আলম খোরশেদ একাধারে বিশিষ্ট অনুবাদক, প্রাবন্ধিক ও সংস্কৃতিজন। ১৯৬০ সালে কুমিল্লায় তাঁর জন্ম। ছাত্রাবস্থা থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা শাখায় সক্রিয় তিনি; যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশের গ্রুপ থিয়েটার, বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন এবং সমকালীন শিল্পচর্চায়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে যন্ত্রকৌশলে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের সিটি ইউনিভার্সিটির বারুচ কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রবাসে প্রায় দেড় দশক প্রকৌশল পেশায় নিয়োজিত থাকার পর ২০০৪ সালে স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে আসেন এবং সংস্কৃতিচর্চায় পূর্ণকালীন আত্মনিয়োগ করেন।
শিল্প ও সাহিত্যের বহুমুখী শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ থাকলেও তাঁর প্রধান আগ্রহের ক্ষেত্র সমকালীন বিশ্বসাহিত্য। চট্টগ্রামে তিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘বিশদ বাংলা’ নামের একটি ব্যতিক্রমী সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ নয় বছর তা সফলভাবে পরিচালনার পর ২০১৪ সালের শেষের দিকে ‘চট্টগ্রাম আর্টস ট্রাস্ট’-এর অধীনে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বিস্তার: চিটাগং আর্টস কমপ্লেক্স’। সম্পাদনা, অনুবাদ ও মৌলিক রচনা মিলিয়ে তাঁর গ্রন্থসংখ্যা কুড়িটিরও অধিক। অনুবাদসাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য অনুবাদগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: জাদুবাস্তবতার গাথা: লাতিন আমেরিকার গল্প, বোরহেস নাগিব চিনুয়া, মার্কেস ও অন্যান্যদের গল্প, দক্ষিণী ও লাতিন আমেরিকার অন্যান্য গল্প, লাতিন-দ্বাদশী, ভার্জিনিয়া উল্ফের নিজের একটি কামরা, সালমান রুশদির দ্য জাগুয়ার স্মাইল, হেনরি মিলার: ভাবনাগুচ্ছ, তরজমাগুচ্ছ, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর বোর্হেসের সঙ্গে কথোপকথন, ভিস্লাভা শিমবরস্কার ত্রিশটি কবিতা, নৈঃশব্দ্যের নামগান এবং নির্জন নিঃশ্বাস: নারীবিশ্বের কবিতা।
বর্তমানে তিনি সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি নিজের গড়া সংস্কৃতি-কেন্দ্র ‘বিস্তার’ পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন। সম্প্রতি ‘গল্পপাঠ’-এর পক্ষ থেকে তাঁকে একটি লিখিত সাক্ষাৎকার পাঠানো হলে তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে সেগুলোর উত্তর লিখে পাঠান। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন স্বকৃত নোমান।

স্বকৃত নোমান :
আপনার পড়াশোনার একটা সময় কেটেছে নিউ ইয়র্কে। বহু ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে থাকা আপনার সাহিত্যপাঠ এবং পৃথিবীকে দেখার চোখে কী ধরনের পরিবর্তন এনেছিল?
আলম খোরশেদ :
আমি বুঝতে পেরেছিলাম পৃথিবীর বহু দেশে ও বহু ভাষায় অত্যন্ত উন্নতমানের সাহিত্য রচিত হচ্ছে। বৈচিত্র্য, বিস্তৃতি ও গভীরতায় সেগুলো প্রায়শই বাংলা সাহিত্যের চেয়ে উচ্চাঙ্গের। সেসব সাহিত্যের বহু লেখক স্রেফ লেখালেখিকেই তাঁদের জীবনের প্রধান ব্রত ও সাধনা হিসেবে গ্রহণ করেন এবং তার জন্য প্রচুর ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকেন। সেই তুলনায় আমাদের সাহিত্যের একটা বড় অংশকেই মনে হতো সৌখিন, অপরিকল্পিত ও অগভীর। এর জন্য প্রধানত আমাদের সমাজ-বাস্তবতা ও অনুন্নত অর্থনীতিই প্রধানত দায়ী হলেও, তাকে উপেক্ষা ও অতিক্রম করার জন্য যে মানসিক শক্তি ও সক্ষমতা প্রয়োজন, কোথায় যেন তার একটা ঘাটতি লক্ষ করতাম। শিল্পসাহিত্য যে একটি গভীর ও একাগ্র সাধনার বিষয়, যা এখনও আমাদের সমাজমানসে সেভাবে শেকড় গাড়তে পারেনি, সে সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হওয়ার ফলে একধরনের বিষণ্নতার বোধ কাজ করত মনে।
স্বকৃত নোমান :
অনুবাদের দিকে এলেন কীভাবে? প্রথম কোন লেখা অনুবাদ করতে গিয়ে মনে হয়েছিল, এই কাজটি আপনি নিয়মিত করতে চান?
আলম খোরশেদ :
অনুবাদের দিকে আসাটা আসলে আমার একটি সচেতন সিদ্ধান্তের ফসল। মূলত প্রবাসে থাকাকালীন বিশ্বসাহিত্যের প্রচুর বিখ্যাত লেখককে পাঠ করার সময় মনে হতো, তাঁদের অপূর্ব সব সাহিত্যের স্বাদটুকু যদি কিছুটা হলেও আমার স্বদেশি লেখক-পাঠক বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারতাম তাহলে বেশ হতো। সেই ভাবনা থেকেই মূলত মৌলিক লেখার পাশাপাশি অনুবাদের কাজটাও শুরু করি। এরপর পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশকের উৎসাহ, আগ্রহ, অনুরোধ ও উপরোধে সেটি আমার এক নিয়মিত অভ্যাস ও সাহিত্যিক কর্তব্যের অংশ হয়ে ওঠে।
স্বকৃত নোমান :
আপনি মূলত কথাসাহিত্য অনুবাদ করেন। গল্প-উপন্যাসের প্রতি এই বিশেষ টান কেন?
