সাক্ষাৎকার গ্রহণ: সায়নী সরকার 
বাংলা অনুবাদ: নাহার তৃণা

ফারাহ আহমেদ কেনিয়ার নৈরোবিতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা। তাঁর আদি শেকড় দক্ষিণ এশীয় গুজরাটি ইসমাঈলি মুসলিম পরিবারে। ফারাহ'র এই বহুসাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতাই তাঁর লেখায় বিশেষ সংবেদনশীলতা এনে দেয়। বর্তমানে তিনি লন্ডনে বসবাস করছেন। ফারাহ Period Matters: Menstruation in South Asia গ্রন্থটির সম্পাদক, এটি প্রকাশ করেছে Pan Macmillan। তাঁর ছোটোগল্প ও প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক বহু সম্মানিত সাহিত্য পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে White Review, Markaz Review, Ploughshares, Massachusetts Review, LA Review of Books সহ আরও অনেক জার্নাল। তাঁর লেখায় দক্ষিণ এশিয়ার সামাজিক বাস্তবতা, নারীর অভিজ্ঞতা এবং মানবিক সূক্ষ্মতা বিশেষভাবে ফুটে ওঠে।

ফারাহ আহমেদ তাঁর প্রবন্ধ Three Dolls and the Politics of Femininity-এ আফগান কবি Parwana Fayyaz-এর ‘Three Dolls’ কবিতাকে কেন্দ্র করে নারীর রাজনীতি, শরীরের প্রতীক, এবং সামাজিক কাঠামোর ভেতরে নারীর অবস্থান নিয়ে গভীর আলোচনা করেছেন। সেই প্রবন্ধের সূত্র ধরে সায়নী সরকারের নেওয়া দুই পর্বের এই সাক্ষাৎকারে তাঁর অনুপ্রেরণা, দুই কবির সঙ্গে তাঁর সংযোগ, এবং সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথোপকথন এগিয়েছে।

নারীর অভিজ্ঞতা, প্রতীকের নীরব ভাষা, এবং সমাজের অদৃশ্য কাঠামোর ভেতরে নারীর চলার পথ, ইত্যাদিকে ফারাহ তাঁর প্রবন্ধ ‘Three Dolls and the Politics of Femininity’-এ এক সূক্ষ্ম আলোয় দেখিয়েছেন। Parwana Fayyaz-এর ‘Three Dolls’ কবিতাকে কেন্দ্র করে লেখা সেই প্রবন্ধ যেন তাঁর নিজের স্মৃতি, পাঠ, এবং নারীর রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে এক অন্তরঙ্গ কথোপকথন। এই আলাপচারিতায় উঠে এসেছে দুই কবির সঙ্গে ফারাহর প্রথম পরিচয়, অনুপ্রেরণার উৎস, লেখার ভেতরের নীরব আন্দোলন, এবং নারীর রাজনীতিকে তিনি কীভাবে দেখেন সেসব ইতিবৃত্ত। এই কথোপকথনের প্রবাহ পাঠক যেন সহজে অনুসরণ করতে পারেন সে জন্য মূল সাক্ষাৎকারের উপশিরোনামগুলো অক্ষন্ন রেখে বাংলায় উপস্থাপন করা হলো। সাক্ষাৎকারটি ফারাহ আহমেদের সম্মতিতে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে।

প্রথম পর্ব: পুতুলের রাজনীতি ও প্রথম পরিচয়

১. প্রথম সাক্ষাৎ (First Encounter)
সায়নী সরকার: 
পারওয়ানা ফায়াজ এবং ফোরুগ ফাররোখজাদ কীভাবে আপনার জীবনে এলেন?

