মৌসুমী কাদের
গল্পপাঠের একশো সংখ্যার দিকে ফিরে তাকাতে গিয়ে মনে হলো, পুরোনো কোনো লেখা খুলে বসলে যেমন বহু বছর পর একটি পুরোনো ঘরের দরজা খুলে যায়, তেমনি গল্পপাঠের পাতাগুলোও আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ফেলে আসা এক সময়ে। ঘরটি অন্ধকার নয়, আবার পুরোপুরি আলোতেও ভরা নয়। জানালার ধারে বিকেলের নরম আলো এসে পড়েছে। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে কিছু কাগজ, পাশে দু-একটি বই, কম্পিউটারের পর্দায় খোলা একটি গল্প। কোথাও কোনো তাড়া নেই। শুধু মনে হয়, এই ঘরে একসময় অনেক কথা হতো। গল্পপাঠের সঙ্গে আমার দিনগুলোও ছিল অনেকটা এমন। সেই সময়টাকে এখন মনে করলে সবচেয়ে আগে মনে পড়ে শব্দের চেয়ে মানুষের মুখ। কম্পিউটারের পর্দায় ভেসে ওঠা কোনো নতুন গল্প, মেইলে আসা অচেনা একজন লেখকের লেখা, কোনো পরিচিত লেখকের ফোন—সবকিছুর মধ্যেই যেন একটি নতুন দরজা খুলে যেত। একটি গল্প পড়তে গিয়ে মনে হতো, লেখাটির সঙ্গে আরও একটু কথা বলা দরকার। কোনো লেখকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তাঁর অন্য গল্পের প্রসঙ্গ উঠত। সেই গল্প থেকে আরেকজন লেখক, আরেকজন লেখক থেকে অন্য কোনো শহর। কখনও কলকাতার কোনো গলি, কখনও কোনো লেখকের বাড়ির বারান্দা, কখনও কোনো বইয়ের ভেতরের অচেনা পৃথিবী, আবার কখনও শুধু ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসা একটি কণ্ঠ—এভাবেই গল্পপাঠ ধীরে ধীরে আমার নিজের জীবনেরও একটি অংশ হয়ে উঠেছিল।
তখন কাজ আর পড়ার মধ্যে কোনো স্পষ্ট সীমানা ছিল না। অনেক রাত পর্যন্ত লেখা পড়েছি। কোনো গল্পের একটি বাক্য মনে থেকে গেছে, কোনো লেখকের একটি কথা সারাদিন মাথার ভেতর ঘুরেছে। কখনও একটি লেখা নিয়ে মনে হয়েছে, লেখককে কিছু একটা বলা দরকার। কখনও আবার কোনো গল্প পড়ে চুপ করে থেকেছি—কারণ সব লেখার প্রতিক্রিয়া শব্দে প্রকাশ করা যায় না। সেই দিনগুলোর দিকে এখন ফিরে তাকালে মনে হয়, গল্পপাঠের সঙ্গে আমার সম্পর্কটি আসলে কাজের সম্পর্ক ছিল না। ধীরে ধীরে সেটি হয়ে উঠেছিল এক ধরনের সহযাত্রা। আমরা লিখছিলাম, পড়ছিলাম, সম্পাদনা করছিলাম, কথা বলছিলাম—আর সেই করতে করতেই বুঝতে পারিনি, আমাদের চারপাশে একটি সময় তৈরি হয়ে যাচ্ছে। আজ এত বছর পর মনে হয়, আমরা তখন শুধু একটি ওয়েবসাইট পরিচালনা করছিলাম না; অজান্তেই বাংলা সাহিত্যের একটি সময়কে ধরে রাখছিলাম।
