নিরু দাঁড়িয়েছিল অন্ধকারে। আমি জানি ওটা নিরু, নিরুই হবে। রাত নটা বেজে গেলেই ও আমাদের গলিপথটা পেরিয়ে এসে রাস্তার মুখে দাঁড়ায়। আসলে ও নটার আগে থেকেই আনচান করে, কিন্তু নটা বেজে গেলে আর থাকতে পারে না, ঠিক এক পা এক পা করে, পায়ে পায়ে গলির মুখ পর্যন্ত চলে আসে।
কিন্তু নটা মানে নটা নয়। নিরু এখানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে। যতক্ষণ না কিশোরকাকা ফেরে। কোনও কোনওদিন দশটা, সাড়ে দশটা, এগারোটাও গড়িয়ে যায়।
কিশোরকাকা রেলে চাকরি করে। হয়তো কোনও উচ্চপদে নয়। এখানকার বেশিরভাগ মানুষই লেখাপড়া জানে না, কী আর ভালো চাকরি করবে। তবে রেলের চাকরি তো, অনেক টাকা মাইনে পায়। ওদের বাড়িটাই আমাদের রামলালা মাঠের প্রথম পাকা বাড়ি। যে বাড়ির ছাদ আছে। আমি ছোটবেলায় ছাদের ওপর নিরুকে দেখেছি। পূর্ণিমার রাতে জুঁইকাকি আর নিরুকে পরির মতো লাগত। রামলালা ক্লাবের মাঠে বসে আঁকো প্রতিযোগিতায় আমি নিরু আর কাকিমার ছবি এঁকেছিলাম। ওদের পিঠে ডানা দিয়েছিলাম। ফার্স্ট প্রাইজ দিয়েছিল আমাকে। যিনি পুরস্কার দিতে এসেছিলেন— একজন শিল্পী মতো লোক তিনি বললেন—পরি! আমি বলিনি ওটা নিরু আর কাকিমা। কাউকেই বলিনি। ওদের বাড়ির ছাদটা আমাকে খুব টানত।
বড় হয়ে ওদের বাড়ির ছাদে উঠেছি অনেকবার। ঘুড়ি ওড়াতে, পায়রা বসলে। তখন নিরুর সঙ্গে আমার বেশ ভাব। নিরু যখন এইটে পড়ে জুঁইকাকি পাড়ার একটা রং মিস্ত্রির সঙ্গে পালিয়ে গেল। সবাই খুব হায় হায় করল। এই হায় হায় নিরুর জন্য যেমন করল, তেমনই করল জুঁইকাকির জন্য। সবার একটাই কথা রেলের চাকরি করা বর ফেলে কেউ রংমিস্ত্রির সঙ্গে যায়! এবার অভাবে মরবি।
আমাদের এদিকে বেশিরভাগ পুরুষ মিস্ত্রি মজুরের কাজ করে। জগাও মিস্ত্রির কাজ করত। জুঁইকাকির থেকে অনেকটা ছোট। সবাই বলত— আর কদিন পরে তোর মেয়ে কোথায় প্রেম করে বাড়ি থেকে পালাবে, তা নয় আধদামড়ি মাগি তুই। ছিলি রেলের বউ হয়ে, হবি রঙমিস্তিরির বউ!
