উমবের্তো একো ছিলেন ইতালির লেখক, অধ্যাপক ও গবেষক। ভাষা, চিহ্ন, বই, ইতিহাস এবং মানুষ কীভাবে অর্থ তৈরি করে, এসব ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের পড়াশোনার বিষয়। মধ্যযুগ নিয়েও তিনি বহু বছর কাজ করেছেন। কথাসাহিত্য লেখার আগে তিনি মূলত চিন্তা ও গবেষণার বইয়ের জন্য পরিচিত ছিলেন। সেই মানুষটিই যখন প্রথম উপন্যাস লিখলেন, তৈরি হলো The Name of the Rose। বইটি প্রকাশের পর বিপুল পাঠকপ্রিয়তা পায়। কিন্তু এটি শুধু একটি রহস্যকাহিনি নয়। এর মধ্যে আছে খুন, অনুসন্ধান ও উত্তেজনা, আবার আছে মধ্যযুগের ধর্মীয় দ্বন্দ্ব, বই ও জ্ঞানের ওপর নিয়ন্ত্রণ, সত্য খোঁজার চেষ্টা এবং মানুষ যা দেখে তার অর্থ কীভাবে বোঝে, সেই প্রশ্নও। পরে Postscript to The Name of the Rose বইয়ে একো ফিরে তাকিয়েছেন এই উপন্যাসটির জন্ম ও নির্মাণের দিকে।
যাঁরা উপন্যাসটি পড়েননি, তাঁদের জন্য গল্পটা অল্প করে জানা দরকার। ঘটনাটি ১৩২৭ সালের। ফ্রান্সিসকান সন্ন্যাসী উইলিয়াম অব বাস্কারভিল তাঁর তরুণ সঙ্গী আদসো অব মেলককে নিয়ে পাহাড়ের ওপর একটি বেনেডিক্টাইন মঠে আসেন। সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় বৈঠক হওয়ার কথা। কিন্তু তাঁদের পৌঁছানোর পর মঠে রহস্যজনকভাবে একজন সন্ন্যাসীর মৃত্যু ঘটে। এরপর আরও মৃত্যু হতে থাকে। উইলিয়াম মানুষের আচরণ, কথাবার্তা, বই এবং নানা ছোট সূত্র দেখে বোঝার চেষ্টা করেন, আসলে কী ঘটছে।
মঠটির সবচেয়ে রহস্যময় জায়গা তার বিশাল গ্রন্থাগার। বাইরে থেকে সেটি শক্ত দুর্গের মতো, ভেতরে গোলকধাঁধা। সেখানে এমন অনেক বই আছে যা সবাই পড়তে পারে না। ফলে খুনের রহস্যের সঙ্গে জ্ঞানের প্রশ্নও জড়িয়ে যায়। কে কী জানতে পারবে? কোনো বই কি বিপজ্জনক হতে পারে? জ্ঞানকে লুকিয়ে রাখা কি ক্ষমতার একটি উপায়? এভাবেই একটি খুনের গল্প ধীরে ধীরে বই, বিশ্বাস, ক্ষমতা এবং সত্য খোঁজার গল্প হয়ে ওঠে।
এত বড় একটি উপন্যাসের শুরু হয়েছিল খুব ছোট একটি ভাবনা থেকে। ১৯৭৮ সালের মার্চে একোর মাথায় হঠাৎ একটি ইচ্ছা আসে, একজন সন্ন্যাসীকে বিষ দিয়ে মারলে কেমন হয়। এর বেশি কিছু তখন তাঁর জানা ছিল না। পরে তিনি ১৯৭৫ সালের একটি পুরোনো খাতা খুঁজে পান। সেখানে কোনো নামহীন মঠের কয়েকজন সন্ন্যাসীর নাম লিখে রেখেছিলেন। আর কিছু নয়। তখন বোঝা গেল, উপন্যাসটির বীজ হয়তো তাঁর মাথায় আরও আগে থেকেই ছিল।
