জ্ঞানের প্রত্নবিদ্যা : স্টেটমেন্ট কী
আমরা যেটাকে স্টেটমেন্ট বলি, তাকে ফুকো বলেছেন কথার জগতের বীজ। তিনি বলছেন, আমরা যে বারবার স্টেটমেন্ট শব্দটা ব্যবহার করছি, এটি আসলে কী? একটি কথাকে কখন আমরা স্টেটমেন্ট বলব?
ফুকো তিনি দেখাচ্ছেন, আমরা সচরাচর যা ভাবি, স্টেটমেন্ট তার থেকে আলাদা। যুক্তিবিদ্যায় আমরা সত্য-মিথ্যা বিচার করি, যেমন সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে। ফুকো বলছেন, না। যুক্তির নিয়ম আর স্টেটমেন্টর নিয়ম এক নয়। আপনি বললেন, ‘কেউ শোনেনি’, আবার বললেন, ‘এটি সত্য যে কেউ শোনেনি।’ যুক্তির দিক থেকে দুটো কথার মান সমান। কিন্তু একটি উপন্যাসের শুরুতে ‘কেউ শোনেনি’ লেখা থাকলে বোঝা যায় লেখক বর্ণনা দিচ্ছেন। আর ‘এটি সত্য যে...’ বললে মনে হয় কেউ তর্কে জড়াচ্ছে, অর্থাৎ একই কথা বা যুক্তি হলেও পরিস্থিতি অনুযায়ী তা আলাদা স্টেটমেন্ট হতে পারে।
আমরা ভাবি, ব্যাকরণ মেনে কর্তা, কর্ম ও ক্রিয়া থাকলেই সেটা স্টেটমেন্ট। ফুকো বলছেন, মোটেও না। আপনি মুদির দোকানে গিয়ে পকেট থেকে একটি লিস্টি বের করে দোকানির হাতে ধরিয়ে দিলেন, যেখানে লেখা আছে চাল, ডাল তেল। এগুলি পূর্ণাঙ্গ বাক্য নয়, আমি চাল চাই, বা ডাল-তেল চাই এমন লেখা নেই। কিন্তু এগুলি কি অর্থপূর্ণ স্টেটমেন্ট নয়? নিশ্চয়ই অর্থপূর্ণ। ক্রিকেট খেলার সময় টিভিতে আমরা রান রেইটের চার্ট দেখি। সেখানে কোনো বাক্য লেখা থাকে না, শুধু দাগ আর সংখ্যা থাকে। কিন্তু ওটা দেখে আমরা সব বুঝি। ফুকো বলছেন, এই চার্টও একেকটা স্টেটমেন্ট। সুতরাং বাক্য না হলেও স্টেটমেন্ট হতে পারে।
ভাষাবিদরা বলেন, কথা বলা মানেই একটি কাজ করা, যেমন আদেশ দেওয়া, প্রতিজ্ঞা করা। বিবাহে যখন বর বা কনে যখন কবুল বলে, তখন সে একটি কাজ মানে বিবাহ সম্পন্ন করে। কিন্তু ফুকো বলছেন, একটি প্রার্থনা বা একটি চুক্তিনামায় অনেকগুলি বাক্য থাকে। সেখানে অনেকগুলি স্টেটমেন্ট মিলে একটি কাজ হয়। তাই কাজ আর স্টেটমেন্ট এক জিনিস নয়।
তাহলে স্টেটমেন্ট আসলে কী? ফুকো বলছেন যে, স্টেটমেন্ট কোনো বস্তু নয়, যেমন কলম বা কাগজ, আবার এটি নিছক ভাষাও নয়। স্টেটমেন্ট হল মূলত অস্তিত্বের সক্রিয়তা। একগাদা অক্ষর বা শব্দ যখন বিশেষ কোনো নিয়ম মেনে, বিশেষ কোনো সময়ে এবং পরিস্থিতিতে একটি অর্থপূর্ণ অস্তিত্ব পায়, তখনই সেটা স্টেটমেন্ট হয়। আপনি কি-বোর্ডের দিকে তাকালেন। সেখানে ‘ঙ, য, ড, প, ট, চ’ ইত্যাদি অক্ষর ছাপা আছে। এই কি-বোর্ড কি কোনো স্টেটমেন্ট? না, এটি একটি সরঞ্জাম মাত্র। আপনি যদি কাগজে এলোমেলোভাবে ‘ঙ, য, ড, প, ট, চ’ লেখেন, সেটা কি স্টেটমেন্ট? না, ওটা অর্থহীন হিজিবিজি হিজিবিজি। কিন্তু, যদি আপনি একটি টাইপিং শেখার বই খোলেন এবং সেখানে লেখা দেখেন যে বাঙলা টাইপ শিখবার জন্য আঙুলগুলি ‘ঙ, য, ড, প, ট, চ’ অক্ষরের ওপর বাম হাতের আঙুল এমনভাবে রাখুন ইত্যাদি, তখন এই ‘ঙ, য, ড, প, ট, চ’ আর এলোমেলো অক্ষর থাকে না। তখন এটি একটি স্টেটমেন্ট হয়ে ওঠে। কারণ তখন এটি একটি নির্দিষ্ট নিয়ম বা জ্ঞানের অংশ হয়ে গেছে। ফুকো বোঝাতে চাইছেন যে, কেবল শুধু ব্যাকরণ শুদ্ধ হলেই হয় না, কেবল যুক্তি থাকলেই হবে না। স্টেটমেন্ট সেই বিশেষ মুহূর্ত বা শর্ত, যা একগাদা নিরর্থ, হিজিবিজি বা মৃত চিহ্নকে জীবন্ত করে তোলে, অর্থ দেয়। এটি এমন এক জাদুকরী সক্রিয়তা, যা ঠিক করে দেয় কখন, কোথায় এবং কেমন করে কিছু চিহ্ন বা কথা অর্থপূর্ণ হয়ে উঠবে। ক্রিকেট বোর্ডের স্কোর বোর্ড, গণিতের সূত্র, বাজারের লিস্টি, কিংবা উপন্যাসের লাইন, এরা দেখতে আলাদা হলেও, এরা সকলেই এক একটি স্টেটমেন্ট, কারণ এরা নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে আমাদের কাছে অর্থ প্রকাশ করছে।