২০০৮ সালে শুরু হওয়া সেই পথ আজ একশো সংখ্যার দোরগোড়ায়। প্রায় পাঁচ হাজার লেখা, ৮৮৭ জন লেখকের রচনা এবং ৩৫১টি ই-বুক—সংখ্যাগুলো গল্পপাঠের বিস্তার বোঝায়। কিন্তু এই সংখ্যাগুলোর ভেতরে যে মানুষগুলো আছেন, তাঁদের গল্প কোনো পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। একজন নতুন লেখকের প্রথম লেখা পাঠানোর সংকোচ, কোনো প্রতিষ্ঠিত লেখকের নতুন গল্পের অপেক্ষা, সম্পাদকের রাত জাগা, কোনো লেখা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা, পাঠকের নীরবে পড়ে যাওয়া—এসবই গল্পপাঠের অদৃশ্য ইতিহাস। একটি লেখা প্রকাশিত হওয়ার মুহূর্তটি খুব ছোট। কিন্তু তার পেছনে যে সময়, অপেক্ষা, সংশয়, যত্ন আর ভালোবাসা কাজ করে, তার পরিধি অনেক বড়। গল্পপাঠের সৌন্দর্য বোধ হয় এখানেই। এটি শুধু লেখা প্রকাশের একটি অনলাইন জায়গা হয়ে থাকেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি হয়ে উঠেছে একটি বিস্তৃত সাহিত্যভুবন—গল্প, অনুবাদ, সাক্ষাৎকার, আলোচনা, ধারাবাহিক লেখা, বিশেষ আয়োজন, ই-বুক এবং পুরোনো সংখ্যার বিপুল সঞ্চয়ে গড়ে ওঠা একটি চলমান সাহিত্য-আর্কাইভ। বহু বছর আগে পড়া কোনো গল্পের কাছে ফিরে যাওয়া যায়। একটি গল্প পড়তে পড়তে সেই লেখকের আরেকটি লেখা খুঁজে পাওয়া যায়। কোনো সাক্ষাৎকারের সূত্র ধরে পৌঁছে যাওয়া যায় অন্য একজন লেখকের কাছে। এভাবেই গল্পপাঠের পাতাগুলো একে অন্যের সঙ্গে কথা বলে।
সম্পাদনার টেবিলের স্মৃতিও তাই আলাদা করে মনে পড়ে। সম্পাদনা করতে বসে ধীরে ধীরে বুঝেছি, লেখাকে সুন্দর করে তোলা আর লেখকের নিজস্ব স্বরকে অক্ষুণ্ণ রাখা—দুটির মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য আছে। কোথাও বানান ঠিক করতে হয়, কোথাও একটি বাক্য একটু হালকা করতে হয়, কোথাও লেখককে একটি প্রশ্ন করতে হয়। আবার কখনও বুঝতে হয়, এখানে আমার কিছুই করার নেই। লেখাটিকে তার নিজের মতো থাকতে দিতে হবে। কারণ একটি ভালো লেখার নিজস্ব শ্বাস আছে। অতিরিক্ত সম্পাদনা কখনও কখনও সেই শ্বাসটুকুই কেড়ে নেয়। এই ছোট ছোট অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই আমার নিজেরও শেখা হয়েছে—শুধু সাহিত্য সম্পর্কে নয়, মানুষ সম্পর্কে। বুঝেছি, প্রত্যেক লেখার পেছনে একজন মানুষ আছেন; তাঁর নিজস্ব জীবন, স্মৃতি, ক্ষত, আনন্দ, ভয় এবং বলার মতো একটি নিজস্ব পৃথিবী আছে। সেই পৃথিবীর দরজায় সম্পাদকের প্রবেশ খুব সতর্ক হওয়া দরকার।
গল্পপাঠের এই দীর্ঘ যাত্রার কথা বলতে গেলে কুলদা রায়ের কথা আলাদা করে মনে পড়ে। গল্পপাঠের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে তিনি শুধু একটি ওয়েবসাইটের কথা ভাবেননি; গল্পকে ঘিরে একটি জীবন্ত সাহিত্যভুবন গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। নতুন লেখাকে জায়গা দেওয়া, লেখকদের উৎসাহ দেওয়া, নানা ধরনের লেখা ও পাঠকে এক জায়গায় নিয়ে আসা—গল্পপাঠের পথচলায় তাঁর সেই ভাবনার ছাপ স্পষ্ট। তাঁর নিজের লেখালেখিতেও স্মৃতি, ইতিহাস ও বিস্মৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। গল্পপাঠের দীর্ঘ পথেও যেন স্মৃতিকে ধরে রাখার সেই তাগিদ কাজ করেছে। তবে কোনো সাহিত্যভুবন একা একজনের হাতে তৈরি হয় না। অমর মিত্রের সাহিত্যিক উপস্থিতি, দীপেন ভট্টাচার্যের দায়িত্বশীল ভূমিকা, নাহার তৃণার সম্পাদনার কাজ, স্মৃতি ভদ্রসহ গল্পপাঠ টিমের বহু মানুষের শ্রম ও নিষ্ঠা—সব মিলিয়েই গড়ে উঠেছে এই দীর্ঘ পথ। তাঁদের প্রত্যেকের অবদান এই ইতিহাসের অংশ।