আসলে কিশোরকাকা অনেক টাকা মাইনে পেত। নেশা বলতে গান। তখন মোবাইল ফোন ছিল না। মানুষ ইচ্ছে করলে বুকপকেটে গান নিয়ে ঘুরতে পারত না। কিশোরকাকা বাড়িতে থাকলে সিডিতে সারাক্ষণ কিশোরকুমারের গান চলত। সেই গানের সঙ্গে কিশোরকাকাও গলা মেলাত। আর যখন বাড়ি থাকত না, রাস্তাঘাটে পথে থাকত, তখনও গান চলত, সেটা কিশোরকাকার গলার ভেতর। কাছের লোক শুনতে পেত। পাশ দিয়ে গেলে শুনতে পেত। দাঁড়ালে তো পেতই। সদাসর্বদা সুর ভেঁজে চলেছে।
জুঁইকাকি চলে যাওয়ার পর কিশোরকাকা গান বন্ধ করে দিল আর নিরু স্কুল। নিরু সেভেন পাশ হয়েই থাকল। এর সঙ্গে একটা নতুন উৎপাত জুটল সেটা হল মদের নেশা। আগে নিশ্চয়ই কিশোরকাকা মদ খেত। এদিককার কে খায় না, পয়সা পেলে সবাই খায়, বিনা পয়সায় সবাই খায়। কিন্তু রেজিস্টার্ড মাতাল আছে সাত আটজন। তাদের কেউ না কেউ বাড়ি এসে ঝামেলা করে। আমাদের এখানে ফি রাতেই মাতাল পুরুষ ভার্সেস বাড়ির লোকের চিৎকার চেঁচামেচির রেকর্ড চলবে। কোনও পরিবারে চিৎকার বেশি হয়। দুপক্ষের খিস্তিখাস্তা চলে। কোনও পরিবারের মারামারি। কান্নাকাটি, শাপশাপান্ত। কোথাও আবার ভাঙচুর। ভাঙচুর ব্যাপারটা বড্ড খারাপ। সুস্থ অবস্থায় কষ্ট করে জিনিস বানায়, নেশার ঝোঁকে সেগুলোই ভাঙে। কিশোরকাকার তা নয়। সে মদ খেয়ে আসে। আসতে আসতে স্টেশনের ধারেকাছে আবার কারও না কারও সঙ্গে বসে পড়ে। পকেটের টাকা খরচ করে শেষ হয়ে যায়। তারপরেও বাড়ি ফেরে না। রাস্তার ধারের কোনও একটা জায়গায় থুম মেরে বসে থাকে। এই নয়, কিশোরকাকা নেশা করে রাস্তায় পড়ে আছে। আসলে কিশোরকাকা অন্ধকার চায়। অন্ধকার হলে, লোকজন কমলে গলি পেরিয়ে রামলালা মাঠে ঢুকবে। আরে, আমাদের এখানে অনেক রাত পর্যন্ত লোকজন বাড়ির সামনে মাদুর পেতে, প্ল্যাস্টিক পেতে বসে থাকে। ঘরে অত জায়গা কোথায়, হাওয়া কোথায়? কিশোরকাকা নিশুতি চায়, তখন পা টিপে টিপে আসবে। বুঝি লোকটার হয়তো লজ্জা করে।
আরও লজ্জা করে, যখন জগা বা জগন্নাথ মাঝে মাঝে বাড়ি আসে বাইক নিয়ে। বাবাকে খৈনি, মাকে টাকা দিয়ে যায়, রাতে খেয়ে দেয়ে বাড়ি ফেরে। জুঁইকাকির আবার একটা মেয়ে হয়েছে। তবে জুঁইকাকি আর কোনওদিন এদিকে আসেনি।
আমি কয়েকবার জুঁইকাকিকে দেখেছিলাম, একবার সঙ্গে একটা বউ ছিল। জুঁইকাকি আমাকে দেখে একটু থমকে গেল। আমাদের দুটো স্টেশন আগে ট্রেনে উঠেছিল। বসবি তো বস ঠিক আমার উলটোদিকে। আসলে বুঝতে পারেনি। খালি সিট দেখে সঙ্গের বউটি ঝপ করে আমার উলটো দিকে বসে। কাকিকেও বসতে হয়। আমি জুঁইকাকির দিকে তাকায়নি, সারাক্ষণ মোবাইল স্ক্রোল করে গেছি। আমাকে দেখে কাকির নিশ্চয়ই নিরুর কথা মনে পড়েছিল। আমি কথা বললে কি নিরুর কথা জিজ্ঞেস করত? নিশ্চয়ই সবই জানে। জগাকাকা এখান থেকে সব খবরই নিয়ে যায়। নিয়ে গিয়ে কাকিকে শোনায়। কিশোরকাকার কথা তো নিশ্চয়ই বলে। হয়তো বলতে বলতে হাসে, বলে, কিশোরদার গান বন্ধ হয়ে গেছে। জগা কি অন্ধকারের গল্প জানে, যে কিশোরকাকা অন্ধকারের অপেক্ষায় থাকে। নিরুর কথা জানে? নিরু ক্লাস সেভেন পাশ হয়েই থাকল। দেখুন, এখানকার মেয়েরা কে কত পাশ করে বড় চাকরি করছে, সেটা ব্যাপার নয়। ছেলেরাও কি তেমন ভালো চাকরি পেয়েছে। কিন্তু নিরু তো সে পথেই যেতে পারল না। রাত নটার পরে নিরু এসে গলির মুখে দাঁড়ায়। আমিও বেশির ভাগ দিন তার ঠিক আগে আগে ফিরি। আমি যখন চান করি, নিরু তখন পায়ে পায়ে গলির দিকে এগিয়ে যায়। দিন দিন পাড়াটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আগে এখানে সব গরিব লোকজন থাকত, কিন্তু ইদানীং এদিকে বাড়িঘর কিনে কয়েকটা হিন্দিভাষী বিহারী পরিবার এসেছে। এর মধ্যে দুটো পরিবারের ছেলেগুলো সুবিধের নয়। আমি বেশ কয়েকদিন ধরে দেখেছি, ওরা রাত নটা নাগাদ ওই গলির মুখে ঘোরাঘুরি করে। মোবাইলে রিলস চালিয়ে জোরে জোরে হাসে। নিরু অসহায়ের মতো ওদের মোবাইলের নীল আলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে।
দুই.