স্টেটমেন্ট কোনো কাঠামো নয়, এটি এমন এক সক্রিয়তা, যা চিহ্নকে অর্থ ও অস্তিত্ব প্রদান করে।
আমরা যখন কথা বলি বা কিছু লিখি, তখন আমরা মনে করি আমরা কেবল কিছু শব্দ সাজিয়ে বাক্য তৈরি করছি। ছোটোবেলা থেকে ব্যাকরণ বইতে আমরা শিখেছি, কিছু শব্দ পাশাপাশি বসে যদি মনের ভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করে, তবে তাকে বাক্য বলে। ফুকো বলছেন সব বাক্যই কিন্তু স্টেটমেন্ট নয়। আবার সব স্টেটমেন্টই যে ব্যাকরণ মেনে চলা বাক্য হতে হবে, তাও নয়। স্টেটমেন্ট কোনো সাধারণ বাক্য নয়, আবার এটি কোনো যুক্তির খেলাও নয়। স্টেটমেন্ট হল এমন এক জাদুকরী ক্ষমতা বা ভিত্তি, যা কতগুলি মৃত শব্দ বা চিহ্নকে প্রাণ দান করে। একটি শাদা কাগজে কিছু আঁকিবুঁকি কাটা আছে। যতক্ষণ না সেটা কোনো অর্থ তৈরি করছে, ততক্ষণ সেটা শুধুই কালির দাগ। কিন্তু যখনই সেটা একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে কোনো অর্থ তৈরি করে, তখন সেই কালির দাগগুলি অস্তিত্বশীল হয়ে ওঠে। এই যে অস্তিত্ব দেবার ক্ষমতা, এটিই স্টেটমেন্ট।
আমরা সাধারণত মনে করি, ভাষার কাজ হল জগতের কোনো কিছুকে নির্দেশ করা, যেমন আমি যদি বলি ‘গাছ’, আপনি সঙ্গে সঙ্গে জানালার বাইরের সবুজ একটি উল্লম্ব উদ্ভিদকে কল্পনা করবেন। আমি যদি বলি ‘টেবিল’, আপনি কাঠের চারপায়া একটি আসবাবের কথা ভাববেন। কিন্তু স্টেটমেন্টর কাজ এত সরল নয়। স্টেটমেন্ট সবসময় বাস্তব বস্তুকে নির্দেশ করে না, সে নিজেই তার সত্যতার জগৎ তৈরি করে নেয়। কেউ একজন বলল বা লিখল, ‘নোয়াখালিতে সোনারপাহাড় আছে।’ এখন আপনি বইপত্র নিয়ে বসেন কিংবা নানাভাবে তন্ন তন্ন করে খোঁজেন, নোয়াখালিতে কোনো সোনার পাহাড় পাবেন না। যুক্তিবিদ্যা বা পণ্ডিতরা বা অনেকেই বা সকলেই বলবেন, ‘এই বাক্যটা মিথ্যা, কারণ বাস্তবে এর কোনো রেফারেন্স নেই।’ অথবা ‘এটি সত্য-মিথ্যার বিচারেই আসে না, এটি অর্থহীন।’
কিন্তু ফুকো বলছেন, না, এটি অবশ্যই একটি স্টেটমেন্ট। কেন? কারণ, এই বাক্য যখন কোনো গল্পে উপন্যাসে লেখা হয়, তখন সেই গল্পের কল্পনার জগতে এই ‘সোনার পাহাড়’ একদম জীবন্ত সত্য। সেখানে এই বাক্যটার একটি মূল্য আছে। স্টেটমেন্ট হতে গেলে বাস্তবে সেই জিনিসের অস্তিত্ব থাকতেই হবে, এমন কোনো দিব্যি দেওয়া নেই। স্টেটমেন্ট তার নিজের খেলার মাঠ বা জগৎ নিজেই তৈরি করে নেয়।
আমরা সবাই জানি ঘোড়া আকাশে উড়তে পারে না, তাদের ডানা নেই। বাস্তবে পক্ষীরাজ ঘোড়া বলে কিছু নেই। কিন্তু যখন ঠাকুরমার ঝুলিতে আমরা পড়ি যে ডালিম কুমারের পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়ে উড়ে চলবার কথা, তখন কি আমরা বলি যে লেখক মিথ্যা কথা বলছেন? বলি না। কারণ রূপকথার ওই বিশেষ জগতে পক্ষীরাজ ঘোড়া একটি অত্যন্ত শক্তিক্ষম ও সত্য স্টেটমেন্ট। ফুকো এটিই বোঝাচ্ছেন যে, স্টেটমেন্টর একটি সহসম্পর্কিত বিষয় থাকে। এ সবসময় চোখের সামনে দেখা ইট-কাঠ-পাথরের বস্তু হবে না। এ হতে পারে কোনো কাল্পনিক জগৎ, কোনো প্রতীকের জগৎ, অথবা কোনো স্বপ্নের জগৎ।