ফারাহ আহমেদ:
 লন্ডনের বারবিকান সেন্টারে সোহেইলা সোকানভারির ‘রেবেল রেবেল’ (Rebel Rebel) প্রদর্শনীতে আমি প্রথম ফোরুগ ফাররোখজাদের কথা জানতে পারি। সেই সিরিজের প্রথম ছবিটিই ছিল ফাররোখজাদের। তাঁর জীবনের গল্প আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয় এবং আমি তাঁকে নিয়ে আরও জানার আগ্রহ বোধ করি। ‘দ্য মারকাজ রিভিউ’-তে শোলেহ ওলপের অনুবাদে ফাররোখজাদের কয়েকটি কবিতা পড়ার পর সেগুলো আমার মনে গভীর দাগ কাটে। তখন থেকেই আমি বারবার তাঁর জীবন ও কর্ম, যার মধ্যে তাঁর কবিতা ও চলচ্চিত্রও রয়েছে, সেগুলোর প্রতি আকর্ষিত হই। রাষ্ট্র যখন তাঁকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছিল, তখন তিনি যেভাবে সাহস, আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় প্রত্যয় দেখিয়েছেন, তা আমাকে অনুপ্রাণিত করে। আমি একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম যেখানে ‘কণ্ঠস্বর’ বা ‘নিজস্ব কণ্ঠ’ সম্পর্কে তাঁর ধারণার বিবর্তনকে তুলে ধরা হয়েছে; তিনি বিশ্বাস করতেন, এই কণ্ঠস্বরই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।

পারওয়ানা ফায়াজের খোঁজ আমি পেয়েছিলাম নিতান্তই দৈবক্রমে। আফগানিস্তানের কোনো সাহিত্য পড়ার আগ্রহ থেকে আমি আফগান নারী কবিদের খুঁজছিলাম, তখনই তাঁর সহজ অথচ বলিষ্ঠ ভাষা আমাকে মুগ্ধ করে। ফাররোখজাদের মতো তিনিও নিজস্ব ভঙ্গিমায় একজন ‘বিদ্রোহী’; এমন এক সমাজের বিরুদ্ধে তিনি রুখে দাঁড়ান ও প্রতিবাদ জানান, যে সমাজ নারীদের ভীতু ও নতজানু করে রাখতে চায়।

২. অনুপ্রেরণা (The Spark)
সায়নী সরকার: 
এই কবিতাগুলো নিয়ে বিশেষভাবে লেখার প্রেরণা কোথা থেকে এলো?

ফারাহ আহমেদ: 
কেনিয়ায় আমার শৈশব এবং আমার জীবনের প্রভাবশালী নারীরা, যেমন মা ও খালা-ফুফুদের কথা আমি ভাবছিলাম; পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যকার বন্ধন ও চিন্তাধারা কীভাবে আমাকে প্রভাবিত করেছে, তা নিয়েও চিন্তাভাবনা করছিলাম। ফায়াজের কবিতা পড়ার সময় আমার নিজের বোনদের কথা এবং ছোটোবেলায় আমরা যেসব পুতুল নিয়ে খেলতাম, সেসবের কথা মনে পড়ে যায়। ফায়াজের অভিজ্ঞতার তুলনায় আমার সেই সময়টা ছিল অনেক বেশি নিরাপদ ও নিষ্পাপ। তাঁর কবিতায় পুতুলের রূপক ব্যবহার আমাকে ফাররোখজাদের ‘উইন্ড-আপ ডল’ বা চাবি-দেওয়া পুতুলের কথা মনে করিয়ে দেয়, যার তাৎপর্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

৩. আলাপচারিতা (The Conversation)
সায়নী সরকার: 
লেখাটি লিঙ্গ, ভাষা বা স্থান নিয়ে কী ধরনের নতুন আলাপের দরজা খুলে দেয়?

