ফজলে লোহানী
আগস্ট শোকের মাস। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হন মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গল্পপাঠের নিয়মিত আয়োজন ‘মুক্তিযুদ্ধ’ বিভাগে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রয়াত সাংবাদিক ফজলে লোহানীর এই আলাপচারিতা প্রকাশিত হলো। সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছে বাতিঘর থেকে প্রকাশিত ‘মুখোমুখি বঙ্গবন্ধু : ৫০টি সাক্ষাৎকার ও কথোপকথন’ শীর্ষক বই থেকে। বইটির সংগ্রাহক ও সম্পাদক জামিল বিন সিদ্দিক। আমরা তাঁর ঋণ স্বীকার করছি।
—সম্পাদক

আজকের প্রজন্ম ফজলে লোহানীকে ভুলে গেছে। '৭০-৮০ দশকের প্রজন্মের কাছেও তাঁর একমাত্র পরিচয় 'যদি কিছু মনে না করেন'-এর জনপ্রিয় উপস্থাপক। এই পরিচয়ের আড়ালে হারিয়ে গেছে তাঁর ৫০-৬০ দশকের সাংবাদিকতা ও সাহিত্যিক কর্মকাণ্ড। ১৯৪৯ সালে পাকিস্তান অবজাভার-এর যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে তাঁর সাংবাদিকতা জীবন শুরু, একে একে কাজ করেন সংবাদ, পাকিস্তান পোস্ট, বিবিসিতে। এর মধ্যেই ১৯৫৩ সালে তাসিকুল আলম খান, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম আর বড় ভাই ফতেহ লোহানীকে নিয়ে বের করেন সাহিত্য পত্রিকা অগত্যা। ব্যঙ্গাত্মক ও খোঁচামারা লেখাগুলোর দৌলতে অচিরেই মাসিকটি হয়ে ওঠে এই অঞ্চলের সবচেয়ে জনপ্রিয় সাময়িকী। সাময়িকীটির প্রভাব ও জনপ্রিয়তায় ভয় পেয়ে দুই বছর চলার পরই এটি নিষিদ্ধ করে সরকার। হতাশ হয়ে লন্ডন চলে যান লোহানী, পরে ফিরে এসে সাংবাদিকতার পাশাপাশি মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন, স্বাধীনতার পর ন্যাপের (ভাসানী) হয়ে সিরাজগঞ্জ থেকে নির্বাচনও করেন লোহানী। আর আশির দশকে 'যদি কিছু মনে না করেন' দিয়ে হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় টিভি ব্যক্তিত্ব। এই অনুষ্ঠানটি কার্যত দেশে আধুনিক টিভি সাংবাদিতার সূচনা করে। ১৯৭৯ সালের অক্টোবরে শুরু হয়ে আমৃত্যু চলে ছিল এই ম্যাগাজিন। একটা টিভি ম্যাগাজিনও যে সাধারণের মনে এত প্রভাব রাখতে পারে, 'যদি কিছু মনে না করেন'-এর আগে তা ধারণাও করতে পারেনি এই অঞ্চলের মানুষ।
উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের ধাক্কায় বিদায় নিয়েছে আইয়ুব সরকার, গণচাপের মুখে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছে ইয়াহিয়ার সামরিক সরকার। এমনই এক খোলা হাওয়ায় ১৯৭০-এর ১ জানুয়ারি থেকে 'আত্মা দিয়ে দেখা' শিরোনামে জাতীয় নেতাদের সাথে সাক্ষাৎকারমালা প্রকাশ শুরু করে দৈনিক পাকিস্তান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ফজলে লোহানীর দীর্ঘ অন্তরঙ্গ আলাপচারিতা 'এই দেশেতে জন্ম আমার' শিরোনামে ১১, ২১, ২৩, ২৫, ২৭ জানুয়ারি এবং ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রকাশিত হয়। ২ ফেব্রুয়ারির কিস্তির শেষে লেখা ছিল, 'শেষাংশ আগামী পরশু দৈনিক পাকিস্তানে প্রকাশিত হবে।' অজ্ঞাত কারণে পরের কোনো সংখ্যাতেই আর সেই শেষাংশ প্রকাশিত হয়নি।
উপক্রমণিকা
সেদিনকার কথা নিশ্চয়ই মনে আছে সবার।
'কণ্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে বাঁশী সঙ্গীতহারা, অমাবস্যার কারা। সারা দেশ নিস্তব্ধ।'
মানুষের কণ্ঠ রোধ করে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের লক্ষ গ্রাম অমাবস্যার কালিমায় ঢাকা পড়ে আছে।
এই তো বেশি দিন আগের কথা নয়।
ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের সামনে এসে থামল একটি মিলিটারি গাড়ি। সৈন্যরা নেমে সঙিন উঁচিয়ে দাঁড়াল জেলগেটের সামনে। একি দুর্যোগের ঘনঘটা।
ভেতরে নিঃসঙ্গ এক বন্দী। নিরাপত্তা আইনে তিলে তিলে দহন করা হয়েছে তাঁকে। এ দহন জ্বালাময়ী, কিন্তু ইস্পাতকে অঙ্গার করতে পারেনি বন্দিশালার সে দহন। নিঃসঙ্গতা এক পলকহীন প্রহরীর মতো প্রতিদিন এসে পায়চারি করেছে লোহার গারদের বাইরে। এমনি করে কেটে গেল দুটো বছর।
তারপর একদিন এল জেলার। বলল, তোমার আজ মুক্তি।
মুক্তবিহঙ্গের মতো যেন পাখা মেলে উড়ে যেতে চায় নিঃসীম আকাশের পানে। তবু কোথায় যেন এতটুকু অবিশ্বাসের মেঘ ছায়া ফেলে রাখে। অর্ফিয়াসের বাঁশির মতো বেজে ওঠে না কেন মুক্তির গান। বন্দী জেলগেটের বাইরে এসে দাঁড়ায়। সঙিনধারী সৈন্য এসে বলে, এটুকু ছিল প্রহসন। তুমি আবার বন্দী হলে। চলো এবার আমাদের সঙ্গে।
কত দূর? কোথায়? কোন সে সীমানায় নিয়ে যাবে, সুদূরের অন্তরালে? কত দিন রাখবে সেথায়?
জবাব মেলে না।
সেই গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে জেলগেটের পথের মাঝে বন্দী একটি ছোট্ট অনুরোধ জানায়।
শুধু একমুহূর্ত সময় দাও আমায়।
তারপর কারাগারের সামনে একমুঠি ধুলো তুলে কপালে স্পর্শ করে মোনাজাত জানায় সবার অলক্ষ্যে যিনি আছেন তাঁর উদ্দেশে।
—এই দেশেতে জন্ম আমার, যেন এই দেশেতে মরি।
কারাগারের ফটক বন্ধ হয়ে গেল। বন্দী শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে মিলিটারি ট্রাক ছুটে চলল কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টের উদ্দেশে। প্রহসনের এখানেই শেষ নয়। যবনিকা উঠল আরেক প্রহসনের। পাকিস্তানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রহসনের। পাকিস্তানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রহসন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা: শুরু হলো।
সেদিন সারা দেশ স্তব্ধ হয়ে দেখছিল এই নাটকীয় অপমানের দৃশ্য।
কিন্তু বছর না ফুরোতে পটপরিবর্তন হলো। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীরা হলেন পদাতিক। ঢাকা নগরী হলো ছাউনি। ব্যারিকেড। বার্বডওয়্যার। মিছিল, মশাল আর সান্ধ্য আইন। সেদিন বাংলাদেশের আরেক নাম হলো সংগ্রাম। মুক্তিপাগল ছিনিয়ে আনা প্রমত্তা বন্যার মতো জনতা গিয়ে দুই হাতে উঁচু করে নিয়ে এল অনেক বন্দীকে। যাত্রাপথের জয়ধ্বনি মৃদঙ্গের মতো ডাক দিয়ে যায়।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে তখন। সারা দিনের কর্মকোলাহলের পর নিঃশেষিত পৃথিবীতে নেমেছে আসন্ন রাতের নিস্তব্ধতা।
এই নিস্তব্ধতা ভেঙে শোনা যাচ্ছে শুধু একজোড়া পায়ের শব্দ। ভাঙা নদীর পার ধরে একটি ছেলে দৌড়াচ্ছে প্রাণপণে। ঘরে ফিরতে হবে তাকে তখনই। সন্ধ্যার শেষ আলোটুকু আকাশে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই তাকে পৌঁছাতে হবে গাঁয়ের সীমানায়।
উঁচু পাড় থেকে শুকিয়ে যাওয়া নদীর মাঝখানে ক্ষীণধারা স্রোতটুকু দেখে মনে হয় লাটিমের রুপালি সুতো কেউ ফেলে রেখে গেছে সেখানে। বিশীর্ণ নদীর ভাঙা পাড় থেকে শুরু হয়েছে অসমতল জমির বিস্তৃতি। কোথাও কলাইয়ের খেত। আবার কোথাও বুটছোলার সবুজ শস্যে মাঠ ভরে গেছে। মাঝে মাঝে খড়ের ছাউনিঢাকা রাতপ্রহরীদের টুঙ্গি। শীতের পহর রাতে ঘুমজড়ানো চোখে কিষান বসে এখানে পাহারা দেয়। দূরের মাঠে মাঠে ছায়ার মতো লোকগুলো নাড়া পোড়াচ্ছে। অতিকায় এক ঘোড়ার পেখমতোলা পুচ্ছের মতো খড়ের ধোঁয়া আকাশজুড়ে ভাসছে।
কাছের একটি টুঙ্গি থেকে একটি রাখাল ছেলে বেরিয়ে এল। কয়েক গোছা ছোলা তুলে নেয় সে খেত থেকে।
নদীর ধারে চারজন লোক বসেছে খড়ের আগুন পোহাতে।
বুড়ো একজন লোক জিজ্ঞেস করল, 'কিরে তুই আইজ টুঙ্গিতে থাকবি নাকি রে?
