হামিম কামাল বাংলা ভাষার সমকালীন কথাসাহিত্যিক। লিখছেন গল্প ও উপন্যাস। জন্ম ৯ আগস্ট, ১৯৮৭, ঢাকায়। আহসানুল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তড়িৎ প্রকৌশলে স্নাতক। পেশায় সাংবাদিক। প্রকাশিত বইসমূহের মধ্যে রয়েছে জঠর, কারখানার বাঁশি, জাদুকরী ভ্রম, দস্তইয়েভস্কির সঙ্গে দ্বিমত, ত্রিস্তান, লিন্ডার বাগানবিলাস। গত বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে উপন্যাস মাকারানার অশ্রু এবং গল্পের বই মানুষ হারবে না। বই দুটি নিয়ে গল্পপাঠের পক্ষ থেকে তাঁকে কিছু প্রশ্ন পাঠানো হয়। তিনি লিখিত উত্তর দিয়েছেন।
গল্পপাঠ : 
গেল বইমেলায় আপনার দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে। উপন্যাস ‘মাকারানার অশ্রু’ এবং গল্পগ্রন্থ ‘মানুষ হারবে না।’ প্রথমে গল্পগ্রন্থটি নিয়ে আলাপ করা যাক। এটি আপনার কততম গল্পের বই? কয়টি গল্প আছে এ বইয়ে এবং কত বছর ধরে লিখেছেন গল্পগুলো?

হামিম কামাল : 
মানুষ হারবে না চতুর্থ গল্পগ্রন্থ। পাঁচটি গল্প আছে। এখানে সবচেয়ে পুরনো গল্পটি, ছোট্ট দুই পূজারী, আঠার সালে লেখা। তুলনামূলক নতুন রাত্রি ও ফাইকাস লেখা পঁচিশ সালে। লেখার সময় খুব বেশি সময় নিইনি। পরে সম্পাদনায় দেরি হয়েছে। এরপর প্রকাশিত হতে আরো।

গল্পপাঠ : 
যদি আপনাকে এ বইয়ের একটি সেরা গল্প নির্বাচন করতে বলা হয়, আপনি কোনটিকে করবেন? গল্পটি রচনার ইতিবৃত্ত শুনতে চাই।

হামিম কামাল :
সেরা গল্প চিহ্নিত করা কঠিন। কারণ কোনোটিতেই আমি নিজের সেরাটা সেভাবে দিতে পেরেছি বলে মনে করতে পারি না। কোনটিতে তুলনামূলক অধিক হামিম কামাল উপস্থিত সে ব্যাপারেও নিশ্চিত নই। সুতরাং সবিনয়ে সেরার পরিবর্তে প্রিয় গল্পের নাম বলার অনুমতি চেয়ে নিচ্ছি। সেই গল্পের নাম ‘এমনই এক শরতে বিশ্বযুদ্ধ হয়েছিল’।