সন্ন্যাসীকে বিষ দিয়ে মারা হবে, কিন্তু কীভাবে? এবার শুরু হলো খোঁজখবর। বিষ নিয়ে বহু বছর আগে কেনা একটি বই তিনি বের করলেন। সেখানে তাঁর দরকারের মতো বিষ পেলেন না। তখন একজন জীববিজ্ঞানী বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলেন, এমন কিছু আছে কি না যা হাতে ধরলে চামড়ার ভেতর দিয়ে শরীরে ঢুকতে পারে। গল্প তখনও দাঁড়ায়নি, অথচ তিনি ইতিমধ্যে জানতে চাইছেন মৃত্যুটা বাস্তবে কীভাবে ঘটতে পারে। এতে একোর লেখার ধরন স্পষ্ট হয়। কল্পনা তাঁর কাছে ইচ্ছেমতো ঘটনা বানিয়ে দেওয়া নয়। বানানো ঘটনাটিকেও এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে মনে হয়, এটি সত্যিই ঘটতে পারত।
শুরুতে তিনি গল্পটিকে মধ্যযুগে রাখার কথাও ভাবেননি। তাঁর প্রথম ভাবনা ছিল আধুনিক কালের একটি মঠ। এমনকি তদন্তকারী সন্ন্যাসীটি ইতালির একটি বামপন্থী সংবাদপত্র পড়বে, এমন ধারণাও ছিল। কিন্তু মঠ নিয়ে ভাবতে গিয়ে তাঁর নিজের পুরোনো পড়াশোনা ফিরে এল। বহু বছর ধরে তিনি মধ্যযুগের শিল্প, ধর্ম, বই, পাণ্ডুলিপি ও চিন্তা নিয়ে কাজ করেছেন। ১৯৫২ সাল থেকে তাঁর কাছে জমে ছিল অসংখ্য নোট, ফাইলকার্ড, ফটোকপি ও খাতা। কিছু নোট ছিল দানব নিয়ে, কিছু পুরোনো বিশ্বকোষ নিয়ে, কিছু নানা ধরনের তালিকা নিয়ে। এগুলো কোনো উপন্যাসের জন্য সংগ্রহ করা হয়নি। কিন্তু একসময় সবই কাজে লাগতে শুরু করল। তাঁর মনে হলো, যে যুগটি এতদিন ধরে তাঁর কল্পনার মধ্যে আছে, উপন্যাসটিকেও সেই যুগেই নিয়ে যাওয়া যায়।
মধ্যযুগকে তিনি শুধু পুরোনো পোশাক, পাথরের মঠ আর ধর্মীয় আচার দিয়ে দেখাতে চাননি। তাঁর আগ্রহ ছিল, সেই সময়ের একজন মানুষ পৃথিবীকে কীভাবে দেখত। একবার তাঁর স্ত্রী তাঁকে বলেছিলেন, বাইরে আগুন জ্বালালে গাছের ফাঁক দিয়ে যে ফুলকি উড়ে যায়, তিনি সেগুলোর দিকে কখনো ভালো করে তাকান না। পরে উপন্যাসের আগুনের অংশ পড়ে স্ত্রী বলেছিলেন, তাহলে তো তিনি নিশ্চয়ই সেগুলো দেখেছিলেন। একোর উত্তর ছিল, না, তিনি দেখেননি। কিন্তু তিনি জানতেন, মধ্যযুগের একজন সন্ন্যাসী সেই আগুনকে কীভাবে দেখত। তিনি শুধু ইতিহাসের তথ্য সাজাতে চাননি, সেই সময়ের মানুষের চোখ দিয়ে পৃথিবীটাকে দেখতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু গল্পটি বলবে কে? এতদিন একো গল্প বিশ্লেষণ করেছেন, ভাষা বিশ্লেষণ করেছেন, অন্য লেখকের লেখা নিয়ে লিখেছেন। এবার তাঁকেই গল্প বলতে হবে। এতে তাঁর কিছুটা অস্বস্তি হচ্ছিল। তাঁর