![]() |
সাম্প্রতিক বাংলা ছোটগল্প কি সময়ের ক্রূর বাস্তবতাকে ধারণ করে ঔপনিবেশিক আধুনিকতার ছাঁচ ভাঙতে পারছে, নাকি চটজলদি প্রতিষ্ঠা আর সস্তা জনপ্রিয়তার পুনরাবৃত্তিতে বন্দি হয়ে পড়ছে? ফর্মের দুরন্ত নিরীক্ষা বনাম প্রস্তুতিহীন আখ্যানচর্চা—এই দ্বৈরথের ভেতর দাঁড়িয়েই আজ নির্ণীত হচ্ছে বাংলা গল্পের বাঁক ও গতিপ্রকৃতি। ‘গল্পপাঠ’-এর শততম সংখ্যাকে সামনে রেখে সাম্প্রতিক বাংলা ছোটগল্পের এই বহুমাত্রিক জমিন, এর শক্তি ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে স্পষ্ট ও নির্মোহ বক্তব্য তুলে ধরেছেন বিশ-একুশ শতকের সাহিত্য ও মননচর্চার বিশিষ্ট গবেষক ও প্রাবন্ধিক পুরুষোত্তম সিংহ। গল্পপাঠের পক্ষ থেকে প্রশ্নগুলো তাঁকে পাঠানো হয়েছিল। তিনি সেগুলোর উত্তর লিখে পাঠিয়েছেন।

গল্পপাঠ:
সাম্প্রতিক বাংলা ছোটগল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি কী বলে আপনার মনে হয়? কেন?
পুরুষোত্তম:
বাংলা গল্পের বৃহত্তর বাঁকবদলই আজকের বাংলা গল্পের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট। হ্যাঁ, সীমাবদ্ধতাও আছে। নিমাই ভট্টাচার্য, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, আশুতোষ মুখোপাধ্যায় সেদিনও ছিলেন, আজও আছেন। সেই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করেই আজকের নবীন-প্রবীণরা মিলে বাংলা গল্পকে ক্রমেই বিশ্বসাহিত্যের অংশ করে তুলতে বদ্ধপরিকর। বাংলা গল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি সমাজবাস্তবতা। সময়ের দুঃসাহসকে সে যৌথভাবে আলিঙ্গন করেছে। বাংলা ভাষার আধুনিকতার সচল খাত প্রবাহিত করার ক্ষেত্রেও আজকের বাংলা গল্প তার দৃঢ় ভূমিকা পালন করে চলেছে। সাহিত্যতত্ত্বের ক্রমবিকশিত রূপ যে সময়ে সময়ে বদলে যায়, নতুন আধুনিকতা পুরাতন আধুনিকতাকে গ্রহণ-প্রত্যাখ্যানের সত্যে সংযোজন-পরিমার্জন-পুনর্নির্মাণের ভূমিকায় যে কেবলই নব্যরূপে প্রবাহিত করে—যা যেকোনো ভাষা-সাহিত্যের সচল খাত জানান দেওয়ার জন্য জরুরি, বাংলা ভাষায় সেই ভূমিকা আজকের ছোটগল্প মুখ্যভাবে পালন করছে। রাষ্ট্রশক্তি যত ব্যভিচারী সত্যে প্রবাহিত, সময় যত বিধ্বংসী, ক্রূর, জীবন যত নরখাদকে পরিণত, ধর্ষণের জ্বালাময় আর্তনাদ যত গাম্ভীর্যময়, সেই তিমিরে বাংলা গল্প তত ডানপিঠে। হ্যাঁ, মেনিমুখো শিশুখাদ্যের তরল নরম ফুল-পাখি-প্রেম-কেচ্ছার গল্পও আছে। সেই সংখ্যাই অধিক। সেই সংখ্যাকে দূরে রেখে বা বাতিল করে দিয়ে প্রকৃত পাঠক বাংলা গল্পের দৃঢ় মেজাজকে বুঝতে সমর্থ হলে বাংলা গল্পের জয়পতাকা ক্রমেই বিশ্বদুয়ারে পৌঁছে যাওয়ার ঔদ্ধত্য রাখে। ফর্ম নিয়ে দুরন্ত পরীক্ষা, পশ্চিমা আধুনিকতাকে প্রতিমুহূর্তে চ্যালেঞ্জ জানানোর দুঃসাহস, দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক সাজসজ্জাকে ভেঙে নতুন আধুনিকতাকে দেখার অভিপ্রায়, অগ্রপথিকের ন্যারেটিভকে প্রতিমুহূর্তেই অতিক্রম করে যাওয়ার সচেতন প্রয়াস বাংলা গল্পের গ্রহণযোগ্যতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করে চলেছে। প্রায় দেড়শো বছরের কাছে পৌঁছে যাওয়া বাংলা গল্পের প্রবাহিত তরঙ্গের নতুন সাজসজ্জা দেখবার মতো।
গল্পপাঠ:
সাম্প্রতিক বাংলা ছোটগল্পের প্রধান দুর্বলতা বা সীমাবদ্ধতা কোথায় দেখছেন?