ফারাহ আহমেদ: 
আমার মতে, কবিতাগুলো বেশ আকর্ষণীয় কারণ এগুলোর রচয়িতা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপট ও সময়ের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তারা উভয়েই ‘পুতুল’-এর মতো একই প্রতীকের ওপর নির্ভর করেছেন; আর এই বিষয়টিই আমি আমার প্রবন্ধে বিশ্লেষণ করেছি।


৪. যে পঙক্তিটি মনে গেঁথে রইল (The Line That Stayed)
সায়নী সরকার: 
কবিতাগুলোর মধ্যে কি এমন কোনো মুহূর্ত, দৃশ্যকল্প বা ধারণা ছিল যা আপনার মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে?

ফারাহ আহমেদ: 
আমি এই ধারণাটা খুব পছন্দ করেছি যে কবিদের কাছে পুতুল শুধু একটি বস্তু নয়, এটি নারীসত্তার রাজনীতি, সাংস্কৃতিক প্রভাব ও সংহতির মতো বিষয় নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সুযোগ দেয়। এক বন্ধু আমাকে বলেছিল, আমার লেখাটি তাকে বার্বি পুতুলের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। যা কারো কাছে নিছক আনন্দ কিংবা খেলার অনুষঙ্গ, আবার অন্যদের কাছে তার অর্থ অনেক বেশি নেতিবাচক।

সত্তরের দশকে কেনিয়ায় বেড়ে ওঠার সময় আমি ও আমার বোনের কাছে বার্বি পুতুল ছিল বিত্তবান ও বিত্তহীনদের মধ্যে এক বিভাজনরেখা: একদিকে তারা, যাদের আত্মীয়স্বজন বিদেশ থেকে এটি নিয়ে আসতো, আর অন্যদিকে তারা, যারা জানতোও না সেটি কী, অথবা গোপনে বার্বি পুতুল পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা পুষতো। বার্বি পুতুল এমন এক দোলাচলপূর্ণ অনুভূতির জন্ম দেয়—যে জিনিসটি মানুষ মনে করে তার থাকা উচিত, অথচ যার সঙ্গে তার প্রকৃত কোনো সম্পর্ক নেই।

প্রতীক হিসেবে পুতুল যে কতটা ব্যক্তিগত, বহুমাত্রিক ও জটিল হতে পারে, কবিতাগুলোতে সেই বিষয়টি যেভাবে উঠে এসেছে, তা আমার দারুণ লাগে।

এই অস্বস্তির প্রসঙ্গেই সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি গল্পের কথা মনে পড়ে। এ. এম. হোমস-এর ‘আ রিয়েল ডল’ (A Real Doll) গল্পটিতে জাদু-বাস্তবতার একটি মাত্র উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। পুতুলের প্রাণ ফিরে পাওয়ার ক্ষমতা-কৌশল ব্যবহার করে গল্পের কিশোর কথকের মনের গহীনের অস্বস্তিকর জগতকে অন্বেষণ করা হয়েছে। কথক শুরু থেকেই বার্বির সঙ্গে তার সম্পর্ককে এক ধরণের প্রস্তুতির পর্যায়ে ফেলে: ‘আমি বার্বির সঙ্গে প্রেম করছি... আমি ভবিষ্যতের জন্য অনুশীলন করছি।’ এরপর ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ ও লঙ্ঘনের বিষয়টি স্বাভাবিক হয়ে উঠতে থাকে; পুতুলটি হয়ে ওঠে তার কামনা-বাসনা ও নানারকম পরীক্ষার এক নিষ্ক্রিয় পাত্র। এমনকি যেসব মুহূর্তে সচেতনতার আভাস পাওয়া যেতে পারতো, সেগুলোও বরং তার বিচ্ছিন্নতাবোধকে আরো বাড়িয়ে তোলে। সে স্বীকার করে, ‘সে (পুতুলটি) বুঝতে পারছিল বিষয়টি আমার ভালো লাগতো... আমি এমন সব কাজের কথা ভাবতে শুরু করলাম যা হয়তো কোনো শাস্তি ছাড়াই করে ফেলা সম্ভব।’ গল্পটি এমন এক শিহরণজাগানিয়া বয়ঃসন্ধির চিত্র তুলে ধরে যা অধিকারবোধ, নিজের মানসিকতার প্রতিফলন এবং কোনো পরিণতির ভয় না থাকার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।

