কমরেড মিখাইল গরবাচভ
বরাবরেষু
ঠিক তেরো বছর পর পৌঁছতে পারলাম আপনাকে চিঠি লেখার এই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটিতে। আপনি পৃথিবীর সবচেয়ে পরাক্রান্ত, স্বপ্নময় ও প্রতারক কমিউনিস্ট পার্টি, সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সর্বশেষ সাধারণ সম্পাদক, ওই দেশের শেষতম প্রেসিডেন্ট। আর আমি? ভারতবর্ষের মতো দেশের একাধিক কমিউনিস্ট পার্টির একটিরও সভ্যপদ অর্জনে অক্ষম, ব্যর্থ এক যুবক, যার চোখে হয়তো এখনও লেগে থাকতে পারে অনাগত বিপ্লবের স্বপ্ন, শৈশবে মা-র হাতে পরানো কাজলরেখার অবশেষের মতো।

আমাদের দুজনের মাঝখানে সাত সমুদ্র তেরো নদী তো দূরের কথা, যেন এক গ্রহের ব্যবধান, অথবা শতাব্দীর, তবু আপনিই আমার নিরুপায় অবলম্বন, যেহেতু মাঝখান জুড়ে কেবলই রাতের অন্ধকার ছড়ানো, যে অন্ধকারে তারাদের মনে হয় নিকটতম, পাশের মানুষটির চেয়ে। মানুষটি তো আলো নয়, চেতনার আলোড়নহীন এক অস্তিত্ব যেন তার, তারাদের আলো থাকে, নক্ষত্রদেরও। আমি একটি নক্ষত্রের জন্য অপেক্ষা করে থাকি, আরও অনেকেই থাকে।

সাতাশি সালে ভারত সফরে এসেছিলেন আপনি, আমাদের সংসদের দুটি কক্ষের যৌথ অধিবেশনে জড়তাহীন রুশ ভাষায় বক্তৃতা করেছিলেন। পৃথিবীর প্রবল শক্তিমান একটি দেশের প্রেসিডেন্ট হয়েও ইংরেজি না জানার গ্লানি ও হীনম্মন্যতার রেশমাত্র ছিল না আপনার আত্মবিশ্বাসী ভাষায় ও ভঙ্গিমায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির ২৭ এবং ২৮তম কংগ্রেস, সে দেশের প্রথম বহুদলীয় ভোট উপলক্ষে আপনাকে বহুবার দেখেছি টিভির পর্দায়। একই রকম। কিন্তু আমাদের সংসদে, আমাদেরই চেনাজানা সাংসদদের মধ্যে আপনার ওই রুশ ভাষার বক্তৃতার জবাব এতদিনে, আমার ব্যক্তিগত কলমে, বাংলা ভাষায়। বিপ্লব বা বিপ্লবহীনতার তো কোনও ভাষা হয় না, বাংলা অথবা রুশ, প্রতিবাদের অভিব্যক্তিই তো যথেষ্ট। অচলায়তনকে ভাঙার প্রয়াসের কোনও দেশ নেই, রাষ্ট্র নেই। সেইখানেই একটিমাত্র মিল, আপনার সঙ্গে আমার। আমরা দুজনেই, সম্পূর্ণ ভিন্ন ইতিহাস সত্ত্বেও, এখন, চরাচরে, মিছিলে, সমাবেশে, সম্মেলনে অপ্রাসঙ্গিক। মাতৃভাষার অহংকার যোগ করে, মিলটা আরও ঘন, প্রসারিত করতে চাইছি। কাউকেই কি পাওয়া যাবে না, এ চিঠির অনুবাদে আছে যার আগ্রহ ও দায়? থাকতে পারে? নাও যদি থাকে তেমন কেউ, তবু অনুভূতিগুলো থাক, লিপিবদ্ধ।

কী লিখব আপনাকে, কী লিখতে চাই অথবা পারি? এক শতাব্দীর মনীষীর কাজও যখন ব্যর্থ হয়, তখন এই চিঠি তো উন্মাদের রোজনামচার মতো অসংলগ্নতায় পৌঁছতেই পারে। সেটাই স্বাভাবিক। আমি সেই অসংলগ্নতার ভেতর, বিপ্লবের, পার্টির সাফল্য আর ব্যর্থতার ভেতর ভিড় করে আসা কিছু অনুভব আপনার কাছে পেশ করতে পারি। আর যদি কারও কাছে নাও থাকে এসব অনুভূতির কোনও প্রাসঙ্গিকতা, আমার কাছে তো আছে, যে কখনও বিপ্লবী কোনও পার্টির সদস্যই হতে পারেনি, আর আমার ধারণা, আপনার কাছেও আছে, যিনি বিপ্লবকে, বিপ্লবের পার্টিকে বাঁচাতে পারেননি শেষপর্যন্ত, যথাসাধ্য চেষ্টা করেও। বরং, সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আপনাকেই সই করতে হয়েছিল ইতিহাসের অমোঘ অথচ ট্র্যাজিক সেই ডিক্রিতে, যা ওই দেশে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
কমরেড গরবাচভ, জীবনে এই প্রথম কাউকে আমি এমন নিঃসংকোচে, এমন লগ্নতায়, এমন অধিকারবোধে, এমন প্রত্যয়ে কমরেড সম্বোধন করতে পারছি। অসম্ভব সাধ থাকা সত্ত্বেও আমি যে কোনওদিন কাউকে ‘কমরেড’ সম্বোধন করতে পারিনি, সেই তীব্র যন্ত্রণা যদি এতে লাঘব হয় আদৌ। কিম্বা, ওই যন্ত্রণাকে ভুলতেই হয়তো আপনাকে আমার এই ‘কমরেড’ সম্বোধন, তখন, যখন আপনিও আর কোনও বিপ্লবী পার্টির সদস্য নন, তাই ‘কমরেড’ও নন। অর্থহীন, মর্যাদাবোধহীন, স্বার্থান্বেষী, ষড়যন্ত্রময়, ব্যঞ্জনাহীন উচ্চারণে ‘কমরেড’ শব্দটি এতবার শুনলাম আমাদের এই কমিউনিস্ট শাসিত পশ্চিমবাংলায় যে, কিছুতেই আর ওই সম্বোধনের সাধ, স্বপ্ন, স্পর্ধার মাত্রা আমি ছুঁতেই পারব না জীবনে। ‘কমরেড’ শব্দটির উচ্চারণ থেকে সাধ, স্বপ্ন, স্পর্ধা ও প্রতিবাদের সমস্ত মাত্রা ঝরে গেলে, সেই বিচ্ছিন্নতা কেমন হয়, আপনিই জানেন কমরেড গরবাচভ, বিপ্লব ও পার্টির মূল্যে জানেন। আমার কাছে পার্টি যন্ত্রণা ও কল্পনার এক মিশেল, বিপ্লব এক স্বপ্ন, আর সমাজতন্ত্র এমন একটা কিছু, যার অনস্তিত্ব টের পাই আফগানিস্তান আর ইরাকে ক্রমাগত মার্কিন বোমারু বিমানের হানাদারি দৃশ্যে। একটি আশ্রয়ের রাতারাতি উধাও হয়ে যাওয়ার পরম বেদনায়। আর কীসে?