একদিন শূন্য পৃষ্ঠা সামনে নিয়ে ভাবছিলাম, আমার জীবনে সত্য বিরহ কী কী আছে। বেশিরভাগই মিথ্যে বিরহে ভরা। সত্য খুঁজতে খুঁজতে যখন নাকাল হচ্ছিল তখন হঠাৎ আমার জীবন থেকে চিরতরে হারানো রূপনগরের কথা মনে এসেছিল। রূপনগর এলাকায় আমি বেড়ে উঠেছি। এই রূপনগর দুই ভাগে বিভক্ত। রূপনগর আবাসিক, রূপনগর টিনসেড। দ্বিতীয়টি আমার এলাকা। আমি সটকে পড়লেও এখনও স্বনামে এলাকাটি আছে। তবে আমি যা দেখেছি, তা হারিয়ে গেছে। হারিয়ে পথ ভুলে গেছে এবং তার চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে। সুতরাং নশ্বর পৃথিবীতে যে কোনো কিছু ঘটতে পারে এ কথা মেনে নিয়েও বলা যায় রূপনগর টিনসেডের আগের সেই রূপকথাসাদৃশ্য কোনোদিন ফিরে আসবে না। ব্যাপারটা দাঁড়াল এই, যা ছিল, তা নেই, সেটা নিরেট বাস্তবের কথা বলছি। বাস্তবে আর নেই। তবে হ্যাঁ, একটি জায়গায় আছে। আমার কল্পনায়। আমার কল্পনায় রূপনগর টিনসেড এমনভাবে ধরা আছে, অগনিত প্রজাপতির উড়ে আসা সহ, ভোরের সিংহের ডাকসহ, খাল ধরে ভেসে আসা মৃতদেহসহ, লোডশেডিঙের অন্ধ গলিতে জাফরিকাটা জোছনাসহ, যে, স্মৃতি অনুসরণ করে পুরো রূপনগরটিকে আবার তৈরি করা যাবে। কল্পনা আর বাস্তবের ভেতর বিভব পার্থক্য তৈরি হলো। আর বিভব পার্থক্য তৈরি হলেই গল্পের প্রবাহ শুরু হয়ে যায়।

গল্পপাঠ : 
আপনার গল্প লেখার প্রক্রিয়া কেমন? প্রতিটি গল্প কি এক বসাতে অর্থাৎ একদিনেই লেখেন, নাকি ধীরেসুস্থে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ ধরে লেখেন?

হামিম কামাল :
সাধারণত আইডিয়া ধরে লিখতে শুরু করি। তখন যা লিখি তার ভেতর গল্পসূত্র থাকে, কিন্তু ‘গল্প’ থাকে সুপ্ত, গুপ্ত, পলায়নপর। “ধর ধর ধর!” তাকে ধরতে সময় লাগে। সবসময় ধরতে পারি না, রম্য গল্পের পুলিশের মতোন দশা হয়। এরপর পলায়নপর দৃষ্কৃতকারী, যে আমার রাতের ঘুম, দিনের শান্তি কেড়ে নিয়েছে, হঠাৎ একদিন নিজের ভুলে, অতি আত্মবিশ্বাসের মাশুলে, পেটমোটা নধরকান্তি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। তাকে রিমাণ্ডে নিয়ে তার মতি, গতি, স্মৃতি, কৃতি, রীতি বের করে আনার জন্য যতই নির্যাতন চালাই, ততই সে হাসে, বেপরোয়া হাসে, বলে, “বলব না!” আমি বলি, “বল্!’ এরপর বলি ‘বলো বাবা!’ তারপর বলি “বলুন না মহামান্য আপনার পায়ে ধরি!” আসল পুলিশ সম্বোধনে ধীরে ধীরে নিচে নামে, আর উঠি ওপরে। এভাবে দেখি সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে, মাস পেরিয়ে গেছে। শেষে ছেড়ে দিই ব্যাটাকে, “যাও বাবা! চলে যাও, আর কখনো এসো না।” আমার চেষ্টার প্রতি করুণাবশত গল্প তখন দুয়েকটা ক্রমিকবিহীন টুকরো সত্য বলে উধাও হয়। ওই যে, লোভ? স্রষ্টা সাজার লোভ? ওটার ওপরই ভর দিয়ে কুৎসিত, আত্মজ্ঞানবিহীণ এই আমি ওর ফেলে যাওয়া সত্যগুলোকে ক্রম মেনে সাজাই, মালা গাঁথতে গাঁথতে আঙুলে রক্ত ফোটে, আর চোখের জল নাকের জল এক করে প্রতীজ্ঞা করি, “আর কোনোদিন গল্প লিখব না, এসব আমার জন্য আসেনি।” ক্যালেন্ডারে ততদিনে সাতদিন কি চৌদ্দ দিন বা একুশদিন নয় আটাশ দিনে লাল কালি পড়েছে।

গল্পপাঠ : 
আপনি কি আগে গল্পের বিষয় ঠিক করেন,নাকি আঙ্গিক? একই সঙ্গে গল্পের শুরুটা এবং শেষটা কি আগেই মাথায় ঠিক করে রাখেন, নাকি লিখতে লিখতে হয়ে যায়?

