“Santal Poetry is Santal Life; Santal life is Santal Poetry.”
ডাক নাম ‘পুটুস’। ভালো নাম ‘বল্লাল মুর্মু’। তার বাপের ডাক নাম ছিল ‘বালকা’। ভালো নাম ‘শ্রীবালক মুর্মু’। যেন মিলজুল করেই বাপ-বেটার নাম রাখা।
এই গ্রামেই বাড়ি। তবে ঠিক মাঝবরাবর কী আর, একেবারে মাথায়। এক-টেরে। সাঁওতালদের ঘর যেমনটা হয় আর কি। আগে-পিছে মস্ত বাঁশঝাড়। কাঁটা ও তলতা বাঁশ—বল্লাল মুর্মুর দু জাতেরই বাঁশঝাড় আছে। তাছাড়া “বেনুবনে মর্মরে দক্ষিণা বায়”—হ্যাঁ, দখিনা বাতাস দিলে মড় মড় ক্যাঁচ কোঁচ করে বাঁশঝাড়ে হরবখত আওয়াজও ওঠে। কখনও কখনও হল হল করে বিষধর সাপ বের হয়। সাপের খোলস তো বাঁশঝাড়ে সংবৎসর লটকে থেকে নিশানের মতো পত্ পত্ করে উড়তে থাকে, উড়তে থাকে।
তার ফাঁক দিয়ে, তার ফাঁক দিয়ে ওই দেখা যায় পুটুস ওরফে বল্লাল মুর্মুর খড়ের চালওয়ালা মাটির একতলা। কাছেই ‘ঘুসুর’ অর্থাৎ শূওরের খোঁয়াড়। এক পাল গৃহবরাহ ঘোঁত্ ঘোঁত্ শব্দ করে সারাক্ষণ আঁদাড়ে পিঁদাড়ে গজাল মুখে মাটি খুঁड़ছে তো মাটি খুঁড়ছে, নয়তো বাঁশঝাড়ে রট্ রট্ করে ভাঙছে ‘বাঁশ-করোল’।
‘বাঁশকরোল’—তারমানে বাঁশের পোঙ বা চারা। শূওর তো শূওর, সে-চারা রান্না করে জনমানুষেও খায়, হাতিতে খায়। আবার নতুন নতুন চারা থেকে বাঁশঝাড়ে বংশ-বৃদ্ধিও হয়।
অনতিদূরেই টিনের চালওয়ালা গ্রামের ফ্রি প্রাইমারি ইস্কুল। তার কাছেই আইসিডিএস-এর একতলা পাকাবাড়ি তথা মিড-ডে-মিলের রঁসুইঘর। ইস্কুল খোলা থাকলে সেখানে হাঁড়া হাঁড়া খিঁচুড়ি রান্না হয়। ছোট ছোট বালতিতে সে-খিঁচুড়ি উপস্থিত জনে জনে বন্টন করা হয়। কতক কতক ডাব্বা-কৌটো-ঘটি-বাটিতে ভর্তি হয়ে ঘরে ঘরে চালানও হয়ে যায়। ‘পুটুস’ ওরফে বল্লাল মুর্মু ও তার সন্তান-সন্ততিরা এক ছটাকও পড়াশোনা করেনি ইস্কুলে। তাই তারা খিঁচুড়ির এককণাও ভাগ পায় না। ‘আবাস যোজনা’-তেও তার নাম ওঠেনি।
তবে ভিটে, বাঁশঝাড়সহ যৎকিঞ্চিৎ হলেও তার আবাদী জমি আছে। একটা লাঙল, একজোড়া গরুহাল আছে। একটা ‘কেঁদরি’ আছে। ‘কেঁদরি’-র অর্থ এক-প্রকার বাদ্যযন্ত্র, ছড়সহ অনেকটা দেখতে বেহালার মতো। তাই নিয়ে বল্লাল মুর্মুর একটু-আধটু ফুটানিও আছে। কেঁদরিতে গান তুলে সে ভালো বাজাতেও পারে। সময় সময় তার বাড়ি ও বাঁশঝাড়ের পাশ দিয়ে পথচলতি মানুষ সে-সঙ্গীত শ্রবণে আমোদিত হয়। আর সেসব কী ‘সেরেঞ’! ‘সেরেঞ’—তারমানেই গীত—
“ হাটেম চালাঃক বাটেম চালাঃক
সোনা ছাতার গ কিরিঞ্যা মে !