আমাদের কাছে যা তখন আকস্মিক, আপনার কাছে তা নিতান্ত স্বাভাবিক ও ধারাবাহিক। এদেশের কমিউনিস্টরা আপনাকে সি আই এ-র চর বলে, পৃথিবীর জঘন্যতম প্রতিবিপ্লবী বলে, আমি মনে করি ও বিশ্বাস করি, আপনিই প্রথম বুঝেছিলেন শেষ হয়ে আসছে বিপ্লব ও সমাজতন্ত্রের মেয়াদ। বিপ্লব ও সমাজতন্ত্রের নিয়মে নয়, ঘোরতর অনিয়মে। ১৯৮৫ সালে প্রেসিডেন্ট চেরনেঙ্কোর মৃত্যুর পর আপনি যখন প্রেসিডেন্ট হলেন, তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বাড়িতে সোভিয়েত বই ও পত্র-পত্রিকা বরাবরই আসে আমাদের, জাল বুনে দেয় স্বপ্নের, সমাজতন্ত্রের। এমনই সেই স্বপ্নের জোর যে, আমার বাবা দশ মাসের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নে যাওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন পার্টিকে। পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশে সমাজতন্ত্র, বাকি অংশেও তা হয়ে ওঠা যখন শুধু সময়েরই অপেক্ষা, তখন সেই অপেক্ষা করতে তাঁর কোনও গ্লানি নেই। পরের বছরই চেরনোবিল পারমাণবিক চুল্লিতে বিস্ফোরণ, আর আলোচনায় চলে এল সোভিয়েতের নিরাপত্তা ও যোগ্যতার মতো বিষয়। তখনও আপনি নেহাতই সোভিয়েত ইউনিয়নের একজন প্রেসিডেন্ট, সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক। স্বরে নেই কোন ভিন্নতা, উচ্চারণে বা বক্তৃতায় নেই কোনও নতুনত্ব, ভাবনা-চিন্তার। লেনিনের কথা খুব বলতেন আপনি, সে তো ও দেশের সব প্রেসিডেন্টই বলেন, নিজেকে তো আর লেনিন বলা যায় না, বার বার লেনিনের কথা বললে বোঝা যায় একটি অনুভূতির গভীরতা ও বিস্তার। ‘বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন।’ লিখেছিলেন আমাদের ভাষার এক কবি, সুকান্ত ভট্টাচার্য। আপনার মুখে লেনিন-বন্দনার মধ্যেও আমাদের শোনার অভ্যাসটাই টিকে যাচ্ছিল। তার বেশি কিছু নয়।

১৯৮৭ সালের গ্রীষ্মে আপনাকে বেশ কিছু দিন দেখা যায়নি প্রকাশ্যে। কাগজে খবর হল, আপনার নেতৃত্ব সংকটে, আপনি সেই সংকটের মোকাবিলা করছেন ক্ষমতালিপ্সা থেকে। তার কিছু দিন পর দেখি হঠাৎ হইচই, আপনার নাকি কী এক বই বেরিয়েছে। খোঁজ করে জানা গেল, গরমের সময় আপনি ওই বইটিই লিখছিলেন। ‘পেরেস্ত্রোইকা ও নতুন চিন্তা’ নামে সেই বইয়ের সমালোচনাও বেরিয়ে গেল, লন্ডনের ‘দি ইকনমিস্ট’ সাপ্তাহিকে, আপনার প্রশংসা করা হল, আপনার ভাষা নাকি বেশ তাজা ও ঝরঝরে, নিজস্ব। একজন কমিউনিস্ট নেতা ও সোভিয়েতের প্রেসিডেন্টের ভাষার সুখ্যাতি করার চেয়ে বেশি আর কীইবা করতে পারে একটি রক্ষণশীল পত্রিকা, পুঁজির স্বার্থই যার অস্তিত্বের সমার্থক। বোঝা উচিত ছিল আমার, আমাদের, ওরা ভাষার প্রশংসা করছে, কিন্তু সেই ভাষায় যা লিখেছেন আপনি, সে বিষয়ে নীরব। মানে সেখানে নতুন কিছু আছে, অবশ্যই আছে। বইটির ইংরেজি অনুবাদ হাতে আসে পরের বছর। আর কী আশ্চর্য এক বিস্ময়ে আমি দেখি, কমিউনিস্ট পার্টির মানুষজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে আমার যা অভিজ্ঞতা, তা মিলে যাচ্ছে আপনার সঙ্গে। আপনি পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিমান কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আর আমি, পার্টি-প্রত্যাখ্যান মেনে স্বেচ্ছায় সরে আসা এক যুবক। কীসের মিল? অভিজ্ঞতার, উপলব্ধির, বিপ্লবের ভবিষ্যৎ ও বর্তমান নিয়ে উৎকণ্ঠার। 