হামিম কামাল :
শুরুতে বিষয়। এরপর উপস্থাপনকে অনন্য করে তোলার জন্যে আঙ্গিক নিয়ে ভাবি। আইডিয়া যদি কোনো শেষদৃশ্য দেখায়, প্রথম দৃশ্য থেকে শুরু করি। তবে আমার ভাগ্য এতো প্রসন্ন না। বেশিরভাগ সময়ই আমি শেষটা জানতে পারি না। তাই প্রথম দৃশ্য থেকে শুরু করি এবং জানতে জানতে সেই প্রাচীন ক্লিশে সত্য আবিষ্কার করি, ‘জানার কোনো শেষ নেই’। এমন আবিষ্কার লিখিত শিল্পকর্মের জন্য আত্মঘাতী। আমার দিগচিহ্নহীন জলপথে ভাসানো জাহাজ থেকে তাই বোধহয় যাত্রীরা বুদ্ধিমানের মতো দ্রুত ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মরক্ষা করে।

গল্পপাঠ : 
আপনি কি একটি গল্প লেখার পর বারবার এডিট করেন, নাকি একবারেই লেখেন, পরে আর কোনো এডিট করেন না?

হামিম কামাল :
এডিট করতে করতে পাগলের দশা হয়। বহু পাণ্ডুলিপি আমি এডিট করতে করতে ধ্বংস করে দিয়েছি। এ যাবত মাত্র দশটা পাণ্ডুলিপি আমার সহধর্মিনী জাহ্‌রা জাহান পার্লিয়া বা বন্ধু মাহবুব ময়ূখ রিশাদ আমার কবল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যৎসামান্য রক্ষা করতে পেরেছে।

গল্পপাঠ : 
ছোটগল্প আপনার দৃষ্টিতে কী। ছোটগল্প এবং উপন্যাসের মধ্যে আপনি পার্থক্য দেখেন? একটু বিস্তারিত বলুন…

হামিম কামাল : 
শিল্পে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ সংজ্ঞা সৃষ্টি করা। আমি এতে নেই। একটা ছবি এঁকে দিচ্ছি। যেটা দিয়ে গড়পরতা গল্প-উপন্যাসের সংজ্ঞা ও পার্থক্য কিছুটা আঁচ করা যাবে। আর গড়পরতার বাইরে যে ধারা তা এ দিয়ে বোঝা যাবে না। বর্তমান ও আসছে দিনের মূর্ত/বিমূর্তভেদী মেধাবী বিশ্লেষক সমালোচকরা তার সংজ্ঞা হয়ত ঠিক করতে পারবেন। ওটা আমার অধিকারের বাইরে।
গল্পপাঠ : 
আপনি কোনটাতে স্বতস্ফূর্ত—উপন্যাসে না গল্পে?

হামিম কামাল : 
আমার স্বতঃস্ফূ্র্ততা উপন্যাসে। উপন্যাস শুরু করতে আমি লবণের মতো ভালোবাসি।

গল্পপাঠ : 
বাংলাদেশে গল্পের বইয়ের পাঠক তো তুলনামূলক কম। ‘মানুষ হারবে না’ প্রকাশের পর কেমন সাড়া পেয়েছেন বা পাচ্ছেন?

হামিম কামাল : 
যেটুকু আশা করেছিলাম সেটুকুই সাড়া পেয়েছি। কতটা, কেমন, তা রহস্য থাক।

গল্পপাঠ : 
আপনি ছোটগল্প কেন লেখেন? কোন তাড়না থেকে? কীসে আপনাকে গল্প লেখায় অনুপ্রাণিত করে?