হাটিঃঞ চালাঃক বাবু বাটিঃঞ চালাঃক
সোনা ছাতার বাবু বৌঞ কিরিঞ্যা –
নোরঞ কিরিঞাম তীরে যুগে।”
হাটে যাচ্ছ মা, তুমি পথে যাচ্ছ। আমার জন্য একটা সোনার ছাতা কিনে দিও! পথেই তো বেরুচ্ছি বাছা। হাটেই তো যাচ্ছি। সোনার ছাতা না তোমার জন্য চিরকালের একটা বউই কিনে আনব।
মাকে অবশ্য হাট-বাট থেকে বউ কিনে আনতে হয়নি। বল্লাল মুর্মু নিজে নিজেই ওঁড়গোদার ‘পাতাবিঁধা’ মেলা থেকে বউ সোমবারির সিঁথিতে জোর করে সিঁদুর ঘষে ‘ইতুৎ সিন্দুর বাপলা’ করে ঘরে নিয়ে এসেছে।
‘ইতুৎ সিন্দুর বাপলা’। সাঁওতাল সমাজে জোরজবরদস্তিমূলক এক প্রকার বিবাহ পদ্ধতি। যাকে শুদ্ধ কথায় বলে ‘রাক্ষস বিবাহ’। গ্রামের আর আর ছেলে-ছোকরাদের সঙ্গে ওঁড়গোদার ‘পাতাবিঁধা মেলা’ বা যৌবনমেলায় গিয়েছিল ‘ডাঙুয়া কাডা’ অর্থাৎ অবিবাহিত যুবক বল্লাল মুর্মু। সময়টা ছিল দুর্গাপূজার ‘ভাসান’ তারমানে বিজয়া দশমীর দিন। মেলা তো নয়, ‘পরব’। পরব, পরব। প্রথমে একটা ঘোড়ার ল্যাজের চুল দিয়ে বানানো ‘কপতি’ বা ঘুঘুপাখি ধরার ফাঁস কিনল পুটুস। তারপর কিনল একগোছা ‘পাটন’। তারমানে লোহার তৈরি একগুচ্ছ তীর। আর মা যদুমণির জন্য ফুল পাতা আঁকা রঙচঙে একটা টিনের বাক্স।
শুরু হল নাচ। দঙ, লাগড়েঁ, বাহা—কত রকমের নাচ! ধামসা-মাদল-কেঁদরি তো বেজেই চলেছে, বেজেই চলেছে। বল্লাল নিজেও তার কেঁদরি বাজাচ্ছে তো বাজাচ্ছে। মেয়ে-পুরুষ নাচতে নাচতে দুজন দুজন করে আচমকা এদিক ওদিক ছিটকে পড়ছে। একজন নারী, একজন পুরুষ। এর মধ্যেই ভাব-ভালবাসা হলে পুরুষটি জাপটে ধরে জোরজবরদস্তি করে মেয়েটির সিঁথিতে সিঁদুর ঘষে দিচ্ছে। “মাড়ে হাপড়ামকো রেয়াঃক কাথাতে ইপুতুঃৎ”—অর্থাৎ জোর করে সিঁদুর দান। কোথাও কোথাও এরপর জোর ‘হুরি’ হচ্ছিল। জোর গণ্ডগোল। ব্যাপক হাঙ্গামা। কেউ কেউ মেনে নিচ্ছে, কেউ মানছে না।
বল্লাল মুর্মুর চোখের সামনে ওঁড়গোদার ‘পাতাবিঁধা মেলা’-য় মাঝরাত গড়িয়ে গেল। মেলার দোকানদারদের হ্যাজাক-হেরিকেন-কুপী-গ্যাসলাইটের আলোয় যেন কালি পড়ল। কালো ধোঁয়া উগরাচ্ছে। ওদিকে চাঁদের আলোও যেন ফিকে হয়ে আসছে। আসলে সব আলোই শুষে নিচ্ছিল—হাড়দা ওদলচুয়া দহিজুড়ি লোধাশুলি চন্দ্রি চর্চিতা পড়িহাটী ধাড়সা দুবরাজপুর—আরও দূর দূর থেকে আসা নৃত্যরতা আদিবাসী যুবক-যুবতীরা। ঘুম এসে যাচ্ছিল পুটুসের। তার তো ‘ইতুৎ সিন্দুর বাপলা’ হল না! ভিড়ের ভিতর একটা মাকড়া পাথরের উপরই মা যদুমণির জন্য কেনা রঙচঙে টিনের বাক্সটায় মাথা রেখে ঘুমিয়েও পড়েছিল সে। ঘুম ভাঙল কার যেন ডাকে! কার যেন হাতের ছোঁয়ায় ঘুম ভেঙে চোখ খুলে দেখল—আরে! কুঠিঘাট-তপসিয়া-রান্টুয়ার ওদিক থেকে আসা সেই মেয়েটা না? মেয়েটা বলল—“উঠো। ‘পাতাবিঁধা মেলা’-য় এসে ঘুমাতে নাই। হাতের কাছে একটা কেঁদরিও আছে দেখছি! বাজাও তাহলে! আমি লাচি।” প্রায় কুদি মেরে উঠে হাতের কেঁদরি বাজিয়ে সেরেঞ ধরেছিল বল্লাল—
“গাতে গাতেলাঙ তাঁহেকানা
উরুনি বীরলাঙ বলয়েনা
