পৃথিবীর সকল অন্ধকার হঠাৎ টুকরো টুকরো। ঝরে-পড়া নক্ষত্র মাটিতে পড়ার আগে ডিজিটাল অ্যানিমেশনের জাদুতে জোড়া লেগে পাদ-কন্দুক বা প্রাণচঞ্চল গোলক। প্রাণচঞ্চল গোলকের গতিঘুর্ণি-রাগে ফোলে ঘোড়াউত্রা নদীতে এক মরনঘাতী ঢেউ। যে ঢেউ ক্রমান্বয়ে একটি নক্ষত্রের পতনকে ত্বরান্বিত করে।

ঘোড়াউত্রার বাতাসে অনেকগুলো লিকেজ দেখা দেয়। জায়গায় জায়গায় কালশিটে ফুটে ওঠে। এর অন্তর্গত বেদনা ঝিনুকের ভেতর মুক্তো হওয়ার বেদনা থেকেও নির্মম। এ যে মুক্তো হয়ে ফুটে ওঠার আগেই ঝরে পড়ার গল্প—শঙ্কা।

জীবন তো নক্ষত্রই। আলো ও অন্ধকারের সহাবস্থান। এই অনন্ত মহাবিশ্বের কোটি কোটি নক্ষত্রের জগতে যেমন প্রতিটি তারা প্রোজ্জ্বল, তেমনি পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জীবনও বিভিন্নরূপে অনুপম গল্প এক একটি। কেউ কারও সদৃশ নয়; প্রত্যেকে নিজের সাদৃশ্যে তুলনাহীন। ঋতুও তেমনই ছিল।

কত জীবনের গল্প ঘোড়াউত্রা বয়ে চলেছে নিরন্তর! ঘোড়াউত্রা কি পাড়ের লোকজনেরে গল্প বানিয়ে গিলে খায়? কোথায় গেল এত এত গ্রাম-ঘর-বাড়ি, বৃক্ষ-লতা-পাতা! কত কী মিশে গেল, যাচ্ছে। তার ওপর কিছুদিন পরপর একজন একজন করে কাঁচা সোনার রকম মানুষ না খেলে যেন এর আর পেটই ভরে না। শাহ্পুর, আবুধ্যা শাহ্পুর, আহসানপুর গ্রাম কি গ্রাম খেয়ে সাফ-সুতুর করে দিয়েছে।

ঋতুর তো ঘোড়াউত্রার সাথে সখ্যই ছিল। ঘোড়াউত্রারই ঋতু। সেই ঋতু আজ শয্যাশায়ী, মারাত্মক অর্বুদে আক্রান্ত।

ঋতু—সে একজন ছেলে না মেয়ে, নাকি ঋতুপরিক্রমারই একটি মানবীয় রূপ? নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সে যখন আকাশের দিকে তাকাত, মনে হতো না সে শুধুই ঋতু। মনে হতো সে এক ঋতুসমূহেরই সংবেদনশীল বোধ।

এভাবেই ঋতুর সকল ভাবনা একত্রিত হয়ে একটি গ্লোব-রূপে তার সামনে প্রতিস্থাপিত হয় অনবরত। এই গ্লোব হলো ঋতুর সকল ভাবনারই একটি মিনিয়েচার—যা ঋতুর সকল ভাবনাগুলোকে এক এক করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, টেনে টেনে, উলটে পালটে দেখার অবাধ সুযোগ তৈরি করে।

ঋতু কি ভেবেছিল কোনোদিন, জীবনের স্পেস আর একটু বাড়ানোর জন্য তাকে তার আস্ত একটি পা-ই হারাতে হবে!

