দেবেশ চন্দ্র সান্যাল
২৬ মার্চ ’৭১ মধ্যরাতের পর থেকে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলো। এই স্বাধীনতা যুদ্ধ পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত হয়। মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ। ২৬ মার্চ ’৭১-এর পর পাকিস্তানি হানাদার সৈন্যরা সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্প স্থাপন করল। তারা নির্বিচারে হত্যা, গণহত্যা, জ্বালাও-পোড়াও, ধর্ষণ, নিপীড়ন ও অন্যান্য মানবতাবিরোধী নৃশংসতম কাজ করতে থাকল। জীবন বাঁচাতে দেশের বিভিন্ন নর-নারী ভারতে আশ্রয় নেয়। বাঙালি আর্মি, ইপিআর ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যগণ মুক্তিফৌজ ও কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও অন্যান্য নর-নারীগণ বাংলাদেশকে হানাদারমুক্ত করতে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়। বাংলাদেশের প্রশিক্ষণহীন কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও অন্যান্যরাও সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে বা না নিয়ে মুক্তিবাহিনী/গণবাহিনীতে যোগ দেয়। অস্ত্র ও গোলাবারুদের স্বল্পতার কারণে অনেকে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও গোলাবারুদের জন্য ভারতে চলে যায়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত এমএনএ ও ১৭ ডিসেম্বর ’৭০ প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য (এমপিএ)-দেরকে নিয়ে বাংলাদেশের গণপরিষদ গঠন করা হয়। ১০ এপ্রিল ’৭১ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয়। ১৭ এপ্রিল ’৭১ কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার ভবেরপাড়ার বৈদ্যনাথতলায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের শপথ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। বৈদ্যনাথতলাকে মুজিবনগর নামকরণ করে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
দেশের ক্রান্তিকালে আমি জীবনপণ মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। বাবা-মা ও বাড়ির অন্যান্য কাউকে না জানিয়ে সাথী অন্যান্যদের সাথে ভারতে গিয়েছিলাম। ভারতে মুক্তিযুদ্ধে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলাম। আমি ৭ নম্বর সেক্টরাধীন দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি মহকুমার পানিঘাটা নামক ট্রেনিং সেন্টারে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলাম। আমাকে থ্রি নট থ্রি রাইফেল, এলএমজি, স্টেনগান, হ্যান্ডগ্রেনেড ও অন্যান্য অস্ত্র ও গেরিলা যুদ্ধের কলাকৌশল শেখানো হয়। ট্রেনিং সেন্টারে আমার এফ.এফ নং-৪৭৪২ বরাদ্দ করা হয়।
