
Painting : Cira Bhang, France
ঝরা সৈয়দ
ছোটগল্প বদলায় খুব নীরবে। কোনো এক সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা দেখি না, পুরোনো গল্প শেষ হয়ে নতুন গল্প শুরু হয়েছে। বরং এক লেখকের হাতে একটু বদলায়, আরেকজন এসে সেই বদলকে আরও দূরে নিয়ে যান। কোথাও ঘটনা কমে আসে, কোথাও চরিত্রের মন বড় হয়ে ওঠে, কোথাও শেষের চমক সরে গিয়ে জায়গা নেয় অনিশ্চয়তা, কোথাও বাস্তবের মধ্যে ঢুকে পড়ে অসম্ভব কিছু। আবার বহুদিনের পুরোনো কোনো কৌশলও নতুন রূপে ফিরে আসে। ফলে আজকের ছোটগল্পকে বুঝতে হলে শুধু আজকের কয়েকজন লেখক পড়লেই হয় না। দেখতে হয় তার পেছনের পথটাও। কোথা থেকে সে এসেছে, কোন কোন বাঁক নিয়েছে, আর এখন কেন এত রকম গল্প পাশাপাশি লেখা হচ্ছে।
একসময় গল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ঘটনা। কেউ কোথাও গেল, বিপদে পড়ল, ভালোবাসল, প্রতারিত হলো, কোনো রহস্যের মুখোমুখি হলো, তারপর সেই ঘটনার একটা পরিণতি এল। লোককথা, রূপকথা, পঞ্চতন্ত্র, আরব্য রজনী থেকে শুরু করে বহু পুরোনো কাহিনিতে এই টানটাই প্রধান। পাঠক জানতে চাইত, তারপর কী হলো। এখনও আমরা গল্প পড়ার সময় এই প্রশ্ন করি। কিন্তু আধুনিক ছোটগল্পের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, “তারপর কী হলো” প্রশ্নটির পাশে ধীরে ধীরে আরও অনেক প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছে। কেন এমন হলো? মানুষটি ভেতরে কী অনুভব করল? সে যা বলছে, তা কি পুরো সত্য? একই ঘটনাকে অন্য কেউ দেখলে কেমন দেখত? গল্প যে জায়গায় থামল, সেখানেই কি সত্যিই তার শেষ?
রোমান্টিক যুগে সাহিত্য মানুষের যুক্তির বাইরের জগতের দিকে নতুন চোখে তাকাতে শুরু করেছিল। প্রকৃতি, ভয়, স্বপ্ন, মৃত্যু, রহস্য, উন্মাদনা, অতিপ্রাকৃত—এসবের মধ্যে দিয়ে মানুষের এমন এক দিক প্রকাশ পেল, যাকে কেবল যুক্তি দিয়ে বোঝা যায় না। এডগার অ্যালান পো এই পথের এক বড় নাম। তিনি বুঝেছিলেন, ছোটগল্পের জায়গা কম বলে তাকে দুর্বল হতে হবে না। বরং প্রতিটি শব্দ, দৃশ্য, পরিবেশ, শব্দের পুনরাবৃত্তি—সব মিলিয়ে পাঠকের মনে নির্দিষ্ট একটা চাপ তৈরি করা যায়। তাঁর গল্পে ঘটনা আছে, কিন্তু সেই ঘটনার পাশে মানুষের অপরাধবোধ, আতঙ্ক, বিভ্রমও আছে। এখান থেকেই আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক গল্পের একটা বড় পথ খুলে যায়।
তারপর বাস্তববাদ গল্পকে সাধারণ মানুষের জীবনের কাছে নিয়ে এল। ঘরের ভেতর, বাজারে, অফিসে, গ্রামের রাস্তায়, মধ্যবিত্তের সংসারে, দরিদ্রের জীবনে গল্পের বিষয় পাওয়া গেল। গি দ্য মোপাসাঁ দেখালেন, খুব সাধারণ ঘটনা থেকেও শক্ত গল্প তৈরি হয়, যদি তার মধ্যে মানুষের লোভ, সামাজিক ভান, আকাঙ্ক্ষা, অপমান বা ভুল সিদ্ধান্ত ধরা পড়ে। তাঁর গল্পে ঘটনার শুরু ও শেষ দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। গল্প এগোয় একটি পরিণতির দিকে।
ও. হেনরি এই পরিণতিনির্ভর গল্পকে আরও জনপ্রিয় করে তুললেন। তাঁর গল্পে শেষের মোচড় পাঠকের আনন্দের বড় জায়গা। সব তথ্য সামনে ছিল, কিন্তু পাঠক সেগুলোকে একভাবে পড়েছেন; শেষে এসে দেখা গেল, তার মানে আরেক রকম। এই ধারার উত্তরাধিকার আজও আছে। রহস্যগল্প, অপরাধকাহিনি, হরর, থ্রিলার, এমনকি রোয়াল্ড ডালের গল্পেও এই নির্মাণ দেখা যায়। The Landlady-তে যেমন ডাল সরাসরি বলেন না বাড়িওয়ালি কী করছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এত সূত্র জড়ো হয় যে পাঠক নিজেই ভয়ংকর সত্যের সামনে এসে দাঁড়ায়।
কিন্তু ছোটগল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে গভীর বদলগুলোর একটি ঘটালেন আন্তন চেখভ। তিনি গল্পকে যেন জীবনের আরও কাছে নিয়ে এলেন। জীবনে কি সব সমস্যার সমাধান হয়? সব সম্পর্ক কি কোনো স্পষ্ট জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়? সব মানুষ কি নিজের ভুল বুঝে বদলে যায়? চেখভ দেখলেন, না। তাহলে গল্পকেই বা সব হিসাব মেলাতে হবে কেন?