এখন তার একমাত্র কাজই হলো শুয়ে থাকা আর জীবনের বিভিন্ন ভাবনায় ডুবে থাকা। ভাবনার সুইচ বাটনটা অন করলেই গ্লোবটা তার হাতের নাগালে চলে আসে—উত্তরমুহূর্তে/নিমেষে/সঙ্গে সঙ্গে সে গ্লোবের ওপর সওয়ার হয়। তখন সে নদী নয়, মধুপুরের গড়ের গহিনে সরু রাস্তায় রাখা ঘোড়ার ওপর ত্রস্ত প্রাণে লাফ দিয়ে ওঠে। ঘোড়ার পিঠে আলতো চাপ দেয়, পায়ের ইশারায় ঘোড়ার গতি বাড়ানোর ইঙ্গিত করে, রেইনস কিছুটা আলগা করে নিজের শরীর সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে ঘোড়াকে দ্রুত হাঁটার জায়গা করে দেয়। ঘোড়া তার সঠিক তালে পড়ে দ্রুত কদমে দৌড়াতে থাকে। ধীরে ধীরে নিজের শরীরের ওজন আরও কমিয়ে এনে, সামনের দিকে আরও ঝুঁকে বসতে থাকলে ঘোড়া আরও দ্রুত কদমে দৌড়ায়।

ঋতুর মনে হয় দৌড়ে ঘোড়া নয়, স্বয়ং সে। ঋতু প্রাণপণ দৌড়ায় দিগন্তপানে। ঋতুর চতুর্দিকে গহিন বন। হাজার হাজার লক্ষ-কোটি বৃক্ষ কাণ্ড এবং শাখা নিয়ে ঊর্ধ্বাকাশে ঠিক এমনই রূপে বিস্তৃত যা ঋতুর মাথার ওপরের আকাশকে ঢেকে দিয়েছে।

বনের শাল, সেগুন, গামারী, পিতরাজ, ভাদি, জিগা, অশ্বত্থ, বট, বানরলরী বৃক্ষরা তাদের একত্রিত করতলে ঋতুকে ডুবিয়ে দিয়েছে অন্ধকারে। গহীন বন ও ঐক্যবদ্ধ অন্ধকার পেরিয়ে ঋতু ছুটে চলে দিগন্তের খোলা ময়দানে।

ঋতু আর ঋতুর বউ যেন মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। এপিঠে দাগ কাটলে ওপিঠে ফুলে ওঠে। ঋতুর পা কেটে ফেলে দেওয়ার পর থেকে বউঋতুর পা দৃশ্যত থাকলেও অবশ হয়ে কার্যত বিকল হয়ে পড়ে। দুইজনই ঋতু, ঋতু এবং ঋতুর বউ। ঋতুর যখন পা কেটে ফেলে তখন তার স্ত্রী মানসিকভাবে এতই দুর্বল হয়ে পড়ে যে সে আর সুস্থ মানুষের মতো হাঁটতে পারে না। সে মনে করে তারই পা কেটে ফেলেছে।

ঋতুর কাটা পা বউঋতুর এক পায়ের দখল নেয়, ঋতুর কাটা পা ঋতুর পা খেয়ে ফেলে। ঋতুর কাটা পা ঋতুর পায়ে কবর করে। ঋতুরা পরস্পর পরস্পরের বোধি পুরাণ সাঁকো। একজন পুরুষ একজন প্রকৃতি। পুরুষ-প্রকৃতির জোড়। এই জোড় তার নিজের ভেতরে আধেয় ও আধার উভয়কে যথাযতভাবে ধারণ করে স্বয়ং দ্বৈত হয়েও অদ্বৈতরূপে বিরাজ করে। সত্তার এই অদ্বৈত রূপটিই তাদের শ্রেষ্ঠ রূপ। এই দুই ঋতু মিলেই অদ্বৈত এক ঋতু রূপ—অন্তঃশীল। একজন আর একজনের একটি স্টিক।

একটি স্টিক = আলো + সাপোর্ট + অ্যালার্ম + ভারসাম্য।

আলো : ‘ঋতু, আমার পা কাটা গেছে তো কী হয়েছে। এতোদিন আমার চোখ ছিল দুটি, এখন চোখ হয়েছে আমাদের চারটি। আমার সামনে আমাদের আর কোনো অন্ধকার নেই। কেটে গেছে আমাদের সকল আশা আকাঙ্ক্ষা কামনা বাসনা। আমাদের মাথার ওপর সূর্য দাঁড়িয়ে থাকে স্থির—চুপিসারে ঢোকে রোদের আরাম; ছিঁড়ে সকল দড়িদড়া, মুখ উঁকি দেয় মুখের আড়ে, বিস্মরণ।’