গাতে গাতেলাঙ বালা-য়া-য়েন।।”
সখীতে সখীতে আমরা দুটিতে ছিলাম। গহন অন্ধকার বনে ঢুকে কখন হারিয়ে গেলাম। আজ আবার সখীতে সখীতে আমরা—এই তো সুযোগ, মাহেন্দ্রক্ষণ। বল্লালও এ সুযোগ হেলায় হারাল না। আর একটুও বিলম্ব না করে ট্যাঁকের সিঁদুর পোঁটলা খুলে সোমবারির সিঁথিতে জোর-জবরদস্তি ঘষে দিল। জোরজবরদস্তি কী আর, মন তো আগেই দিয়েছিল সোম-বারি, ‘পাতাবিঁধা মেলা’-র ধারে শালবনে রাত তো আরওই ঘন হয়েছিল। আর সাঁওতাল সমাজে কোনও মেয়ের সিঁথিতে কোনও যুবক যদি একবার সিঁদুর তো সিঁদুর, একমুঠো ধুলোও লাগিয়ে দেয়, তবে সে তার বৈধ স্ত্রী। বরপক্ষ কন্যা-পক্ষের মধ্যে এক্ষেত্রে কোনও গোলমালই হল না। বল্লালের বাপ বাল্কা সাঁওতাল দস্তুরমতো কন্যাপণ দিয়ে ছেলের বউকে ঘরে এনেছিল।
সেই সোমবারি এখন ভোর ভোর পুটুসের সঙ্গে ‘কুমারডুবির বিল’-এ। পুড়ুঙ পাড়াঙ কাজলপাতি শাক তুলছে। লোহার কাজললতার মতোই এক-একটা পাতার সাইজ, বিলময় লহ লহ করছে। তার মধ্যে মধ্যে ফুটে আছে অপরাজিতা ফুলের মতো নীল নীল ফুল সব। কাজলপাতি শাক তুলছে আর কোঁচড় ভরতি করছে সোমবারি। এই কোঁচড় ভরতি কাজলপাতি শাক তুলে ঘরে গিয়ে তাতে শুধুমাত্র নুন মাখিয়ে মাটির ত্যালানে ভেজে তারা স্বামী-স্ত্রীতে ‘পাখাল’ অর্থাৎ পান্তা ভাত খেয়ে, ছা-ছানাদের খাইয়ে ‘জোগাড়’-এর কাজে বেরুবে। ওদিকে মুর্মু বল্লাল মাথায় পাগড়ি বেঁধে হাতে একটা খেঁচনিবাড়ি নিয়ে জলার কাদা ঘেঁটে ঘেঁটে ‘কুঁচিয়া’ ধরছে। ‘কুঁচিয়া’—এর অর্থ হল বানমাছের মতোই দেখতে লম্বায় এক-দেড় হাত না-মাছ না-সাপের মাঝামাঝি একপ্রকার জলজ জীব। খেলে যে গায়ে রক্ত হয়—তা নাকি সুবিদিত! তাল্লাট-কে-তাল্লাট জানে। সেই পরোক্ষভাবে রক্ত অনুসন্ধানকারী বল্লাল মুর্মুর সহযাত্রী হয়ে এক-পা দু-পা করে তিন-চারটা টিকিধারী সাদা বকও হেঁটে চলেছে। মৃদুমন্দ হাওয়ায় তাদের টিকিগুলো তির্ তির্ করে নড়ছে। আষাঢ় এখনও আসেনি, সময়টা জ্যেষ্ঠ।
একটা ‘কুঁচিয়া’ ধরা পড়ল। খেঁচনিবাড়ি দিয়ে কুঁচিয়াটাকে চেপে ধরে বল্লাল চিল্লে উঠল—“গে বোহু! চটতে হিজুঃ মে!! তাড়াতাড়ি আয়!!” তার ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকিতে বগুলাগুলো ডানা ঝাপটে উড়ে উঠল বটে, তবে একেবারে উড়ে গেল না। ততক্ষণে সোমবারিও হবলস ফবলস করে দৌড়ে এসেছে। এসেই মস্ত কুঁচিয়া দেখে আহ্লাদে আটখানা হয়ে বলে উঠেছে—“বাপ রে! এ যে সাপের ল্যাখান? সাপ লয় ত?” খেঁচনিবাড়ি মেরে কুঁচিয়াটাকে আধমরা করে সোমবারির কোঁচড়ে ভরে দিয়ে বউয়ের গালে একখামচা কাদা লেপ্টে বল্লাল বউকে ভর্ৎসনা করে বলে উঠল—“সান্তাল মারজীউ হয়ে আজতক ‘বিঞ্’ চিনলি নাই বোহু? সান্তাল মেয়েমানুষ হয়ে সাপ-কুঁচিয়ার ফারাক জানলি নাই? আম্ চেৎ লেকাতে নোয়া লেকা কথাদ মেন্ কেদাম—তুই কী করে একথা বললি?” আজ যেন একটা সুবাতাস বইছে। টের পেয়ে সোমবারি হার মানল—“মানছি মানছি, হেঁ বাবা। আর রাগিস নাই, বানুঃ আ!”
