হারুনুজজামান

আজকের দ্রুতগতি আর প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে আমাদের জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটা বড় পরিবর্তন চলে এসেছে। এই বদলের প্রভাব কেবল আমাদের কাজের জগতে সীমাবদ্ধ নেই, তা ছুঁয়ে গেছে আমাদের চিন্তাভাবনা, আবেগ প্রকাশ আর বই পড়ার অভ্যাসকেও। যে সাহিত্য একসময় কেবল ছাপা বই বা পত্রিকার পাতায় বন্দি ছিল, তা আজ খুব সহজেই আমাদের হাতের মুঠোয় থাকা ফোনের পর্দায় নতুন প্রাণ খুঁজে পেয়েছে। মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার যেমন একসময় সাহিত্যের জগতে একটা বড় আলোড়ন তুলেছিল, ঠিক তেমনি আজকের ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তি বাংলা সাহিত্যকে এনে দিয়েছে এক নতুন রূপ ও গতি। আর এই পরিবর্তনের একদম সামনের সারিতে রয়েছে অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা বা ‘ওয়েবজিন’। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, যেখানে তরুণ সমাজ প্রযুক্তিকে সঙ্গী করে নিত্যনতুন উপায়ে নিজেদের প্রকাশ করতে চাইছে, সেখানে অনলাইন সাহিত্য পত্রিকার ভূমিকা কেবল লেখালেখির মধ্যেই আটকে নেই; তা হয়ে উঠেছে মুক্তচিন্তা, নতুন ভাবনা আর নিজস্ব সংস্কৃতিচর্চার এক উন্মুক্ত মাধ্যম।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশে সাহিত্যচর্চায় ‘লিটল ম্যাগাজিন’ আন্দোলনের এক দারুণ ঐতিহ্য রয়েছে। মূলধারার বাণিজ্যিক পত্রিকা বা বড় বড় প্রকাশনীর বাইরে গিয়ে স্বাধীন ও নতুন ভাবনার লেখকদের সবচেয়ে বড় আশ্রয় ছিল এই লিটল ম্যাগাজিনগুলো। প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে লেখার স্বাধীনতা আর নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার যে সাহস এসব পত্রিকা দেখিয়েছে, তা বাংলা সাহিত্যকে বারবার নতুন প্রাণ দিয়েছে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে কেবল অর্থের অভাব, ছাপার খরচ বেড়ে যাওয়া আর দূর-দূরান্তে পত্রিকা পৌঁছে দেওয়ার জটিলতার কারণে অনেক অসাধারণ লিটল ম্যাগাজিন অকালেই বন্ধ হয়ে গেছে। ঠিক এই কঠিন জায়গাতেই প্রযুক্তি এসে দাঁড়িয়েছে এক সহজ সমাধান হিসেবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো লিটল ম্যাগাজিনের সেই স্বাধীন ও প্রতিবাদী ভাবনাকে হারিয়ে যেতে দেয়নি, বরং তাকে দিয়েছে আরও দ্রুত আর বহু মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ। আশির বা নব্বইয়ের দশকের শেষে ব্লগের মাধ্যমে অনলাইন সাহিত্যচর্চার যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা আজ পরিপক্ক রূপ নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ অনলাইন সাহিত্যশিল্পে পরিণত হয়েছে।

অনলাইন সাহিত্য পত্রিকার এই নতুন জোয়ারে যে সাময়িকীটি অত্যন্ত নিষ্ঠা, যত্ন আর দায়িত্বশীলতার সাথে নিজের জায়গা তৈরি করে নিয়েছে, তা হলো ‘গল্পপাঠ’। অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা শুনলেই অনেকে হয়তো ধরে নেন যে এখানে সম্পাদনা ছাড়া যা-তা লেখা প্রকাশ হয়। কিন্তু ‘গল্পপাঠ’ শুরু থেকেই সেই ধারণাকে একদম ভুল প্রমাণ করেছে। বাংলা ছোটগল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই বিশেষ প্ল্যাটফর্মটি দেখিয়ে দিয়েছে যে, সঠিক সম্পাদনা আর নিষ্ঠা থাকলে ডিজিটাল মাধ্যমেও অত্যন্ত উঁচুমানের সাহিত্যচর্চা সম্ভব। দেশের ভেਤরের ও বাইরের অসংখ্য বাংলাভাষী গল্পকারকে এক ছাদের নিচে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে গল্পপাঠের অবদান সত্যি প্রশংসনীয়।