ছোলা হাতে ছেলেটি এসে পাশে বসে। আগুনে ছোলা পোড়াতে পোড়াতে বলে, 'না, বাজান হাটে গেছে। বাজান আইলেই আমি যামুগা।'
নদীর ধার ধরে কৃশকায় ছেলেটি দৌড়াতে থাকে। এর বেশি শোনার আর সময় নেই তার। সে নিজেও গিয়েছিল হাটে। মাইল তিনেক দূরে শনিবারের হাট বসে। কত দূরদূরান্ত থেকে লোক আসে সেখানে। চালের কারবারি। গুড়ের সওদাগর। নৌকা ঘাটে বেঁধে তক্তার ওপর দিয়ে ভারী পিপেগুলো নামায়, কুলিরা শোরগোল করে। এসব দেখতে বড় ভালো লাগে তার। পাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে দুচোখ ভরে দেখে ছোট ছেলেটি এই দৃশ্য। মৌসুমের সময় বড় বড় পাটবোঝাই নৌকা পাল তুলে আসে উজান দেশ থেকে। পানি ছুঁয়ে যায় বোঝাই নৌকার গলুই। ছোট ছেলেটি পাড়ে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে ভাবে, এসব নৌকা ডোবে না কেন!
এমনই তাদেরও নৌকা ছিল। বুড়ো দাদার মুখে সে কত গল্প শুনেছে তাদের নৌকাগুলোর। দুই কুড়ি, তিন কুড়ি নৌকার বহর। ভারী দূরপাল্লার মালটানা বজরার গল্পকাহিনি।
দাদা সাহেব দাওয়ায় বসে ফরাসি হুক্কায় তামাক খেতেন। আর গল্প করে বলতেন বিগত দিনের কথা। তাঁর প্রবল পরাক্রান্ত বাবা শেখ ওয়াসিমুদ্দিনের কথা। ছোট ছেলেটি পাশে বসে সেই সব গল্প অবাক বিস্ময়ে শুনেছে।
শেখ ওয়াসিমুদ্দিনের নৌকা মাল নিয়ে যেত কলকাতায়। ইংরেজের ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র তখন কলকাতা শহর। ঢাকা থেকে, ফরিদপুর থেকে, সিরাজগঞ্জ থেকে মাল যেত কলকাতায় নৌকায় করে। নীল, রেশম, মসলিন, পাট, গুড়। ওয়াসিমুদ্দিনের বজরা গিয়ে ঠেকত উল্টোডাঙার ঘাটে। সেখান থেকে মাল উঠত হুগলি নদীর জাহাজে। সাগর পাড়ি দিয়ে যেত বিদেশের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য।
'একবার লাগল ঝগড়া ইংরেজ সাহেবের সাথে।' দাদাসাহেব গল্প শুরু করেন।
শুরু হয় মোকদ্দমা। অনেক টাকাপয়সার খরচ। খুলনার আলাইপুর পুল নীলকর সাহেবের চাই। সে যুগে ইংরেজ নীলকর যা চাইত, তাই পেত সে।
এ পুল নিজের এখতিয়ারে আনতে পারলে সাহেব তার ওপর ট্যাক্স বসাতে পারবেন। নেটিভদের যাতায়াত বন্ধ করতে পারবেন ইচ্ছামতো।
কিন্তু ওয়াসিমুদ্দিন এ ব্যবস্থা মেনে নিতে পারলেন না।
তিনি বললেন, এত বড় অন্যায় হতে দেব না। এ পুল সবার ব্যবহারে লাগবে। সুতরাং আলাইপুরের পুল সাহেবকে দেওয়া চলতে পারে না।
শুরু হলো মামলা। উকিল-মোক্তার এলেন। চলল সলাপরামর্শ। সাহেব ঝানু লোক। শাসিয়ে গেলেন, গোরার বিরুদ্ধে মামলা করে কখনো জিততে পারবে না।
কিন্তু ওয়াসিমুদ্দিন নাছোড়বান্দা। শেষ পর্যন্ত নথিপত্র দেখে হাকিম রায় দিলেন ওয়াসিমুদ্দিনের পক্ষে। মামলায় হেরে গেলেন শ্বেতাঙ্গ সাহেব। ফাইন দিতে হবে তাঁকে।
ওয়াসিমুদ্দিন কোর্টে দাঁড়িয়ে বললেন, 'অর্থের লোভ আমার নেই। ন্যায়বিচার যে আমি পেয়েছি, তাতেই আমি খুশি। সে জন্য নমুনাস্বরূপ একটি পাই পয়সা, জরিমানা আমি দাবি করছি।'
কেঁপে উঠল ইংরেজ সাহেবের বুক। এ তো নিদারুণ শাস্তি। ইংরেজ হয়ে একজন কালা নেটিভের জরিমানা তাঁকে দিতে হবে। সে কী করে হয়?
