর্থ মানুষ তো ক্ষোভই উগড়ে দিতে পারে। আর কী পারে? আবার শুধু ব্যর্থতার সমীকরণ দিয়ে এই দুর্নীতিকে আড়াল করা যাবে না। একজন মূল্যবোধ নীতি পরায়ণ সচেতন মানুষ এই আকাশপ্রমাণ দুর্নীতি ও নীতিহীনতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না। ফলে গর্জে উঠি। পুঁজিবাদের অনিয়ন্ত্রিত বিকাশে যে লাগামহীন দুর্নীতি তৎসহ ভ্রষ্টাচারের মধ্যে আমাদের অবস্থান তার সঙ্গে একজন প্রকৃত লেখকের সোমঝোতা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই আমি ক্ষণে ক্ষণ তেজি ক্রোধী, দ্রোহী। তা যেকোনো ভ্রষ্টাচার হতে পারে। ভ্রষ্টাচারের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠাই যেন আমার জীবনের স্বাভাবিক ধর্ম।

সাথী
প্রায় বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই পিএইচডি নিয়ে যে সমস্ত কর্মকাণ্ডের প্রচলন আছে এর অবসান কী সম্ভব?

পুরুষোত্তম
প্রশ্নটা স্পষ্ট নয়। কর্মকাণ্ড বলতে তুমি কী বোঝাতে চাইছ? কেচ্ছাকাহিনি না প্রচলিত সিস্টেমের কথা? যদি সিস্টেমের কথা বলো তবে পঞ্চকদের বড় প্রয়োজন। অচলায়তনকে ভেঙে দিতে। তুমি খুব ভালো করে দেখবে আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা প্রশ্ন করতে শেখায় না। এমনকি ছাত্র বেশি প্রশ্ন করলে কিঞ্চিৎ শিক্ষক ছাড়া প্রায় সকলেই বিরক্ত হন। এমনকি সেই ছাত্রকে ডেপো, পাকা ইত্যাদি আখ্যা দেওয়া হয়। শুধু তাই নয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় কীভাবে কম নম্বর পাবে সে ব্যাবস্থা করে দেওয়া হয়। এই প্রজন্মের সকলেই তো নম্বরের পিছনে ছুটছে। কম পড়ে, কম পরিশ্রম করে কীভাবে বেশি নম্বর পাওয়া যায় সেই রাস্তায় হাঁটছে। প্রকৃতপক্ষে মূল্যবোধটা বিসর্জন দিচ্ছে। কেউ কেউ সেই পথে জিতেও যাচ্ছে মানে জীবনে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাচ্ছে। যে মূল্যবোধ টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল সে দেখছে পথ ভুল। দিনের শেষে মানুষ তো কিছু সাফল্য চায়, কিছুটা ভাত কাপড়ের সংস্থান চায়। আমরা তো কেউই কর্ণের মতো ঘোষণা করতে পারি না—‘জয়ী হোক, রাজা হোক পাণ্ডবসন্তান/ আমি রব নিষ্ফলের, হতাশের দলে’। কে আর পরাজিত হতে চায়? এই করতে করতে ভুলটাই একদিন রাস্তা হয়ে যায়। মূল্যবোধ তখন পুরাতন আমলের নীতিদর্শনের পথ হয়ে বাতিল হয়ে যায়। কেউ সেই পথে অংশ নেয়, কেউ সেই পথে অংশ নেওয়ার সুযোগ না পেয়ে ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ করে, কিঞ্চিৎ কেউ কেউ সেই পথ অংশ নেয় না। এই ত্রিবিধ বৃত্তের অনুপাত অনেক বেশি অসমান্তরাল। সেই ভুল পথটাই আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মানদণ্ড হয়ে আছে। কোনো অধ্যাপক যদি এর ব্যতিক্রম হয়ে যায় তবে তাকে গ্রুপবাজি করে আড়াল করে দেওয়া বা বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে। কেচ্ছাকাহিনির মধ্যে আছে শারীরিক মিলন, যৌনতার কথা। এখানে চলে আসে ক্ষমতাবৃত্তের কথা। ক্ষমতা যৌনতাকেও নিয়ন্ত্রণ করে। আবার শরীর তো একটা ইনভেস্টমেন্ট প্রডাক্ট। সে ব্যবহৃত হয়ে সাফল্য অর্জন করছে। এখানে চাহিদা, কামের কিন্তু কোনো প্রসঙ্গ নেই। দেহ এখানে উচ্চতায় ওঠার সিঁড়ি। স্বাধীন দেশে স্বাধীন মানুষ স্বাধীন প্রবৃত্তির ক্ষেত্রে যেতেই পারে। এখানে আমার বলার কিছু নেই। পাপ-পুণ্যের ধারণা আজ অচল। মূল্যবোধটা তো আগেই ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আত্মহত্যা ঘটছে, যৌন নির্যাতন ঘটছে। দায়ী কে? নিপীড়ক নিজেই। প্রশ্ন হল এই সিস্টেমকে কীভাবে বদল ঘটানো সম্ভব? চলে এল শ্রেণির প্রশ্ন। ছাত্র নামক শ্রেণি থেকে কেউ যদি গোপন পথে যায় আর তা যদি সমষ্টির ছাত্র হয়ে নিয়ন্ত্রণ না করা যায় তবে এই পথ চলতেই থাকবে। ·