ঝরা সৈয়দ

গল্পের অভাব নেই, সমস্যা বাছাইয়ে
সাম্প্রতিক বাংলা ছোটগল্প পড়লে প্রথমেই যে কথাটি মনে হয়, আমাদের গল্পকারদের গল্পের অভাব নেই। চারপাশে এত জীবন, এত ঘটনা, এত বদল যে বরং কোনটা নিয়ে লিখবেন, সেটাই বড় প্রশ্ন। শহর বদলাচ্ছে, গ্রাম বদলাচ্ছে, পরিবার বদলাচ্ছে। রাজনীতি মানুষের ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ছে। রাষ্ট্র কখনো মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করছে, কখনো তার পরিচয় ঠিক করে দিচ্ছে। প্রযুক্তি মানুষের কাজ কেড়ে নিচ্ছে। পুরোনো বিশ্বাস নতুন জীবনের সঙ্গে মিশছে। দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ, রাজনৈতিক সহিংসতা, ধর্ম, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, নারী-পুরুষের সম্পর্ক, অভিবাসন, সীমান্ত, যৌনতা, স্মৃতি, অপরাধবোধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সবই গল্পে আসছে।

এটি বাংলা ছোটগল্পের বড় শক্তি। আমাদের গল্পকারকে গল্পের বিষয় খুঁজতে খুব দূরে যেতে হয় না। নিজের চারপাশেই গল্প ছড়িয়ে আছে। মুশকিলটিও অনেক সময় এখান থেকেই শুরু হয়। বলার মতো এত কিছু থাকে যে কোনটা বলা হবে আর কোনটা ছেড়ে দেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একটি গল্পের মধ্যে আরও কয়েকটি গল্প ঢুকে পড়ে। একটি চরিত্রের যতটুকু পরিচয় দরকার, তার সঙ্গে প্রায় পুরো জীবনকাহিনি এসে যায়। একটি ঘটনার পাশে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও জুড়ে দেওয়া হয়। একটি দৃশ্য থেকে পাঠক যা বুঝে ফেলেছেন, পরে লেখক আবার নিজের ভাষায় সেটিই বুঝিয়ে দেন।

ফলে বাংলা ছোটগল্পের সমস্যা অনেক ক্ষেত্রে উপাদানের অভাব নয়। বরং এত উপাদানের মধ্যে গল্পের জন্য ঠিক জিনিসটি বেছে নেওয়া।

গল্পের মাটি আছে, কখনো মাটির ইতিহাস বেশি হয়ে যায়
সাম্প্রতিক বাংলা গল্পের একটি বড় শক্তি তার নিজের জায়গা। গ্রামের খাল, বিল, নলবন, নদীর ঘাট, সীমান্তের কাঁটাতার, মফস্বলের বাজার, পুরোনো বাড়ি, শহরের গলি, মাদ্রাসা, থানা, পুকুরপাড়, বনের পথ, মানুষের উঠোন, রান্নাঘর গল্পে ফিরে ফিরে আসছে।

এসব জায়গা শুধু ঘটনার পেছনে পড়ে থাকছে না, কখনো জায়গাটিই গল্পের অংশ হয়ে উঠছে। একটি পুরোনো বাড়ি ভেঙে গেলে শুধু একটি দালান হারায় না, তার সঙ্গে মানুষের অতীতের একটা অংশও হারিয়ে যায়। সীমান্তের বেড়া কখনো নিজের দেশের মানুষকেই নিজের দেশ থেকে আলাদা করে দেয়। কোনো বন বছরের পর বছর মানুষের গোপন অপরাধ জমিয়ে রাখে। কোনো খাল যুগের পর যুগ মৃতদেহ বহন করতে করতে একটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে ওঠে।

একটি সীমান্তের গল্পের কথা ধরা যাক। একজন মানুষ নিজের দেশেই বাস করেন। কিন্তু তাঁর বাড়িটি সীমান্তের বেড়ার এমন পাশে যে নিজের দেশের মূল ভূখণ্ডে যেতে হলে তাঁকে কাঁটাতারের গেট পার হতে হয়। অসুস্থ মাকে নিয়ে সেই পথ পাড়ি দিতে গিয়ে নিজের দেশের সীমান্তরক্ষীর গুলিতেই মা মারা যান। এই গল্প থেকে সীমান্তটি সরিয়ে দিলে গল্পটিই আর থাকে না। কাঁটাতার এখানে শুধু পটভূমি নয়। মানুষের জীবন, নাগরিক পরিচয়, ভয় এবং শেষ পর্যন্ত মায়ের মৃত্যুর সঙ্গেও সেটি জড়িয়ে আছে।

আবার একটি পুরোনো বাড়িকে ঘিরে গল্পে দেখা যায়, বাড়িটি ভেঙে সেখানে মেট্রোর পিলার উঠছে। যে বাড়িতে একটি পরিবার বছরের পর বছর থেকেছে, দেয়ালে শিশুদের বেড়ে ওঠার দাগ আছে, সেই ঠিকানায় এখনো মৃত মানুষের নামে চিঠি আসে। পরে পরিবারের লোকেরা মেট্রোতে চড়ে সেই জায়গার ওপর দিয়ে যায়। বাড়িটি তখন শুধু থাকার জায়গা নয়। বাড়ি হারানোর সঙ্গে একটি পরিবারের স্মৃতি, একটি পাড়ার পুরোনো চেহারা এবং শহর বদলে যাওয়ার গল্পও জড়িয়ে যায়।

এই নিজস্ব জায়গা বাংলা গল্পকে আলাদা চেহারা দেয়। গ্রামের একটি গল্প আর ঢাকার একটি গল্পের চারপাশ এক রকম হবে না। বাংলাদেশের সীমান্ত গ্রামের জীবন আর নিউইয়র্কে থাকা বাঙালির জীবনও এক নয়। জায়গা বদলালে মানুষের জীবনযাপন বদলায়, কথা বলার ধরন বদলায়, ভয় ও দুশ্চিন্তার কারণ বদলায়, এমনকি ভালোবাসা প্রকাশের ধরনও বদলে যেতে পারে।

কিন্তু নিজের জায়গা সম্পর্কে গল্পকারের এত জানা থাকে এবং তার প্রতি এত মায়া থাকে যে কখনো কখনো গল্প থামিয়ে সেই জায়গার ইতিহাস বলতে শুরু করেন।

একটি পুরোনো বাড়ি গল্পে এল। সঙ্গে সঙ্গে কে বাড়িটি বানিয়েছিল, কোন সালে বানিয়েছিল, তার বাবা কে ছিলেন, আগে সেখানে কী ছিল, পরে কারা থাকত, সব চলে এল। একটি পুকুর এল, তার খননের ইতিহাস শুরু হলো। একটি মাদ্রাসা এল, তার প্রতিষ্ঠাতার পরিচয়ও দিতে হলো।