পুরুষোত্তম:
এই বক্তব্যের অনেকগুলো ছক আছে। প্রথমত সব গল্পকার আমি পড়ি না। গোয়ালা বকনা গরুর চামড়া দেখেই বলে দিতে পারে গরু বিয়োলে কতখানি দুধ দিতে পারে। কৃষক বাড়ন্ত গাছের অঙ্গভঙ্গি দেখেই জানান দিতে পারে ফসল কতখানি হবে। হ্যাঁ, অভিজ্ঞতার কথা বলছিলাম। বাংলা গল্পপাঠের সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে গল্প পড়ার আগেই গল্পের শিরোনাম, অঙ্গভঙ্গি, ফেসবুকে থাকলে কোনো পোস্ট বা মন্তব্য অথবা দুই-তিন-পাঁচটি গল্প পড়লেই কিঞ্চিৎ বোঝা যায়। আজকের দিনে ই-ম্যাগাজিন তো আছেই। বহু লেখকই বাতিল হয়ে যান। অতএব আমার বিবেচনায় দাঁড়াল অপাঠ্য লেখক আর পাঠ্য লেখক। অথবা প্রথম শ্রেণির লেখক, দ্বিতীয়-তৃতীয় শ্রেণির লেখক। প্রথম শ্রেণির লেখক হাতে গোনা। বাংলা গল্পের ধারাবাহিকতা রক্ষায় সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে দ্বিতীয়-তৃতীয় শ্রেণির লেখককেও পড়তে হয়। তারপরও কিছু কথা থাকে।
বাঙালি লেখক এত অধিক পরিমাণে লেখেন যে পুনরাবৃত্তি অবধারিত। কোথাও কোথাও নিছক কাহিনিরই ঘনঘটা, কাহিনিকে যে শিল্পিত করে তুলতে হবে সে প্রয়াস নেই। প্রস্তুতিহীন লেখা। অগ্রজ ও সমসাময়িক লেখা সম্পর্কে অজ্ঞতা। চটজলদি প্রতিষ্ঠা পাওয়ার মোহ। পাড়াকেন্দ্রীক পুরস্কার পাওয়ার লোভ। বছরওয়ারি গ্রন্থপ্রকাশের প্রবণতা। প্রতিনিয়ত লেখা প্রকাশের বাসনা, প্রত্যাখ্যানের ভাষা না জানা। কোনো রাজনৈতিক দর্শন নেই, চেতনাহীনতা, রাষ্ট্রবিরোধিতা ও সুনির্দিষ্ট প্রকরণ অনুপস্থিত। বাঙালি লেখক শুধু লোভী নন, ভীরু। চড়ুই পাখির মতো উড়ুউড়ু তাঁদের মন, এ ডালে ও ডালে। প্রতিষ্ঠা পাওয়ার বাসনায় সব কুড়িয়ে খাওয়ার ভিখারি মনোভাব। বিবেকহীনতা, সাহিত্যহীনতা, সাহিত্যকে না বুঝেই কেবল লেখা প্রকাশের ধান্দায় কতরকম গাঁজাখুরি গপ্পই না সাজান। সুনির্দিষ্ট চেতনা, জীবনবোধ, সাহিত্যিক জ্ঞান ও প্রকরণ ছাড়া কোনোভাবেই যে গল্পকার হওয়া সম্ভব নয়, তা বোঝেনই না। সম্পাদকের অপদার্থতা। গল্প না চেনা, না বোঝার ক্ষমতা, অথচ সম্পাদক হওয়ার বাসনায় লেখা ছাপার খ্যাপাটে মনোভাব। গল্পের ভাষাহীনতা অথবা সুনির্দিষ্ট ভাষিক প্রকরণ গড়তে ব্যর্থতা। কারও কারও লোকাল লেখক/গল্পকার হিসেবে স্বীকৃতি অর্জনের গরিমা। সুনির্দিষ্ট বলয়/ভূগোল/মানচিত্রের মধ্যে গল্পকে সীমাবদ্ধ করে রাখা। আঞ্চলিক বৃত্ত থেকে গল্পকে কোনোভাবেই বের করতে না পারা, অথচ আঞ্চলিকতার সৌন্দর্যে কোনো নন্দনতত্ত্বও অনুপস্থিত। সুদীর্ঘকাল ধরে একই ফর্মে লিখে যাওয়া। অজস্র নাম করা যায়।
গল্পপাঠ:
সাম্প্রতিক বাংলা ছোটগল্পে গল্পকার ও পাঠকের সম্পর্ক কেমন বলে আপনার মনে হয়? গল্পকার কি পাঠককে নিজের মতো করে গল্পটি বুঝে নেওয়ার যথেষ্ট জায়গা দিচ্ছেন?