প্রশিক্ষণের পর আমাদেরকে পানিঘাটা থেকে নিয়ে আসা হয় ৭ নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার কালিয়াগঞ্জ থানার তরঙ্গপুরে। তরঙ্গপুর থেকে আঞ্চলিক মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে গেরিলা গ্রুপ করা হয়। অস্ত্র ও গোলাবারুদ দেওয়া হয়। আমার নামে একটি থ্রি নট থ্রি রাইফেল, একটি হেলমেট, এক ম্যাগাজিন ও এক বেল্ট গুলি ইস্যু করা হয়। অন্যান্য গোলাবারুদ, গ্রেনেড, এক্সপ্লোসিভ, পকেটমানি, রেশনিং অ্যালাউন্সের টাকা ও অন্যান্য সামগ্রী আমার গ্রুপ লিডার/কমান্ডারকে দেওয়া হয়েছিল। আমার গ্রুপ লিডার/কমান্ডার নিযুক্ত হন সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি থানার (বর্তমানে উপজেলা) তামাই গ্রামের জনাব গাজী মো. আব্দুল মান্নান। ডেপুটি লিডার/কমান্ডার (সেকেন্ড ইন কমান্ড) নিযুক্ত হন শাহজাদপুর থানার জামিরতা গ্রামের রবীন্দ্রনাথ বাগচী। আমরা সবাই গ্রুপ নিয়ে চলে আসি বেলকুচি থানার বিভিন্ন গ্রামে। আমার গ্রুপ লিডার/কমান্ডার ও রণাঙ্গনের সাথী অন্যান্যদের বলেছিলাম—আমার জন্য প্রায় পাগল হয়ে আমার বাবা-মা পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভারতের আসামের মানিকারচর শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে। আমার লাশ নেওয়ার মতো আমার পরিবারের কোনো সদস্য বাংলাদেশে নাই। আমি রণাঙ্গনে বীরগতিপ্রাপ্ত হলে (মারা গেলে) আমার লাশ তরঙ্গপুর থেকে কেনা জাতীয় পতাকা দিয়ে জলে দিয়ে দেবেন।
আমি দুজন কমান্ডারের অধীনে ৪টি ভয়াবহ সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। কমান্ডার গাজী মো. আব্দুল মান্নানের নেতৃত্বাধীন হয়ে (১) সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি থানা অপারেশন যুদ্ধ, (২) সিরাজগঞ্জ সদর থানার কালিয়া হরিপুর ও জামতৈল রেলওয়ে স্টেশনের মধ্যবর্তী স্থানে অ্যামবুশ ও (৩) সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি থানার কল্যাণপুর যুদ্ধ। ডেপুটি কমান্ডার রবীন্দ্রনাথ বাগচীর নেতৃত্বাধীন হয়ে শাহজাদপুর থানার (বর্তমানে উপজেলা) সোনাতনী ইউনিয়নাধীন ধীতপুর নামক ওয়াপদা বাঁধের যুদ্ধে। আমার অংশগ্রহণ করা যুদ্ধগুলির বিবরণ নিচে দিলাম।
বেলকুচি থানা অপারেশন
বেলকুচি সিরাজগঞ্জ জেলার একটি উল্লেখযোগ্য থানা। এই থানা অপারেশনের নেতৃত্বে ছিলেন গ্রুপ কমান্ডার জনাব এম. এ. মান্নান স্যার। অক্টোবর ’৭১-এর প্রথম সপ্তাহে কমান্ডার স্যারের ও আরো ৩ জনের রেকিতে একযোগে বেলকুচি থানা ও মুসলিম লীগ নেতা মো. আব্দুল মতিনের বাড়ি আক্রমণ করেছিলাম। সন্ধ্যায় বানিয়াগাঁতি শেল্টারে কমান্ডার স্যার বিস্তারিত ব্রিফ করেছিলেন। কমান্ডার স্যার আমাদের গ্রুপকে দুই গ্রুপে ভাগ করে দিয়েছিলেন। সিদ্ধান্ত ছিল কমান্ডার স্যারের নেতৃত্বে বড় গ্রুপটি থানা আক্রমণ করবে। অন্য গ্রুপটি রবীন্দ্রনাথ বাগচীর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ নেতা মো. আব্দুল মতিন সাহেবের বাড়ি আক্রমণ করে মতিন সাহেবকে ধরে আনবে। আমি কমান্ডার স্যারের গ্রুপে থেকে থানা অপারেশন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। রাত ৯টায় বানিয়াগাঁতি শেল্টার থেকে যাত্রা করেছিলাম। থানার কাছে গিয়ে দুই গ্রুপ টার্গেটের উদ্দেশ্যে ভাগ হয়েছিলাম। রাত ১২টায় একযোগে আক্রমণের সিদ্ধান্ত। পরিকল্পনা মোতাবেক আমাদের গ্রুপ ও আমির হোসেন ভুলুর গ্রুপসহ অন্যান্য গ্রুপ থানার পশ্চিম পাশ দিয়ে ক্রোলিং করে থানার সামনে যেতেই সেন্ট্রি দেখে ফেলেছিল। হুইসেল বাজিয়ে থানার সবাইকে জানিয়ে দিয়ে আমাদেরকে লক্ষ্য করে সেন্ট্রি গুলি করা শুরু করেছিল।