মনে হলো, আজকের একজন লেখক যদি লেখেন, “নভেম্বরের শেষের এক সুন্দর সকাল ছিল”, বাক্যটি খুব চেনা শোনাতে পারে। কিন্তু মধ্যযুগের কোনো মানুষ যদি কথাটি বলে, তখন তা অস্বাভাবিক লাগবে না। তাঁর দরকার ছিল একটি মুখোশ। সেই মুখোশ হলো আদসো। একো মধ্যযুগের পুরোনো ইতিহাসলেখকদের পড়লেন, তাঁদের বলার ধরন ও ছন্দ ধরার চেষ্টা করলেন। নিজের মুখে নয়, আদসোর মুখে গল্পটি বলতে শুরু করলেন।
গল্পটি আবার সরাসরি আদসোর কাছ থেকেও আসে না। একো এমনভাবে সাজালেন যেন বহু পুরোনো একটি লেখা নানা মানুষের হাত ঘুরে, নকল ও সম্পাদনার কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে আমাদের কাছে এসেছে। এতে তাঁর আরেকটি বিশ্বাসও কাজ করেছে। কোনো বই একা জন্মায় না। বই অন্য বইয়ের সঙ্গে কথা বলে। নতুন গল্পের ভেতরে পুরোনো গল্পের স্মৃতি থাকে। তাই তাঁর উপন্যাসও শুরু হলো একটি ‘খুঁজে পাওয়া পুরোনো পাণ্ডুলিপি’র কৌশল দিয়ে।
এই শুরুটা লেখার পর একো প্রায় এক বছর থেমে গেলেন। কারণ তিনি বুঝেছিলেন, এখনই বাক্য লেখার সময় নয়। আগে সেই পৃথিবীটি তৈরি করতে হবে যার মধ্যে গল্পটি ঘটবে।
প্রথম বছরের বড় একটি সময় চলে গেল সেই কাজে। একটি মধ্যযুগীয় গ্রন্থাগারে কী কী বই থাকতে পারে, তার দীর্ঘ তালিকা করলেন। সন্ন্যাসীদের নাম, পরিচয়, বয়স, অতীত ঠিক করলেন। এমন অনেক চরিত্রের কথাও ভেবেছেন, যারা পরে উপন্যাসে আসেইনি। কিন্তু লেখকের নিজের জানা দরকার ছিল মঠের বাকি মানুষগুলো কারা। কারণ বাস্তব কোনো জায়গায় শুধু সেই মানুষগুলো থাকে না, যাদের গল্পে প্রয়োজন। দৃশ্যের বাইরে আরও মানুষ থাকে, আরও ঘর থাকে, আরও জীবন থাকে। লেখক যদি সেই অদেখা অংশটিও জানেন, দেখা অংশটি অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়।
এরপর ইতিহাস এসে তাঁর অনেক সিদ্ধান্ত বেঁধে দিল। একোর একজন তদন্তকারী দরকার ছিল। তিনি ইংরেজ হলে ভালো হয়। তাঁর চোখ তীক্ষ্ণ হবে, ছোট ছোট চিহ্ন দেখে ঘটনা আন্দাজ করতে পারবেন। একো পড়তে পড়তে দেখলেন, এই ধরনের চিন্তা চতুর্দশ শতকের ফ্রান্সিসকান জগতের সঙ্গে বেশি মানায়, বিশেষ করে রজার বেকনের পরের সময়ের সঙ্গে। চিহ্ন দেখে কোনো নির্দিষ্ট জিনিস সম্পর্কে জানার যে ধরনের ভাবনা তাঁর দরকার, সেটিও ওকামের সময়ের কাছাকাছি গিয়ে বেশি মানানসই। তাই গল্পটিকে চতুর্দশ শতকে নিয়ে যেতে হলো। অথচ এই সময়টা তিনি আগের কয়েকটি শতকের মতো ভালো জানতেন না। ফলে আবার নতুন করে পড়তে হলো। প্রথমে তিনি ওকামকেই তদন্তকারী করার কথা ভেবেছিলেন, পরে মত বদলান। শেষ পর্যন্ত তৈরি হয় উইলিয়াম অব বাস্কারভিল।