আলম খোরশেদ :
কথাটি সর্বাংশে সত্য নয়। আমি কথাসাহিত্যের পাশাপাশি প্রচুর কবিতাও অনুবাদ করেছি দু’হাতে। এছাড়া বেশ ক’টি মননশীল গদ্যগ্রন্থ, যেমন ভার্জিনিয়া উলফের A Room of One's Own, হেনরি মিলারের আত্মজৈবনিক রচনা Reflections, সালমান রুশদির নিকারাগুয়া ভ্রমণ-আখ্যান The Jaguar Smile; এর বাইরে I Shall Marry When I Want নামে কেনিয়ার প্রখ্যাত লেখক নগুগি ওয়া থিয়োংগ’ওর একটি সুবিখ্যাত নাটকও অনুবাদ করেছি।
স্বকৃত নোমান :
কোনো গল্প বা উপন্যাস অনুবাদের জন্য বেছে নেওয়ার সময় প্রথমে কী দেখেন? লেখক, বিষয়, ভাষা, শিল্পগুণ, নাকি বাংলা পাঠকের কাছে লেখাটির প্রয়োজন?
আলম খোরশেদ :
উল্লিখিত সবক’টি বিষয়ই কমবেশি প্রযোজ্য, তবে বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে তার আবেদন ও প্রয়োজনীয়তার বিবেচনাটিই শেষবিচারে প্রধান হয়ে ওঠে আমার কাছে।
স্বকৃত নোমান :
অনুবাদ শুরু করার আগে একটি লেখা আপনি কীভাবে পড়েন? লেখকের অন্য লেখা, তাঁর সময়, সমাজ বা ব্যক্তিজীবন সম্পর্কেও কি খোঁজ নেন?
আলম খোরশেদ :
প্রথমে একটি সরল পাঠের মাধ্যমে রচনাটির মূল ভাব ও বক্তব্যকে বুঝে নিতে চেষ্টা করি। দ্বিতীয় পাঠে এর অন্তর্নিহিত রূপ, রস, ইঙ্গিত ইত্যাদি গভীরতর অনুষঙ্গসমূহ আবিষ্কারে মনোযোগ দিই। সবশেষে এতে অন্তর্ভুক্ত নানাবিধ তথ্য, ডিটেল, পরিবেশ-পরিচিতির পাশাপাশি লেখকের ব্যক্তি, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন সম্পর্কেও কিছুটা পড়াশোনা করে নিতে হয়। এক্ষেত্রে আজকাল ইন্টারনেট তথা আন্তর্জাল একটি বড় আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে আমাদের লেখক-অনুবাদকদের জন্য।
স্বকৃত নোমান :
অনুবাদকে কি আপনি এক ধরনের গভীর পাঠ বলে মনে করেন? এমন কি হয়েছে, অনুবাদ করতে গিয়ে একটি গল্পে এমন কিছু আবিষ্কার করেছেন, যা সাধারণ পাঠের সময় চোখে পড়েনি?
আলম খোরশেদ :
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। যে কোনো রচনার প্রথম পাঠে সাধারণ পাঠক, এমনকি আমরা অনুবাদকেরাও, অনেককিছুই এড়িয়ে যাই। প্রধানত আলস্যের কারণে এবং অংশত এর প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবনে ব্যর্থতার দরুন। কিন্তু অনুবাদের সময় তো একজন দায়িত্বশীল ও নিষ্ঠাবান অনুবাদক রচনার প্রতিটি শব্দ, বাক্য, যতিচিহ্ন, পাদটীকা এমনকি উল্লেখপঞ্জির দিকেও সমান মনোযোগ ও অভিনিবেশ দিয়ে থাকেন, কেননা সেখান থেকেও তিনি তাঁর অনুবাদের জন্য অনেক সহায়ক রসদ সংগ্রহ ও কৌশল আবিষ্কার করতে পারেন।
স্বকৃত নোমান :
একটি গল্পের শব্দ ও বাক্যের অর্থ বাংলায় আনা যায়। কিন্তু তার স্বর, ছন্দ, নীরবতা, ব্যঙ্গ বা অস্বস্তি কীভাবে বাংলায় আনেন?
আলম খোরশেদ :
এটাই তো আসলে একজন অনুবাদকের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর জন্য আসলে একজন অনুবাদককে তাঁর উৎসভাষার ওপর অগাধ দখল রাখতে হয়, যা কোনো অংশেই একজন সৃজনশীল লেখকের চাইতে কম নয়। বরং কখনো কখনো তাঁর চাইতেও অধিক দক্ষতা ও উৎকর্ষের প্রয়োজন পড়ে একজন সৃষ্টিশীল ও সুদক্ষ অনুবাদকের জন্য।
স্বকৃত নোমান :
ইংরেজি আর বাংলার বাক্যরীতি এক নয়। মূলের কাছাকাছি থাকতে গিয়ে বাংলা যেন ইংরেজি-ঘেঁষা না হয়ে যায়, সেটা কীভাবে সামলান?
আলম খোরশেদ :
এটা ঠিক, বাংলা আর ইংরেজির বাক্যরীতি একেবারেই এক নয়। লেখাটা যেহেতু বাংলায় অনূদিত হচ্ছে সেহেতু এর বাক্যরীতি যতটা সম্ভব বাংলা ভাষার স্বধর্ম অনুযায়ী হওয়া উচিত। আমি প্রথমে মোটামুটি মূলানুগ, প্রায় আক্ষরিক একটা অনুবাদের খসড়া তৈরি করে ফেলি। তারপর সেটিকে বারেবারে সম্পাদনা, সংশোধনের মাধ্যমে বাংলার ভাষিক রীতি ও ব্যাকরণ মেনে তাকে যথাসম্ভব সর্বজনগ্রাহ্য বাংলা ভাষার চেহারা দিতে সচেষ্ট থাকি।
স্বকৃত নোমান :
আপনার কাছে অনুবাদে বিশ্বস্ততা বলতে আসলে কী বোঝায়? শব্দের প্রতি বিশ্বস্ততা, না মূল রচনার স্বর, অর্থ ও শিল্পরীতির প্রতি বিশ্বস্ততা?
