'না, সম্ভব নয়।' সোমেশ বলে ও রেস্তরাঁর টেবিলে তার কনুই আলগোছে পেতে রেখে সামনের মলিন ডিশের ঘোরানো কিনার লক্ষ করতে থাকে। প্রথম গ্রীষ্মের আলোয় ওই চ্যাপ্টা ও ধবল ডিশ থেকে প্রতিফলিত শাদা, টেবিলের পালিশহীন কাঠ, প্রায়ান্ধকার দেওয়াল, চামচের মৃদু সোনালি, গেলাশের স্বচ্ছ ঝকঝকে কাচ, আর দূর থেকে ভেসে আসা যানবাহনের এঞ্জিন... সোমেশ অন্যমনস্ক হয়ে যায়। 'ভালো করে ভেবে দেখ সোমেশ,' বলে দীপক, 'দল এখন এমনিতেই ভাঙছে, আর এখন যারা সত্যিই দলকে ভালোবাসে—' সোমেশ ঘাড় ফিরিয়ে নিয়ে দীপকের দিকে সোজাসুজি তাকায়, তারপর বলে, 'শোন দীপক, আমি কতকগুলো ধরণায় বিশ্বাস করি। আর এই বিশ্বাসের পেছনে যুক্তি আছে ভালোবাসা নেই। যুক্তিগুলো যদি টেকসই না হয়, তাহলে বিশ্বাসও থাকে না।'

'ভালো কথা, তোর সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই,' দীপক উঠে দাঁড়ায়, 'গ্রুপের সিদ্ধান্ত হচ্ছে তোর ইস্তফা দেওয়া চলবে না। তোর চিঠি আমরা ফেরত দিচ্ছি; তোকে বের করে দেওয়া হবে।'

'তারপর?' 'তারপর আর কী—'

বলে দীপক ওর পকেট থেকে একটি ভাঁজকরা কাগজ সন্তর্পণে সোমেশকে দেয়। সোমেশ তা না খুলেই বোঝে ওটি তার পদত্যাগপত্র। 'চা খাবি না? আমি যে আনতে বলে দিলাম—' সোমেশ অন্যমনস্কভাবে বলে।

'তা আপত্তি নেই অবশ্য।' দীপক তার পকেট থেকে রুমাল বের করে চশমার কাচ সাফ করতে থাকে। তারপর বলে, 'সেদিন রমলাদের বাড়িতে চা খাচ্ছিলাম, এমন ডেটলের গন্ধ... আসলে পাশেই ডেটলের খোলা বোতল ছিল, ব্যস্, একটিন চা-ই নষ্ট—' বলে সে সাবধানে চশমার কাচে লেপ্টে থাকা ঝাপশা ময়লা পরীক্ষা করতে থাকে।

সোমেশ ভাবে, সেদিন স্কুলবাড়ির মাঠে ভবতোষ সরকারের মুণ্ডু ধড় থেকে কেটে আলাদা করার পর ওরকমই সাবলীল ভাবে দীপক পকেট থেকে রুমাল বের করে বলেছিল, 'আজ সকালেই বউদি পইপই করে সাবধানের কথা বলল, ঠিক ভুলে গেছি।' সোমেশ জানত দীপক সেদিন পাড়ার মুদিখানা থেকে সানলাইট কিনে নিয়ে তবেই বাড়িতে ঢুকবে। কেবল তার রুমাল নয়, দাদার গেঞ্জিও তা দিয়ে সাফ করা হবে।

চশমার পুরু উজ্জ্বল ও শাদা লেন্সের ভিতর দিয়ে দীপকের চোখ তখন দেখাচ্ছে তীব্র অথচ নিস্পৃহ। চা-এর বাটির উপর ঝুঁকে সে সাবধানে চামচ ডুবিয়ে একটুকরো ছাই তুলে আনে, তারপর নিঃশব্দে হাসে। সোমেশ ভাবতে থাকে, সে যদি, তার পদত্যাগপত্র এখন প্রত্যাহার করে নেয়, এমনকী তাহলেও কিছু হবে না। ওরা জেনে গেছে, সে আর ওদের লোক নয়। আর ফিরে যাওয়ার কোনও রাস্তা নেই। দীপকও তাকে ফিরে আসতে বলেনি, বলেছিল পদত্যাগপত্র ফেরত নিতে। ফেরত নিলে সম্ভবত তাকে বহিষ্কৃত করার রাস্তায় জটিলতা আরও কমে যায়। এটা যে সোমেশ আগেই আন্দাজ করেনি তা নয়। সমস্ত গোপনীয় কাগজপত্র আপিশে জমা দেওয়ার পর তবেই সে জানায় মতবিরোধ ঘটেছে। কারুর সঙ্গেই সে, তার আগে আলোচনা করেনি, পাছে উপদলীয় চক্রান্তের অজুহাত তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায়। শত্রুর প্রতিটি রক্তের ফোঁটায় যে গোপনীয়তা গড়ে উঠেছিল, তা ভাগ করে নেওয়াই ছিল বিশ্বাস অর্জনের একমাত্র প্রমাণ; কোনও যুক্তি নয়। আজ যদি সে বলে বিশ্বাসের প্রধান শর্ত ছিল যুক্তি, তাহলে তা ওরা শুনবে কেন। 'তাহলে কী করবি এরপর... বিয়ে... চাকরি...' দীপক ফের নিরাসক্ত গলায় বলে।