খোলা হাওয়ায় ডুবতে রাজি হওয়াটা আদৌ আপনার চিন্তাবিলাস নয়, বরং ডুবতে থাকা এক তরীকে বাঁচাতে পারে ওই খোলা হাওয়া, আপনি বুঝেছিলেন। তাই আরও খোলা হাওয়া, আরও সমালোচনা, আরও আত্মসমালোচনা, সমাজ ও পার্টির প্রতিটি স্তরে, এই ছিল আপনার প্রস্তাব। কিন্তু কেন? আপনার জবাব ছিল, ‘গত ১৫ বছরে জাতীয় আয় কমে এসেছে অর্ধেকেরও বেশি, আশি সালের শুরুতে প্রায় অর্থনৈতিক অচলাবস্থা দেখা দিয়েছিল। অচলায়তনের বিধিবিধানে আমরা আচ্ছন্ন হয়েছিলাম কয়েক দশক। এখন ফল ভোগ করতে হচ্ছে।’ আপনি ভেবেছিলেন বিপ্লব আর লেনিনের স্মৃতিকে উসকে দিয়ে, পার্টির দায়িত্বশীলতার প্রসঙ্গ তুলে আপনি আপনার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যাবেন, মানুষের সঙ্গে পার্টির ও বিপ্লবের, সমাজতন্ত্রের দূরত্ব কাটাতে পারবেন। স্বরে আপনার নতুনত্ব ছিল, চিন্তায় ছিল বিপ্লবের উত্তরাধিকার, কিন্তু পার্টি আর মানুষের ঘনিয়ে ওঠা দূরত্ব টের পেয়েও আপনি কিছুটা ভুল বুঝেছিলেন আপনার পার্টিকে। অথবা ঠিক বুঝেও, আপনার মতো একজন কমিউনিস্টের ভরসার জায়গা তো ওই পার্টিই। হায়, সেই পার্টিই আপনাকে গৃহবন্দি করল, সেই পার্টিই আপনার সইয়ের অপেক্ষায় থাকা শিথিল ইউনিয়ন চুক্তিকেও আটকে দিল, সেই পার্টিই ক্ষমতা আরও কুক্ষিগত করতে চেয়ে প্রবল গণআন্দোলনের মুখে নিষিদ্ধ হয়ে গেল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙল, সমাজতন্ত্র হয়ে গেল অনস্তিত্ব। মানুষ যে আর পার্টিকে চায় না, সে দেশে, বুঝলাম আমরা। মানে, সোভিয়েতের বাইরের লোকজন।

পার্টিই সব কিছুর স্বাভাবিক বোদ্ধা আর নিয়ন্তা, এমন চিন্তা ও ধারণা যে অলৌকিক, হতে পারে না কখনও, একথা একজন কমিউনিস্ট নেতা হিসেবে আপনার মুখেই আমি প্রথম শুনি। কী যে ভালো লেগেছিল সেদিন, আজও তা বোঝাতে পারব না আপনাকে। সত্যের ওপর, জ্ঞানের ওপর, বিশ্লেষণের ওপর কারুর যে একক অধিকার থাকতে পারে না কখনও, ইতিহাসের ছাত্রের মতো এই উপলব্ধির কথা আপনি পার্টি কংগ্রেসের মঞ্চ থেকেও মনে করিয়ে দিয়েছিলেন পার্টিকে, তবু, মনে হয় আমার, এসব কথা শোনার আর উপলব্ধি করার মতো কেউ ছিলেন না সেই সম্মেলনে। এমনও হয় তাহলে ইতিহাসে, সবচেয়ে জরুরি সতর্কবার্তাও ঝরা পাতার মতো অবহেলায় পড়ে থাকে পথপাশে। পার্টির এক্তিয়ার কমিয়ে আনার কথা বলে আপনি পার্টিকে ভারমুক্ত করতে চেয়েছিলেন, আর সমাজকে একটু পরিণত করতে। কিন্তু ‘সর্বহারার একনায়কত্ব’ এমনই এক শব্দের আর আকাঙ্ক্ষার মিলন, দশকের পর দশক ধরে, সেখানে একনায়কত্বের স্বাদ আর সাধ কিছুতেই ঝেড়ে ফেলা যায়নি পার্টি থেকে আর সর্বহারার অস্তিত্ব চেতনা গেছে হারিয়ে। কর্তৃত্ব বা আধিপত্য, সভ্যতার এমনই এক বাসনা, যাকে আড়াল করে চলতে হয়, যাকে উপেক্ষা করা বা এড়িয়ে চলা তো কঠিনতম কাজ। এখানে সেই আড়ালের কৌশলও খুঁজতে হয় না, ‘একনায়কত্ব’ শব্দটাকেই ব্যবহার করেছিলেন স্বয়ং মার্কস, বৈধতার প্রশ্নও উঠবে না কোথাও। কমরেড গরবাচভ, তবে মার্কস যা লিখেছিলেন সভ্যতার ইতিহাসের প্রেক্ষিতে, লেনিনের কাছে সেই প্রেক্ষিত ঘটমান নভেম্বর বিপ্লব ও তাকে রক্ষা করার কাজে সীমিত হয়ে গেল, আর তার পর থেকে যারাই এই শব্দ ব্যবহার করুন না কেন, কখনই তা সভ্যতার ইতিহাসের মাত্রাকে ছুঁতে পারেনি, খাটো হয়েছে, কেবলই খাটো হতে হতে তা শুধুই পার্টি অথবা তার নেতার, গোষ্ঠীর স্বার্থের প্রেক্ষিতে এসে ঠেকেছে। মিছিলের দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়, যে কোনও বক্তৃতা আনমনে শুনলেও। অন্য কোনও অন্বেষণ বা অস্থিরতা ছাড়াই বোঝা যায়।