চেখভের পর ছোটগল্পে একটি বড় স্বাধীনতা এল। গল্পের শেষ মানেই আর সব দরজা বন্ধ করে দেওয়া নয়। এখান থেকেই আজকের গল্পের প্রথম বড় বৈশিষ্ট্যে আসা যায়।
খোলা সমাপ্তি। এর একটি চমৎকার উদাহরণ চেখভের “The Lady with the Dog”। গুরভ ও আন্নার সম্পর্ক সামাজিকভাবে অসম্ভব এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়। গল্পের শেষে তারা বুঝতে পারে, তাদের জীবনের আসল জটিলতা তো এখনই শুরু। চেখভ চাইলে বলতে পারতেন এরপর কী হলো। তারা পালাল কি না, আলাদা হলো কি না, সংসার ভাঙল কি না। তিনি বলেন না। কারণ গল্পের আসল বিষয় ভবিষ্যতের ঘটনাগুলো নয়; দুজন মানুষ যে জায়গায় এসে নিজেদের জীবনকে আর আগের মতো দেখতে পারছে না, সেটাই। ফলে গল্প শেষ হয়, কিন্তু জীবন শেষ হয় না। ভালো খোলা সমাপ্তি এমনই। লেখক জানেন কোথায় থামতে হবে।
খোলা সমাপ্তির পাশে আছে দ্ব্যর্থতা ও অনিশ্চয়তা। হুলিও কোর্তাসারের “House Taken Over” পড়লে বিষয়টি খুব সহজে বোঝা যায়। এক ভাই ও বোন তাদের পুরোনো বিশাল বাড়িতে থাকে। ধীরে ধীরে বাড়ির একের পর এক অংশ যেন অদৃশ্য কিছু দখল করে নেয়। কী দখল করছে? ভূত? রাজনৈতিক কোনো ভয়? অতীত? সামাজিক পরিবর্তন? চরিত্রের মানসিক অবস্থা? কোর্তাসার কোনো উত্তর দেন না। কিন্তু গল্প অস্পষ্ট নয়। ঘটনা পরিষ্কার। অনিশ্চিত শুধু তার অর্থ। এই পার্থক্যটি জরুরি। ভালো দ্ব্যর্থতার গল্পে পাঠক কিছুই বুঝতে পারেন না এমন নয়; বরং তিনি একাধিক অর্থ দেখতে পান।
সমকালীন গল্পের আরেক বড় জায়গা মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা। অ্যালিস মুনরোর “Runaway” এ ক্ষেত্রে প্রায় আদর্শ উদাহরণ। কার্লা তার স্বামী ক্লার্ককে ছেড়ে পালাতে চায়। সুযোগও আসে। কিন্তু সে ফিরে যায়। কেন? ভয়? ভালোবাসা? অভ্যাস? নির্ভরতা? নিজের সিদ্ধান্তে আস্থার অভাব? কোনো একক উত্তর যথেষ্ট নয়। এই কারণেই চরিত্রটি জীবন্ত। বাস্তব মানুষ যেমন একটিমাত্র কারণ দিয়ে চলে না, মুনরোর মানুষও তেমন। পুরোনো গল্পে চরিত্রের কাজের কারণ অনেক সময় স্পষ্ট করে দেওয়া হতো। আজকের ভালো গল্পে মানুষকে বোঝা কঠিন হয়ে উঠেছে, কারণ মানুষ নিজেকেই সব সময় পুরো বোঝে না।
এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে না-বলা কথার গুরুত্ব। হেমিংওয়ের “Hills Like White Elephants”-এ একজন পুরুষ ও একজন নারী রেলস্টেশনে বসে কথা বলছে। তারা একটি “operation”-এর কথা বলে, কিন্তু “abortion” শব্দটি উচ্চারণ করে না। অথচ কথোপকথনের প্রতিটি বাঁক, পুরুষটির আশ্বাস, নারীর দ্বিধা, বারবার একই কথায় ফিরে যাওয়া—সব মিলিয়ে পাঠক বুঝতে পারে কী নিয়ে কথা হচ্ছে। আরও বড় কথা, আমরা বুঝতে পারি সম্পর্কটির ভেতরে ক্ষমতার ভার কোথায়। যা বলা হয়নি, সেটাই গল্পের সবচেয়ে ভারী অংশ। আধুনিক ছোটগল্প এই নীরবতার ভাষা খুব ভালোভাবে শিখেছে।