সোমেশ কোনও উত্তর দেয় না। সে জানে দীপকের এই প্রশ্ন নেহাতই সৌজন্যমূলক, আসলে তাকে বাতিল করার সিদ্ধান্ত গ্রুপের সভায় আগেই নিশ্চয়ই নেওয়া হয়েছে। দীপকও সেই স্কোয়াডে থাকতে পারে, তবে আজ নয়। আজ ওরা শেষ চেষ্টা করে দেখল। সম্ভবত কাল, কাল থেকে দীপকের কাছে যাওয়া বিপজ্জনক হবে। না, দীপক নিজে একটি আঙুলও তুলবে না, এমনকী তার পিছনে ছুরি কিংবা পিস্তল উদ্যত হওয়ার পূর্বমুহূর্তেও দীপক অবিচলিত ভাবে, ভদ্রতা বজায় রাখবে, আর সেইজন্যই সে ঢের বেশি বিপজ্জনক। 'কী আর করব,' সোমেশ বেশ কিছুক্ষণ পরে আস্তে আস্তে বলে, 'ভাবছি একটা প্রবন্ধ লিখব, মতবিরোধের কারণগুলো বাইরের লোককে জানানো দরকার—'

তৎক্ষণাৎ দীপক সোজা হয়ে বসে, 'তাহলে সত্যিই তুই—'

'না, তা নয়,' সোমেশ বলে। চেয়ারের উপর বিমলের সতর্ক ও সোজা ঘাড় থেকে চোয়ালের কঠোর নেমে আসা দেখে দীপকের কথা মনে পড়ে যায় সোমেশের, সে আবার বলে, 'পিস্তল ব্যবহার করে আমরা কিছু ভুল করিনি বিমল, পিস্তল ছাড়া রাজনীতি হয় না, আসলে গণ্ডগোলটা অন্য জায়গায়, নিছক চোরাগোপ্তা খুন, কোনও গেরিলা যুদ্ধ নয়।'

'তা সে তো গোড়া থেকেই হচ্ছিল।'

'সেইজন্যই ঠিক জায়গায় থামা দরকার,' সোমেশ ক্লান্ত গলায় বলে, তারপর যোগ করে, 'কিন্তু তুই কি প্রবন্ধটা ছাপবি?'

'দাঁড়া, কয়েকদিন সময় দে।' বিমল তার চেয়ারে নড়েচড়ে বসে, তারপর টেবিল থেকে ফাইলপত্র সরায়। সে একটি জনপ্রিয় সাপ্তাহিকের সম্পাদক। মন্ত্রী, বিদেশি দূতাবাস ও চোলাইমদের আড্ডা—সর্বত্রই তার সংবাদ সংগ্রহের যন্ত্র গোপনে কাজ করে চলেছে। একদা আধুনিক সাহিত্যের অনুরাগী ও তীব্র বামপন্থী রাজনীতির ভক্ত বিমল এখন সংবাদ ব্যবসায়ের পণ্যমূল্য বোঝায় যথেষ্ট দক্ষতা ও খ্যাতি অর্জন করেছে। ইদানীং গেরিলাযুদ্ধ সংক্রান্ত তথ্যাবলির বাজারদর যে বেশ চড়া তা বিমলের সঙ্গে কিছুক্ষণ বাক্যালাপ করার পরেই সোমেশ টের পায়। বিমল অবশ্য মনে করে যে সে গবেষণামূলক প্রবন্ধই সাধারণত ছাপায়। তবে সোমেশের তাতে কিছু এসে যায় না, বিমল তার কলেজের সহপাঠী, তার কাগজ মারফত যত বেশি সংখ্যক পাঠকের কাছে সে পৌঁছোয়, ততই ভালো। এখানে আসার আগে সে এর থেকে বেশি কিছু ভাবেনি। 'তাহলে তোরও রাজনীতি সম্পর্কে ঘেন্না ধরল,' বিমল এবার বলে।

'ঘেন্না ধরবে কেন,' সোমেশ বলে, 'তোকে তো আগেই বলেছি গণ্ডগোলটা অন্য জায়গায়। আসলে রাজনীতিকে ঘেন্না করা বা ভালোবাসার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। কোনও কোনও সময় রাজনীতি করার দরকার হয়, আবার অনেক সময়ই তা হয় না। যদি দেখি তখন আমি যা ভাবছি তা কোনও দল ভাবছে, তাহলে বাইরে থেকে ওদের সঙ্গে কাজ করব, ভিতরে ঢুকব না।'

'কেন?'