শিব রামদাসের ‘অ্যান্ড নাও হিজ লর্ডশিপ ইজ লাফিং’ (And Now His Lordship Is Laughing) গল্পটির কথাও আমার মনে পড়ছে, যেখানে পুতুল তৈরির শিল্পকর্মটিই প্রতিরোধের এক শক্তিশালী হাতিয়ারে রূপান্তরিত হয়। ঔপনিবেশিক বাংলার প্রেক্ষাপটে ‘আপা’ একজন দক্ষ পুতুল-শিল্পী। শুরুতে তার পাটের পুতুলগুলো গড়ে ওঠে সামাজিক বন্ধন ও শিল্পের প্রতি ভালোবাসার ওপর ভিত্তি করে; তিনি বলতেন, ‘আমার পুতুল বিক্রির জন্য নয়। আমি যাদের পছন্দ করি, তাদেরই এগুলো দিই।’ ঔপনিবেশিক শাসকের মেয়ের জন্য পুতুল তৈরির আবদার তিনি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন, ‘না... এ বিষয়ে পুনর্বিবেচনার কোনো অবকাশ নেই।’

দুর্ভিক্ষ-সৃষ্টিকারী নীতির মাধ্যমে ব্রিটিশরা যখন জনপদকে বিপর্যস্ত করে তোলে, তখন তার পুতুল তৈরির শিল্পে এক আমূল পরিবর্তন আসে। যে পাট একসময় ছিল যৌথ শ্রম ও স্মৃতির প্রতীক, তা-ই তখন শোক, ক্ষোভ ও প্রতিরোধের বারুদ হয়ে ওঠে, ‘তিনি আর রক্ত ঝেড়ে ফেলেন না, বরং তা চুঁইয়ে পড়তে দেন... পাটের আঁশের ভেতরে।’ তার শেষ সৃষ্টি, একটি ‘হাসির পুতুল’—শাসক ও শাসিতের মধ্যকার ক্ষমতার সমীকরণকে উল্টে দেয়। শিশুদের নির্মল বিনোদনের বস্তু হিসেবে নয়, বরং জাদুকরী ও ধ্বংসাত্মক এক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় সেই পুতুল। সেটি ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের এমন এক অনিয়ন্ত্রিত হাসির মুখে ঠেলে দেয় যা শেষ পর্যন্ত তাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেই মুহূর্তে আপা তার শৈল্পিক ও রাজনৈতিক সত্তাকে পুনরুদ্ধার করেন এবং পুতুলটিকে ঔপনিবেশিক সহিংসতার শাস্তিস্বরূপ এক মারণ-অস্ত্রে পরিণত করেন।

এই রূপান্তরটি ফাররোখজাদের ‘দ্য উইন্ড-আপ ডল’ (The Wind-Up Doll) এবং ফায়াজ-এর ‘থ্রি ডলস’ (Three Dolls)-এর বিষয়বস্তুর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যদিও প্রতিটি রচনায় পুতুলের প্রতীকী ব্যবহার ভিন্ন। ফাররোখজাদের ‘উইন্ড-আপ ডল’ এর পুতুলটি যান্ত্রিক অস্তিত্ব ও আরোপিত পুনরাবৃত্তির প্রতীক; অন্যদিকে রামদাসের পুতুলটি নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান ও প্রথাগত ধারার ভাঙন ঘটানোর মাধ্যমে সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। এর বিপরীতে, ফায়াজ-এর ‘থ্রি ডলস’-এ পুতুল তৈরিকে নিপীড়নের মুখে টিকে থাকার একটি হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে; এবং রামদাসের কাজও এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে গভীরভাবে সংগতিপূর্ণ। চরম সহিংসতার মধ্যেও আপা পুতুল তৈরি অব্যাহত রাখেন, এবং তাকে একটি সচেতন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপান্তরিত করেন। হোমস (Homes)-এর রচনায় পুতুল নিয়ে ‘চর্চা’ ক্ষমতার পুনরুৎপাদন ও আধিপত্য বিস্তারের প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে; অথচ অন্যান্য রচনায় পুতুল ‘তৈরি’র বিষয়টি একটি পাল্টা-শক্তি হিসেবে উপস্থাপিত হয় এবং ক্ষমতার কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ ও পুনর্গঠনের সম্ভাবনাকে তুলে ধরে।