এসব তথ্য ভুল নয়। অনেক সময় খুব আকর্ষণীয়ও। কিন্তু আকর্ষণীয় তথ্য আর গল্পের দরকারি তথ্য এক জিনিস নয়।

বাড়িটি ১৯৩০ সালে তৈরি হয়েছিল, এই তথ্যটি দরকার হলে চরিত্রটি বাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে সদর দরজার মাথায় সিমেন্টের গায়ে লেখা ‘১৯৩০’ দেখতে পারে। পুকুরটি বহু পুরোনো বোঝাতে একজন বৃদ্ধ বলতে পারেন, ছোটবেলায় তিনি এই পুকুরেই সাঁতার শিখেছিলেন। এখন পুকুরের অর্ধেক ভরাট হয়ে দোকান উঠেছে। একটি গাছের বয়স বোঝাতে বৃদ্ধা বলতে পারেন, তাঁর বিয়ের সময়ও গাছটি এমনই ছিল। তথ্য পাওয়া গেল। গল্পও থামল না।

একইভাবে একজন ফুলটিকে টগর বলল। গ্রামের বৃদ্ধ তাকে শুধরে দিয়ে বললেন, ‘আমরা তো একে দুধফুল বলি।’ একটি ছোট কথাতেই জায়গার ভাষা, মানুষের পরিচয় এবং স্থানীয় স্মৃতি চলে এল।

পটভূমি সম্পর্কে লেখক অনেক কিছু জানতে পারেন। তাঁর সব জানা কথা পাঠকের জানা দরকার নেই। যতটুকু চরিত্রের জীবন ও বর্তমান ঘটনার সঙ্গে লাগে, ততটুকুই গল্পে এলেই জায়গাটি জীবন্ত হতে পারে।

তখন জায়গাটি আর গল্পের পেছনে আঁকা ছবি থাকে না। চরিত্রের জীবনের অংশ হয়ে যায়।

রাজনীতি গল্পে আসছে, সমস্যা হয় যখন গল্প বক্তৃতা হয়ে যায়
রাজনীতি ও সমাজের নানা ঘটনা বাংলা ছোটগল্পে প্রবলভাবে আসছে। ক্রসফায়ার, সীমান্ত, দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় দমন, ধর্মীয় অনুশাসন, নারীর জীবন, গ্রামীণ ক্ষমতা, বেকারত্ব, শ্রেণিবৈষম্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সবই গল্পের বিষয় হচ্ছে।

এটি বড় শক্তি। গল্প তার সময় থেকে বিচ্ছিন্ন থাকছে না। বিশেষ করে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে লেখা ভালো গল্পগুলো বড় ঘটনাকে মানুষের ছোট জীবনের মধ্যে নামিয়ে আনতে পারছে।

ধরা যাক, রাষ্ট্রের রিপোর্টে একজন মানুষ মারা গেছে। পরে দেখা গেল, লোকটি আসলে বেঁচে আছে। তখন রাষ্ট্র নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে। আবার লোকটিকে মেরে রিপোর্টটাকেও সত্যি করে দিতে পারে। গল্পে যদি দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে, তাহলে রাষ্ট্রের ক্ষমতা সম্পর্কে অনেক কিছুই একটি ঘটনার মধ্যে ধরা পড়ে।

মানুষটি মারা গেছে বলে রিপোর্ট তৈরি হয়নি। রিপোর্টে সে মারা গেছে বলেই এখন তাকে মরতে হবে। এই অবস্থার পরে রাষ্ট্র কত ভয়ংকর, সরকারি কাগজ কীভাবে সত্য তৈরি করে, ক্ষমতা কীভাবে বাস্তবকে বদলে দেয়, এসব নিয়ে আলাদা ব্যাখ্যা দরকার পড়ে না।

দুর্বলতা তৈরি হয় যখন গল্পকার এই দৃশ্যটির ওপর ভরসা করতে পারেন না। ঘটনার পরেই তার রাজনৈতিক অর্থ বুঝিয়ে দিতে শুরু করেন। তখন গল্পের মধ্যে প্রবন্ধ ঢুকে পড়ে।

রাজনৈতিক গল্পে লেখকের অবস্থান থাকবে। কোনো লেখকই শূন্য জায়গা থেকে লেখেন না। কিন্তু অবস্থান আর বক্তৃতা এক নয়।

একজন নাগরিক নিজের দেশের মূল ভূখণ্ডে যেতে গিয়ে নিজের দেশের সীমান্তরক্ষীর গুলিতে মাকে হারালেন। শেষ পর্যন্ত মৃত মাকে নিয়ে কাঁটাতার পেরিয়ে তিনি বললেন, এবার তারা আসল দেশে এসেছেন। এই একটি দৃশ্য রাষ্ট্র, সীমান্ত ও নাগরিকত্ব নিয়ে অনেক কথা বলতে পারে। এর পরে রাষ্ট্রের অমানবিকতা নিয়ে আরেকটি অনুচ্ছেদ লিখলে দৃশ্যটির শক্তিই কমে যেতে পারে।

বাংলা রাজনৈতিক গল্পের শক্তি তাই শুধু রাজনৈতিক বিষয় নেওয়ার মধ্যে নয়, সেই রাজনীতিকে মানুষের জীবনে ঘটাতে পারার মধ্যেও।

লোকবিশ্বাসের ভান্ডার বড়, নতুন সম্পর্ক তৈরি করাই আসল
বাংলা গল্পকারের হাতে লোককথা ও লোকবিশ্বাসের বিরাট ভান্ডার আছে। জিন, পরী, ভূত, পীর, অলৌকিক ঘটনা, স্বপ্ন, তাবিজ, নানা সংস্কার বহুদিন ধরে মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে আছে। এটি আমাদের গল্পের বড় সম্পদ।

কিন্তু শুধু জিন বা পরী গল্পে এলেই নতুন গল্প তৈরি হয় না। পুরোনো বিশ্বাসটিকে বর্তমান মানুষের জীবনের সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত করা গেলে তার অন্য শক্তি তৈরি হয়।

একটি গল্পে একজন জিন শিকারি সারা জীবন মানুষের শরীর থেকে জিন তাড়িয়ে বেড়ায়। এলাকার মানুষ তাকে সম্মান করে। কিন্তু গল্প এগোতে এগোতে তার নিজের অতীতের অপরাধ বেরিয়ে আসে। শেষ পর্যন্ত যে ভয়ংকর জিনটিকে সে খুঁজে পায়, তার মুখটি নিজেরই মুখের মতো।

এখানে জিন শুধু অতিপ্রাকৃত প্রাণী নয়। মানুষের নিজের ভেতরে চাপা দেওয়া অপরাধের সঙ্গেও তার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