হামিম কামাল : 
মানুষ যাকে ভালোবাসে, ঠিক তাকেই কেন ভালোবাসে, জিজ্ঞেস করলে বলতে গিয়ে এক পর্যায়ে নিজেকে নির্বোধ মনে হতে থাকে। কেন গল্প লিখি? সহজ কথায়, প্রকৃতির ষড়যন্ত্র। প্রকৃতি কেন এই ষড়যন্ত্র করে? সম্ভবত এজন্য যে বেঁচে থাকায় গল্পের উচ্চ উপযোগ রয়েছে। প্রকৃতি চায়, মৃত্যুর পরিণতি নিয়ে আসা প্রাণটি কিছুকাল বাঁচুক। বাঁচার অর্থ মৃত্যুনদীতে উল্টোসাঁতার। সংগ্রাম ব্যাপারটা প্রতিযোগিতাতেও আছে, সহযোগিতাতেও আছে। ঈশ্বরের মতো সে বিব্রতকররূপে সর্বত্র। বাঁচতে চাই অভিজ্ঞতা। প্রাণকে বিবিধ অভিজ্ঞতা দিতে প্রকৃতি বোধহয় কিছু বাজে লোককে দিয়ে লোককে গল্প বলায়।

গল্পপাঠ : 
সম্প্রতি পড়া বাংলা ভাষার কিংবা পৃথিবীর যে কোনো ভাষার একটি ছোটগল্প সম্পর্কে আপনার কাছ থেকে জানতে চাই, যেটি আপনাকে ছুঁয়ে গেছে, আপনার মনে রেখাপাত করে গেছে।

হামিম কামাল : 
আমি আরেকটি ভাষায় পড়া ছোটগল্পের কথা বলতে চাই, সেটি চিত্রভাষা। মূলত চিত্রভাষা। স্বল্প সংলাপ আছে, সেটি জাপানি থেকে ইংরেজিতে রূপান্তরিত। আমার গুরুদের একজন, বিখ্যাত ‘মাঙ্গাকা’ প্রয়াত কেনতারো মিউরার ধ্রপদী সৃষ্টি ‘বারজার্কের’ মূল গল্প থেকে বিচ্ছিন্ন একটি ছোট গল্প সেটি। কারাগারে নিয়ে আসা মৃতপ্রায় এক কিশোরের সঙ্গে একই কারা প্রকোষ্ঠের ইটের ফাঁকে জন্ম নেওয়া বুনো ফুলের পরীর গল্প। মধ্যযুগীয় যুদ্ধক্লান্ত ইউরোপের পটভূমি। হাসিখুশি ওই পরীরা ফুল থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। ফুলগাছটি বাঁচলে তারা বাঁচে, ফুলগাছটি মরলে তারাও মরে যায়। ফুলপরীটি বন্দিত্ব থেকে বাঁচতে মৃতপ্রায় কিশোরের সহায়তা চায়। কিশোরটির নাম গাট্‌স। গাট্‌স কথা দেয়, যদি আজ রাতটি কোনোক্রমে বেঁচে থাকে, যে করেই হোক ফুলপরীর সেই বিন্দি গাছটিকে সে বাইরের অবারিত তৃণভূমিতে নিয়ে যাবে। সেখানে অজস্র বুনো ফুলের ডগায় তার মতো ফুলপরীরা বাতাসে দোল খায়। মুক্তির স্বপ্নে ফুলপরীর চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। জ্ঞান হারানো গাট্‌সকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনতে তার ক্ষতগুলোর সে ছোট্ট সেই গাছের একটি একটি পাতা বিছিয়ে দিতে থাকে। একেটি পাতায় সেই পরীটির প্রাণ। একসময় তার সবকটি প্রাণপত্র সে ছেলেটির সবকটি ক্ষতের ওপর বিছিয়ে দিয়ে মৃত্যুবরণ করে।

গল্পপাঠ : 
ছোটগল্প লেখার জন্য আপনি কি বেশি বেশি ছোটগল্প পড়েন? লেখার জন্য পাঠ কি জরুরি?

