সন্ধেবেলা আকাশে যে তারাগুলো জ্বলে ওঠে, তার সবগুলো সত্যি সত্যি তারা নয়। আমার হাতে বানানো দু-চারটে ফানুসও সেখানে রয়েছে। খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশে তাকালে জানা যাবে, তারাদের চক্করে পড়ে ফানুস একসময় তারা হয়ে যায়। নিজের হাতে এই সত্যি-মিথ্যেকে গুলিয়ে দেওয়াই হলো আমার কাজ। এমন দিন আসে যখন নিজের ওড়ানো ফানুসকেই, আকাশের তারা বলে ভুল করি।

আমার চোদ্দোপুরুষ এইভাবে ফানুস বানিয়েছে। কতদিনে চোদ্দোপুরুষ হয় জানি না। বাবা বানাতেন, বাবার বাবাও ছিলেন। আর শোনা গেছে বহুদিন আগেকার বাবারাসব এই কাজে হাত পাকিয়েছিলেন। তাঁদের দিনমান গেছে ফানুস তৈরির ঘিঞ্জি অন্ধকার কারখানার ভেতর। একসময় হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, অন্ধকার কারখানা ঘর সত্যি নয়, সত্যি হলো বাইরের খোলা আকাশ। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অন্ধকারের ঘর থেকে মিথ্যের কিছু উপজাত ফানুসের চেহারায় আকাশে উড়িয়েছি।

মিথ্যের ব্যবসা নিয়ে থাকা ফানুসের কারিগর যারা, বাইরের কারো সাথে তারা মিল ও মিশেলে থাকে না। তাদের জন্যে আলাদা জায়গা দেওয়া আছে। সেই কবেকার দিন থেকে এমন হয়ে আছে।

আলাদা থাকতে থাকতে আমাদের নামে আলাদা পাড়া তৈরি হয়েছে। পাড়াটা আঁকড়ে ধরে বাঁচি। লোকে বলে ফানুস এলাকা। অনেকেই খুব একটা এদিকে আসে না, মিথ্যের এলাকা বলে জায়গাটা এড়িয়ে চলে।

অন্যদিকের বাড়িগুলো দূর থেকে দেখা যায়। সেইসব ঘরবাড়ি নিয়ে আমার নিজেরও বেশ কৌতূহল আছে। তাদের বিষয়ে জানতে ইচ্ছে করে। তারা কী করে। ফানুস তৈরির মতো আর কিছু নিশ্চয়ই করে। সত্যিকে কতটা মিথ্যে করে দেয়? নাকি মিথ্যে যা কিছু, তাকে সত্যি করে তোলে।

বাবা বারবার বলেছিল, “ওদিকের ঘরবাড়ি নিয়ে মাথা বেশি না ঘামানোই ভালো। এমনিতে আমাদের বাড়তি সময় হাতে নেই। দিন থেকে রাত পর্যন্তই কাজের এমন চাপ, নাওয়া-খাওয়ার সময় হয় না।”

ওদিকের এলাকা থেকে আমাদের জন্যে কাঁচামাল আসে। সেইসব জিনিসের ওপর কিছুকিছু ভরতুকি পাই। যারা চায় তাদের ইচ্ছে ও আবদারমতো ফানুস বানিয়ে দিই। কার জন্মদিনে কোন রঙ আর চেহারায় কত বড় ফানুস গড়া হবে, এইসব নিয়ে আলোচনা করে আমাদের ছোটভাই বাবন।

দরাদরি সারা হলে বাবনের কাছে তারা দাম রেখে যায়। ফানুস তারা ছুঁয়েও দেখে না। আকাশে ওড়াবার দিন ক্ষণ মাস ও বছর নিয়ে ক্যালেন্ডার আছে। আমরা সেই ক্যালেন্ডার দেখে দেখে কাজ করি। তাদের ইচ্ছেমতো ফানুস উড়িয়ে দিই। কিছুক্ষণ উড়ে উড়ে টুইঙ্কল টুইঙ্কল গানে ফানুসেরা তারাদের বন্দনা করে। কিছুটা সময় পেছন পেছন যাই। তারপর টের পাই ক’দিনের প্রসূতিঘরের আদরসীমা অতিক্রম করে তারা চলে গেছে।

যাদের নাম করে এইসব ফানুস উৎসর্গ হয়েছিল, মাঠের ওপার থেকে, বাড়ির ছাদ থেকে, কিংবা সামনের খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে তারা সেই ফানুসের চলে যাওয়া দেখে। অপেক্ষায় থাকে কখন ফানুসখানি আকাশের তারা হয়ে যাবে।

একদিন ফানুস-এলাকার কাছাকাছি খোলা মাঠে কয়েকগাড়ি মানুষ এলো। তাঁবু ও কানাত গাড়া হলো। ছায়া খুঁজে নিয়ে ঝাঁকড়া বটগাছের নিচে চেয়ার-টেবিল পেতে দিলো তারা। আলাদা তাঁবুতে চানঘর হলো। ক’জন ফুরফুরে যুবক-যুবতী সারাদিন এলাকাটা উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়ালেন। চেয়ার-টেবিলে বসে খাওয়া-দাওয়া সারলেন। বইখাতা খুলেমেলে আলোচনা সেরে নিয়ে আবার খাতায় কীসব লিখেও রাখলেন। ফানুস এলাকার দিকে ফিরেও তাকালেন না।

রাত খুব ঘন হলে টেবিলের ওপর ছোট আলো জ্বলে উঠল। হাতে হাতে তখন কয়েকটা দূরবীন ঘুরে বেড়াতে লাগল। আকাশের দিকে দূরবীন চোখে লম্বা সময় তারা তাকিয়ে রইলেন।

সকাল হতে তাঁবুর আশপাশে একটা কুকুর নজরে পড়ল। চেহারায় ছোট হলেও এ কুকুরের দাপট আছে বলতে হবে। ঘনঘন লেজ নাড়তে নাড়তে সে একবার তাঁবুর ভেতর ঢুকছিল, আবার উত্তেজিত হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসছিল। দু-এক টুকরো খাবার সেদিকে ছুঁড়ে দিয়ে লোকগুলো তামাশা দেখছিল। শূন্য থেকে খাবার লুফে নিয়ে দৌড়ে কুকুর দূরে চলে যাচ্ছিল।