তারপর আমাদের গ্রুপ কমান্ডার জনাব এম. এ. মান্নান স্যার কমান্ড করে ফায়ার ওপেন করেছিলেন। কমান্ডার স্যারের কমান্ড পেয়ে আমরা সবাই একযোগে গুলি শুরু করেছিলাম। আমাদের গ্রুপের সহযোগী ছিল এলাকায় শেল্টার নেওয়া জনাব মো. আমির হোসেন ভুলুর গ্রুপসহ অন্যান্য আরো কয়েকটি গ্রুপ। প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী যুদ্ধ হয়েছিল। যুদ্ধটি ছিল ভয়াবহ যুদ্ধ। আমার মাথায় হেলমেট ছিল। দুইটি গুলি এসে আমার হেলমেটে লেগেছিল। আমার ডান পাশে অবস্থান নিয়েছিলেন যুদ্ধের কমান্ডার। বিজয় আর না হয় মৃত্যু ছাড়া কোনো পথ ছিল না। আমরা সবাই বৃষ্টির মতো গুলি চালাচ্ছিলাম। যুদ্ধের এক পর্যায়ে কমান্ডার স্যার আমাকে লক্ষ্য করে বললেন—“দেবেশ, মাথা তুলো না, গুলি চালিয়ে যাও।” আমাদের গুলির কাছে হেরে গিয়ে থানার পুলিশ ও রাজাকারেরা থানার পিছন দিক দিয়ে পালিয়ে সোহাগপুর নদীতে থাকা একটি লঞ্চে আমাদের রেঞ্জের বাইরে যমুনা নদীর মধ্যস্থানে চলে গিয়েছিল। থানার সেন্ট্রি গুলি করা বন্ধ করে আত্মসমর্পণ করল। তারপর আমরা সবাই থানার ভেতরে ঢুকে পড়েছিলাম। থানার মালখানা থেকে সকল অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়েছিলাম। এই যুদ্ধে আমরা দুজন রাজাকারকে ধরে নিয়ে এসেছিলাম। ভোর হয়ে গিয়েছিল। মতিন সাহেবের বাড়ি আক্রমণ করা দলটিও এলো। মতিন সাহেব পালিয়ে গিয়েছিল। তাকে ধরা সম্ভব হয় নাই। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে অধিকাংশ বাড়ি ও দোকানে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তৈরি করে রেখেছিল। আমাদের বিজয় দেখে স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দে থানার আশেপাশের লোকজন দোকান ও বাড়িতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমরা বিজয়ী হয়ে কিছু সময় উল্লাস করে শেল্টারে চলে এসেছিলাম। ধরে আনা রাজাকার দুজনকে প্রথমত চোখ বেঁধে আমাদের শেল্টারের রুমের পাশের রুমে রাখা হয়েছিল।
আমি আমার কমান্ডার স্যারের অনুমতি নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে রাজাকার দুজনের কাছে রাজাকার হওয়ার প্রেক্ষাপট ও অন্যান্য জিজ্ঞাসাবাদ করলাম। রাজাকার দুজন ছিল সাধারণ মানুষ। তাদের কাছ থেকে জানা গিয়েছিল তারা কাউকে অত্যাচার করে নাই। তারা একটি চাকরি ভেবে রাজাকারে যোগ দিয়েছিল। রাজাকার দুজনকে দেখে সহজ-সরল ও ভালো মানুষ মনে হলো। আমি তাদের চোখবাঁধা খুলে দিলাম। আমাদের সমান তালে তাদের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। রাতে শেল্টার পরিবর্তনের সময়ে কমান্ডার স্যারকে বললাম—“স্যার, রাজাকার দুজন ভালো মানুষ, তারা কারো ক্ষতি করে নাই। তাদের বাড়িতে স্ত্রী-পুত্রাদি আছে। তারা গরিব মানুষ। দয়া করে এদেরকে ছেড়ে দিন।” আমাদের কমান্ডার স্যার ছিলেন