'ওই যে বললাম, আমি রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। তোর জলতেষ্টা পেলে তুই হাত দিয়ে গেলাশটা টেবিল থেকে তুলে নিবি, তার জন্য হাত, জল কিংবা গেলাশ এর কোনওটাতেই তোর আলাদাভাবে বিশ্বাস করার দরকার নেই।' 'যাক, তোর দ্বারা কিছু হবে না তাহলে,' বিমল বেশ দরাজ গলায় এবারে বলে।

'কে বলতে পারে—' সোমেশ টেবিল থেকে একটি কাগজকাটা ছুরি তুলে নিয়ে নোখের ময়লা সাফ করতে থাকে। 'তাহলে তুই এখন লুকিয়ে বেড়াচ্ছিস বল,' বিমল লঘু গলায় আবার বলে।

'হ্যাঁ, দু-পক্ষের কাছ থেকেই', বলে সোমেশ, 'দুপক্ষ, মানে পুলিশ, আর—' সে কথা শেষ না করে ভাবতে থাকে, ভবতোষ সরকারের মতোই তার অবস্থা শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়াল তাহলে! ভবতোষকে ওরা দুপক্ষই খুঁজছিল। ভবতোষ ওদের প্রতিদ্বন্দ্বী আরেকটি দলের ট্রেড ইউনিয়ন নেতা ছিল। 'তুই বরঞ্চ থানায় গিয়ে ধরা দে, সোমেশ,' বিমল হঠাৎ বলে, 'আমি অরবিন্দকে বলে দেব যেন মারধোর না করে। কিছুদিন জেলে থাক, তারপর ঝামেলা মিটে গেলে বেরিয়ে আসবি।'

স্তম্ভিত হতে গিয়ে সোমেশ হেসে ফেলে এবার, 'খবর? খবরের কী হবে? খবর না দিতে পারলে পুলিশ আমায় খামোখা জেলে পুষবে কেন?'

'খবর তো তুই আমায় দিচ্ছিস।'

'না তো,' সোমেশ বলে, 'খবর কোথায় দিচ্ছি, আমি একটা প্রবন্ধ লিখছি মাত্র।'

'ওই একই হল।'

'না, এক নয় বিমল, তুই বোকা। না, এক ফোঁটা খবরও আমার কাছ থেকে কেউ বের করতে পারবে না।'

এবারে বিমল হাসে না। চাপা ও ঠাণ্ডা গলায় সে বলে, 'সোমেশ তুই, সত্যিই নির্বোধ। আলাদা কোনও খবরের দরকার নেই। তুই পার্টি ছেড়েছিস, এখন এইটেই খবর। তোকে জেলে না রেখে স্বচ্ছন্দে যাদুঘরে রাখা যায়,' মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে যায় সোমেশ। সে যা ভয় করেছিল, এখন ঠিক তা-ই ঘটতে চলেছে। তার দলত্যাগকে ওরা এখন ব্যবহার করবে তারই দলত্যাগের কারণের বিরুদ্ধে। এ ব্যাপারে দীপক, পুলিশ কিংবা খবরের কাগজওয়ালাদের ভিতর কোন বিরোধ নেই। ওদের প্রত্যেকের কাছেই, তার দলের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের একটি 'খবর' হিশেবে সে গুরুত্বপূর্ণ, ব্যক্তি হিশেবে নয়। আর সেই জন্যই সোমেশ দ্রুত সিদ্ধান্তে আসে, তার প্রবন্ধ যেভাবেই হোক ছাপাতে হবে। 'তাহলে, কী করবি বল,' বিমল ফের বলে, 'আমি একটা আস্তানার বন্দোবস্ত করতে পারি যদি রাজি থাকিস—'

'না, থাক,' সোমেশ বলে, 'আমি একবার রমলাকে ফোন করব।'

'এখনও বিয়ে করিসনি?' বিমল চোখ ছোটো করে হাসে।

'না, কই আর' সোমেশ উঠে দাঁড়ায়।

'কেন রমলাকে বিপদে ফেলবি সোমেশ,' এবারে ধূর্তের মতো হাসে বিমল, 'তার চেয়ে দাঁড়া, আমি অরবিন্দকে একটা ফোন করি, যাহোক একটা কিছু বন্দোবস্ত—'