কিন্তু চরিত্র সব সময় বড় স্বীকারোক্তিতে ধরা পড়ে না। ছোট আচরণেও চরিত্রের ভেতর খুলে যায়। ক্লেয়ার কিগানের “So Late in the Day”-এ একটি ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের গল্প বলা হয়। পুরুষটির বড় কোনো অপরাধ প্রথমেই আমাদের সামনে রাখা হয় না। সে কীভাবে টাকা নিয়ে ভাবে, খাবার নিয়ে ভাবে, সংসারের কাজ নিয়ে ভাবে, নারীর কাছ থেকে কী আশা করে, নিজের সুবিধাকে কত স্বাভাবিক মনে করে—এই ছোট ছোট আচরণ জমতে জমতে মানুষটিকে চিনিয়ে দেয়। কিগান পাঠককে বলেন না, “এই লোকটি স্বার্থপর।” তিনি তার কাজ দেখান। পাঠক নিজেই সিদ্ধান্তে পৌঁছান। আজকের গল্পে এই বিশ্বাসটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পাঠককে সব বুঝিয়ে দিতে হবে না।
দৈনন্দিন ছোট ঘটনার মধ্যে বড় অর্থ খুঁজে পাওয়ার ক্ষমতাও আধুনিক ছোটগল্পের বড় সম্পদ। রেমন্ড কারভারের “Cathedral”-এ কী ঘটে? এক অন্ধ মানুষ এক দম্পতির বাড়িতে আসে। তারা খায়, কথা বলে, টেলিভিশন দেখে। শেষে অন্ধ মানুষটির সঙ্গে গল্পের কথক একটি ক্যাথেড্রালের ছবি আঁকে। বাইরে থেকে খুব সামান্য ঘটনা। কিন্তু সেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একজন সংকীর্ণ, ঈর্ষাপরায়ণ, নিজের মধ্যে বন্ধ মানুষ প্রথমবার অন্যভাবে “দেখার” অভিজ্ঞতা পায়। ছোটগল্পের সৌন্দর্য এখানেই। পৃথিবী ধ্বংস না হলেও মানুষের ভেতরে একটা দরজা খুলতে পারে।
আর তাই আজকের গল্পে শেষের চমকের বদলে উপলব্ধি খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জেমস জয়েসের “Araby” এর সুন্দর উদাহরণ। একটি কিশোর ভালোবাসার আবেশে আরাবি নামের মেলায় যায়। তার মনে এক রোমান্টিক জগৎ তৈরি হয়েছে। সেখানে গিয়ে সে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়, তা কোনো ও. হেনরি-সুলভ চমক নয়। হঠাৎ সে নিজের আকাঙ্ক্ষা, অহং, কল্পনা এবং বাস্তবতার ফারাক বুঝতে পারে। ঘটনাটি ছোট, কিন্তু নিজের দিকে তাকানোর চোখ বদলে যায়। আজকের অনেক গল্পের শেষ এমন। নতুন কোনো তথ্য নয়, নতুন দৃষ্টি।
কম ব্যাখ্যা, বেশি ইঙ্গিত দেওয়ার শক্তি বোঝার জন্য অ্যামি হেম্পেলের “In the Cemetery Where Al Jolson Is Buried” পড়া যায়। একজন নারী তার মৃত্যুপথযাত্রী বন্ধুর কাছে যায়। আমরা বুঝি বন্ধুত্ব আছে, ভয় আছে, অপরাধবোধও আছে। কিন্তু লেখক বসে বসে ব্যাখ্যা করেন না কে কাকে কতটা ভালোবাসে বা কেন কেউ পালাতে চায়। ছোট ঘটনা, স্মৃতির খণ্ড, অদ্ভুত কথা, নীরবতা—এসব মিলিয়ে আবেগ তৈরি হয়। পাঠককে অনুভূতির নাম বলে দেওয়া হয় না। ফলে আবেগটা আরও সত্যি লাগে।
এখান থেকেই আসে পাঠকের সক্রিয় অংশগ্রহণ। হোর্হে লুইস বোর্হেসের “The Garden of Forking Paths”-এ পাঠককে শুধু কাহিনি অনুসরণ করলেই চলে না। সময়, সম্ভাবনা, বই, গোলকধাঁধা, ইতিহাস—সব একসঙ্গে ভাবতে হয়। একটি সিদ্ধান্তের বদলে যদি সব সম্ভাব্য সিদ্ধান্তই কোথাও ঘটতে থাকে? গল্প তখন শুধু “কী ঘটল” বলছে না; পাঠককে নিজের মাথায় গল্পের কাঠামোও তৈরি করতে হচ্ছে। সমকালীন ছোটগল্পের বড় অংশে পাঠকের এই কাজ বেড়েছে। লেখক আর সব সংযোগ তৈরি করে হাতে তুলে দেন না।