সাপোর্ট : ‘ঋতু, তোমার পা কাটা গেছে তো কী হয়েছে। আমরা দুইটি খুঁটি মিলে একটি ঘর। তোমার এক পা আমার এক পা মিলেমিশে আমরা একজন মানুষ—ঋতু। আমাদের বল সম্বল হয়েছে ডাবল। আমাদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে, বিশ্বাস আমাদের পুনর্জন্ম দিয়েছে। আমাদের সামনে আর কোনো ভয় নেই। দূর হয়েছে আমাদের সকল ভয়ের উৎস—অর্থ সম্পদ প্রতিপত্তি নাম ডাক যশ।’

অ্যালার্ম : ‘ঋতু, আমরা যেমন দুই ঋতু মিলে এক ও অদ্বিতীয়, তেমনি আমাদের হৃদপিণ্ডও একের ভেতর দুই। চলমান সময়ের সচেতনতায় আমাদের হৃদ-টিক্-টিক্ অ্যালার্ম বাজবে সময় ও অসময়ের সমন্বয়ের স্মরণে, প্রেম ও ভালোবাসার আনন্দধামে বসবাসের নির্বাণে, আয়না হয়ে ফুটে উঠবে আমাদের অন্তদৃষ্টি। আমাদের চতুর্পাশে জীব ও জীবন বর্ণনায়নের পরিবর্তে চিত্রকল্পে স্রষ্টার ব্যক্তিত্বের যে উদ্ভাসন দেখি, সৃষ্টি-সমগ্রতার যে শিল্পাভাস পাই তার দ্বারা যুগ ও জীবনের অভিঘাত হয়ে উঠবে আমাদের জীবনের অলংকারস্বরূপ।’

ভারসাম্য : ‘প্রসারিত আমাদের চওড়া কাঁধ; উঁচু-নিচু বন্ধুর পথ আমরা অবলীলায় অতিক্রম করে যাব, জীবন ও মরনের মাঝে আমরা সকল যাপনের সাম্যাবস্থা রক্ষা করে চলতে পারব সহনীয় মাত্রায়। আমি তোমার জীবন্ত ক্রাচ, ঋতু।’

গ্রীষ্ম :
খড়া-ন্যাড়া দুপুর। জড়, এক পায়ে দাঁড়িয়ে, নীরস। ভ্যাপসা তাপে সেই দূরে দুপুর কেঁপে কেঁপে কাঁপে, ঝিকঝিক। ঝিঁঝিঁপোকার অনবরত ঝিঁঝিঁধ্বনির কম্পন ষড়দিক। দেহের ভেতর ঘুমঘুম অলসতা পাকে। অলস অগ্নিলেহে ঋতু পড়ে আছে তপ্ত বিছানায়। বিছানার কুসুম-উত্তাপ ঋতুর লোমকূপ দিয়ে ঢোকে। দেহের অভ্যন্তরে কোষ বেয়ে বেয়ে পৌঁছে, চোখে। ঋতুর আধা-সেদ্ধ চোখ ঘুমঘুম, চর পেঁচানো।

ঋতু ঘোড়াউত্রা নদীর বাতাসে আর সব মানুষের মতোই বেড়ে উঠেছে। রাতের ঘোর নেই, দিনের প্রখর নেই, ঋতু ঘোড়াউত্রায় নামেনি, কারণে অকারণে নেমেছে। জলকে চলন করে ঋতু যখন জলপথে নেমেছে বহু বহু বহু মাছের ভীর জমেছে, বহু বহু বহু নৌকা সারিবদ্ধ হয়ে ট্রেনের অবয়ব গড়েছে, ঋতু যেন সেই ট্রেনের ইঞ্জিন। একেকটা নৌকা যেন ট্রেনের একেকটা কামরা। নদীর সকল মাছেরা হুড়োহুড়ি করে ট্রেনের কামড়ার যাত্রী হয়। সকল যাত্রী আজ বেহুঁশ, কোথায় যাবে এই ট্রেন তার কোনো সঠিক নিশানা ঠিক করা নেই।