খুব ভালো মানুষ। ছোট মানুষ হিসেবে আমাকে খুব ভালোবাসতেন। আমার কথায় সম্মত হয়ে তিনি রাজাকার দুজনকে ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি দিলেন। রাতে শেল্টার পরিবর্তনের সময় আমি ও দৌলতপুরের মো. শামসুল হক রাজাকার দুজনকে ছেড়ে দিয়ে কিছু দূর এগিয়ে দিয়ে এসেছিলাম। পরদিন সিরাজগঞ্জ থেকে শতাধিক পাকিস্তানি হানাদার সৈন্য এসে বেলকুচি থানার আশেপাশে আগুন দিয়েছিল এবং মানুষদের নির্যাতন করেছিল। ঐ রাতের জন্য কমান্ডার স্যার আমাদের পাসওয়ার্ড দিয়েছিলেন শাপলা ও গোলাপ।
কালিয়া হরিপুর রেলওয়ে স্টেশন সন্নিকটে অ্যামবুশ
কালিয়া হরিপুর স্টেশন ও জামতৈল স্টেশনের মাঝপথে কালিয়া হরিপুর রেলওয়ে স্টেশনের কাছে আমরা অ্যামবুশ করেছিলাম। কালিয়া হরিপুর সিরাজগঞ্জ জেলার সদর থানার একটি রেলওয়ে স্টেশন। নভেম্বর ’৭১ মাসের প্রথম সপ্তাহে। এই অ্যামবুশের নেতৃত্বে ছিলেন গ্রুপ কমান্ডার জনাব এম. এ. মান্নান। ঐ রাত ১১টার দিকে আমাদের গ্রুপের ঝাঐল গ্রামের জনাব মো. আব্দুল হামিদ তালুকদারের রেকি ও তথ্যের ভিত্তিতে কালিয়া হরিপুর রেলওয়ে স্টেশন ও জামতৈল স্টেশনের মাঝপথে আমরা অ্যামবুশ করেছিলাম। কমান্ডার স্যার ক্রোলিং করে রেললাইনে বৈদ্যুতিক মাইন বসিয়ে এসেছিলেন। গ্রুপ কমান্ডার স্যার ট্রেন উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। আমরা সবাই ধানক্ষেতের মধ্যে পজিশন অবস্থায় ছিলাম। কমান্ডার স্যারের হাতে মাইনের তার ও ব্যাটারি। টর্চলাইট ও হারিকেন হাতে পাকি মিলিশিয়া ও রাজাকারেরা টহল দিচ্ছিল। ওদের পায়ে লেগে হঠাৎ আমাদের মাইনের তার বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। মাইনটি পাকি হানাদারদের নজরে পড়েছিল। পাকি হানাদাররা হুইসেল দিয়ে রাজাকারদের লাইং পজিশনে রেডি থাকতে কমান্ড করল। আমাদের দিকে টর্চলাইট মেরে মেরে উর্দুতে আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বকাবকি করতে থাকল। এমন সময় ঈশ্বরদী থেকে সিরাজগঞ্জগামী পাকিস্তানি সৈন্যবাহী ট্রেন এলো। কালিয়া হরিপুর স্টেশনের পাকিস্তানি মিলিশিয়া ও অন্যান্যরা সিগন্যাল দিয়ে স্টেশনে ট্রেনটি থামিয়ে দিল। ট্রেনের পাকি হানাদারেরা অস্ত্র তাক করা অবস্থায় নেমে আমাদেরকে খুঁজতে থাকল। আমাদের মাইনটি বাস্ট করা সম্ভব হলো না। পাকি হানাদারদের সংখ্যাধিক্যতা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে কমান্ডার স্যার উইথড্র হওয়ার কমান্ড করলেন।
আমরা ক্রোলিং করে কিছু দূর পিছিয়ে এসে হেঁটে রাত ১২.০০টার দিকে তামাই গ্রামে চলে এসেছিলাম। পরের দিন সিরাজগঞ্জ থেকে পাকি হানাদার ও রাজাকারেরা এসে কালিয়া হরিপুরের আশেপাশে বিভিন্ন গ্রামের কয়েকটি বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল এবং গ্রামের কয়েকজনকে ধরে নির্যাতন করেছিল। আমরা অ্যামবুশ থেকে ফিরে এসে তামাই গ্রামে কমান্ডার স্যারের বাড়িতে একত্রিত হই। কমান্ডার স্যারের মা আমাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। আমরা কমান্ডার স্যারের বাড়িতে খাওয়াদাওয়া