সাহেব অনুরোধ জানালেন ওয়াসিমুদ্দিনকে, 'তোমার যত টাকাপয়সা লাগে আমি দেব, তবু আমাকে জরিমানা কোরো না। আমি একঘরে হয়ে যাব ইংরেজ সমাজে। লজ্জায় মুখ দেখাতে পারব না আর কাউকে।'
ওয়াসিমুদ্দিন অটল।
'ইংরেজ সাহেবকে জরিমানা দিতে হয়েছিল শেষ পর্যন্ত। তিনি মেয়ের বিয়ে দিতে পারেননি এই জন্য।' দাদাসাহেব গল্প শেষ করেন।
নদীর ধারে হাটে প্রতি শনিবারেই ছোট ছেলেটি আসত। পিতলের থালা পিটে শব্দ করে লাঠিয়ালরা খেলা করত হাটের ধারে খোলা মাঠে।
জীবন পরামানিক। সলু শেখ। হাদী দরজি। এরা সবাই লাঠি ধরতে পারত মরদের মতো, মাথায় তাদের থাকত ঝাঁকড়া চুল। সারা গা বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরত। কালো পাথরে খোদাই মূর্তির মতো সুন্দর তাদের দেহ। কত রকমের লাঠির খেলা দেখাত তারা। বনবন করে মাথার ওপর ঘুরত পাকা বাঁশের লাঠি। খটাখট শব্দ উঠত মাঠ থেকে। এ শব্দে যেন জাদু ছিল। ছোট ছেলেটি ছুটে যেত এ শব্দ শুনেই।
তবে সবার চেয়ে ভালো লাগত তার একজনকে। যার জন্য প্রতি শনিবার স্কুলের ছুটির পর তিন মাইল হেঁটে চলে আসত হাটে। মুকিম মুন্সি ছিল তার কাছে রূপকথার রাজ্যের যুবরাজ। মুকিম হাটরে গায়েন। সুর করে গান ধরত সে হাটের মাঝে। হাতের একতারায় আঙুলের স্পর্শে মূর্ছনা জাগাত। মাথা নেড়ে নেড়ে সে গান গাইত। অপূর্ব সে গানের সুর। সব কথা না বুঝলেও ছোট ছেলেটির মনে মুকিম মুন্সির গানগুলো গভীর আবেদন সৃষ্টি করত।
মুকিম গাইত এ দেশের গান। এখানকার মাটির-মানুষের গান। তাদের সুখ-দুঃখের গান। ধান কাটার কাহিনি থাকত সে গানে। থাকত কুচবরণ কন্যা আর তার মেঘবরন কেশের কথা, থাকত তেপান্তরের মাঠ আর পঙ্খিরাজ ঘোড়ার কথা।
বিভোর হয়ে শুনছিল মুকিম মুন্সির মুখের গান ছেলেটি। কখন বেলা ডুবে গেছে টেরই পায়নি সে। ঘরে ফিরতে হবে তাকে সন্ধ্যার আগে।
নদীর ভাঙা পাড় ধরে কলাইখেতের পাশ দিয়ে ছেলেটি ছুটতে থাকে। সূর্য তখন নেমেছে পাটে।
চোখে তার পুরোনো দিনের স্মৃতি। শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর অতীত জীবনের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো খুঁজছিলেন মনের আনাচকানাচে। বাইরে শীতের হিমেল সকাল। ভোরের কুয়াশায় ভরে গেছে সামনের রাস্তাটি। সকাল সাড়ে ৭টায় তাঁর বাড়িতে গিয়ে আমি উপস্থিত হলাম। ধানমন্ডির পথে দু-একটা লোক সবে বেরিয়েছে। লেকের পাড়ে গাছগুলোর পাতা ভিজে গেছে। সারা রাত ধরে নিঃশব্দে শিশির পড়েছে মাঠে। লেকের ঢালু কিনারায়।
কথা হচ্ছিল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সম্পর্কে।
শেখ মুজিবুর রহমান বললেন, 'শহীদ সাহেবকে অনেকে চিনতেন না। কী বিরাট ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষ ছিলেন তিনি।'
পুরোনো দিনের কথা। পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে যে পুরুষের এতখানি সংযোগ ছিল, যিনি প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় দেশ থেকে বহুদূরে মৃত্যুবরণ করেছেন, তাঁর সম্পর্কে কথা বলছিলেন শেখ সাহেব।
প্রশ্ন করলাম, 'অনেকে বলেন যে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন ওপরতলাকার মানুষ।'
শেখ সাহেব জবাব দিলেন, 'যিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ব্যক্তিগতভাবে জেনেছেন, তিনি এ ধরনের কথা বলবেন না।'
কত গভীরভাবে যে তিনি সাধারণ মানুষকে ভালোবাসতেন, সে কথা তাঁর সংস্পর্শে যে এসেছে, সেই জানে। ত্রিশের দশকের কলকাতার কথা। সুপুরুষ অমিততেজ যুবক শহীদকে দেখা যেত কলকাতার শহরতলির বস্তি এলাকা খিদিরপুর, মেটিয়াবুরুজ, রাজাবাজারে। শ্রমিকদের খোলার ঘরে, বস্তির ঘিঞ্জি চায়ের দোকানে। তিনি বসে আছেন বস্তিবাসীর মাঝে। তাদের কথা শুনছেন।
তাদের বিপদে-আপদে এগিয়ে যাচ্ছেন। কাউকে হাসপাতালে নিতে হবে। কারও চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে। শ্রমিক দল গঠন করতে হবে কোথাও, এসব ব্যাপারে শহীদ সোহরাওয়ার্দী রয়েছেন সর্বাগ্রে।
'উনিশ শ সাঁইত্রিশে বাংলাদেশের মন্ত্রিসভায় শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রথম শ্রম দপ্তর বলে পোর্টফোলিওটি খোলেন। এর আগে সরকারের কোনো শ্রম দপ্তরই ছিল না। ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাক্ট প্রণয়নকারীদের অন্যতম ছিলেন তিনি,' শেখ সাহেব বলতে থাকেন।
শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কথা বলতে বলতে শেখ সাহেবের চোখ দুটো আর্দ্র হয়ে আসে গভীর বেদনায়।
'তিনি আমাকে ছেলের মতো ভালোবাসতেন। ১৯৪১-এর পর থেকে আমি সব সময়ই পাশে থাকতাম।'
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বিভাগ-পূর্ব ভারতে রাজনীতি শিখেছেন। তাঁর রাজনৈতিক প্রেরণার উৎস তিনি খুঁজে পেয়েছেন উনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপীয় উদারনৈতিক চিন্তাধারার মাঝ থেকে। সে যুগে ব্রিটিশ পণ্যের সঙ্গে ভারতে এসেছিল স্বাধীনতার মন্ত্রবাণী। মধ্যবিত্ত ভারত বুকে টেনে নিয়েছিল সেই আগুন জ্বালানো কথামৃত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইউরোপীয় শিক্ষার আলো যাঁরা পেয়েছিলেন, তাঁরাই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের পুরোধা হলেন। ব্যারিস্টার মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। তাঁর উত্তরসূরি ব্রিটিশ পাবলিক স্কুলের ছাত্র জওহরলাল নেহরু। সিংহলে ছিলেন ব্যারিস্টার বন্দরনায়েক। এ যুগের সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি কিউ ইয়ন-তাঁরা সবাই ব্রিটেনেই তালিম নেন উদারনৈতিক মতবাদের। এ রাজনীতিরই ধারাবাহক ছিলেন ব্যারিস্টার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তাঁরা যুগ উত্তরণের এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে গেছেন। শহীদ সাহেবের সঙ্গে সঙ্গে বোধ হয় সে যুগেরও পরিসমাপ্তি ঘটল।
শহীদ সাহেবের সাহস, আত্মত্যাগ আর মনোবলের প্রশংসা মওলানা ভাসানীও করেছেন।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী বাংলাদেশের মানুষকে ভালোবাসতেন গভীরভাবে।
শেখ সাহেব বললেন, এ মমত্ববোধ ছিল প্রাণ-উৎসারী। এতে কোনো খাদ ছিল না।
মৃদু হেসে তিনি বললেন, একটি কবিতা [গান) শহীদ সাহেবের খুব প্রিয় ছিল। দূরে কোথাও যাওয়ার সময় গাড়িতে একা একাই তিনি গুনগুন করে গাইতেন, 'এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি...'
গণতান্ত্রিক আন্দোলন আজ নতুন দিকে মোড় ফিরিয়েছে-এ পথের কথা সোহরাওয়ার্দী হয়তো ভেবেছিলেন। কিন্তু তিনি জীবিত থাকতে এই নতুন উত্তরণ দেখে যেতে পারেননি।
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে আওয়ামী লীগ সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল নয়। আওয়ামী লীগ আজ সমাজতান্ত্রিক আদর্শের কথা বলছে। কোন পথে সে আদর্শ বাস্তবে রূপান্তরিত হবে, তা শুধু ভবিষ্যৎই বলতে পারে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, এককালে সমাজতন্ত্র ছিল এ দেশে একটি নিষিদ্ধ শব্দ। এ নিয়ে যাঁরা চিন্তা করতেন, তাঁরা শাসকের তর্জনীর ভয়ে ছিলেন ম্রিয়মাণ। কিন্তু আজ সর্বসাধারণের প্রকাশ্য বক্তব্যের উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে শব্দটি।
আওয়ামী লীগের ম্যানিফেস্টোতে রয়েছে-আওয়ামী লীগের আদর্শ স্বাধীন, শোষণহীন ও শ্রেণিহীন সমাজব্যবস্থা কায়েম করা। সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থ্যর মাধ্যমেই বর্তমানের শোষণ, বৈষম্য, অবিচার ও দুর্দশার হাত থেকে দেশকে মুক্ত করা সম্ভব বলে আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকল্পে সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা কায়েম করা আওয়ামী লীগের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
প্রশ্ন করলাম, এই আদর্শ হচ্ছে একটি বিপ্লবধর্মী আদর্শ। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ছাড়া এই আদর্শ নির্বাচনের মাধ্যমে বাস্তবে রূপায়িত করা যাবে কি?