সোমেশ নিঃশব্দে ফের চেয়ারে বসে পড়ে। অরবিন্দও একদা তাদেরই সহপাঠী ছিল, এখন সে পুলিশের জবরদস্ত চাকুরে। এবারে হঠাৎ অবসন্ন বোধ করতে শুরু করে সোমেশ। সে তো ন্যাকা কিংবা নির্বোধ নয়, দলত্যাগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সে জানত না নাকি যে অন্যের পক্ষে তার ক্ষীণতম সংসর্গ যেমন বিপজ্জনক হতে পারে, তেমনই অন্যের কাছ থেকে নেওয়া সামান্যতম সাহায্যও তার দলত্যাগের কারণ অর্থাৎ তার বিশ্বাসকেও মুহূর্তের মধ্যে কালিমালিপ্ত করে তুলতে পারে। কাল রাতে সে সন্তোষের ফ্ল্যাটে ছিল, আজও ভেবেছিল সেখানে ফিরে যাবে, কিন্তু এখন তার অস্বস্তি বোধ হচ্ছে। এতদিন পর্যন্ত সে দলের একটি গোপন আস্তানায় থাকত। দিন তিনেক আগে সে বাড়িতে ফেরে। বাড়ির কেউই কোনও মন্তব্য করেনি। বলতে কি সকলেই তাকে বেশ সমীহ করে কথা বলেছে। কিন্তু কাল দীপকের সঙ্গে কথা বলার পরই বাড়ি ছেড়েছে। আর বাড়িতে থাকাও নিরাপদ নয়। কিন্তু রমলার একটা খবর পেলে ভালো হত। যদিও রমলার খবরের জন্য এই মুহূর্তে সে তত ব্যস্ত নয়। কে বলতে পারে হয়তো রমলার বাড়িতে সে যেতে পারে ভেবেই ওরা ওখানে ফাঁদ পেতে রেখেছে! না অত সহজে সে ব্যক্তিগত দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেবে না। নীচের রাস্তা থেকে ট্রামের শব্দ উঠে আসছে, একটু ঝুঁকে পড়লেই দেখা যায় ট্রামলাইন, পেট্রোলের গন্ধ ভেসে আসছে হাওয়ায়। জানালার বাইরে গ্রীষ্মের দীর্ঘ দিন স্বচ্ছ ও চকচকে একটি জলের ফোঁটার মতো ক্রমশ বিস্ফারিত হয়ে উঠছে। লরি ও বাসের অবিরাম গুমরানি, রিকশার মৃদু ঘণ্টা, হঠাৎ বিকট আওয়াজে একটি জেট প্লেন চলে যায়। 'না,' সে উঠে দাঁড়ায়, 'অরবিন্দকে ফোন করাটা ঠিক হবে না বিমল, তুই অন্য কী একটা যেন বলছিলি...'

বিমল একমুহূর্ত ভাবে, তারপর বলে, 'হ্যাঁ, তোর যদি আপত্তি না থাকে, তাহলে না-হয় আমার এখানেই, পাশের ঘরে থাকবি, আপিশটারও দেখাশুনো হবে। একজন বিশ্বাসী লোক...'

'তা থাকতে পারি' সোমেশ বলে, কিন্তু মুশকিল হবে প্রবন্ধটা ছাপার পর, অবশ্য তুই যদি ছাপিস—'

বিমল বলে, 'সে দেখা যাবে'খন।'

কিন্তু বিমল যত সহজে রাজি হয়, ব্যাপারটা যে তত সহজ নয়, তা সোমেশের প্রবন্ধ ছাপার পরই বোঝা যায়। বিমলের কাছে ফোন আসে। অবশ্য বিমল অত সহজে ঘাবড়ানোর ছেলে নয়। কিন্তু ওরা যে তার পত্রিকার আপিশের উপর নজর রাখছে তা বোঝা এমন কিছু কঠিন হয় না, অন্তত বিমলের মতো ঝানু সাংবাদিকের পক্ষে তো নয়ই। পুলিশের কাছে খবর দেওয়া উচিত হবে কি না প্রশ্ন করায় বিমল নিস্পৃহ গলায় সোমেশকে বলে, 'না, তার দরকার হবে না।' বিমলের ওই নির্লিপ্ত ও উদাসীন ভঙ্গি দেখেই কিন্তু সোমেশের সন্দেহ হয় যে সম্ভবত পুলিশ জানে যে সে এখানে আছে। বাইরে বেরুনোর পাট অবশ্য তার এমনিতেই ছিল না। এরপর আর সে প্রশ্ন তো ওঠেই না। কিছুদিন পরেই বিমল হন্তদন্ত হয়ে এসে রাতে বলে, 'আজ রমলা ফোন করেছিল, ওকে এখানে আসতে বলেছি।'

'সে কি,' সোমেশ বিস্ময় বোধ করে, বিরক্তও হয়।

'আমি অবশ্য বলিনি যে তুই এখানে আছিস,' বিমল নির্বিকার ভাবে বলে, 'বলেছি যে এখানে এলে তোর একটা হদিশ পাওয়া যেতে পারে,' তারপর একটু থেমে সোমেশের অসন্তুষ্ট মুখের দিকে তাকিয়ে যোগ করে, 'আরে আসুকই না আগে, দেখবি খুব একটা ঝামেলা হবে না। আর তা ছাড়া ওদের দল ভাঙছে, ওরা তোকে নিয়ে আর ততটা ব্যস্ত নয়।'