একদিন টিপটিপ করে বৃষ্টি হচ্ছে। নিরুকে দেখলাম একদিকের শিকভাঙা একটা ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আসে। আর পারলাম না। গিয়ে বললাম, ‘কী রে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছিস?’
‘এমনি।’
‘কিশোরকাকা এখন ফেরেনি?’
‘না।’
‘তুই ঘরে যা আমি এগিয়ে গিয়ে দেখছি।’
‘এসে যাবে।’
‘তুই বাড়ি যা, আমি দেখছি।’ বলে আমি হাঁটতে শুরু করলাম। আমি দু একটা জায়গা চিনি, যেখানে কিশোরকাকা কোনও না কোনও সময় চুপ করে বসে থাকতে দেখেছি। সেখানকারই সেকেন্ড জায়গায় পেয়ে গেলাম। বলললাম, ‘কাকা বাড়ি চলো। নিরু দাঁড়িয়ে আছে, তুমি কী গো?’
কিশোরকাকা কোনও কথা বলল না। উঠে দাঁড়াল। আমার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল। এসে দেখলাম, নিরু যায়নি, দাঁড়িয়ে আছে। বললাম, ‘কী রে এখনও দাঁড়িয়ে আছিস? কোনদিন তুই বিপদ ঘটাবি।’
নিরু ওর বাবাকে নিয়ে চলে গেল।
পরের দিন আবারও নিরুকে দেখে বাড়ি যেতে বলে আমি কিশোরকাকাকে ধরে আনতে গেলাম। সেদিন কিশোরকাকাকে পেলাম প্রায় স্টেশনের কাছে। আমাদের বাড়ি থেকে স্টেশন প্রায় মিনিট কুড়ির হাঁটাপথ। খুঁজতে খুঁজতে গিয়ে আবার ফেরত আসতে প্রায় ঘণ্টাখানেক লেগে গেল। কিশোরকাকাকে বাড়ি দিয়ে এলাম। তারপর থেকে আমি স্টেশনের পাশে থেকে সাইকেল নিয়ে দেখতে দেখতে আসি। কিশোরকাকাকে দেখতে পেলেই সঙ্গে নিয়ে আসি।
সাইকেলে দু একবার বসানোর চেষ্টা করেছি। টাল খেয়ে যায়। সাইকেল নিয়ে হেঁটে হেঁটে আসি। প্রায় কথা হয় না। একদিন বললাম, ‘কাকা আর গান করো না।’
বলল, ‘গান—ধুস্!’
বললাম, ‘আস্তে আস্তে করো না, শুনি।’
‘নাহ্!’