পুরুষোত্তম:
এর উত্তর সমানুপাতিক ও বিপ্রতীপ। আহ্বান-প্রত্যাখ্যান দুটোই আছে। বিদেশি লেখকদের তুলনায় বাংলা ভাষার চার ভুবনে এত গল্পকার আছেন আর এত গল্পকারের এত প্রকরণ আছে, যা একজন পাঠকের পক্ষে ধারাবাহিকতা রক্ষা করে পড়ে যাওয়া এক হিমশিম ব্যাপার। গল্পকার নিজের ধারণা অনুসারে লেখেন। পাঠক তাঁর ধারণা অনুসারে পড়েন। যেখানে মিলে যায় সেখানে একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যেখানে অমিল ঘটে সেখানে লেখক-পাঠক বিচ্যুত থাকেন। বিবিধ লেখক নিজের রুচি ও সাহিত্য সম্পর্কিত অভিজ্ঞান থেকে যেমন লেখেন, তেমনই পাঠক নিজের রুচি ও সাহিত্য সম্পর্কিত প্রজ্ঞা থেকে খুঁজে নেন। আবার স্রোতে ভেসে যাওয়া লেখক-পাঠক দুটোই আছে। তবে আমি সর্বদা বাঙালি লেখক থেকে দূরে থাকতেই ভালোবাসি। বাঙালি লেখকের প্রভাবিত করার একটা কর্কটরোগ আছে। একটা বৃত্ত পাকানোর প্রবল মোহ আছে। সম্পাদকের নির্দেশ মান্য করে এখানে অর্ডারি লেখাও যেমন হয়, তেমনই সম্পাদককে প্রত্যাখ্যানের ফরমানও চোখে পড়ে।
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরও হ্যাঁ-না, আহ্বান-প্রত্যাখ্যান দুটোই। গল্পকার তো পাঠকের রুচি-মর্জি-সাহিত্যিক ধারণা-সাহিত্যিক মননকে সামনে রেখে লিখছেন না। তিনি নিজের লেখক-শর্তে অবিচল থেকে লিখছেন। কোনো পাঠক পড়তে গিয়ে টেক্সটের মধ্যে ভাবার বিস্তর অবকাশ পাচ্ছেন, কোথাও ছিটকে যাচ্ছেন। কোনো লেখক পাঠকের সঙ্গে একটা মিতালি পাকাচ্ছেন, পাঠককে সঙ্গী করছেন, পাঠকের মনন-চেতনা-হৃদয়কে সঙ্গী করে টেক্সটের অনুষঙ্গে একটা সাব-টেক্সট পাঠকের মনে যেমন নির্মাণ করে দিচ্ছেন, তেমনই টেক্সটের ভিতর পাঠককে ভ্রমণ করিয়ে একটা নতুন মানদণ্ড খুব সহজ সমীকরণে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন। কোনো লেখক টেক্সটের ভিতর পাঠককে ঢুকতেই দিচ্ছেন না, পাঠককে বারবার ধাক্কা দিচ্ছেন; পাঠক তাঁর যাবতীয় অভিজ্ঞান নিয়ে তুষার অঞ্চল ভেদের মতো টেক্সট ভেদ করে চলেছেন, প্রত্যহ অস্থিরতার সূত্র থেকে দাঁড়াবার পরিসর খুঁজছেন। কিন্তু লেখক এতটাই প্রাজ্ঞ, এতটাই আধুনিকতার শর্তকে ভাঙতে দক্ষ, এতটাই কিম্ভূত সত্যে দণ্ডায়মান যে পাঠকের মস্তিষ্ক সঞ্চরণের সবটাই শুষে নিচ্ছেন। প্রথম সমীকরণের লেখক সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বপন পাণ্ডা; দ্বিতীয় সমীকরণের লেখক পীযূষ ভট্টাচার্য, নাসরীন জাহান। অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায়।
গল্পপাঠ:
বাংলা ছোটগল্পে নতুন নতুন বিষয় আসছে। গল্প বলার ভাষা, কাঠামো ও কৌশলেও কি তেমন নতুনত্ব আসছে?