বলতে না বলতেই আরেকটা কুঁচিয়া খেঁচনিবাড়িতে মারা পড়ল। হাস্যমুখে কুঁচিয়াটাকে সোমবারির কোঁচড়ে দিতে দিতে বল্লাল হুরি করে উঠল—“হুই রে! লিল্-হো লিল্-হো! আরেকটা আরেকটা।” তারপরেও একটা, তারপরেও একটা। তারপরেও… উল্লাসে ফেটে পড়ে বল্লাল মুর্মু উচ্চারণ করল—“জহার গঁসায় মারাঙ বুরু! আজ কার মুখ দেখে যে উঠেছিলাম!” আহ্লাদী সোমবারি তার গায়ের উপর ঢলে পড়ে আব্দার করে বলল—“কার আবার? আমার, আমার! ইঞাঃ মোচা!” তারমানে ‘আমার মুখ’। ফের কাদা-মাখা-হাতে বউয়ের গাল টিপে দিয়ে বল্লাল বলে উঠল—“আজ আরও কুনো বঢ়িয়া খবর আসছে রে বোহু।” হি-হি করে হাসতে হাসতে বউ জেরা করল—“হঁ, তুই রাজা-উজিরও হতে পারিস। তাবলে যখন-তখন এখানে কাদা লেপ্টালেপ্টি করিস নাই! চারধারে কুমারডুবি জলায় এই সকাল সকাল কত লোকে কত কী কাজে নেমেছে! কারও না কারও চোখ পড়বে।” সেকথা ধর্তব্যেই নিল না বল্লাল। পুরনো কথার জের টেনে বলল—“কী বললি? বললি কি রাজা-উজির? হেঁ, একটা হেঁয়ালি আছে না—‘কাহু কটাল, তোয়ো রাজ’। তার মানে—কাক কোটাল, শেয়াল রাজা। আমার বাঁশঝাড়ে ত শেয়ালরাজা হয়েই আছি।” বলেই হো হো করে পুটুসের হাসি! সাতসকালে সে হাণ্ডি বা পাঁচুই মদ গিলে এসেছে।
বেলা বেড়ে যাচ্ছিল, জোগাড়ের কাজে যেতে হবে তাদের স্বামী-স্ত্রীকে। তারউপর ওবেলা ‘দুয়ারে রেশন’ বসবে। আজ ত শুক্কুরবার। হাতে ধরে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বল্লালকে মনে করিয়ে দিল সোমবারি। বল্লালেরও মনে পড়ল—পুরনো কার্ডের বদলে নতুন কার্ডে মাল দেবে আজ। রেশনডীলার হরিহরের ভাই দিলীপই তো বলেছে! আর সেই তো রেশনের গাড়ি গ্রামের ‘দুয়ার’-এ নিয়ে আসে প্রত্যেক মাসে। ‘আতোরে মাঞ্জহি’ অর্থাৎ গ্রামপ্রধানও জানিয়ে দিয়েছে। মনে পড়তেই হাঁড়িয়ার নেশা কেটে গেল তার। “হঁ, বেড়া হোয় আকানা। সত্যি সত্যিই বেলা হয়েছে!” বলেই বউয়ের হাত ছাড়িয়ে স্নানের নিমিত্ত খালের দিকে দৌড়াল বল্লাল। বাবু-ভায়েদের বাঁধা ঘাটের অনেক নিচে সাঁওতালদের নির্দিষ্ট ঘাটের জলে স্নানান্তে পোঁটলায় বাঁধা একটাই শুকনো কাপড় দুজনে জড়াজড়ি করে খালপাড়ে বসে তাদের ‘অদা’ বা ভেজা কাপড় জ্যৈষ্ঠের ছাতিফাটা রৌদ্রে শুকোতে দিল। চড় চড় করে ক মিনিটেই সে-কাপড় শুকিয়ে গেলে যে যার সে তার শুকনো কাপড় পরে স্বামী-স্ত্রীতে ঘরে এল। রাস্তায় আসতে আসতে এর মধ্যেও একটা সেরেঞ কী আর হয়নি? হয়েছে, হয়েছে। লোকজনও শুনেছে। এই গানটাই—
“সড়ক সড়ক তেং চালাঃক কানা
তালা সড়ক রেঞ তেন্দোয়ানা
নিয়ে করে পুটুস মেনামমে খান
পিতল তল কেঁদরি পুটুস নরঙলেতাম –”
রাস্তায় রাস্তায় চলেছি, মাঝরাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছি। এখন আশপাশে যদি কোথাও থাকো পুটুস, তাহলে তোমার পিতল-বাঁধানো কেঁদরিটা একবার সুর করে বাজাও!