একদিন বদমাইশি করলাম, কাকাকে আসার সময় নিয়ে মোবাইলে একটা কিশোরকুমারের গান চালিয়ে দিলাম। হঠাৎ দেখলাম মানুষটা রাস্তা ছেড়ে মাঠের মধ্যে দিয়ে দৌড়াতে শুরু করেছে। আমি সাইকেল ফেলে ছুটে গিয়ে ধরলাম। বললাম, ‘ওদিকে কেন ছুটে যাচ্ছিলে— একটু কম মাল খাও। তোমার জন্য মেয়েটার একদিন বিপদ হবে। রাত্রিবেলা একা একা দাঁড়িয়ে থাকে। কোনদিন কারা এসে মুখ চেপে তুলে নিয়ে যাবে, সেদিন বুঝবে। বউ গেছে মেয়েটাকেও খোয়াবে।’
ইদানীং নিরুর নটা বাজার আগেই কিশোরকাকাকে আমি বাড়ির দিকে রওনা করিয়ে দিই। বেশ চলছিল। আমার মা ব্যাপারটা নজর করেছে। হঠাৎ একদিন আমার মা প্রচণ্ড রেগে গেল। আমি ঘরে না ঢুকতে ঢুকতেই বলল— তুই কি নিরুর সঙ্গে প্রেম করছিস? মনে রাখিস, ওর রক্তে পাপ ঢুকে আছে। ও প্রতিদিন রাতেরবেলায় ওই গলির মুখে দাঁড়িয়ে বিহারীগুলো সঙ্গে হ্যা হ্যা হি হি করে।
আমি বললাম— নিরু কিশোরকাকার জন্যে দাঁড়িয়ে থাকে।
‘বাপ খোঁজে না ছেলে ধরে? তোর কী দরকার, রোজ খুঁজে খুঁজে মাতালটাকে ধরে নিয়ে আসবি? তাই বলি, সাইকেল থাকতে ছেলে কেন হেঁটে হেঁটে আসে! তুই যদি এবার ওই মাতালটাকে খুঁজতে যাস— আমি নিরুর সঙ্গে বুঝে নেব।’
‘মা তুমি এরমধ্যে ঢুকবে না।’
‘নষ্ট মেয়েছেলে, যেমন ওর মা, তেমন মেয়ে।’
আমি বললাম, ‘তুই নিরুকে কিছু বলবে না।’
‘তুই স্টেশনে নেবে সাইকেল নিয়ে চলে আসবি। নইলে ওর ছাল আমি ছাড়িয়ে দেব।’
আমি মা বড় মুখরা। এখানকার সব মেয়েই মুখরা, নাহলে টিকতে পারবে না। আমি জানি, মা নিরুর ধুরধুরি নেড়ে দেবে, ছাল ছাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। মা নির্ঘাত একটা বিশ্রী কাণ্ড ঘটাবে। আমি, বাবা বিয়ের পরেও দিদি সবাই মায়ের মুখের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে। বাবা আমাদের কথোপকথন শুনছিল। তারপর আস্তে আস্তে বাইরে বেরিয়ে গেল। বাবা প্রত্যেক দিন পাড়ার ক্লাবে রাত নটা সাড়ে নটা পর্যন্ত ক্যারাম খেলা দেখে, টিভিতে খবর শোনে। বাবা ঢুকলে আমরা সবাই খাই। বাবা দিনের বেলা একটা প্যাথ ল্যাবে বসে। বিকেল পেরিয়ে ঘরে আসে। আমি সকালে বেরিয়ে যায়। ফিরি আটটা নাগাদ। আজ বছর দুয়েক আমি চাকরি পাওয়ার পর সংসারের হাল ফিরেছে। বাবা বলে, অভাবেই তোর মা এমন খ্যাক খ্যাকে হয়ে গেছে, আগে মুখ ফুটে একটা আওয়াজ বের হতো না। হবে হয়তো। অভাব তো আমাদের এখানকার সবার জন্মদাগ।
এক প্রকার মায়ের ভয়েই আমি আর কিশোরকাকার খোঁজ করি না। তবে একদম যে করি না। তা নয়। যেমন আসার সময় দু’চোখ জ্বেলে খুঁজি। চোখে পড়লেই কাকাকে তুলে রওয়ানা করিয়ে দিই। এতে সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙে। ব্যাপারটা বেশ কাজে আসছিল। কোনও কোনও দিন কাকাকে তুলে ধমক কষিয়ে বললাম— লজ্জা করে না। মেয়েটা বাড়িতে একা। সে তোমার জন্য গলির মুখে দাঁড়িয়ে আছে, আর এখানে বসে বসে তুমি চাঁদ তারা গুনছ। চলো। এক্ষুনি বাড়ি চলো। কোনওদিন বলি— মাল খেলে তোমার কী হয়? নালায় তো পড়ো না বাবা, রাস্তার ধারে বসে থাকো কেন? তোমার জন্য একদিন নিরুর সর্বনাশ হবে। কোনওদিন বলি, কাকি গেছে এবার মেয়েও যাবে।