ফ্রান্সের বর্তমান রাজা খুব টাকমাথা। বাস্তবে ফ্রান্সে এখন গণতন্ত্র, কোনো রাজা নেই। তাই বাস্তব জগতের হিসেবে এই কথাটা পাগলের প্রলাপ। কিন্তু যদি কোনো ঐতিহাসিক উপন্যাসে বা নাটকে এই লাইনটা থাকে, তখন সেই নাটকের জগতের নিয়মে এটি একটি অর্থপূর্ণ স্টেটমেন্ট। সুতরাং স্টেটমেন্ট বস্তুর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রাখে না, সে এমন একটি ক্ষেত্র তৈরি করে যেখানে তার কথাগুলির গুরুত্ব আছে।
আমরা ভাবি, যে মানুষটি কলম দিয়ে লিখছে বা মুখ দিয়ে বলছে, সেই হল সেই কথার স্রষ্টা । যেমন আমি এখন এই লেখাটা লিখছি, তাই আমিই এর লেখক। কিন্তু ফুকো বলছেন, রক্ত-মাংসের লেখক আর স্টেটমেন্টর স্রষ্টা, এই দুইজন এক ব্যাপার নয়। বইয়ের মলাটে লেখকের নাম জ্বলজ্বল করছে, হুমায়ূন আহমেদ। তিনি একজন রক্ত-মাংসের মানুষ, যিনি নুহাশপল্লিতে থাকতেন। কিন্তু উপন্যাসের ভেতরে যখন হিমু বলছে, ‘আমি আজ হলুদ পাঞ্জাবি পরেছি, রূপা’, তখন এই ‘আমিটা কে? এই ‘আমি’ কি হুমায়ূন আহমেদ? না। হুমায়ূন আহমেদ হয়তো তখন লুঙ্গি পরে ঘরে বসে লিখছিলেন। তাহলে ওই ‘আমি’টা হল একটি কাল্পনিক চরিত্র বা একটি অবস্থান। আবার গল্পের বর্ণনাকারী যখন বলছেন, ‘রাস্তায় খুব কড়া রোদ ছিল’, তখন সেই বর্ণনাকারী কে? সে একজন অদৃশ্য কথক।
ফুকো বলছেন, স্টেটমেন্টর স্রষ্টা কোনো নির্দিষ্ট মানুষ নয়। এটি একটি ‘খালি চেয়ার’ বা শূন্যস্থানের মতো। এই চেয়ারে যে কেউ বসতে পারে। স্টেটমেন্টর স্রষ্টা হওয়া মানে হল একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা পালন করা বা একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে দাঁড়ানো। জ্যামিতি বইতে লেখা আছে, ‘ধরি, একটি ত্রিভুজের তিনটি কোণ...’। এই কথাটা কে বলছে? বইয়ের লেখক? নাকি আপনি, যখন আপনি অঙ্কটি করছেন? নাকি আপনার শিক্ষক? আসলে, গণিতের ক্ষেত্রে এই ‘আমি’ হল সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে, যেকোনো মানুষ যখন এই উপপাদ্য প্রমাণ করতে যাবে, সে-ই তখন ওই স্টেটমেন্টর স্রষ্টা হয়ে যাবে। এখানে স্রষ্টা কোনো ব্যক্তিমানুষ নয়, স্রষ্টা হল একটি যৌক্তিক অবস্থান।
ডাক্তার যখন খসখস করে লিখলেন, ‘দিনে তিনবার এই ওষুধ খাবেন”, তখন তিনি ‘আরিফ উদ্দিন’ বা ‘আয়শা ইসলাম’ হিসেবে লিখছেন না। তিনি লিখছেন ‘ডাক্তার’ নামের একটি অবস্থানের ক্ষমতার চেয়ারে বসে। ওই চেয়ারে যদি অন্য কোনো ডাক্তার এসে বসতেন, তিনিও একই ক্ষমতা নিয়ে একই স্টেটমেন্ট লিখতেন, অর্থাৎ প্রেসক্রিপশনের ওই লেখাটার শক্তি কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে ‘ডাক্তার’ নামক ওই অবস্থানটার ওপর। ফুকো আমাদের শেখাচ্ছেন, কোনো কথার বিশ্লেষণ করতে গেলে লেখকের মনের ভাব বোঝার চেষ্টা করে লাভ নেই। বরং দেখতে হবে, ওই কথাটা বলবার জন্য একজনকে সমাজ বা প্রতিষ্ঠানের কোন চেয়ারটায় বসতে হয়েছে।