পুরুষোত্তম:
হ্যাঁ, এসেছে। বিষয়ের থেকেও আমার কাছে ভাষা-কাঠামো-কৌশলই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বস্তুত আমার পড়া এবং অন্বেষণও সেই দিকে। বিষয়টা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিষয়টা সময়ের সখ্য। সময়ই নতুন নতুন বিষয়ের জন্ম দেয়। এখানে গল্পকারের কোনো দক্ষতা নেই। এমনকি নতুন বিষয় নিয়ে বলয় রচনায় পাঠকের সঙ্গে লেখকের কোনো প্রভেদ নেই। লেখকের দক্ষতা মূলত ভাষা-ফর্ম-উপস্থাপন-নির্মাণ-সাহিত্যতত্ত্ব-জীবনবেদ-অস্তিত্বের গহন সঞ্চালনে। সেই প্রবণতায় আজকের বাংলা গল্প অনেক বেশি জরুরি হয়ে উঠছে। বহু নাম করা যায় (কিন্তু নাম উল্লেখের প্রধান অসুবিধা হলো দুই-চারটি নাম করে এক-দুটি আপাততভাবে বাদ গেলে সেই লেখক আবার ইনবক্সে এসে হাই তোলেন। বাঙালি লেখক এতটাই ক্ষুদ্র মননের। তবুও কিঞ্চিৎ উল্লেখ না করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে না। যদিও আমার বিবিধ প্রবন্ধে সাম্প্রতিক বাংলা গল্প-উপন্যাসের কতরকম ঘরানা গড়ে উঠেছে তার বিস্তৃত আলেখ্য আছে; পাঠক না দেখলে আর কী করা যাবে! এমনকি গল্পপাঠে প্রবন্ধগুলি খুঁজলেই পাঠক তার হদিস পেয়ে যেতে পারেন, ‘নাই নাই সময় যে নাই’)।
প্রথম তিনটি প্রশ্নে ‘সাম্প্রতিক’ শব্দটা ছিল। এখানেও যদি ‘সাম্প্রতিক’ শব্দটা ধরে নিই, তবে বাংলা গল্পের সাম্প্রতিক কালের মধ্যে দেখা যাবে গত শতকের ছয়-সাত-আট-নয়ের দশকের লেখকরা যেমন লিখছেন, তেমনই পরবর্তী সময়ের তরুণরাও লিখছেন। অতএব মোটামুটি শেষ পঁচিশ বছরের সময়পর্ব বিবেচনা করেই বলতে হবে। ‘শাস্ত্রবিরোধী’দের অতিরিক্ত ফর্মনির্ভরতা, এমনকি পরবর্তীকালে যা বাণিজ্যিক লেখালেখির সঙ্গে মিলে গেল, সেই ইতিহাস থেকে পরবর্তী গল্পকাররা শিক্ষা নিলেন যে শুধু ফর্ম নয়, তার সঙ্গে ভাষা-উপস্থাপন-বয়ান-নির্মাণ-কৌশল-বিবরণ সবই আধুনিক করতে হবে; নইলে শুধুমাত্র ফর্মনির্ভর করে গল্প দাঁড়াবে না। আবার হাংরি, শাস্ত্রবিরোধী, নিম সাহিত্য, নতুন নিয়ম, গাণিতিক সূত্র, ছ্যাঁচ ভেঙে ফ্যালো, থার্ড লিটারেচার—এসব সাহিত্য আন্দোলন যেমন নব্যসাহিত্যের ইশতেহার গড়ে তুলল, তেমনই ভাষা-ফর্ম-উপস্থাপন-নির্মাণ-কাউন্টার-প্রচলিত ছক ভেঙে নতুনত্বের দিশা দেখাল। বাংলা গল্পের ভোল দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। তেমনই এইসব আন্দোলনের মধ্যে না থেকেও কেউ কেউ (শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, দেবেশ রায়, অরূপরতন