করলাম। খাওয়াদাওয়ার পর আমাদের সবাইকে বসিয়ে কমান্ডার স্যার ব্রিফ করলেন। স্থানীয়ভাবে ট্রেনিং দেওয়া বেশ কিছু যুবককে আমাদের গ্রুপে ভর্তি করা হয়েছিল। এত বড় প্লাটুন এক শেল্টারে শেল্টার নেওয়া সমস্যা। তাই কমান্ডার স্যার ডেপুটি কমান্ডার রবীন্দ্রনাথ বাগচীকে কমান্ডার করে আমাদের কয়েকজনের আর একটি গ্রুপ তৈরি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। পরস্পর যোগাযোগ রেখে কাজ করার জন্য বিভিন্ন নির্দেশনা দিলেন। তারপর আমরা বেলকুচি থানার একটি অজপাড়াগাঁয়ে শেল্টার নেওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ঐ রাতে কমান্ডার স্যার আমাদের পাসওয়ার্ড দিয়েছিলেন শাপলা ও জবা।
কল্যাণপুর যুদ্ধ
কল্যাণপুর সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি থানার একটি গ্রাম। এই যুদ্ধের নেতৃত্বে ছিলেন গ্রুপ কমান্ডার জনাব এম. এ. মান্নান। তামাই গ্রাম থেকে সারারাত হেঁটে বেলকুচি থানার কল্যাণপুর নামক গ্রামে কয়েকটি বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। নভেম্বর ’৭১ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে গ্রামের নেতৃস্থানীয়রা আমাদের সকালের খাবারের ব্যবস্থা করলেন। আমরা সারারাত নিদ্রাহীন থেকে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। সকালের খাবার খেয়ে প্রকাশ্যে পিটি, প্যারেড করলাম। অস্ত্র পরিষ্কার করলাম। অস্ত্রে পুলথ্রু মারলাম। দুইজন করে করে ডিউটি করতে থাকলাম। অন্যান্যরা ঘুম বা বিশ্রামে থাকলাম। কল্যাণপুর একটি নিভৃত গ্রাম। আমাদের ধারণা ছিল এই গ্রামে পাকি হানাদার ও রাজাকার আসবে না। বেলা ১০টার দিকে সেন্ট্রিরত সহযোদ্ধা রতনকুমার দাস দৌড়ে এসে জানালেন আমাদেরকে ধরার জন্য বেলকুচি থানা থেকে কয়েকজন পাকি হানাদার, মিলিশিয়া ও রাজাকার আসছে। বওড়া গ্রামের মধ্য দিয়ে কল্যাণপুরের দিকে আসতেছিল। দুইজন পাকিস্তানি দালাল পরিচয় গোপন রাখার জন্য গামছা দিয়ে মুখ বেঁধে নিয়ে হানাদার ও রাজাকারদের পথ চিনিয়ে নিয়ে আসছিল। দূর থেকে অনুমান হলো এই দলে ৫ জন মিলিশিয়া ও ৮ জন রাজাকার আছে। আমাদের কমান্ডার যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
আমরা কল্যাণপুর রাস্তার দক্ষিণ ধারে বাংকারের মতো বাঁশঝাড়ের মধ্যে পজিশন নিলাম। বাঁশঝাড়ের সামনে দিয়ে চলা রাস্তা ধরে পাকিস্তানি মিলিশিয়া ও রাজাকারেরা আসছিল। আমাদের রেঞ্জের মধ্যে আসার সাথে সাথে কমান্ডার স্যার কমান্ড ও ফায়ার ওপেন করলেন। এক লাফে হানাদারেরা রাস্তার উত্তর পার্শ্বে পজিশন নিল। ওরাও আমাদেরকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিল। আমরাও একযোগে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে থাকলাম। গোলাগুলির শব্দ পেয়ে আশেপাশে অবস্থানকারী মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ আমাদের সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। এক ঘণ্টার অধিক সময় সম্মুখযুদ্ধ চলছিল। তারপর পাকি হানাদারেরা পিছিয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধে