বেবী সাউ

ধিকিধিকি আগুন জ্বলছে। শনশন হাওয়া বইছে উত্তরের।

প্রবল ঠান্ডায় জমে উঠছে শরীরের আরেক পাশ। কিন্তু সেই তীব্র তীক্ষ্ণ ঠান্ডা কিছুতেই কাবু করতে পারছে না এই ক'জনের মন। জীবনের দুখ-সুখ, স্মৃতি, আনন্দ-দুঃখ-বেদনার কথা ঠান্ডাকে জমতে দিচ্ছে না। তাঁরা গল্প করছেন। এটা চিরপরিচিত গ্রামের চিরপরিচিত দৃশ্য। মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত জনজাতির মধ্যে এমনভাবেই মুখে মুখে রচিত হয় জীবনের কাহিনি। আর সেই শিকারপ্রণালী থেকে শুরু করে অরণ্য, বৃষ্টির অপেক্ষা, মৃত্যুর রহস্য, প্রেমের আনন্দ কিংবা অজানাকে জানার বিস্ময় ডালপালা মেলে ছড়িয়ে দিচ্ছে জন্ম থেকে প্রজন্মে।

সভ্যতা এগিয়েছে, আগুনের পাশে বসা মানুষ পৌঁছে গেছেন হয়ত মুদ্রণযন্ত্রের যুগে, রেডিও-টেলিভিশনের যুগে, ইন্টারনেটের যুগে, আর এখন তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অভাবনীয় বিস্তারের সময়ে। কিন্তু গল্প শোনার যে কৌতূহল তা কমেনি একটুও। পরিবারের বড় কেউ গল্প বলছেন, তাঁর কুঁচকে যাওয়া চোখে হাজার বছরের ইতিকথা, চামড়ার খাঁজে আদিম রহস্য আর আমরা সেই রহস্য ভেদ করতে করতে আমাদের শৈশব পার করছি, কৈশোরের স্বপ্নের হাত ধরছি। কখনও বা বড় হয়েও রাতের নিভৃতে রচনা করছি এক কল্পনার দেশ।

আজকাল, স্ক্রিনের পর্দায় আঙুল ছোঁয়ালেই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের সংবাদ, ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন, বিনোদন কিংবা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অসংখ্য বিবরণ আমাদের সামনে এসে হাজির হয় আলাদিনের প্রদীপের সেই জিনের মতো। যে তথ্য সংগ্রহ করতে একসময় দিনের পর দিন গ্রন্থাগারে কেটে যেত, পাড়ি দিতে হত দীর্ঘ পথ, এখন কয়েক সেকেন্ডে পাওয়া সম্ভব। যে ভাষা বুঝতে অভিধান খুলতে হতো, প্রযুক্তি মুহূর্তের মধ্যে হাজির করছে হাজারো অর্থ। এমনকি বিভিন্ন ভাষায়ও। আর এখন তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা লিখতে পারে কবিতা, তৈরি করতে পারে গল্পের খসড়া, অনুবাদ করতে পারে দুর্বোধ্য ভাষার পাঠ, এমনকি মানুষের প্রশ্নের উত্তরে যুক্তি সাজিয়ে দিতে পারে।

কিন্তু তাতে কি আমাদের মনের ক্ষুধা মেটে? আমরা দেখি একটা সাধারণ কাক উড়ে গেল আকাশে। আর তারপরেই হয়ে গেল বিরাট এক ড্রাগন। ছুঁয়ে ফেলল আকাশ-মাটি-পাতাল। রাতের ঘন অন্ধকারের মধ্যে ডাকছে টিকটিকি। হঠাৎ করে সে হয়ে গেল ফেরেশতা থেকে উঠে আসা এক অলৌকিক পুরুষ। সারারাত ধরে গল্প শোনাল, বলল ভূত-ভবিষ্যৎ এবং... প্রেম... আশ্চর্য এবং অলৌকিক...

এই যে কল্পনা এবং আশ্চর্য এক জগতের নির্মাণ, তা কেমন করে রচনা করবে প্রযুক্তি? করতেও পারে, করুক গে!

কিন্তু গল্প বলার আনন্দ? জীবনের গল্প, জীবনকে ছুঁয়ে থাকার গল্প, গল্পের ভেতর দিয়ে আরেকটা গল্পে ঢুকে পড়ার গল্প কিংবা আশ্চর্যজনক সেই চেয়ে থাকা চোখের সামনে গল্পকথক যখন হয়ে উঠছেন মহাকথাকার ব্যাসদেব—সেই আনন্দ ছুঁতে পারবে কোনও অ্যালগরিদম? আর গল্প শোনার, বলার এবং লেখার যে আনন্দ, সেটা তো আর পাওয়া সম্ভব না! আসলে, প্রত্যেক মানুষের গোপন কিছু কক্ষ আছে। গোপন কিছু ইচ্ছা, যেখানে রোজ জাল বোনে শব্দের আশ্চর্য দুনিয়া। কাহিনি তৈরি করে তার ভিত্তিপ্রস্তর। আর তার হাত ধরেই একজন মানুষ স্রষ্টার আনন্দে মেতে ওঠেন। লেখেন। গোপন কক্ষের কথা হয়ে ওঠে গল্প, কবিতা—সাহিত্য! আর তখনই আমাদের কাছে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বোঝা যায়, প্রযুক্তির যুগে সাহিত্যের প্রয়োজন কমেনি তো, উলটো অন্য এক মাত্রা অর্জন করেছে।