আলম খোরশেদ :
অনুবাদের বিশ্বস্ততা একটি সার্বিক বিষয়। ভাষা ও বক্তব্যের প্রতি বিশ্বস্ততার বিষয়টি তো বলাই বাহুল্য খুবই অপরিহার্য, কিন্তু একই সঙ্গে মূল রচনার ভঙ্গি, স্বর, শৈলী, ছন্দ, উপস্থাপনরীতি ইত্যাদিকেও যতটা সম্ভব আত্মস্থ করে নিয়ে লক্ষ্য-ভাষায় আত্মীকৃত করাটা জরুরি বলে মনে করি।
স্বকৃত নোমান :
আক্ষরিক অনুবাদ করলে যদি বাংলা অস্বাভাবিক শোনায়, আবার স্বাভাবিক বাংলা করতে গেলে মূল বাক্যের গঠন বদলাতে হয়, তখন আপনি কোন পথ নেন?
আলম খোরশেদ :
মূল বাক্যের গঠন বদলানোটা বড় কোনো অপরাধ নয় বলে মনে করি, কেননা একেক ভাষার বাক্যের গঠন একেক রকম। খেয়াল রাখতে হবে যেন সেটি করতে গিয়ে মূল লেখকের বিশেষ কোনো আঙ্গিক বা শৈলীগত বৈশিষ্ট্য হারিয়ে না যায়।
স্বকৃত নোমান :
অনুবাদক কতটা স্বাধীন? কোন জায়গায় এসে তাঁর স্বাধীনতা থামা উচিত?
আলম খোরশেদ :
অনুবাদক সেই অর্থে আসলে স্বাধীন নন। তিনি মূল রচনার লেখক, ভাষা, ধর্ম, রাজনৈতিক বিশ্বাস, সংস্কৃতি ইত্যাদির কাছে দায়বদ্ধ। ফলে তাঁকে তাঁর তরজমা-কর্মের ভাষা, ভঙ্গি, উপস্থাপনারীতিতে নিজস্বতা বা স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করেও মূল লেখক ও লেখার উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যাবলির প্রতি বিশ্বস্ত থাকা উচিত বলে মনে করি।
স্বকৃত নোমান :
প্রত্যেক বড় লেখকেরই নিজস্ব গদ্যভঙ্গি থাকে। হেমিংওয়ে, কাফকা, ভার্জিনিয়া উলফ বা টনি মরিসন একইভাবে লেখেন না। বাংলায় অনুবাদের সময় লেখকদের এই আলাদা স্বর কীভাবে ধরে রাখা যায়?
আলম খোরশেদ :
এটা একটি দুরূহ কাজ। তবে এর অনেকটাই অর্জন করা যায় যদি মূল টেক্সটের প্রতি যথাসম্ভব বিশ্বস্ত থাকা যায়। কেননা স্বর কিংবা শৈলীর প্রাতিস্বিকতাও তো একজন লেখকের অবিচ্ছেদ্য চারিত্র্যলক্ষণ। বাকিটা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সৃজনশীলতার প্রতি আনুগত্য রক্ষা এবং তাকে সাধ্যমতো চর্চা ও অনুসরণের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করি।
স্বকৃত নোমান :
অনুবাদকের নিজেরও একটি ভাষা ও লেখার ধরন থাকে। নিজের সেই ভাষা যেন মূল লেখকের ভাষাকে ঢেকে না ফেলে, সেটা কীভাবে সামলান?
আলম খোরশেদ :
তা থাকে নিশ্চয়ই। তবে সেটি সৃজনশীল সাহিত্যিকদের মতো অতটা উচ্চকিত না হওয়াই শ্রেয়। আমার নিজের ভাষারও একটি স্বতন্ত্র শৈলী বা স্বর রয়েছে বটে, কিন্তু সেটিকে আমি কখনোই মূল লেখকের ভাষাশৈলী বা সাহিত্যিক কণ্ঠস্বরকে ছাপিয়ে উঠতে দিই না।
স্বকৃত নোমান :
অনেক অনুবাদ পড়লে মনে হয়, পৃথিবীর নানা দেশের লেখক বাংলায় এসে প্রায় একই ভাষায় কথা বলছেন। কেন এমন হয়?
আলম খোরশেদ :
এটি মূলত হয়ে থাকে আক্ষরিক অনুবাদের কারণে। অনুবাদক এখানে লক্ষ্য-ভাষার স্বাতন্ত্র্য, বৈশিষ্ট্য, শৈলী এবং বাচিক ও ব্যাকরণিক চারিত্র্যলক্ষণ বিষয়ে উদাসীন; কখনো কখনো এমনকি পুরোপুরি বিস্মৃত হন। তিনি তাকে লক্ষ্য-ভাষার নিজস্ব আত্মার অন্তর্গত করে নিয়ে তার মধ্যে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করার কষ্ট ও পরিশ্রমটুকু করতে অনীহ হন। অথচ একটি অনুবাদকর্ম সার্থক, স্বাদু, সুখপাঠ্য, সর্বোপরি সাহিত্যগুণসম্পন্ন হয়ে ওঠে মূলত এই দ্বিতীয় পর্বের অবশ্যকরণীয় অনুশীলনটুকুর জন্যই।
স্বকৃত নোমান :
সংলাপ অনুবাদের সবচেয়ে কঠিন জায়গা কোনটি? ইংরেজিতে খুব স্বাভাবিক একটি কথা বাংলায় সরাসরি অনুবাদ করলে অনেক সময় কৃত্রিম শোনায়। তখন কী করেন?
