আর্কাইভ কী
আমরা সাধারণত মনে করি, কোনো কথা গুরুত্বপূর্ণ হয় কথাটা বিশেষ কেউ বলেছেন বা কথাটার ভেতরে লুকানো কোনো গভীর সত্য বা আদি কারণ আছে বলে। ফুকোর মতে, এটি সত্য নয়। গুরুত্ব তৈরি হয় বক্তার মনের ভেতরে নয়, কথাটা বলবার পুরো সামাজিক খেলার মাঠে। কে কথা বলছে বা তার মনে কী আছে সেটা বড়ো বিষয় নয়, বড়ো বিষয় হল সমাজ তাকে কী বলতে দিচ্ছে এবং কীভাবে বলতে দিচ্ছে। আমরা ভাবি, আমার মুখ আছে, ভাষা আছে, তাই আমি যা খুশি বলতে পারি। কিন্তু ফুকো বলছেন, না, পারেন না। সমাজ সব কথা বলবার অনুমতি দেয় না। বিশাল সমুদ্রে যেমন সব মাছ ধরা যায় না, তেমনি ভাষার জগৎ অসীম হলেও সমাজ সেখান থেকে বেছে বেছে খুব অল্প কিছু কথা বলবার সুযোগ দেয়। বাকি কথাগুলিকে সমাজ গায়েব করে দেয় বা নিষিদ্ধ করে রাখে। তিনি কাঠামোবাদী বিশ্লেষণের ঠিক উলটো পথে হেঁটে দেখান তিন কারণে যথা দুষ্প্রাপ্যতা, বাহ্যিকতা ও সঞ্চয়নের কারণে কথা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কথা এমন সম্পদ, যা সবসময়ই দুষ্প্রাপ্য। আমরা মনে করি, ভাষার মাধ্যমে আমরা যা খুশি বলতে পারি, কথার কোনো অভাব নেই। ফুকোর মতে, একটি সমাজ, একটি সংস্কৃতি বা একটি নির্দিষ্ট সময়ে, কিছু অদৃশ্য নিয়ম কাজ করে, যা সেই অসীম সম্ভাবনা থেকে মাত্র কয়েকটি কথাকে বলবার বা লিখবার সুযোগ দেয়। বাকি অগণিত কথাকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয় বা গুরুত্বহীন করে তোলা হয়। আপনি চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছেন। সেখানে সব বিষয় নিয়ে কথা বলবার স্বাধীনতা আছে বলে মনে হয়। কিন্তু আপনি চাইলেই সেখানে দাঁড়িয়ে দেশের খুব প্রভাবশালী কোনো নেতার বিরুদ্ধে যাচ্ছেতাই বলতে পারবেন না, আপনার মধ্যে ভয় কাজ করবে। আপনি চাইলেই সেখানে আপনার মনের গভীর কোনো বেদনার কথা বলতে পারবেন না, পাছে লোকে হাসাহাসি করে বা বলবে ন্যাকামি মনে করে। ফলে ওই চায়ের দোকানে কেবল রাজনীতি, ক্রিকেট বা বাজারদর নিয়ে কথাগুলিই বলা সম্ভব হয়ে ওঠে। এই যে সমাজ হাজার হাজার বিষয় বাদ দিয়ে মাত্র কয়েকটা বিষয়কে বলবার যোগ্য বানিয়ে দিল একে ফুকো বলছেন দুষ্প্রাপ্যতা। যা কিছু কম, তার দাম বেশি। এই নির্বাচিত কথাগুলিই সমাজে ক্ষমতা তৈরি করে।
আমরা ভাবি যে, আমি যা বলছি, সেটা আমার মনের কথা। ফুকো বলছেন, ভুল ভাবছেন। আপনি যা বলছেন, সেটা আসলে আপনার চারপাশের পরিবেশ, আপনার অবস্থান ও পরিস্থিতি ঠিক করে দিচ্ছে। আপনি কেবল একটি মাধ্যম মাত্র। আপনি একজন অফিসের বস। আপনি অধস্তনকে একটি ইমেইল লিখছেন। আপনি চাইলেই সেখানে ‘দোস্ত কেমন আছিস’ টাইপ কথা লিখতে পারবেন না। এখানে আপনি কী ভাবছেন সেটা বড়ো কথা নয়। বড়ো কথা হল অফিসের নিয়ম, আপনার বসের চেয়ার ও কর্পোরেট কালচার আপনাকে বাধ্য করছে নির্দিষ্ট ভাষা ব্যবহার করতে। এখানে বক্তা আসল নন, আসল হল ব্যবস্থা। এই বাইরের জগৎটাই আপনার মুখের কথা ঠিক করে দেয়, এটিই বাহ্যিকতা।