ঘরে এসে রাঁধাবাড়া, নিজেদের ও ছা-ছানাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করা, খোঁয়াড়ের শূওরদের দানাপানি দেওয়া—অতকিছু করতে করতে আরও কিছুটা বিলম্ব হয়ে গেল রাজমিস্ত্রির কাছে রোজকার ‘রেজা’ খাটতে যাওয়ার। তাদের দেখে হেডমিস্ত্রি জহির প্রথমেই খেঁকিয়ে উঠে বলল—“এত্খণে লাটসাহেবের টায়েম হোলই? বলি, ফুল-টায়েম না হাফ-টায়েম, ফুটুস? আমরার কাম কী গরমেন্টের কাম—যেখিনে যেমন খুশি আইলে হোলই। আজ তোমরার খোরাকি হামি হাফ কন্নু। কী বুলছিস?” কিছুই না বলে খালি চোখ পিট্ পিট্ করছিল বল্লাল। বলতে কী বউকেই এগিয়ে দিল সে। সোমবারি মাথায় ইট তোলার জন্য কাপড়ের ‘বেঠনা’ বাঁধতে বাঁধতে হেডমিস্ত্রির সামনে বুক চিতিয়ে বলল—“হাফ-ফুল—কী যে বুলিস মিস্তিরি! দিবি ত ফুলেই দে! মোরা গতর খাটিয়ে শোধ করে দিব।” কী বুঝল কে জানে—শুনে তো পৈশাচিক হাসি হাসল জহির! বলল—“সম্বারি, তুকে যে এক জাম-বাটি হাঁড়িয়া আনতে বুলহেছি, আনিসনি ক্যানে?” “ও, এই কথা”—সোমবারিও জোরে জোরে হাসল। অত কথা আবার ‘দিকু’-দের সঙ্গে বলতে পারে না বল্লাল, সে খালি চোখ পিট্ পিট্ করে। ‘দিকু’ মানে অ-সাঁওতাল উচ্চ বর্ণের মানুষজন। আজ স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কঠোর পরিশ্রম করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করে চলল। পথচলতি দু-চারজন ‘গৃহনির্মাণ’ দেখতে এসে যত না গৃহের কথা বলল, তারচেয়ে বেশি বলল হাটের কথা, ‘দুয়ারে রেশন’-এর কথা। আজ আবার হাটবার। দলে দলে লোক আসছে হাটে। ঝাঁকায়-মাথায় বাঁকে-গাড়িতে আনাজপাতি মুদি-মনিহারি দ্রব্যাদি আসছে।
হাটের কথা, ‘দুয়ারে রেশন’-এর কথা মনে পড়ে গেল বল্লাল-সোমবারির। সুপ্রসন্ন জহিরের অনুমতিক্রমে আগেভাগে হাটে গেল সোমবারি, ‘দুয়ারে রেশন’-এ গেল বল্লাল। বল্লাল মুর্মু। গ্রামের মাথায় বলখেলার মাঠে ‘দুয়ারে রেশন’-এর গাড়ি লাগিয়েছে রেশনডীলার হরিহরের ভাই দিলীপ। দিলীপ, দিলীপ। এতদিন গ্রামের লোকেদের রেশন আনতে যেতে হত বহুদূরে হরিহরের ঘরে। এবার রেশন এসেছে গ্রামের মাথায় বলখেলার মাঠে। সেখানে লম্বা লাইন পড়েছে রেশনকার্ড-হোল্ডারদের। লাইনে দাঁড়িয়েও আগু-পিছু করছিল বল্লাল। একবার এগিয়ে গিয়ে দেখে আসছিল—কতবড় লাইন। আবার পিছিয়ে গিয়েও দেখে আসছিল লাইনের ল্যাজাটা কোথায়! দু-চারজন তাকে হাঁকাড়ও দিল—“এই পুটুস, এদিক-ওদিক করছিস যে বড়ো! লাইনে দাঁড়া। নচেৎ কুঁচিয়া ধরতে খালেবিলে যা।” তাল্লাট-কে-তাল্লাট জানে পুটুস ওরফে বল্লাল মুর্মু কুঁচিয়া ধরায় রাজা। শুধু রাজা নয়, রাজার রাজা। মহারাজা।