আরেকটি গল্পে একটি ছেলে টগর ফুলের গাছ আঁকে। পরে সেই গাছটিই বাড়ির উঠোনে দেখা যায়। সে পাখি আঁকে, পরে খাঁচায় জ্যান্ত পাখি আসে। মাছ আঁকার পর জ্যান্ত মাছও দেখা যায়। সত্যিই কি তার আঁকা জিনিস জীবন্ত হয়ে উঠছে, নাকি ঘটনাগুলোর অন্য কোনো ব্যাখ্যা আছে, গল্প তা বলে দেয় না। এই না-বলার মধ্যেই গল্পটির শক্তি।

অলৌকিক ঘটনার রহস্যটি লেখক নিজেই মিটিয়ে দিলে সেই শক্তি কমে যেতে পারে। ‘আসলে সে পরী ছিল’, ‘জিনটি সত্যিই এসেছিল’, ‘সবটাই ছিল কুসংস্কার’, এমন কোনো একটি উত্তর দিয়ে দিলে অন্য সম্ভাবনাগুলো বন্ধ হয়ে যায়।

তবে সব গল্পেই রহস্য রেখে দিতে হবে, এমন নয়। কোনো গল্পের জন্য পরিষ্কার উত্তরই দরকার হতে পারে। কিন্তু যে গল্পের শক্তি বাস্তব ও অবাস্তবের মাঝের জায়গাটিতে, সেখানে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সেই জায়গাটিই নষ্ট না করাই ভালো। লোকবিশ্বাস তখন পুরোনো থাকে, কিন্তু গল্পটি পুরোনো থাকে না।

সাধারণ জিনিস কথা বলছে, তাকে বেশি কথা বলাতে নেই
সাম্প্রতিক অনেক গল্পে সাধারণ জিনিসের ব্যবহার চোখে পড়ে। একটি কাঁথা, ট্রলিব্যাগ, ছুরি, চিঠি, ফুল, সিগারেটের প্যাকেট, খাবারের বাটি কিংবা পুরোনো বাড়ির কোনো জিনিস গল্পের মধ্যে ধীরে ধীরে অন্য অর্থ পেতে শুরু করে। এটি গল্পের একটি শক্তি। কারণ সব কথা মানুষকে মুখে বলতে হয় না।

একটি গল্পে একজন নারী কাঁথা বিক্রি করেন। একটি বিশেষ কাঁথার সঙ্গে তাঁর হারিয়ে যাওয়া স্বামীর স্মৃতি জড়িয়ে আছে। অন্য কাঁথাগুলো বিক্রি করা যায়, ওই কাঁথাটি যায় না। পাঠক বুঝতে পারেন, ওই কাঁথার দাম টাকা দিয়ে মাপা যাচ্ছে না।

আরেকটি গল্পে একটি ছুরির সেট কেনা হয়েছিল ভালোবাসার সময়। পরে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বদলে গেলে সেই একই ছুরি ভয় তৈরি করে। ছুরিটি বদলায়নি। বদলেছে তার চারপাশের সম্পর্ক।

আবার একজন পুলিশ কর্মকর্তা মানুষ হত্যার আগে বিশেষ একটি ব্র্যান্ডের সিগারেট খান। এক তরুণকে হত্যার পর সেই সিগারেটটি তাঁর কাছে নেই। আছে নিহত তরুণের লেখা একটি চিঠি। তিনি চিঠিটি গোপনে নিজের পকেটে রেখে দেন।

লেখক যদি এখানেই থামেন, পাঠক নিজের মতো করে ভাবতে পারেন মানুষটির মধ্যে কী ঘটেছে।

জিনিসটির অর্থও লেখক বলে দিলে তার নিজের আর কিছু করার থাকে না। ‘কাঁথাটি তার হারানো স্বামীর স্মৃতির প্রতীক।’ ‘ছুরিটি তাদের ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের প্রতীক।’ ‘চিঠিটি কর্মকর্তার অপরাধবোধের প্রতীক।’

এই কথাগুলো বলার পরে পাঠকের আবিষ্কার করার জায়গাটুকু কমে যায়। একই সমস্যা হয় যখন কোনো জিনিসকে এতবার সামনে আনা হয় যে পাঠক বুঝে যান লেখক তাকে প্রতীক হিসেবে চিনিয়ে দিতে চাইছেন। প্রতিবার ঝগড়ার সময় ছুরির দিকে তাকানো, বারবার কাঁথাটি ছুঁয়ে স্মৃতি মনে করা, বারবার একই ফুল দেখানো, এতে জিনিসটির স্বাভাবিকতা কমে যায়।

একটি জিনিস দ্বিতীয়বার বা তৃতীয়বার অবশ্যই ফিরে আসতে পারে। তবে প্রতিবার তার সঙ্গে নতুন কিছু যোগ হওয়া ভালো। প্রথমবার ছুরি নতুন সংসারের জিনিস। পরে সেটিই ভয়। প্রথমবার একটি ফুল শুধু ফুল। পরে তার সঙ্গে একটি স্মৃতি জড়াল। আরও পরে সেই ফুলের নাম থেকে একটি শিশুর নাম তৈরি হলো। তখন ফিরে আসাটা পুনরাবৃত্তি নয়, অর্থ বদলানো।

প্রতীককে আগে জিনিস হিসেবেই থাকতে দেওয়া ভালো। কাঁথা আগে কাঁথা, ফুল আগে ফুল, চিঠি আগে চিঠি। গল্পের ঘটনাই ধীরে ধীরে তাদের অন্য অর্থ দিক।

চরিত্রের আলো-অন্ধকার আছে, ব্যাখ্যা এসে তাকে সহজ করে দেয়
বাংলা ছোটগল্পে চরিত্র তৈরির ক্ষেত্রেও ভালো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। গল্পের মানুষকে শুধু ভালো মানুষ বা খারাপ মানুষ হিসেবে দেখানো হচ্ছে না। বাস্তব জীবনেও আমরা কাউকে এত সহজে ভাগ করতে পারি না।

একটি গল্পে একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা আছেন। বাড়িতে তিনি স্নেহশীল বাবা। মেয়েকে ভালোবাসেন, স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর স্নেহের সম্পর্ক আছে। অথচ অফিসে বসে তিনিই একজন আটক তরুণকে বিনা বিচারে মেরে ফেলার নির্দেশ দেন।

তাঁকে শুধু নিষ্ঠুর পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে দেখালে চরিত্রটি অনেক সহজ হয়ে যেত। কিন্তু মেয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা দেখার পরে হত্যার নির্দেশটি আরও অস্বস্তিকর লাগে। কারণ তখন বোঝা যায়, মানুষটি ভালোবাসতে জানেন। অন্য মানুষের জীবনের মূল্য তাঁর অজানা নয়। তারপরও তিনি হত্যা করতে পারেন।

একই গল্পে নিহত হতে যাওয়া তরুণটিও একরঙা নয়। সে দরিদ্র মানুষের পক্ষে লড়ছে, নিজের বিশ্বাসের জন্য মরতে প্রস্তুত। আবার যাদের সে শোষক মনে করে, তাদের মানুষ বলেই মানতে চায় না।