বসু, সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, নবারুণ ভট্টাচার্য, সাধন চট্টোপাধ্যায়, আলপনা ঘোষ, অভিজিৎ সেন, অমর মিত্র, অশোক অধিকারী, শেখর দাশ, রামকুমার মুখোপাধ্যায়, তপনকর ভট্টাচার্য) একটা নতুন গড়ন গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছিলেন। আরও পরে সমরেশ রায়, দেবর্ষি সারগী, কমল চক্রবর্তী, পীযূষ ভট্টাচার্য, দেবীপ্রসাদ সিংহ, শহীদুল জহির, সোমক দাস, নাসরীন জাহান, অনিশ্চয় চক্রবর্তী, মধুময় পাল, শুভংকর গুহ, সোহারাব হোসেন, স্বপন পাণ্ডা, অলোক গোস্বামী, গৌতম সেনগুপ্ত, সঞ্জীব নিয়োগী। আরও পরে উপল মুখোপাধ্যায়, হিরণ্ময় গঙ্গোপাধ্যায়, শতদল মিত্র, সব্যসাচী সেন, লুৎফর রহমান, কুলদা রায়, কণিষ্ক ভট্টাচার্য, সাদিক হোসেন, শান্তনু ভট্টাচার্য, অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়, শমীক ষাণ্ণিগ্রাহী, অনির্বাণ বসু, অভিষেক ঝা, সেখ আসাদ আলি। (হে পাঠক, আমি কিন্তু নামের নামাবলি করতে বসিনি)। গল্প আন্দোলনের মধ্যে থাকা গল্পকারদের উল্লেখ করা গেল না, সেসব নিয়ে বিস্তর লিখেছি, খোঁজ করলেই পেয়ে যাবেন।
কাহিনিকে অতিক্রম করে গল্পকে সার্বিকভাবে নতুন রূপ দিতে সচেষ্ট হয়েছেন এইসব লেখক। এঁদের আবার ভিন্ন ভিন্ন প্রকরণ আছে। কমল চক্রবর্তীর সঙ্গে পীযূষ ভট্টাচার্য বা মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে সুবিমল মিশ্রকে মেলানো যাবে না, বা দেবীপ্রসাদ সিংহের অভিজ্ঞতার আস্তরণের সঙ্গে সোমক দাসকে এক খাপে ঢোকানো যাবে না। বস্তুত আমিও পাঠক হিসেবে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতায় একেবারেই স্বতন্ত্র প্রকরণ চাইছিলাম। আবার জীবনবাস্তবতা, চরিত্রের স্থান-কাল-পাত্র-বয়স-ভূগোল অনুপাতে ভাষার কেমন বদল হওয়া উচিত, বিষয় অনুপাতে ভাষার শরীর কেমন হবে, তা স্বপন পাণ্ডা না পড়লে বোঝা অসম্ভব। আবার টেক্সটই যে ভাষাচর্চা, অভিধান, বাংলা ভাষার অতীতের দলিলিকরণ, অথচ উপস্থাপন একেবারেই উত্তর-আধুনিক—তা বুঝতে রামকুমার মুখোপাধ্যায়ে যেতেই হবে।
হ্যাঁ, গল্প শোনানোর নতুন কৌশলও আছে। সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, গৌতম সেনগুপ্ত, দেবীপ্রসাদ সিংহ, কুলদা রায়। ঔপনিবেশিকতার আস্তরণকে ভেঙে ভেঙে টুকরো টুকরো করে গল্পের কথক-শ্রোতা-দর্শককে নতুন আঙিনায় এনে নব্য কথক দ্বারা গল্পের নতুন ধারাপাত গড়ে উঠছে সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ে। আজকের