আমরা এমন এক সময়ে এসে পৌঁছেছি, তথ্যের প্রবাহ ক্রমশ দ্রুততর হচ্ছে, কিন্তু সেই তথ্যকে আত্মস্থ করার অবকাশ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। প্রতিদিন অসংখ্য সংবাদ, ছবি, ভিডিও, মতামত, বিজ্ঞাপন এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছি আমরা। একটি দুর্ঘটনার ছবি দেখার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অন্য একটি হাসির ভিডিও আমাদের মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে। একটি যুদ্ধের সংবাদ পড়তে পড়তেই আমরা পৌঁছে যাচ্ছি কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপনে। এই বিপুল দৃশ্যের মধ্যে একটি বিপদ আছে—আমরা অনেক কিছু দেখছি, কিন্তু এত কিছুর সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত হতে পারছি না।

অথচ সাহিত্য আমাদের থামতে শেখায়। দাঁড়াতে শেখায়। ভাবার অবকাশটুকু দেয়। প্রযুক্তি আমাদের সামনে মানুষের ছবি তুলে ধরতে পারে, কিন্তু সাহিত্য আমাদের সেই ছবির অন্তর্গত জীবন সম্পর্কে আমাদের অভিযাত্রী করে তোলে।

তা বলে, যন্ত্রের সক্ষমতাকে অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপুল পরিমাণ ভাষাগত উপাদান বিশ্লেষণ করে লেখার খসড়া তৈরি করতে পারে, বিভিন্ন রচনাশৈলী অনুসরণ করতে পারে, নতুন ধারণা সাজাতে সাহায্যও করতে পারে। সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির এই ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অনুবাদ, সম্পাদনা, গবেষণার প্রাথমিক প্রস্তুতি কিংবা ভাষাগত সংশোধনের কাজে প্রযুক্তি লেখককে সহযোগিতা করতে পারে।

আবার এটা ভুললেও চলবে না, সাহিত্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, ইতিহাস, শেকড়, সমাজ, দ্বন্দ্ব—আরও অনেক কিছু। একজন লেখক যখন তাঁর শৈশবের গ্রাম নিয়ে লেখেন, তখন তিনি সেই গ্রামের মাটির গন্ধ, বর্ষার শব্দ, উৎসব, হাসি-কান্না, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক বৈষম্য, আবেগ সবকিছুই তাঁর লেখায় প্রবেশ করে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বৃহত্তর সামাজিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে যায়। একটি নির্দিষ্ট জীবনের ভিতর দিয়ে তিনি তুলে আনেন বৃহত্তর জীবনের কথা।

অবশ্য মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থাকলেই সাহিত্য সৃষ্টি হবে, এমন নয়। কল্পনা, গবেষণা, বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, ভাষার সৃজনশীল ব্যবহার সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের লেখা থেকে শিখে ভাষা ব্যবহার করে এমন রচনা তৈরি করছে, সেটাও পাঠকের মনে আবেগের সঞ্চারও করতে পারে।

এবার আসল প্রশ্ন একটা উঠে আসতেই পারে—কোন সামাজিক ও ঐতিহাসিক অবস্থান থেকে লিখছে, তার বক্তব্যের দায় কে গ্রহণ করছে এবং সেই রচনার সঙ্গে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক কী?

একজন লেখক তাঁর সময়ের সাক্ষী। তিনি সমাজের প্রচলিত সত্যকে প্রশ্ন করে নিজের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে, ক্ষমতার ভিতর লুকিয়ে থাকা সত্য-অসত্যকে প্রকাশ করতে পারেন। তাঁর লেখা সামাজিক স্মৃতির অংশ হয়ে উঠতে পারে। তাঁর রচনার মূল্য তখন শুধু ভাষার মধ্যে আটকে না থেকে বাস্তবকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করে দেবে, বলা বাহুল্য।

প্রযুক্তি লেখককে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু লেখকের সামাজিক দায়িত্ব তার হয়ে বহন করতে পারে না। শেষ পর্যন্ত কোন অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে, কীভাবে ভাষা তৈরি করা হবে এবং কোন সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো হবে—এই সিদ্ধান্তের নৈতিক দায় লেখকেরই।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সাহিত্যের ভবিষ্যৎ ভাবতে গেলে প্রযুক্তিকে প্রতিপক্ষ হিসেবে না ভেবে, তাকে অন্যভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করা উচিত। লেখক যদি প্রযুক্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, আখেরে লাভ কিছু হবে বলে মনে হয় না। কিন্তু লেখক যদি প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাঁর সৃজনশীল স্বাধীনতার ক্ষেত্রকে বিস্তারিত করেন, সে ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের সাহিত্য আরও উন্নত এবং বৈচিত্র্যময় হবে আশা করা যায়। ·