হামিম কামাল : 
দুটোর কোনোটির ব্যাপারেই আমি ঠিক নিশ্চিত নই। তবে পড়তে পড়তে বোঝার ক্ষমতা বাড়ে। লিখতে লিখতে লেখার। দুটোর কোনো এক রহস্যময় সমন্বয়ের ভেতর সৃষ্টির সূত্র লুকিয়ে থাকতেও পারে।

গল্পপাঠ : 
এবার ‘মাকারানার অশ্রু’ বিষয়ে আলাপ করি। মাকারানা ভারতের রাজস্থান রাজ্যের নাগৌর জেলার একটি বিখ্যাত শহর, যা উৎকৃষ্ট মানের সাদা মার্বেল বা মর্মর পাথরের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। উপন্যাসটা কি সেই শহরকে নিয়ে বা সেই শহরের পটভূমিতে রচিত? নাকি মাকারানা কোনো ব্যক্তিবিশেষের নাম?

হামিম কামাল :
 ধন্যবাদ গল্পপাঠ! যোগসূত্র আছে। ‘সূত্র’। ওটুকুই। রাজস্থানের সেই অঞ্চলের নাম মাকরানা। আমি সামান্য আকার যোগ করে তাকে নিয়ে গেছি আমার কল্পনার ভূখণ্ডে। ‘মাকারানার অশ্রু’ হলো আমার কল্পনার দেশে মাকারানার মর্মরে তৈরি একটি ফুলদানির আদরের নাম। এই ফুলদানি তৈরি করেছেন যিনি তাঁর প্রাণের কিছু অংশ ফুলদানিতে চলে এসেছে এবং পাথরের প্রাণ ও শিল্পীর প্রাণ—এ দুটোর ভেতর একটা বিয়ে হয়ে সৃষ্ট হয়েছে নতুন প্রাণ। মাকারানার অশ্রু নামে ফুলদানিটি এক ধরনের প্রাণি।

স্রষ্টা সৃষ্টির মাঝে পশে যান। প্রতিটি সৃষ্ট তাই স্রষ্টাময়, প্রাণময়, জ্যান্ত। যেমন—গীতবিতানের ত্রোস্তগুলো জ্যান্ত, কনকচাঁপা চাকমার চন্দ্রনৃত্য সিরিজের ছবিগুলো জ্যান্ত। প্রতীকী কিছুর কথা বলছি না। আক্ষরিক অর্থেই এদের প্রাণ আছে। এবং এরা বুদ্ধিসম্পন্ন।

‘মাকারানার অশ্রু’ যেহেতু বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণি, সেও নিজেকে রক্ষা করতে চায়। সময় ধরে সামনে এগোচ্ছিল। মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় পৃথিবীতে যেভাবে মাত্রা উন্মুক্ত হয়েছে, সব কিছুই তাই করে, সময় ধরে সামনে এগোয়। সেও তাই এগোচ্ছিল কিন্তু ‘হঠাৎ কী হলো মতি’। প্রাণ প্রতিকূলতা বুঝতে পারে এবং সময়ও শুধু সামনেই এগোয় না। সময় আসলে কোনোদিকেই এগোয় না, সে কেবল বিরাজ করে। এবং শিল্পীর চিন্তার সৃষ্টি ভুবন আর মহাবিশ্ব সৃষ্টির ফলে সৃষ্ট ‘পৃথিবী; ভুবনের নিয়ম এক নয়। মাকারানার অশ্রু স্থিরবিরাজমান সময় ধরে কখনো ভবিষ্যতের দিকে ধাবমান, কখনো অতীত অতিক্রম করছে। সুতরাং টেবিলের ফুলদানি ঢুকে পড়ল ষাট বছর আগের ফটোগ্রাফে। সে পেছাচ্ছে! কিন্তু বাবা তুমি যে এগোচ্ছ বা পেছাচ্ছ, তোমার সঙ্গে তো বাধা পড়ে যাচ্ছে যুগে যুগে অনেক প্রেমিক প্রেমিকার মন! বন্ধন ছিন্ন করতে তোমার কষ্ট হয় না, তাদের তো হয়! এ উপন্যাস মাকারানার মর্মরে তৈরি ফুলপাত্রের সঙ্গে বাঁধা পড়া এক জুটির গল্প। আর শিল্প ও শিল্পী নিয়ে কচকচি।

