একটা মেসিন বানিয়েছি। নাম রেখেছি 'যন্ত্রলেখা'। লেখার জন্যে এখন আর আমাকে ভাবতে হবে না। যা লিখতে চাই, এই যন্ত্রই লিখে দেবে। আমার চিন্তা ভাবনা ইচ্ছা অনিচ্ছা সব কিছুই যন্ত্রে ধরা পড়বে। যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রিত হবে। একবার বোতাম টিপে দিলে, খুব সহজেই ছাপা হয়ে যাবে।
আমি লেখক হতে চাই। খুব নামী লেখক। ছেলেবেলায় এক জ্যোতিষী আমার হাত দেখে বলেছিল,—বড় হয়ে খুব নামী লোক হব। কথাটা ফলবে কিনা জানি না, তবে আমি কিছু লিখতে চাই। নিজের কথাই লিখতে চাই। লিখতে গেলে নানা কথা এসে পড়বে। কত কিছুই তো লেখার আছে। বাড়ির কথা। বন্ধুদের কথা। এই শহর। এখানকার রাস্তা। মানুষজন। রোজ যা হচ্ছে-যাকে যেভাবে দেখছি, সব লিখতে হবে। এসবের কেন্দ্রে থাকব আমি। আমাকে নিয়েই তো সবকিছু।
কিন্তু মুশকিল কী, লেখাটা আর হয়ে ওঠে না। ঠিক মতো গোছাতে পারি না। কিভাবে শুরু করবো, কোথায় শেষ হবে, বুঝতে পারি না। বন্ধুরাও উৎসাহ দেয় না। এই তো সেদিন একজন বলে গেল, ব্যাপারটা অত সহজ নয়। একি চিঠি, নাকি পরীক্ষার খাতায় রচনা লেখা? লিখবো বললেই কি আর লেখা যায়? একজন বয়স্ক সাহিত্যিক বললেন—বুঝলে হে, বেশ ঝামেলা আছে। দরকার হলে এক একটা লেখা অনেকবার লিখতে হবে। বার বার লিখতে হবে।
এই সব শুনে শুনে আমি তো প্রায় হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। লিখতে পারবো না? এটা কি এমন কঠিন কাজ? কাগজ কলম নিয়ে একটু গুছিয়ে বসতে পারলেই হয়। আপসে লেখা হয়ে যাবে। সত্যি বলতে কী, কয়েকদিন চেষ্টাও করেছিলাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাদা পাতা নিয়ে বসে থেকেছি। সরু মোটা নানা রকমের দাগ কেটেছি খাতায়। কলমটা কপালে ঠেকিয়েছি। কিন্তু লেখা আর হয়নি। আসলে কিভাবে যে শুরু করবো, তাই ঠিক করতে পারি না। কি নিয়ে লিখবো? একটা বিষয় ঠিক করি তো, আর একটা লিখতে ইচ্ছা করে। যেভাবে হোক শুরু করলেই হয়। লেখা নাকি নিজেই এগিয়ে যায়। কিন্তু লিখতে গিয়ে দেখি, ইচ্ছে মতো শুরু করা যায় না। তা হলে? ভাবলাম বোধহয় কলমটার দোষ। বার বার কালি ফুরিয়ে যায়। ঠিক মতো লেখা পড়ে না। দামী একটা কলম কিনলাম। প্রচুর কালি ধরে। অনেকটা লেখা যায়। কিন্তু কি বলবো এতেও কিছু হলো না। মন মতো কিছুই লিখতে পারলাম না। নিবটাও বড্ড সরু। পাতা ফুটো হয়ে যায়। তাড়াতাড়ি হাতও চলে না। কিছু লিখতে না লিখতে আরও পাঁচ রকমের চিন্তা মনে আসে। হাতের আগেই মন ছোটে। আচ্ছা মুশকিল তো! এতো দেখি আর এক সমস্যা। লেখার কত সমস্যাই না আছে! কাউকে বললে, বিশ্বাস করবে না। ঠাটা ইয়ারকি করবে। সমস্যা তো আমার। অন্যে তা বুঝবে কেন?