ঋতুর আধা-সেদ্ধ চোখ অনার্দ্র। চোখের ভেতর হালকা ধূসর-সাদা পাতলা ঘুমের চর পড়ে। বিছানা ও পিঠ সেদ্ধ ঘামে ভিজে, সারসারে। কোকিল ডাকে—গলে চুঁইয়ে চুঁইয়ে গড়িয়ে পড়ে নৈঃশব্দ্য। মাথার ওপর শালিক, চড়ুই, বাবুই ছোটো পাখিরা দলবেঁধে কোরাসে চ্যাঁচাচেঁচি। তাপ দুপুর কর্কশ শব্দরা গলে ঋতুর কানের গর্তে ঢোকে, ধীরে শিরশির।

ঋতু হাঁটে প্রকৃতির কোলজুড়ে। অভিমুখ—ঘোড়াউত্রা নদীর জল। গ্রীষ্মের প্রকৃতি—জীবনের জেদ, দহন। কিছু কিছু ফুল—কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, শিমুল, পলাশ।

ঘোড়াউত্রার জল—ঋতু ছাই-মেরুনরঙা হাঁস—ডানা মেলে ঝাপ। জল—উপরভাগ তপ্ত, ভেতর হীম-শীতল। সাঁতার—ছপাছপ। সাঁতার—ভাসভাস। সাঁতার—ফাঁপফাঁপ।

একটু জোরে, হাত-পা ছুড়ে, ফাঁপফাঁপ সাঁতার কাটতে গিয়ে কাটা পায়ে টান লেগে ঠনঠন করে ওঠে। ঋতু জাগে, বসে—অনুভব হয় পিঠ ও বিছানা লেপ্টে ছিল। কাটা পায়ের পাশের হাতটা স্বয়ংক্রিয় কাটা জায়গাটার ওপর চলে যায়। কাটা পায়ের শীর্ষদেশে আনমনে হাত বুলায়। ঘোড়াউত্রা নদীতে ঝাপ দেওয়ার সময় একটি পানকৌড়ি ওড়া দিয়েছিল, সেই ওড়ার শব্দের রেশ এখনো কানে লেগে আছে। সেই রেশে রেশে ঋতু শুয়ে পড়ে আবার, চোখ বোজে। দেখে—শুয়ে আছে, এখন, তার পাশে, সবটা ঘোড়াউত্রা। কাটা পায়ের শীর্ষদেশ থেকে ঋতুর হাতটা এখন চলে যায় ঘোড়াউত্রা নদীর ওপর। হাত বুলায়, মনমরা।

সেই মনমরা হাত বুলানোর ধীরস্থির একটা ঢেউ বেয়ে বেয়ে, মৃদু আঘাত করে চোখের ল্যাক্রিমাল গ্রন্থিতে। চোখের ওপর বাহিরের কোণায় ফোঁটায় ফোঁটায় জল জমে। ফোঁটা ফোঁটা জল, খুব নীরবে, চোখের কোণা থেকে গড়িয়ে পড়ে, নাক বেয়ে, কানের লতির তল দিয়ে, বালিশে।

ঋতু আনমনেই উচ্চারণ করে—‘‘হায় ঘোড়াউত্রা! তোমারে ভীষণ ভালোবাসি গো...’’

নদী বয়ে চলে—কলকল, ঝিরঝির, সোঁ সোঁ। ঘোড়াউত্রা নদী আর ঋতু—একতান এখন, মিশিভূত, সমরস। ঘোড়াউত্রা ও ঋতু এই মুহূর্তে অভিন্ন একাকার। বয়ে চলে এক ও অভিন্নরূপে। কালো কালো পানকৌড়ি ওড়ে, বসে; খাঁটালের মরা বাঁশে। সাদা সাদা লম্বা গলার বক—ওড়ে, বসে; খাঁটালের আবদ্ধ জারমুনির ওপর।

ঋতুর চোখমুখ চকমক; আনন্দে উদ্ভাসিত। সারা নদী জুড়ে তিরতির বয়ে বেড়ায়। আহসানপুরের দক্ষিণ পাড়ে এসে যেন ‘বাজল মাদলের ঢমক’, নদীর সেই ঢমক যেন আর নেই—ঠিক এখানে এসে ঘোড়াউত্রা নদী দুটি ভাগ হয়েছিল; যেন একটি নদী তার দুটি পা...এখন আর একটি পা নেই, কাটা পড়েছে। আর একটি পা পশ্চিমে সরে গিয়ে শাহপুর ও নদী বিলীন হয়েছে একাকার হয়ে। চিরতরে তলিয়ে গেছে নদীর এক পায়ের তলায় শাহপুর ও আবুধ্যা শাহপুর গ্রাম।

ঠিক এখানটায় এসে, তার হাত আবার চলে আসে তার কাটা পায়ের শীর্ষদেশে। আলতো করে হাত বুলায়। সহসা ফিরে সম্বিত। সম্বিতে হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে—আমার পা কোথায়...??