ফুকো বলছেন, কোনো স্টেটমেন্টই মহাশূন্যে একা একা ভেসে বেড়াতে পারে না। একটি বাক্য ব্যাকরণ মেনে গঠিত হতে পারে, কিন্তু সেটা ‘স্টেটমেন্ট’ হয়ে উঠবার জন্য তার চারপাশে আরও অনেক স্টেটমেন্টর একটি জাল থাকা চাই। আপনি একা একটি মানুষ, কিন্তু আপনার পরিচয় কি শুধু আপনার শরীরে? না। আপনার পরিচয় তৈরি হয়, আপনি কার সন্তান, কার বন্ধু, কোন দেশের নাগরিক, কোন সমাজে বাস করেন ইত্যাকার সম্পর্কের জালের মাধ্যমে। স্টেটমেন্টর ক্ষেত্রেও একদমই তাই। আপনি একটি কাগজে শুধু একটি শব্দ লেখা দেখলেন, ‘আগামীকাল’। এটি কি কোনো স্টেটমেন্ট? না, এটি শুধুই একটি শব্দ। এর কোনো আগা-মাথা নেই। কিন্তু যদি কেউ বলে, ‘আমি তোমাকে আগামীকাল গোপন কথাটা বলব’, তখন এটি একটি বাক্য এবং একটি স্টেটমেন্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু খেয়াল করুন, এই কথাটার পূর্ণ অর্থ বুঝতে হলে আপনাকে আরও অনেক কিছু জানতে হবে। কে বলছে? কাকে বলছে? আগে কী কথা হয়েছিল? কোন গোপন কথার ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে? ফুকো বলছেন, শুধু পরিস্থিতির কথা জানলেই হবে না। একটি স্টেটমেন্ট অন্য স্টেটমেন্টর সঙ্গে সম্পর্কিত হয়েই বেঁচে থাকে, যেমন একটি উপন্যাসের মাঝখানের একটি লাইন আর বিজ্ঞানের বইয়ের মাঝখানের একটি লাইন, দুটো বাক্যের গঠন হয়তো এক, কিন্তু তাদের ক্ষেত্র আলাদা। উপন্যাসের লাইনটি তার আগের ও পরের লাইনের সঙ্গে মিলে একটি দৃশ্যকল্প তৈরি করছে। আর বিজ্ঞানের লাইনটি বিজ্ঞানের অন্যান্য সূত্র ও প্রমাণের সঙ্গে মিলে একটি বৈজ্ঞানিক সত্যের জগৎ তৈরি করছে। এই ‘ক্ষেত্র’ কীভাবে কাজ করে? ফুকো বলছেন, এটি একটি জটিল মাকড়সার জালের মতো।
একটি স্টেটমেন্ট প্রায়ই পুরোনো কোনো স্টেটমেন্টকে মনে করিয়ে দেয়। যেমন আমরা যখন বলি, ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’, তখন আমরা জানি এটি একটি আপ্তবাক্য এবং এর পেছনে একটি ঘটনা আছে।
একটি স্টেটমেন্ট ভবিষ্যতের কোনো স্টেটমেন্টর জন্য পথ খুলে দেয়। যেমন কেউ প্রশ্ন করলে, সেই প্রশ্নটা একটি উত্তরের অপেক্ষা তৈরি করে।
সব কথার ওজন সমান নয়। কোনো কথাকে আমরা বলি ‘সাহিত্য’, কোনোটাকে বলি ‘ধর্মীয় বাণী’, আবার কোনোটাকে বলি ‘বকবক’। এই যে একটি কথাকে সাহিত্য, ধর্ম বা বিজ্ঞান হিসেবে মেনে নেওয়া, এটি সম্ভব হয় কারণ ওই কথাটার চারপাশে সেই সংক্রান্ত আরও হাজারটা কথা বা নিয়ম জড়িয়ে আছে। কাজেই, একা একা কোনো স্টেটমেন্টর অস্তিত্ব নেই। সে সবসময় একটি নেটওয়ার্ক বা জালের অংশ হিসেবেই অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ফুকো বলছেন, একটি স্টেটমেন্ট হতে হলে তার অবশ্যই একটি শরীর বা বস্তুগত রূপ থাকতে হবে। হাওয়ায় ভাসা কোনো চিন্তা স্টেটমেন্ট নয়। সেটাকে হয় মুখে উচ্চারণ করতে হবে শব্দতরঙ্গ হিসেবে, অথবা কোথাও লিখে রাখতে হবে, অথবা রেকর্ড করতে হবে। অদৃশ্য বা অবস্তুগত কোনো কিছুই স্টেটমেন্ট হতে পারে না। কোনো কথা যদি কেউ কোনোদিন না বলে, কোথাও না লেখে, তবে সেটা স্টেটমেন্ট নয়। কিন্তু এই বস্তুগত রূপ আসলে কী? এবং কখন আমরা বলব যে এটি একই স্টেটমেন্ট? আপনি রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’র একটি অনেক দামি, সুন্দর বাঁধাই করা সংস্করণ কিনলেন। আর আপনার বন্ধু নীলক্ষেত থেকে একটি সস্তা, নিউজপ্রিন্ট কাগজের পাইরেটেড কপি কিনল। এখন দেখুন, দৃশ্যত ও স্পর্শত দুটো জিনিস কিন্তু আলাদা। একটির কাগজ ভালো, অন্যটার খারাপ। একটির অক্ষর হয়তো বড়ো, অন্যটার ছোটো। একটির ওজন বেশি, অন্যটার কম। কিন্তু আমরা কি বলব যে আপনারা দুটো আলাদা বই পড়ছেন? না। আমরা বলি, আপনারা দুজনেই গীতাঞ্জলি পড়ছেন।