আজকের গল্পের মানুষও আর সহজে ভালো বা খারাপ দুই দলে ভাগ হয় না। নৈতিক অনিশ্চয়তা তার বড় বৈশিষ্ট্য। জর্জ সন্ডার্সের “Escape from Spiderhead”-এ অপরাধীদের ওপর ওষুধের পরীক্ষা চালানো হয়। তারা অপরাধ করেছে, ফলে পাঠক প্রথমে হয়তো ভাবে, তাদের প্রতি সহানুভূতি কতটা হওয়া উচিত? কিন্তু বিজ্ঞানী যখন তাদের শরীর ও ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন প্রশ্ন বদলে যায়। অপরাধী মানুষেরও কি অধিকার আছে? শাস্তির নামে কতটা করা যায়? বিজ্ঞান কি নৈতিকতার বাইরে? একটিমাত্র সহজ উত্তর নেই। গল্প পাঠককে অস্বস্তির মধ্যে রাখে।
স্মৃতি ও সময়ের ভাঙাচোরা চলন বোঝার জন্য লরেন গ্রফের “The Midnight Zone” মনে রাখা যায়। দুর্ঘটনার পর এক নারীর চেতনা, মাতৃত্ব, ভয়, অতীত, বর্তমান একে অন্যের মধ্যে ঢুকে পড়ে। সময় আর ঘড়ির কাঁটার মতো চলে না। সংকটের মুহূর্তে মানুষের মনও তো এভাবে চলে। কখনো বর্তমানের মধ্যে বহু বছর আগের দৃশ্য ঢুকে পড়ে, কখনো একটি শব্দে শিশুকালের স্মৃতি ফিরে আসে। আধুনিক গল্প বুঝেছে, মানুষের সময় আর ক্যালেন্ডারের সময় এক নয়।
এরপর আসে অবিশ্বাসযোগ্য কথক। শার্লট পারকিন্স গিলম্যানের “The Yellow Wallpaper” পুরোনো হলেও আজকের গল্প বোঝার জন্য এখনও অসাধারণ উদাহরণ। একজন নারী নিজেই তার অভিজ্ঞতা লিখছে। ধীরে ধীরে তার মানসিক অবস্থা বদলে যাচ্ছে। দেয়ালের হলুদ নকশায় সে নারীর অবয়ব দেখতে পায়। পাঠক বুঝতে পারে, তার দেখা সবকিছু বাইরের বাস্তব নয়। কিন্তু একই সঙ্গে তার বন্দিত্ব, স্বামীর নিয়ন্ত্রণ, নিজের শরীর ও মনের ওপর অধিকার হারানোর অভিজ্ঞতা একেবারেই সত্য। ফলে কথকের কথা “মিথ্যা” নয়; বরং তার সত্য আর বাইরের সত্য এক নয়। অবিশ্বাসযোগ্য কথক মানে তাই শুধু মিথ্যাবাদী কথক নয়।
একই সঙ্গে আজকের গল্প বারবার মনে করিয়ে দেয়, একই ঘটনার একাধিক অর্থ থাকতে পারে। আকুতাগাওয়া রিউনোসুকের “In a Grove”-এ একটি হত্যা ও সম্ভাব্য ধর্ষণের ঘটনা বিভিন্ন মানুষ বিভিন্নভাবে বর্ণনা করে। প্রত্যেকের গল্প আলাদা। এমনকি মৃত মানুষটির বয়ানও আসে। কিন্তু কোনটি সত্য? কোনো চূড়ান্ত উত্তর নেই। এই গল্পের গুরুত্ব আজ আরও বেড়েছে। আমরা জানি, স্মৃতি নির্ভুল নয়, মানুষ নিজের স্বার্থে ঘটনাকে বদলে মনে রাখে, নিজের লজ্জা ঢাকে, নিজের সম্মান রক্ষা করে। ফলে সত্য শুধু তথ্যের ব্যাপার নয়; কে বলছে, কেন বলছে, সেটাও জরুরি।
সমকালীন ছোটগল্পের আরেকটি লক্ষণ সংযত ও মিতব্যয়ী গদ্য। রেমন্ড কারভারের “Popular Mechanics” গল্পটি খুব ছোট। স্বামী-স্ত্রী আলাদা হচ্ছে। শিশুকে কে নেবে, তা নিয়ে টানাটানি শুরু হয়। ভাষা প্রায় শুষ্ক। লেখক আবেগের বড় শব্দ ব্যবহার করেন না। কিন্তু যত কম বলেন, দৃশ্য তত ভয়ংকর হয়। সংযম মানে আবেগ নেই তা নয়। বরং লেখক আবেগ পাঠকের ওপর চাপিয়ে দেন না। দৃশ্যটিই তার কাজ করে।