সোমেশ এবার নিশ্চিন্ত হয় যে, বিমলের সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগ রয়েছে। কিন্তু সেটা তো স্বাভাবিক, তা ছাড়া অরবিন্দ বিমলেরও সহপাঠী ছিল। তবে ঠিক স্বাভাবিক যোগাযোগ এ নয়। সোমেশের সন্দেহ হয়। সম্ভবত তার থেকে একটু বেশিই গভীর। অবশ্য তাতে তার, আপাতত কোনও অসুবিধে নেই। পুলিশ যদি তার গায়ে হাত না দিয়ে কেবল দূর থেকে নজর রাখে তাতে সোমেশ অস্বস্তি বোধ করলেও একদিক থেকে নিরাপদ। কিন্তু এই নিরাপত্তাকে সে তার প্রাপ্য বলে ভাবতে পারে না। সত্যি কথা বলতে কি এই নিরাপত্তা তার পক্ষে অপমানজনক, যেহেতু সে তার বিশ্বাস থেকে এক ইঞ্চিও সরে আসেনি। তার দলই সরে গেছে, সে নয়।

রমলা কয়েকদিন পরে তার কাছে আসে। বিমলের ধারণাই ঠিক, রমলা তাকে বলে, 'তোমায় নিয়ে আর ওরা মাথা ঘামাচ্ছে না সোমেশ। এখন শশাঙ্ককে নিয়ে খুব হৈ চৈ হচ্ছে, সে আলাদা দল তৈরি করছে।' তারপর তার দিকে ঝুঁকে পড়ে চাপা গলায় যোগ করে, দীপক এখন শশাঙ্কের দিকে। তোমার মতো ওরাও সরে আসার জন্য চুপচাপ ভেতরে ভেতরে দল পাকাচ্ছিল। তোমায় ঠিক বিশ্বাস করতে পারেনি। ভেবেছিল তুমি উলটোদিকের লোক। চালাকি করছ। এখন যদি রাজি থাকো—'

'কিন্তু আমি তো ভেতরে ভেতরে কোনও দল তৈরি করিনি,' সোমেশ বলে।

'করোনি?' রমলা একটু বিস্মিত ভাবে তাকায়, তারপর বলে, 'তাহলে এখানে কী করছ?'

'পরে বলছি,' বলে সোমেশ, 'কিন্তু... তার আগে... একটা কথা রমলা... তুমি কোন দিকে?'

'আমি?' রমলা চমকে ওঠে, তাকে অপ্রস্তুত ও নিষ্প্রভ দেখায়, 'আমি কোনওদিকেই নেই সোমেশ, আমার আর ভালো লাগছে না। ভাগ্যিশ আমি ভেতরে ঢুকিনি। কিন্তু কই বললে না তো কেন চলে এলে?'

'বলছি,' সোমেশ এবার বলে। তারপর একটু থেমে নিশ্বাস যোগ করে, 'আসলে গণ্ডগোলটা কী জানো রমলা, ওরা রক্তপাতে বিশ্বাস করে, লোকে যেমন ঈশ্বরে বিশ্বাস করে। রাইফেল ছাড়া রাজনীতি হয় না আমি জানি, কিন্তু আমার কাছে রাইফেল একটা উপায় মাত্র, ওটা ব্যবহার করা যায়, বিশ্বাস করা যায় না।'

'এসব জেনেও তুমি গেছিলে কেন?'

'ভেবেছিলাম জঞ্জাল সাফ করার কাজটাই জরুরি, ওটা আগে করা দরকার, তর্কটা পরে করলেও চলবে। দেখলাম তা হয় না।'

'কেন?'

'দলের অধিকাংশ লোকের মত ভুল জানলেও তুমি তা মেনে নিতে বাধ্য, আর বাইরের লোকের কাছে সেই মত ভুল জেনেও ঠিক বলে তোমায় প্রচার করতে হবে। তোমার কি মনে হয় না রমলা, যে, চিন্তা ও কথার এই ফারাক দিনের পর দিন অসীম নিষ্ঠাভরে চর্চা করে গেলে একটা লোক ক্রমশ ভিতর থেকে টুকরো হয়ে যায়, তার কথা আর কাজের মধ্যেও ফাঁক ক্রমশ বেড়ে যেতে থাকে?'

'এখন তোমার আর তা নেই নিশ্চয়ই,' রমলা হঠাৎ বলে।

মুহূর্তে সোমেশের মুখ রক্তহীন দেখায়, প্রাণপণ চেষ্টায় সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, 'অনেকটা কমিয়ে এনেছি। আমার প্রবন্ধটা বোধহয় তোমার ভালো লাগেনি? কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, সব লোক সমস্ত সময়ই স্বাধীন।'

'তা কি হয় সোমেশ?'

'তা না-হওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই,' সোমেশ বলে, 'ধাপে ধাপে কিস্তিতে কিস্তিতে স্বাধীন হওয়া যায় না। জেলে যে কয়েদি সে-ও জেলে থাকবে, না জেল ভেঙে পালাবে তা ঠিক করার সিদ্ধান্ত সে নিজেই নেয়। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা তার কাছ থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারে না কখনও...।'

এত কথা একসঙ্গে বলার পর সোমেশ হাঁফাতে থাকে। রমলা মৃদু গলায় বলে, 'এসব কথা ভেবে আর লাভ নেই সোমেশ, এখান থেকে চলো। বিমলবাবুও তত সুবিধের নয়, এভাবে আর কতদিন থাকবে?'