মানুষের মুক্তির জন্য জীবন দেওয়ার সাহস এবং কিছু মানুষকে মানুষ না ভাবার নিষ্ঠুরতা একই চরিত্রের মধ্যে আছে। এই ধরনের চরিত্র বাংলা গল্পের শক্তি।

কিন্তু চরিত্রকে জটিল করে তোলার পরে লেখক নিজেই আবার তাকে সহজ করে দিলে সেই শক্তি কমে যায়।

‘লোকটি বাইরে নিষ্ঠুর হলেও ভেতরে খুব ভালো মানুষ।’ ‘সে আসলে পরিস্থিতির শিকার।’ ‘তরুণটি কঠোর হলেও তার হৃদয় ছিল কোমল।’

এ ধরনের ব্যাখ্যা চরিত্রের দুই বিপরীত দিককে আবার একটি সহজ উত্তরে নামিয়ে আনে। তার বদলে চরিত্রকে কাজ করতে দেওয়া যায়।

অফিসে বসে কর্মকর্তা কাউকে হত্যার নির্দেশ দিলেন। একটু পরে মেয়ের ফোন এল। তাঁর গলার স্বর বদলে গেল। মেয়ে বলল, ফেরার সময় তার জন্য কিছু আনতে। রাতে বাড়ি ফেরার পথে তিনি সেটা কিনেও নিলেন।

কোন মানুষটি সত্যি? দুটিই। এই উত্তর লেখককে দিতে হয় না। দৃশ্যই দিয়ে দেয়।

দৃশ্য শক্তিশালী, তার পরে ব্যাখ্যা এসে শক্তি কমায়
সাম্প্রতিক অনেক গল্পে মনে থাকার মতো দৃশ্য পাওয়া যায়। ছোট একটি কাজ, একটি সংলাপ বা নীরবতা চরিত্রের বড় অনুভূতি প্রকাশ করে। এটি গল্পের বড় শক্তি।

একজন মা সকালে নিজের ছেলেকে খাবার দিয়েছেন। পুলিশ এসে বলছে, ছেলে তিন দিন আগে মারা গেছে। মা প্রতিবাদ করছেন। চারপাশের মানুষ পুলিশের কথায় সায় দিতে শুরু করেছে। একসময় মা নিজেই ভাবতে শুরু করলেন, তিনি কি সত্যিই আজ সকালে ছেলেকে খাইয়েছেন, নাকি তিন দিন আগে?

দৃশ্যটি এখানেই খুব শক্তিশালী।

কিন্তু এর পরে যদি লেখা হয়, ‘রাষ্ট্র মানুষের স্মৃতিও বদলে দিতে পারে’, তাহলে পাঠক যে জায়গায় নিজে পৌঁছেছিলেন, লেখক এসে আবার তাঁকে সেই জায়গাটিই দেখিয়ে দিলেন। একজন মানুষ ভয় পেয়েছেন। তাঁর হাত কাঁপছে। মুখে বলছেন, ‘আমি ঠিক আছি।’ এর পরে ‘আসলে তিনি প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলেন’ বলার দরকার নেই। 

একজন মা মৃত ছেলের জামার ছেঁড়া জায়গায় আঙুল বুলিয়ে বললেন, ‘এটা আমি সেলাই করে দিয়েছিলাম।’ এর পরে ‘ছেলের মৃত্যুতে তাঁর বুক ভেঙে যাচ্ছিল’ বললে কথাটি আর বাড়ে না।

বাংলা গল্পে অনেক শক্তিশালী দৃশ্য আছে। দুর্বলতা প্রায়ই তৈরি হয় দৃশ্যটির পরে। লেখকের মনে হয়, পাঠক হয়তো বুঝলেন না। তাই আরেকবার বলা হয়। কিন্তু সব পাঠক একই অর্থ বুঝবেন, এমনও নয়। একজন রাজনৈতিক অর্থ দেখবেন, একজন ব্যক্তিগত শোক দেখবেন, আরেকজন স্মৃতির ভাঙন দেখবেন। এই ভিন্ন পাঠও গল্পেরই অংশ। পাঠককে একটু জায়গা দিলে দৃশ্য অনেক সময় লেখকের ব্যাখ্যার চেয়ে বেশি কথা বলে।

লেখকের কণ্ঠ দরকার, কিন্তু সব চরিত্রের হয়ে কথা বললে সমস্যা
গল্পে লেখক অদৃশ্য হয়ে যাবেন, এমন কোনো নিয়ম নেই। লেখকের কণ্ঠ থাকতে পারে। সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারী থাকতে পারেন। মন্তব্যও থাকতে পারে। বহু বড় গল্পকারই তা করেছেন। সমস্যা লেখকের উপস্থিতিতে নয়। সমস্যা হয় যখন তিনি চরিত্রকে নিজের মতো থাকতে দেন না। চরিত্র একটি কাজ করল, সঙ্গে সঙ্গে লেখক বলে দিলেন কেন করল। সে চুপ করে থাকল, তার মনের সব কথা জানিয়ে দেওয়া হলো। সে অন্যায় করল, লেখক তাকে ক্ষমা করার কারণও বুঝিয়ে দিলেন। সে ভালো কাজ করল, তার মহত্ত্বও জানিয়ে দেওয়া হলো। তখন চরিত্রকে আমরা তার কাজ থেকে চিনতে পারি না। লেখকের দেওয়া পরিচয় থেকেই চিনতে হয়।

একজন কর্মকর্তা নিজেকে আইনের রক্ষক মনে করতে পারেন। একই মানুষ বিনা বিচারে হত্যার নির্দেশও দিতে পারেন। তাঁকে ভণ্ড বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের সম্পর্কে তাঁর ধারণা আর তাঁর কাজ পাশাপাশি থাকলেই পাঠক ফারাকটি দেখতে পাবেন।

আবার কোনো গল্পে লেখকের সরাসরি মন্তব্যই দরকার হতে পারে। ব্যঙ্গ, রম্যরচনা, রাজনৈতিক রূপক কিংবা বিশেষ ধরনের বর্ণনায় লেখকের কণ্ঠ গল্পের প্রধান আনন্দও হতে পারে। তাই লেখককে আড়াল করাই নিয়ম নয়। দেখার বিষয়, তাঁর কণ্ঠ চরিত্র ও ঘটনাকে বড় করছে, নাকি তাদের হয়ে সব কথা নিজেই বলে দিচ্ছে।

এক গল্পের ভেতরে অনেক গল্প, কোনটি রাখব
বাংলা গল্পকারদের আরেকটি শক্তি তাঁদের গল্পের ভান্ডার। একটি চরিত্রের পাশে আরেকটি চরিত্র এলেই তারও একটি জীবন পাওয়া যায়। একটি বাড়ির পেছনে ইতিহাস আছে। একটি গ্রামের পেছনে আরও গল্প আছে। একটি রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে দশটি পুরোনো ঘটনা জড়িয়ে আছে। এই প্রাচুর্য গল্পকে সমৃদ্ধ করতে পারে। আবার এই প্রাচুর্যই গল্পকে ছড়িয়ে দিতে পারে।