এর কাছাকাছি, কিন্তু আলাদা আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো ঘটনাকে ছোট রেখে অর্থকে বড় করা। ঝুম্পা লাহিড়ির “A Temporary Matter”-এ কয়েক রাত বিদ্যুৎ বন্ধ থাকবে। অন্ধকারে বসে এক দম্পতি ঠিক করে, তারা প্রতিদিন একে অন্যকে একটি গোপন কথা বলবে। ঘটনাটি খুব ছোট। কিন্তু সেই কয়েক রাতের ভেতর দিয়ে তাদের সন্তানহারা শোক, দাম্পত্যের দূরত্ব, অপরাধবোধ, ভালোবাসা, বিচ্ছেদের পুরো ইতিহাস খুলে যায়। গল্পের সময় কয়েক দিন, কিন্তু তার ভেতরের সময় কয়েক বছর। ছোটগল্পের ঘনত্ব বলতে এটিই বোঝায়।
আধুনিক ও সমকালীন গল্পের আরেক বড় পথ তৈরি হয়েছে বাস্তব ও অবাস্তবের মিশ্রণে। অ্যাইমি বেন্ডারের “The Rememberer”-এ একজন নারীর প্রেমিক বিবর্তনের উল্টো পথে যেতে থাকে। মানুষ থেকে ক্রমে আরও আদিম প্রাণীতে ফিরে যায়। ঘটনাটি বাস্তবে অসম্ভব। কিন্তু বিচ্ছেদ, কাউকে হারিয়ে ফেলা, ভালোবাসার মানুষটি ধীরে ধীরে আর আগের মানুষ না থাকা—এই অনুভূতিগুলো খুবই বাস্তব। অসম্ভব ঘটনাটি তাই কল্পনার খেলা নয়, আবেগের সত্যকে দৃশ্যমান করার উপায়।
আরও এক ধাপ এগোলে দেখি ম্যাজিক রিয়ালিজম, হরর, ফ্যান্টাসি ও বাস্তববাদ একে অন্যের সঙ্গে মিশছে। কারেন রাসেলের “The Prospectors”-এ দুই তরুণী এমন এক জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে বাস্তবতার নিয়ম ধীরে ধীরে বদলে যায়। ভূতের গল্পের আবহ আছে, ঐতিহাসিক বাস্তবতা আছে, মানুষের লোভ আছে, বন্ধুত্ব আছে। গল্পকে শুধু ghost story বললে কম বলা হয়, আবার শুধু literary realism বললেও চলে না। আজকের অনেক গল্প এই মাঝামাঝি জায়গাতেই বাস করে।
এ থেকেই আসে আরও বড় পরিবর্তন, ঘরানার সীমানা ভেঙে যাওয়া। কারমেন মারিয়া মাচাদোর “The Husband Stitch” কি হরর? লোককথা? দাম্পত্যের গল্প? নারীর শরীর ও স্বাধীনতার গল্প? যৌনতার গল্প? সবই। পুরোনো urban legend-এর একটি রহস্যময় ফিতা নিয়ে তিনি এমন গল্প বানান, যেখানে বিবাহ, পুরুষের অধিকারবোধ, নারীর শরীর, ভালোবাসা, ভয় সব একসঙ্গে কাজ করে। গল্পকে একটি বাক্সে ঢোকাতে গেলেই তার কিছু অংশ বাইরে পড়ে যায়। সমকালীন ছোটগল্পের বড় স্বাধীনতা এইখানে।
শুধু বিষয় নয়, গল্পের রূপ নিয়েও পরীক্ষা চলছে। জেনিফার এগানের “Black Box” প্রচলিত অনুচ্ছেদের গল্পের মতো তৈরি নয়। ছোট ছোট বাক্য, প্রায় নির্দেশিকা বা ডিজিটাল বার্তার মতো অংশ দিয়ে গল্প এগোয়। গুপ্তচরবৃত্তি, প্রযুক্তি, শরীর, নজরদারি সব মিলিয়ে তার রূপটাই বিষয়টির সঙ্গে জুড়ে যায়। গল্প যদি প্রযুক্তির যুগ নিয়ে হয়, তবে তার শরীরও কেন উনিশ শতকের গল্পের মতোই থাকবে? এই প্রশ্ন সমকালীন লেখকেরা করছেন।
এর সঙ্গে আছে খণ্ডিত নির্মাণ। টিম ও’ব্রায়েনের “The Things They Carried”-এ সৈনিকেরা কী কী জিনিস বহন করছে তার তালিকা দিয়ে গল্প এগোয়। অস্ত্র, খাবার, চিঠি, ভয়, প্রেম, অপরাধবোধ, মৃত বন্ধুর স্মৃতি—সব একসঙ্গে বহন করছে তারা। গল্প সোজা শুরু-মাঝ-শেষের পথে চলে না। তালিকা, স্মৃতি, ঘটনা, পুনরাবৃত্তি মিলে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। যুদ্ধের স্মৃতি নিজেই যখন ছিন্নভিন্ন, গল্পের গঠনও সোজা হওয়া কেন জরুরি?