খাওয়া শেষ হলেও তারা জায়গা ছাড়েনি। সূর্য মাঝ-আকাশে আরো সরে যেতে, বটের ছায়া জাঁকালো হয়ে চেয়ার-টেবিল জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ছায়ায় বসে তারা কথা বলছিল। দেখে মনে হতে পারে আলোচনার বিষয় ছিল গম্ভীর। আর ছায়ার নিচে বসে, একটা কাজ-চালানো আড়াল তারা বজায় রেখেছে। এমন ধারণা অবশ্য ভুলও হতে পারে। কথা বলার ফাঁকে লাল একটা বল নিয়ে একজন কুকুরটার সঙ্গে খেলছিল। তাদের কথোপকথন দূর থেকে বোঝা সম্ভব নয়। তবে হাত-পায়ের নড়াচড়া, পরস্পরের দিকে ঘনিষ্ট হয়ে ঝুঁকে পড়া, মাঝেমাঝে দূরে সরে যাওয়া; আলোচনার বিষয়ের ব্যাপারে কিছুটা হলেও আলোকপাত করে বইকি। তর্কাতর্কি নয়, সকলে মিলেমিশে কোনও এক বিষয়ের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে।

হলুদ আমাদের পোষা বেড়াল। এলাকার প্রত্যেক বাড়িতে হাঁড়িতে হাঁড়িতে তার জন্যে প্রতিদিন চাল নেওয়া হয়। সেই হলুদ একদিন ওদের এলাকা থেকে মুখে করে মাছ নিয়ে এলো। ব্যাপারটা তখন ভাবিয়ে তুলল। লোকগুলো সরকারী গাড়িতে এসেছে। আমাদের তরফে বলবার কিছু ছিল না। তবু এলাকায় কেমন সংশয় ছড়িয়ে পড়েছে। কাজ ফুরিয়ে গেলে অল্পদিনে তাঁবু গুটিয়ে নেওয়া হবে ভেবেছিলাম। অথচ পুরনো তাঁবুর পাশে আরও নতুন তাঁবু ইদানিং জায়গা করেছে।

খোলা এই মাঠে আগেও অনেকে তাঁবু গেড়েছিল। ভ্রাম্যমান অভিযাত্রী যারা, দুঃসাহসিক সন্ধান শেষে, বিশ্রামের ক’দিন হয়তো এইখানে আরাম করেছে। এরা তাদের মতো নয়। এরা যেন থেকে যেতে এসেছে।

কিছুদিন মনে হয়েছিল সিনেমা দেখছি। সিনেমায় যেমন হয়, যারা দেখে তাদের তরফে সরাসরি যোগ দেবার কোনো জায়গা থাকে না। আরও কিছুদিন একতরফা দেখে যেতে হবে ভেবেছিলাম। যতদিন না তারা নিজে থেকে শেষ করে।

কেউ এমনও আশা করেছিল, চলে যাবার আগে তারা নিজে থেকে এগিয়ে এসে কথা বলবে। যাবার আগে নতুন কাজের ফরমাস দেবে। পর্যাপ্ত কাঁচামাল জমানো রয়েছে। যে জিনিসের সত্যতা নিয়ে কারো কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু তা দিয়ে তৈরি ফানুস যখনই উড়ে যায়, আকাশ পরিমণ্ডলে এক ব্যাপ্ত মিথ্যার জন্ম দেয়। আবহমান কাল ধরে সেই মিথ্যা মানুষের ভালো লেগে এসেছে। মিথ্যাকে তারা দেবতার মতো বিশ্বাস করেছে। তাঁবুর নিচে আসর জমানো দলটাকে তাই চিনতে আমাদের ভুল হয়নি।

ক’দিন পরে শীত এসে জাঁকিয়ে জায়গা দখল করল। কুয়াশায় থমথমে হয়ে গেল সকাল-বিকেল। তাঁবুগুলো প্রায় ভুলতে বসেছিলাম। নিঃসাড় চলাফেরায় লোকগুলো অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। তাদের জামাকাপড় পুরনো ম্যাড়মেড়ে হয়ে গিয়েছিল। এমনকি টুপিগুলোর গড়ন কিমাকারে ঘেঁটে গিয়ে মুখের চেহারাও পালটে গিয়েছিল। তারা আর আগের মতো নজরে ছিল না।

শীত গাঢ় হলে রাত বড় হয়। ওড়বার আকাশ ও সময় বাড়ে। জেগে থেকে আকাশের মোহন রূপ দেখি। ফানুসের গতিবিধি দেখেশুনে কাগজে তাদের ছেলেমানুষি বা ব্যাপ্ত বুড়োমির কথা লিখে রাখি।

আমাদের ঘরদোরে আমাদেরই হাতে যে ফানুস চেহারা পেয়েছে, গভীর আকাশে গিয়ে তার মানে ও মাত্রার হিসেব থাকে না। জেগে থেকে হিসেবের বাইরের কথা কিছু লিখে রাখি।

তারাই প্রথমে এলো। আগে তারা কখনও আসেনি। তাই চেনবার কথা নয়। প্রথমে কোনো ব্যবসায়ী বা ফানুসের গাহক বলে ভুল করেছিলাম। বাইরের ওদিকের থেকে যারা আসে, বাবন তাদের চেনে। বাবন বলল, তারা আমাদের চেনা কেউ নয়।

লোকগুলো নিজেদের পরিচয় দিলো। তাদের কথা কিছু বুঝতে পারছিলাম না। বাবন বলল, দূরের পশ্চিমের কোনো জায়গা থেকে যেন, তারা এসেছে।

আমাদের জানা হয়ে গেল তাঁবু তারা দূর দেশ থেকে বয়ে এনেছে। তাদের তাঁবু আর ভাষা, দুই-ই আমাদের অজানা ছিল। কথা বলবে বলে সঙ্গে করে দোভাষীও এনেছিল।

দোভাষীর হাত ধরে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে লাগল। আমাদের বলা কথা দোভাষী তাদের কানে পৌঁছে দিলো। দু’দলের মাঝখানে দেওয়াল সরে একে অন্যের কাছে খোলামেলা হয়ে গেল। গলগল করে উভয়ে বলে গেল। আমাদের ফানুসের মসৃণ ওড়াওড়ি পছন্দ করেছে তারা। এ জাতীয় ফানুস নিয়ে কত কথা কতদিন ধরে শুনে এসেছে। ব্যাপারটা যাচিয়ে দেখবে বলে কাছাকাছি এসে এতদিন বসে আছে। সেসব উত্তেজনাময় অভিজ্ঞতার বর্ণনা তারা এমন করে দিয়েছিল, যেন আমরা নই, বরং তারাই প্রপিতামহের সময় থেকে ফানুস প্রকল্পে লেগে আছে।

উত্তরে যা বলবার বলছিলেন জ্যাঠামশাই। ঘরের কথা ঘটা করে বাইরে বলতে হলে সবসময় জ্যাঠামশাইকে পাশে পাই। এমন পরিস্থিতি ঘনিয়ে উঠলে আমাদের প্রতিটি প্রজন্ম পাশে একজন জ্যাঠামশাইকে পেয়ে এসেছে।


তারা জিজ্ঞেস করল, কীভাবে শুরু করেছিলেন?