এইসব ভাবতে ভাবতেই একটা মেসিন তৈরির ফন্দি করলাম। মেসিন যদি হিসেব করতে পারে, দাবার চাল বলে দিতে পারে, তা হলে লিখতেই বা পারবে না কেন? এই তো সেদিন টেস্ট টিউবে মানব সন্তানের জন্ম হয়েছে। মহাশূন্যে মানুষ আজ হাঁটাচলা করছে। বিজ্ঞান যদি এত কিছু করতে পারে তো লেখার একটা যন্ত্রও করা যেতে পারে। কেউ তো চেষ্টা করেনি। একবার দেখলে হয়।
কয়েকদিন ধরে বইটই ঘেঁটে একটা নক্সা তৈরি করলাম। চোরাবাজার মল্লিকবাজার ঘুরে টুকিটাকি অনেক কিছুই জোগাড় করলাম। উঁচু টেবিলে প্রথমে একটা শব্দ-গ্রাহক যন্ত্র বসানো হলো। যখন যা মনে আসবে মুখে বললেই, শব্দযন্ত্র টেপ করে নেবে। তারপর সময় মতো মেসিন চালিয়ে টেপ বাছাই করতে হবে। শব্দ যন্ত্রের পাশে একটা অটোমেটিক টাইপরাইটার। টেপ চললেই আমার কথাগুলো সব ছাপা হয়ে যাবে। সহজ ব্যাপার। এতদিন কেন যে ভাবিনি!
আমার টেবিল জুড়ে এখন 'যন্ত্রলেখা'। সকাল দুপুর বা রাতে, যখনই সময় পাই, ঘরে ঢুকে পড়ি। দরজা জানলা বন্ধ করে দেই। 'যন্ত্রলেখা' যেন আমার জন্যেই অপেক্ষা করে থাকে। নীচু একটা টুলে বসি। সুইচ টিপতেই লাল আলো জ্বলে ওঠে। শব্দ হয়। কথা বলে যাই। যন্ত্র সব টেনে নেয়। পাশেই আর একটা টেবিলে রেকর্ড-প্লেয়ার। পুরিয়া কল্যাণ রাগে সেতার বাজতে থাকে। আবছা অন্ধকার ঘরে অলৌকিক এক পরিবেশ তৈরি হয়। লেখা ব্যাপারটা তখন খুব সহজ মনে হয়। কিছুদিন এইভাবে চালিয়ে যেতে পারলে, কে রুখবে! আমার লেখা নিয়ে চারদিকে হইচই পড়ে যাবে। লেখক বন্ধুরা? ফুঃ!
কয়েকদিন বেশ আনন্দেই কাটালাম। রাস্তায় দপদপিয়ে হাঁটি। খেয়াল খুশী মতো গলা ছেড়ে গান গাই। পরিচিত কাউকে দেখলে গম্ভীর হয়ে যাই। এখন কাউকেই কিছু জানাবো না। সময় মতো ওরাই ছুটে আসবে।
মুশকিল কি, 'যন্ত্রলেখা' এখনো ঠিক মতো কাজ করছে না। যা বলতে চাই, ঠিক পর পর সাজিয়ে লিখতে পারি না। কেমন যেন উল্টো-পাল্টা হয়ে যায়। মেসিনেও তাই ছাপা হয়। কিন্তু এভাবে তো গল্প লেখা যায় না। গল্পের সুরু থাকবে। একটা শেষও থাকা চাই। এলোমেলোভাবে তো গল্প হয় না।
সেদিন একজন অধ্যাপকের সঙ্গে এইসব কথাই হচ্ছিল। সমালোচক হিসেবে ওঁর খুব নামডাক। পণ্ডিত লোক। নিজে লেখেন না। অন্যের লেখার সমালোচনা করে থাকেন। আমার সব ব্যবস্থা দেখে বেশ খুশী হলেন ভদ্রলোক। —বাহ, অনেক কিছুই তো করেছ দেখছি। লেখা হচ্ছে কিছু?
সব কাগজপত্তর দেখালাম। দেখতে দেখতে কিন্তু ভদ্রলোক গম্ভীর হয়ে গেলেন। তারপর হাসতে হাসতে বললেন—দারুণ, দারুণ ব্যাপার করেছ। কয়েক জায়গায় লাল কালির দাগ দিতে দিতে বললেন, —য়ুরোপ আমেরিকায় আজকাল এ ধরনের 'অটোমেটিক' লেখা হচ্ছে।
অধ্যাপকের কথা শুনে সেদিন কী যে খুশী হয়েছিলাম! কফি বানিয়ে খাওয়ালাম। ভাল সিগারেট দিলাম। 'যন্ত্রলেখা'র সামনে বসে নানা রকমের জল্পনা কল্পনা করা হলো। চলে যাওয়ার সময় ভদ্রলোক বললেন—ব্যাপারটা নিয়ে একটু হইচই করা দরকার।
—কি করতে চান?
