মেক্সিকো সিটিতে যাওয়ার আগে জানতামই না, মানুষের শরীরের ভেতরেও একেকটা দেশ থাকে। সে দেশের কোনো সীমানা নেই, মানচিত্রে তার নাম লেখা নেই। তবু মানুষ সারাজীবন সেই দেশের পথেই হেঁটে বেড়ায়। কোথাও পুরোনো ভাঙা হাড়ের ব্যথা, কোথাও শুকিয়ে যাওয়া ক্ষত, কোথাও এমন কিছু কষ্ট, যার কথা কাউকে বলা যায় না। শরীর আমাদের শুধু বয়ে নিয়ে চলে না, কখনো কখনো সে নিজেই হয়ে ওঠে এক দীর্ঘ পথ। সে পথে হাঁটতে হাঁটতে মানুষ একদিন আবার নিজের কাছেই ফিরে আসে।
কোয়োআকানের সরু পথ পেরিয়ে যখন বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়ালাম, তখন বিকেল গড়িয়ে আসছে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ এসে পড়েছে পথের ওপর। কাসা আজুলের নীল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হলো, নীল রঙেরও বুঝি একটা মন আছে। এই নীল শুধু দেয়ালে মাখানো রং নয়। মনে হলো, আকাশের এক টুকরো এখানে এসে ঘর বেঁধেছে। কোথাও মেঘলা দুপুরের মনখারাপ, কোথাও বৃষ্টির পর ধুয়ে যাওয়া আকাশ, কোথাও বহুদিনের কান্না শুকিয়ে গিয়ে রং হয়ে বসে আছে। এই নীলের মধ্যে যেন মিশে আছে ফ্রিদার ছোটবেলা, তাঁর ভালোবাসা, তাঁর একা থাকার দিনগুলো, আর শরীরের ভেতর জমে থাকা কত না বলা কষ্ট।
কাসা আজুল—নীল বাড়ি। এই বাড়িতেই ফ্রিদা কাহলোর জন্ম, এখানেই কেটেছে তাঁর শৈশব, প্রেমময় সময়, অসুখ আর জীবনের শেষ দিনগুলো। ১৯৫৪ সালে তাঁর মৃত্যুর চার বছর পর, ১৯৫৮ সালে বাড়িটি জাদুঘর হিসেবে খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই আমার মনে হলো, আমি কোনো জাদুঘরে আসিনি। যেন কারও বাড়িতে এসেছি। এমন একজনের বাড়ি, যিনি হয়তো একটু আগেও উঠোনে এসেছিলেন, কিংবা পাশের ঘরে বসে ছবি আঁকছিলেন। এই বুঝি দরজা ঠেলে আবার ফিরে আসবেন।
ঘরগুলোতে ফ্রিদার কত ছোট ছোট স্মৃতি ছড়িয়ে আছে। তাঁর পোশাক, গয়না, বই, চিঠি, রঙের বাক্স, তুলি আর পুরোনো আসবাব। কোথাও মেক্সিকান টাইলসের উজ্জ্বল রং, কোথাও মাটির পাত্র, কোথাও পুরোনো জিনিসের গায়ে সময়ের নরম ছোঁয়া। জানালা দিয়ে আলো এসে মেঝের ওপর পড়ে আছে। উঠোনে নীল আর সবুজ পাশাপাশি এমন আপন হয়ে আছে যে মনে হয়, রং দুটো বুঝি এখানকার মাটিতেই জন্মেছে।
এই বাড়ির জিনিসগুলো শুধু একজন শিল্পীর স্মৃতি নয়। এগুলোর মধ্যে যেন লুকিয়ে আছে তাঁর প্রতিদিনের বেঁচে থাকা। কোথাও তাঁর হাসি, কোথাও তাঁর অভিমান, কোথাও এমন এক নীরবতা, যার কাছে গেলে নিজের মনের কথাও তীব্রভাবে মনে পড়ে।
আমি ধীরে ধীরে হাঁটছিলাম। মনে হচ্ছিল, ফ্রিদা আমার আশপাশেই কোথাও আছেন। কখনো তাঁর রঙিন পোশাকের ভাঁজে, কখনো দেয়ালের নীল রঙে, কখনো বাতাসে দুলতে থাকা পাতার ফাঁকে। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল আমার। অথচ কী বলব, তা কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিলাম না।
শোবার ঘরের দরজায় এসে থেমে গেলাম।
একটি বিছানা।
খুব সাধারণ।
কিন্তু বিছানার ওপরে ঝোলানো আয়নাটার দিকে তাকাতেই বুকের ভেতর কেমন একটা হাহাকার জেগে উঠল। এই আয়না শুধু একটি মুখ দেখেনি। দেখেছে কত দীর্ঘ রাত, কত অসহ্য ব্যথা, বিছানায় শুয়ে কাটানো কত দিন। দেখেছে এক তরুণীর চোখ, যে নিজের শরীরের কাছে আটকে থেকেও নিজের স্বপ্নগুলোকে আটকে রাখেনি।