ওদিকে রেশনের কর্মচারীরা গাড়ি থেকে একটার পর একটা চালের বস্তা নামাচ্ছে আর মুহূর্তে খালি হয়ে চলে যাচ্ছে রেশনগ্রহীতার বস্তায়। দ্রুত হাতে দড়ি বেঁধে বস্তার মুখ ‘অঁটার’ করে কাঁধে, পিঠে, সাইকেলে, মোটর সাইকেলে চাপিয়ে—ওই, ওই তো চলে যাচ্ছে রাম-শ্যাম-যদু-মধুরা। একেকজন বরাদ্দ হিসাবে পাচ্ছেও ত্যামন—২০ কিলো ২৫ কিলো বা তারও বেশি। কেউ কেউ চাল বেচে দিয়ে নগদানগদি নিয়ে যাচ্ছে। আর এদিকে এখনও হাত কচলাচ্ছে বল্লাল। তবে হাঁ, কেউ কেউ শুখা মুখে এমনি এমনিও চলে যাচ্ছে—তাদের যে পাঁচ পাঁচ দশ আঙুলের কোনও আঙুলেরই ছাপ মিলল না! রেশন তোলায় গ্যাঁড়াকলও আছে বটে। তেমনটা হয় যদি বল্লালের? আচমকা আপনমনে ‘মা’ বলে চিল-চিচিক্কার করে উঠল বল্লাল—“গে মাঈ!!” কাছেপিঠের লোকজন তাই শুনে পরিহাসচ্ছলে বলল—“কী রে ফুটুস! দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েও হোঁচট খাচ্ছিস নাকি রে?” জুলু জুলু চোখে তাদের দিকে খানিক চেয়ে থাকল বল্লাল, কোনকিছুই বলল না।
অবশেষে, সন্ধ্যা হব হব সময়ে তার ডাক পড়ল। রেশনডীলার হরিহরের ভাই দিলীপ, ‘দিলপা’-ই যেন গলা ফাটিয়ে ডাক দিল। তবে বল্লাল মুর্মু না বলে বলল—“বল্লাল সেন! বল্লাল সেন!!” উপস্থিত লাইনে দণ্ডায়মান রেশনগ্রহীতারা যার পর নেই হো হো করে হেসে উঠল। হাসাহাসি তুমুলভাবে চলল বেশ কিছুক্ষণ। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে হাসাহাসির আদি-অন্ত্য বুঝতে না পেরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে শুধুই এদিক ওদিক তাকিয়ে চোখ পিটপিট করছে, এতক্ষণে তার হাত-পাও কাঁপছে। বল্লাল মুর্মু আর কোন উপায় না দেখে মনে জোর এনে রাগ দেখিয়ে প্রায় হাঁকাড় দিয়ে বলে উঠল—“আর রগড় করিস নাই! আমার রেশন দে দিলপা!” তেমনি হাসতে হাসতে দিলীপ উত্তর করল—“তোর আবার রেশনের কী দরকার বল্লাল? তুই তো এখন বল্লাল সেন, রাজা!” লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ‘বুঝদার’ কেউ কেউ বলে বসল—“রাজা নয়, মহারাজা।” হিসাব কষে বল্লালের বউ আর তার ছেলেমেয়েদের জন্য বরাদ্দকৃত চাল সরবরাহ করে বল্লাল মুর্মুর রেশনকার্ড তার হাতে ফেরত দিয়ে ফের হাস্যমুখে রেশনডীলার হরিহরের ভাই রীতিমতো বি.এ পাশ দিলীপ ঘোষণা করল—“পুরনো কার্ডের বদলে নতুন ‘ডিজিটাল কার্ড’ করার সময়ে ‘বল্লাল মুর্মু’-র জায়গায় ভুলবশত কি ইচ্ছাকৃতই লেখা হয়ে গিয়েছে ‘বল্লাল সেন’। এ তো একরকম রাজারই কার্ড! এ কার্ডে আমি তো—”