আলম খোরশেদ :
সংলাপের অনুবাদ আক্ষরিকভাবে করতে যাওয়াটা একটা বিরাট ভুল। কেননা একেক ভাষায় কথা বলার একেক রূপ রয়েছে। আবার ক্ষেত্রবিশেষে ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সেই রূপেরও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। আমি নিজে একসময় গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম; নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের হয়ে মঞ্চেও অভিনয় করেছি। এছাড়া রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বসু, বাদল সরকার, সৈয়দ শামসুল হক কিংবা শেকসপিয়র, চেখভ, ব্রেশট প্রমুখের প্রচুর নাটকের অভিনিবিষ্ট পাঠের অভিজ্ঞতা আমার অনুবাদকর্মে সংলাপরচনার কাজে যথেষ্ট সাহায্য করে।
স্বকৃত নোমান :
গালি, যৌনতা, ধর্ম, জাতিগত পরিচয় বা রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর কোনো কথা মূল রচনায় থাকলে অনুবাদকের কি তা নরম করার অধিকার আছে?
আলম খোরশেদ :
না, নীতিগতভাবে তা নেই। তবে অনেক সময় লক্ষ্যভাষার পাঠকের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় বাস্তবতা ও মনোজগতের কথা বিবেচনা করে অনেক অনুবাদকই সেটা করে থাকেন, যা হয়তো ততটা দোষেরও কিছু নয়।
কোনো সংস্কৃতির রসিকতা, খাবার, পোশাক, লোকাচার বা ঐতিহাসিক ইঙ্গিত বাংলা পাঠকের কাছে একেবারেই অপরিচিত হলে কী করেন? কতটা বুঝিয়ে দেন, আর কতটা অপরিচিতই রেখে দেন?
আলম খোরশেদ :
মূল পাঠবস্তুর মধ্যেই সেটাকে বুঝিয়ে দেওয়াটা ঠিক কাজের কথা নয়। তবে প্রয়োজনে পাদটীকা ব্যবহার করে সেটা আরেকটু খোলাসা করে দেওয়া যেতে পারে নিশ্চয়ই।
স্বকৃত নোমান :
অনুবাদে পাদটীকা সম্পর্কে আপনার মত কী? এটি পাঠককে সাহায্য করে, নাকি গল্প পড়ার স্বাভাবিক গতি নষ্ট করে?
আলম খোরশেদ :
কেবল অনুবাদ নয়, সব ধরনের লেখাতেই পাদটীকা একপ্রকার পাঠ-বিঘ্ন ঘটায়। কিন্তু কখনো কখনো এর প্রয়োজনীয়তাকেও অস্বীকার করা যায় না। এর সংখ্যা ও পুনরাবৃত্তি কিঞ্চিৎ নিয়ন্ত্রিত হওয়াই কাম্য।
স্বকৃত নোমান :
একজন ভালো সাহিত্য-অনুবাদকের জন্য কোনটি বেশি জরুরি, ইংরেজি ভাষার ওপর দখল, বাংলা ভাষার ওপর দখল, নাকি বিস্তর সাহিত্যপাঠ?
আলম খোরশেদ :
একজন ভালো সাহিত্য-অনুবাদকের দুই ভাষাতেই, তথা উৎস ভাষা ও লক্ষ্য ভাষা, উভয়ের ওপরই ভালো দখল থাকা দরকার, তবে লক্ষ্য ভাষা, অর্থাৎ যে-ভাষায় লেখাটি অনূদিত হচ্ছে তার ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি দখল বা দক্ষতা থাকা উচিত বলে আমি মনে করি। আর ‘বিস্তর সাহিত্যপাঠ’ তো সবরকম লেখালেখির ক্ষেত্রেই একটি অন্যতম পূর্বশর্ত।
স্বকৃত নোমান :
আপনি বিশ্বসাহিত্য নিয়ে পড়েন এবং লেখেনও। আপনার কাছে ‘বিশ্বসাহিত্য’ বলতে কী বোঝায়? যে সাহিত্য ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে বা পশ্চিমের বড় প্রকাশনা ও পুরস্কারের মাধ্যমে পরিচিত হয়েছে, আমরা কি অনেক সময় সেটাকেই বিশ্বসাহিত্য বলে ধরে নিই?
আলম খোরশেদ :
হ্যাঁ, কথাটা অপ্রিয় হলেও সত্য। মূলধারার অন্তর্গত ও স্বীকৃত তথাকথিত ‘বিশ্বসাহিত্যে’র বাইরেও এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার বিশাল ও বিপুল এক সাহিত্যের জগৎ রয়েছে, যে বিষয়ে আমরা হয়তো অতটা অবগতও নই। পশ্চিমা বিশ্বের মূলধারা কর্তৃক প্রচারিত ও প্রশংসিত সাহিত্য ও সাহিত্যিক বিষয়ে আমাদের তাই সবসময় কিছুটা প্রশ্নশীল ও সমালোচনামনস্ক হওয়া উচিত। পাশাপাশি নিজস্ব অনুসন্ধান, আলোচনা ও গবেষণা অব্যাহত রাখাটাও জরুরি।
স্বকৃত নোমান :
বিশ্বসাহিত্যের কথাসাহিত্যের পাশে বাংলা কথাসাহিত্যকে রাখলে আপনি কোথায় দেখেন? আমাদের শক্তির জায়গাগুলো কী? আবার কোথায় পিছিয়ে আছি?
আলম খোরশেদ :
বিশ্বসাহিত্যের তুলনায় বাংলা কথাসাহিত্য হয়তো অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। তবে সত্যি বলতে কী, এর জন্য যত না আমাদের লেখকেরা দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী প্রকাশক ও পত্রিকার সম্পাদক সম্প্রদায়। এখানে মনের আনন্দে, হাত খুলে লেখার ন্যূনতম পরিবেশটাই তৈরি হয়নি আজও। এক কথায় বলতে গেলে, এর জন্য যে সত্যিকার পেশাদারিত্বের প্রয়োজন, লেখক-সম্পাদক-প্রকাশক সবারই পক্ষ থেকে, সেটি একেবারে নেই বললেই চলে। এরই মাশুল দিতে হচ্ছে আমাদের সাহিত্য, বিশেষ করে কথাসাহিত্যকে।
স্বকৃত নোমান :
বিষয়, ভাষা, আঙ্গিক ও গল্প বলার নতুন পথ খোঁজার দিক থেকে সাম্প্রতিক বাংলা কথাসাহিত্য সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা কী?