জ্যাঠামশাই জানিয়ে দিলেন, শুরুর কথা যদি কিছু থাকে, সে আমাদের কথা নয়, শুধু কিছু লোকশ্রুতি লোক-পরম্পরায় আমাদের সময় পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। এ ছাড়া আর কিছু নেই। যেমন বাবা ‘অ’ লিখতে শিখিয়েছিলেন।

তিনি যেন নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলছিলেন। পরিস্থিতি তেমন হলে, তিনি প্রতিবার বলা কথার নবীকরণে অভ্যস্ত ছিলেন। আমরাও অন্য কিছু এভাবেই শিখেছি। আমাদের ফানুসও অন্যতর হয়ে উঠেছে।

জ্যাঠামশাই বলেছিলেন, “বাবা ‘অ’ লিখে দিয়েছেন হাওয়া বাতাসের গালে।”

কাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন এমন বায়ুর কথা বায়বীয় বয়ানে, জানি না। বাতাস বা জলের মতো মৌলকে আয়ত্ব করে বুঝি জ্যাঠামশাই যে কোনো নির্মাণে পৌঁছনোর ধারণা করতে পেরেছিলেন। তবে মাঝখানের দোভাষী বেচারা তার কী অনুবাদ করেছিল, কে বলতে পারে।

“বুনিয়াদী সেই ‘অ’ টি ক্রমাগত বুলিয়ে চলেছি। নিজেকেই খড়ি দিয়ে বুলিয়ে চলেছি। বারবার নিজেকে নকল করে বেঁচে আছি।” – অনেকক্ষণ সময় নিয়ে জ্যাঠামশাই কথা ক’টি বললেন।

অনুবাদেও সময় লেগেছিল। তবে তাদের চোখের দিকে তাকালে বোঝা যায়, অনুবাদ তেমন জমেনি। তাই আরও কিছু শোনার জন্যে তারা তৈরি হচ্ছিল। নড়েচড়ে আরও জমাট বেঁধে বসতে চাইছিল।

ঠিক তখনই জ্যাঠামশাই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “আমার পেছনে আসুন।”

পেছনে হেঁটে হেঁটে আমরাও শিখেছিলাম। এখন তারাও এলো। চোখ-কান তাদেরও খোলা ছিল বেশ বোঝা যায়।

ফানুস-স্টেশন পর্যন্ত অতিথিরা পৌঁছে গিয়েছিলেন। কারিগর আর শিক্ষানবিশেরা সেখানে গুলতুনি করছিলেন। আমাদের পাড়াগ্রামের চেনাশোনা লোকজন তারা সব। যতক্ষণ না এই ফানুস-এলাকায় পা রেখেছিল, তারা নিজেদের ঘরের হাবুল, কাবুল, মনোজ, তীর্থ বৈ তো আর কেউ ছিল না। কিন্তু এলাকায় যখন ঢুকে পড়ল, তখন অন্য মানুষ; হাবুল-কাবুল রইল না আর, তারা কারিগর হলো।

সেই কারিগরেরা নতুন কাজের সম্ভাবনা আঁচ করে উৎগ্রীব হলো। এতদিন সে জায়গা পর্যন্ত কাউকে পৌঁছতে দেখেনি। তাই নতুন কিছু দেখে প্রথমে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছিল। পরে সে উৎকণ্ঠা বাড়তি আগ্রহে পালটে গেল। তারা অতিথিদের কথা ভেবে কোথা থেকে ক’টা চেয়ার নিয়ে এলো। লোকগুলো সে চেয়ারে বসল না। বেশ বোঝা যাচ্ছিল তাদেরও উত্তেজনা বাড়ছে।

সময় নষ্ট না করে অতিথিরা সরাসরি বললেন, “এতদিন বসে থেকে ফানুসের ওড়াওড়ি লক্ষ করেছি। আপনাদের কাজ কেমন করে গভীর অনিশ্চয়তায় হারিয়ে যায়, তাও জেনেছি। উড়িয়ে দেবার পরে হয়তো আর ভেবে দেখেননি কেমন করে আবার তাকে ফিরিয়ে আনা যায়।”

জ্যাঠামশাই নিজে এর উত্তর দিলেন, “ফিরিয়ে আনাই যেত। অনেকে হয়তো তেমনই করে থাকেন। ফানুসের বাইরের অবয়ব এই কারখানা ঘরে গড়ে ওঠে। তারপর উড়ে যায়। যতক্ষণ ওড়ে, নির্মাণ বস্তু হিসেবে ততক্ষণই সে নিজেকে পালটায়। বিষয় ও আঙ্গিকের ক্রমাগত পরিবর্তন স্বতোদ্ভাবন পদ্ধতিতে এক স্বকীয় ফানুস নির্মিতির জন্ম দেয়। তারপর সেই ফানুস ওড়াওড়ির সীমানার বাইরে চলে যায়। কোথায় যায় জানি না। জানতে চাইও না। চোখের বাইরে বলেই ভেবে নিতে পারি, সে ক্রমশ আরও হয়ে উঠছে। তাই হারিয়ে যেতে দেওয়ার মধ্যেই নির্মাতা হিসেবে ফানুস কারিগরের সার্থকতা লুকিয়ে আছে।”

কথা শেষ হতে জ্যাঠামশাইকে ক্লান্ত লাগছিল। যারা শুনছিলেন তারা কিন্তু ধৈর্য হারাননি। নতুন কিছু বলার জন্যে তারা কথা সাজিয়ে নিচ্ছিলেন।

এতক্ষণ চুপ করে জ্যাঠামশাইয়ের মুখের দিকে যিনি তাকিয়ে ছিলেন, তিনিই নীরবতা ভাঙলেন। বললেন, “এই ফানুসের সঙ্গে আমরাও উড়ে যেতে চাই। অঙ্কের মতো সত্য ও সহজ স্বচ্ছতায় ফানুস নির্মিতির শেষ কথা জানতে চাই। জানা হয়ে গেলে আমরা ফিরে আসব। সকলকে জানিয়ে দেবো। এতে আপনাদের সুবিধেই হবে।”

জ্যাঠামশাই জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি অধ্যাপক?”