ধরা যাক, একজন মানুষ বহু বছর পরে গ্রামের বাড়িতে ফিরেছেন বাড়িটি বিক্রি করতে। সেখানে গিয়ে পুরোনো একটি গাছ দেখে তাঁর মৃত স্ত্রীর কথা মনে পড়ল। বাড়িটির দেখাশোনা করা এক বৃদ্ধার সঙ্গে কথা বলতে বলতে তিনি এমন কিছু জানতে পারলেন, যার পরে বাড়িটি বিক্রি করবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত বদলে যেতে শুরু করল। গল্পটির টান এখানে।

এর মধ্যে যদি তাঁর বাবার চাকরিজীবনের ইতিহাস, গ্রামের জমিদারবাড়ির কাহিনি, দেশভাগের সময় কারা কোথায় গিয়েছিল, পাশের বাড়ির পারিবারিক বিবাদ, পুকুর খননের ইতিহাস, গ্রামের রাজনৈতিক পরিবর্তন, বৃদ্ধার স্বামীর পুরো জীবনকাহিনি একে একে ঢুকে পড়ে, তাহলে প্রতিটি অংশ আলাদা করে ভালো হলেও মূল গল্পটি আড়ালে চলে যেতে পারে।

পাঠক একসময় ভুলেই যেতে পারেন, মানুষটি আসলে বাড়ি বিক্রি করতে এসেছিলেন। তার মানে উপকাহিনি বাদ দিতে হবে, তা নয়।

একটি রাজনৈতিক গল্পে সরকারি রিপোর্টে একজন মানুষ মৃত, অথচ বাস্তবে সে বেঁচে আছে। এর পাশে একটি কালভার্টের গল্প এল। সরকারি কাগজে কালভার্টটি তৈরি হয়ে গেছে, বাস্তবে সেখানে কিছুই নেই।

এই উপকাহিনিটি মূল গল্পকে দুর্বল করছে না। বরং একই কথাকে অন্য জায়গা থেকে দেখাচ্ছে। কাগজে কালভার্ট আছে, বাস্তবে নেই। কাগজে মানুষটি নেই, বাস্তবে আছে। দুটি ঘটনা একে অন্যকে শক্তিশালী করছে।

কিন্তু কোনো পার্শ্বচরিত্রের শৈশব, বিয়ে, গরু কেনা, ছেলের চাকরি, স্ত্রীর অসুখ যদি আসে এবং তার কোনোটিই মূল ঘটনার সঙ্গে আর যুক্ত না হয়, তাহলে সেই জীবনটি নিজে গল্প হতে পারে, কিন্তু এই গল্পটির জন্য দরকারি নাও হতে পারে।

কোনো অংশ বাদ দেওয়ার আগে তাই দেখা যায়, সেটি চলে গেলে কী হারাচ্ছে। চরিত্রকে বোঝা কঠিন হচ্ছে? পরের ঘটনার কারণ বোঝা যাচ্ছে না? শেষের অর্থ দুর্বল হচ্ছে? গল্পের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে? কিছুই যদি না ঘটে, অংশটি না থাকলেও চলে।

গল্পকারের কাছে তাঁর প্রতিটি চরিত্রই প্রিয় হতে পারে। প্রতিটি জানা তথ্যই মূল্যবান মনে হতে পারে। কিন্তু একটি গল্পে সব ভালো জিনিসের জায়গা হয় না। কোনো সুন্দর ঘটনা অন্য গল্পের জন্য তুলে রাখা যায়।

ছোটগল্পে কী লেখা হবে, সেই সিদ্ধান্তের মতো কী লেখা হবে না, সেই সিদ্ধান্তও জরুরি।

বড় ঘটনা কখনো ছোট হয়ে যাচ্ছে, ছোট ঘটনা বেশি জায়গা নিচ্ছে
বাংলা গল্পে আরেকটি সমস্যা প্রায়ই দেখা যায়। যে ঘটনাটি চরিত্রের জীবন বদলে দিয়েছে, সেটিই দু-তিনটি বাক্যে বলা হয়েছে। অথচ তার আগে পরিবার, বাড়ি, পাড়া বা গ্রামের ইতিহাস অনেকটা জায়গা নিয়ে আছে।

ধরা যাক, একজন নারী বহু বছর সংসার করার পরে জানতে পারলেন তাঁর স্বামীর সঙ্গে অন্য একজনের সম্পর্ক আছে। যদি শুধু লেখা হয়, ‘একদিন তিনি জানতে পারলেন স্বামীর সঙ্গে অন্য এক নারীর সম্পর্ক আছে। এরপর তাদের সংসার ভেঙে গেল’, তাহলে আমরা ঘটনাটি জানলাম। কিন্তু সেই মুহূর্তটি দেখলাম না।

স্বামী রাতে বাড়ি ফিরেছে। ফোনে একটি বার্তা এল। স্ত্রী ফোনটি এগিয়ে দিতে গিয়ে বার্তাটি দেখে ফেললেন। তিনি কিছু বললেন না। ফোনটি টেবিলে রেখে দিলেন। স্বামীও বুঝল তিনি দেখে ফেলেছেন। পাশের ঘরে সন্তান ঘুমাচ্ছে। স্ত্রী রান্নাঘরে গিয়ে কলের পানি ছেড়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। একটি সংসারের ভাঙন শুরু হয়ে গেল।

অন্যদিকে একটি চরিত্র ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে এসেছে। পথে কোথায় বাস বদলেছে, কোথায় চা খেয়েছে, ফেরিঘাটে কতক্ষণ অপেক্ষা করেছে, এগুলোর সঙ্গে পরের ঘটনার সম্পর্ক না থাকলে এক বাক্যই যথেষ্ট হতে পারে, ‘বিকেলের দিকে সে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছাল।’ সব ঘটনাকে সমান জায়গা দিতে হয় না।

যে মুহূর্তে চরিত্রের জীবন বদলাচ্ছে, সেখানে গল্প একটু ধীরে চলতে পারে। প্রেমের শুরু, বিশ্বাসভঙ্গ, মৃত্যু, অপমান, ভয়ংকর কোনো সিদ্ধান্ত, অপরাধ করে ফেলা, বহুদিনের সত্য জানতে পারা, কাউকে ছেড়ে চলে যাওয়া বা ফিরে আসা, এসব মুহূর্ত পাঠকের চোখের সামনে ঘটলে তার প্রভাব বাড়ে। আর যে ঘটনা শুধু চরিত্রকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে, সেটি দ্রুত চলে যেতে পারে।