আলম খোরশেদ :
সত্যি বলতে কী, একেবারে সাম্প্রতিক বাংলা কথাসাহিত্যের সঙ্গে আমার জানাশোনা যে খুব নিবিড় সেকথা জোর দিয়ে বলা যাবে না। তবু মাঝেমধ্যে পত্রিকার সাহিত্যপাতা, ঈদসংখ্যা, লিটল ম্যাগাজিন ইত্যাদিতে বেশ কিছু ভালো গল্প পড়ার সুযোগ ও সৌভাগ্য হয়েছে আমার। সেই তুলনায় সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী উপন্যাস খুব বেশি চোখে পড়েনি তেমন। একজন দেবেশ রায়-সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়-অভিজিৎ সেন; হাসান আজিজুল হক-আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-কায়েস আহমেদ কিংবা হালের শহীদুল জহির-আকিমুন রহমান-জাকির তালুকদার-মশিউল আলম-ইমতিয়ার শামীম-মাসরুর আরেফিনদের পাশাপাশি মাহবুব ময়ূখ রিশাদ, আনিফ রুবেদ, আশানুর রহমান, হামিম কামাল, বর্ণালী সাহা, কিযী তাহনিন, স্বকৃত নোমান, মোজাফফর হোসেন, সুহান রিজওয়ান প্রমুখ শক্তিমান লেখকেরাও রয়েছেন। কিন্তু এর পর তো আর শক্তিমান ও সম্ভাবনাময় তরুণ কথাসাহিত্যিক তথা ঔপন্যাসিকদের চোখে পড়ছে না তেমন।
স্বকৃত নোমান :
বাংলা কথাসাহিত্যের কোনো সীমাবদ্ধতা যদি আপনার চোখে পড়ে, তার কারণ কোথায়? লেখকের প্রস্তুতি ও পাঠে, ভাষা ও আঙ্গিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায়, প্রকাশনা ব্যবস্থায়, নাকি পাঠকের রুচিতে?
আলম খোরশেদ :
মূলত প্রকাশনা ব্যবস্থায় এবং অংশত পাঠকের রুচিতে। তবে পাঠকের রুচি তৈরির পেছনেও প্রকাশকদের একটা বড় ভূমিকা থাকে। সেখানে তাঁরা যথাযথ ভূমিকা রাখছেন বলে মনে হয় না। এককথায়, মোটাদাগে বলতে গেলে পেশাদারিত্বের সার্বিক সংকটই আসলে এর পেছনে দায়ী বলে আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ।
স্বকৃত নোমান :
বাংলা ভাষার এমন কোনো কথাসাহিত্যিক আছেন, যাঁর লেখা বিশ্বসাহিত্যের পাঠকের কাছে আরও বড় পরিসরে পৌঁছানো উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আলম খোরশেদ :
তা আছেন বৈকি। জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব বসু, সমর সেন, দেবেশ রায় প্রমুখ, কিংবা আমাদের শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, আলতাফ হোসেন, কায়েস আহমেদ, আকিমুন রহমান, ইমতিয়ার শামীম প্রমুখ লেখকদের রচনা আরও বেশি করে অনূদিত হওয়া বাঞ্ছনীয়।
স্বকৃত নোমান :
আমরা বিশ্বসাহিত্য বাংলায় আনার ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহী। কিন্তু বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বের কাছে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কি একই রকম আগ্রহ দেখাই?
আলম খোরশেদ :
না, তা দেখাই না। তবে এটা ঠিক অনুবাদকের একার কাজ নয়। এর পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও থাকা দরকার সমভাবে। প্রকাশকদের পক্ষ থেকেও পরিকল্পনা, প্রস্তাবনা, উদ্যোগ, তাগিদ থাকা উচিত। আর দরকার রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা, ব্যবস্থাপনা, আয়োজন, দূতিয়ালি, কূটনীতি ইত্যাদির।
স্বকৃত নোমান :
আপনি বিদেশে পড়াশোনা করেছেন, ইংরেজি ও বাংলা দুই ভাষার সঙ্গেই আপনার ঘনিষ্ঠতা আছে। ইংরেজি থেকে বাংলায় নিয়মিত অনুবাদও করেন। কিন্তু বাংলা কথাসাহিত্য ইংরেজিতে অনুবাদ করার দিকে যাননি কেন?
আলম খোরশেদ :
হ্যাঁ, ইংরেজি ও বাংলা দুই ভাষার সঙ্গেই আমার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে সত্য, কিন্তু বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করার জন্য যতটা সাহিত্যিক দখল ও দক্ষতা প্রয়োজন ততটা ইংরেজি-ভাষাজ্ঞান তথা নৈপুণ্য আমার আয়ত্তে রয়েছে কি না সে বিষয়ে আমি ঠিক নিশ্চিত নই বলেই হয়তো সে পথে এগুনো হয়নি আর।
স্বকৃত নোমান :
বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদের ক্ষেত্রে দক্ষ অনুবাদকের অভাবই কি প্রধান সমস্যা, নাকি আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ও যোগাযোগের ঘাটতিও বড় বাধা?
আলম খোরশেদ :
দক্ষ অনুবাদকের অভাবটা হয়তো অতটা বড় নয়, কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রকাশনা পরিমণ্ডল, তার প্রক্রিয়া, পদ্ধতি, রীতি, সংস্কৃতি বিষয়ে আমাদের লেখক, প্রকাশকদের জানাশোনার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে বলেই মনে হয় আমার।
স্বকৃত নোমান :
বাংলাদেশে এখন অনুবাদের বইয়ের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। কিন্তু সংখ্যার সঙ্গে অনুবাদের মানও কি বেড়েছে?