আর আমার কাছে গল্পপাঠের সবচেয়ে বড় পাওয়া—মানুষ। অমর মিত্র, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, জয়া মিত্র, জয়া কুন্ড, দোলনচাপা দাশগুপ্ত—নাম লিখে শেষ করা যাবে না। কারও সঙ্গে দীর্ঘ কথা হয়েছে, কারও সঙ্গে অল্প। কারও সঙ্গে সাহিত্য নিয়ে তর্ক হয়েছে, কারও সঙ্গে শুধু একটি গল্প নিয়ে কথা হয়েছে। কিন্তু সেই কথাগুলো অনেক সময় গল্পের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থেকেছে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার ও ওয়াসি আহমেদ স্যারের সাক্ষাৎকার নেওয়ার অভিজ্ঞতা আমার নিজের পাঠক-চোখকেও বদলে দিয়েছিল। একজন লেখকের লেখা পড়া আর তাঁর মুখোমুখি বসে তাঁর সৃষ্টির কথা শোনা—দুটি অভিজ্ঞতা এক নয়। সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে মনে হয়েছে, একটি গল্পের আড়ালে আরেকটি গল্প লুকিয়ে থাকে; লেখক নিজে কথা বললে সেই দ্বিতীয় গল্পটির দরজা একটু খুলে যায়। ২০১৮ সালে জয়া মিত্র আমাকে লিখেছিলেন, “তোমার সাথে কথা বলে আমি পুলকিত। নতুন বন্ধু পাওয়া মানে একটা চমৎকার নতুন বই পাওয়ার মত।” কথাটি আজও মনে আছে। সত্যিই, কিছু মানুষকে পাওয়া যেন নতুন একটি বই পাওয়া। প্রথমে শুধু প্রচ্ছদ দেখা যায়। তারপর ধীরে ধীরে পাতা খুলতে হয়। কিছু মানুষকে পড়তে সময় লাগে। তাঁদের কথার ভেতর দিয়ে তাঁদের জীবন, অভিজ্ঞতা, আনন্দ আর বিষণ্নতার কাছে পৌঁছাতে হয়। গল্পপাঠ আমাকে এমন অনেক মানুষের বই খুলে পড়ার সুযোগ দিয়েছে। এই কারণেই গল্পপাঠের স্মৃতি আমার কাছে শুধু গল্পের স্মৃতি নয়। এটি মানুষের স্মৃতি। কোনো লেখার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি কণ্ঠ, কোনো সাক্ষাৎকারের আগে-পরে কাটানো সময়, সম্পাদনার টেবিলে বসে কোনো লেখাকে নিয়ে দীর্ঘ ভাবনা—এসব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে আমার গল্পপাঠ।
গল্পপাঠের পাতায় দূরদেশের লেখক আছেন, কলকাতার লেখক আছেন, বাংলাদেশের লেখক আছেন, পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলা ভাষার মানুষ আছেন। কেউ খুব পরিচিত, কেউ একেবারে নতুন। কেউ নিয়মিত লিখেছেন, কেউ হয়তো শুধু একটি গল্প রেখে গেছেন। কিন্তু প্রত্যেকেই এই ভুবনের কোথাও না কোথাও একটি চিহ্ন রেখে গেছেন। এই বিচিত্র মানুষের সমাবেশই গল্পপাঠকে দিয়েছে তার নিজস্ব চরিত্র। এটি যেন একটি ভুবনগ্রাম—যেখানে দূরত্ব আছে, কিন্তু বিচ্ছিন্নতা নেই; দেশ আলাদা, কিন্তু ভাষা ও গল্পের সূত্রে মানুষ পরস্পরের কাছে এসে দাঁড়ায়। শততম সংখ্যা কোনো যাত্রার শেষ নয়। বরং এতদূর এসে একবার থেমে সামনে তাকানোর সময়। বিশ্বের বিভিন্ন অনলাইন সাহিত্যপত্রিকা দেখিয়েছে, ডিজিটাল সাহিত্য শুধু লেখা প্রকাশের জায়গা নয়; সাক্ষাৎকার, অনুবাদ, নতুন লেখকের পরিচয়, আলোচনা ও শ্রুতিপাঠের মধ্য দিয়েও পাঠকের কাছে পৌঁছানো যায়।