আজকের গল্পে ব্যক্তিগত জীবনের ভেতরে সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা খুব গভীরভাবে ঢুকে থাকে। ইয়িউন লির “A Thousand Years of Good Prayers”-এ ওপর থেকে দেখলে বাবা ও মেয়ের গল্প। বৃদ্ধ বাবা চীন থেকে আমেরিকায় মেয়ের কাছে এসেছেন। কিন্তু তাদের নীরবতার মধ্যে দেশ, রাজনৈতিক ইতিহাস, ভাষা, অভিবাসন, প্রজন্মের দূরত্ব সব ঢুকে আছে। গল্প আলাদা করে বক্তৃতা দেয় না চীন বা আমেরিকা নিয়ে। রাজনীতি চরিত্রের জীবনের মধ্যে আছে। ভালো সমকালীন গল্প প্রায়ই এভাবেই বড় ইতিহাসকে ছোট ব্যক্তিগত মুহূর্তে ধরে।
আর এসেছে নতুন সময়ের নতুন বিষয়। টেড চিয়াংয়ের “The Truth of Fact, the Truth of Feeling”-এ প্রযুক্তি মানুষের স্মৃতিকে নিখুঁতভাবে ধরে রাখলে কী হবে, সেই প্রশ্ন আসে। আমরা অনেক কিছু ভুলে যাই, নিজের সুবিধামতো মনে রাখি। কিন্তু যদি প্রযুক্তি দেখিয়ে দেয় ঠিক কী ঘটেছিল? তখন পরিবার, ক্ষমা, আত্মপরিচয়, স্মৃতি—সব বদলে যাবে না? প্রযুক্তি এখানে শুধু যন্ত্র নয়; মানুষ হওয়ার মানেটাকেই প্রশ্ন করে। আজকের গল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নজরদারি, জলবায়ু, অনলাইন পরিচয়, জৈবপ্রযুক্তি, নতুন কাজের ধরন—এসব তাই শুধু পটভূমি নয়, মানুষের নতুন অভিজ্ঞতার অংশ।
একই সময়ে পুরোনো জিনিসও ফিরে এসেছে। তবে আগের মতো নয়। পুরোনো মিথ, লোককথা ও রূপকথার নতুন ব্যবহার আজ খুব শক্তিশালী। অ্যাঞ্জেলা কার্টারের “The Bloody Chamber” পুরোনো Bluebeard কাহিনিকে নতুন করে লেখে। পুরোনো গল্পে নারী প্রায়ই বিপদের মধ্যে আটকে থাকা চরিত্র; কার্টার সেই গল্পের ভেতরে নারী-ইচ্ছা, যৌনতা, সহিংসতা, পুরুষের ক্ষমতা নতুনভাবে দেখেন। সমকালীন গল্পকারেরা পুরোনো কাহিনি শুধু আবার বলেন না, প্রশ্ন করেন: গল্পটা যদি নারীর চোখে বলা হতো? পরাজিতের চোখে? উপনিবেশিত মানুষের চোখে? দানবের চোখে?
সবশেষে আসে এমন এক বৈশিষ্ট্য, যেটা আলাদা করে মাপা কঠিন, অথচ বড় গল্প চিনতে গেলে খুব দরকার। গল্প শেষ হওয়ার পরও তার কাজ চলতে থাকা। শার্লি জ্যাকসনের “The Lottery” এর ভালো উদাহরণ। একটি গ্রামের মানুষ প্রতি বছর একটা লটারির আয়োজন করে। প্রথমে সবকিছু স্বাভাবিক, প্রায় উৎসবের মতো। শেষে দেখা যায় সেই প্রথার ভয়ংকর রূপ। কিন্তু গল্পের শক্তি শুধু শেষের সহিংসতায় নয়। পড়া শেষ হওয়ার পর প্রশ্ন থেকে যায়: মানুষ কেন শুধু পুরোনো বলে কোনো প্রথা মানে? সবাই মেনে চলছে বলেই কি নিষ্ঠুরতা স্বাভাবিক হয়ে যায়? আমরা নিজের সমাজে এমন কিছু করছি না তো? গল্প শেষ হয়, কিন্তু প্রশ্নগুলো পাঠকের সঙ্গে থেকে যায়।
---------------------------------------আজকের ছোটগল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্যখোলা সমাপ্তি — গল্প থামে, কিন্তু সব প্রশ্নের উত্তর মেলে না।দ্ব্যর্থতা ও অনিশ্চয়তা — একটি ঘটনার একাধিক অর্থ বা ব্যাখ্যা থাকতে পারে।মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা — বাইরে কী ঘটল তার পাশাপাশি মানুষের ভেতরে কী ঘটছে, সেটিও বড় বিষয়।না-বলা কথার গুরুত্ব — চরিত্র যা বলে না, অনেক সময় সেটাই গল্পের সবচেয়ে জরুরি অংশ।