আলম খোরশেদ :
অনুবাদের মানের সমস্যাটি তো আমাদের সবসময়ই ছিল, এখনও নিশ্চয়ই রয়েছে। একই সঙ্গে এটাও অস্বীকার করা যাবে না যে, অনুবাদকের সংখ্যাবৃদ্ধির পাশাপাশি অনেক শিক্ষিত, সচেতন তরুণও অনুবাদের কাজে এগিয়ে আসছেন, যা নিঃসন্দেহে আমাদের অনুবাদ-সাহিত্যে একটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
স্বকৃত নোমান :
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রকাশিত সাহিত্য-অনুবাদের সামগ্রিক মান আপনি কীভাবে দেখেন? ভালো দিকগুলো কী, আর দুর্বলতা সবচেয়ে বেশি কোথায় চোখে পড়ে?
আলম খোরশেদ :
আমাদের বর্তমান সাহিত্যিক-অনুবাদের সার্বিক মানকে ভালোই বলতে হয়। কেননা এখন প্রচুর সাহিত্যানুবাদের কাজ হচ্ছে, যেখানে অংশগ্রহণ করছেন প্রচুর সংখ্যক তরুণ লেখক, যাদের বিশ্বসাহিত্যের পাঠ খুবই সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়। এটাই ভালো দিক। তবে দুর্বলতার দিক হলো এদের অনেকেরই বাংলা ভাষাজ্ঞান অতটা পোক্ত নয়। এর কারণ, বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিক, আধুনিক ও সমকালীন অনেক লেখক ও তাঁদের সাহিত্যকর্মের সঙ্গে এদের সবার পরিচয় অতটা গভীর ও গাঢ় নয়।
স্বকৃত নোমান :
বাংলাদেশে ভালো সাহিত্য-অনুবাদ তৈরি হওয়ার পথে প্রধান বাধাগুলো কী? অনুবাদকের প্রস্তুতি, বাংলা ভাষার ওপর দখল, বিস্তর পাঠের অভাব, সম্পাদনা, পারিশ্রমিক, সময়, প্রকাশকের ভূমিকা, কোন সমস্যাটি সবচেয়ে বড় বলে মনে করেন?
আলম খোরশেদ :
এর সবগুলিই কমবেশি সত্য। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা মনে হয় বাংলা ভাষার ওপর যথাযথ দক্ষতার অভাব। এছাড়া বাংলা ও বিশ্বসাহিত্য পাঠের কার্পণ্যও একটি সংকট বৈকি।
স্বকৃত নোমান :
আমাদের দেশে অনুবাদের বই প্রকাশের আগে যথেষ্ট সম্পাদনা হয় বলে মনে করেন? একজন দক্ষ অনুবাদ-সম্পাদকের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
আলম খোরশেদ :
না। অথচ একজন দক্ষ অনুবাদ-সম্পাদকের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, লেখক কিংবা প্রকাশক কারও পক্ষেই।
স্বকৃত নোমান :
কম পারিশ্রমিক, দ্রুত বই প্রকাশের চাপ এবং প্রকাশকের বাণিজ্যিক চিন্তা কি অনুবাদের মানে প্রভাব ফেলছে?
আলম খোরশেদ :
তা কিছুটা ফেলছে তো বটেই। কিন্তু সৎ, শুদ্ধ ও আত্মমর্যাদাবান অনুবাদকদের উচিত এসব প্রতিকূলতা, প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে কোনোভাবেই আপস না করা।
স্বকৃত নোমান :
অনুবাদের জন্য বই নির্বাচনের ক্ষেত্রেও কি সমস্যা আছে? আমরা কি একই পরিচিত লেখক ও জনপ্রিয় বই বারবার অনুবাদ করছি, অথচ বিশ্বের বিশাল একটি সাহিত্যভুবন বাংলা পাঠকের অজানাই থেকে যাচ্ছে?
আলম খোরশেদ :
আছে বৈকি। একজন লেখক কোনো কারণে খুব পরিচিতি কিংবা জনপ্রিয়তা পেলে তাঁকে অনুবাদের একটা তাগিদ কিংবা প্রণোদনা তৈরি হয়; বিশেষত প্রকাশক, পত্রিকা সম্পাদক মহলের তরফে। নোবেল কিংবা বুকার পুরস্কার ঘোষণার পর এই প্রবণতাটি খুবই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তবে সচেতন ও দায়বদ্ধ অনুবাদকদের উচিত তাঁদের দৃষ্টিসীমাকে আরও প্রসারিত ও কর্মপৃথিবীকে ক্রমাগত বিস্তৃত করায় মনোযোগী হওয়া।
স্বকৃত নোমান :
কোন বই অনুবাদ করা হবে, সেই নির্বাচনও কি এক ধরনের ক্ষমতা? অনুবাদক ও প্রকাশকের পছন্দ কি শেষ পর্যন্ত অনেকটাই ঠিক করে দেয় বাংলা পাঠক কোন বিশ্বসাহিত্য পড়বেন আর কোন সাহিত্য তাঁর কাছে পৌঁছাবে না?
আলম খোরশেদ :
তা একধরনের ক্ষমতা তো বটেই। তবে লেখক তথা অনুবাদকের দিক থেকে দেখতে গেলে এটা অতটা নেতিবাচক নয়, কেননা একজন প্রকৃত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ও দায়বদ্ধ অনুবাদক বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও তাঁর নিবিষ্ট পাঠকদের প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান-ভালোবাসা এবং দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই প্রধানত তাঁর অনুবাদ্য লেখক ও গ্রন্থ নির্বাচন করে থাকেন। ফলে সেখানে তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহারের শঙ্কা ততটা নেই; যতটা রয়েছে বাণিজ্যমুখী, মুনাফালোভী ও অসাধু প্রকাশকদের বেলায়।
স্বকৃত নোমান :
বাংলা অনুবাদের একটি বড় অংশ সরাসরি মূল ভাষা থেকে হয় না। স্প্যানিশ, ফরাসি, আরবি, জাপানি বা অন্য ভাষার একটি রচনা ইংরেজি হয়ে বাংলায় এলে কী কী হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে?