পুরোনো কথা মরে যায় না, নতুন রূপ নেয়। আমরা ভাবি, পুরোনো ইতিহাস বা দলিল-দস্তাবেজ মানেই মৃত জিনিস, যা জাদুঘরে সাজানো থাকে। ফুকো বলছেন, মোটেই না। পুরোনো কথা বা নিয়মগুলি স্তরে স্তরে জমা হতে থাকে এবং আজকের দিনেও আমাদের শাসন করে। এগুলি জীবন্ত। আজকের দিনে সরকার নতুন কোনো ইন্টারনেট আইন বানাচ্ছে। এই আইনটি কি একদম শূন্য থেকে বানানো? না। আইনজীবীরা ১০০ বছরের পুরোনো কোনো ব্রিটিশ আমলের আইনের বই ঘেঁটে দেখছেন তখন কী শাস্তি ছিল, সেটাকে একটু ঘষামাজা করে আজকের আইনে ঢুকাচ্ছেন। অর্থাৎ ১০০ বছর আগের সেই পুরোনো কথা বা দলিলটি কিন্তু মরে যায়নি। তা আজকের দিনেও আপনার ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করছে। পুরোনো জ্ঞানগুলি ব্যাংকে টাকা জমানোর মতো সঞ্চয় হয়ে থাকে এবং সময়মতো সুদে-আসলে ক্ষমতা খাটায়। এটিই সঞ্চয়ন।
২.
ফুকো বলছেন, যেকোনো ডিসকোর্স-এর একটি নিজস্ব ঐক্য থাকে, অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট যুগে প্রাজ্ঞরা যখন কথা বলেন, তারা একটি অদৃশ্য সাধারণ নিয়ম মেনে চলেন। তারা হয়তো পরস্পরের বিরোধিতা করেন, কিন্তু তাদের বিরোধিতার ভাষাও একই কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। মধ্যযুগে দুজন যাজক তর্ক করছেন। একজন বলছেন, ‘ঈশ্বর ক্ষমাশীল। অন্যজন বলছেন, ‘ঈশ্বর কঠোর বিচারক।’ তাদের মত ভিন্ন, কিন্তু তাদের কথা একার্থে একই। কারণ দুজনেই মেনে নিচ্ছেন যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব মেনেই এই স্টেটমেন্ট দিচ্ছেন। তাদের তর্কের ভিত্তি একই। কিন্তু আজকের যুগের একজন অবিশ্বাসীর সঙ্গে যাজকের সেই তর্ক মিলবে না, কারণ তাদের স্টেটমেন্টর মূলগত একতা নেই। ইতিহাস বা চিকিৎসাবিদ্যায় আমরা দেখি, বিভিন্ন বিজ্ঞানী বা লেখক আলাদা আলাদা সময়ে জন্মিয়েছেন, তাদের বই আলাদা, এমনকি তাদের মতবাদও হয়তো আলাদা। কিন্তু তবু তাদের সবার মধ্যে একটি অদৃশ্য মিল বা ঐক্য থাকে। এই ঐক্য মানে এটি নয় যে, তারা সবাই একই সত্য কথা বলেছেন। এর মানে তারা একই খেলার মাঠে খেলছেন। আঠারো শতকের দুজন জীববিজ্ঞানী লিনিয়াস ও বুফন পরস্পরের বিরোধী হতে পারেন, একজন আরেকজনের সূত্র ভুল প্রমাণ করতে পারেন। কিন্তু ফুকো বলছেন, তাদের এই ঝগড়াটা সম্ভব হচ্ছে কারণ তারা একই নিয়ম বা কাঠামোর মধ্যে থেকে চিন্তা করছেন। তারা একই ধরনের প্রশ্ন তুলছেন, একই ধরনের শব্দ ব্যবহার করছেন। কিন্তু ডারউইন যখন উনিশ শতকে এলেন, তিনি লিনিয়াস বা বুফনের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। ডারউইনের চিন্তার জগৎ আলাদা। তাই লিনিয়াসের সঙ্গে ডারউইনের তুলনা চলে না। ডিসকোর্স-এর ঐক্য সেই সাধারণ পটভূমি বা অদৃশ্য নিয়ম, যা ঠিক করে দেয় একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিজ্ঞানীরা কীভাবে কথা বলবেন বা তর্ক করবেন।