পার্টি চেয়েছিল একতরফা সব কিছুর ওপর কর্তৃত্ব, সে যোগ্যতা তার থাক অথবা না থাক, আপনি দীর্ঘদিনের পার্টিকর্মী হিসাবে চেয়েছিলেন সেই কর্তৃত্ব থেকে পার্টি সরে আসুক পার্টির স্বার্থে, সমাজের স্বার্থে, বিপ্লবের স্বার্থে। সরে আসাটা যে খুব দরকার, একনায়কত্বের ধারণাটার অবসানও সেই সঙ্গে, বুঝেছিল পার্টি নেতৃত্বও। তাই ’৭৭ সালের নতুন সংবিধানে ‘সমগ্র জনগণের রাষ্ট্র’ হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিন্তু ওই পর্যন্তই, তার বেশি কিছু নয়। নাহলে, ওই ঘোষণার পর ১৩ বছর কী করে সময় লাগে ও দেশে প্রথম তেমন ভোট করতে, যেখানে কমিউনিস্টরাই একমাত্র দল বা প্রার্থী নয়। অনেকের মধ্যে একজন মাত্র। কমরেড গরবাচভ, পার্টির সদস্যপদ জোটেনি কখনও আমার, তবু কেন এত কথা লিখছি আপনাকে? কোন অধিকারে? আসলে পার্টিকার্ড না পাওয়ার কারণ খুঁজতে খুঁজতে তো পার্টি নিয়ে এমন ভাবনা, উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তার নিশিযাপন। প্রশ্নহীন অস্তিত্ব নয় আমার কোনওদিনই, তাই পার্টি তার অস্তিত্বের অভ্যন্তরে আমাকে নেয়নি কখনও। পার্টিকে ভালোবেসে প্রশ্ন তুলতে চায় যে, তার চেয়ে পার্টি অনেক বেশি পছন্দ করে পার্টির আড়ালে যে অন্য কাজ করে নিতে তৎপর, অথচ নেতৃত্বের অনুগত, তাকে। এ আমার জীবনের অভিজ্ঞতা, তাই পার্টির নেতাদের সঙ্গে আমার সংলাপ নেই, আত্মীয়তা নেই কোনও। প্রশ্ন, জিজ্ঞাসার অস্থিরতাহীন সংলাপেই যে আমার আগ্রহ নেই কোনও। সমাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শিখিয়েছে মার্কসবাদ, পার্টির নেতারা তা থামাতে চান কোন মুখে? আপনার মতো পার্টিহীন এক সাধারণ সম্পাদককে লেখা তার চেয়ে অনেক সহজ, নির্ভার। 

পার্টি আপনার ডাকে সাড়া দেয়নি। পার্টি তার ক্ষমতার রাশ ছাড়তে এটুকুও রাজি ছিল না। কর্তৃত্বের কোনও শৈথিল্যে তার তীব্র আপত্তি, মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যদি মতাদর্শের দূরত্ব বাড়ে কেবলই, তখন মানুষ সেই মতাদর্শকে আর নিজের বলে মনে করতে পারে না, একথা তো রোজই শুনি, পার্টি যদি তবু নিজেকে না বদলায়, অভিজ্ঞতা আর মতাদর্শের ভেতরের ফাঁকটুকু বুঝতে না পারে, তখন মানুষ পার্টিকেও ছেড়ে চলে যায়। ’৯১ সালের আগস্টে সোভিয়েত ইউনিয়নে ঠিক তাই হয়েছিল। এক দিনে নয়, দিনে দিনে। ১৮ আগস্ট সন্ধ্যায় আমি শুনি, মস্কোর রাস্তায় ট্যাঙ্ক চলছে, গরবাচভ গৃহবন্দি, ক্রিমিয়ায়। পেরেস্ত্রোইকা আর গ্লাসনস্ত শুরু হওয়ার পর থেকেই আমি বুঝেছিলাম, আপনিই আমার সেই কাঙ্ক্ষিত কমিউনিস্ট নেতা, যাকে আমি খুঁজছি পার্টি নামক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর। আপনি গৃহবন্দি হয়েছেন শুনে আমি যেন আমার চৈতন্যে নিহিত এক উৎকণ্ঠার সমর্থন পেয়েছিলাম, সঙ্গে উদ্বেগ, কী হবে সোভিয়েত ইউনিয়নের? অভিজ্ঞতায় আমি জানতাম, যেভাবে আপনি চাইছেন, মুক্তির, স্বাধীনতার সেই আবহ কমিউনিস্টরা পছন্দই করে না। আপনি পারছেন দেখে ভালো লাগছিল, কিন্তু চূড়ান্ত সাফল্য নিয়ে সংশয় ছিল আমার। কমিউনিস্টরা পৃথিবীর যে কোনও ভূগোলেই এক, যে কোনও ইতিহাসেও। লড়বে অনেক, প্রাণ দেবে, বিজয়ের পর ক্ষমতায় পৌঁছে কেমন এক নিয়তিতাড়িত পুরুষের মতো ধীরে ধীরে সব জ্ঞান, সব চেতনা, সব উপলব্ধি হারিয়ে ফেলবে স্রেফ কর্তৃত্বের মোহে। তখন যা কথা
বলবে, বিবৃতি দেবে অথবা ভাষণ, কোনওটাই আর মানুষের স্বার্থের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে না, নিজেদের ক্ষমতালিপ্সার সঙ্গেই তখন সেসবের সম্পর্ক। সোভিয়েতের মানুষ পার্টির এই চেহারাটা রক্তমাংসে, হাড়েমজ্জায়, ব্যথা-যন্ত্রণায় টের পেয়ে গিয়েছিল। আর পার্টির বেশিরভাগ সভ্য, সমর্থকের ছিল অপরাধবোধ, কৃতকর্মের। অপরাধবোধ, দীর্ঘ-দীর্ঘদিনের স্বজনপোষণ, দুর্নীতি আর অনাচারের। মানুষের স্বার্থের বিপরীতে হাঁটার। নিজেদের প্রকৃত চলার পথ গোপন ও আড়াল করার অপরাধবোধ। নাহলে, ‘৯১
সালের আগস্টের ওই দিনগুলোতে কেন পার্টিকর্মীরা রুখে দাঁড়ালেন না সোভিয়েত আর বিপ্লবকে বাঁচাতে? সরকারি সেনাবাহিনী, ট্যাঙ্ক, প্রশাসনের কথা বাদ দিলাম। আগের ৭৪ বছরে কমিউনিস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়ে তো কেউ প্রশাসনের, প্রতিরক্ষার, স্বরাষ্ট্রবিভাগের শীর্ষে যেতে পারেননি, তাঁরা কেন শেষ প্রতিরোধটুকুও গড়লেন না? বিপ্লবের রণরক্ত সাফল্যে বিভোর যদি হয়েই থাকত সোভিয়েতের মানুষ, তবে তারা কেন বিপ্লবকে বাঁচাতে এগিয়ে এলেন না? লেনিনের মূর্তি মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখেও কেন নীরব আর নিষ্ক্রিয় থাকলেন? রাষ্ট্র তাহলে সমগ্র জনগণের হয়ে ওঠেনি আদৌ, যতই সংবিধান বলুক, যতই পার্টি ও সরকার বলুক, এমনকী যতই আপনি নিজেও বলে থাকুন না কেন?