ফুকো বলছেন, স্টেটমেন্টর বস্তুরূপ সাধারণ বস্তুর মতো নয়। এটি পুনরাবৃত্তিযোগ্য, যতক্ষণ না মূল শব্দ বা অর্থের কোনো বিশাল পরিবর্তন হচ্ছে, ততক্ষণ হাজার হাজার কপি ছাপা হলেও, অক্ষরের আকার পালটালেও সেটা একই স্টেটমেন্ট হিসেবে গণ্য হবে। আমাদের সমাজ বা প্রতিষ্ঠান ঠিক করে দিয়েছে যে, এই ছোটোখাটো শারীরিক পার্থক্যগুলি স্টেটমেন্টর মূল পরিচয়কে পালটাতে পারে না। কিন্তু সব ক্ষেত্রে এই নিয়ম খাটে না। প্রসঙ্গ পালটালেও একই বাক্য আলাদা স্টেটমেন্ট হয়ে যেতে পারে। একজন লেখক তার ব্যক্তিগত ডায়েরিতে জানালার দিকে তাকিয়ে লিখলেন, ‘বৃষ্টি নামছে’। আবার তিনি তার গল্পের ভেতরেও হুবহু একই লাইন লিখলেন, ‘বৃষ্টি নামছে’। বাক্য দুটো দেখতে এক, শব্দ এক, বানান এক। কিন্তু ফুকো বলছেন, এই দুটো এক স্টেটমেন্ট নয়। কেন? কারণ ডায়েরির লেখাটা বাস্তবের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেদিন সত্যি সত্যি বৃষ্টি হচ্ছিল। আর উপন্যাসের লেখাটা কাল্পনিক জগতের অংশ, সেখানে বৃষ্টি হওয়া বা না হওয়া লেখকের খেয়াল-খুশির ওপর। তাদের ব্যবহারের ক্ষেত্র আলাদা, তাই তারা আলাদা স্টেটমেন্ট। স্টেটমেন্টর পরিচয় নির্ভর করে সেটা কোথায়, কীভাবে এবং কোন নিয়মে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর।
অনুবাদেও এই সমস্যাটা দেখা যায়। আপনি যদি আইনস্টাইনের কোনো থিওরি ইংরেজিতে পড়েন আর বাংলায় পড়েন, ভাষা আলাদা হলেও আমরা বলি একই কথা বা স্টেটমেন্ট বলা হয়েছে। কারণ বিজ্ঞানে ভাষার সৌন্দর্যের চেয়ে তথ্য বা সূত্রটা বেশি জরুরি। ওটা পুনরাবৃত্তি করা যায়। কিন্তু কবিতার ক্ষেত্রে? জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ যদি ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়, তখন কি আমরা বলব এটি একদম হুবহু মূল কবিতার মতোই? না। কারণ কবিতার ক্ষেত্রে তার মূল ভাষার গঠন, ছন্দ, শব্দচয়ন, সবই ওই স্টেটমেন্টর শরীরের অংশ। ভাষা পালটালে কবিতার সেই বিশেষ স্টেটমেন্টর অস্তিত্ব নষ্ট হয়ে যায় বা বদলে যায়।
ফুকো আমাদের শেখাচ্ছেন, ভাষা শুধু ব্যাকরণ বা যুক্তির খেলা নয়। ভাষা একটি বিশাল ক্ষমতার জগৎ। স্টেটমেন্ট হল এমন এক অদ্ভুত সত্তা যা মানুষ তৈরি করে, ব্যবহার করে, বদলায়, আবার ধ্বংসও করে ফেলে। আমরা যখন কোনো কথা বলি, ফেইসবুকে পোস্ট দিই, অফিসের ফাইলে সই করি, কিংবা পরীক্ষার খাতায় উত্তর লিখি, সবই এই স্টেটমেন্টর খেলা। একটি সাধারণ কথা তখনই স্টেটমেন্ট হয়ে ওঠে যখন তার একটি নিজস্ব জগৎ থাকে, হোক তা বাস্তব বা কল্পনার।
স্টেটমেন্টর একজন স্রষ্টা থাকে, যে কোনো ব্যক্তি নয়, সে মূলত একটি অবস্থান। স্টেটমেন্ট একা নয়, অন্য অনেক কথার জালের মধ্যে আটকে থাকে। স্টেটমেন্টর একটি বস্তুগত রূপ থাকে, যা নকল বা পুনরাবৃত্তি করা সম্ভব।
ফুকো মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, স্টেটমেন্ট কোনো যুদ্ধের জয়-পরাজয় বা রাজার মৃত্যুর মতো একবার ঘটে শেষ হয়ে যাওয়া ঘটনা নয়। স্টেটমেন্ট আমাদের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি আর ইতিহাসের ভেতরে বেঁচে থাকে। সে বারবার ফিরে আসে, বিভিন্ন রূপে আমাদের সামনে দাঁড়ায় এবং আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে।
এই যে আমি আপনাদের এতক্ষণ ধরে এই কথাগুলি বললাম, এটিও একটি স্টেটমেন্ট তৈরি করবারই চেষ্টা। এখন এই কথাগুলি আপনার মনের ভেতরে ঢুকে কীভাবে নতুন অর্থ তৈরি করবে, বা আপনি এটিকে কীভাবে অন্য কারোর কাছে ব্যাখ্যা করবেন, তাইই এই স্টেটমেন্টর ভবিষ্যৎ।
২.