ফুকো বলছেন, কোনো কথা সত্য কি না, তা নির্ভর করে ওই সময়ের ইতিহাসের ওপর, একটি কথা কেবল ব্যাকরণগতভাবে শুদ্ধ হলেই হবে না, সেই সময়ের ইতিহাসে কথাটির অস্তিত্ব থাকতে হবে। এটি কোনো চিরস্থায়ী সত্য নয় বা কোনো লেখকের ব্যক্তিগত খেয়ালখুশিও নয়, এটি ইতিহাসের সেই নির্দিষ্ট নিয়ম যা ঠিক করে দেয় এই যুগে কী বলা সম্ভব আর কী বলা সম্ভব নয়। সতেরো শতকে কেউ চাইলেও ‘আমার ডিএনএ পরীক্ষা করা দরকার’ এমন কথা বলতে পারত না। কারণ সেইসময় জ্ঞানের কাঠামোতে জিনের ধারণাই ছিল না। ঐতিহাসিক পূর্বপ্রমাণ্য হল সেই সময়ের ছাঁচ বা নিয়ম, যার ভেতর দিয়ে গিয়ে একটি কথা বা জ্ঞান সমাজে প্রকাশিত হয়।
সাধারণত আর্কাইভ বলতে আমরা বুঝি পুরোনো দলিলপত্র রাখবার জায়গা। কিন্তু ফুকোর মতে, আর্কাইভ কেবল এমন কোনো জায়গা নয়, এটি সেই অদৃশ্য ব্যবস্থা বা আইন, যা ঠিক করে দেয় সমাজে কোন কথাগুলি বলা যাবে, কোনগুলি সংরক্ষিত থাকবে এবং কোনগুলি হারিয়ে যাবে। এটি এমন এক নিয়মতন্ত্র যা হাজার হাজার কথার ভিড় থেকে কিছু নির্দিষ্ট কথাকে জ্ঞান বা সত্য হিসেবে টিকিয়ে রাখে। এটি ঠিক করে দেয়, কেন আমরা কিছু কথা মনে রাখি আর কিছু কথা ভুলে যাই। এটি হল যা কিছু বলা সম্ভব, তারই নিয়ম। যেমন আজকের যুগে আমরা চিকিৎসাবিদ্যাকে যেভাবে মান্য করি, ঝাড়ফুঁককে সেভাবে করি না। কেন? কারণ আমাদের সময়ের আর্কাইভ বা জ্ঞানব্যবস্থা চিকিৎসাবিদ্যাকে বৈধতা দিয়েছে আর ঝাড়ফুঁককে কুসংস্কার হিসেবে বাতিল করেছে। এই আর্কাইভই ঠিক করে দেয় যে, গ্যালিলিওর কথা একসময় কেন বাতিল ছিল, আর আজ কেন সেটাই ধ্রুব সত্য। এটি হল সেই নিয়মতন্ত্র যা আমাদের কথাবার্তা ও জ্ঞানকে সাজিয়ে রাখে। এটি সেই ব্যবস্থা, যা ঠিক করে দেয় সমাজে কী বলা যাবে এবং কোন জ্ঞানটি ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করবে।
আমরা যা বলি বা ভাবি, তা আমরা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বলি না। আমরা ইতিহাসের এক অদৃশ্য কাঠামোর অধীনে আছি। আমরা সবাই এক অদৃশ্য নিয়ম মেনে বা একই মাঠে দাঁড়িয়ে কথা বলি। আমাদের সব কথার পেছনে ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট শর্ত বা প্রেক্ষাপট থাকে, যা ছাড়া ওই কথার কোনো মূল্য নেই। এটি সেই অদৃশ্য নিয়মতন্ত্র যা আমাদের কথাগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে, সাজায় এবং ঠিক করে দেয় কোনটা থাকবে আর কোনটা থাকবে না। ·

0 মন্তব্যসমূহ