জয়ী হয়ে আমরা বিজয় উল্লাস করেছিলাম। সকল স্তরের মানুষের আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হলো। কয়েকটি বাড়িতে খাওয়াদাওয়া করেছিলাম। তারপর কমান্ডার স্যারের নির্দেশে রবীন্দ্রনাথ বাগচীর কমান্ডাধীন পিড়ারচর, খাসিয়ার চর ও অন্যান্য কয়েকটি গ্রাম হয়ে আমরা কয়েকজন হেঁটে দৌলতপুর গ্রামের সহযোদ্ধা মো. শামসুল হকের বাড়িতে এসে শেল্টার নিয়েছিলাম। কয়েক দিন দৌলতপুর, তেঁতিলিয়া, খুকনী, বাজিয়ারপাড়া, দরগার চর ও অন্যান্য গ্রামে শেল্টার নিয়ে থাকলাম। প্রতিদিন রাতে কমান্ডার পাসওয়ার্ড দিতেন। প্রতিদিন সকালে অস্ত্রে পুলথ্রু মারা হতো ও তেল দেওয়া হতো। প্রতিদিন পাকিস্তানি সৈন্য ক্যাম্প ও রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ করার জন্য গ্রুপ করে করে রেকি করতাম।
ধীতপুর যুদ্ধ
১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর থানার (বর্তমানে উপজেলার) সোনাতনী ইউনিয়নাধীন ধীতপুর নামক স্থানে ওয়াপদা বাঁধে পাকিস্তানি হানাদার সৈন্য ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের একটি যুদ্ধ হয়েছিল। তখন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ছিল দ্বারপ্রান্তে। আমরা প্রতিক্ষণে ভাবছিলাম পরবর্তী সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বেই বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। ২১ নভেম্বর মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথবাহিনী গঠন করা হয়েছিল। ৪ ডিসেম্বর থেকে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনী বিভিন্ন রণাঙ্গনে যৌথভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল। ৬ ডিসেম্বর প্রথমে ভুটান ও পরে ভারত আমাদের বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। সারাদেশের স্বাধীনতাবিরোধীরা দেশ ও বিদেশে পালিয়ে যাওয়া শুরু করেছে। রাজাকারেরা বিভিন্ন ক্যাম্প ছেড়ে অস্ত্রসহ অথবা অস্ত্রবিহীন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করছে। যারা হিন্দুদের মালামাল লুট করে নিয়েছিল তারা লুটের মাল হিন্দুদেরকে ফেরত দিয়ে মিল করছে। স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ মানুষ পরস্পর মিল করছে।
আমাদের গ্রামের একমাত্র রাজাকার ছিল বায়না রাজাকার। সে করশালিকা রাজাকার ক্যাম্পে ভর্তি হয়েছিল। সে আমার খোঁজ পেয়ে তার সাথী আর কয়েকজন রাজাকারকে সাথে নিয়ে এসেছে আত্মসমর্পণ করার পরামর্শ নিতে। ১২ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে যমুনা নদী পার হয়ে এক প্লাটুন পাকিস্তানি সৈন্য মালিপাড়া রাজাকার ক্যাম্পে এসেছে। মালিপাড়া রাজাকার ক্যাম্প থেকে পথ চেনানোর জন্য দুইজন রাজাকারকে সাথে নিয়েছে। ওয়াপদা বাঁধ ধরে পালিয়ে যাচ্ছে। ১২ ডিসেম্বর আমাদের গ্রুপটি ছিল সৈয়দপুর নামক গ্রামের কালা চক্রবর্তী ও আখর হাজীসহ অন্যান্যের বাড়িতে। ১৩ ডিসেম্বর দুপুরের দিকে কয়েকজন যুবক এসে আমাদেরকে পাকিস্তানি সৈন্যদের পালানোর খবর দিল। সংবাদ পেয়ে