আমরা যখন কথা বলি বা লিখি, তখন আমাদের মনোযোগ সাধারণত বাক্য বা প্রস্তাবনার ওপর থাকে। বাক্য হল ব্যাকরণগতভাবে শুদ্ধ এক কাঠামো, যেমন আজ আবহাওয়া ভালো। আর প্রস্তাবনা হল যৌক্তিকভাবে সত্য বা মিথ্যা হতে পারে এমন এক উক্তি। তবে মিশেল ফুকো বলেন, ভাষার এই দৃশ্যমান স্তরের গভীরে আরও মৌলিক এক স্তর রয়েছে, আর সেটাই হল স্টেটমেন্ট। ফুকোর কাছে স্টেটমেন্ট কোনো সাধারণ ভাষাগত একক নয়। এটি কোনো শব্দ বা বাক্যের আকৃতি নিয়ে আলোচনা করে না, এর কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা করে। স্টেটমেন্ট হল সেই অদৃশ্য ব্যবস্থা বা ক্ষমতা, যা কোনো কথা, চিহ্ন, সংকেত বা সূত্রকে সমাজে একটি নির্দিষ্ট উপায়ে বিদ্যমান বা সক্রিয় করে তোলে।
স্টেটমেন্ট কোনো নির্দিষ্ট আকারে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি সম্পূর্ণ বাক্য হতে পারে, ছোটো বাক্যাংশও হতে পারে, এমনকি কোনো ভাষাগত কাঠামো নাও হতে পারে, একটি গাণিতিক সূত্র হতে পারে, একটি ট্র্যাফিক লাইটের লাল সংকেত হতে পারে বা কোনো রোগের উপসর্গ ও তার কারণ ব্যাখ্যা করে আঁকা একটি ছকও হতে পারে।
স্টেটমেন্টর একমাত্র পরিচয় এটি একটি উচ্চারণমূলক কার্যকারিতা। এই কার্যকারিতা চিহ্নগুলিকে শুধু চিহ্ন না রেখে একটি স্থায়ী সামাজিক ও ঐতিহাসিক অস্তিত্ব দেয়। আপনার হাতে একটি লাঠি আছে, যেটা কাঠের, এটি তার ধরন। কিন্তু যখন সেই লাঠি একজন পুলিশ হাতে নেয় এবং নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে নাড়ায়, তখন সেটা আর শুধু লাঠি থাকে না, আইন প্রয়োগের ক্ষমতা আর নির্দেশ প্রদানের কার্যকারিতা অর্জন করে। ফুকোর স্টেটমেন্ট হল সেই ক্ষমতা ও নির্দেশ, যা লাঠিটাকে একটি সামাজিক অস্তিত্ব দিল। স্টেটমেন্ট হল লাঠির কাঠ নয়, তার বিদ্যমান থাকবার শর্ত।
স্টেটমেন্ট তার বক্তব্যকে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের সঙ্গে জুড়ে দেয়। এটি বিচ্ছিন্নভাবে বলা কোনো কথা নয়। এটি সেই ক্ষমতা, যা কথাটিকে একটি নির্দিষ্ট জ্ঞানের আলোচনার ক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার দেয়, যা ঠিক করে যে কোনো একটি স্টেটমেন্ট কোন ধরনের বিষয়ের দিকে নির্দেশ করতে পারে, তার সীমানা কী। যখন কোনো কৃষিবিদ বলেন যে, এবছর ধান উৎপাদনের হার শতকরা ১৫ ভাগ কমেছে, তখন এই কথা সাধারণ আলোচনা থাকে না, স্টেটমেন্ট হয়, আর তা সঙ্গে সঙ্গে কথাটিকে কৃষি বিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক ডিসকোর্স-এর সঙ্গে জুড়ে দেয়। তখন স্টেটমেন্টটা আর শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি এক বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক আলোচনার দরজা।
স্টেটমেন্ট যিনি কথাটা বলছেন সেই ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে না, একটি কর্তার অবস্থান তৈরি করে। এই অবস্থান হল সেই ভূমিকা বা স্থান, যা থেকে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে এই কথাটি বলবার বৈধতা ও সুযোগ দেওয়া হয়। এই অবস্থান শর্তসাপেক্ষ। কিছু নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও সামাজিক শর্ত পূরণ করলেই কেবল বিভিন্ন ব্যক্তি সেই অবস্থানে বসতে পারে। প্রাচীন চিকিৎসা ব্যবস্থায়, ‘রোগের কারণ হল পাপ’, এই স্টেটমেন্ট দেবার বৈধতা ছিল একজন যাজকের। আর আধুনিক চিকিৎসা সন্দর্ভে, ‘রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক’, এমন স্টেটমেন্ট কেবল একজন ডাক্তারের অবস্থান থেকে উচ্চারিত হলেই তার গুরুত্ব ও বৈধতা আলাদা হয়। এমন স্টেটমেন্ট ব্যক্তির পরিচয় নয়, ক্ষমতার অবস্থান নির্ধারণ করে।