গল্পপাঠ : 
‘মাকারানার অশ্রু’ আপনার কততম উপন্যাস? উপন্যাসটি লেখার পরিকল্পনা আপনার মাথায় কীভাবে এসেছিল, একটু বিস্তারিত যদি বলেন...।

হামিম কামাল : 
ষষ্ঠ উপন্যাস।
সত্যি সত্যি মাকরানা (এবার আমার বানোয়াট মাকারানা নয়, আদি ও আসল ‘মাকরানা’) পাথরের তৈরি একটা ফুলদানি হাতে নিয়ে মাথায় গোলমাল হয়ে গেল। ছোট ফুলদানি, ভেবেছিলাম কতই বা ভর। কিন্তু হাতে নিয়ে ফেলেই দিচ্ছিলাম প্রায়। আমার চাচাত ভাই নূরউদ্দিন মামুন। ভারতে গিয়ে তিনি মাকরানা মর্মরে কাজ করেন এমন একজন শিল্পীর সান্নিধ্য পান। সেই শিল্পী তাঁকে বানিয়ে দিয়েছিলেন আশ্চর্য ওই ফুলদানি। কোনো নকশা নেই অথচ এর পুরো শরীর মূর্তিমতি নকশা। হাতে নেওয়ামাত্র আমি গোটা গল্পটাকে মুহূর্তের জন্যে দেখতে পেয়েছিলাম (পরে হারিয়ে ফেলি।) পরে আমি একটি ছবিও এঁকেছিলাম সেই ফুলদানির।
গল্পপাঠ : 
যতটা মনে পড়ে আপনার প্রথম উপন্যাস ‘জঠর’। এত বছর পর আপনি কি এই উপন্যাসের ভাষা ও নির্মাণে কোনো ত্রুটি দেখতে পান? এখন কি মনে হয় উপন্যাসটি আপনি এখন লিখলে ঠিক এই আঙ্গিকে, এই ভাষায় বা এ বিষয়ে লিখতেন না? অনেক লেখকের প্রথম উপন্যাস সম্পর্কে এমনটা মনে হয়।
হামিম কামাল : 
গল্পপাঠের জন্যে ভালোবাসা। জি, জঠর।
ভাষায় ত্রুটির শেষ নেই। নির্মাণেও। তবে সত্যি বলতে বর্তমান আমার সাধ্য নেই আরেকটি ‘জঠর’ লিখি। মানুষের কিছু কিছু সাধ্য আছে সাধনায় লোপ পায়। জঠরের সময়ে এক অপাপবিদ্ধ কল্পনাশক্তি আমার সঙ্গী ছিল। তা আমি হারিয়েছে। কেঁদেও ফিরে পাব না এমন অজস্র সুন্দর আমি হারিয়েছি।

গল্পপাঠ : 
‘মাকারানার অশ্রু’ লিখতে কতদিন লেগেছিল? লেখার প্রক্রিয়া কেমন ছিল? আগেই কি চরিত্র, চরিত্রের নাম, কাহিনি, পরিণতি—এসব ঠিক করে নিয়েছিলেন, নাকি লিখতে লিখতেই সব এসেছে? কতবার এডিট করেছিলেন এই পাণ্ডুলিপি?