আমি বুঝি এই অমোঘ বিচ্ছিন্নতা, মানুষের সঙ্গে পার্টির। সেই যে মায়াকভস্কি তাঁর অনন্য লেনিনগাথায় লিখেছিলেন, ‘লেনিন আর পার্টি যেন দুই ভাই। কে বলবে বড় কে, ওদের জননী ইতিহাসের কাছে।’ বুঝি, সভ্যতার ইতিহাস কত হাজার বছরের, আর পার্টির ইতিহাস তো গড়ে-ভেঙে দেড়শো বছরেরও নয়। সেই
সভ্যতায় নিজেদের অনন্য এক রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার যে সুযোগ কমিউনিস্টরা পেয়েছিল, তা তারা হেলায় হারাল। সভ্যতা, বিপ্লব, লেনিন, এমনকী নিজেদের পার্টি সম্বন্ধে কোনও দায়িত্ববোধ না থাকায় হারাল। ওরা মার্কসবাদকে ঈশ্বরচেতনার মতো মনে করেছিল, লেনিনকে মনে করেছিল ঈশ্বর আর বিপ্লবকে যেন এমন আবহের মতো যেখানে মানুষ নিয়তি বিষয়ে সন্দেহ করবে না কোনওদিন, মেনে নেবে, সব মেনে নেবে, বিষাদে, বিরস, তবু। ওরা ভাবতেই পারেনি, লেনিনের মতো ঈশ্বরের মাটিতে লুটিয়ে পড়া দেখেও মানুষ নীরব থাকবে। ওরা ভেবেছিল সেই মানুষই লেনিনকে বাঁচাবে, বিপ্লবকে বাঁচাবে, যারা এতদিন ধরে সব কিছু মুখ বুজে সহ্য করছে লেনিনের নামে, বিপ্লবের নামে, সমাজতন্ত্রের নামে। হায়, তা ঘটেনি। বিপুল উল্লাসে মানুষ স্বাগত জানিয়েছে পার্টিকে নিষিদ্ধ করা আর পার্টির সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ডিক্রিকে, আর তাতে সই করতে হয়েছে আপনাকে। কমরেড গরবাচভ, ওই সইটি করার মুহূর্তে কেমন ছিল আপনার চেতনার আলোড়ন, আমার জানতে ইচ্ছে করে। পেরেস্ত্রোইকা নিয়ে বই লিখলেন পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও প্রেসিডেন্টের দায়দায়িত্বের অসম্ভব ব্যস্ততার  মধ্যেও, কোথাও তো নিজেই বুঝতে পারছিলেন আগতপ্রায় যে সর্বনাশের কথা, তাকে ঠেকাতে। আর এখন এই খণ্ড খণ্ড অবসরে একটা স্মৃতিকথা না হোক, চৈতন্যের বিবরণী তো লিখতে পারেন, যাতে মানুষ বুঝতে চেষ্টা করবে ওই ট্র্যাজিক মুহূর্তটাকে, তার নির্মাণকে। পার্টিকে আপনি বাঁচাতে পারেননি, দেশকেও নয়, বিপ্লব বা সমাজতন্ত্রকেও নয়। আপনার কাছে এই অবসানের তো একটা হিসেব আছে, একটা উপলব্ধি কোনও, পার্টির শেষতম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নয়, ব্যক্তি হিসেবে, নেহাত ব্যক্তি, যে একদিন নবীন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জন্মে, দিনে দিনে বিপ্লবের আর পার্টির সঙ্গে একাত্ম হয়েছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অসামান্য বীরগাথা আর প্রতিরোধের অভিজ্ঞতা নিয়ে এসে পড়েছিল অচলায়তনের অদ্ভুত এক উপলব্ধিতে আর পার্টিকে সে অব্যাহত বিপ্লব পেরেস্ত্রোইকার অনুগামী করে তুলতে পারেনি বলেই পার্টিকে নিষিদ্ধ করার ডিক্রিতে সই করেছিল ইতিহাসের বাধ্যতায়।