ভূগোল-ইতিহাস একদমই জানা ছিল না বল্লাল মুর্মুর। কারণ সে তো এক ছটাকও পড়াশোনা করেনি ইস্কুলে। বউ সোমবারি আর গণ্ডাকতক ছা-ছানাদের জন্য বরাদ্দকৃত একমাসের চাল, ওজনে যৎকিঞ্চিৎ কম হলেও বস্তায় পুরে বস্তার মুখ দড়ি দিয়ে বেঁধে ‘অঁটার’ করে দোকান থেকে ঘরে ফিরছিল সে। দোকান থেকে বেরুনোর সঙ্গে সঙ্গেই তখনও লাইনে দাঁড়ানো লোকজন তাকে দেখামাত্রই উচ্চৈঃস্বরে বলতে লাগল—“বল্লাল সেন”, “বল্লাল সেন”!! কেউ কেউ শুধু বল্লাল সেন নয়, বলল—“রাজা বল্লাল সেন”!! কেউ কেউ আবার—“মহারাজা বল্লাল সেন”!!! এসবের বিন্দুবিসর্গ কিছুই বুঝতে পারছে না বল্লাল, তবে শরীরে ও মনে আলবাৎ টের পাচ্ছিল—একটা কিছু কোথাও হয়েছে, বা হচ্ছে। হপ্তায় হপ্তায় প্রত্যেক শুক্কুরবারে বসা হাটের পাশ দিয়েই তার ডিহিবাড়ি যাবার রাস্তা। ওই তো কাঁটা আর তলতা বাঁশের ঝাড়! হব হব করেও সন্ধ্যা এখনও হয়নি। হলে শয়ে শয়ে জ্বলন্ত ‘বাঘযুগনি পোকা’ অর্থাৎ জোনাকি পোকা এতক্ষণে চোখে মুখে ঢুকে আসত। তাকে দেখে হাট-ফেরতি লোকজন তো লোকজন, খেলার মাঠে খেলামত্ত ছা-ছানারা, মায় ফ্রি প্রাইমারি ইস্কুলের থ্রি-ফোরের পড়ুয়ারা পর্যন্ত হৈ হৈ করে চিৎকার জুড়ে দিল—“বল্লাল সেন, বল্লাল সেন”! “রাজা বল্লাল সেন” “রাজা বল্লাল সেন”!! “মহারাজা বল্লাল সেন” “মহারাজা বল্লাল সেন”!!! তারমানে ইতোমধ্যে হাটে-মাঠে-ইস্কুলেও ঘটনাটা রটে গিয়েছে। এসব শোনাইস্তক একটা কিছুও বলেনি বল্লাল, শুধুই চোখ পিটপিট করে তাদের দিকে তাকিয়েছিল। ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই বউ সোমবারিও প্রথমে হাস্যমুখেই বলল—“কী? মেন্ লেদাইং—বলেছিলাম নাই তুই রাজা হবি? হলি ত ‘রাজা বল্লাল সেন’?” বলেই বল্লালের বুকের উপর আছড়ে পড়ে হুড় হুড় করে কিছুক্ষণ কেঁদে ভাসাল সে। তারপর বলল—“নিৎদো চেৎ হোয়ওঃআ? এখন কী হবে গো? শুনেই ত হাটে বুথ-সভাপতিকে ধরি। ও বলল, পঞ্চাৎকে ধর। তার পিছকে পঞ্চাৎ-সভাপতিকে ধর। কেউ আবার বলল, অত ধরাধরির কী আছে? তুই খোদ রেশনডীলারকেই ‘কাট’-টা দে। ওই-ই যা করার বলক থেকে ঠিক-ঠাক করে আনবে।” এতক্ষণ একটা কথাও বলেনি বল্লাল। সোমবারির সমস্ত কথাই সে শুনল চুপচাপ। এত চুপচাপ যে তাকে গাছের মতো হিলাতে হিলাতে সোমবারি জিজ্ঞাসা করল—“এ বাবু, কথা ক্যানে বলছিস নাই? চেদা বাঙ এম মেন এদা?” বল্লাল কোনমতে বলল—“হঁ, এই ত বলছি। দে হিজুঃ মে। আয় ত দেখি—খোঁয়াড়ে শূয়ারগুলা এত ক্যানে চ্যাঁচাচ্ছে?” বলেই সোমবারিকে হাতে ধরে টানতে টানতে বল্লাল শূওরের খোঁয়াড়ে ঢুকল।
পরের দিন সকাল সকাল বেরিয়ে সোমবারি কোত্থেকে খবর নিয়ে এল আজ বাদ পরশু তাদের ঘরের কাছের ইস্কুলেই ‘দুয়ারে সরকার’ বসবে। আর সেখানে হাজিরা দিলেই বল্লালের রেশনকার্ডের যাবতীয় ভুলভ্রান্তি মুহূর্তেই ঠিক হয়ে যাবে। এ খবরে সোমবারি তো চড়ুই-চটার মতো চিড়িক চিড়িক করে নাচতে লাগল। কিন্তু বল্লালের কোনও হেলদোল নেই, তার কেঁদরিতে ছড় টেনে সে তখন সুর তুলছে—
“আয়ু তো লিলা ঝিলিমিলি লুগা হো