ঘটনাটি ১৩২৭ সালের নভেম্বরেই কেন? কারণ বাস্তব ইতিহাসকে মানতে হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে মাইকেল অব চেজেনা আভিনিয়নে চলে যান। তাই সময় ইচ্ছেমতো বদলানো যাবে না। আবার গল্পেরও নিজের প্রয়োজন আছে। একটি মৃতদেহকে শূকরের রক্তভরা বড় পাত্রে পাওয়া যাবে। তার জন্য শূকর জবাই হতে হবে। একো খোঁজ নিয়ে জানলেন, ঠান্ডা না পড়লে সাধারণত শূকর জবাই করা হয় না। নভেম্বর মাসে সমতলে যথেষ্ট ঠান্ডা নাও থাকতে পারে। তাই মঠকে পাহাড়ে নিয়ে যেতে হলো, যেখানে তখন ঠান্ডা ও বরফের সম্ভাবনা বেশি।
একটি ছোট ঘটনা এভাবে পুরো জায়গাটির অবস্থান ঠিক করে দিল।
হোর্হে চরিত্রটির জন্মও অনেকটা এমন। একোর দরকার ছিল একজন অন্ধ মানুষ, যে গ্রন্থাগারের সঙ্গে যুক্ত। অন্ধ মানুষ আর গ্রন্থাগারের কথা একসঙ্গে ভাবলেই তাঁর মনে হোর্হে লুইস বোর্হেস আসেন। তাই চরিত্রটির নামের মধ্যেও বোর্হেসের স্মৃতি ঢুকে গেল। একো এই ঋণ লুকাননি। কিন্তু শুরুতেই চরিত্রটির শেষ ভূমিকা তাঁর জানা ছিল না। তাঁর কথা ছিল সহজ, চরিত্রকে সেই পৃথিবীর নিয়ম মেনে চলতে হয়। লেখক একবার সেই নিয়মগুলো ঠিক করে দিলে তিনিও আর যা খুশি করতে পারেন না।
গ্রন্থাগারের গোলকধাঁধা তৈরি করতেও তাঁকে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। তাঁর জানা বেশির ভাগ গোলকধাঁধা ছিল খোলা জায়গায়। কিন্তু গ্রন্থাগার তো মাঠে হতে পারে না। তাই দরকার ঘরের ভেতরের গোলকধাঁধা। আবার ঘর আর সরু পথ বেশি হলে বাতাস চলবে না। অথচ গল্পের শেষে আগুনের প্রয়োজন আছে, আর আগুন ছড়ানোর জন্য বাতাস দরকার। ফলে কয়েক মাস ধরে নকশা করার পর এমন ব্যবস্থাও রাখতে হলো, যাতে ভেতরে যথেষ্ট বাতাস চলতে পারে। শেষের একটি ঘটনা শুরুতেই বাড়িটির গঠনকে প্রভাবিত করছিল।
মঠ বেছে নেওয়ার আরেকটি সুবিধা ছিল। একো একটি বন্ধ জায়গা চেয়েছিলেন। কয়েকজন মানুষ একই জায়গায় থাকবে, বাইরে যাওয়ার সুযোগ কম থাকবে, সময়ও সীমিত হবে। বেনেডিক্টাইন মঠ এই কাজের জন্য খুব মানানসই। সাত দিনের গল্প। দিনের সময়ও ভাগ হয় সন্ন্যাসীদের নির্দিষ্ট প্রার্থনার ঘণ্টা ধরে। তাঁর মনে হয়েছিল, জয়েসের Ulysses-এর দিনের ঘণ্টা ধরে তৈরি কাঠামো হয়তো অজান্তে তাঁর ওপর কাজ করেছে। টমাস মানের The Magic Mountain-এর পাহাড়ের ওপর বন্ধ পৃথিবীর কথাও তাঁর মনে ছিল।