কমরেড গরবাচভ, সেদিন, মানে ১৯৯১ সালের ২৯ আগস্ট সুপ্রিম সোভিয়েতের যে অধিবেশনে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব ওঠে এবং অনুমোদিত হয়, সেই অধিবেশনে ইতিহাসের এক ছাত্র উপস্থিত ছিলেন, তাঁর নাম রয় মেদভেদেভ। তার মাত্র দু'বছর আগে বেরিয়েছে তাঁর হাজার পৃষ্ঠার বই, ‘লেট হিস্টরি জাজ’, যার পাতায় পাতায় ছড়ানো ইতিহাসের তথ্য ও ঘটনার বিবরণ, বিপ্লবোত্তর সোভিয়েত ইউনিয়নের কলঙ্কের ইতিহাস, আর বেরিয়েছে বলেই সবাই তাঁকে কমিউনিস্ট-বিরোধী আখ্যা দিয়েছে, তবু তিনি অচঞ্চল মেধায় প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কী করছিল কমিউনিস্টরা’; উত্তর দেওয়ার মতো কেউ ছিল না ওই অধিবেশনে। তার আগের তিন-চার দিন আপনি চেষ্টা করেছিলেন আপ্রাণ, সোভিয়েতকে এক রাখার। কেউ সে কথায় কান দেয়নি। আপনি বলেছিলেন, ‘আমি চাই ইউনিয়ন। পুনর্বিন্যস্ত ইউনিয়ন। শিথিল এক নতুন কাঠামোর ইউনিয়ন।’ কেউ সে কথায় কান দেয়নি। মাত্র ১১ দিনের ঘটনাপ্রবাহে কীভাবে অর্থহীন হয়ে গেল ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’-এর সেই স্বপ্ন আর বাস্তবে মেশা অনন্য বিবরণী আর ইতিহাস। তার দায়, সেই অর্থহীনতায়? এই অনস্তিত্বে কার ভূমিকা প্রবলতম? পার্টি ছাড়া সে আর কোন দিকভ্রান্ত, অচল কম্পাস?

মার্কস একবার লিখেছিলেন, কখনও এমন হয় ইতিহাসে। কুড়ি কুড়ি বছর কেটে যায় তাৎপর্যহীন ঘটনার
অনুপস্থিতিতে, এমনই একঘেয়ে যেন মনে হয় কাটছে বুঝি আর একটি দিন। আবার কখনও এমনও হয়, এক দিনে ঘটে যায় কুড়ি বছরের ইতিহাসের সমতুল কোনও ঘটনা। বদলে যায়, নাড়া খায় ইতিহাসের গতি। ১৯১৭-র দশটি দিন ছিল তেমন, ১৯৯১-এর ১১টি দিন হল তেমন। প্রথম বার বিপ্লবে, দ্বিতীয় বার বিপ্লবের অবসানে। মাঝখানে ৭৪ বছরের পার্টি আধিপত্যের ইতিহাস। যারা সেই ইতিহাস রচনা করেছিলেন, তাঁরা কেউ কি জানতেন, বুঝতেন, এই সমবেত পাপের ফল একদিন ফলবেই ইতিহাসে? দুনিয়া জুড়ে কত কোটি মানুষের চেতনার আশ্রয় ভেঙেচুরে বিলীন হয়ে যাবে। সেই নিরাশ্রয়তার ব্যঞ্জনা কি কোনওদিন তাঁরা কেউ উপলব্ধি করবে না, যাঁরা ভবনে ভবনে গড়ে তুলছেন প্রশ্নহীন, জিজ্ঞাসাহীন আনুগত্যের দুর্গ? তাদের কাজ কি তবে শেষ, পার্টিরও শেষ হয়ে যাওয়ায়?

মেদভেদেভ কিন্তু আজও লিখছেন ইতিহাস। ‘৯১-এর পরের দিনগুলোয় রুশ জনগণের কষ্ট, যন্ত্রণা, দারিদ্র, বঞ্চনার ইতিহাস। তিনি তো ইতিহাসের ছাত্র, ইতিহাসই তাঁর অবলম্বন। আর জমানো সোনার পাহাড়ে বসে থাকা সেই বিপ্লবী কী করছেন, বিপ্লব ছিল যাদের অস্ত্র? ছিল আড়াল, স্বজনপ্রীতির, দুর্নীতির, অনাচার আর দম্ভের? 

কমরেড গরবাচভ, আমি কোনওদিন পার্টির কেউ নই, আপনিও এখন আর পার্টির কেউ নন। সেই একটিমাত্র ঐক্যের সুতো ধরে আপনাকে এত কথা আমার, পার্টিরই প্রসঙ্গে। আপনার দেশ আলাদা, ভাষা আলাদা, জীবন আলাদা, অভিজ্ঞতারও মিল নেই কোনও। তবু আপনার '৮৭ সালের ভারত সফরের সময় আমাদের সেই মফস্সল শহরের দেওয়ালে বছর পঁচিশের আমি রঙে আর তুলিতে লিখেছিলাম, ‘স্বাগত, কমরেড গরবাচভ।’ হয়তো সেদিনই লেখা হয়েছিল এই চিঠির প্রথম বাক্য, অবচেতনে। আর তারও ১৭ বছর পর আজ লিখছি, বাকি অংশ। লেখক এক, প্রাপকও এক, শুধু বদলে গেছে সারা পৃথিবীর প্রেক্ষিতটাই। সোভিয়েতের, পূর্ব ইওরোপের সমাজতন্ত্রের থাকা আর না থাকায় চেতনায় যে কোনও এক স্বপ্ন আর প্রত্যয়ের অভাব নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়, জীবনের ওপর নিরন্তর ধেয়ে আসা পুঁজি আর পণ্যের চাপ কীভাবে বয়ে বেড়াতে হয়, অসহায় আত্মসমর্পণ করে যেতে হয় অহরহ, প্রতিরোধের জোর থাকে না কোনও, কী যে সব ঘটে চলে চারপাশে, সেকথা তো চিঠিতে লেখার বিষয় নয় কোনও। সেসব, অভিজ্ঞতা। আর আমি আপনাকে জানাতে বসেছি আমার কিছু অনুভূতি। ’৯১-এর আগের আর পরের জীবনে তার কী যে তফাত, লেখা যায় না, বলা যায় না, বোঝানো যায় না কাউকে। শুধু অনুভব করে যেতে হয় স্নায়ুতে, রক্তচাপে, অবসাদে। ভাবি, দেখি, এত বদল চেতনায়, এত বদল প্রতিরোধের ক্ষমতায়, অক্ষমতায়, এত বদল সমর্পণের সহজে, তবু, আমার চারপাশের বামপন্থায় কোনও
বদলই নেই ভাষায় অথবা ভঙ্গিতে। তার দশকেও নেই, এত আলোড়নেও নেই, এত আক্রমণেও নেই, আছে শুধু এক অনড়তা, এক অচলায়তন, সব শেষ হয়ে গেলে হয়তো বা কোনও অবশেষের প্রতীক্ষায় কিন্তু সম্পূর্ণতার অহংয়ে। বোঝে না সে বদলের তাৎপর্য আর গভীরতা, মানুষের মনে। বোঝে না, এখনও অভ্যাস, স্রেফ অভ্যাস ধরে রেখেছে মিছিলকে, সমাবেশকে। প্রতিবাদের স্পর্ধা নয় কোনও, নবীনের স্বপ্নও নয়, দিনবদলের। আমি পার্টির সঙ্গে থেকে দেখেছি, বাইরেও, কত তুচ্ছ, কত অপ্রাসঙ্গিক, এই পার্টি, জীবনে, মরণে। বিপুল এই দেশের কতজন মানুষেরই বা আছে পার্টি চেতনা? পার্টি কী, জানে কি তারা? অথচ বেঁচে থাকে মানুষের সমস্ত প্রাপ্য মাথায় নিয়ে, বঞ্চনা, অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ, লাঞ্ছনা, সব সব কিছুর মধ্যে। ক’জন আশ্রয় অথবা মীমাংসা চায় পার্টির কাছে? পার্টিই বা কতজনকে দিতে পারে চৈতন্যের আশ্রয়? কী প্রাসঙ্গিকতা আছে, পার্টির সদস্য হতে না পেরে আমার ব্যক্তিগত যন্ত্রণার, আর পার্টিরই চেতনার অনড়তায় আমার অবসাদে, বিরক্তিতে?