২য় পর্ব: সঙ্গীত, নীরবতা এবং ইরানি প্রতিরোধ


গত মাসে ফারাহ আহমেদের সঙ্গে আমার প্রথম পর্বের আলাপচারিতা হয়েছিল। সেখানে আমরা পারওয়ানা ফায়াজ ও ফোরুগ ফাররোখজাদের মতো নারী কবিদের নিয়ে এবং সাহিত্যে নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ‘পুতুল’-এর রূপক নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। ইরানি প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতিবাদী স্বর নিয়ে আমাদের সেই আলোচনার সূত্র ধরেই এই দ্বিতীয় পর্ব।

এই পর্বে ফারাহ আমাদের জানাবেন কোন বিষয়গুলো তাঁকে অনুপ্রাণিত করে এবং প্রতিরোধ আন্দোলনে সঙ্গীতের ভূমিকা কী। পাশাপাশি তিনি তাঁর পছন্দের কিছু সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ এবং লেখালিখির সময় তাঁকে সহায়তা করে এমন কিছু আচার বা রীতির কথাও তুলে ধরবেন।

১. বার্তাটি ছড়িয়ে দিন (Pass It On)
সায়নী সরকার: 
এমন একজন নারী বা প্রান্তিক লেখকের একটি বইয়ের নাম বলুন যা আরও বেশি পাঠকের পড়া উচিত।

ফারাহ আহমেদ: 
বইয়ের পরিবর্তে, আমি এমন একটি গানের কথা উল্লেখ করতে চাই যেখানে পুতুলের প্রসঙ্গ এসেছে। ইরানি পপ গায়িকা শাহরজাদ সেপানলু ১৯৯৯ সালে তাঁর ‘গালবে মান’ (Ghalbe Man/ আমার হৃদয়) গানে পুতুলের রূপক ব্যবহার করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার জীবনে আমি কাচের ঘরে বন্দি কোনো পুতুল হয়ে থাকিনি’, এ কথা বলে তিনি নিজের মানবিক সত্তা ও আবেগের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন যে ফাররোখজাদের ‘চাবি-দেওয়া পুতুল’-এর (wind-up doll) ঠিক বিপরীত সত্তা তিনি, কারণ তাঁর নিজস্ব অনুভূতি ও চিন্তাভাবনা রয়েছে। সেপানলু লিখেছিলেন:

আমার জীবনে আমি কখনোই কাচের ঘরে আটকে থাকা পুতুল ছিলাম না।
কখনো আমি নির্মলতায় ভরে উঠেছি,
কখনো পাপের কাছে মেনেছি হার।
আমি যা-ই হই বা অতীতে যা-ই ছিলাম না কেন,
তোমার চাওয়া উচিত ঠিক সেই আমিটিকেই।