আমি আসলে মনে মনে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে থাকি। আমার বার বার মনে হয়, নিরু যেভাবে এমন দাঁড়িয়ে থাকে, যেকোনও দিন ওকে কেউ মুখচাপা দিয়ে টেনে নিয়ে যাবে। বাড়ির কাছে ভাঙা কারখানা জঙ্গল। একবার ওখানে ঢোকালে নিরু আর বাঁচবে না। অনেক অনেক বছর আগে বুড়োর পিসি ডেডবডি পাওয়া গিয়েছিল কারখানার ভেতর মরা । তখন কিন্তু কারখানা চালু ছিল। এখন তো বন্ধ, পরিত্যক্ত। নিরুও তেমন গোঁয়ার। রোজ এসে দাঁড়ানোর কী আছে। মা সবকিছু খারাপ বলে না— ওই বিহারী ছেলেগুলো সঙ্গে ওর কিছু একটা থাকলেও থাকতে পারে।
তবে আমার বুদ্ধিটা কাজে দিয়েছিল। আমি চলে আসার কিছুক্ষণ পরে কাকা চলে আসত। কিন্তু একদিন বাড়ি ফেরার পথে কিশোরকাকাকে কোথাও দেখতে পেলাম না। বাড়ি চলে এলাম। রাত তখন প্রায় এগারোটা হঠাৎ দেখলাম কিশোরকাকা একা একা চোরের মতো ফিরছে। দেখে, আমি চমকে উঠলাম। কাকা এখন ফিরছে তাহলে নিরু কোথায়? কাকার পিছনে নেই, গলির মুখে নেই। আমার বুকের ভেতরটা কাঁপছে। আমি ছুটে বেরিয়ে গেলাম বাড়ি থেকে, সোজা নিরুদের বাড়ি। কিশোরকাকা তখন সবে বাড়ি ঢুকেছে। দরজা খোলা। সটান ভেতরে ঢুকে দেখি— নিরু শুয়ে। কিশোরকাকা বিড়বিড় করল— নিরুর জ্বর।
জ্বর হয়েছে। সেরে যাবে। মরবে না। এখানকার কোনও মেয়েই অত সহজে মরে না। গলির মুখ থেকে কেউ তো তুলে নিয়ে যাইনি।
বাড়ি ফিরলাম। মায়ের সতর্ক চোখ। কোথায় গিয়েছিলি?
নালায় খল খল করছিল। দেখলাম— কই না সাপ?
আমি তো ভাবলাম পেতনি শাকচুন্নি দেখতে গেছিস।
তিন.
এভাবেই হয়তো আমার আর নিরুর গল্প শেষ হয়ে যেত। যেমন হয় আরকী। নিরু যদি বিপদে আপদে পড়ত তবে গল্পটা রোমহর্ষক হতে পারত। আমি যেমন ভাবি, দুঃস্বপ্নে থাকি— এই নিরুকে কেউ তুলে নিয়ে গেল, এই নিরুর করুণ চিৎকার শোনা গেল ভাঙা কারখানা থেকে, এই নিরু আর ওই বিহারি ছেলেগুলোকে নিয়ে বড়সড় কোনও হুজ্জতি হয়ে গেল, কিংবা আরও কত কিছু, নিরুকে গলির মুখে দেখতে দেখতে আমি যা যা ভাবি।
আমি যা যা ভাবি তার কিচ্ছু হল না। কিন্তু গরিবঘরে যা হয় তার নাম বিপদ। নিরুর সেই বিপদ হল। কিশোরকাকার পায়ের পাতা কেটে নিয়ে চলে গেল একটা ট্রেন। অফিস থেকে এসে শুনলাম। গোড়ালি থেকে বাদ। মানুষটা বেঁচে গেছে। শুনলাম, পা গিয়ে কিশোরকাকা অনেক টাকা পাবে। টাকার কথা রামলালা মাঠের চারদিকে ঘুরছে। সত্যি সত্যি অনেক টাকা পেল। সেই টাকায় নিরু স্টেশনের পাশেই একটা ব্লাউজের দোকান দিল। বিউটি ব্লাউজ সেন্টার। বিবিসি। সেখান থেকে আমাদের রামলালা মাঠের অনেকেই ব্লাউজ কেনে। সস্তা নেয়। আমার মা কেনে না। দিদি এসে একবার কিনেছিল বলে মা গালমন্দ করল। মায়ের যে কী জাতক্রোধ! হঠাৎ একদিন শুনলাম নিরুদের বাড়িতে খুব জোরে জোরে কিশোরকুমারের গান বাজছে। শুনলাম, নিরু কিশোরকাকাকে সাউন্ড সিস্টেম কিনে দিয়েছে। অনেক কিছু পালটে গেল কয়েক বছরের মধ্যে। হ্যাঁ মিস করে যাচ্ছিলাম। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন যেটা হল, এখন প্রতিদিন নটা বাজলে কিশোরকাকা গলিমুখে নিরুর জন্য এসে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়েই থাকে যতক্ষণ না নিরু ফেরে।
আমার আর নিরুর গল্প শেষ হয়ে গিয়েছিল অনেকদিন আগেই। অনেকদিন আগে থেকে নিরুর গল্পে আমি নেই। থাকার কথাও নয়। ক্লাস সেভেন পাশ নিরু এখন বিবিসি হয় গেছে।
তবু, একদিন ট্রেন থেকে নেমে সাইকেল নিয়ে চলেছি। হঠাৎ দেখলাম রাস্তার এক পাশ দিয়ে নিরু হেঁটে যাচ্ছে। আমি থামলাম। বললাম, ‘যাবি?’