আলম খোরশেদ :
অনেককিছু। প্রথমত মূলের ভাষিক বৈশিষ্ট্য, স্বাতন্ত্র্য, সৌন্দর্যের নানাবিধ মাত্রা ও অনুষঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত, বিনষ্ট, এমনকি লুপ্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দ্বিতীয়ত ইংরেজি অনুবাদকের সক্ষমতা ও বিশ্বস্ততার অভাবে সেই রচনার অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, ইঙ্গিত, শৈলীগত ঐশ্বর্য, ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও বক্তব্যের হানিও হয়ে থাকে।
স্বকৃত নোমান :
সরাসরি মূল ভাষা থেকে অনুবাদ আর ইংরেজি অনুবাদ থেকে আবার বাংলায় অনুবাদ করার মধ্যে সাহিত্যিক ও নৈতিক কোনো পার্থক্য দেখেন?
আলম খোরশেদ :
সাহিত্যিক পার্থক্য তো ভালোরকমভাবেই দৃষ্ট হয়। কেননা অনুবাদের অনুবাদে দ্বিগুণ রসক্ষয় এবং বক্তব্য-বিভ্রাটের সুযোগ ও সম্ভাবনা থাকে। এর নৈতিক মাত্রাটিকে অতটা বড় করে দেখার সুযোগ নেই, অন্তত আমাদের দেশে; কেননা এখানে আমরা চাইলেই তো আর পৃথিবীর প্রতিটি ভাষায় পারঙ্গম অনুবাদকদের খুঁজে পাব না। তবে সম্পাদক, প্রকাশকদের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মূল ভাষায় দক্ষ ও অভিজ্ঞ অনুবাদকদের খুঁজে বার করায় সচেষ্ট হওয়া। আর রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমাদের দেশে আরও বেশি করে বিদেশি ভাষা শিক্ষার সুযোগ, সুবিধা ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো উচিত।
স্বকৃত নোমান :
ভালো অনুবাদ আর দুর্বল অনুবাদ একজন সাধারণ পাঠক কীভাবে চিনবেন? এমন কয়েকটি লক্ষণ কি বলা যায়?
আলম খোরশেদ :
দুর্বল অনুবাদের ভাষা প্রায়শই এমন আড়ষ্ট হয় যে, পাঠক তা পড়তে গিয়ে বারবার হোঁচট খান, খেই হারিয়ে ফেলেন এবং এক পর্যায়ে হতাশ হয়ে পাঠের হাল ছেড়ে দেন। আবার অনেক সময় এমনও হয়, অনুবাদকে এতটাই সাবলীল, সুখপাঠ্য ও মৌলিক মনে হয় যে, সংশয় জাগে সেটি আসলে কার ভাষা: মূল লেখকের না অনুবাদকের? তখন যদি একটু কষ্ট করে, মূল ভাষ্যের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া যায়, দেখা যাবে সেটি মূল থেকে অনেকটা দূরে সরে গিয়ে তরজমাকারীর নিজেরই ভাষা হয়ে উঠেছে প্রায়। এ দুটোই আসলে ভালো অনুবাদের অন্তরায় এবং দুর্বল অনুবাদের নিদর্শন। এছাড়া অনেক অনুবাদকই নিজের মর্জি অনুযায়ী অথবা অক্ষমতাজনিত কারণে মূল লেখার অনেককিছু বর্জন করেন এবং অকারণেই নিজস্ব ভাষা ও ভাষ্য যোগ করে দেন তাতে, যার কোনোটাই আসলে কাম্য নয়। একজন সচেতন পাঠক একটু চোখ কান খোলা রাখলেই অনুবাদকের এইসব স্বেচ্ছাচারিতা ও খেয়ালখুশির নিদর্শনসমূহ সহজেই ধরে ফেলতে পারেন।
স্বকৃত নোমান :
আপনি সমালোচনাও করেন। সমালোচকের চোখ অনুবাদের সময় কতটা কাজে লাগে? আবার কখনো কি মূল লেখাটিকে নিজের মতো করে ‘ভালো’ করে দেওয়ার প্রলোভন তৈরি করে?
আলম খোরশেদ :
হ্যাঁ, সমালোচকের দৃষ্টি ও চৈতন্যটুকু নিশ্চয়ই আমার অনুবাদের কাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। কেননা কখনো কখনো মূল লেখকের উদাসীনতা, তাড়াহুড়ো, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে অজ্ঞতাজনিত কারণেও কিছু প্রমাদের জন্ম হয়, যা একজন তীক্ষ্ণদৃষ্টি ও বোধসম্পন্ন অনুবাদকের হাতে সংশোধিত এবং পরিমার্জিত হয়ে ওঠার সুযোগ থাকে।
স্বকৃত নোমান :
চিত্রশিল্পের সঙ্গেও আপনার ঘনিষ্ঠতা আছে। ছবি দেখা কি আপনার সাহিত্য পড়া বা অনুবাদের চোখকে কোনোভাবে বদলে দিয়েছে?
আলম খোরশেদ :
নিশ্চয়ই। দৃশ্যশিল্প মাধ্যমটিতে প্রায়শই নানাবিধ ইঙ্গিত, সংকেত, প্রতীক ও ডিটেইলসের প্রয়োগ থাকে। সেগুলোকে আবিষ্কার, অনুধাবন ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা একজন সমালোচকের কাজ। সেটি অনুবাদের ক্ষেত্রেও সমান প্রযোজ্য; কেননা মূল পাঠবস্তুর এইসব উপাদান, উপকরণসমূহ থেকে একজন অনুবাদক তাঁর অনুবাদকর্মের সহায়ক কিছু তথ্য, ব্যাখ্যা এবং অনুবাদের প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিরও খোঁজ পেয়ে যেতে পারেন।
স্বকৃত নোমান :
একটি ছবিতে রং, আলো, ছায়া, ফাঁকা জায়গা ও দৃষ্টিকোণ দিয়ে অনেক কিছু বলা হয়। কথাসাহিত্যেও কি আপনি এর কাছাকাছি কোনো ব্যাপার দেখতে পান?