'দাঁড়াও একটু সামলে নিই; আর কয়েকটা লেখা—' সোমেশ কথা শেষ করার আগেই রমলা তার মাথায় আস্তে হাত রাখে 'অনেকদিন তেল দাওনি, মাথায় ময়লা জমেছে, উঃ কী চুল তোমার মাথায়...'

চারিদিকে বই-এর গাদা, ছাপার কালি আর পুরোনো ভিজেকাঠের গন্ধ। ট্রামের শব্দ। বাইরে গ্রীষ্মের মেঘ, জানালা দিয়ে দেখা যায়, দিগন্তের কাছে মোটা কালো একটি পেন্সিলের রেখার মতো সোজা চলে গেছে। ল্যাম্পপোস্টের মাথায় কাক ও চড়ই খড়কুটো জড়ো করেছে, তার ভিতর আলো ও অন্ধকারের একটি বুনুনি একবার জ্বলে উঠে ফের নিভে যায়। এই গ্রীষ্মের মেঘাদ্র সন্ধ্যায় রক্তিম সোনালি হলুদ আলোর ভিতর কৃষ্ণনীল মেঘে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়তে থাকে দিগন্ত বরাবর। হাওয়ায় শুকনো পাতার শব্দ, পায়ের আওয়াজ, দূরাগত জাহাজের ঝাপশা ভোঁ, হাওয়ার প্রবল ঝাপটায় ওই অস্পষ্ট ভোঁ-এর আওয়াজ উড়ন্ত পাতার মতো টুকরো হয়ে লঘু ভেসে যেতে থাকে, রমলার কপালে সোমেশ আস্তে হাত বুলোয়, ঠোঁটে আঙুল রাখে, বোঝে তার ঠোঁট কাঁপছে। দূরে বিমলের গলার আওয়াজ পাওয়া যায়, তারা তৎক্ষণাৎ সতর্ক হয়। বিমল ঘরে ঢুকে বলে, 'এখন কিছুদিন সোমেশ এখানে থাক, আপনি এসে দেখে যেতে পারবেন।'

রমলা উঠে দাঁড়ায়। বিমল ওকে বাসস্টপে এগিয়ে দিতে যায়। হঠাৎ ভয়ানক খারাপ লাগে সোমেশের, এমনকী রমলাকে বাসস্টপে পৌঁছে দেবার মতো স্বাধীনতাটুকুও তার নেই, আর সে কিনা ভাবছে সব লোক সমস্ত সময়েই স্বাধীন। এক দাসত্ব থেকে সে তো আরেক দাসত্বে এসে পৌঁছেছে তাহলে। এখন আর তার সঙ্গে পিস্তল থাকে না। থাকলেই বা কী হত। ভবতোষের সঙ্গে তো ছিল। পকেট থেকে বের করার আগেই ওরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তাহলে? এই 'তাহলে'র উত্তর তাকে খুঁজে বের করতে হবে। সে ইচ্ছে করলে বাইরে বেরিয়ে খুন হতে পারে, ইচ্ছে করলে জেল ভেঙেও তো পালানোর চেষ্টা করা যায়। কেবল তার বিপদের জন্য তৈরি থাকতে হবে। আসলে সোমেশ এখন ঝুঁকি নিতে ইচ্ছুক নয়। এই অনিচ্ছুক হওয়ার স্বাধীনতা তার আছে। সে এখানে, বিমলের কাছে থেকে, যদি আরও কটি প্রবন্ধ ছাপাতে পারে, তাহলে কিছু লোক নতুনভাবে ভাবার চেষ্টা করতে পারে। একটি খুনের ধাক্কায় যা হয়, একটি লেখার ধাক্কায় তা নিশ্চয়ই হবে না। কিন্তু খুব ধীরে হলেও কিছুটা তো হবে। আর রমলার কথা যদি সত্য হয়, তাহলে সে এখন বাইরেও বেরুতে পারে। কিন্তু এটা তাকে বাইরে বের করে আনার একটা কায়দাও হতে পারে। কী আশ্চর্য, সে রমলাকে সন্দেহ করছে অথচ বিমলকে বিশ্বাস করছে কত সহজে। সত্যি সে ভাবে, বিমল এতদিন পরে হঠাৎ দেখা হওয়ার পর বিপদের ঝুঁকি নিয়েও কোন্ উদ্দেশ্যে তাকে এখানে থাকতে দিয়েছে। খবর? না কি বন্ধুত্ব? নাকি আসলে বিমল তাকে এখানে নজরবন্দী করে রেখেছে? বিমল ও তার কাগজ সম্পর্কে নানাকথা কানাঘুষোয় সোমেশ, আগে তার দলে থাকতেই শুনেছে, যদিও ঠিক তা বিশ্বাস করেনি। তার প্রবন্ধ ছাপার পর এই সুযোগে তার সঙ্গে বিমলকেও সন্দেহ করেছে, সোমেশের দলত্যাগ ও প্রবন্ধটা নেহাতই ভাঁওতা, আসলে দলের নির্দেশেই সোমেশ, বিমলের উপর নজর রাখতে এসেছে এখানে। অবশ্য এটা ভাবা একটু বাড়াবাড়িও হতে পারে। কিন্তু যাই হোক না কেন বিমলকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা ঠিক নয়। সেদিন রাত্রে সোমেশ বিমলকে বলে, 'শোন, আমি ভাবছি, শশাঙ্কর সঙ্গে একবার দেখা করব।'