অতিথি জানালেন, “আমরা সকলেই অধ্যাপক। যে কোনো নির্মিতির অঙ্গ, স্নায়ু বা রক্তনালীর শারীরবৃত্তীয় কাঠামো ম্যাজিকের মতো ব্যবচ্ছেদ করে দেখানো আমাদের কাজ।”

জ্যাঠামশাইয়ের বোধহয় আর জানবার ছিল না। সম্ভবত এমন প্রস্তাব আগে শোনেননি। তাঁর ভঙ্গিতে সেকথা ফুটে উঠেছিল। তিনি নিজেই ভেতরে চলে গেলেন। এরপর কথা চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব আমাদের।

বাবন বলল, “কিন্তু আমাদের ফানুস একা আকাশে উড়ে যায়। ফানুসের সঙ্গে ওড়বার জন্যে দু’এক জনের ব্যবস্থা সেখানে করা থাকে। সেটা আমাদের নির্মাণ বিষয়ক পরম্পরা। তবে আমরা ফানুসকে একা ছেড়ে দিই। তার সঙ্গে সহযাত্রায় আজ পর্যন্ত কেউ যায়নি। ছেড়ে দেওয়া ফানুসকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনবার কথাও আলাদা করে ভাবা হয়নি। শুরু থেকে অনেকটাই সে আপনার চোখের সামনে থাকবে, তবে পুরোটা থাকবার কথা নয়। তার নিজের জন্যে কিছু ছাড় রাখা থাকে। তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় যাতে সবার অলক্ষ্যে সে হয়ে উঠতে পারে। ভোক্তার বিস্ময় উদ্রেকের কথা ভেবে এই অবকাশটুকু রাখা থাকে।”

কিছু জিজ্ঞেস করার জন্যে অতিথিদের একজন উসখুশ করছিলেন। বাবনের কথায় তিনি বিস্মিত হলেন। তবে মুখে বললেন, “আপনাদের অজ্ঞতার কারণে এক অমিত সম্ভাবনা বাজারজাত করা গেল না। তার বদলে এক অমিত ক্ষতির পরিকাঠামো তৈরি হয়েছে।”

ভারী বিষয় নিয়ে যখনই কথা হয়, মানুষ তখনই কেমন গম্ভীর ভাষার আড়াল খুঁজে নেয়। অথচ বিষয় হিসেবে ফানুস ছিল বাতাস ছাড়াই উড়ে যাবার মতো হালকা ভাসমান কিছু।

বাবন বলল, “আমাদের পূর্বপুরুষেরা সেভাবে ভাবেননি। আর ফানুস ওড়ানোর পেছনে যে দর্শন কাজ করে সেটাও লম্বা সময়ের উত্তরাধিকার। তাই এরকমই করা হয়। অন্য কিছু সম্ভব নয়। আপনারা এখন যেতে পারেন।”

সহজে চলে যাবেন বলে তারা আসেননি। উলটে বেশ গুছিয়ে বসলেন। অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য চায়ের ব্যবস্থা হয়েছিল। সে চা তারা ছুঁয়েও দেখলেন না। তবে তারা যেন আমাদের জন্য কিছু করে দেখাবেন বলেই এসেছিলেন। তাদের মুখ-চোখে সৌহার্দ্যের চাপা আন্তরিকতাও গোপন ছিল না।

বাবনের কথা শেষ হল না। বাইরে কুকুরের চেনা চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছিল। এ সময়ে সামনের খোলা মাঠে কুকুরটা প্রতিদিন দৌড়য়। তার পেছনে অতিথিদলের কেউ না কেউ থাকে, যে অনেক দূরের লক্ষ্যে বল ছুঁড়ে দেয়। কুকুরটা দৌড়ে গিয়ে বল কুড়িয়ে আনে। পরেরবার বল আরও দূরে ছুঁড়ে দেওয়া হয়। কুকুর আরও দূর পর্যন্ত ছুটে গিয়ে বল কুড়িয়ে আনে। বলের দূ্রত্বের সঙ্গে কুকুরের লক্ষ্য ক্রমে বাড়ে। একসময় মনে হয়েছিল, এই পশুটির ধৈর্য ও সহনশীলতা বাড়াবার জন্যই ফাঁকা মাঠে এসে তারা তাঁবু গেড়ে বসে আছে। আর এখন জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখা গেল, আমাদের বেড়াল হলুদও সেই কুকুরের সঙ্গে যোগ দিয়েছে।

এখন মনে হচ্ছে, কুকুর নয়, ফানুসের ওড়াওড়ির চিরকালীন চেহারায় তারা একটা বাড়তি লেজ লাগিয়ে দিতে চায়। সেটা হবে উত্তর-আধুনিক এক পুনর্নির্মাণ যোজনা। স্বনিযুক্ত বিশেষজ্ঞ হিসেবে এ কাজে একদিন তারা দাগ রেখে যাবে।

তবে কুকুরের চিৎকার-চেঁচামেচিতে তারা বিশেষ বিচলিত হলো না। সব হট্টগোল একসময় থেমে গেল। এবার তারা বলল, আমাদের প্রস্তাব খুব পরিষ্কার। আমরা আপনাদের ফানুসের সঙ্গে আকাশে উড়ে যেতে চাই।

এমন প্রস্তাব আগে আসেনি। উড়তে থাকা ফানুসের দিকে সকলেই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থেকেছে। ফানুসের হয়ে ওঠার কথা ভেবে যে জায়গায় তাকে একা ছেড়ে দেওয়া হয়, সে জায়গার পর ভোক্তার নজর আর আগে এগোয়নি।

নতুন অতিথিরা আলাদা নয়। তাদের ভাবনাতেও কোনো অস্বচ্ছতার অবকাশ নেই। তাই শেষ পর্যন্ত নিজে চোখে দেখবে বলে তারা ব্যাকুল হয়েছে।