স্টেটমেন্ট কখনও একা বা বিচ্ছিন্নভাবে বিরাজ করে না। এটি তার সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের অন্যান্য প্রাসঙ্গিক স্টেটমেন্টর একটি বলয়ের মধ্যে নিজেকে স্থাপন করে। একটি স্টেটমেন্ট তখনই পূর্ণতা পায়, যখন এটি সেই একই ডিসকোর্স-এর অন্যান্য স্টেটমেন্টর সঙ্গে সহাবস্থান করে। ‘সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে’, এই স্টেটমেন্ট তখনই অর্থবহ হয়, যখন এটি একইসঙ্গে বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের তত্ত্ব, মুদ্রাস্ফীতির হার, এবং উৎপাদন হ্রাসের কারণ সম্পর্কিত অন্যান্য অর্থনৈতিক স্টেটমেন্টর সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে। এই সমন্বয়ই একটি স্টেটমেন্টর অর্থকে স্থিতিশীলতা দেয়।
স্টেটমেন্ট কেবল একবারের জন্য বলা বা লেখা একটি ক্ষণস্থায়ী ঘটনা নয়, এটি একটি স্থায়ী, টেকসই, ব্যবহারযোগ্য বিষয় হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়, যা সময়ে ও স্থানে বারবার একই গুরুত্ব নিয়ে ফিরে আসতে পারে। এই স্থায়ী ছাপ বা কাঠামোই হল এর বস্তুগততা। এটি শুধু কালি, কাগজ বা শব্দ তরঙ্গ নয়, এটি হল স্টেটমেন্টর স্থান, নিয়ম, ব্যবহারের ধরন ও পুনরায় ব্যবহারের সুযোগ। এই বস্তুগততার কারণে স্টেটমেন্টটা ইতিহাসের পাতায় বা দৈনন্দিন আলোচনায় বারবার পুনঃসক্রিয় হবার সুযোগ পায়। একটি টাকার নোটে লেখা থাকে ‘চাহিবামাত্র ইহার বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবে’। টাকার নোটটি নিজেই তার নির্দিষ্ট রং, আকার ও ছাপ, একটি অর্থনৈতিক স্টেটমেন্ট বহনকারী বস্তুগত রূপ। নোটটি যখনই আপনার হাত থেকে অন্য কারও হাতে লেনদেন হয়, এই কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক স্টেটমেন্টটি পুনঃসক্রিয় হয়। এটি বারবার কেনাবেচার ক্ষেত্রে, ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে, একই মূল্য এবং একই আস্থা বহন করে পুনরাবৃত্ত হতে থাকে। এটি শুধু একটি কাগজ নয়, এটি স্থায়ী অর্থনৈতিক বিশ্বাস বহনকারী একটি বস্তুগত ব্যবস্থা।
আইনস্টাইন একটি সূত্র একবার লিখলেন, তাই বলে এটি স্রেফ সেই সময়ের একটি লেখা নয়। এটি একটি বস্তুগত সত্যের সূত্রায়ন, যা জ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। একজন বিজ্ঞানী আজ গবেষণাগারে, অন্যজন মহাকাশ গবেষণায়, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে, ভিন্ন সময়ে এই সূত্রটিকে বারবার ব্যবহার করতে পারে। এর কার্যকারিতা বা গুরুত্ব সময়ের সঙ্গে লীন হয় না, পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে নিশ্চিত হয়। এইভাবে একটি স্টেটমেন্ট অতীত কালের একটি ঘটনা না থেকে, বর্তমানে ব্যবহারের উপযোগী একটি টেকসই ও সক্রিয় রূপে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়।
ফুকো স্টেটমেন্টর আড়ালে কোনো গোপন অর্থ বা বক্তার অব্যক্ত ইচ্ছা বা কোনো গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণ খুঁজতে যান না। তিনি এই অনুসন্ধানকে অপ্রয়োজনীয় মনে করেন। তিনি শুধু দেখতে চান কথাটি যেভাবে বলা হয়েছে, ঠিক সেইভাবেই তার বিদ্যমান থাকবার ধরন কী? এটি কোনো ব্যাখ্যা নয়। এটি হল এক ধরনের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ যা প্রশ্ন করে, অন্য কিছু না হয়ে, এই কথাটি ঠিক এই সময় ও এই স্থানে কেন ও কীভাবে উপস্থিত হল?