শেখ মুজিব বিশ্বাস করেন বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনই অগ্রগতির পথ। এ মতের সপক্ষে যুক্তি দেখিয়ে তিনি বলেন যে যুগ বদলে গেছে। দুনিয়ার পরিবর্তন হয়েছে। সোভিয়েত রাশিয়ার কুলাকের অত্যাচার, জারের দুর্জয় শাসন ছিল। অর্থোডক্স চার্চের চরম গুঁড়িতে মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা হয়েছিল। রাজার বিরুদ্ধে কথা বললে গর্দান যেত। সেখানেই বিপ্লব করে পরিবর্তন আনতে হয়েছে। রাশিয়ার বিপ্লব ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।
আজ অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। আজ জনসাধারণ বুদ্ধিসচেতন, শেখ বললেন।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ঐতিহাসিক যুগ পরিবর্তনের শুরু। চীনে বিপ্লবের মাধ্যমে পুরোনো ব্যবস্থা বদলানো হয়েছে। ভিয়েতনামে মুক্তিযুদ্ধ চলছে। সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে আফ্রিকার পূর্বতন কলোনিগুলো।
আলজেরিয়ার জনগণতন্ত্রের পরীক্ষা চলছে। কিন্তু এসব দেশে সমাজতন্ত্র কায়েম হয়নি এখনো। কিন্তু যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের জোয়ার এসব দেশে এসেছে তাকে ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে না দেখলে ভুল করা হবে। উত্তরণের যুগে এই ধারার পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে কি না, তা যুক্তিসাপেক্ষ।
গত ১১ জানুয়ারি পল্টনের জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের অর্থনৈতিক প্রোগ্রাম পেশ করেছেন এই বলে যে মূল শিল্পগুলো, ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ হবে।
আওয়ামী লীগ ম্যানিফেস্টোর শিল্পপর্যায়ের বক্তব্যেও বলা হচ্ছে ব্যাংক, বিমা, গুরুত্বপূর্ণ যানবাহন, যোগাযোগ প্রভৃতি প্রত্যক্ষ জনস্বার্থমূলক প্রতিষ্ঠানসমূহও জাতীয়করণ হবে এবং বৈদেশিক বাণিজ্য রাষ্ট্রায়ত্তাধীনে পরিচালিত হবে।
এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট একটি ধারণার দরকার রয়েছে। বর্তমান ঘোষণার সূত্র ধরে যদি বলা যায়, পাকিস্তানের বিভিন্ন পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বেছে নেবে। তাহলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, বিমা ও মূল শিল্প অন্যান্য প্রদেশেও সম্ভব কি না? জাতীয়করণ ব্যবস্থা কি প্রতিটি প্রদেশেই বিস্তৃত হবে? যেহেতু প্রদেশগুলো স্বায়ত্তশাসিত এবং কোন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা একটি প্রদেশ বেছে নেবে, তার অধিকার প্রদেশের রয়েছে। সুতরাং জাতীয়করণ ব্যবস্থা পাকিস্তানের সব অংশের জন্য চালু করার অধিকার কি কেন্দ্রের থাকবে?
এ ব্যাপারে শেখ মুজিব মনে করেন যে পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলের জনসাধারণও আজ একচেটিয়া পুঁজিপতি ও বুর্জোয়াসামন্ত শ্রেণির হাতে নিগৃহীত।
সেখানেও গণতান্ত্রিক আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠেছে।
তাঁরাও চাইবেন জাতীয়করণের সুফল ও সংগতি পাকিস্তানের সব অংশে পরিব্যাপ্ত হোক, শেখ সাহেব বললেন।
যে রাষ্ট্রের সমাজবিন্যাসে বুর্জোয়া শ্রেণি ও একচেটিয়া পুঁজিপতির অস্তিত্ব থেকে যাচ্ছে, সেই রাষ্ট্রে এ ধরনের জাতীয়করণ প্রোগ্রামের সত্যিকারের সুফল আশা করা যায় কি?
শেখ মুজিবুর রহমান বললেন, পাকিস্তানে একচেটিয়া পুঁজির যে কার্টেল সৃষ্টি হয়েছে, তা ভাঙার জন্যই ব্যাংক, বিমা ও মূল শিল্পগুলো জাতীয়করণের কথা বলা হয়েছে। একচেটিয়া ধনতন্ত্রের সর্বগ্রাসী কর্তৃত্ব ভেঙে দেওয়ার প্রথম ব্যবস্থা হবে এর মাধ্যমেই।
একই ধরনের আরও কয়েকটি প্রশ্ন মনে জাগছিল। জিজ্ঞেস করলাম, আওয়ামী লীগ ম্যানিফেস্টোতে কৃষিনীতির ব্যাপারে বলা হয়েছে, সমবায় পদ্ধতিতে দেশে যৌথ চাষাবাদের পালন করতে হবে।
পূর্ণ প্ল্যানিংয়ের মাধ্যমেই আওয়ামী লীগের কৃষিনীতির বাস্তব রূপান্তর সম্ভব হবে বলে শেখ মুজিব অভিমত দেন।
আরেকটি প্রশ্ন করলাম, আমলাতন্ত্র আমাদের দেশে একটি বিশেষ শ্রেণি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভর করে আওয়ামী লীগের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবে রূপায়ণ করা কি সম্ভব হবে?
শেখ সাহেব জবাবে বললেন, যে আমলাতন্ত্র জনসাধারণের মঙ্গলের জন্য কাজ করবে না, তাকে শেষ পর্যন্ত সরে পড়তে হবে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের প্রাথমিক যুগ থেকে আজ পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক অবস্থার মোড় অনেকখানি বদলে গেছে। আওয়ামী লীগের সামনে আজ একটি লক্ষ্য-ওয়েলফেয়ার স্টেট। এ লক্ষ্যে পৌছাতে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের হয়তোবা শেষ পরীক্ষা এখন চলছে। আশার বৃক্ষের শাখায় ফল ঝুলছে, এই ফল কে পেড়ে আনবেন, তার সঠিক উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়। এ ফল অবশ্য আপনা থেকে যে কখনো টুপ করে পড়বে না, তা-ও জানা কথা।
বাইঘা নদীর পানি অনেক জায়গায় শুকিয়ে গেছে। গিমাডাঙ্গা স্কুলের টিনের চাল চোখে পড়ে। ছোট ছেলেটি যখন টুঙ্গিপাড়ায় ফিরে এল, তখন সন্ধ্যার কালো আঁধারে ঢাকা পড়ে গেছে টুঙ্গিপাড়ার মসজিদ, বাড়ি।
পিতা শেখ লুৎফর রহমান এশার নামাজ শেষে মাদুর গুটিয়ে উঠে পড়লেন। বাইরে পড়ার ঘরে লণ্ঠন বাতি জ্বলছে।
বাড়ির ছেলেরা বাতির চারপাশ ঘিরে গোল হয়ে বসে সুর করে পড়া শুরু করে দিয়েছে।
মুজিবের গলার স্বর শোনা যায়। নামতা পড়ে সুর করে।
তারপর দীর্ঘ সময়ের অতিক্রমণ।
গিমাডাঙ্গা স্কুলের পড়া শেষ। ১২ মাইল দূরে গোপালগঞ্জ। মিশন স্কুলে নিয়ে গেলেন পিতা বালক পুত্রকে ভর্তি করার জন্য।
১৯৩৪ সাল এল।
সে যুগে বাংলাদেশে একধরনের রোগের কথা শোনা যেত। বেরিবেরি। ভিটামিন 'বি'র স্বল্পতার দরুন এ রোগ হতো, হার্ট দুর্বল করে ফেলত এ রোগ। পা ফুলে যেত। আর চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত। মুজিব তখন মিশন স্কুলের ক্লাস সেভেনের ছাত্র। বেরিবেরির আক্রমণে শয্যাশায়ী হলো বালক ছাত্র। বাবা নিয়ে গেলেন তাকে কলকাতায়। চোখ অপারেশন করতে হয়েছিল তাকে। তিন বছর পড়াশোনা নষ্ট হয়েছিল তার।
রোগমুক্তির পর মিশন স্কুলে আবার ফিরে এল মুজিব।
১৯৩৮ সাল।
বাংলার তখন নবজাগরণের শুরু। ১৯৩৬ সালের ভারত শাসন আইন পাস হয়ে গেছে। প্রদেশে প্রদেশে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে।
ফজলুল হক আর শহীদ সোহরাওয়ার্দী এলেন গোপালগঞ্জে। সে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। দূরদেশ থেকে খেতচাষি, গেরস্ত আর হাটের কামলারা এল ফজলুল হককে দেখতে। ১০০ বছরের ঋণের বোঝার নিচে বাংলার গাঁয়ের চাষি তখন মৃতপ্রায়। হক সাহেব-এই নামটি তাদের কাছে আশার ধ্রুবতারার মতো জ্বলছে। মহাজন আর জমিদারের ঋণ চাষির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে।