গল্পপাঠ কেবল নামকরা লেখকদের লেখা ছাপার জায়গা নয়, এটি নতুনদের শেখার ও গড়ে ওঠারও একটি পথ। একজন নতুন লেখক যখন প্রথাগত কোনো কাগজের পত্রিকা বা বড় প্রকাশনীতে নিজের লেখা পাঠান, তখন তাকে প্রায়ই দীর্ঘ অপেক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। অনেক সময় নতুনদের প্রতি গুরুত্ব না দেওয়ায় সম্ভাবনাময় অনেক তরুণ শুরুতেই উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। গল্পপাঠ এই জায়গাটিতে বড় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। এখানে নবীনদের লেখাকে শুরুতেই বাদ দেওয়া হয় না; বরং সম্পাদকীয় পর্যালোচনার মাধ্যমে লেখাটিকে আরও গুছিয়ে প্রকাশের উপযোগী করা হয়। একই সাথে, প্রখ্যাত লেখকদের দুর্লভ বা গুরুত্বপূর্ণ গল্প প্রকাশ করে পাঠকদের কাছে সাহিত্যের এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার তুলে ধরা হয়। এভাবে প্রবীণ ও নবীন—দুই প্রজন্মের লেখকদের মধ্যে একটি সুন্দর সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে।

শুধু দেশীয় গল্পের মধ্যেই গল্পপাঠ নিজেদের আটকে রাখেনি। বিশ্বসাহিত্যের সেরা ও জনপ্রিয় ছোটগল্পগুলোর সহজ ও সুন্দর অনুবাদ প্রকাশ করে এটি বাংলা পাঠকদের চিন্তার পরিধি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্য দেশের জীবন ও সংস্কৃতিকে নিজের ভাষায় ফুটিয়ে তোলার কাজে গল্পপাঠ চমৎকার দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। এর পাশাপাশি, গল্প নিয়ে নানা আলোচনা, বিশ্লেষণ ও সহজ ভাষায় সমালোচনা প্রকাশের মাধ্যমে বাংলা কথাসাহিত্যের ভিত শক্ত করতেও এটি কাজ করে যাচ্ছে। ফলে এটি কেবল গল্প পড়ার মাধ্যম না হয়ে সাহিত্যঅনুরাগী ও সংগ্রাহকদের কাছে এক গভীর ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে।

অনলাইন সাহিত্য পত্রিকার এই প্রসারের ফলে সামগ্রিকভাবে আমাদের সাহিত্যচর্চা এখন অনেক বেশি সহজ আর সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে উঠেছে। আগে সাহিত্যচর্চার মূল কেন্দ্র ছিল ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরের নির্দিষ্ট কিছু সাহিত্যিক আড্ডা। কিন্তু ইন্টারনেটের কল্যাণে আজ প্রত্যন্ত কোনো গ্রাম বা জেলা শহরের তরুণকেও তাঁর মেধা প্রমাণের জন্য রাজধানীতে ছুটতে হয় না। একটি স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই তিনি নিজের লেখা ছড়িয়ে দিতে পারছেন সারা বিশ্বে। এই যে সমান সুযোগ তৈরি হওয়া, তা বাংলা সাহিত্যকে আরও বৈচিত্র্যময় আর সাধারণ মানুষের জীবনের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। গ্রামবাংলার মানুষের গল্প, জীবনসংগ্রাম আর লোকজ সংস্কৃতি আজ কোনো বাধা ছাড়াই সাহিত্যের মূল ধারায় জায়গা করে নিচ্ছে।