১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯২৫ সাল। আঠারো বছরের ফ্রিদা তখনও জানতেন না, একটি বিকেল তাঁর জীবনের সবকিছু বদলে দেবে। বাস দুর্ঘটনায় তাঁর শরীরের অনেকগুলো হাড় ভেঙে যায়। গুরুতর আঘাত লাগে মেরুদণ্ড ও কোমরে। তারপর শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা। দিনের পর দিন তাঁকে বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়। বাইরে পৃথিবী তখনও আগের মতোই চলছিল। রাস্তায় মানুষ হাঁটছিল, গাছের পাতায় রোদ পড়ছিল, পাখিরা ডাকছিল। শুধু ফ্রিদার পৃথিবীটা যেন থেমে গিয়েছিল সেই বিছানার চারপাশে।
তাঁর মা বিছানার ওপরে একটি আয়না লাগিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে শুয়ে থেকেও ফ্রিদা নিজের মুখ দেখতে পারেন। সেই আয়নাতেই একদিন তিনি নিজের ছবি আঁকতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে আয়নাটি হয়ে ওঠে তাঁর জানালা। সেই জানালা দিয়ে তিনি তাকাতে থাকেন নিজের মুখের দিকে, নিজের শরীরের দিকে, নিজের কষ্ট আর ভালোবাসার দিকে।
আমি আয়নাটার দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।
কী আশ্চর্য! যে আয়না শুধু মুখ দেখানোর জন্য ছিল, একদিন সেটাই খুলে দিল অন্য এক জগতের দরজা। হয়তো ফ্রিদা বুঝেছিলেন, শরীর যখন নিজের ইচ্ছেমতো চলতে পারে না, তখন স্বপ্নগুলোকে আরও দূরে যেতে দিতে হয়। যে শরীর তাঁকে আটকে রেখেছিল, সেই শরীরকেই তিনি ছবির মধ্যে মুক্ত করে দিলেন। নিজের মুখ আঁকলেন। নিজের ক্ষত আঁকলেন। নিজের ভয়, ভালোবাসা, রাগ আর একাকিত্বকে রঙের মধ্যে রেখে দিলেন। নিজের কষ্টকে আড়াল করলেন না। বরং বারবার তার দিকেই ফিরে তাকালেন।
কিন্তু ফ্রিদার জীবন কি শুধু কষ্টের গল্প?
মনে মনে কথাটা ভাবতেই ঘরের আলো যেন একটু বদলে গেল। জানালার বাইরে ঝাপটা মেরে একটা পাখি ডেকে উড়ে গেল। মনে হলো, নীল দেয়ালের কোথাও কেউ মৃদু হেসে উঠেছে।
ফ্রিদার জীবনেও প্রেম এসেছিল। দিয়েগো রিভেরা নামের এক অস্থির, প্রতিভাবান মানুষকে তিনি ভালোবেসেছিলেন। ১৯২৯ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। দিয়েগো বয়সে ফ্রিদার চেয়ে অনেক বড় ছিলেন। তিনি তখনই নামকরা শিল্পী। আর ফ্রিদা ধীরে ধীরে নিজের ছবির জগৎ তৈরি করছেন। তাঁদের ভালোবাসা সহজ ছিল না। সেখানে গভীর টান ছিল, ছিল অভিমান, বিচ্ছেদ, কষ্ট, আবার ফিরে আসা। দিয়েগোকে ভালোবেসে ফ্রিদা যেমন কেঁদেছেন, তেমনি সেই ভালোবাসার ভেতর দিয়েই নিজের মনের আরও গভীরে পৌঁছেছেন।
তবু ফ্রিদা শুধু দিয়েগোর স্ত্রী হয়ে থাকেননি। তাঁর নিজের একটা জগৎ ছিল। নিজের রং, নিজের কথা, নিজের স্বপ্ন। মেক্সিকোর মাটি আর মানুষের প্রতি তাঁর গভীর টান ছিল। তিনি মেক্সিকান পোশাক পরতেন, চুলে ফুল গুঁজতেন, গলায় রঙিন গয়না পরতেন। তাঁর সাজের মধ্যেও যেন নিজের দেশকে ভালোবাসার কথা লেখা থাকত।
রঙিন পোশাক আর চুলের ফুলের আড়ালে যে শরীরটি কত কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছিল, তা হয়তো সবাই দেখতে পেত না। কিন্তু ফ্রিদা নিজের কষ্টকে লুকিয়ে রাখতে চাননি। তিনি যেন বলতে চেয়েছিলেন, এই শরীর আমার, এই জীবনও আমার। এর আনন্দ যেমন আমার, এর ব্যথাও আমার। ১৯৩৮ সালে নিউইয়র্কে তাঁর ছবির প্রদর্শনী হয়। পরের বছর প্যারিসেও তাঁর ছবি দেখানো হয়। দূরদেশের মানুষ তাঁর ছবির দিকে তাকাতে শুরু করে। যে নারী একসময় বিছানায় শুয়ে আয়নায় নিজের মুখ আঁকতেন, তাঁর ছবিই একদিন পৌঁছে গেল পৃথিবীর নানা প্রান্তে। তবু তাঁর ছবির মধ্যে দূরের কোনো কল্পনার দেশ ছিল না। ছিল নিজের জীবনের কথা। কখনো সেই জীবন রক্তাক্ত, কখনো ভালোবাসায় ভেজা, কখনো অদ্ভুত সুন্দর।