বাবন বলল, “ফানুস এলাকা একান্তই আমাদের। তবে তা যখন আকাশে উড়ে যায় তখন আর নিজের থাকে না। অন্য কারও কথা বলবার অধিকার সেখান থেকে হয়তো শুরু হয়। তখন আর তার ওপর কথা বলা আমাদের সাজে না।”

তারা খুশি হলেন। বললেন, “তবে তো আর কোনো অসুবিধে রইল না। আপনাদের সঙ্গে আমরাও কাজে লেগে যাব।”

বাবন চুপ করে রইল। তাকে বললাম, “জ্যাঠামশাইকে একবার জিজ্ঞেস করা উচিত।”

সে কি বলল, বোঝা গেল না।

পরের দিন তোড়জোড় শুরু হলো। বসার জায়গাটায় অতিথিদের একজন উঠে বসলেন। আগে কখনও কেউ বসেনি। ফানুসের নিচে নিয়মের মতো এতদিন জায়গাটা লেগে ছিল। ভয় ছিল ব্যবহার না থাকার কারণে মানুষের প্রত্যঙ্গের মতো একদিন সেটা ক্ষয় হয়ে বাতাসে মিলিয়ে যাবে। কিন্তু এতদিনে জায়গাটা যেন কাজে লাগল। কখনো দেখিনি, তবে শুনেছিলাম একদিন এর ব্যবহার ছিল। তখন ফানুসের কাহিনি অন্য ছিল। হয়তো কোনো মহাভারত বা রামায়ণের সময়ে। তবে চোখের সামনে এই প্রথম।

ওড়বার আগে কেবিনের ভেতর একা মানুষটি কেমন গুটিয়ে গেলেন। দেখে মায়া হলো। যদিও তিনি স্বেচ্ছায় এ যাত্রায় সওয়ার হয়েছেন। তিনি এমন কিছু ভেবেছিলেন যাতে ফানুসের ওড়াওড়ি একটা অন্য মাত্রায় চলে যায়। তবে তিনি ছাড়াও সেসব ছিল অতিথিবর্গের সম্মিলিত ভাবনা। প্রথমবারের মতো তাঁকেই এগিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

আর শেষ পর্যন্ত তিনি কুকুরটাকে ডেকে নিলেন। কেবিনে ঢোকবার আগে কুকুর ঘনঘন লেজ নাড়াচ্ছিল। সে ভেতরে ঢুকলে যখন কেবিনের দরজা বন্ধ হয়ে গেল, তার লেজ নাড়া থমকে থেমে গেল। বড় সম্ভাবনার আগের শুরু যেমন হয়।

আমাদের মনে ভয় ছিল। শুধু জ্যাঠামশাই কেন, এলাকার সকলেই আগের রাতে ঘুমোতে পারেনি। তবু কেন রাজি হয়ে গেলাম? নতুন করে ভেবে দেখা শুরু হলো। জ্যাঠামশাইও রাজি হলেন। অতিথিরা আমাদের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন।

অনেক দূর পর্যন্ত জেগে থেকে ফানুসের উড়ে যাওয়া দেখা হলো। যতক্ষণ চোখের আয়ত্তে ছিল, ততক্ষণ অন্য ভাবনার অবকাশ ছিল না। এলাকার সকলেই, ওড়া এভাবেই দেখে এসেছে। দূর এলাকা পর্যন্ত যাদের এই দেখার অভ্যাস রয়েছে, আমরা যাদের জানি না, তবু যাদের কথা ভেবে আমরা প্রাণপাত করে বড় হই, বুড়ো হই; তারাও হয়তো দেখেছিল। তারা প্রতিদিন এই ওড়া নিয়ে কী ভেবে এসেছে সেসব জানা হয়নি কোনোদিন। তবু তারা অলক্ষ্যে রয়েছে জেনে, এতদিন কাজ করে গেছি। ফানুস একসময় চোখের আড়ালে চলে গেল।

পরের কয়েকদিন উত্তেজনা চরমে উঠল। ফানুস এলাকা নিয়ে খুশিই ছিলাম। ভাসমান ফানুস যখন চোখের বাইরে চলে যেত, অজানা শিল্প-সম্ভাবনার কথা ভেবে বুঁদ হয়ে থাকতাম। এমন আরামের নেশা আমাদের বিবেচনায় শিল্পের চূড়ান্ত সম্ভাবনা হিসেবে গ্রাহ্য হতো। কেবল জ্যাঠামশাই এই বাড়তি আকাঙ্ক্ষা অলীক বলে মনে করতেন। সেই থেকে রটনাটা খুব চলেছিল যে ফানুসের শিল্প এক মিথ্যের উদ্ভাসে ভর করে বেঁচে আছে। এতদিন চাইনি, যখন অতিথিরা বারবার বোঝাল মিথ্যে অলীকের ওপর আলো ফেলে তাকে সত্যি করে দেবে; তখন কেমন সম্মত হলাম।

তাদের তাঁবুর বাইরে তেমন কিছু পালটায়নি। তবে কুকুরের না-থাকা বেশ চোখে লাগছিল। দুরবিনে চোখ রেখে আকাশে তাকিয়ে থাকার সময় তাদের বেড়েছিল।

ফানুস যে সওয়ার নিয়ে আবার ফিরে আসবে, এমন প্রত্যয় ক্রমে কমছিল। যদিও প্রতিদিনের কাজে কোনো গাফিলতি ছিল না। ঠিক রাজি নয়, আমরা নিমরাজি হয়েছিলাম। ইচ্ছের বাইরে একজন ফানুসে সওয়ার হয়ে উড়ে গেছে। চোখের বাইরে চলে যাওয়া অলক্ষ্যের বস্তুর ভেতরই এতদিন সম্ভাবনা খুঁজে পেতাম। প্রিজমের মতো ধরা দিত অদেখা আলো। এখন তারা বলে দিলো, এরপরেও আছে। সেখানে পৌঁছে তারা সরেজমিনে তদন্ত করে সেই আলোর পেছনে শিল্পকে আবিষ্কার করতে চেয়েছিল। আবিষ্কার নয়, ব্যবচ্ছেদ; বাবন বারবার বলছিল। তারা শুধু বলেছিল, কোনো কিছুই ধ্রুবক নয়। তাই তারা গেল।