শুনে কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে থেকে বিমল বলে, 'তোকে কি আর ওরা বিশ্বাস করবে সোমেশ?'

'তা না-করলে তুই তো আছিস।'

'আমি আর নাও থাকতে পারি।'

'তার মানে?'

'তার মানে ওরা এখানেও ঢুকেছে,' বিমল শান্ত গলায় বলে।

'সে কী?'

'হ্যাঁ, ঠিক বুঝতে পারছি না, কে। তবে আমি, অরবিন্দকে বলেছি নজর রাখতে। কিছু শাদা পোশাকের লোক—'

'তাহলে তো ব্যাপারটা বড় খারাপ হল।'

'তা কিছুটা হল।'

'আর এ সবই আমার জন্য?'

'না, ঠিক তোর জন্য নয়,' বিমল ফের ঠাণ্ডা গলায় বলে, 'তোকে নিয়ে ওরা আর মাথা ঘামায় না, তোর মতো অনেকেই বেরিয়ে যাচ্ছে। এখন সকলেই প্রায় সবকিছু জানে। আসলে আমার উপর ওদের অনেকদিনের রাগ।'

'তাহলে আমি না-হয় একবার ঘুরে দেখে আসি, রমলাও বলছিল।'

'ঠিক আছে, যা ভালো বুঝিস।' বিমল নিস্পৃহ গলায় বলে, 'তবে রাজনীতি করা একদিক দিয়ে ভালো; প্রবন্ধ লোকে পড়ে আর ভুলে যায়।'

সোমেশ বোঝে বিমল তাকে সন্দেহ করে না, কিন্তু তার চেয়েও খারাপ ব্যাপার ঘটেছে। তাকে আর বিমলের কোনও প্রয়োজন নেই। এমনকী তার প্রবন্ধ সম্পর্কেও বিমলের আর বোধহয় তেমন কোনও উৎসাহ নেই। প্রথমত দলত্যাগীর সংখ্যা এখন ক্রমশ বাড়ছে, দ্বিতীয়ত, সোমেশ দলত্যাগী হয়েও বিশ্বাসভঙ্গ করতে রাজি নয়, তার কাছ থেকে গোপন কোনও খবর পাওয়ার যে তেমন কোনও সম্ভাবনা নেই, তা বোঝার পর বিমলের উৎসাহ কিছুটা ফিকে হয়ে আসা স্বাভাবিক। অতএব এখান থেকে তাকে পাততাড়ি গোটাতে হবে। কিন্তু যাবে কোথায়? সে যে নেহাতই গুরুত্বহীন একটি বাতিল লোক, তা এখন তার কাছে পরিষ্কার। রমলার সঙ্গে সে যোগাযোগ করার সিদ্ধান্ত নেয় এরপর। ফোনে রমলা তাকে বলে, 'না, বাইরে দেখা করার কী দরকার, তুমি সোজা এখানে চলে এসো।'

কিন্তু সোমেশ রাজি হয় না। ঘরে নয়, বাইরে কোথাও সে দেখা করতে চায়। বহুদিন পরে অন্ধকার, উন্মুক্ত চকচকে কালো আকাশ, জলের শব্দ, হাওয়ার একটানা বয়ে যাওয়া, এই সব কিছুর জন্য সে ব্যগ্র হয়ে ওঠে। রমলাকে সন্ধ্যায় কাশীপুর জেটির কাছে সে দেখা করতে বলে। রমলা একটু বিস্মিত হলেও আপত্তি করে না।

সোমেশের পৌঁছতে দেরি হয়। দীর্ঘদিন পর শহরের প্রান্তে অন্ধকার নদীর উপর রক্তিম কালো আকাশ, সে দেখে, দিগন্ত জুড়ে একটি পশ্চাৎভূমির মতো কারখানার উঁচুনীচ ছাউনি, চিমনি, স্টিমারের চোঙা এই সবকিছু স্পষ্ট করে তুলেছে। দূরে ব্রিজের উপর ধাবমান ট্রেনের গুমগুম আওয়াজ নদীর ভিতর থেকে অন্ধকার হাওয়ায় গম্ভীর পদধ্বনির মতো উঠে আসে। স্টিমারের একটি চলমান লাল আলো ক্রমশ দূরে যেন কুয়াশার ভিতর সরে যেতে থাকে, জলকাটার ক্ষীণ আওয়াজ। হঠাৎ কোথাও শিকলের ঝনঝনানি, রেলইয়ার্ড থেকে এঞ্জিনের বাঁশি, জাহাজের ভোঁ, পিছনে দেশলাই-এর চকিত আওয়াজ ও আলোর ঝলকানিতে সে চমকে তাকায়, তার চিনতে ভুল হয় না, দীপক এগিয়ে আসে, 'সোমেশ—' পাশ থেকে রমলার গলার আওয়াজ পাওয়া যায়, 'বাড়িতে এলে না কেন?'