কৈজুরী গ্রাম থেকে আমরা পাকিস্তানি সৈন্যদের পিছু নিলাম। তখন আমাদের কমান্ডার ছিলেন রবীন্দ্রনাথ বাগচী। কমান্ডারের নির্দেশ ছিল, পাকিস্তানি সৈন্যরা পালিয়ে যাচ্ছে, ওরা আমাদের লোকজনদের কোনো ক্ষতি না করলে আমরা ওদেরকে আক্রমণ করব না। পাকিস্তানি সৈন্যরা ওয়াপদা বাঁধ ধরে বেড়া থানার দিকে যাচ্ছিল। আমরা নিরাপদ দূরত্ব থেকে গোপন পথে ওদেরকে ফলো করে চলছিলাম। পাকিস্তানি সৈন্যরা ছিল ক্ষুধার্ত। ওরা কৈজুরীর এক কৃষকের ক্ষেত থেকে মুলা তুলে খাওয়ার চেষ্টা করল। ওরা ভীষণ ক্রোধী। ধীতপুর গ্রামের কাছে গিয়ে ওরা আমাদেরকে দেখে ফেলল। ওরা আমাদের দিকে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরল। আমরা জাম্প করে ওয়াপদা বাঁধের পশ্চিম পাশে পজিশন নিলাম। ওরাও জাম্প করে বাঁধের পূর্ব পাশে পজিশন নিল। ওরা পজিশন নিয়ে আমাদের ওপর গুলি চালাতে থাকল। আমাদের কমান্ডার রবীন্দ্রনাথ বাগচী ফায়ার ওপেন করলেন এবং আমাদেরকে ফায়ার করার নির্দেশ দিলেন। শুরু হলো গুলি ও পাল্টাগুলি। পাকিস্তানি সৈন্যরা ছিল পেশাদার, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। ওদের সাথে যুদ্ধ করে বিজয়ী হওয়া খুব কঠিন ছিল। ওরা আমাদের ওপর বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে থাকল। কী ভয়াবহ যুদ্ধ! আমার মাথার ওপর দিয়ে চোঁ-চোঁ করে গুলি যাচ্ছে। এ যুদ্ধে পরাজিত হলে ওরা আমাদের সবাইকে নৃশংসভাবে হত্যা করবে। আমাদের গ্রুপ কমান্ডার ছিলেন রবীন্দ্রনাথ বাগচী। তিনি এলএমজি চালাচ্ছিলেন। তাঁর ডান পাশে ছিল আমার অবস্থান। আমার ডান পার্শ্বে ছিল আমার মেজ দাদা সমরেন্দ্রনাথ সান্যাল। আমি থ্রি নট থ্রি রাইফেল চালাচ্ছিলাম। আমার পার্শ্বে অবস্থান নিয়েছিলেন আমার গ্রুপের অন্যান্যরা। আমাদের গ্রুপের ডান পার্শ্বে অবস্থান ছিল বেড়া থানার এস. এম. আমির হোসেনের গ্রুপ। আমাদের যুদ্ধের সংবাদ শুনে শাহজাদপুরের কাদাই বাদলা গ্রামের মো. সিরাজুল ইসলামের গ্রুপ, উল্টাদাব গ্রামের জনাব মো. আব্দুল হাইয়ের গ্রুপ ও অন্যান্য গ্রুপ, বেড়া থানার এস. এম. আমির হোসেনের গ্রুপ, বেলকুচি ও চৌহালী থানার অন্যান্য গ্রুপ এসে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন। গোলাগুলির এক পর্যায়ে আমাদের পক্ষের বেড়ার এস. এম. আমির হোসেনের গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধা বৃশালিকা গ্রামের অধিবাসী ও বেড়া বিবি হাইস্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র জনাব মো. আব্দুল খালেক ও ছেচানিয়া গ্রামের অধিবাসী মো. আমজাদ হোসেন গুলিবিদ্ধ হলেন। দুইটা গুলি এসে আমার হেলমেটে লাগল। আমাদের গ্রুপের ডান পাশেই গুরুতর আহত বীর মুক্তিযোদ্ধা দুইজন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। তাদের গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধারা কেউ কেউ তাদের যন্ত্রণা লাঘবের চেষ্টা করছেন। যুদ্ধও বন্ধ করা যাবে না। যুদ্ধ বন্ধ করলে পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের ধরে ফেলবে। আমি ও অন্যান্যরা সবাই গুলি চালিয়ে যাচ্ছি।