যখন প্রায় ভুলতে বসেছি, ফানুস সত্যিসত্যি ফিরে এলো। মাটিতে লুটিয়ে পড়তে সকলে দৌড়ে চারপাশে জড়ো হলাম। অতিথিরাও সঙ্গে এলো। তাঁবুতে থাকলেও আজকাল তাদের নিজেদের লোক বলে মনে করতাম। এমনকি দোভাষী ছাড়াই তাদের কথা বুঝতে পারতাম।

ফানুসে সওয়ার হয়ে যাওয়া অতিথি-বন্ধুটি কোথাও নেই। তবে কেবিনের ভেতর কুকুরটা ছিল। সে কারো মুখের দিকে তাকাচ্ছিল না। নিজের থাকবার জায়গায় ফিরে গেল। দু’দিন খাবার মুখে তুলল না। এক সকালে তাকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। তবে সে যখন গেছে, আমাদের বেড়াল হলুদকেও সঙ্গে নিয়ে গেছে।

ফানুস কিন্তু আবার উড়ল। এবার আগেকার থেকে কিছু বড়। যিনি সঙ্গে গেলেন, তার উৎসাহে ঘাটতি ছিল না। মুখে প্রকাশ করিনি, তবে মনে মনে তাকেও হারানোর জন্যে তৈরি ছিলাম।

এবার ফানুসের গতি আগের চেয়ে বেশি। অল্প সময়ে চোখের আড়ালে চলে গেল। হারিয়ে যাওয়া মানুষটির স্মরণে শোকসভার আয়োজন হয়েছিল। নিজেদের মধ্যে কিছু কথা বিনিময়ের ভেতর তাকে মনে করা আরকি। বাইরের লোকেরা কীকরে খবর পেলেন কে জানে। যারা এসেছিলেন, তাদের আগে দেখিনি। প্রায় গোপন এক অভিযানের কথা বাইরে এমন ছড়িয়েছে দেখে আশ্চর্য হলাম। কেউই মানুষটির কথা তেমন আলোচনা করল না। তবে যে অজানা আলোর জন্যে সে হারিয়ে গেছে, সেই আলো নিয়ে তাদের আলোচনা থেকে প্রিজমের মতো নানা বিচ্ছুরণ বেরিয়ে আসছিল।

দ্বিতীয়বার যে গেল তার জন্যেও আগের মতোই দিন গুনছিলাম। শোকসভার পরের দিন অবাক হয়ে দেখলাম, অতিথিদের তাঁবু ক’খানির পাশে কারা এসে বসে গেলেন। পেছনে বাস-লরি-জীপ গাড়ির বাহার ভিড় করে এলো। নাকি এই মানুষেরাই সেইসব গাড়ি থেকে মাঠে নেমেছিল, খেয়াল করিনি। দলে কে কখন এলো গেল কে রয়ে গেল কে জানে। তবে কাজে খুব ব্যাঘাত হচ্ছিল। এমন আলটপকা গজানো ভিড় সামলে ওঠা পাড়াঘরের সামান্য ক’জনের ক্ষমতার বাইরে থাকে। ভিড়ের মানুষ নিজেরাই সামলে নিয়েছিল নিজেদের।

ভিড় থেকেই প্রথম আওয়াজ উঠল, চোখের আড়ালে থাকাই শেষ কথা নয়, তার পরে আরও আছে। বাকিরা ধুয়ো দিলো, উড়ে যাওয়া ফানুসকে ফিরিয়ে আনার মধ্যেই নবতর শিল্পের কথা লেখা আছে।

এই নিয়ে জনতা উদ্বেলিত হলো।

আমরা তখনও নিশ্চিত ছিলাম না ফানুস আবার ফিরে আসবে। তবে সঙ্গে থাকা জ্যান্ত মানুষের কথা ভেবে ভেতরে ভেতরে কষ্ট হচ্ছিল। একজন নয়, দু’জন। একজন আগেই হারিয়ে গেছে। অন্যজনের কথা তখনও বলা যাচ্ছে না। তবে দুজনেই মেঘের আড়ালে চলে গেছে। যে আড়াল নিয়ে এতদিন খুশি ছিলাম, তাই-ই এখন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।

একদিন ঘুম ভাঙতেই দেখি চারিদিকে উৎসবের মহড়া শুরু হয়েছে। মহড়া মনে হয়েছিল কারণ, অসময়ে কেন এই উৎসব, বুঝতে পারিনি। যখন দেখলাম দ্বিতীয় ফানুসটা ফিরে এসেছে, বুঝলাম মহড়া নয়, আসল উৎসবের এখানেই শুরু। শুধু ফানুসই আসেনি, চলে যাওয়া দুজনেই ফানুসের সঙ্গে ফিরে এসেছে।

তাদের বসার জন্যে নতুন চেয়ার দেওয়া হয়েছে। তারা কথা বলছেন না, তবে হাসিমুখে সবার কথা শুনছেন। পাশে টেবিলে কিছু খাবার রাখা হয়েছে। খাবার নয়, ছোট গ্লাসে দেওয়া জল তারা চুমুকে চুমুকে খাচ্ছেন।

ভিড়ের ভেতর ফানুস এলাকার কাউকে দেখলাম না। অথচ সবার আগে আমাদেরই সেখানে থাকার কথা ছিল। যে অতিথিরা তাদের সহকর্মীর জন্যে এতদিন অপেক্ষায় ছিলেন, ভিড়ের মধ্যে তারাও যেন কিছুটা পেছনে পড়েছিলেন।

খবর কেমন করে ছড়িয়ে পড়ে কে জানে। এত সাংবাদিক কার কাছে যে জানলেন। ক্যামেরা আর বুম মাইকে ছয়লাপ হলো। ফিরে আসা দুজনে এবার মুখ খুলতে বাধ্য হলেন। আমরা দূরেই ছিলাম। তারা কোন প্রশ্নের কি উত্তর দিচ্ছিলেন, শোনবার ইচ্ছে হয়নি। তারা যে ফিরে এসেছে, সেটাই বড় স্বস্তির।

কাগজের খবরে ফানুসের সাতকাহন উড়ে বেড়াচ্ছিল। সেসবের সিংহভাগ আমাদের জানা ছিল না। অথচ এই ফানুসের ওড়ার আগে আমরা প্রাণপাত করেছিলাম। কত রাত জেগে কাটিয়েছিলাম। তখন অতিথিরাও কিছু কম করেনি। ইদানিং তাদের ব্যবহারও কেমন পালটে যাচ্ছিল।