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস আসলে সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবন, সমাজ ও ভাষার বদলে যাওয়ার ইতিহাসও। পুরোনো লেখা পড়লে যেমন অতীতের জীবনযাত্রার পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনি ভাষার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ধরা পড়ে একেকটি সময়ের চিন্তা ও অনুভব। সাম্প্রতিক নাটক-সিনেমার কথ্য ভাষাও গল্প নির্মাণে প্রভাব ফেলছে। মানুষের মুখের স্বাভাবিক কথা, আঞ্চলিক টান, ছোট ছোট সংলাপ ও দৈনন্দিন শব্দ গল্পের চরিত্রকে আরও জীবন্ত করে তুলতে পারে। তবে এই ভাষা ব্যবহারে প্রয়োজন সংবেদনশীলতা, যাতে তা কেবল অনুকরণ না হয়ে চরিত্র ও কাহিনির সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশে যায়। বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় সম্পদগুলোর একটি তার বিপুল সঞ্চয়। গল্পপাঠের কাছেও রয়েছে বহু বছরের সেই সঞ্চয়। পুরোনো লেখার নতুন পাঠ, লেখককেন্দ্রিক সাক্ষাৎকার, বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যের অনুবাদ, নতুন লেখকদের জন্য আয়োজন, সাহিত্য-আলোচনা ও শ্রুতিপাঠের পাশাপাশি পুরোনো সংখ্যাগুলোকে লেখক, বিষয় ও সময় অনুযায়ী সহজে খুঁজে পাওয়ার মতো করে সাজানো যেতে পারে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের পাঠকদের জন্য মোবাইলে স্বচ্ছন্দে পড়ার সুবিধা, লেখক ও গল্পের সংক্ষিপ্ত পরিচয়, সহজ অনুসন্ধান, লেখা সংরক্ষণ এবং পাঠ-আলোচনার মতো উদ্যোগ গল্পপাঠের সঙ্গে নতুন পাঠকের সম্পর্ক আরও সহজ করে তুলতে পারে।
কারণ কোনো ভালো লেখা সত্যিকার অর্থে পুরোনো হয় না। শুধু তার পাঠক বদলে যায়। নতুন চোখে পুরোনো লেখাও নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে আসতে পারে। প্রযুক্তি বদলেছে, পাঠের অভ্যাস বদলেছে। কিন্তু মানুষের গল্প শোনার প্রয়োজন বদলায়নি। একটি ভালো গল্প এখনও মানুষকে থামায়, নিজের ভেতরে তাকাতে শেখায়, অপরিচিত একজন মানুষের জীবনকে নিজের কাছাকাছি নিয়ে আসে। ভাষার দূরত্ব পেরিয়ে মানুষকে মানুষের সঙ্গে যুক্ত করে।
একশো সংখ্যা তাই শেষ নয়, নতুন পথচলার একটি মুহূর্ত। এতদিনের গল্প, মানুষ আর স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে গল্পপাঠ এগিয়ে যাক আরও দূরে। যে দরজা একদিন গল্পের দিকে খুলেছিল, সেটি খোলা থাকুক। নতুন গল্প আসুক, নতুন কণ্ঠ আসুক, আর বাংলা ভাষার এই ভুবন আরও বিস্তৃত হোক।

0 মন্তব্যসমূহ