হক সাহেবের সঙ্গে শহীদ সোহরাওয়ার্দী। বয়োজ্যেষ্ঠের সঙ্গে চলেছেন মন্ত্রিসভার নতুন সদস্য।
ঘুরে ঘুরে তাঁরা মিশন স্কুল দেখছেন। হেডমাস্টার ছাত্রদের আগেই তালিম দিয়ে নিয়েছেন। মানপত্র পেশ, সংবর্ধনা সভা। সবই বেশ সুচারুরূপে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবার মাননীয় অভ্যাগতদের ফিরে যাওয়ার পালা।
কয়েকজন ছাত্র সঙ্গে নিয়ে এসে দাঁড়াল একজন ছিপছিপে কৃষ্ণাঙ্গ কিশোর। মুজিব মেহমানদের পথ আগলে দাঁড়াল।
'আপনাদের যেতে দেব না এখন'-নির্ভয়ে কথা বলে ওঠে কিশোর ছাত্র।
এত সাহস কোথা থেকে এল মিশন স্কুলের এই ছাত্রটির। হেডমাস্টার বিরক্ত হয়ে ওঠেন বাংলার প্রধানমন্ত্রীর সামনে।
'কী করছ মুজিব, সরে দাঁড়াও। দেখছ না অতিথিরা যাবেন এখন,' হেডমাস্টার বলেন।
'না।'
অস্বীকার, অগ্রাহ্যের প্রতীক এই 'না'। মিশন স্কুলের বারান্দায় এই শব্দটি যেন এক সঞ্জীবনী নবচেতনায় স্পন্দিত হয়ে ওঠে। সঙ্গী ছাত্রদের প্রাণে আশার সঞ্চার করে শব্দটি। তারাও এগিয়ে এসে দাঁড়ায় মুজিবের পেছনে।
'আমাদের হোস্টেলের ছাদ দিয়ে পানি পড়ছে। আপনারা কথা দিন ছাদ সারিয়ে দেবেন। তারপর এখান থেকে যেতে পারবেন আপনারা।'
এ যে কিশোর ছাত্রের অলঙ্ঘনীয় দাবি। এ দাবি উপেক্ষা করা যায় না।
মন্ত্রী দুজন নীরবে হাসতে থাকেন। দাবি মঞ্জুর।
অভ্যর্থনা শেষে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ডেকে পাঠান কিশোর ছাত্রকে একান্তে।
মুজিব গিয়ে দাঁড়ায় সোহরাওয়ার্দীর বাংলোর সামনে। এই প্রথম শিষ্য গুরুর সাক্ষাৎ পায়। এ যেন হঠাৎ করে দেখা। সোহরাওয়ার্দী খুঁজছিলেন এমন একজনকে, যাকে সঙ্গে নিয়ে দুস্তর পারাবার অতিক্রম করা যায়।
গোপালগঞ্জের মিশন স্কুলে সেই অপরাহ্ণের আশ্চর্য আলোয় একজন অভিজ্ঞ কামার খুঁজে পেলেন একটা ছোট্ট লোহার খণ্ড। একে প্রত্যক্ষ রাজনীতির আগুনে তাতিয়ে শাণিত অস্ত্রে পরিণত করতে হবে। সোহরাওয়ার্দী এই প্রথম তাঁর একলব্যকে খুঁজে পেয়েছেন। একে ছাড়া যাবে না কখনো।
কলকাতায় ফিরে গিয়ে তিনি চিঠি লেখেন মুজিবকে। শুরু হয় ছাত্রের রাজনীতি পাঠ।
খণ্ড খণ্ড ঘটনা। তুলির অসংলগ্ন আঁচড়ের মতো মনে হয় জীবনপটে।
শহরের পথে এক রুগ্ন বৃদ্ধা পড়ে আছে ধুলার মাঝে। পথ দিয়ে কত লোক চলে যাচ্ছে। কিন্তু কেউ লক্ষ করছে না তাকে। অমন কত ভিখিরিই তো পথে পড়ে মৃত্যুর অপেক্ষা করে প্রতিদিন।
কিন্তু কী হলো সেদিন, এক নবীন কিশোর এসে দাঁড়াল বৃদ্ধার পাশে।
'মা, তোমার কী হয়েছে? কেন তোমার চোখে পানি?'
অস্পষ্ট দৃষ্টি নিয়ে বৃদ্ধা তাকায় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রশ্নকারীর দিকে। কিশোরের প্রশ্নে কত দরদ, কত মমতা রয়েছে ছেলেটির চোখে।
মাটি থেকে রুগ্ন বৃদ্ধাকে তুলে নেয় ছেলেটি। দুই হাতে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে সে পরিত্যক্ত ভিখারিনীকে সযত্নে।
'চলো মা, তোমায় হাসপাতালে নিয়ে যাই। এখানে পড়ে থাকলে তো আর চলবে না।'
নিঃস্ব নারী অজেয় পুত্রকে আশীর্বাদ করেন।
'আল্লাহ, তোমার ভালো করবেন, বাবা।'
দেশ স্বাধীন হলো। নবাব, নাজির, উজিররা এসে পাকিস্তানের তে বসলেন। তদানীন্তন ভারত সরকারের নয়াদিল্লির অফিসে যাঁরা চাকরি করতেন, তাঁদের ভেতর এমন অনেকেই ছিলেন যাঁরা লোকজন, ভিড়, জনতা মিছিল কখনোই পছন্দ করতেন না। ব্রিটিশ সরকার বাহাদুরের অপূর্ব করুণাকীর্তন করতেই যাঁদের সকাল-সন্ধ্যা কাটত, তাঁরা হঠাৎ এসে পাকিস্তানের রক্ষাকর্তা হয়ে দাঁড়ালেন। তাঁরাই সবার চেয়ে ভালো বোঝেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য দিল্লি কলকাতার সরকারি কামরায় বসে পাখার তলায় যাঁরা থাকতেন, তাঁদের সে ঘাম ব্যর্থ হতে তাঁরা দেবেন না। সংকল্প করলেন সিল্কের শেরওয়ানি পরা, আদ্দির কুর্তা পরা দেশপ্রেমীরা।
রাস্তা দিয়ে সবুজ পতাকাবাহী সাধারণ মানুষের কত মিছিল যেত।
জানালা দিয়ে তাঁরা সে দৃশ্য দেখে বলতেন, 'অ্যাগেইন দোজ হুলিগানস আর আউট অন দ্য স্ট্রিট।'
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তাঁরাই এসে সামনের সারির চেয়ারগুলো দখল করে বসলেন।
কায়েদে আজমের নেতৃত্বে ভারতের ১০ কোটি মুসলমান সংগ্রাম করে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পেয়েছিলেন।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হলো। ১৯৪৮ সালে কায়েদে আজম মারা গেলেন।
দেশের জননেতারা তখন কোথায়? পূর্ব পাকিস্তান থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে দেশদ্রোহী বলে। মওলানা ভাসানী এখানকার রাজনীতিতে অপাঙ্ক্তেয়।
বই বাজেয়াপ্ত করার হিড়িক পড়ে গেছে দেশে। সংবাদপত্রের বুকে পা রেখে দাঁড়িয়েছে পরাক্রান্ত পুলিশ। মিছিল নিষিদ্ধ। মানুষের মুখ বন্ধ।
কোথায় গেল উড়ে গরিব মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার? নদী শিকস্তি চরের মানুষ, বাংলার গাঁয়ের চাষি, খেতমজুর, গঞ্জ-বাজারের নিঃস্ব দোকানদাররা ভালো করে বুঝে ওঠার সময় পেলেন না তাঁদের সর্বনাশ কী করে হলো।
সাতচল্লিশ থেকে সত্তর। ২২টি বছরের শেষ। ২২টি হৃদয়নিংড়ানো, জ্বালাময়ী, ব্যথাদীর্ণ ক্লেশময় বছর।
অত্যাচার আর অন্যায়ের একটানা ইতিহাস এ কয়টি বছরে লেখা হয়েছে।
শেখ মুজিবুর রহমান বললেন, 'সোনার বাংলা নিঃশেষ হয়ে গেছে এ কটি বছরে। বাংলার ঘরে ঘরে আজ আর বাতি দেবার লোক নেই।'
কারা এ দুর্দশার জন্য দায়ী।
তিন বছর আগে বেলুচিস্তানে দেখা হয়েছিল এক পাঠানের সঙ্গে, নিঃস্ব হয়ে সে জনমজুরি করছে কোয়েটার রাস্তায়।
চা-খানায় বসে জিজ্ঞেস করলাম ওকে ওর জীবনের কথা। প্রথমে ও কিছু বলতে চায়নি পুলিশের চরের ভয়ে।
কোয়েটার বাজারে গুপ্তচর ঘুরে বেড়ায় প্রতিনিয়ত। আশ্বাস দিলাম পাঠান বন্ধুকে।
'ভয় নেই, নির্ভয়ে বলতে পারো তুমি আমাকে সব কথা।'
বেলুচরা সাধারণত সুপুরুষ। উন্নত দেহ এই মানুষগুলো পাহাড় আর শুষ্ক কঠিন মাটির বুকে জীবনের জয়ধ্বজা উড়িয়ে বেঁচে থাকে।
বলল সে তার দুঃখের পাঁচালি।
কোয়েটা থেকে শ খানেক মাইল দূরে তার একখণ্ড জমি ছিল। ছোট জমির ওপর নির্ভর করে স্ত্রী আর দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে বেঁচে থাকা অসম্ভব। সেই ছোট্ট জমির অংশ একটু একটু করে সে বিক্রি করতে থাকে।
ক্ষুদ্র জমির অংশবিশেষ কেনার মানুষও তাহলে বেলুচিস্তানে আছে। ডিকেড অব প্রগ্রেসের কী অপূর্ব মহিমা।
বেলুচ পাঠান এমনি করেই তার একমাত্র আশার শেষ সম্বলটুকু নিঃশেষ করে ফেলে একদিন। হাতের টাকা ফুরিয়ে যায়। তারপর একদিন রাতের অন্ধকারে সে পালিয়ে এসেছে তার গাঁ ছেড়ে। প্রিয়জনদের পরিত্যাগ করে।
'তোমার ছেলে-মেয়ে আর স্ত্রীর খবর কী?'