সোমেশ নিরুত্তর দাঁড়িয়ে থাকে।

'আর কোনও গণ্ডগোল নেই রে,' দীপক বলে। ব্রিজের ও জেটির নীচে তীব্র অন্ধকার জলস্রোত, হাওয়া ও কলরোলে তার কথা অস্পষ্ট, সে ফের বলে, 'তোকে নিয়ে আর কোনও ঝামেলা নেই রে, রমলা বলছিল।' 'শোনো', তাকে থামিয়ে দিয়ে রমলা বলে, 'সোমেশ কী বলে আগে শোনো।' সোমেশের কাছে সমস্ত ব্যাপারটা অবাস্তব বলে মনে হয়। দীপক, রমলার সঙ্গে তার কাছে আসবে, সে ভাবেনি। বিস্ময়ের প্রথম চোট সামলে নিয়ে সে বলে, 'তোমার সঙ্গে কথা ছিল রমলা।'

রমলা বলে, 'দীপকের সামনেই বলো। যা বলার।'

সোমেশ ইতস্তত করতে থাকে। রমলা আবার বলে, 'তুমি আরও কিছুদিন সময় চাও, এই তো?'

মুহূর্তে সোমেশ যা অনুমান করার তাই করে। কোনও উত্তর দেয় না সে। রমলা ফের বলে, 'আমার কিছু বলার নেই সোমেশ। সেদিন ফিরে এসেই বুঝতে পারলাম আমার বয়স হয়েছে। আমি নেহাতই সাধারণ, নিজেকে নিয়ে পরীক্ষা করার সময় আমার নেই। তা ছাড়া কেবল নিজের সঙ্গে তর্ক করে আমি বাঁচতে পারবো না।'

সোমেশ স্তব্ধ হয়ে শোনে। তারপর বলে, 'চলো, তোমাদের এগিয়ে দিয়ে আসি।'

'কিছু বলবে না তুমি?'

'না।' বলে সোমেশ। তারপর ফুরিয়ে যাওয়া সিগারেটের প্যাকেট ছুঁড়ে ফেলে দেয় জলে। অন্ধকারে রমলার ফেরানো মুখরেখা মাঝে মাঝে যেন ভেঙে টুকরো হয়ে যায় হাওয়ায়। কয়েকগাছা চুল উড়ছে তার, বহুদুর স্মৃতির তলদেশ থেকে ধীরে ধীরে প্রখর স্রোতে যেন উঠে আসে ওই তামসী নারীর আঁধার মুখাবয়ব, তারপর ভেসে যেতে থাকে জোয়ারের প্রবল টানে পরিত্যক্ত কাগজের টুকরোর মতো।

সোমেশের কাঁধে আস্তে হাত রাখে দীপক, সোমেশ দাঁড়িয়ে থাকে; ওরা চলে যায়। কাছেই রেলইয়ার্ড, এঞ্জিনের তীব্র উজ্জ্বল সোনালি নল বসানো প্রকাণ্ড কালো গা থেকে তাপ ও গম্ভীর কাঁপুনি উঠে আসছে, নিরালোক নদীর পার, দূরে ট্রামডিপো, আকাশ অন্ধকার। সোমেশ হাঁটতে থাকে, হঠাৎ একফোঁটা জল তার কপালে পড়ে, ওই জলের ফোঁটা ক্রমশ ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে তার ভুরুর কিনারে, চোখের পাতায়, সে চোখ তুলে দেখে আকাশে রক্তিম কালো মেঘ থেকে স্বচ্ছ একটি রক্তাভা বেরিয়ে আসছে, হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে ওই মেঘ, রাস্তা জনহীন, সে পেছনে ফিরে দেখে, না কেউ নেই, কেউই তাকে অনুসরণ করছে না। কারুরই তাকে খুন, বিবাহ কিংবা গ্রেপ্তার করার দরকার নেই, সে ভাবে, বুলেটের তুলনায় ছাপার অক্ষরের আঘাত আর কতটুকু! এই কি সে চেয়েছিল, এরকম পুরোপুরি অবাঞ্ছিত হয়ে যেতে? হয়তো তাই, সে দুঃখিতভাবে মাথা নীচু করে, এখন কোনওকিছুই আর তার পক্ষে বাধ্যতামূলক নয়। হয়তো সে ভাবে এ-ই সেই নৈঃশব্দ্য, যা কথা শুরু করার আগে, শৈশবে, সকলকেই ভোগ করতে হয়।