অতীতের কথা বিবেচনা না করেই, তিনি নিজেকে নিজের মতো করে গ্রহণ করার দাবি জানান। একই ধরনের দাবি জানানো আরেকজন ইরানি শিল্পী হলেন গুগুশ (ফায়েগেহ আতাশিন)। তিনি একজন অনুপ্রেরণাদায়ক ইরানি গায়িকা ও অভিনেত্রী, যিনি ‘ইরানের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে পরিচিত। তাঁর জীবন তারকাখ্যাতি এবং সেই সঙ্গে প্রতিরোধের পরিণতির এক মিশ্র অভিজ্ঞতা। ১৯৮০ সালে সরকার তাঁর গানকে ‘পাপপূর্ণ’ হিসেবে ঘোষণা করার পর তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয় এবং অন্যান্য নারীর সঙ্গে একটি ভূগর্ভস্থ কক্ষে আটকে রাখা হয়; এরপর দীর্ঘ ২১ বছর তিনি নীরবতা ও নির্বাসনের মধ্যে কাটান। তিনি তাঁর আবেগঘন ব্যালাডধর্মী গান এবং ইরানিদের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থানের জন্য সমাদৃত। প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত তাঁর কয়েকটি অত্যন্ত জনপ্রিয় গান হলো:

“তালাক” (Talagh / বিবাহবিচ্ছেদ) - ১৯৭০-এর দশক: বলিষ্ঠ ও ‘ফাঙ্কি’ সুরের এই গানটিকে প্রায়শই ‘রক-সলিড হিপ’-এর এক দুর্দান্ত নিদর্শন এবং কখনও কখনও ফারসি ‘সাইক-ডিস্কো-ফাঙ্ক’ ধারার এক বিদ্রোহী সৃষ্টি হিসেবে অভিহিত করা হয়। প্রথাগত প্রেমের গানের ধারা থেকে বেরিয়ে এসে এটি তাঁর এক বিদ্রোহী ও আধুনিক ভাবমূর্তি তুলে ধরেছিল।

“বেহেশত” (Behesht / স্বর্গ) - ২০১৪: এটি একটি শক্তিশালী গান ও ভিডিও যা ইরানের এলজিবিটিকিউ+ (LGBTQ+) সম্প্রদায়ের সমর্থনে প্রকাশ করা হয়েছিল; এর মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর হিসেবে তাঁর ভূমিকা ফুটে ওঠে।

“৪০ সাল” (40 Saal / ৪০ বছর) - ২০১৮: সিয়াভাশ ঘোমাইশির সঙ্গে যৌথভাবে গাওয়া একটি রাজনৈতিক গান, যাতে সরাসরি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ৪০ বছরের শাসনব্যবস্থার সমালোচনা করা হয়েছিল।

“দোবারেহ” (Dobareh / আবার) - ২০২২: এটি অন্যান্য ইরানি শিল্পীদের (যেমন—লেইলা ফোরুহার ও শাহরজাদ সেপানলু) সঙ্গে যৌথভাবে গাওয়া একটি গান, যা “নারী, জীবন, স্বাধীনতা” আন্দোলনের সমর্থনে একটি প্রতিবাদী গান হিসেবে চিহ্নিত।

“খাবাম ইয়া বিদারাম” (Khabam Ya Bidaram / আমি কি ঘুমিয়ে নাকি জেগে আছি): এই গানটি সোহেইলা সোকানভারির “রেবেল রেবেল” (Rebel Rebel) সাউন্ডস্কেপ প্রদর্শনীর অংশ; এই প্রদর্শনীতে ইরানে নারীদের প্রতিরোধের কণ্ঠস্বরকে তুলে ধরা হয়েছে।

“হিজরত” (Hejrat / প্রস্থান বা দেশান্তর): শাহইয়ার ঘানবারির লেখা এই গানটি প্রেম, বিচ্ছেদ ও হারানোর বেদনা নিয়ে রচিত একটি বিষাদমাখা পপ গান। গানটির কথায় প্রকৃতি ও স্বর্গীয় বাগানের মতো ফারসি সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ ব্যবহার করা হয়েছে। এতে প্রেমিক-প্রেমিকার কাহিনিকে ঋতু পরিবর্তনের রূপকের সঙ্গে মিলিয়ে প্রেমিকের চলে যাওয়ার বেদনাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। একইসঙ্গে এতে রোমান্টিক হৃদয়ভঙ্গ এবং দূরে সরে যাওয়া বা “উড়ে যাওয়ার” গভীর অনুভূতির ইঙ্গিত রয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরানে গুগুশের গাওয়া শেষ বড় হিট গানগুলোর মধ্যে “হিজরত” অন্যতম; ওই বিপ্লবের পরই দেশটিতে নারীদের একক সঙ্গীত পরিবেশনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল।

২. সংযোগ (Connections)
সায়নী সরকার: 
সঙ্গীত এবং সাহিত্য একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলে মনে করেন কেন?