যে আন্তর্জাতিকের সুরে সুরে, উচ্চারণে নিজেকে নিমেষে নিয়ে যেতে পারতাম এই গ্রহের যে কোনও প্রান্তের তন্নিষ্ঠ বিপ্লবীর অনুভূতি ও দায়বদ্ধতার কাছে, শরিক হতে চাইতাম তাঁর স্বপ্নের ও নির্মাণের, সেই আন্তর্জাতিক আজ পৌঁছে দিতে পারি না যে আমারই পরবর্তী পুরুষে, সন্তানে-সন্ততিতে, সে বরং মেতে ওঠে উদ্ভট এক বিশ্বায়নের রঙিনে, চলমান ছবিতে, সে ব্যথার শরিক আমি খুঁজে বেড়াই কোন বাতাসে? কোথায় আমার বৈকাল-আমুর রেলপথের মহাকর্মযজ্ঞের প্রেরণা? কোথায় মরুভূমিতে ফসল ফলানোর প্রতিজ্ঞার ছবি? মধ্য এশিয়ার লিপিহীন জনজীবনে লিপির জোগান, গল্প আর উপন্যাস, কবিতা রচনার সিদ্ধি? এত সব হারানোর হাহাকার আমি কাকে, কীভাবে পৌঁছে দেব? কত স্বপ্ন, কোটি মানুষের চেতনার গহনে বীজ পুঁতেছে আমারই কাজেকর্মে, সেসবের কোনও ধারণা যদি আমারই মধ্যে না থাকে, তবে তো বিপ্লবের মানেটাই আমি বুঝিনি। সে কি কোনও অযোগ্যতা নয়? কমিউনিস্টদের? চিঠির শুরুতে আমি লিখেছিলাম এক সচেতন শব্দ, প্রতারক। কমরেড গরবাচভ, আমি বিশ্বাস করি, আমারই জ্ঞান ও বিশ্বাসের গভীরে অগভীরে, কমিউনিস্টরা প্রতারণা-ই করেছে, মানুষের সঙ্গে, গত শতাব্দীর সভ্যতার প্রত্যাশার সঙ্গে। স্বপ্ন না দেখালে প্রত্যাশা জাগে না। তারা স্বপ্ন দেখিয়েছে, অথচ নিজেদের আর কোনও দায়িত্ব আছে বলে মনেই করেনি। সস্তায় লেনিনের বই আর ছবি বিলিয়েছে দুনিয়া জুড়ে, সেই পয়সায় সমাজতন্ত্রের জোর বাড়ানোর কথা ভাবেনি। সমাজতন্ত্র ভেঙেচুরে গেছে, লেনিন-মূর্তি মাটিতে। কী করেছিলেন কমিউনিস্টরা? কী করছেন এখন? মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় জঙ্গি মৌলবাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে প্রচুর প্রাক্তন কমিউনিস্ট। তাদের কারও কারও ঘরে ‘অর্ডার অফ স্ট্যালিন’ অথবা ‘অর্ডার অব লেনি ‘ পদক দেখলেও আর আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, সত্যিই নেই।