তালেবর পাঠক গল্প নাও শুনতে পারেন, তা জানেন গৌতম সেনগুপ্ত। কিন্তু তিনি গল্প শুনিয়েই ছাড়বেন। গল্প থেকে পাঠক বেরিয়ে যেতে চাইলে নতুন গল্প, একই গল্পে নতুন ডালপালা এনে গল্প শোনাবেনই। দেবীপ্রসাদ সিংহের প্রায় আখ্যানেই দুটি চরিত্র (অনন্ত দত্ত, রজব আলি) বারবার ঘুরেফিরে আসবে, কিন্তু আপনি গল্প থেকে কোনোভাবেই বের হতে পারবেন না। এমনই তাঁর কৌশলপরায়ণ উপস্থাপন, জীবনবাস্তবতা ও শিল্পিত অবতারণা। কুলদা রায়ের গদ্যের প্রাথমিক গুণ আন্তরিকতা, সে পাঠককে প্রথমেই গল্পে ডুবিয়ে দেবে, পরিত্রাণের পথই নেই। তেমনই আন্তরিক গদ্য অনিশ্চয় চক্রবর্তীর। অমর মিত্র মিথ্যার ফুলঝুরি দিয়ে বাস্তব-অর্ধবাস্তবের মধ্য দিয়ে অলীক বাস্তবে কাহিনি গড়িয়ে দেবেন। অলোক গোস্বামীর বক্তব্যে ফাঁক রেখে দেবেন। সেই ফাঁক দিয়েই তর্ক-বিতর্কের বয়ানে, যুক্তি-প্রতিযুক্তির বিন্যাসে কাহিনি এগিয়ে যাবে। ব্যঙ্গ ও শ্লেষে কাহিনিকে তির্যক গতিতে আকর্ষণ করা স্বপ্নময় চক্রবর্তীর গল্পধর্ম। রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায় বিস্তৃত পরিসর রেখে দেবেন, গল্প যেকোনো দিক থেকে যেকোনো দিকেই গড়িয়ে যেতে পারে।
গল্পপাঠ:
এই সময়ের বাংলা ছোটগল্পকে আরও শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র হয়ে উঠতে হলে কোন জায়গাগুলোতে সবচেয়ে বেশি কাজ করা দরকার বলে আপনি মনে করেন?
পুরুষোত্তম:
বাংলা গল্প এমনিতেই অত্যন্ত স্বতন্ত্র, অত্যন্ত বলিষ্ঠ, নন্দনতাত্ত্বিক মূল্য অপরিসীম। অন্তত আমার পাঠতালিকায় যে শিল্পিত বলয় আছে, তা তেমন সত্যই ধরা দেয়। প্রাথমিক কাজ প্রকৃত গল্পের সঙ্গে পাঠকের যোগসূত্র স্থাপন। যোগসূত্র স্থাপনের অভাবে প্রকৃত গল্প, শিল্পিত গল্প বর্তমানে পিছিয়ে যাচ্ছে। এমনকি বিজ্ঞাপন, প্রচার, সাহিত্য উৎসব, পুরস্কারের গোলকধাঁধা আয়োজনে সাধারণ পাঠক এতটাই বিভ্রান্ত হচ্ছে যে প্রকৃত বাংলা গল্পের নাগালই পাচ্ছে না। আবার প্রকৃত গল্প বোঝার জন্য পাঠকের যে মেধা-দক্ষতা-পাঠপ্রবণতা-চিন্তাশীলতা প্রয়োজন, তা এতটাই ন্যূন যে পাঠক গল্প চিনতেই ভুল করছে। এটাই আজকের বাংলা গল্পের প্রধান বাধা।
বাংলা গল্পের যে বিপুল ঐতিহ্য, তা সাম্প্রতিক একজন লেখক অতিক্রম করতে পারছেন কি না, সেটাই আজকের গল্পকারের কাছে বড় প্রশ্ন।