এর মধ্যে অন্ধকার নেমে এলো। পাকিস্তানি সৈন্যরা গুলি করা প্রায় বন্ধ করল। ওদের দেখাদেখি আমরাও গুলি করা বন্ধ করলাম। সারারাত আমরা না খেয়ে পজিশন অবস্থায় থাকলাম। রাতে রাজাকার দুজন মাঝে মাঝে দুই-একটা কভারিং ফায়ার করছে। তাদের গুলির জবাবে আমরাও দুই/একটা করে গুলি করছি। ভোরে আমাদের কমান্ডার ও অন্যান্যরা রাজাকার দুজনকে ঘিরে ধরে সারেন্ডার করালেন। তাদের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে নেওয়া হলো। রাজাকার দুজনের কাছ থেকে জানা গেল, রাত ১২টার দিকে পাকিস্তানি সৈন্যরা ক্রোলিং করে পিছিয়ে এসে রাজাকার দুজনকে কভারিং ফায়ারের নির্দেশ দিয়ে ওয়াপদা বাঁধ ধরে পালিয়ে গেছে। পরে জানা গেল পাকিস্তানি সৈন্যরা ভেড়াকোলা হলদারদের নৌকায় বেড়া নদী পার হয়ে নগরবাড়ী হয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে পালিয়ে গেছে। সকালে দেখা গেল ওয়াপদা বাঁধের ওপর দুইজন সাধারণ মানুষ যুদ্ধের সময়ে গুলি লেগে মারা গেছেন। আমাদের পক্ষের বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হয়েছেন। এস. এম. আমির হোসেন ভাইয়ের গ্রুপের গুরুতর আহত দুজনকে বেড়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। পরে জানা গেছে এস. এম. আমির হোসেন ভাইয়ের গ্রুপের জনাব মো. আব্দুল খালেক ও মো. আমজাদ হোসেন দুইজনই শহীদ হয়েছেন।
ধীতপুর যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে আমাদের গ্রুপ জামিরতা হাইস্কুলে ক্যাম্প করে আশ্রয় নিলাম। ঐ দিনই অর্থাৎ ১৪ ডিসেম্বর শাহজাদপুর থানা হানাদারমুক্ত হলো। ১৬ ডিসেম্বর ’৭১ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দানে) বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা একানব্বই হাজারাধিক পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের সহযোগী অন্যান্যের পক্ষে জেনারেল নিয়াজী কিছু পাকিস্তানি আর্মি অফিসার নিয়ে নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। ১৭ ডিসেম্বর ’৭১ ভারতীয় হেলিকপ্টারে আমাদের যৌথবাহিনীর ঊর্ধ্বতন অফিসার ও অন্যান্যরা কয়েকটি বিমান নিয়ে বাংলাদেশের আকাশপথে ঘুরে যুদ্ধোত্তর স্বাধীন বাংলাদেশের অবস্থা দেখেছিলেন। একটি বিমান গুলি আমাদের জামিরতা হাইস্কুল ক্যাম্পের ওপর দিয়ে গিয়েছিল। হানাদারমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ পেলাম। ২৪ জানুয়ারি ১৯৭২ সোমবার সিরাজগঞ্জ সদরস্থ ইব্রাহিম বিহারীর বাসায় স্থাপিত অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা নেওয়া ক্যাম্পে অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দিয়ে আমার মুক্তিযুদ্ধের দায়িত্ব শেষ করেছিলাম। ·
সম্পাদকীয় নোট : দেবেশ চন্দ্র সান্যাল একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার হাবিবুল্লাহ নগর ইউনিয়নাধীন রতনকান্দি গ্রামের বাসিন্দা। তার ভাষারীতি পরিবর্তন করা হয়নি। শুধু বানান সংশোধন করা হয়েছে। লেখকের মোবাইল নং: ০১৭১৩৭৪১৬৮৬। ইমেইল: debesh00007@gmail.com

0 মন্তব্যসমূহ