‘ফেলে দিবি না?’
‘উঠেই দেখ না।’
সাইকেলটা দুপাক গড়াতে নিরু বলল, ‘তোর সাইকেলটা সেই কবেকার— বিশুকাকা দুপুরে খেতে এলে তুই হাফ প্যান্ট পরে লম্বা লম্বা ঠ্যাং নিয়ে হাফ প্যাটেল করতিস। আমরা হেসে মরতাম।’
কথাটা বলে নিরু হঠাৎ চুপ করে গেল। কারণটা আমি বুঝেছি। আমরা! নিরু আর জুঁইকাকি।
আমি সাইকেল চালাচ্ছি। নিরু চুপ করে বসে আছে।
আমি একটু সহজ হওয়ার জন্য বললাম। ‘তুই তো এখন বিবিসি।’
‘নামটা আমিই দিয়েছি।’ নিরু গর্বিত, হাসল।
‘বিবিসি এখন সব মেয়েদের বুকের খবর জানে!’
‘ইশ! বাবু তুই এখনও অসভ্য থেকে গেলি!’
আমরা হাসছি। যে করে যেকোনও দু’জন হাসে। গলি মুখে ওর বাবা দাঁড়িয়ে। আমি বললাম, ‘কিশোরকাকা!’
‘আমাকে গলির আগেই নামিয়ে দে।’
‘আমি বললাম— চল না।’
কিশোরকাকার কাছে এসেও আমি সাইকেল থামালাম না। নিরু বলল, ‘এই বাবু থামা।’
আমি ক্রিং ক্রিং করে বেল দিলাম। কিশোরকাকা তাকাল। কিন্তু আমি সাইকেল থামালাম না। বললাম, ‘ছাড় তো। তুই অনেকদিন কিশোরকাকার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকেছিস।’
আমি ক্রিং ক্রিং বেল দিয়ে গলির মধ্যে ঢুকে পড়লাম। সামনে রামলালা মাঠ। বাড়ির উঠোনে স্পষ্ট মাকে দেখা যাচ্ছে। কোমরে হাত দিয়ে, গলির দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে। নিরু ভয়ার্ত গলায় বলল, ‘বাবু তোর মা।’
আমি কোনও কথা বললাম না। আমাদের বাড়ির সামনে এসে, মায়ের সামনে এসে ক্রিং ক্রিং করে বেল দিয়ে নিরুকে নিয়ে ওর বাড়ির দিকে উড়ে গেলাম।
সাইকেল থেকে নেমে নিরু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘বাবু তোর খুব সাহস হয়ে গেছে! এই তুই আজ মাল খেয়েছিস নাকি রে? মাল না খেলে তো কারও এত সাহস হয় না।’
আমি ওর মুখের কাছে মুখ এনে দু’বার হা হা করলাম। বললাম, ‘কালও তোকে নিয়ে আসব। আমার জন্য অপেক্ষা করবি।’
নিরু হাসল, বলল, ‘এক তারিখে আমার স্কুটি আসছে। বুক করেছি। তারপর থেকে আমিই তোকে নিয়ে আসব।’ ·

0 মন্তব্যসমূহ