'কিচ্ছু জানি না।'
'কত দিন ধরে তুমি কোয়েটার বাজারে কুলির কাজ করছ?'
'ছ মাস।'
এই ছ মাসে এই নিঃস্ব পাঠানের প্রিয়জনেরা কী করছে? সংসার ভেঙে গেছে তার চিরতরে। ইতিহাসে বলা হয়েছে আদিযুগের মানুষ প্রথম তার পরিবার পত্তন করেছিল। কোয়েটার বাজারের পাঠান কুলি তার পরিবার হারিয়ে ফেলেছে বেলুচিস্তানের পাহাড়ের অপর পাশে কোনো অনুর্বর ভূমিতে।
ফরিদপুর, রংপুর, পদ্মার ধারের মানুষ। চাঁদপুর আর নোয়াখালীর লোকেরা তাদের গাঁয়ের বধূকে ফেলে পালাচ্ছে। কিন্তু যাওয়ার কোনো পথ নেই।
বেলুচ পাঠান আর পলিমাটির দেশের লোক আজ ভাবছে এ কোন দেশেতে
জন্ম আমার?
গল্প শুনে শেখ মুজিবের চোখ ছলছল করে উঠল।
'এ জুলুমের শেষ হবেই।'
গোপালগঞ্জে যে যুগে কংগ্রেসি ছাত্ররা খদ্দরের সাদা টুপি মাথায় দিয়ে 'কুইট ইন্ডিয়া' স্লোগান দিয়ে বেড়াতেন, সেই যুগে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের শুরু। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। কলকাতায় কংগ্রেস ট্রামবাস পুড়িয়ে অসহযোগ আন্দোলন করছে। গোপালগঞ্জের দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার পড়েছে ব্রিটিশ ভারত ছাড়ো। শেখ মুজিব তখন গোপালগঞ্জ মহকুমা মুসলিম লীগ ডিফেন্স কমিটির সেক্রেটারি। আর নির্বাচিত হয়েছেন অল ইন্ডিয়া মুসলিম স্টুডেন্টস ফেডারেশনের কাউন্সিলর হিসেবে।
শেখ মুজিব সে যুগে বাংলার মধ্যবিত্ত মুসলিম ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এই যুগের ছাত্র আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতি থেকেই শেখ মুজিবের রাজনৈতিক চেতনাবোধের উন্মেষ। তখনকার বাংলার মুসলিম লীগের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য যেমন পেশাদার উকিল, মোক্তার, ডাক্তার, শিক্ষক, সাংবাদিক এগিয়ে এসেছিলেন বিভিন্ন জেলা ও মহকুমা শহরগুলো থেকে। মধ্যবিত্ত মুক্তি আন্দোলনের পরমার্থ খোঁজার জন্য, তেমনি তাঁদের ঘরের ছেলেরাই প্রধানত ছিলেন মুসলিম ছাত্ররাজনীতির পুরোধা।
নবাব সিরাজউদ্দৌলার নাম কলঙ্কিত করে ব্রিটিশ ঐতিহাসিকের কল্পনাপ্রসূত ব্ল্যাকহোল ট্র্যাজেডির স্বাক্ষর বহনকারী হলওয়েল মনুমেন্ট এককালে দাঁড়িয়েছিল ইংরেজ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় নগরী কলকাতার আপিসপাড়া ডালহৌসি স্কয়ারের মোড়ে। বাংলার বিক্ষুব্ধ মুসলমান ছাত্রসমাজ একদিন সকালে লালদীঘির মোড়ে এসে জমায়েত হলেন।
পনেরো ফুট চওড়া আর পনেরো ফুট লম্বা একটি জায়গা কালো লোহার শিকল দিয়ে ঘেরা। তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে হোয়াইট স্টোনে গড়া হলওয়েল মনুমেন্ট। এখানেই নাকি ছোট কুঠুরিতে বন্দী করে নবাব সিরাজউদ্দৌলার হুকুমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কয়েক শ গোরা সৈন্যকে দম আটকে মেরে ফেলা হয়েছিল। ঘটনাটি সম্পূর্ণ কল্পনাপ্রসূত। উত্তরকালে প্রখ্যাত দেশীয় ঐতিহাসিকেরা যুক্তি দিয়ে এই মিথ্যাকে অস্বীকার করেছেন। পরবর্তীকালের ইউরোপীয় ইতিহাসবিদেরাও সন্দেহ প্রকাশ করেন ব্ল্যাকহোল ট্র্যাজেডির যৌক্তিকতা সম্পর্কে।
হলওয়েল মনুমেন্ট সেদিন শেষবারের মতো দাঁড়িয়ে ছিল লালদীঘির মোড়ে। সমবেত ছাত্রের দল পাথর ভেঙে কলঙ্ক মুছে ফেলার জন্য এগিয়ে গেল কর্ডনরত পুলিশের দিকে।
সেই মুহূর্তে সংগ্রামী মুসলিম ছাত্র-জনতার জন্ম হলো বাংলার বুকে। আরও অনেকের সঙ্গে গোপালগঞ্জ থেকে এসেছিলেন নবীন ছাত্রকর্মী শেখ মুজিব। নিজের চোখে দেখলেন সংগ্রামের শুরু কী করে হলো।
পাকিস্তান আন্দোলন মুসলমান ছাত্রসমাজের কাছে ছিল এক অগ্নিমন্ত্র-ছাত্রসমাজ মনে করত, এই আন্দোলনের দুটো দিক-যারা বঞ্চিত তাদের আত্মত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং এই আন্দোলনই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের আরেক দিক।
যুদ্ধোত্তর কলকাতার রাস্তায় রশীদ আলী দিবসে মুসলমান ছাত্ররা ওয়েলিংটন পার্কে বিক্ষোভ করলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে। তাঁরা লাটভবনে গেলেন বিরাট শোভাযাত্রা নিয়ে।
মুসলমান ছাত্রদের যে অংশ অপেক্ষাকৃত উদার আর প্রগতিশীল মনোভাব নিয়ে আন্দোলন করছিল, তাদের সঙ্গে শরিক ছিলেন শেখ মুজিব। মুসলিম লীগের রাজনৈতিক চিন্তাধারায় যাঁরা প্রগতির কথা বলতেন, তাঁদের মধ্যে সাপ্তাহিক মিল্লাত গ্রুপের কর্মীরা ছিলেন অন্যতম। শেখ মুজিবকে এ সময় দেখা যেত কলকাতার রাস্তার মোড়ে মিল্লাত বিক্রি করছেন।
১৯৪৬-এর নির্বাচনে মুসলিম লীগের জয়লাভ। ১৯৪৭-এর সিলেট রেফারেন্ডাম।
ব্রিটিশের ভারত ত্যাগ। পাকিস্তানের জন্ম। মুসলিম লীগের অভ্যন্তরে এরপর কী করে প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের প্রভাব বৃদ্ধি এবং সম্পূর্ণভাবে ক্ষমতা দখল-এসব কথা ঐতিহাসিকের দলিলে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
ঢাকার সে যুগের কথা অনেকেরই মনে আছে। সবে পাকিস্তান হয়েছে। তখনো নবস্বাধীনতালব্ধ মানুষ নতুন জীবনে রঙিন স্বপ্ন দেখছেন। সেই সময় কিছুসংখ্যক ছাত্র উপলব্ধি করেছিলেন, এ পাকিস্তান তো তাঁরা চাননি। কোথায় গেল খেতমজুর, শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্তের মুক্তির দেশ পাকিস্তান। সেই যুগে প্রকাশ্যে গণতন্ত্রের মশাল জ্বালালেন মাত্র কয়েকজন ছাত্র।
পুরান ঢাকার রক্ষণশীল মহল্লার একটি ছোট ময়দানে সভা ডাকল ডেমোক্রেটিক ইয়ুথ লীগ। এই দলের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে একজন ছিলেন শেখ মুজিব। মহল্লার সাধারণ নাগরিকেরা সভা ভেঙে দিল। সেদিন আর আজকের সময়ের ভেতর কত ব্যবধান। নাজিরাবাজার মহল্লার নাগরিকেরা আজ তো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অগ্রগামী সৈনিক।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর প্রথম জেলে যান শেখ মুজিব। ১৯৪৮-এর ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিনিয়ালস স্ট্রাইক উপলক্ষ করে। এরপর শেখ মুজিবুর রহমান অনেকবারই জেলে গিয়েছেন।