অনলাইন সাহিত্য পত্রিকার আরেকটি বড় সাফল্য হলো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী বাঙালিদের একসূত্রে বাঁধা। জীবিকা বা পড়াশোনার প্রয়োজনে যেসব বাঙালি আজ বিদেশে থাকেন, তাঁদের অনেকেই মন থেকে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে গভীরভাবে ভালোবেসে আঁকড়ে ধরে রাখতে চান। অনলাইন সাহিত্য পত্রিকাগুলো তাঁদের জন্য দেশের সাথে যুক্ত থাকার এক চমৎকার মাধ্যম। প্রবাসে বসেও তাঁরা দেশের সাহিত্যের নতুন খবর যেমন পাচ্ছেন, তেমনই বিদেশের মাটিতে নিজেদের নানা অভিজ্ঞতার কথা লিখে দেশের পাঠকদের সাথে ভাগ করে নিতে পারছেন। এর ফলে সাহিত্য আর নির্দিষ্ট কোনো দেশের সীমান্তে আটকে নেই, তা হয়ে উঠেছে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সব বাঙালির যৌথ সম্পদ।

অর্থনৈতিক দিক থেকে চিন্তা করলেও আজ অনলাইন সাহিত্য পত্রিকার গুরুত্ব অনেক। বর্তমানে কাগজ, কালি ও ছাপার খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণে ছাপা পত্রিকা চালানো বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি ভালোমানের কাগজের পত্রিকা প্রকাশ করা এবং তা পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া দিন দিন বেশ ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। অনলাইন পত্রিকাগুলো ছাপা ও যাতায়াতের এই বিশাল খরচকে এক ধাক্কায় শূন্যে নামিয়ে এনেছে। এতে সম্পাদক বা উদ্যোক্তাদের ওপর আর্থিক চাপ অনেক কমে যায়। পৃষ্ঠার সীমাবদ্ধতা না থাকায় লেখা দীর্ঘ হলে তা কেটে ছোট করার প্রয়োজন পড়ে না, ফলে সম্পাদকরা কেবল লেখার মান ও সুন্দর উপস্থাপনার দিকেই পুরো মন দিতে পারেন।

অনলাইন পত্রিকার আরও একটি আকর্ষণীয় দিক হলো ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধার ব্যবহার। ছাপার হরফে কেবল লেখা পড়ার সুযোগ থাকলেও অনলাইন পত্রিকায় গল্পের সাথে যুক্ত করা যায় লেখকের কণ্ঠে গল্প বা কবিতা পাঠের অডিও, ভিডিও সাক্ষাৎকার কিংবা মানানসই ছবি। আজকের তরুণ প্রজন্ম, যারা মূলত দেখা ও শোনার মাধ্যমে কোনো বিষয় দ্রুত গ্রহণ করতে ভালোবাসে, তারা কেবল লেখা পড়ার চেয়ে এই ধরনের পরিবেশনা বেশি পছন্দ করে। প্রযুক্তির এই নতুন রূপ তরুণদের আবার সাহিত্যের দিকে ফিরিয়ে আনতে বেশ ভালো ভূমিকা রাখছে।

লেখা সংরক্ষণের দিক থেকেও অনলাইন পত্রিকার গুরুত্ব অনেক বেশি। আর্দ্র আবহাওয়া বা যত্ন না নেওয়ার কারণে কাগজের বহু পুরোনো পত্রিকা ও লিটল ম্যাগাজিন আজ চিরতরে হারিয়ে গেছে। কিন্তু অনলাইন পত্রিকার ক্ষেত্রে এই লেখাগুলো ডিজিটাল ফাইল হিসেবে বহু বছর সুরক্ষিত থাকে। ভালো ওয়েবসাইট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বহু বছর আগের লেখাও এক ক্লিকেই পাঠকের সামনে নিয়ে আসা সম্ভব। বর্তমানে বাংলাদেশে গল্পপাঠের মতো পত্রিকাগুলো পুরোনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখা ও প্রখ্যাত সাহিত্যিকদের কাজ নতুন করে সংরক্ষণ করছে, যা ভবিষ্যৎ গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য এক অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।