এইসব কথা আমি আপনাকে লেখার জন্য রেখে দিয়েছি একটাই কারণে। সেটুকু লিখেই শেষ করব এই অবান্তর চিঠি। আমি দেখেছি, কমিউনিস্টরা দু'ধরনের হয়। একদল স্বপ্ন, কল্পনা, অভিজ্ঞতা আর জ্ঞানের গভীরে যেতে চায়। আর একদল ক্ষমতার শিকড় আর ডালপালায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। এই দুইয়ের ভারসাম্যে, মেলবন্ধনে যথার্থ যে কমিউনিস্ট, তেমন আমি দেখি না কাউকে, দেখিনি। আপনার মধ্যে তাদেখতে পাচ্ছিলাম, আর ইতিহাসের অচেনা এক দায়িত্ববোধ। কী ট্র্যাজেডি, আপনিই হয়ে এবং  রয়ে গেলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির শেষ সাধারণ সম্পাদক, দেশ হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের শেষ প্রেসিডেন্ট। ইতিহাস কী নিষ্ঠুর, কী নির্মম। সেই নির্মমতার যন্ত্রণা যিনি উপলব্ধি ও জ্ঞান দিয়ে বয়ে বেড়াচ্ছেন, দেশ যার উধাও হয়ে গেছে, পৃথিবীর মানচিত্র থেকে, এমন এক প্রাক্তন রাষ্ট্রনায়ক যিনি, ক্ষমতার সুচটুকুও নেই যার সঙ্গে, এমন এক কমিউনিস্টের সহমর্মী হতে চাই। অসম্ভব, তবু চাই। অসম্ভবই তো মনে হয়েছিল লেনিনের বিপ্লবচেতনাকে, বাকি পৃথিবীর? স্বপ্নে আর ব্যথা-যন্ত্রণায় অসম্ভব কিছু নেই। সীমাহীন তার গভীরতা ও বিস্তার। স্বপ্নে আমি ছুঁয়েছি যাকে এক বার, সেই বিপ্লবকে, ব্যথা-যন্ত্রণাতেই যে ছুঁতে হচ্ছে এখন। কমরেড গরবাচভ, এটুকু প্রাসঙ্গিকতা তো স্বীকার করবেন, আমার যন্ত্রণাটার? সে কি কঠিন খুব অথবা অবাস্তব, নেহাত?

আপনার দীর্ঘ, নীরোগ জীবন কামনা করি। আর লেখা চাই আপনার কাছে, উপলব্ধির গহন থেকে লেখা।
দুনিয়া কাঁপানো ১১ দিনের বিবরণ নয়, চৈতন্যের বিন্যাস পড়তে চাই সেই লেখায়। ভালো থাকবেন। আর,
মার্জনা করবেন এই চিঠির চূড়ান্ত অপ্রাসঙ্গিকে আপনাকে টেনে আনার ঔদ্ধত্যকে।

পুনশ্চ: এই চিঠি শেষ করার পরই খবর এল, রাশিয়ায় নভেম্বর বিপ্লব দিবসের ছুটি বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে বার্ষিক জাতীয় ছুটির তালিকা থেকে। রাশিয়ার সংসদ ‘ডুমা’ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিপুল ভোটের তারতম্যে। অথচ বহাল রয়েছে মে দিবসের ছুটি। কমরেড গরবাচভ, শ্রমিকশ্রেণির আট ঘণ্টা কাজের অধিকার আদায়ের লড়াইকে তো তাহলে ভুলে যায়নি রাশিয়ার মানুষ, তাদের জনপ্রতিনিধিরা। সেই লড়াইয়ের ইতিহাস ও উত্তরাধিকারকে তারা মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু নভেম্বর বিপ্লবের যে স্মৃতি তাদের আছে, তার সজীবতা সত্ত্বেও, সেই বিপ্লবের পরবর্তী অভিজ্ঞতার তিক্ততায়, তারা প্রত্যাখ্যান করছে বিপ্লবের স্মৃতিকে, উত্তরাধিকারকে। এর কোনও দায় কি কমিউনিস্টদের নেই? তারাই তো বিপ্লবের পরের ৭৪ বছর
সর্বেসর্বা ছিল সমাজের, রাষ্ট্রের। আমি জানি, এসব প্রশ্নের সামনে আপনি আর যন্ত্রণাবিদ্ধ হন না। আপনার যন্ত্রণা আরও গভীরে গোপনে। সব বুঝে, শেষ চেষ্টা করেও আপনি বাঁচাতে পারেননি বিপ্লবকে।
একজন বিপ্লবীর তার চেয়ে বড় কোনও যন্ত্রণা হয় না, হতে পারে না। সেই যন্ত্রণা যে সয়েছে, তার কাছে
বাকি সব প্রশ্নই তো অবান্তর, অপ্রাসঙ্গিক।

মায়াকভস্কি তাঁর অনবদ্য লেনিনগাথায় লিখেছিলেন, ‘পার্টি মানে অযুত হাত, মগজ, চোখ, একতারে বাঁধা,
কাজও করে একসঙ্গে। পার্টি আসলে কম্পাস, যা ঠিক পথে রাখে আমাদের। সমস্ত শ্রমিকশ্রেণির মেরুদণ্ড-ই তো ওই পার্টি।’ কমরেড গরবাচভ, পার্টি মানে কি শেষপর্যন্ত ছিল এমন? অযুত হাত, মগজ আর চোখের সেই সমন্বয়ের কোন চিহ্ন তাহলে রয়ে গেল রাশিয়ার ইতিহাসে? সেকথা কি ভেবে দেখার সময় আসেনি, বাকি পৃথিবীর কমিউনিস্টদের, পার্টির নেতাদের? কই সে ভাবনা, কোথায়? কেন তা গড়ে উঠল না এখনও, সে প্রশ্ন আমি যেমন আপনাকে করব, আপনি নিজেকে করবেন, সবাই কি তা করতে রাজি? না হলে, তারা কমিউনিস্ট পার্টি করেন কেন? এই পার্টি তৈরির ইতিহাস জেনে কি তারা সভ্য হয়েছেন পার্টির? যদি না হন, এখন কি জানছেন ইতিহাস? নাকি, নিজেদের ভাবতে শুরু করেছেন ইতিহাসের নিয়ন্তা হিসেবে? হায়, সোভিয়েত উবে যাওয়ার পরও যাদের ইতিহাসচেতনা গড়ে ওঠে না, আমি তাদেরই কারও কারও ইচ্ছায় প্রত্যাখ্যাত হয়েছি ওই পার্টিরই ঘনিষ্ঠতা থেকে। কমরেড গরবাচভ, আপনাকে চিঠি লেখার কোনও অধিকার কি আমার আছে? আপনি ইতিহাসের মানুষ, আর যেন, আমি প্রাক-ইতিহাসের। সেই দূরত্বটা যেন ধরা পড়ে গেল, এই চিঠির ছত্রে ছত্রে। থাক, ধরা থাক।