ছোট আচরণে চরিত্র প্রকাশ — দৃষ্টি সরানো, কথা থামিয়ে দেওয়া, উত্তর না দেওয়া, ছোট সিদ্ধান্তের মধ্যেই চরিত্র বেরিয়ে আসে।দৈনন্দিন ছোট ঘটনার ভেতরে বড় অর্থ — একটি খাবার, একটি সফর, একটি বিকেল বা একটি কথোপকথন থেকে পুরো জীবনের আভাস পাওয়া যায়।শেষের চমকের বদলে উপলব্ধি — সব সময় নতুন ঘটনা এসে চমক দেয় না; অনেক সময় পুরোনো ঘটনাকেই নতুনভাবে দেখতে শেখায় শেষটা।কম ব্যাখ্যা, বেশি ইঙ্গিত — লেখক সবকিছু বুঝিয়ে না বলে কিছু সূত্র রেখে দেন।পাঠকের সক্রিয় অংশগ্রহণ — গল্পের ফাঁক পূরণ করা, না-বলা কথা বোঝা, বিভিন্ন সূত্র জোড়া লাগানোর কাজ পাঠককেও করতে হয়।নৈতিক অনিশ্চয়তা — চরিত্রকে সহজে ভালো বা খারাপ বলে ভাগ করা যায় না।স্মৃতি ও সময়ের ভাঙাচোরা চলন — অতীত, বর্তমান, স্মৃতি ও ভবিষ্যৎ সোজা পথে না-ও চলতে পারে।অবিশ্বাসযোগ্য কথক — যে গল্প বলছে, তার কথাই পুরো সত্য কি না, সে প্রশ্ন থেকে যায়।একই ঘটনার একাধিক অর্থ — একই সম্পর্ক বা ঘটনার মানে ভিন্ন মানুষের কাছে ভিন্ন হতে পারে।সংযত ও মিতব্যয়ী গদ্য — অল্প কথায় অনেক কিছু বোঝানোর চেষ্টা থাকে।ঘটনাকে ছোট রেখে অর্থকে বড় করা — বাইরে সামান্য ঘটনা, কিন্তু তার পেছনে একটি সম্পর্ক, পরিবার বা পুরো জীবনের চাপ থাকতে পারে।বাস্তব ও অবাস্তবের মিশ্রণ — অদ্ভুত বা অসম্ভব ঘটনা বাস্তব জীবনের মধ্যেই এসে পড়ে।ম্যাজিক রিয়ালিজম, হরর, ফ্যান্টাসি ও বাস্তববাদের মেলবন্ধন — একটি গল্প একাধিক ধারার কৌশল একসঙ্গে নিতে পারে।ঘরানার সীমানা ভেঙে যাওয়া — গল্পকে এক নামে চেনা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।গল্পের রূপ নিয়ে পরীক্ষা — তালিকা, ই-মেইল, রিপোর্ট, নোট, কথোপকথন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টও গল্পের কাঠামো হতে পারে।খণ্ডিত নির্মাণ — গল্প সব সময় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সোজা পথে যায় না; স্মৃতি ও দৃশ্য টুকরো টুকরোভাবে আসতে পারে।ব্যক্তিগত জীবনের ভেতরে সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা — শ্রেণি, রাষ্ট্র, যুদ্ধ, ক্ষমতা, বর্ণ বা ইতিহাস চরিত্রের ব্যক্তিগত জীবনের ভেতর দিয়ে প্রকাশ পায়।নতুন সময়ের নতুন বিষয় — প্রযুক্তি, অনলাইন জীবন, একাকিত্ব, অভিবাসন, শরীর, পরিচয়, জলবায়ু, পরিবেশ, কাজের অনিশ্চয়তা গল্পে আরও বেশি জায়গা নিচ্ছে।পুরোনো মিথ, লোককথা ও রূপকথার নতুন ব্যবহার — পরিচিত পুরোনো গল্পকে নতুন সময়ের প্রশ্ন দিয়ে আবার বলা হচ্ছে।গল্প শেষ হওয়ার পরও তার কাজ চলতে থাকা — বই বন্ধ করার পরও চরিত্র, প্রশ্ন বা কোনো দৃশ্য পাঠকের মনে ফিরে আসে।
এই চব্বিশটি বৈশিষ্ট্য পাশাপাশি রাখলে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়। আজকের ছোটগল্প পুরোনো গল্পকে বাতিল করে তৈরি হয়নি। বরং পুরোনো গল্পের বহু পথ এসে আজ একসঙ্গে মিলেছে। পো-র অন্ধকার মনস্তত্ত্ব আছে। মোপাসাঁর ঘটনা আছে। ও. হেনরির মোচড় আছে। চেখভের অসমাপ্ত জীবন আছে। জয়েসের উপলব্ধি আছে। হেমিংওয়ের নীরবতা আছে। কাফকার অস্বাভাবিকতা আছে। বোর্হেসের গোলকধাঁধা আছে। লাতিন আমেরিকার ম্যাজিক রিয়ালিজম আছে। কারভারের সংযম আছে। এর সঙ্গে নতুন সময়ে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি, জলবায়ু, অভিবাসন, শরীর, পরিচয়, নতুন ধরনের নিঃসঙ্গতা, নতুন ধরনের ক্ষমতা।