টিভি খুললেই আজকাল ফানুস নিয়ে একগাদা প্রোগ্রাম। বিশিষ্ট অতিথিদের মধ্যে বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞ ছাড়া, শেষ কথা বলবেন বলে মাননীয় রাজনীতিকরাও সেখানে বসতেন।

ফানুস নিয়ে তাত্ত্বিক চর্চা নিজেদের মধ্যেই সীমিত ছিল এতদিন। দু-একজন বাইরের মানুষ এখানে এসে ফানুস-তত্ত্ব নিয়ে নিজেদের গভীর জীবনবোধকে, আমাদের চর্চার আলোয় সমৃদ্ধ করবেন ভেবে দু’চারদিন থেকে যেতেন। সেই একত্রবাসে আমরাও সম্পন্ন হয়ে উঠতাম।

অথচ এতদিন বংশ পরম্পরায় যা জেনেছিলাম, আজকের আলোচনায় তা অতীত বলে মনে হলো।

ফিরে আসা মানুষ দুজনকে একটা লাল গাড়ি এসে তুলে নিয়ে গেল। তীব্র লাল বড় চোখে লাগে। কোথাও আগুন লাগলে যেমন দাউদাউ লাল দমকল এসে নাড়িয়ে দেয়। দুজনকে কি আগুন নেভানোর কাজে ব্যবহার করা হবে?

চলে যাবার পর তাদের সম্বন্ধে সম্যক জানা গেল।

সেই প্রথম মানুষটি আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে কোথায় যেন পৌঁছে যায়। জল স্থল অন্তরীক্ষে এমন জায়গার সন্ধান আগে ছিল না। অন্তত আমরা জানতাম না। তারা হয়তো এর মধ্যে কোনো সম্ভাবনা দেখেছিল। তবে খুব পরিষ্কার কিছু নয়। সে জায়গার কথা আগে কোনো বইয়ে লেখা হয়নি।

অতিথি বন্ধু সেখানে কেমন করে টিকে যায়, সে কথাও বলে। আমাদের কাছে সেসব বিস্ময় উদ্রেক করে। কিন্তু তার চেয়েও আশ্চর্যের কথা দ্বিতীয় বন্ধুও একই জায়গায় পৌঁছেছিল। প্রথমজন দ্বিতীয়ের সঙ্গে বেঁচে থাকার সব উপকরণ ভাগ করে নিয়েছিল।

সব শুনে বাবন বলল, “ওড়ানো ফানুসের সম্ভাবনা নিয়ে কবে থেকে গাদা গাদা ভাবনা লিখে রাখা হলো, অথচ কোথাও এমন জায়গা নিয়ে লেখাজোখা নেই।”

জ্যাঠামশাই তাকে থামিয়ে দিলেন। বললেন, “দৃষ্টিসীমার মধ্যে যেটুকু থাকে, আমাদের শিক্ষা সেটুকুই পেয়ে শুরু করতে শিখিয়েছিল। তার পর থেকে অসীম সম্ভাবনার এলাকা খুলে যায়। কোথাও পৌঁছে যেতে চাইনি আমরা। কাউকে কখনো ফানুসের সঙ্গে যেতে উৎসাহও দিইনি।”

বাবন আপত্তি জানিয়েছিল, “কিন্তু সঙ্গে যাবার ব্যবস্থা তো সেখানে ছিল?”

“তবু যাওয়া হয়নি। তবে সেটা অন্য প্রসঙ্গ।” – জ্যাঠামশাই বাবনকে থামিয়ে দিলেন। বললেন, “সব কথা একসঙ্গে জানতে নেই।”

বাবন তবু জানতে চায়। সে বলে, “আমরা তো একবার চেষ্টা করে দেখতে পারি। যদি তেমন কোথাও পৌঁছে যাই, অন্য কিছু ঘটবে বলে মনে হয়।”

“চেষ্টা করে তেমন কিছু ঘটানো যায় না। ফানুস এলাকার নিজস্ব ঘরানা সে কথা বলে না।”

ফানুস তৈরির কাজ আরও কিছুদিন আমাদের হাতেই রয়ে গেল। কিন্তু অস্বস্তি ও আশঙ্কার কথা ছিল অন্য জায়গায়। পুরনো উৎসাহ নিয়ে যারা ওড়াবেন বলে আর্জি নিয়ে কাছে এসেছিলেন, তারা এখনই উড়ে যাবেন বলে বায়না ধরলেন। সকলেই অন্যের আগে উড়ে যেতে চান। পরে যদি আর সুযোগ না পাওয়া যায়।

বাইশ-ঘর ফানুস এলাকা এখন বাইশ-ঘরের একার রইল না। ভিড় করে উৎসাহ ঢুকে পড়ে সেখানে জায়গা দখল করল। জমির দাম খুব খানিক বাড়ল। আশপাশের জমিতে টান লেগে এমন দাঁড়াল যে তারা দিশেহারা হয়ে বাইশ-ঘরের দিকে হাত বাড়াল।

এত জমি হবে কী ? তারা যে বাড়িঘর বানিয়ে এখানেই থেকে যাবে বলে ভেবেছে। মানুষের দেরি সইছিল না। ঘাড়ের ওপর বসত বানিয়ে উৎকণ্ঠার গরম নিশ্বাস ফেলছিল। এভাবে কারো চোখের তলায় ঘাড় গুঁজে বাঁচতে হবে, আগে ভাবিনি। নিজের ঘরে বসে সুস্থির হয়ে কাজ করার আরাম চৌপাট হলো।

সেই তখনই তারা এলো। তারা বলে দিলো, অনেক করেছো এতদিন, এবার বিশ্রামের কাল শুরু হোক। এসব কথা এত দরদ দিয়ে আগে কেউ বলেনি। অথচ বংশ-পরম্পরায় ফানুস উড়িয়েছি। এমন দরদ-গলা মলম লাগানো কথা আগে শুনিনি। কাজের দায়িত্ব অচিরেই তাদের হাতে চলে গেল।

আমাদের ঘনিষ্ট হয়ে ওঠা অতিথির দল ইতোমধ্যেই তাঁবু ছেড়েছিলেন। কোথায় গেলেন জানা যায়নি। ফানুসে ওড়া মানুষ দুজন লালগাড়ি চড়ে হারিয়ে গেলেন। তারা একটা উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছিলেন। তাদের কাজ তবে ফুরল। বাকি সঙ্গীরাও দরজা খোলা রেখে তাঁবু ফেলে চলে গেল। সেখানে সকাল-বিকেল হাওয়া খেলা করে গেল কিছুদিন। তাই দেখে এক সকালে তাঁবু গুটিয়ে তুলল কিছু অচেনা মানুষ।

এমন দিনে জ্যাঠামশাই একদিন ঘর থেকে বাইরে এলেন।

সকলে তাঁকে ঘিরে গোল হয়ে বসি।

তিনি বললেন, “অতিথি বন্ধুরা আমাদের ভালো চেয়েছিল। কিন্তু অন্যের ধরিয়ে দেওয়া ভালো তোমার জন্যে ভালো না-ও হতে পারে। ফানুস ওড়ানো থেকে কী পেতে চেয়েছিলাম?”