শেখ মুজিবের সমালোচকেরা অভিযোগ করেন যে এই জেলে যাওয়াই শেখ সাহেবের রাজনৈতিক জীবনের সম্বল।
এ ধরনের সমালোচনা অর্থহীন ও অপ্রিয়। শাসকের হাতে শেখ মুজিব দীর্ঘকাল নির্যাতিত হয়েছেন, এ কথা অস্বীকার করা রাজনৈতিক প্রজ্ঞার লক্ষণ নয়। যেমন শেখ সাহেব নির্যাতিত হয়েছেন, তেমনি মওলানা ভাসানীও বন্দী হয়েছেন শাসনকর্তার বন্দিশালায়। তেমনি আরও অনেক সৎ, আদর্শবান এবং মহান আত্মাকে পাকিস্তানের কয়েদখানায় লাঞ্ছনা ভোগ করতে হয়েছে গত বাইশ বছরে।
শেখ মুজিবুর রহমান আমাকে বললেন, 'আমি বলেছিলাম জেলারকে, জুলুম করতে পারো আমার ওপর। কিন্তু আমাকে মারতে পারবে না কখনো।'
বহুদিন আগে মিশন স্কুলের বারান্দায় যে 'না' শব্দটি প্রতিধ্বনিত হয়েছিল, আজও দীর্ঘকাল পরে সেই শব্দেরই অনুরণন শুনলাম শেখ সাহেবের কথায়।
শেখ সাহেবের রাজনৈতিক জীবনের দুটো ভুল হচ্ছে-১৯৫৪ ও ১৯৫৬ সালে এই দুবার মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করা। যে রাজনৈতিক চেতনার ফলে তিনি দীর্ঘকাল সংগ্রাম করে এসেছেন, সেই চেতনাই তাঁকে বলে দিতে পারত, এই সময় মন্ত্রিসভায় গিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্বে মলিন ক্ষমতালোভী মঞ্চে উঠে বসা তাঁর উচিত হয়নি। এখানেই উকিল আর মোক্তার পরিবেষ্টিত সংকীর্ণ স্বার্থবাদী রাজনীতির শিকার হয়ে পড়েন। ওই মন্ত্রিত্ব থেকে তিনি দেশকে কী দিয়েছেন?
আমরা যেখানে বসে ছিলাম, জানালা দিয়ে ভোরের আলো এসে পড়েছে ঘরের দেয়ালে। দেয়ালে উঁচু কোণে এখনো একটি ফ্রেমে বাঁধানো ফটোগ্রাফ ঝুলছে। ১৯৫২ সালে পিকিং শান্তি সম্মেলনে তোলা সেই ছবিটি। চীনা নেতাদের সঙ্গে হাত মেলানো শেখ মুজিব।
শেখ সাহেব ছবিটির দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, 'ভুল করলে সংশোধন করতে হবে। এগিয়ে যেতে হবে। দোজ হু হেজিটেট উইল বি লস্ট ফরএভার।'
১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় পশ্চিম পাকিস্তানের সীমান্তে যখন দুই দেশের সৈন্যদল আত্মঘাতী লড়াই শুরু করে দিয়েছিল, তখন পূর্ব পাকিস্তান বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
সাবেক জাতীয় পরিষদের সদস্য শাহ আজিজুর রহমান সেদিন লন্ডনে। লন্ডনের সান্ধ্য পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে-ইন্ডিয়া অ্যাটাকস পাকিস্তান। টিউব স্টেশনের মোড়ে হকাররা চিৎকার করে কাগজ বিক্রি করছে-গ্রেটেস্ট ট্যাংক ব্যাটল সিন্স এল-আলামিন।
লন্ডন থেকে যেসব পূর্ব পাকিস্তানি নাগরিক দেশে ফিরছিলেন, তাঁদের বিমান থেকে নামিয়ে নেওয়া হলো। নো মোর ফ্লাইট টু ঢাকা। টেলিফোন, টেলিগ্রাফ-ঢাকার সঙ্গে সব রকম সংযোগ বন্ধ। শাহ আজিজুর রহমান সপ্তাহখানেক পর অর্ধেক দুনিয়া ঘুরে রেঙ্গুন হয়ে ঢাকায় পৌঁছালেন বোধ হয় শেষ পর্যন্ত। যুদ্ধ চলাকালে পুরো সময়টা পূর্ব পাকিস্তান বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল।
লন্ডনের পাকিস্তান হাইকমিশনে পূর্ব পাকিস্তানিরা ভিড় করতেন প্রতিদিন দেশের খবর জানার জন্য। প্রতিদিন সেই একই জবাব আসত হাইকমিশন থেকে-উই হ্যাভ নো নিউজ ফ্রম ঢাকা। অজানা আশঙ্কায় উদ্বেলিত জনতা ফিরে যেতেন মৌন মুখে।
সেদিন পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় বন্ধুজন হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন যাঁরা, তাঁদের কথা ভুলে যাওয়া উচিত হবে না। চীন তিনবার স্পষ্ট ভাষায় ভারতকে শাসিয়ে দিয়েছিল, ভারত যদি যুদ্ধবিস্তৃতি ঘটায় পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তে, তাহলে বন্ধুরাষ্ট্রের সহযোগিতায় সর্বাগ্রে ছুটে আসবেন তাঁরা। ইরান পাকিস্তানকে পেট্রল সরবরাহ করার পূর্ণ আশ্বাস দিয়েছিল। ইন্দোনেশিয়া তার যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে দিয়েছিল ভারত মহাসাগরে টহল দেওয়ার জন্য। তুর্কি সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল সমরসজ্জা দিয়ে। এরাই ছিলেন সেদিনকার দুর্যোগের সাথি। কেউ এসেছিলেন ধর্মীয় ভ্রাতৃবন্ধনের টানে। আবার কেউ এসেছিলেন সব দেশের মানুষের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে সর্বকালের জন্য অটুট রাখার দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে।
বাংলার ঘরে কিন্তু সেদিন মানুষের মন যেন নির্বাক হয়ে গিয়েছিল ক্ষণকালের জন্য। কোনো এক আশ্চর্য জিজ্ঞাসায় মথিত হচ্ছিল বাংলার বাতাস। মানুষের প্রাণের ডাক পলিমাটির বুক থেকে নবাঙ্কুরের মতো উদিত হচ্ছিল নীল আকাশের দিকে মাথা তুলে। গগনচুম্বী একটিমাত্র বাক্য জন্ম নেওয়ার পূর্বমুহূর্তে মৌনতার কুঁড়িতে লুকিয়ে ছিল শেষবারের মতো।
নারায়ণগঞ্জের মাঠে ১৯৬৬ সালের জনসভা। ওপারে মগরাপাড়া, সোনাকুণ্ডা, আরও দূরের গাঁ থেকে এসেছেন জনতা। নতুন কথা শোনার জন্য।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে সারা দেশের উদ্দেশে শেখ মুজিব ছুড়ে দিলেন আগুনের জ্বলন্ত ফুলকির মতো একটি বাক্য। আমাদের বাঁচতে দাও। যেমন করে মশালের মুখ থেকে আগুন নিয়ে আরেকটি মশাল জ্বলে ওঠে। যেমন করে শব্দ বহু প্রতিধ্বনিত হয়ে জেগে ওঠে পাহাড়ের গায়ে প্রতিবিম্বিত হয়ে। যেমন করে শিশুর কলহাস্যে বাংলার উঠোন ভরে যায়। যেমন করে মায়ের বুকের ঘ্রাণে গাঁয়ের বাতাস চঞ্চল হয়, তেমনি করেই জন্ম হলো এই একটি বাক্যের।
বাঁচার অধিকার আমাকে দিতে হবে। এ ধ্রুববাক্যের সেদিন জন্ম না হলে ইতিহাস মিথ্যা হয়ে যেত। ইতিহাসবেত্তারা বুঝবেন, সেদিন এ বাক্যের জন্মের জন্য অপেক্ষা করছিল দেশ। ম্যাক্সিম গোর্কি যে মাদার লিখেছিলেন, জুলিয়াস ফুচিক যে জন্য ফাঁসির মঞ্চে প্রাণ দিয়েছিলেন, গার্সিয়া লোরকা স্পেনের জেগে ওঠার গান যে জন্য গেয়েছিলেন, যে জন্য বরকত ঢাকার রাস্তায় মৃত্যুহীন প্রাণ বিলিয়ে দিয়ে গিয়েছেন, যে জন্য চাটগাঁর রমেশ শীল কবিগান গাইতেন, জসীমউদদীন যে মায়ের কথা কবিতায় বলেন, তাঁর অশ্রু ছুঁয়ে এই বাক্যের জন্ম হয়েছে।
পূর্ব পাকিস্তানকে বাঁচতে দাও।
