নাহার মনিকা

‘গল্পপাঠ’-এর শততম সংখ্যা প্রকাশিত হচ্ছে! 

কথাসাহিত্য নিয়ে একটি ওয়েবজিন নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা এবং একশতম সংখ্যায় পৌঁছে যাওয়া খুব সহজ কথা না। এর পেছনে সাহিত্যে নিবেদিতপ্রাণ নিরলস পরিশ্রমী মানুষের মূল্যবান সময় দরকার হয়। লেখকদের লেখার আমন্ত্রণ, তাগাদা দিয়ে লেখা সংগ্রহ করা এসব তো বলাই বাহুল্য। বিশেষ করে আজকের ভিড়ে ভিড়াক্কার অনলাইন মিডিয়ার সময়ে, যখন চারদিকে রুচিগত দুর্দিন, টেলিভিশনের মেগা সিরিয়ালের মতো লেখালেখি দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া সয়লাব, তার ওপরে এসে গেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। মানুষ লিখছে নাকি এআই দিয়ে লিখিয়ে নিচ্ছে তা যাচাই করতে হিমশিম খেতে হয়। একের পর এক প্রিন্ট মিডিয়া বন্ধ হচ্ছে। হাতের একটি ডিভাইসে ঢুকে পড়েছে গোটা পৃথিবী। তেমন একটি সময়ে মননশীল কথাসাহিত্যের ম্যাগাজিনের টিকে থাকাই যেখানে মুশকিল, সেখানে ‘গল্পপাঠ’-এর শততম সংখ্যার প্রকাশ সত্যিই বিশেষ এবং আনন্দের কথা। এ যাবৎ আটশর বেশি লেখকের পাঁচ হাজারের বেশি লেখা প্রকাশ করেছে গল্পপাঠ! সাতটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। এসব পরিসংখ্যান এবং একশতম সংখ্যার প্রকাশই বলে দেয় যে, গল্পপাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়েব ম্যাগাজিন ও কথাসাহিত্যের আর্কাইভ হয়ে উঠতে পেরেছে।

প্রিন্ট মিডিয়া থেকে অন্তর্জালে পৌঁছানো যেকোনো ভাষার সাহিত্যের জন্যই অভাবনীয় একটা ঘটনা। একটি গল্প, কবিতা বা প্রবন্ধের খোঁজে লাইব্রেরির দ্বারস্থ, কিংবা বইয়ের দোকানে ধর্না দিতে হচ্ছে না,— এক সময় এটি অকল্পনীয় ছিল। আজকে আমরা সেই অভাবিতের মধ্যে বাস করছি! কাগজের পাতায় মুদ্রিত সাহিত্যপাঠের আনন্দ তূরীয়, কিন্তু স্থানিক দূরত্ব অতিক্রম করে অন্তর্জালের ডানায় ভর করে যে ক্ষুদে কালো অক্ষর পাঠকের কাছে ভেসে আসে, তার আনন্দও যে অপ্রতিরোধ্য তাতে এখন কোনো সন্দেহ নেই। বরং ধীরে ধীরে মানুষ অনলাইনে পত্রপত্রিকা পড়াতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। মুদ্রণের বিরোধিতা না করেও বলা যায় যে, কাগজের মুদ্রণে লেখার যে স্থানসংকুলানের সংকট থাকে, সম্পাদকেরা প্রায়ই লেখার ওপরে কাঁচি চালান, তা অনলাইনে নেই বললেই চলে। অনলাইনের প্রতি আগ্রহ এবং পক্ষপাত বেড়েই চলেছে। আর, এই বিবেচনায় ‘গল্পপাঠ’ পাঠক লেখক দুপক্ষের কাছে প্রিয় হতে পেরেছে।

গল্পপাঠ-এর সঙ্গে আমার পরিচয় সম্ভবত ২০১২ সালের দিকে। সে বছর বৈশাখ সংখ্যার জন্য গল্পপাঠ কতৃপক্ষ লেখা চেয়ে যোগাযোগ করেছিল। জানলাম যে শুধুমাত্র গল্প নিয়ে এই ওয়েব ম্যাগাজিন। লিংক পাঠালেন। লেখকের ছবিসহ চমৎকার সব লেখা প্রকাশিত হয়েছে। পরিচ্ছন্ন, পরিশীলিত ওয়েবসাইটটি দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। আমি ‘উন্মূল’ নামের একটি গল্প পাঠিয়েছিলাম। এরপর গল্পপাঠ-এর বিভিন্ন সংখ্যায় আমার একাধিক গল্প প্রকাশিত হয়েছে। লেখা পাঠাতে পেরে, এবং প্রকাশিত হওয়ায় আনন্দ পেয়েছি। আমার গল্প ‘চারিদিকের রোদের হাহাকারে’ নিয়ে একজন চমৎকার একটি পাঠপ্রতিক্রিয়া লিখেছিলেন।