উনি হেসে বললেন, —আর কিছু না পারি, পত্রিকায় একটা ফিচার তো লেখা যাবে।
আনন্দে উত্তেজনায় সেদিন রাতে ঘুমোতে পারিনি।
'যন্ত্রলেখা'কে ঠিক মতো কাজে লাগাতে পারলে, খ্যাতি আর কে আটকায়? অসুবিধে একটু হচ্ছে। বানান ভুল হয়। কিন্তু সে তো আমার দোষ। অনেক শব্দই ঠিক মতো উচ্চারণ করতে পারি না। ল-কে ন, ম-কে ব আর র-কে ড় এর মতো হামেশাই উচ্চারণ করি। যেখানে-সেখানে 'চন্দ্রবিন্দু' ব্যবহার করি। 'যন্ত্রলেখা'র কি দোষ? যেমন বলি, ছাপিয়ে দেয়। আমার সব চিন্তা-ভাবনারও মাথামুণ্ডু নেই। গল্পের জন্য দরকার নেই, এমন অনেক কিছু ভেবে থাকি। তাই ছাপা হয়। এই এক মুশকিল! যদি এমন কিছু করা যেত, —যা শুধু লেখার জন্যে দরকার, যন্ত্র তাই ছাপাবে। ভুল ত্রুটি শুধরে দেবে। যা ভাবি বলি বা দেখি, সব কিছু নিয়েই তো আর সাহিত্য হয় না।
এবার 'যন্ত্রলেখা'কে আরও ভাল করতে হবে। সব রকমের বিদ্যে ফলাতে শুরু করলাম। মেসিনের সামনেই একটা বৈদ্যুতিক চেয়ার বসিয়ে দিলাম। এই চেয়ারটায় বসে, মাথায় লোহার টুপি পরতে হবে। টুপিতে নেগেটিভ-পজিটিভ তার লাগানো আছে। সুইচ টিপলেই মাথার লাল আলো জ্বলে ওঠে। তামার একটা হাত এগিয়ে এসে বুক ছুঁয়ে থাকে। বাজে কথা বা চিন্তাগুলো নেগেটিভ তার দিয়ে বেরিয়ে যায়। পজিটিভ তারটা যেন চুম্বক। যেটুকু দরকার টেনে নেয়।
এবার লেখা শুরু। তামার হাতটা বুক ছুঁয়েই আছে। মেসিনে পাতার পর পাতা ছাপা হয়ে যাচ্ছে। বৈদ্যুতিক চেয়ারে বসে আছি। 'যন্ত্রলেখা'র মাথায় লাল আলোটা দপদপ করছে।
কিন্তু ভাগ্যে না থাকলে যা হয়! কী বলবো, যা লিখলাম গল্প হলো না একটাও। সমস্যা কী কম? হয়তো লিখেছি—সোনালী গমের মতো এক ফালি রোদ কাঁপছে তিরতিরিয়ে। এখন পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছে, রোদ কী সোনালী গমের মতো? আমি সোনালী দেখছি, আরেকজন নাও দেখতে পারে। তিরতিরিয়ে কাঁপাটা কেমন? রোদ কি কাঁপে? নাকি আমারই দেখার দোষ? কোন চরিত্র লিখতে গেলেও কেমন যেন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। যাকে নিয়ে লিখছি, সত্যিই কী তাকে ভাল করে চিনি, না জানি? যেটুকু তাকে দেখেছি, সে তো বাইরে থেকে। তাহলে?
'যন্ত্রলেখা' এসব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। কি যে করি! এত কষ্ট করে যন্ত্রটা তৈরি করলাম। ভেবেছিলাম, এবার লেখক হয়ে যাব। আমার সব কথা, দুঃখ কষ্ট ইচ্ছে অনিচ্ছে—সবকিছু লিখে জানাতে পারবো। কিন্তু পারছি কই? পরিশ্রমে, নানা চিন্তায় শরীরটা একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছে। একটু কাজ করলেই এখন মাথা ধরে। হাত পা অবশ হয়ে আসে। কী যে কষ্ট হয়, কাউকে বোঝাতে পারি না।
বাড়ি থেকে একদম বেরুই না। লেখক বন্ধুরা মাঝে মধ্যে আসে। ছুটির দিনে আড্ডা জমে ওঠে। লেখা নিয়ে আলোচনা হয়। কার কটা বই বেরুলো। কে কোথায় লিখছে। বাধ্য হয়েই সব শুনতে হয়। নিজের দুঃখ বাড়ে। 'যন্ত্রলেখা কে আলাদা একটা ঘরে দরজা বন্ধ করে রেখেছি। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলি, নষ্ট হয়ে গেছে। ওকে দিয়ে আর কোন কাজ হবে না। বেকার চেষ্টা করছি। ভাগ্যে না থাকলে যা হয়!