১৯৩৯ সালে আঁকা দ্য টু ফ্রিডাস ছবিটির কথা মনে পড়ল। পাশাপাশি বসে থাকা দুজন ফ্রিদা। দুজনের পোশাক আলাদা, বুকের ভেতরকার ব্যথাও যেন আলাদা। অথচ তাদের হৃদয় কোথাও গিয়ে এক হয়ে আছে।
ছবিটার দিকে তাকালে মনে হয়, মানুষ কখনো কখনো নিজের ভেতরেই দুজন হয়ে বেঁচে থাকে। একজন ভালোবাসে, অন্যজন সেই ভালোবাসার কষ্ট বয়ে বেড়ায়। একজন পৃথিবীর সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, অন্যজন নিজের ভেতরে চুপচাপ কাঁদে। তবু তারা দুজনেই একই মানুষ।
দিয়েগোর সঙ্গে বিচ্ছেদের পরও ফ্রিদা থেমে থাকেননি। নিজের ছবির মধ্যে বারবার ফিরে গেছেন নিজের কাছে। ১৯৪০ সালে তাঁরা আবার বিয়ে করেন। তাঁদের সম্পর্কের সব জট খুলে যায়নি, কিন্তু ফ্রিদার জীবনও কোনো একটি সম্পর্কের মধ্যে আটকে থাকেনি।
তাঁর বন্ধুত্ব ছিল, শিল্পী বন্ধু ছিল, নিজের দেশ ও মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা ছিল। তাঁর বাড়িতে শিল্পী, কবি, চিন্তক আর দূরদেশ থেকে আসা মানুষেরা আসতেন। নীল বাড়িটি যেন ধীরে ধীরে সবার জন্য এক আশ্রয় হয়ে উঠেছিল। সেখানে মানুষ শুধু বেড়াতে আসত না, নিজেদের মনের কথাও যেন রেখে যেত।
আমি আবার বিছানাটার দিকে তাকালাম।
এত কিছুর পরও শরীর তাঁকে শান্তি দেয়নি। একের পর এক অস্ত্রোপচার, ব্যথা আর অসুখ তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। তবু ১৯৫৩ সালে মেক্সিকোতে তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনীতে তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে।
শরীর তাঁকে গ্যালারিতে হেঁটে যেতে দেয়নি। তাই বিছানাটিকেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেখানে। নিজের বিছানায় শুয়েই তিনি মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন।
ভাবলাম, কী অদ্ভুত এক জেদ ছিল তাঁর! শরীর যতই তাঁকে আটকে রাখুক, মনের দরজা তিনি বন্ধ হতে দেননি। নিজের জীবনকে আড়াল না করে মানুষের সামনে মেলে ধরেছিলেন।
হয়তো সাহস মানে কষ্ট না পাওয়া নয়। সাহস মানে কষ্ট নিয়েও বেঁচে থাকা। নিজের ভাঙা জায়গাগুলোকে লুকিয়ে না রেখে তাদের ভেতর দিয়েই একটু আলো আসতে দেওয়া।
আমি শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোনে এলাম।
ফ্রিদা যেন আমার সঙ্গেই বেরিয়ে এলেন।
বিকেলের আলো তখন নীল দেয়াল বেয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামছে। ক্যাকটাসের কাঁটায় আলো আটকে আছে। মাটির পাত্রের পাশে কয়েকটি ফুল ফুটে আছে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। পাতাগুলো নড়ছে খুব আস্তে।
আমি হাঁটছিলাম।
ফ্রিদা পাশে।
“তুমি এত ফুল ভালোবাসতে কেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
তিনি বললেন, “কারণ ফুল জানে, অল্প সময়ের মধ্যেও কীভাবে পুরোপুরি ফুটে উঠতে হয়।”
আমি হেসে বললাম, “তোমার জীবনও কি তেমন ছিল?”