গল্পের গতি শুধু বাক্যের দৈর্ঘ্যে তৈরি হয় না। কোথায় থামা হচ্ছে আর কোথায় দ্রুত পার হয়ে যাওয়া হচ্ছে, তার ওপরও অনেকটা নির্ভর করে।

ভাষা সুন্দর, কখনো সৌন্দর্যের ভার বেশি
বাংলা ছোটগল্পের ভাষার বড় শক্তি আছে। অঞ্চলভেদে কথ্য ভাষা, শহুরে ভাষা, গ্রামের মানুষের মুখের কথা, লোকজ শব্দ, প্রশাসনিক ভাষা, রাজনৈতিক ভাষা, শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ভাষা, সবই গল্পে ঢুকছে। ভালো সংলাপে দুটো কথাতেই একজন মানুষের অবস্থান, ভয়, দম্ভ বা অসহায়তা ধরা পড়ে।

আমাদের গদ্যের কাব্যিক ঐতিহ্যও শক্তিশালী। সুন্দর বাক্য লেখার ক্ষমতা অনেক গল্পকারেরই আছে। মুশকিল হয় যখন প্রতিটি বাক্যকেই সুন্দর করতে হয়।

বিকেল শুধু বিকেল থাকে না, তাকে বিষণ্ন বিকেল হতে হয়। আকাশে মেঘ জমলে চরিত্রের দুঃখের ছায়াও সেখানে পড়ে। বাতাস বয়ে গেলেও তাকে মানুষের দীর্ঘশ্বাস বহন করতে হয়।

কোনো বিশেষ মুহূর্তে এমন একটি উপমা খুব ভালো কাজ করতে পারে। কিন্তু প্রায় প্রতিটি দৃশ্যেই ভাষা যদি নিজের দিকে দৃষ্টি টানে, তখন চরিত্র ও ঘটনা পেছনে চলে যায়।

একজন মা ছেলের জন্য অপেক্ষা করছেন। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। লেখা যেতে পারে, ‘রক্তাক্ত সূর্য পশ্চিম আকাশে ডুবে যাচ্ছিল। বিষণ্ন বাতাসে মায়ের বুকের হাহাকার ছড়িয়ে পড়ছিল।’

আবার দেখা যেতে পারে, সন্ধ্যার পরও মা ভাতের হাঁড়ি নামাননি। ছেলে ফিরলে গরম ভাত খাবে বলে চুলায় অল্প আঁচ দিয়ে রেখেছেন। কেউ এসে বলল, ‘আপনি খেয়ে নেন।’

মা বললেন, ‘ও আসুক।’ তারপর আবার দরজার দিকে তাকালেন। আকাশকে দুঃখী হতে হলো না। বাতাসকেও কাঁদতে হলো না।

সহজ ভাষা মানে শুকনো ভাষা নয়। সুন্দর বাক্য থাকবে, উপমা থাকবে, প্রকৃতির বর্ণনাও থাকবে। দেখতে হবে সেই সৌন্দর্য চরিত্রের অভিজ্ঞতার ভেতর থেকে আসছে কি না।

কখনো খুব সাধারণ একটি বাক্যই গল্পের সবচেয়ে সুন্দর বাক্য হয়ে ওঠে। কারণ তার পেছনে পুরো গল্পটি দাঁড়িয়ে থাকে।

পুনরাবৃত্তি কখন কাজে লাগে, কখন ভার হয়
একটি কথা বা জিনিস গল্পে ফিরে আসা সব সময় দুর্বলতা নয়। কখনো ফিরে আসাটাই গল্পের গঠন তৈরি করে। সমস্যা হয় যখন একই অর্থই বারবার ফিরে আসে।

একজন স্বামী স্ত্রীর ফোনে অচেনা একটি নাম দেখলেন। কিছু বললেন না। পরে দেখলেন, স্ত্রী তাঁর সামনে সেই লোকটির ফোন ধরছেন না। সন্দেহ তৈরি হয়ে গেছে। এর পরে যদি বলা হয়, ‘তার মনে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হলো’, কিছু পরে ‘স্ত্রীর আচরণ তাকে ভাবিয়ে তুলছিল’, তারপর ‘এখন তার আর সন্দেহ রইল না’, তাহলে একই কথা কয়েকবার বলা হলো।

বরং স্ত্রী ঘুমিয়ে পড়ার পর মানুষটি তার ফোনের দিকে তাকালেন। হাত বাড়িয়েও নিলেন না। সন্দেহ এখন তাঁর আচরণের মধ্যে চলে এসেছে।

শোকের ক্ষেত্রেও একই কথা। মা কাঁদলেন, সন্তানের জামা বুকে ধরলেন, তারপর বলা হলো তাঁর বুক শূন্য হয়ে গেছে, পরে আবার বলা হলো তিনি সন্তানকে ভুলতে পারছেন না। একই অনুভূতি নানা বাক্যে ফিরে আসছে। তার বদলে সন্ধ্যায় মা অভ্যাসমতো দুটি থালা বের করলেন। কিছুক্ষণ পরে একটি থালা তুলে রাখলেন।

কিন্তু একই জিনিস দ্বিতীয়বার এসে যদি অন্য অর্থ তৈরি করে, সেটি পুনরাবৃত্তি নয়। প্রথমবার কোনো বস্তু আনন্দের সঙ্গে ছিল, দ্বিতীয়বার ভয় নিয়ে এল। প্রথমবার একটি নাম ছিল অনাগত শিশুর জন্য, পরে একই নাম অন্য একটি শিশুর জীবনে ফিরে এল। প্রথমবার একটি বাড়ি ছিল শৈশবের জায়গা, পরে সেটি ভেঙে গেল, আরও পরে সেই জায়গার ওপর দিয়ে ট্রেন চলে গেল।

একই জিনিস, কিন্তু প্রতিবার একই অর্থ নয়। দ্বিতীয়বারের উপস্থিতি নতুন কিছু যোগ করছে কি না, সেটাই দেখার বিষয়।

চমক আছে, কিন্তু সব চমক ভালো সমাপ্তি নয়
বাংলা ছোটগল্পে শেষের চমকের দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। এখনো অনেক গল্প শেষ লাইনে পাঠককে চমকে দিতে চায়। চমক গল্পের শক্তি হতে পারে।

একজন জিন শিকারি শেষ পর্যন্ত জিনের মুখে নিজের মুখ দেখতে পেল। এর আগে যদি তার চাপা অপরাধগুলো গল্পে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এসে থাকে, তাহলে শেষের ঘটনাটি শুধু চমক নয়। পাঠককে আগের পুরো গল্পটি আবার ভাবতে হয়। শেষের ঘটনা তখন আগের গল্পের অর্থ বদলে দেয়।

কিন্তু চমকের জন্য লেখক যদি এমন একটি তথ্য গোপন করেন, যা গল্পের চরিত্র স্বাভাবিকভাবেই জানে এবং বর্ণনারও লুকানোর কারণ নেই, শেষে হঠাৎ সেটি বের করে পাঠককে চমকে দেওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু সেই চমক অনেক সময় কৌশল হিসেবেই ধরা পড়ে। ভালো সমাপ্তিকে পাঠককে চমকে দিতেই হবে এমন নয়।