বাবা তো লিলা মুঠা বৌরি টাকা হো
ভাইয়া তো লেলা বারাদা
এক পাইলা ধানাকেরা
এক পুরিয়া সিঁদুর।”
মা নিল ঝিলিমিলি শাড়ি, বাবা নিল মুঠো ভরে টাকা। ভাই তো নিল একটা এঁড়েবাছুর, একডোল ধান আর একপুরিয়া সিঁদুর। কেঁদরিতে সুর তুলে সোমবারিকে সে ডাকলও—“লাচবি ত আয়!” সোমবারি এল না। রাগ দেখিয়ে ঝুড়ি বগলে ছুটে বেরিয়ে গেল কুমারডুবির বিলে। অগত্যা বল্লালকেও বউয়ের পিছু পিছু যেতে হল। আর ইস্কুলের পাশ দিয়েই তো বিলে যাবার রাস্তা। যেতে যেতে কী মনে করে, যে ইস্কুলে কখনও এক ছটাক পড়াশোনা করেনি, পড়াশোনা তো দূরঅস্ত্ ইস্কুলের ছায়া পর্যন্ত মাড়ায়নি, ‘দিকু’-দের চোখের দিকে তাকিয়ে একটাও কথা বলতে পারে না—সেই পুটুস ওরফে বল্লাল মুর্মু আচমকা ইস্কুলে ঢুকে পড়ে সামনে যে মাস্টারকে পেল তাকে ধরেই জিজ্ঞাসা করল—“এ হে বাবা, মাস্টারবাবা! ‘বল্লাল সেন’ জিনিসটা কী জিনিস—আমাকে একটুক বুঝা ত দেখি!” দৈবক্রমে যাকে সে জিজ্ঞাসা করল সে ইতিহাসেরই প্যারা-টীচার আর ইতোমধ্যে ঘটে যাওয়া বল্লাল মুর্মুর ঘটনাটা তার জানাও বৈকি। তবু, “আরে, দাঁড়ান দাঁড়ান” বলে সে খানিক বইপত্র ঘেঁটে যথাসাধ্য তাকে জানাল—
“আজ থেকে প্রায় সাড়ে আট শ বছর আগে এগারো শ ঊণষাট সালে রাজা বিজয় সেনের পুত্র বল্লাল সেন রাজা হন। রাজা নন, মহারাজা। কারণ, তাঁর সময়ে রাজ্য খুব বড় হয়েছিল। কোন রাজ্য? বঙ্গ, রাঢ়, বরেন্দ্রী, মিথিলা আর বাগড়ী। বঙ্গ মানে গৌড় বঙ্গ। কিছুটা বাংলাদেশ আর কিছুটা আমাদের দেশ। রাঢ় তো বর্ধমান, বীরভূম, বাঁকুড়া, মুর্শিদাবাদ। বরেন্দ্রী তো আসাম-কামরূপ। বাগড়ী হল সুন্দরবন, মেদিনীপুর। মগধ-মিথিলা তারমানে বিহার-ঝাড়খণ্ড—”
“আর বলতে হবে নাই! আমি বুঝেছি, বুঝেছি” বলতে বলতে উঠে পড়েছিল বল্লাল। তবু প্যারা-টীচার ছোকরা তার পিছনে আসতে আসতে বলে যাচ্ছিল—“শুনুন, শুনুন! দানসাগর, অদ্ভুত সাগর, কৌলিণ্য প্রথা, জাতপাত—”
ততক্ষণে ইস্কুলগৃহ পরিত্যাগ করে কুমারডুবির বিলের দিকে কুদি মেরে দৌড়ুচ্ছে বল্লাল—দৌড়—দৌড়—
নির্দিষ্ট দিনে ইস্কুলগৃহে ‘দুয়ারে সরকার’ বসেছিল। দরজায় ধাক্কা মেরে সিভিক-ভলান্টিয়ার ডাকতেও এসেছিল। ঘরের একোণে সেকোণে অন্ধকারে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে বসেছিল বল্লাল, মোটেও সাড়া দেয়নি। অবশেষে সোমবারির হাত ধরে টানাটানি, উস্তানি-খুস্তানিতে ‘দুয়ারে সরকার’-এর কাছে হাজিরা দিতে গিয়েছিল সে। তবে “নাম কি?” খাদ্য সরবরাহ ও বণ্টন আধিকারিকের লোক জিজ্ঞাসা করায় রেশন কার্ডটা দেখিয়ে বলেছিল—“এ বাবু, এই তো দ্যাক ‘বল্লাল সেন’। আর কুনো পাল্টাপাল্টি না। এই ‘কাটে’ মাল দিতে হয় দে। নচেৎ গলায় ছুরি দে!!”
0 মন্তব্যসমূহ