প্রশ্নটা হয়তো তিনি কাউকে উদ্দেশ্য করে বলেননি। নিজেকেই জিজ্ঞেস করেছিলেন। এবার উত্তরও নিজেই দিলেন। —“কাজটা আমাদের বাঁচবার উপায় ছিল। পূর্বপুরুষেরাও সেভাবে বেঁচে থেকে আমরা হয়েছেন। তাই তাঁরা আজও বেঁচে আছেন। আমরা সরে গেলে তাঁরাও আর থাকবেন না।”

ফানুসের কাজ এরপর ঢিমে-তেতালায় উড়তে উড়তে চোখের বাইরে চলে গেল। অনুপ্রবেশের কারণে এলাকায় ঘরবাড়ির লাগাও সব অফিস-কাছারি দোকান-বাজার হলো। দোকানে বসে আমাদের ঘরের ছেলেরা ঠাণ্ডা খাবার খেতে খেতে মাথা ঠাণ্ডা রাখার কৌশল শিখেছিল।

বসে বসে ফানুসের ওড়াওড়ি দেখতাম। কারা বানাতো ফানুস, কারাই বা কোথা থেকে উড়িয়ে দিত জানি না। তবে আশপাশ থেকে নিশ্চয়ই। এত ভেতরের কথা না জানলেও, বাইরের আকাশ এখনও চোখের সামনে খোলা ছিল। তা ছিল সিনেমার পর্দার মতো রহস্য-উদ্রেককারী। সেখানে দর্শকের মতো তাকিয়ে দেখার বিস্ময় তখনও জেগে ছিল। প্রতিটি ফানুসের তলায় নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম ঝুলিয়ে দেওয়া হতো।

আকাশে ওড়বার হুড়োহুড়ির কথা আর নাই বা বললাম। যেহেতু, আগেকার মতো ফিরে আসা নিয়ে কোনো অস্বচ্ছতা ছিল না, সকলেই আগে যেতে চাইতেন। ফিরে আসবার পর রাস্তায় একা হাঁটলেও, দেখে মনে হতো কোনও কুচকাওয়াজের ময়দানে বিজয় দিবসে সামিল হয়েছেন।

দস্তাবেজের পাতায় ফানুস নিয়ে প্রাপ্তির কথা আর লেখা হতো না। কোথাও কোনো অস্বচ্ছতা ছিল না। চোখ খুললেই আকাশের ভেতর-বাইরে দেখা যেত।

হঠাৎ একদিন একটা ফানুস আকাশ ঢাকা কালো অন্ধকার নিয়ে নেমে এলো। অন্ধকার মাটিতে নামতেই তার পেটের ভেতর একফালি আলোর চিড় ধরল। সকলে চিৎকার করে বলল, সোনা, সোনা। আকাশ থেকে সোনা নেমে এলো।

ফানুস এবার সোনা নিয়ে ফিরেছে।

কেউ বলল, “সোনা নয়। সোনার চেয়েও দামি কিছু।”

“ সোনার চেয়ে দামি আর কী আছে ?”

“ সেটা বড় কথা নয়। সোনা দিয়ে পৃথিবীকে এবার মুড়ে দেওয়া যাবে।”

একজন গোঁফে তা দিয়ে জানাল, “এসব ব্যাপারে আমিও কিছু কিছু জানি। আমার দাদুর দাঁত সোনা দিয়ে মোড়া ছিল। শ্মশানে মুখাগ্নির আগে সোনাশুদ্ধ দাঁত ছোটকাকা উপড়ে নিয়েছিল।”

“বাজে কথা রাখো। ফানুস আর সোনার সঙ্গে দাদুর দাঁতের কী সম্পর্ক?”

“না, সে কথাই বলছি। বেঁচে থাকতে দাঁত বার করে দাদু ঘুরে বেড়ালেন। অথচ মারা যাবার পর বেবাক ফোকলা হয়ে গেলেন।”

“ঘরের কেচ্ছা এই অসময়ে বাইরে না বেরোলেই নয়?”

রাশি রাশি ফানুস আকাশে উড়ে গেল। আকাশটা ঘোড়দৌড়ের মাঠের মতো দৌড়চ্ছিল।


এমন সময় তারা ওই আকাশ থেকে নেমে এলো। পুরাণে যেমন লেখা ছিল।

লোকে বলল, সোনাখোঁচার দল তারা। হাতে কুড়ুল আর গাঁইতি রয়েছে।

“কুড়ুল কিংবা গাঁইতি দিয়েই কি সোনা খুঁজতে হয় ?”

“আরে, আরে, ওটা একটা প্রতীকি ব্যাপার। ঠাকুর-দেবতাদের হাতে যেমন থাকে।”

“লোকগুলো কি দেবতা?”

“ লোকগুলো রঘু ডাকাতের ভিনদেশি ভাইপো।”

“ তারা যে ভাইপোই, বুঝলে কীকরে ?”

“ ভাইপোরা যখন-তখন সন্দেহজনক হতে পারে, আমাদের দস্তাবেজে লেখা আছে।”

“লোকগুলো তবে ভারী বেয়াদব। এখন তারাই সব কেড়ে নেবে?”

“যতক্ষণ পাওয়া যাবে ততক্ষণ নেবে।”

“এত সোনা তারা কী করবে ?”

“মেডেল করে গলায় ঝোলাবে।”

“ফানুস ওড়ানোর তবে কী হবে?”

“ফানুস যে একদিন উড়েছিল, সে কথা আর কারো মনেও পড়বে না।”