কখনো একটি মানুষ ফিরে না তাকিয়ে চলে গেলেই গল্প শেষ হতে পারে। কখনো একটি চিঠি পকেটে রেখে দেওয়া। কখনো একটি নাম। কখনো একটি অসমাপ্ত কাজ। কখনো একটি প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া।

শেষের পরে যদি পাঠক গল্পটির আগের অংশ নিয়ে আবার ভাবেন, সেই সমাপ্তির শক্তি অনেক সময় চমকের চেয়েও বেশি।

নতুন বিষয় আসছে, গল্প বলার ধরনও কি বদলাচ্ছে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্রসফায়ার, অভিবাসন, নারীর স্বাধীনতা, যৌনতা, ধর্মীয় উগ্রতা বা রাজনৈতিক দমন আমাদের সময়ের বিষয়। এসব বাংলা গল্পে আসছে। এটি জরুরি এবং স্বাভাবিক। কিন্তু নতুন বিষয় আর নতুন গল্প বলার ধরন এক জিনিস নয়।

একজন শিল্পী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চাকরি হারালেন। বিষয়টি একেবারেই আজকের। কিন্তু গল্পে যদি প্রথমে শিল্পীর পরিচয় দেওয়া হয়, তারপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভালো-মন্দ নিয়ে কয়েক পৃষ্ঠা আলোচনা হয়, এরপর চাকরি হারানোর ঘটনা আসে এবং শেষে লেখক বুঝিয়ে দেন প্রযুক্তি কীভাবে মানুষের জায়গা দখল করছে, তাহলে বিষয়টি নতুন হলেও গল্পের নির্মাণ খুব চেনা থাকতে পারে। আবার একই বিষয় অন্যভাবে গল্পের মধ্যে ঢুকতে পারে।

একজন কার্টুনশিল্পীর আঁকার নিজস্ব ভঙ্গি আছে। তাঁর ছেলে বাবার হাত দেখে দেখে আঁকা শিখছে। একই সময়ে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও তাঁর আঁকার ধরন নকল করতে শিখছে। একসময় প্রযুক্তির কারণেই শিল্পী কাজ হারান।

তখন প্রশ্নটি শুধু যন্ত্র মানুষের চাকরি নেবে কি না, সেখানে আটকে থাকে না। যন্ত্র একজন শিল্পীর আঁকার ভঙ্গি নকল করতে পারে। কিন্তু বাবা থেকে ছেলের মধ্যে যে স্মৃতি, শিক্ষা, হাতের অভ্যাস এবং ভালোবাসা চলে আসে, সেটিও কি একই জিনিস? গল্প নিজেই প্রশ্নটি তৈরি করছে।

তবে আধুনিক গল্প মানেই খোলা সমাপ্তি নয়। সময় ভেঙে বলতে হবে এমন নয়। লেখককে অদৃশ্য হতে হবে এমনও নয়। বহুকণ্ঠ, অনিশ্চিত সত্য, খণ্ডিত সময়, অবিশ্বাস্য বর্ণনাকারী, জাদুবাস্তবতা, এসব গল্প বলার নানা কৌশল। এগুলোর কোনোটি ব্যবহার করলেই গল্প আধুনিক হয়ে যায় না।

একেবারে সরলভাবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বলা গল্পও সমকালীন ও শক্তিশালী হতে পারে। আসল কথা হলো, গল্পটি তার বিষয় ও চরিত্রের জন্য ঠিক রূপটি পেয়েছে কি না।

সমকালীন বিষয় নিয়ে পুরোনো ভঙ্গিতে ভালো গল্প লেখা সম্ভব। আবার বহু পুরোনো বিষয় নিয়েও নতুন নির্মাণ সম্ভব। বিষয় আর নির্মাণকে এক করে দেখা ঠিক নয়।

পাঠকের জন্য জায়গা আছে কি
সাম্প্রতিক বাংলা গল্পের শক্তি ও দুর্বলতার অনেক কথাই শেষ পর্যন্ত এসে এই একটি জায়গায় মেলে। পাঠকের জন্য গল্পে কতটা জায়গা রাখা হচ্ছে?

লেখক যদি সব বলে দেন, চরিত্র কেন কাজটি করল, কোন ঘটনাটি কী বোঝায়, কোন জিনিসটি কীসের প্রতীক, কোন চরিত্র ভালো, কোনটি খারাপ, শেষ ঘটনার অর্থ কী, তাহলে পাঠক মূলত লেখকের সিদ্ধান্তগুলোই গ্রহণ করেন। আবার ইচ্ছা করে সবকিছু দুর্বোধ্য করে রাখাও কোনো গুণ নয়।

পাঠকের জায়গা মানে তাকে ধাঁধার মধ্যে ফেলে দেওয়া নয়। বরং এমন কিছু সম্পর্ক, অনুভূতি বা অর্থ রাখা, যা তিনি গল্প পড়তে পড়তে নিজে আবিষ্কার করতে পারেন।

একজন মানুষ নিজেকে খুব ন্যায়পরায়ণ মনে করেন, অথচ অন্যায় করেন। লেখক কিছু বললেন না। পাঠক ফারাকটি দেখলেন।

একটি পুরোনো চিঠির মধ্যে বহু বছর আগের একটি অপূর্ণ ইচ্ছা পাওয়া গেল। সেই ইচ্ছা বর্তমানের আরেকজন মানুষের জীবনের সঙ্গে মিলে গেল। লেখক বললেন না দুই জীবন একই। পাঠক সম্পর্কটি অনুভব করলেন।

এক পরীর ডানা কেটে দেওয়ার পুরোনো গল্প আছে। পরে একজন নারীর শরীরে পুরোনো কাটা দাগ দেখা গেল। নারীটি বললেন, ছোটবেলায় গাছ থেকে পড়ে দাগটি হয়েছিল। তিনি সত্য বলছেন কি না, গল্প আর কিছু বলল না।

এমন গল্পে পাঠক শুধু পরের ঘটনা জানার জন্য পড়েন না। তাঁকেও গল্পের মধ্যে একটু কাজ করতে হয়।

আবার কোনো গল্পের জন্য পরিষ্কার উত্তরই দরকার হতে পারে। সেখানেও পাঠকের জায়গা থাকতে পারে চরিত্রের অনুভূতি বোঝার মধ্যে, তার সিদ্ধান্ত বিচার করার মধ্যে কিংবা নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার মধ্যে। পাঠককে জায়গা দেওয়া আর গল্পকে অস্পষ্ট করা এক কথা নয়।