অনলাইন মাধ্যমে সাহিত্য পড়ার আরও একটি বড় আনন্দ হলো পাঠক ও লেখকের সরাসরি কথা বলার সুযোগ। আগে পত্রিকা পড়ার পর লেখকের কাছে চিঠি পাঠাতে হতো, যা পৌঁছাতে অনেক দিন লেগে যেত। কিন্তু এখন অনলাইন পত্রিকার নিচের মন্তব্যের ঘরে পাঠক সঙ্গেই তাঁর ভালো লাগা বা মন্দ লাগা জানাতে পারেন। পাঠকদের এই সরাসরি মতামত লেখককে যেমন উৎসাহ দেয়, তেমনই গঠনমূলক সমালোচনা তাঁকে নিজের কাজ আরও গুছিয়ে নিতে সাহায্য করে। এই সরাসরি প্রতিক্রিয়া সাহিত্যচর্চাকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে।

তবে এত সব সুবিধার পাশাপাশি কিছু সমস্যাও কিন্তু রয়ে গেছে। ইন্টারনেটে যে কেউ যেকোনো সময় লিখতে পারেন বলে অনেক সময় সম্পাদনা ছাড়া দুর্বল লেখা অনলাইনে চলে আসে। মানহীন লেখার ভিড়ে ভালো লেখাগুলো অনেক সময় ঢাকা পড়ে যায়, যা পাঠকদের বিমুখ করতে পারে। তবে গল্পপাঠের মতো যেসব পত্রিকা সঠিক সম্পাদনা নীতি মেনে চলে, তারা নিজেদের মান খুব সুন্দরভাবে ধরে রাখতে পেরেছে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো লেখা চুরি বা কপিরাইটের অভাব। ইন্টারনেটে একজনের লেখা অনুমতি ছাড়াই অনেকে নিজের নামে অন্য কোথাও প্রকাশ করে দেন। এ বিষয়ে কড়া নিয়ম না থাকায় মূল লেখকরা অনেক সময় তাঁদের কষ্টের উপযুক্ত মূল্যায়ন পান না। এছাড়া, ইন্টারনেটে সবাই বিনামূল্যে পড়তে অভ্যস্ত বলে পত্রিকা চালানো বা লেখকদের সম্মানি দেওয়ার মতো টেকসই আয়ের পথ তৈরি করা এখনো বেশ কঠিন একটি চ্যালেঞ্জ।

সবশেষে বলা যায়, প্রযুক্তির এই নতুন জোয়ার সাহিত্যকে থামিয়ে দেয়নি, বরং তাকে দিয়েছে আরও বড় ক্যানভাস ও নতুন গতি। বাংলাদেশে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ইন্টারনেট পৌঁছে যাওয়ায় অনলাইন সাহিত্য পত্রিকাগুলো মানুষের কাছে সাহিত্য ও স্বাধীন চিন্তার বার্তা খুব সহজেই পৌঁছে দিচ্ছে। কাগজের বই বা পত্রিকার প্রতি পাঠকের ভালোবাসা চিরকাল থাকবে সত্যি, কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে ডিজিটাল মাধ্যমের এই সহজলভ্যতাকেও অস্বীকার করার উপায় নেই। গল্পপাঠের মতো দায়িত্বশীল পত্রিকাগুলোর সঠিক পরিচালনা এবং মান ধরে রাখার চেষ্টা যদি অব্যাহত থাকে, তবে আগামী দিনে বাংলা সাহিত্য দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এক নতুন ও সম্মানজনক জায়গা করে নেবে। ·