হামিম কামাল :
নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন, তবে বিস্তৃত কোভিড-সময়ের কোনো এক মুহূর্ত থেকে লেখা শুরু। এবং ‘জোছনাসম্রাজ্ঞী’ নামে আরেকটি জবরজং উপন্যাস লিখতে লিখতে তাকে পাওয়া। ওই উপন্যাস এখনো অপ্রকাশিত, কখনো প্রকাশ পাবে কিনা তাও জানি না। তবে এটুকু জানানো যায়, সে ‘মাকারানার অশ্রুর’ জননী। লিখতে লিখতে তাদের পেয়েছি। যেহেতু আইডিয়া ধরে লিখি, সচরাচর লিখতে লিখতেই পাই।শুরুতে এটা অনেকখানি মূর্ত ছিল। এডিট করতে করতে মূর্তি গেছে ভেঙে।

গল্পপাঠ : 
আপনি কি মনে করেন সর্বদিক থেকে আপনার আগের উপন্যাসগুলোকে অতিক্রম করতে পেরেছে ‘মাকারানার অশ্রু’? প্রত্যেক লেখকের কাছে তার সব লেখাই গুরুত্বপূর্ণ। তবু যদি বলা হয় আপনার এ যাবৎকালে প্রকাশিত সব কটি উপন্যাসের মধ্যে সেরা উপন্যাসটি নির্বাচন করতে, আপনি কোনটিকে করবেন?

হামিম কামাল : 
লিখতে লিখতে আমার প্রিয়তা অর্জন করেছে মাকারানার অশ্রু। চেয়েছিলাম সে অগ্রজদের অতিক্রম করুক। কিন্তু ব্যাটা পারেনি। তবু তাকে ভালোবেসেছি। প্রিয় মানুষটি তো সবসময় সফলতম মানুষটি নয়। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে প্রিয় (ব্যর্থ হলেও) উপন্যাস জঠর।

গল্পপাঠ :
রাজনৈতিক জটিলতা, রমজান মাসসহ নানা কারণে গত বইমেলা তো তেমন জমেনি। এই মেলাতেই আপনার দুটি বই প্রকাশিত হলো। গল্পের বইটির কথা তো বলেছেন, উপন্যাসটি প্রকাশের পর কেমন সাড়া পেয়েছেন বা পাচ্ছেন?

হামিম কামাল : 
উত্তেজিত হয়ে ভেবেছিলাম মুহুর্মুহু করতালি পাব। কিন্তু ‘অভাগা যেদিকে চায়...’ ইত্যাদি


গল্পপাঠ
: 
আপনি বেশি পড়েন, নাকি বেশি লেখেন? দিনের কোন সময়টায় লেখেন কিংবা পড়েন? আপনার কি কোনো রুটিন আছে?

হামিম কামাল :
কোনটা বেশি করি ঠিক জানা নেই। পড়ার সময় বিচার নেই। রাতে লিখি। ভোর পর্যন্ত। এই অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসটাই রুটিন দাঁড়িয়ে গেছে।

গল্পপাঠ : 
কাজ করছেন সংবাদপত্রে। এই পেশায় থেকে লেখালেখিতে কোনো চাপ অনুভব করেন কিনা? অর্থাৎ পেশার কারণে আপনার লেখা ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিনা? লেখকের জন্য সংবাদপত্রে চাকরি কোনো সমস্যা কিনা?

হামিম কামাল : 
এই পেশা কোয়ালিটি লেখা কমিয়ে দিয়েছে। লেখকরা সাংবাদিকতা থেকে সাবধান। শুরুতে এটা রক্ষা করবে, পরে এটা হত্যা করবে।

গল্পপাঠ : 
এখন কী পড়ছেন? একই সঙ্গে জানতে চাই কী লিখছেন?

হামিম কামাল : 
পড়ছি ‘বাংলার নবজাগৃতি’। বিনয় ঘোষ প্রাতঃস্মরণীয়। লিখছি ‘পথ যা দেখাবে বলে কথা দিয়েছিল’। উপন্যাস। ·