সম্পাদনার জায়গাটিই সবচেয়ে বড়
এই সব শক্তি ও দুর্বলতার দিকে তাকালে একটি বিষয় বারবার সামনে আসে। বাংলা ছোটগল্পের অনেক সমস্যা প্রথম খসড়ার সমস্যা নয়। সম্পাদনার সময় সেগুলো ঠিক করা সম্ভব।

একটি গল্প লেখা হয়ে গেছে। সেখানে ভালো চরিত্র আছে, শক্তিশালী ঘটনা আছে, নিজের জায়গা আছে, চমৎকার কিছু দৃশ্য আছে। কিন্তু সঙ্গে বাড়তি ইতিহাস আছে, একই অনুভূতি তিনবার এসেছে, একটি প্রতীক বেশি ব্যবহার হয়েছে, বড় ঘটনাটি খুব দ্রুত চলে গেছে, ছোট ঘটনা বেশি জায়গা নিয়েছে, শেষের পরে লেখক আরও দুই অনুচ্ছেদ ব্যাখ্যা করেছেন। এগুলো গল্পের মূল কল্পনার দুর্বলতা নয়। এগুলো সম্পাদনার জায়গা।

সম্পাদনা শুধু বানান ঠিক করা বা বাক্য সুন্দর করা নয়। গল্পটি আসলে কার গল্প, মূল ঘটনাটি কী, কোথা থেকে শুরু করা ভালো, কোনো চরিত্র বাদ দিলে কী হয়, কোন ইতিহাসটি দরকার, কোন ঘটনাটি চোখের সামনে ঘটানো উচিত, কোনটি এক বাক্যে বলা যায়, কোথাও একই কথা দুবার এসেছে কি না, লেখক কোথাও চরিত্রের হয়ে কথা বলে ফেলেছেন কি না, গল্পটি আসলে কোথায় শেষ হয়েছে, এসবও সম্পাদনার অংশ।

একটি গল্প ত্রিশ পৃষ্ঠা লেখা হয়েছে বলে ত্রিশ পৃষ্ঠাই রাখতে হবে না। পঁচিশ পৃষ্ঠায় সেটি ভালো হতে পারে। আবার বিশ পৃষ্ঠার গল্পকে জোর করে দশ পৃষ্ঠায় নামানোও কোনো গুণ নয়।

যেখানে গল্পের শ্বাস নিতে সময় দরকার, সেখানে সময় দিতে হবে। বাদ যাবে সেই অংশ, যা বাদ দিলে কিছু হারায় না।

আমাদের সাহিত্যচর্চায় এই ধরনের সম্পাদনা আরও বেশি হওয়া দরকার। অনেক সময় পত্রিকায় গল্প যেমন আসে, প্রায় তেমনই প্রকাশিত হয়। বানান দেখা হয়, দু-একটি বাক্য ঠিক করা হয়। কিন্তু গল্পের গঠন নিয়ে লেখক ও সম্পাদকের মধ্যে খুব বেশি কাজ হয় না।

অথচ কোথাও পাঁচ পৃষ্ঠা কমলে গল্প ভালো হতে পারে। কোথাও উল্টো একটি দৃশ্য বাড়ানো দরকার হতে পারে। কোথাও একটি পার্শ্বচরিত্র বাদ যেতে পারে। কোথাও শেষের দুই অনুচ্ছেদ বাদ দিলেই গল্প ঠিক জায়গায় শেষ হতে পারে।

ভালো গল্প লেখা এক কাজ। নিজের লেখা থেকে কোন অংশটি আর দরকার নেই, সেটা চিনতে পারা আরেক কাজ।

বাংলা ছোটগল্পের বর্তমান অবস্থার দিকে তাকালে মনে হয়, দ্বিতীয় জায়গাটিতেই আরও বেশি কাজ করার সুযোগ আছে।

শক্তি আছে, দরকার একটু সংযম
সাম্প্রতিক বাংলা ছোটগল্পের দিকে তাকালে হতাশ হওয়ার কারণ দেখি না। বরং গল্পের উপাদানের প্রাচুর্য চোখে পড়ে। নিজের মাটি আছে, নিজস্ব ভাষা আছে, লোকবিশ্বাসের বড় ভান্ডার আছে, রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতা আছে, ইতিহাস আছে, স্মৃতি আছে, নতুন প্রযুক্তির অভিঘাত আছে। মনে থাকার মতো চরিত্রও পাওয়া যাচ্ছে। কোনো কোনো গল্পে এমন দৃশ্য আছে, যা গল্প শেষ হওয়ার পরও মাথায় থেকে যায়। সমস্যাগুলোও এই শক্তিগুলোর খুব দূরে নয়।

নিজের জায়গার প্রতি মায়া আছে বলেই কখনো তার ইতিহাস বেশি বলা হচ্ছে। রাজনীতি নিয়ে তীব্র বোধ আছে বলেই কখনো গল্প বক্তৃতার দিকে যাচ্ছে। চরিত্রকে জটিল করার চেষ্টা আছে, আবার তাকে পাঠকের কাছে পরিষ্কার করে দেওয়ার তাগিদও আছে। সুন্দর ভাষা লেখার ক্ষমতা আছে, তাই কখনো প্রতিটি বাক্যকেই সুন্দর করার চেষ্টা হচ্ছে। গল্পের ভান্ডার বড়, তাই একটি গল্পের মধ্যে অনেক গল্প ঢুকে যাচ্ছে। প্রতীকের বোধ আছে, তাই কখনো প্রতীকটিকে একটু বেশি দেখানো হচ্ছে। পাঠকের কাছে কথা পৌঁছানোর আগ্রহ আছে, তাই তিনি বুঝেছেন কি না ভেবে একই কথা আবার বলা হচ্ছে। অনেক দুর্বলতাই তাই শক্তির উল্টো পিঠ।

সব সমস্যার সমাধান নতুন কোনো গল্পের কৌশল শেখার মধ্যে নেই। অনেক সময় দরকার শুধু কোথায় থামতে হবে, সেটা বোঝা।

সুন্দর একটি অনুচ্ছেদ বাদ গেলেও গল্প সুন্দর থাকতে পারে। অনেক কষ্টে পাওয়া একটি তথ্য ব্যবহার না করলেও সেই পরিশ্রম নষ্ট হয় না। কোনো চরিত্রের পুরো জীবন না বলেও তাকে জীবন্ত করা যায়। একটি দৃশ্যের পরে তার অর্থ না বললেও পাঠক বুঝতে পারেন। একটি প্রতীককে নাম না দিলেও সে কাজ করতে পারে। একটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়েও গল্প শেষ হতে পারে। গল্পকার সব জানবেন। সব লিখবেন না।

কিছু কথা চরিত্র বলবে। কিছু কথা তার কাজ থেকে বোঝা যাবে। কিছু কথা একটি বাড়ি, একটি গাছ, একটি চিঠি, একটি পুরোনো কাঁথা কিংবা একটি নীরবতার মধ্যে থেকে যাবে।

আর কিছু কথা পাঠকের কাছে রেখে দিলেই ভালো। ·