রাতের দিকে বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়লে, এক একদিন 'যন্ত্রলেখা'র সামনে গিয়ে দাঁড়াই। রুমাল দিয়ে ধুলো ঝেড়ে দিই। গায়ে হাত বুলোতে থাকি। মেসিনের মাথায় লাল আলোটা দপ দপ করতে থাকে। ভেতরে কেমন যেন শব্দ হয়। তামার সরু হাতটা কেঁপে ওঠে। বৈদ্যুতিক চেয়ার ফাঁকাই পড়ে থাকে। বসি না। অন্য একটা চেয়ার টেনে নিই। ড্রয়ার থেকে ছাপানো কাগজ-পত্তরগুলো বার করি। পড়তে পড়তে মনে হয়, এতদিন ধরে কী লিখলাম? এতো কিছুই হয়নি। কই, এরকম তো লিখতে চাইনি। কী হবে এসব দিয়ে? পাতাগুলো টেনে টেনে ছিঁড়তে শুরু করি। সাদা কাগজের টুকরো ঘরময় ছড়িয়ে পড়ে।
কাল রাতেও ঠিক এইভাবেই বসেছিলাম। বাড়ির সবাই তখন ঘুমিয়ে। বাইরের রাস্তায় হঠাৎ কোন ছুটে যাওয়া গাড়ির শব্দ। জানলার কাছের দেবদারু গাছটা হাওয়ায় কাঁপছে। মাঝে মাঝে বিকট শব্দে প্যাঁচা ডাকছে। ঘুম আসছে না কিছুতেই।
চেয়ারে বসে একটার পর একটা সিগারেট শেষ করছিলাম। কী রকম যেন মনে হচ্ছিল। উঠে গিয়ে লেখার খাতাটা নিয়ে এলাম। 'যন্ত্রলেখা' পড়ে রইলো। বৈদ্যুতিক চেয়ারেও বসলাম না। লাল আলোটা নিবিয়ে দিলাম। জানলা দিয়ে সাদা জ্যোৎস্না এসে ঘরের মেঝেয় পড়েছে। তিরতিরিয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে। আবছা অন্ধকারে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে আস্তে আস্তে লিখতে শুরু করলাম। পাতার পর পাতা। লিখলাম, কি করে কত দিনের চেষ্টায় এই 'যন্ত্রলেখা'কে তৈরি করেছি। কেন করেছি। একে দিয়ে কী কী করতে চেয়েছিলাম। লিখলাম আমার ব্যর্থতার কথা। নিজের দুঃখ দুর্ভাগ্যের কথা। লেখা আর শেষ হয় না। কত কিছু লেখার আছে। হাত কিছুতেই থামতে চাইছিল না। লিখছি। আর পড়ছি। সাদা পাতায় লাল কালির অক্ষরগুলো যেন রক্ত দিয়ে লেখা।
কতক্ষণ লিখেছিলাম, খেয়াল নেই। লিখতে লিখতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কী একটা শব্দে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল। দেখি, জানলা দিয়ে খানিকটা রোদ এসে পড়েছে। বাঁ হাতটা আলতোভাবে 'যন্ত্রলেখা'র ওপর পড়ে আছে। ডান হাত নীচের দিকে ঝুলে আছে। কলমটা হাত থেকে টুপ করে খসে পড়েছে। সেই শব্দেই ঘুম ভেঙ্গে গেল।
নীচু হয়ে কলমটা তুলতে গেলাম। হাত কেঁপে উঠলো। কেমন যেন শীত শীত করছে। পড়ে গিয়েও নিবটা কিন্তু ভাঙ্গেনি। আঙুলের ডগায়, হাতের চেটোয় লাল কালি। মাথার চুলে হাত মুছতে মুছতে 'যন্ত্রলেখা'র দিকে চাইলাম। লাল আলো জ্বলছে না। তামার হাতটাও নড়ছে না। কোন শব্দ নেই। বৈদ্যুতিক চেয়ারে কত দিনের ধুলো জমে আছে।
নীচের দিকে চেয়ে দেখি, সাদা সিমেন্টের মেঝেয় ফোঁটা ফোঁটা লাল কালির দাগ। রক্তের মতো। ·
[গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় ‘দেশ’ পত্রিকায়, ১৯৭৯৮ সালে]

0 মন্তব্যসমূহ