চিৎকার—বন্দুকের ট্রিগারে টান; বার্ডশর্ট কার্টিজ ফেটে পড়ে; ছোটো ছোটো বালুকণার ন্যায় গুলি ছড়িয়ে পড়ে ঘরময়। ঋতু কাঁপে কম্পমান, বিহ্বল। ঋতু কুঁকড়ে যায় গ্রীষ্মের তাপে সবুজ পাতা; ঝরে পড়ে, মাটিতে।

ঋতুর চিৎকারে ঋতু তরফর দৌড়ে আসে, অস্থির চিত্তে, হুড়মুড়।
‘কিয়ের আওয়াজ অইলো, ঋতু...কি অইছে...পড়ে গেছিলা নিচে...?’

ঋতুও কম্পমান সভয়ে...। বসে ঋতুর পাশে। হাত রাখে হাতে, মাথায়...। হাত সারায় কপালে। হাত আবর্তায় ঋতুর চুলে, ধীরে ধীরে...।

বর্ষা :
বৃষ্টি বৃষ্টি বৃষ্টি। বৃষ্টি কী রাত! বৃষ্টি কী দিন! দিন—প্রেজেন্ট স্যার। রাত—প্রেজেন্ট স্যার। এখন থেকে তখন শুধুই শূন্যতা। বৃষ্টি ও শব্দে ভারি নৈঃশব্দ্য। শব্দ ও তানে লম্বা দীর্ঘশ্বাস। মৃদু টাপুর, কোরাসে। বারান্দা। ষোলকটির ঘর। দুই মাথা এক। মাকড়শা। কাঠের মারুইল। টিনশেড। জাল বুনে চালজুড়ে। ফলস সিলিং নেই। পা-টা ঠনঠন; একটু ব্যথা, না, ব্যথা নয়। একটা সুতা, লম্বালম্বি, পায়ের ভেতর। সুতাটা নড়ে যখন, ব্যথার কুচকাওয়াজ শুরু, লেফট রাইট। পা কামড়ায়। নাহ্! ভুল। হয়তো। আমার তো পা-ই নেই। সত্যিই কি আমার পা নেই! আমি কি সবটা ঋতু!

ঋতুর ভেতর ‘আমার পা কই’ চিৎকার বড়ো হয়, উলটে পড়ে।
একটা কল—হঠাৎ রিংটোন...এক বজ্র। বারান্দা, ষোলকটির ঘর উলটপালট/এলোমেলো। হ্যালো, হ্যালো...শূন্য। মোবাইলের স্ক্রিন—স্ক্রল, দ্রুত। লুডু লুডু লুডু। এহ্! ঘরেতো কেউ নেই! আমি একা!

আবার স্ক্রল। একটা গল্প না হয় কয়েকটা কবিতা। সামনে একটা খবর, ফটোকার্ড।

‘কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পুরনো একটি ভিডিয়ো সামনে এনে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে এক পীরকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গতকাল ১১ এপ্রিল, শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের ফিলিপনগর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।’

ঋতুর ভাবনা ভাঙা-ভাঙা, বিষণ্ন। কাচের টুকরো। সবগুলো টুকরোই ঋতু। শত শত ঋতু, হাজার হাজার ভাবনা এক—‘আমারতো শালার একটা পা, এ দেশটার তো দেহি দুইডা পা-ই নাই...।’ ·


লেখক পরিচিতি : সিদ্দিক বকর, জন্ম- ২৭ আগস্ট ১৯৫৯। বাবা কেরামত আলী, মা আমেনা বেগম। জন্মস্থান : গাজিরচর, বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ। প্রকাশিত গ্রন্থ : জীবন্মুক্ত বাতিঘর, করাতকাটা ঘুম, ফাঁক ফাঁক করে বোনা সুতার আচ্ছাদন বিশিষ্ট মানুষ। বসবাস ঢাকায়।