তিনি একটু থামলেন। তাঁর চুলের ফুলগুলো বাতাসে কেঁপে উঠল।
“জীবনকে তো আমরা বেছে নিই না। কিন্তু তার ভেতরে কী রং রাখব, সেটা কখনো কখনো বেছে নিতে হয়।”
আমি চুপ করে গেলাম।
কথাটা আমার মনের মধ্যে কোথায় যেন গিয়ে বসে রইল। মনে হলো, এতক্ষণ ধরে যে নীল বাড়ির ঘরগুলো ঘুরে দেখছি, সেগুলো শুধু ফ্রিদার জীবনকে ধরে রাখেনি, আমার নিজের জীবনকেও যেন কোথাও ছুঁয়ে যাচ্ছে।
মানুষের শরীর, তার কষ্ট, তার ভালোবাসা—সবই কি শেষ পর্যন্ত নিজের ভেতরে একটা বাড়ি তৈরি করার চেষ্টা নয়? এমন একটা বাড়ি, যেখানে ফিরে এলে মানুষ নিজের সঙ্গে একটু বসতে পারে।
কাসা আজুলের উঠোনে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, ফ্রিদার জীবন আর তাঁর ছবিকে আলাদা করে দেখার কোনো উপায় নেই। তাঁর ছবির রং যেন বাড়ির দেয়ালে উঠে এসেছে। তাঁর চুলের ফুল যেন উঠোনে ফুটে আছে। তাঁর মেক্সিকান পোশাক যেন ঘরের ভাঁজে এখনও নিঃশ্বাস নিচ্ছে। এমনকি তাঁর চুপ করে থাকার মুহূর্তগুলোও যেন বাড়ির কোনো এক কোণে রয়ে গেছে।
আমরা স্টুডিওর দিকে গেলাম।
ইজেলটি দাঁড়িয়ে আছে।
তুলি।
রঙের প্যালেট।
ক্যানভাস।
সবকিছু এত চুপচাপ যে মনে হলো, সময় এখানে এসে বসেছিল, তারপর আর উঠতে পারেনি।
আমি সাদা ক্যানভাসের সামনে দাঁড়ালাম।
ফ্রিদা আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন।
“ভয় পাচ্ছ?”
“সাদা ক্যানভাসকে?”
“না। নিজের ভেতরের সাদাটাকে।”
আমি তাঁর দিকে তাকালাম।
তিনি হাসলেন।
“সেখানেই তো প্রথম রংটা বসাতে হয়।”
জানালা দিয়ে হঠাৎ বাতাস ঢুকল। পর্দা দুলে উঠল। উঠোনের ফুলগুলো একবার কেঁপে উঠল, যেন কেউ তাদের গায়ে হাত বুলিয়ে দিল।
আমি চোখ বন্ধ করলাম।
কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না।
চোখ খুলে দেখি, সাদা ক্যানভাসে একটি নীল দেয়াল।
তার সামনে একটি উঠোন।
উঠোনের মাঝখানে একটি গাছ।
আর গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে আছেন একজন নারী।
চুলে ফুল।
মুখটা স্পষ্ট নয়।
তবু তাঁকে চিনতে আমার একটুও সময় লাগল না।
আমি ফিসফিস করে বললাম, “এ কে?”
ফ্রিদা বললেন, “যে এখনও নিজের বাড়িটা খুঁজছে।”
“সে কি আমি?”
তিনি আমার দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে সেই অদ্ভুত মায়া, যার মধ্যে একই সঙ্গে শক্তি আর কোমলতা মিশে আছে।
“তুমি কি তা জানতে চাও?”
আমি উত্তর দিলাম না।
কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। শুধু তাদের সঙ্গে কিছুদিন হাঁটতে হয়। তাদের পাশে বসে থাকতে হয়। কখনো তাদের জন্য একটি জানালা খুলে দিতে হয়, কখনো একটি রং বেছে নিতে হয়। হয়তো উত্তর আসার আগেই মানুষ বুঝতে পারে—সে আর আগের জায়গাটিতে নেই।
সন্ধ্যা নেমে আসছিল।
কাসা আজুল থেকে বের হওয়ার আগে একবার পেছনে তাকালাম।
নীল দেয়াল।
খোলা জানালা।
সবুজ উঠোন।
কোথাও ফ্রিদা নেই।
তবু মনে হলো, তিনি আমার সঙ্গে বেরিয়ে এসেছেন।
মেক্সিকো সিটির ব্যস্ত রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মানুষের ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ নিজেকে খুব একা লাগল। গাড়ির শব্দ, মানুষের কণ্ঠ, দোকানের আলো—সবকিছু যেন দূরের কোনো পৃথিবী। মনে হচ্ছিল, আমি যে শহরে ঢুকেছিলাম, বেরিয়ে এসে সেই একই শহরে আর ফিরিনি।

0 মন্তব্যসমূহ