তাই আজকের ছোটগল্পকে একটি ঘরানায় বাঁধা যায় না।
একটি গল্প একই সঙ্গে প্রেমের গল্প, হরর, রাজনৈতিক গল্প এবং লোককথা হতে পারে। একটি গল্পের বাইরে প্রায় কিছুই না ঘটলেও চরিত্রের ভেতরে বিশাল পরিবর্তন ঘটতে পারে। আবার প্রচণ্ড ঘটনাবহুল গল্পও হতে পারে গভীর সাহিত্য। কেউ তালিকার ভেতর দিয়ে গল্প লিখছেন, কেউ ই-মেইলে, কেউ টুকরো স্মৃতিতে, কেউ একেবারে পুরোনো সরল বয়ানে। কোনো একটি পথকে এখন আর “আধুনিক” বলে অন্য পথকে পুরোনো বলে ফেলে দেওয়া যায় না।
এটাও মনে রাখা দরকার, খোলা সমাপ্তি মানেই ভালো গল্প নয়। অস্পষ্টতা মানেই গভীরতা নয়। ঘটনা কম মানেই সাহিত্যিক গল্প নয়। প্রচলিত নির্মাণ ভেঙে দিলেই পরীক্ষামূলক গল্প হয় না। সমকালীন গল্পের অনেক দুর্বল লেখাও এসব কৌশলের আড়ালে লুকাতে চায়। কয়েকটি রহস্যময় দৃশ্য, খানিক বিষণ্নতা, চরিত্রের কিছু নীরবতা, তারপর হঠাৎ গল্প শেষ—এতেই বড় গল্প হয় না।
ভালো খোলা সমাপ্তির আগে গল্পের ভেতরে যথেষ্ট চাপ তৈরি হতে হয়। ভালো দ্ব্যর্থতার পেছনে সূত্র থাকতে হয়। না-বলা কথার পেছনে লেখকের জানা কথা থাকতে হয়। খণ্ডিত গঠনেরও একটা ভেতরের নিয়ম থাকে। আর গল্পে বড় ঘটনা না থাকলেও কিছু না কিছু বদলাতে হয়। চরিত্রের চোখ, সম্পর্কের ভার, পাঠকের বোঝা, কোনো কিছুর অর্থ।
এই কারণেই আজকের ছোটগল্প পড়তে পাঠকেরও একটু বেশি কাজ করতে হয়। শুধু ঘটনা অনুসরণ করলেই সব সময় চলে না। দেখতে হয় কে কথা বলছে, কে চুপ করছে, কোন কথাটি দ্বিতীয়বার ফিরে এসেছে, কোনো একটি বস্তু কেন বারবার দেখা যাচ্ছে, কথক নিজেকে যেভাবে দেখছে অন্য চরিত্রও কি তাকে সেভাবে দেখে, ঘটনাগুলো যে ক্রমে বলা হয়েছে তার কারণ কী।
কিন্তু এই কাজের জন্য দুর্বোধ্য ভাষা দরকার নেই। বরং ক্লেয়ার কিগান, ইয়িউন লি, ঝুম্পা লাহিড়ি, অ্যামি হেম্পেল, জেমেল ব্রিঙ্কলি, সামান্তা শোয়েবলিনদের অনেক গল্পের ভাষা খুব পরিষ্কার। বাক্য বোঝা কঠিন নয়। কঠিন হলো মানুষের ভেতরটা। আর সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্যিক গভীরতা শব্দের দুর্বোধ্যতায় নয়, অভিজ্ঞতার গভীরতায়।
তাহলে আজকের ছোটগল্প কোথায় গেছে?
সে এক জায়গায় যায়নি।
সে গেছে মানুষের মনের আরও গভীরে। গেছে বাস্তব আর অবাস্তবের মাঝামাঝি এক অঞ্চলে। ইতিহাস আর ব্যক্তিগত জীবনের ভেতরের যোগ খুঁজেছে। প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়েছে। আবার ফিরে গেছে লোককথা, মিথ আর পুরোনো গল্পের কাছেও। কেউ গল্পের শেষ খুলে দিয়েছেন, কেউ গল্পের শরীর ভেঙেছেন, কেউ পুরোনো শক্ত প্লটের মধ্যেই নতুন মানুষের অভিজ্ঞতা ঢুকিয়েছেন।
কিন্তু এত বদলের পরও ছোটগল্পের পুরোনো প্রশ্নটি রয়ে গেছে।
তারপর কী হলো?
শুধু তার পাশে এখন আরও কয়েকটি প্রশ্ন বসেছে।
মানুষটির ভেতরে কী হলো?
সে যা বলছে, সেটাই কি পুরো সত্য?
যা বলা হলো না, তার মধ্যে কী আছে?
একই ঘটনা অন্য কেউ কীভাবে দেখত?
আর গল্প শেষ হওয়ার পরও যদি একটা দৃশ্য, একটা মানুষ, একটা প্রশ্ন আমাদের মাথায় ফিরে ফিরে আসে, তাহলে কি সত্যিই গল্পটা শেষ হয়েছে?
সম্ভবত আজকের ছোটগল্পের জায়গা ঠিক সেখানেই।
পাতায় তার শেষ আছে। পাঠকের ভেতরে নেই। ·
0 মন্তব্যসমূহ