ফারাহ আহমেদ: 
সঙ্গীত এবং সাহিত্য প্রায়ই অভিব্যক্তির সমান্তরাল ভাষা হিসাবে কাজ করে, প্রতিটি আবেগ, স্মৃতি এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুবাদ করে। উভয়ই ব্যাখ্যা এবং কল্পনার ওপর নির্ভর করে। আফগানিস্তানের মতো জায়গায়, যেখানে বত্তৃতা দেওয়া বা লেখার ওপর নানা বিধিনিষেধ রয়েছে, সেখানে এগুলো সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও প্রতিরোধের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে। সঙ্গীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা শুধুমাত্র শৈল্পিক অভিব্যক্তিকে সীমিত করে না বরং সমাজকেও প্রভাবিত করে, কারণ সঙ্গীত আমাদের আচার-অনুষ্ঠান, গল্প বলা এবং আত্মপরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে বিন্যস্ত। সঙ্গীতের অনুপস্থিতি কেবল শব্দের সেন্সরশিপ নয়; এটি মানুষের স্বরকে শৃঙ্খলিত করার এবং সম্মিলিত কল্পনাকে নিয়ন্ত্রণ করার অপচেষ্টাকেই নির্দেশ করে।

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে ইরানে নারীদের জনসমক্ষে গান গাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর মানে হলো, মহিলাদের গানগুলো প্রায়শই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের আইনি অনুমতি পায় না, তাদের অনলাইন পরিবেশনা সীমিত করা হয়, এবং তারা কেবল নারীদের উপস্থিতিতে বা কোরাসে গাওয়ার আইনি অনুমতি পেয়ে থাকেন। তাই গান গাওয়া সেখানে এক ধরণের রাজনৈতিক বিদ্রোহের শামিল—ঠিক যেমন কবিতা লেখা, নাচ এবং পুতুল তৈরি বা যেকোনো শৈল্পিক সাধনা। ফাররোখজাদ তাঁর ‘অনলি ভয়েস রিমেইনস’ কবিতায় প্রশ্ন তুলেছিলেন কেন তাঁর লেখা বন্ধ করা উচিত? নিজেই তার উত্তর দিয়েছেন :

...জীবনের সূক্ষ্ম শিরা-উপশিরায় এঁকেবেঁকে চলে পথ
চাঁদের জরায়ুর আবহাওয়া বিনাশ করবে কর্কট কোষগুলো;
ভোরের রাসায়নিক আভার মাঝে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে শুধু কণ্ঠস্বর—
কণ্ঠস্বর, যা সময়ের গভীরে চুইয়ে পড়ে।

আমি মনে করি তাঁর ‘কণ্ঠস্বর’ শব্দটির ব্যাপ্তি আরও বিস্তৃত—এর মধ্যে পড়ে লেখালিখি, গান, নাচ কিংবা যেকোনো সৃজনশীল কাজ। যেখানে একজন মানুষ প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও সম্পূর্ণ নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় এমন কিছু বিশ্বকে উপহার দেয়, যা অন্য কারো পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে, যখন চারপাশে শুধু মুছে ফেলার চক্রান্ত আর নীরবতার দাপট, এবং মানুষের কাছে আনন্দ প্রকাশের কোনো কারণ অবশিষ্ট নেই—তখন আমাদের আরও বেশি করে লেখা, গাওয়া, নাচা, আঁকা, সেলাই করা বা পুতুল তৈরি করা উচিত। আমাদের প্রেরণা যাই হোক না কেন, তা যদি কেবল শোক বা ক্রোধ থেকেও আসে, তবুও।