এই গতির কারণেই তিনি উপন্যাসের প্রথম একশ পৃষ্ঠা ছোট করতে রাজি হননি। বন্ধু ও সম্পাদকদের কেউ কেউ বলেছিলেন, শুরুটা কঠিন, কিছুটা ছোট করা দরকার। তিনি না বলেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, কেউ যদি এই মঠে ঢুকে সাত দিন থাকতে চান, তাহলে আগে তাঁকে মঠের গতিতে চলতে শিখতে হবে। তাঁর কাছে প্রথম একশ পৃষ্ঠা ছিল এক ধরনের প্রস্তুতি। তিনি উপন্যাস পড়াকে পাহাড়ে ওঠার সঙ্গে তুলনা করেছেন। পাহাড়ে উঠতে গেলে প্রথমে শ্বাসের ছন্দ ধরতে হয়।
এখানে পাঠকের কথাও আসে। একো মনে করতেন, লেখক সব সময় কোনো না কোনো পাঠকের কথা ভাবেন। কিন্তু সেই পাঠককে আগে থেকেই তৈরি অবস্থায় পাওয়া যায় না। একটি বই নিজেই পাঠককে শেখাতে পারে, কীভাবে তাকে পড়তে হবে। শুরুতে যে পাঠক মধ্যযুগ, লাতিন কিংবা ধর্মীয় তর্কে অস্বস্তি বোধ করছেন, ধীরে ধীরে তিনিই বইটির নিয়ম শিখে ফেলতে পারেন। একো এমন একজন পাঠক চেয়েছিলেন, যে তাঁর সঙ্গে খেলায় যোগ দেবে।
তবে তিনি পাঠককে একটু ভুল পথেও চালাতে চেয়েছিলেন। শুরুতে মনে হবে, এটি একটি খুনের রহস্য। একের পর এক মৃত্যু হচ্ছে, গোয়েন্দা সূত্র খুঁজছেন, নিশ্চয়ই শেষে সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। কিন্তু ধীরে ধীরে পাঠক বুঝতে পারেন, বইটি সাধারণ রহস্যকাহিনির নিয়মে এগোচ্ছে না। লাতিন আছে, দীর্ঘ ধর্মীয় তর্ক আছে, বইয়ের ইতিহাস আছে, আবার রক্তাক্ত মৃত্যুও আছে। পাঠক এক ধরনের বই খুঁজতে এসে আরেক ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্যে ঢুকে পড়েন।
গোয়েন্দা গল্প বেছে নেওয়ার কারণও শুধু উত্তেজনা তৈরি করা নয়। গোয়েন্দা কী করেন? কয়েকটি সূত্র পান। তারপর ভাবেন, সেগুলোর মধ্যে কোনো যোগ আছে কি না। সেই যোগ ধরে সত্যটা আন্দাজ করেন। ডাক্তার রোগ ধরতে একই কাজ করেন। বিজ্ঞানীও নানা তথ্য থেকে একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করান। দার্শনিকও ছড়িয়ে থাকা প্রশ্নের ভেতরে কোনো নিয়ম খোঁজেন।
একোর কাছে গোয়েন্দা গল্প তাই অনুমানের গল্প। প্রশ্নটি শুধু “খুনি কে?” নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো, আমরা যা দেখি তার মধ্যে সত্যিই কোনো নিয়ম আছে কি না। আমরা যে সম্পর্ক খুঁজে পাই, সেটি সত্যি, নাকি আমাদের নিজের বানানো? এ কারণেই এই উপন্যাসের রহস্য শেষ পর্যন্ত পৃথিবীকে বোঝার মানুষের চেষ্টার সঙ্গে মিশে যায়।