এখানেও একটা বড় সমস্যা হচ্ছে যে আমি কি সাম্প্রতিক সামগ্রিক বাংলা গল্প নিয়ে বলব, না নির্ধারিত কিছু গল্পকার নিয়ে? যেহেতু পূর্বেই উল্লেখ করেছি নিমাই ভট্টাচার্য, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, আশুতোষ মুখোপাধ্যায় আগেও ছিলেন, এখনও আছেন। বলা ভালো, এখন আরও বেশি আছেন। তাঁদের কাছে বাংলা গল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী প্রত্যাশা করবেন বা করা উচিত? আর যদি নির্ধারিত বৃত্তের কথা বলেন, তবে তাঁদের সাহিত্যিক জ্ঞান, গল্প নির্মাণ ক্ষমতা, বাংলা গল্পের অতীতকে জানার দক্ষতা, ভাষা-ফর্ম-নির্মাণ নিয়ে এতটাই বিচক্ষণ যে মুগ্ধ হওয়া ছাড়া উপায় নেই।
তবুও কিছু বলার থাকে। বহু লেখকই এত লেখেন যে পুনরাবৃত্তি অবধারিত; এমনকি একটি গল্পের আশপাশ দিয়ে অপর গল্পের যাত্রা। প্রতিটি গল্পই যেন স্বতন্ত্র হয়। কোনো গল্প পড়তে গিয়ে কোনোভাবেই যেন সেই লেখক বা অগ্রজ/সমসাময়িক গল্পকারের কোনো নির্মাণের কথাই মাথায় না আসে। এই সচেতনতা জরুরি। অনেকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ফর্মনির্ভরতা গল্পকে ডুবিয়ে দেয়, বিষয়ের সঙ্গে ফর্ম যেন অঙ্গাঙ্গীভাবে থাকে। গল্পকে আরও যত সম্ভব শিল্পিত ও নন্দনতাত্ত্বিক করে তোলা যায়। ভাষা-সাহিত্য, নন্দনতত্ত্ব, সাহিত্যিক ঘরানাগুলিকে আরও বেশি নতুন প্রকরণে কীভাবে সমৃদ্ধ করা যায়। ভারতীয় গল্প যে পাশ্চাত্য প্রকরণ থেকে পৃথক, অথচ প্রাচ্যের প্রকরণ দিয়েই উত্তর-আধুনিক বীক্ষণকে কীভাবে ডিঙিয়ে নতুন পথসরণি গড়া যায়। অতিকথন বর্জন করে গল্পের শিল্পিত অবয়ব বজায় রাখা যতটা সম্ভব হয়, আবার অতিকথনকেই যদি ফর্ম করে তোলা হয়, তবে সেখানেও যেন শিল্পময় ক্যানভাস বজায় থাকে। দুই-ছয়জন ছাড়া বহু গল্পকারেরই বাক্যগঠন, গদ্যবিন্যাস, পরিচ্ছেদ গঠন এলোমেলো; সর্বত্রই একটা গা-ছাড়া ভাব। এমনকি কোথায় থামলে পরিচ্ছেদটি সুন্দর হবে বা একটি শব্দের অব্যবহার যে পরিচ্ছেদটিকেই নষ্ট করে দিচ্ছে, এ বিষয়ে অনেকেরই অবহেলা দেখি; এসব বিষয়ে নজর দেওয়া আবশ্যক। রাজনীতির ঘাত-সংঘাত, সময়ের বহমানতা যত প্রবলভাবে উঠে আসা সম্ভব, ততই বাংলা গল্পের উন্নতির সম্ভাবনা। সেই রাজনীতির বৃত্তায়ন নানামুখী। এখানেও বাঙালি লেখক নানা কৌশল অবলম্বন করেন; বহু বাঙালি লেখক এতটাই ছুপারুস্তম যে রাজনীতিহীনতাকেই রাজনীতি বলে চালাতে চান, দুই পক্ষেই থাকতে চান। আমাদের ঔপনিবেশিকতায় হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতির পুনর্নির্মাণ ও যথার্থ প্রয়োগ যত বেশি সম্ভব হবে, বাংলা গল্পের নন্দনতত্ত্ব তত বেশি প্রখর হয়ে উঠবে। ·

0 মন্তব্যসমূহ