এটি আমাকে মিশরীয় প্রতিবাদী লেখক নাল আল সাদাউইয়ের (El Saadawi) কথা মনে করিয়ে দেয়। যাঁকে রাষ্ট্র কারারুদ্ধ করে একাকী নির্জন কক্ষে বন্দি করে রেখেছিল। সেই চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও, মাঝরাতে উল্টে রাখা একটি জেরি ক্যানের ওপর বসে তিনি টয়লেট পেপার আর সিগারেটের মোড়কের ওপর লিখতেন। তিনি সেই লেখাগুলো তাঁর চুলের রোলারের ভেতর লুকিয়ে রেখে স্যুটকেসে প্যাক করে মুক্তি পাওয়ার সময় বাইরে পাচার করেছিলেন। বছরের পর বছর ধরে চাপিয়ে দেওয়া একাকীত্ব তাঁর কণ্ঠস্বরকেই বরং আরও তীব্র ও প্রতিধ্বনিত করেছিল।

‘কণ্ঠস্বর’ বা ‘স্বর’ আসলে জীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকার একরকমের অংশগ্রহণ। জীবন এবং শিল্প হলো সেই স্বরকে ক্রমাগত খোঁজা, লালন করা এবং পরিমার্জন করার এক নিরন্তর প্রক্রিয়া। কখন নিজের স্বর উচ্চনাদে তুলতে হবে আর কখন নামাতে হবে, সেটি শিখতে হয়। নিজের কণ্ঠকে জাগ্রত ও উচ্চকিত করা মানুষ হওয়ার এক মৌলিক দায়িত্ব। দিনশেষে, মানুষের একমাত্র অনন্য ও চিরন্তন অনুষঙ্গ কি তার এই নিজস্ব ‘কণ্ঠস্বর’ নয়?

৩. সৃষ্টিশৈলীর রীতি (Craft Rituals)
সায়নী সরকার: 
লেখালিখির পর্ব শুরু করার আগে বা চলার সময় আপনার কি নির্দিষ্ট কোনো রুটিন বা আচার রয়েছে? এটি কি সঙ্গীত, নাকি অন্য কিছু?

ফারাহ আহমেদ: 
হ্যাঁ, আমি একটি রীতি মেনে চলি। সেটি হলো নিখাদ নীরবতা।

অ্যাড্রিয়েন রিচ তাঁর আর্টস অব দ্য পসিবল (২০০২) গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন কীভাবে “সৃষ্টির প্রেরণা শুরু হয় এক নীরবতার সুড়ঙ্গ থেকে, যা প্রায়শই ভীষণ আশঙ্কাজনক ও ভীতিপ্রদ।” অন্যদিকে সুসান সন্টাগ তাঁর দ্য এস্থেটিক্স অব সাইলেন্স (১৯৬৯)-এ লিখেছেন নীরবতা হলো “ধ্যানের এক জগৎ, আধ্যাত্মিক পরিপক্কতার প্রস্তুতি। সে এমন এক কঠিন সাধনা, যার সমাপ্তি ঘটে কথা বলার অধিকার অর্জনের মধ্য দিয়ে।” এর বিপরীতে হেনরি ডেভিড থোরো (১৮৯৩) তাঁর জার্নালে লিখেছেন, “...নীরবতা হলো ইতিবাচক এক সত্তা, যা শোনার মতো।”


বছরের পর বছর ধরে আমি বুঝতে পেরেছি, নীরবতা কেবল শব্দের অনুপস্থিতি বা শোনার মতো কিছু নয়; বরং এটি এমন এক মনস্তাত্ত্বিক স্থান যেখানে একজন মানুষ তার নিজের প্রকৃত কণ্ঠস্বরকে খুঁজে পায়। ·