গ্রন্থাগারের গোলকধাঁধাও এই ভাবনার সঙ্গে মেলে। গোলকধাঁধায় মানুষ একটি পথ ধরে এগোয়, কোথাও গিয়ে আটকে যায়, ফিরে আসে, অন্য পথ নেয়। সত্য খোঁজার সময়ও আমরা এমন করি। একটি চিহ্ন থেকে আরেকটিতে যাই, আন্দাজ করি, ভুল হলে আবার ভাবি। তাই গ্রন্থাগার শুধু রহস্যময় জায়গা নয়, মানুষ কীভাবে জ্ঞান ও সত্যের মধ্যে পথ খোঁজে তারও একটি ছবি।
আদসোকে কথক করার মধ্যেও একো সুন্দর একটি ব্যবস্থা করেছিলেন। ঘটনাগুলো ঘটার সময় আদসোর বয়স আঠারো। কিন্তু গল্পটি বলার সময় সে আশি বছরের বৃদ্ধ। ফলে একই ঘটনার মধ্যে তরুণ বয়সের বিস্ময় এবং বৃদ্ধ বয়সের স্মৃতি পাশাপাশি থাকে। তরুণ আদসো অনেক কিছু দেখে, কিন্তু সব বোঝে না। বৃদ্ধ আদসো বহু বছর পরে সেগুলো মনে করে।
আদসোর আরেকটি সুবিধাও ছিল। আজকের পাঠক চতুর্দশ শতকের গির্জার রাজনীতি, সন্ন্যাসীদের বিভিন্ন দল, ধর্মীয় তর্ক জানবেন না। কিন্তু গল্প থামিয়ে বারবার ইতিহাসের পাঠ দেওয়া যায় না। আদসো অনেক কিছু জানে না, তাই সে প্রশ্ন করতে পারে, অবাক হতে পারে। তার সঙ্গে পাঠকও জানতে পারেন। ইতিহাস তখন তথ্যের বোঝা হয়ে আসে না, গল্পের মধ্য দিয়েই আসে।
একো অতীত নিয়ে সব গল্পকে একই ধরনের ঐতিহাসিক উপন্যাস বলেননি। কোনো গল্পে অতীত শুধু সাজসজ্জা। দুর্গ, তলোয়ার, রাজা, ঘোড়া আছে, কিন্তু চরিত্রের জীবন অন্য যুগে নিলেও খুব একটা বদলাবে না। আবার কোনো গল্পে সত্যিকারের ঐতিহাসিক মানুষ থাকে, কিন্তু কাল্পনিক নায়ক এমন কাজ করে যা অন্য সময়েও সম্ভব।
তাঁর কাছে সত্যিকারের ঐতিহাসিক উপন্যাসে চরিত্রের কাজ ও চিন্তা সেই সময়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত থাকবে। ওই মানুষটি ওই যুগেই ওইভাবে ভাবতে এবং কাজ করতে পারত। তাই উইলিয়াম কাল্পনিক হলেও তাঁর চিন্তার শিকড় চতুর্দশ শতকের ভেতরেই থাকতে হবে।
অতীতকে একো মৃত কোনো সময়ও মনে করতেন না। আজকের অনেক চিন্তার শুরু আগের যুগে। পুরোনো দুটি ধারণা একসঙ্গে এলে নতুন একটি ধারণার জন্ম হতে পারে। ফলে তাঁর কোনো চরিত্র এমন কিছু ভাবলে যা আমাদের কাছে একটু আধুনিক মনে হয়, সেটি সব সময় ভুল নয়। নতুন যুগ তো পুরোনোর ভেতর থেকেই জন্ম নেয়।
একো মজা করে বলেছেন, পাঠকেরা কখনো তাঁর আসল মধ্যযুগীয় উদ্ধৃতিকেই খুব আধুনিক বলে সন্দেহ করেছেন, আবার তাঁর নিজের তৈরি কোনো অংশকে একেবারে খাঁটি মধ্যযুগীয় বলে প্রশংসা করেছেন। আমরা অতীতকে অনেক সময় যেমন ছিল তেমন দেখি না, নিজের ধারণা দিয়ে দেখি।