এ কথা এর আগেও বলে গেছেন অনেকে। কিন্তু এমন জ্বালাময়ী করে এর আগে কেউ বলেননি। তাই ইসলামাবাদ থেকে গর্জে উঠলেন আইয়ুব খান।
দ্য ল্যাংগুয়েজ অব ওয়েপন উইল আনসার দ্য ডিমান্ডস বাই দ্য শেখ। আইয়ুব বললেন, সারা দেশে আমি গৃহযুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দেব।
গভর্নর মোনায়েম খাঁ কালবিলম্ব না করে শেখকে বাদী করলেন।
উনিশ শ ছেষট্টির ৭ জুন। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গীর রাস্তায় গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ল শ্রমিকেরা। সংগ্রামী জনতা বেয়নেটের সামনে প্রাণ দিতে এগিয়ে গেলেন।
লন্ডনের প্রগতিশীল মাসিক পত্রিকা এশিয়ান টাইড ঢাকার রক্তাক্ত সাতই জুন সম্পর্কে লিখেছিল, আওয়ামী লীগ কোনো রেভল্যুশনারি পার্টি নয়। কিন্তু আজ এই দল আইয়ুব সরকারের জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে এগিয়ে এসেছে এককভাবে। পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিচ্ছেন এদের দাবির সমর্থনে দেশের জনসাধারণ। এদের সংগ্রামী চেতনাকে অস্বীকার করা রাজনৈতিক অদূরদর্শিতারই পরিচায়ক হবে। পাকিস্তানের বামপন্থী দলগুলো যখন পোলেমিকসের দ্বন্দ্বে বিব্রত, আইয়ুবের বৈদেশিক নীতিতে তথাকথিত প্রগতিশীল লক্ষণকে সমর্থন করতে গিয়ে যখন তারা নির্বাক হয়ে আছেন, তখন আওয়ামী লীগের সংগ্রামী তৎপরতা বিশ্ববাসীর কাছে লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
সে সময়কার এশিয়ান টাইড পত্রিকার এই মন্তব্য চিন্তা করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার এত বড় একটা ভাঁওতা কোনো সরকার কখনো কোনো দেশের ওপর চালিয়ে দিয়েছে, এমন নিদর্শন দুনিয়ার ইতিহাসে কম।
নাৎসি জার্মানি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ লাগিয়েছিল এমনি ধরনের এক মিথ্যা ষড়যন্ত্রকে কেন্দ্র করে। জার্মানিতে যুদ্ধের পাঁয়তারা চলছিল হিটলার যেদিন বার্লিনে চ্যান্সেলর হয়ে বসলেন, সেদিন থেকেই। তারপর ১৯৩৯ এল। সময় হলো প্রতিবেশী দেশ পোল্যান্ড আক্রমণ করার।
জার্মানি-পোলিশ সীমান্ত ছিল জার্মানির একটি ছোট রেডিও স্টেশন।
জার্মানির বন্দিশালা থেকে কয়েকজন কয়েদিকে গুলি করে মেরে ফেলা হলো। তারপর তাদের পরিয়ে দেওয়া হলো পোলিশ সৈন্যদের ইউনিফর্ম। এবারের মৃত বন্দীদের নিয়ে গিয়ে সীমান্তের কাঁটাতারের পাশে বিক্ষিপ্তভাবে ফেলে রাখা হলো।
ভোর না হতেই বার্লিন রেডিও থেকে দুনিয়ার সামনে ঘোষণা করা হয়-পোল্যান্ডের সৈন্যরা রাতের অন্ধকারে জার্মান সীমান্ত অতিক্রম করে একটি বেতারকেন্দ্র আক্রমণ করেছে। এ অপমান জার্মানি সহ্য করতে পারে না। সুতরাং যুদ্ধ। দলে দলে ফটোগ্রাফার গিয়ে বিক্ষিপ্ত মৃতদেহের ছবি তুলে নিয়ে ছাপাল জার্মানির কাগজ। পরদিন ৩ সেপ্টেম্বর জার্মান বাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করে পোল্যান্ড আক্রমণ করে। মিথ্যা অপমানের প্রতিশোধ নিতে হিটলার দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু করেছিলেন।
এমনি ধরনের মিথ্যা সাজানো মামলা আগরতলার ষড়যন্ত্র। শেখ মুজিবকে পঁচিশ বছর জেলে থাকতে হবে। পল্টনের মাঠে আর কখনো তাঁকে আসতে হবে না। শাসিয়েছিলেন সেদিনকার রক্তচক্ষু শাসকেরা।
কেন শেখ মুজিব তাঁদের একমাত্র দুশমন হয়ে দাঁড়ালেন? বাইশ বছর ধরে যাঁরা চক্রান্তের জাল বুনেছেন, তাঁরা আর শেখকে সহ্য করতে পারছিলেন না।
এর আগেই শেখের বিরুদ্ধে তেরোটি মামলা আনা হয়েছিল। আপত্তিকর বক্তৃতা দেওয়া তাঁর অপরাধ। শেখ মুজিব নিজেই এই মামলাগুলো সম্পর্কে বলেছেন, '১৯৬৬ সালের এপ্রিল মাসে প্রথমে আমাকে যশোরে গ্রেপ্তার করা হয়। খুলনার এক জনসভায় বক্তৃতা দেওয়ার পর যশোর হয়ে আমি ঢাকা ফিরছিলাম। যশোরে পুলিশ এল। আপত্তিকর বক্তৃতা দেওয়ার অভিযোগে ঢাকা থেকে প্রদত্ত এক পরোয়ানা দেখিয়ে আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়।'
এই উপাখ্যানের শেষ এখানেই নয়।
শেখ সাহেব বলে যান, 'যশোরের মহকুমা হাকিমের সামনে আমাকে হাজির করা হয়। তিনি অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করেন। আমি ঢাকায় ফিরে এলে সদর মহকুমা হাকিম আমার জামিনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু ওই দিনই মাননীয় দায়রা জজ আমার জামিন মঞ্জুর করায় আমি মুক্তি পাই।'
'সন্ধ্যা সাতটায় আমি বাড়ি পৌছাই। কিন্তু বিড়ম্বনার শেষ এখানে নয়। এক ঘণ্টা পর রাত আটটায় পুলিশ আরেকটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে আমার বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত।' শেখ মুজিবুর রহমান বলতে থাকেন, 'সিলেটে আপত্তিকর বক্তৃতা দেওয়ার অভিযোগে এই পরোয়ানা সেখান থেকে দেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তার করে সেই রাতেই পুলিশ প্রহরাধীনে আমাকে সিলেটে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন সকালে সিলেটের মহকুমা হাকিম আমার জামিনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে আমাকে হাজতে পাঠিয়ে দেন। এর পরদিন সিলেটের মাননীয় দায়রা জজ আমার জামিন মঞ্জুর করেন, আমি মুক্তি পাই।'
এ যেন রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজের গোয়েন্দা কাহিনি। যুক্তিতর্কের অতীত চরম বিবেকহীনতার এক সুদীর্ঘ বিরতিহীন বর্ণনার মতো শোনায় শেখ মুজিবুর রহমানের মুখের কথাগুলো।
তিনি বলে যান, 'সিলেটের জেলগেটে এক নতুন পরোয়ানাবলে আমাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। মোমেনশাহীর কোনো জনসভায় আপত্তিকর বক্তৃতা নাকি আমি দিয়েছিলাম। সেদিন রাতেই পুলিশের পাহারায় আমাকে সিলেট থেকে মোমেনশাহী নিয়ে যাওয়া হয়।'
শুরু হয় সেই পরিচিত ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি।
শেষে ১৯৬৬ সালের ৮ মে নারায়ণগঞ্জের এক জনসভা থেকে রাতে ফিরে এলে ঢাকার পুলিশ শেখ মুজিবুর রহমানকে দেশ রক্ষা আইনে গ্রেপ্তার করে।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রথম অধ্যায়ের শুরু সেই রাতেই। ·

0 মন্তব্যসমূহ