প্রকাশিত এবং অপ্রকাশিত সব মানসম্পন্ন লেখা গল্পপাঠ প্রকাশ করে। একেবারে আনকোরা, অপ্রকাশিত লেখা হতে হবে— গল্পপাঠ-এর এ জাতীয় ছুৎমার্গ নেই, এ বিষয়টা আমার দারুণ লাগে। যে কারণে এই ওয়েবজিনে আমার বেশকিছু গল্প রয়েছে। কেউ অনলাইনে লেখালেখির সূত্র চাইলে বা এ নিয়ে আগ্রহী হলে আমি খুশিমনে গল্পপাঠ-এর লিংক দেই!

পরের বছর জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ওপরে গল্পপাঠ-এর বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিল। তখন সে বিষয়ে লেখা সংগ্রহ করা বা লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ ইত্যাদিতে সামান্য সহযোগিতা করেছিলাম, মনে আছে। পরবর্তীতে ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে গল্পপাঠ-এ লেখা পাঠানো ছাড়া আর অন্য কোনোভাবে যুক্ত থাকতে পারিনি। লেখককে সম্মান জানানোর জন্য বিশেষ ক্রোড়পত্র, তাঁদের লেখা নিয়ে আলোচনা এবং সাক্ষাৎকারের আয়োজনটি প্রশংসার দাবিদার। তাছাড়াও লেখকের সাক্ষাৎকার, নিজের লেখা গল্প নিয়ে ভাবনা এই বিষয়গুলোও লেখক পাঠকের সেতুবন্ধে গুরুত্ব রাখে বলে আমার মনে হয়।

আমি যে লেখক হিসেবে গল্পপাঠ-এর সঙ্গে সংলগ্নতা অনুভব করি, এটা নিছক আমার বেশকিছু গল্প প্রকাশিত হয়েছে বলে নয়। বরং একশটি সংখ্যা প্রকাশের মধ্য দিয়ে গল্পপাঠ যে নিজস্ব চারিত্র দাঁড় করিয়েছে সেটি আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ছোটগল্প কেন্দ্র করে শুরু হলেও পরে কথাসাহিত্য ও অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্যকে বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করছে গল্পপাঠ। কথাসাহিত্যের সমৃদ্ধ একটি অনলাইন আর্কাইভ তৈরি হয়েছে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস, ছোটগল্প, বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদ ই-বুক আকারে সহজেই পড়তে পারা যায়। দেশ-বিদেশের নানা প্রান্ত থেকে বাংলা কথাসাহিত্যের সৃজনশীল লেখকদের লেখা প্রকাশিত হয়, অনেক নতুন প্রতিভাবান লেখকের লেখা পড়েছি, যাদের নাম আগে শুনিনি। নতুন পুরাতন বিশ্বসাহিত্য অনূদিত হচ্ছে, এবং গল্পপাঠে প্রকাশিত অনুবাদের মান প্রশ্নাতীতভাবে ভালো। অনুবাদ চর্চায়, এবং বিদেশি ভাষায় সাহিত্যপাঠে স্বচ্ছন্দ নন এমন পাঠকের জন্য এটি অসাধারণ ব্যাপার! অনুবাদের মাধ্যমে ভিন্ন ভাষার সাহিত্যকে বাংলায় পড়তে পারার একটি নির্ভরযোগ্য সোর্স গল্পপাঠ। এসব নানা কারণে গল্পপাঠ দিনে দিনে আমার প্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রতিটি নতুন সংখ্যার জন্য এর অগণতি পাঠকের মতো আমিও অপেক্ষায় থাকি।

কথাসাহিত্য চর্চায় যূথবদ্ধতার কতটা প্রয়োজন তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। ব্যক্তিগতভাবে লেখক একাই তার লেখার অভিযাত্রায় যন্ত্রণা এবং আনন্দ রসাস্বাদন করেন। কিন্তু লেখাটি শেষ হবার পরে পাঠকের কাছে লেখক পৌঁছান পত্রিকার সাহিত্য পাতা, বা বই প্রকাশিত হওয়ার মধ্য দিয়ে। ওয়েব ম্যাগাজিন হিসেবে গল্পপাঠ লেখককে তো অবশ্যই, পাঠককেও সম্পৃক্ত করে নেয় বলে আমি অনুভব করি।

অন্তর্জাল বাংলা সাহিত্যের সীমানাকে মানচিত্রচ্যুত করেছে।

গল্পপাঠ-এ সীমানাবিহীন কথাসাহিত্য প্রকাশ ও পাঠ নিয়মিত থাকুক,— এই শুভকামনা। ·