উপন্যাসটির নাম নিয়েও তিনি অনেক ভেবেছেন। প্রথম কাজের নাম ছিল The Abbey of the Crime, অর্থাৎ ‘অপরাধের মঠ’। পরে নামটি বাদ দিলেন। কারণ এতে পাঠক প্রথমেই ধরে নেবেন এটি শুধু খুনের গল্প। তিনি Adso of Melk নামটিও পছন্দ করতেন। আদসো কথক, তাই নামটি তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ।
শেষ পর্যন্ত প্রায় হঠাৎ করেই এল The Name of the Rose।
গোলাপ এমন একটি প্রতীক, যার সঙ্গে এত ধর্মীয়, সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক অর্থ জুড়ে আছে যে একটি নির্দিষ্ট অর্থে তাকে আটকে রাখা কঠিন। আর একোর ঠিক সেটাই দরকার ছিল। তিনি চাননি বইয়ের নাম পাঠককে আগেই বলে দিক, বইটির মানে কী। তাঁর মতে, নাম পাঠকের চিন্তাকে একদিকে ঠেলে দেওয়ার বদলে তাকে নানা দিকে যেতে দিক।
এই ভাবনার সঙ্গে লেখক ও পাঠকের সম্পর্ক নিয়েও তাঁর একটি বিশ্বাস জড়িয়ে আছে। বই লেখা শেষ হওয়ার পর লেখক আর তার একমাত্র মালিক নন। পাঠক বইয়ের মধ্যে এমন সম্পর্ক দেখতে পারেন, যা লেখক নিজে লিখতে বসে ভাবেননি।
একবার একজন পাঠক উপন্যাসের দুটি বাক্যের মধ্যে এমন একটি যোগ দেখেছিলেন। এক জায়গায় উইলিয়াম তাড়াহুড়ো নিয়ে কথা বলেন, একটু পরে বার্নার্ড গুইও তাড়াহুড়ো নিয়ে আরেকটি কথা বলেন। পাঠক জানতে চান, দুই কথার মধ্যে একো কী সম্পর্ক রেখেছেন। একো পরে মনে করতে পারেন, প্রথম কথাটি তিনি একেবারে শেষ পর্যায়ে যোগ করেছিলেন, দ্বিতীয়টির কথা তখন তাঁর মনে ছিল না। অথচ দুটি বাক্য পাশাপাশি এসে নতুন একটি অর্থ তৈরি করেছে।
লেখক ইচ্ছে করে করেননি। কিন্তু লেখাটি করেছে।
এই কারণেই একোর মনে হয়েছিল, বই শেষ হওয়ার পর লেখকের একটু সরে দাঁড়ানো ভালো। তিনি যদি বারবার এসে বলেন, “এর মানে এই”, “ওটার মানে ওই”, তাহলে পাঠকের নিজের পথ খোঁজার সুযোগ কমে যায়। তবে লেখক বলতে পারেন, বইটি কীভাবে তৈরি করেছেন। “বইটির মানে কী?” আর “বইটি কীভাবে বানালাম?” এক প্রশ্ন নয়।
লেখালেখি নিয়ে তাঁর আরেকটি ধারণাও খুব স্পষ্ট। তিনি হঠাৎ পাওয়া অলৌকিক ‘অনুপ্রেরণা’র গল্প খুব বিশ্বাস করতেন না। ভাবনা হঠাৎ আসতে পারে, তাঁর নিজের উপন্যাসের শুরুই তো একটি সন্ন্যাসীকে বিষ দেওয়ার ইচ্ছা থেকে। কিন্তু সেই ভাবনাকে বই বানাতে কাজ করতে হয়।