স্টেটমেন্ট এতই আমাদের কাছে পরিচিত, এতই স্বচ্ছ বা এতই ভাষার মধ্যে মিশে থাকে যে আমরা একে আলাদা করে দেখতে পাই না। যখন আমরা কোনো কথা শুনি, আমরা দ্রুত তার অর্থ বা আকৃতি নিয়ে ভাবি। কিন্তু স্টেটমেন্ট হল সেই বিদ্যমানতা, যা আমরা যা দেখছি বা শুনছি তার মধ্যেই মিশে থাকে। আপনি যখন একটি হাসপাতালের ভবন দেখেন, তখন আপনি তার ইট-পাথর ও কাঠামো দেখেন। কিন্তু স্টেটমেন্ট হল সেই কার্যকারিতা, যা এটিকে রোগ নির্ণয় ও নিরাময় নামক একটি বৈধ ব্যবস্থা হিসেবে বিদ্যমান থাকতে দেয়। এটি ভবনের আকৃতি নয়, এর অস্তিত্বের বিশিষ্টতা।
যদি স্টেটমেন্ট হয় ভাষার মৌলিক সক্রিয় একক, তবে ডিসকোর্সগত গঠন হল এইসব স্টেটমেন্টর বিশাল, নিয়মতান্ত্রিক সমাবেশ। ডিসকোর্সগত গঠন হল একগুচ্ছ নামরহিত, ঐতিহাসিক নিয়মকানুন, যা একটি নির্দিষ্ট সময়ে ও স্থানে স্টেটমেন্টর কার্যকারিতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই নিয়মগুলি স্টেটমেন্টগুলিকে ব্যাকরণগত বা যৌক্তিক বন্ধনে নয়, স্টেটমেন্টর স্তরে যুক্ত করে। একটি নির্দিষ্ট সময়ের অর্থনৈতিক বা চিকিৎসাগত ডিসকোর্স হল একেকটি ডিসকোর্সগত গঠন।
স্টেটমেন্টগুলি হল কী ধরনের বিষয়, যেমন রোগ, বাজার, পরমাণু ইত্যাদি নিয়ে কথা বলবে, স্টেটমেন্ট দিতে পারা কর্তা, যেমন চিকিৎসক, অর্থনীতিবিদ, বিজ্ঞানী প্রমুখের অবস্থান কী হবে, ব্যবহৃত ধারণা, যেমন সংক্রমণ, পুঁজিবাদ, সূত্র ইত্যাদি কীভাবে গঠিত হয় ও কাজ করবে, কী ধরনের কৌশলগত কথা গ্রহণ করবে, যেমন রোগমুক্তির জন্য পুষ্টি, না অস্ত্রোপচার, তার নিয়মাবলি। আর এই নিয়মাবলি ও গঠনকে বাস্তবে প্রয়োগ করবার কাজটিই হল ডিসকোর্সগত চর্চা। এটি কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত চিন্তা বা ব্যাকরণগত দক্ষতা নয়, এটি হল নামরহিত, ঐতিহাসিক নিয়মকানুনের একটি সমষ্টি, যা একটি নির্দিষ্ট সময়ে এবং জায়গায় স্টেটমেন্টর কার্যকলাপের শর্তগুলিকে নির্ধারণ করে। একটি বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে কোনো একটি গবেষণাপত্র গৃহীত হবে কি হবে না, তার পিছনে যে বিশেষজ্ঞ দ্বারা যাচাইয়ের ব্যবস্থা, পত্রিকার সম্পাদকদের অলিখিত নিয়ম, পদ্ধতি ও প্রাতিষ্ঠানিক শর্ত কাজ করে, তাই ডিসকোর্সগত চর্চা। এই চর্চাই নিয়ন্ত্রণ করে কোন জ্ঞান সমাজে বৈজ্ঞানিক হিসেবে স্বীকৃত হবে।
ফুকো দেখাতে চেয়েছেন, স্টেটমেন্ট ও ডিসকোর্সগত গঠন দুটো বিচ্ছিন্ন ধারণা নয়, এরা পরস্পর প্রকৃত মাত্রা হিসেবে কাজ করে।
আপনি যদি একটি নির্দিষ্ট সময়ের অনেকগুলি স্টেটমেন্টর বর্ণনা এবং তার কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করেন, তবে আপনি সেই স্টেটমেন্টগুলির নিয়ন্ত্রণকারী ডিসকোর্সগত গঠনকে চিহ্নিত করতে পারবেন। আবার আপনি যদি একটি ডিসকোর্সগত গঠনকে বিশ্লেষণ করেন, তবে আপনি সেই গঠনের অধীনে উচ্চারিত হওয়া স্টেটমেন্টর নির্দিষ্ট স্তর আবিষ্কার করতে পারবেন। স্টেটমেন্ট ও ডিসকোর্সগত গঠনের বিশ্লেষণ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। একটির আলোচনা ছাড়া অন্যটি অসম্পূর্ণ।
একটি বাক্য তার ভাষার নিয়মের সঙ্গে যুক্ত থাকে। একটি প্রস্তাবনা যুক্তির নিয়মের সঙ্গে যুক্ত থাকে। কিন্তু একটি স্টেটমেন্ট তার ডিসকোর্সগত গঠনের নিয়মের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ফলে স্টেটমেন্ট কোনো বিমূর্ত বা নৈর্ব্যক্তিক ধারণার অংশ নয়, এর নিয়মাবলি সেই ডিসকোর্সগত গঠন থেকেই আসে, যা স্টেটমেন্টটিকে গঠিত হতে এবং সমাজে সক্রিয় থাকতে দেয়।
ফুকোর মতে, ডিসকোর্স হল একই গঠনের অন্তর্গত স্টেটমেন্টগুলির একটি দল। এটি কোনো আদর্শ, চিরন্তন রূপ নয় যা সব সময় একই থাকে। ডিসকোর্স ইতিহাসের একটি অংশ, যার নিজস্ব সীমা, বিভাজন আর রূপান্তরের ধরন রয়েছে। ফুকো স্টেটমেন্টর বিশ্লেষণ করে ভাষার গঠন বা যুক্তি নয়, ভাষার ইতিহাস ও ক্ষমতা সম্পর্কের এক নতুন দিক উন্মোচন করতে চান। ·

0 মন্তব্যসমূহ