তিনি এমন একজন কবির কথা বলেছেন, যিনি দাবি করেছিলেন তাঁর একটি বিখ্যাত কবিতা ঝড়ের রাতে এক মুহূর্তে মাথায় এসেছিল। মৃত্যুর পর তাঁর পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেল। দেখা গেল, সেই কবিতাতেই সবচেয়ে বেশি কাটাছেঁড়া ও বদল ছিল। প্রথম আলোটা হঠাৎ জ্বলে উঠতে পারে, কিন্তু তার পরেই শুরু হয় আসল কাজ।
একোর নিজের উপন্যাসেও সেই কাজের ছাপ আছে। একটি দৃশ্য লেখার সময় তাঁর চারপাশে ধর্মীয় বই, নোট, ফটোকপি ছড়িয়ে ছিল। একটি লেখা থেকে একটি অংশ নিচ্ছেন, আরেক জায়গা থেকে আরেকটি, তারপর সেগুলো এমনভাবে জুড়ে দিচ্ছেন যেন আলাদা জায়গা থেকে নেওয়া বোঝা না যায়। কোথাও মাসের পর মাস গোলকধাঁধার নকশা করেছেন। কোথাও খোঁজ নিয়েছেন শূকর কখন জবাই করা হয়। কোথাও দেখতে হয়েছে একজন চতুর্দশ শতকের মানুষ কী ধরনের কথা ভাবতে পারে।
The Name of the Rose কীভাবে লেখা হলো, সেই গল্প থেকে তাই একটি সহজ কথা বোঝা যায়। উপন্যাস লেখা মানে মাথায় আগে থেকেই তৈরি একটি গল্পকে শুধু সুন্দর ভাষায় লিখে ফেলা নয়। একটি ছোট ভাবনা থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে এমন একটি পৃথিবী তৈরি করতে হয়, যার জায়গা, সময়, মানুষ ও নিয়ম আছে। সেই পৃথিবীর সবকিছু একে অন্যের সঙ্গে মিলতে শুরু করলে গল্পও শক্ত হয়ে ওঠে।
একটি মৃতদেহের জন্য শূকরের রক্ত দরকার। শূকর জবাইয়ের জন্য ঠান্ডা দরকার। ঠান্ডার জন্য মঠকে পাহাড়ে তুলতে হয়। ইতিহাসের একজন মানুষের অবস্থানের কারণে মাস ঠিক করতে হয়। আগুন লাগবে বলে গ্রন্থাগারের গোলকধাঁধায় বাতাস ঢোকার ব্যবস্থা রাখতে হয়। একজন অন্ধ গ্রন্থাগাররক্ষক ভাবতে গিয়ে বোর্হেস এসে পড়েন। গোয়েন্দার চিন্তার ধরন ঠিক করতে গিয়ে পুরো গল্পকে একটি নির্দিষ্ট শতকে নিয়ে যেতে হয়।
এই ছোট ছোট সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে মিলে একটি বিশাল উপন্যাস তৈরি করেছে।
আর তার একেবারে শুরুতে ছিল শুধু একটি ইচ্ছা।
একজন সন্ন্যাসীকে বিষ দিলে কেমন হয়?
Postscript to The Name of the Rose পড়ার সবচেয়ে বড় আনন্দ সম্ভবত এখানেই। এখানে আমরা শুধু একটি বিখ্যাত উপন্যাসের পেছনের গল্প জানি না। একজন লেখকের কাজের ঘরের ভেতরটাও একটু দেখতে পাই। বুঝতে পারি, কল্পনার সঙ্গে লাগে পড়াশোনা, কৌতূহল, খুঁটিনাটি নিয়ে মাথা ঘামানো, ভুল করা, আবার শুরু করা এবং দীর্ঘ পরিশ্রম। একটি ছোট ভাবনা কীভাবে ধীরে ধীরে একটি জীবন্ত পৃথিবীতে বদলে যায়, একোর এই বই সেই গল্পটিই বলে।

0 মন্তব্যসমূহ