আলম খোরশেদ :
সব শিল্পমাধ্যমেই নীরবতা ও অনুপস্থিতি কিংবা অদৃশ্যের একটা ভূমিকা রয়েছে। একজন সাধারণ দর্শক কিংবা প্রশিক্ষিত সমালোচক উভয়কেই সেই নীরবতা ও অনুপস্থিতি-অদৃশ্যের ভাষা বুঝতে হয়। অনুবাদকও তার ব্যতিক্রম নন।
স্বকৃত নোমান :
কোনো গল্পে দৃশ্য, আলো, রং, শরীর, মুখ বা ভূদৃশ্যের বর্ণনা অনুবাদের সময় চিত্রশিল্প সম্পর্কে আপনার জানাশোনা কি কাজে আসে?
আলম খোরশেদ :
হ্যাঁ, তা আসে বৈকি। চিত্রশিল্পের যে ভাষা সেখানে রং, রেখা ও আলোছায়ার সুচিন্তিত ও বুদ্ধিদীপ্ত প্রয়োগের মাধ্যমে একজন শিল্পী কেবল বাহ্যিক পরিবেশ ও পারিপার্শ্বের বর্ণনাই দেন না, তিনি চরিত্রের অন্তর্লোক ও মনোজগতের রূপটিকেও উদ্ঘাটন ও উদ্ভাসিত করেন। একই কাজ অনুবাদকও করতে পারেন তাঁর শব্দপ্রয়োগ ও বাক্যনির্মাণের নানাবিধ করণ-কৌশলের মাধ্যমে।
স্বকৃত নোমান :
নিজের পুরোনো কোনো অনুবাদ এখন পড়লে কি মনে হয়, আজ করলে অন্যভাবে করতেন? অনুবাদকের ভাষাও কি সময়ের সঙ্গে বদলায়?
আলম খোরশেদ :
নিশ্চয়ই। নিজের পাঠাভিজ্ঞতা, সৃজনীশক্তি, কল্পনাপ্রতিভা ও বিশ্লেষণ-ক্ষমতার বৃদ্ধি ও বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে অনুবাদকের ভাষাও অনেকটা বদলে যেতে পারে; যায়ও।
স্বকৃত নোমান :
একই গল্প দুজন দক্ষ অনুবাদক অনুবাদ করলে দুটি অনুবাদ বেশ আলাদা হতে পারে। তাহলে ‘সঠিক অনুবাদ’ বলে কি একটিমাত্র কিছু আছে?
আলম খোরশেদ :
তা হয়তো নেই; তবে মূলানুগতা, প্রসাদগুণ, সুখপাঠ্যতা, সৃষ্টিশীলতা ইত্যাদির বিচারে ভালো অনুবাদ, আকর্ষণীয় অনুবাদ কিংবা উন্নতমানের অনুবাদ, এ-জাতীয় অভিধাসমূহের ব্যবহার তো সমালোচনা সাহিত্যে আমরা হরদমই দেখতে পাই, যা হয়তো তেমন অমূলকও নয়।
স্বকৃত নোমান :
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন কয়েক মুহূর্তে দীর্ঘ লেখা অনুবাদ করতে পারে। এর ফলে সাহিত্য-অনুবাদকের কাজ কীভাবে বদলাবে বলে মনে করেন?
আলম খোরশেদ :
সাহিত্য-অনুবাদকের ক্ষেত্রে এর কিছুটা প্রভাব ও অভিঘাত তো পড়বেই। বিশেষ করে সাদামাটা, একমাত্রিক গল্প-কবিতা, নাটক-নিবন্ধের ক্ষেত্রে। তবে গূঢ়-গভীর কবিতা ও কথাসাহিত্য কিংবা বহুস্তরী ভাষায় রচিত প্রবন্ধ-নিবন্ধ-নাটকের অনুবাদের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কতটা সুচারু ও সফল হতে পারবে সে নিয়ে আমার যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
স্বকৃত নোমান :
এআই একটি বাক্যের সরাসরি অর্থ হয়তো ধরতে পারে। কিন্তু লেখকের স্বর, ব্যঙ্গ, দ্ব্যর্থতা, সাংস্কৃতিক স্মৃতি, নীরবতা বা না-বলা কথাগুলো কতটা ধরতে পারবে?
আলম খোরশেদ :
এআই তথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জিনিসটি ক্রমেই আরও শক্তিশালী, সপ্রতিভ ও সৃজনশীল হয়ে উঠছে সত্য। কিন্তু তারপরেও আমার মনে হয়, শেষবিচারে সে কিছুটা কৃত্রিম, যান্ত্রিক ও আরোপিত হতে বাধ্য। একজন লেখক বা শিল্পীর মন ও মননের সূক্ষ্ম তন্ত্রী, স্বর ও শ্রুতির গভীরে যাওয়া তার পক্ষে অসম্ভবই রয়ে যাবে। কেননা একেকজন লেখক ও শিল্পীর চিন্তা, ভাবনা, অনুভূতি, উপলব্ধি, মন, মানসিকতা, জীবনবোধ ও বীক্ষা একেকরকম। সেই পর্যায়ের ব্যাপকতা, বিস্তৃতি, বহুমাত্রিকতা, উচ্চতা ও গভীরতা অর্জন, জীবনানন্দের ভাষা ধার করে বলা যায়, ‘সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ’, এআই তো কোন ছার!
স্বকৃত নোমান :
নতুন একজন অনুবাদক যদি আপনার কাছে এসে বলেন, ‘আমি বিশ্বসাহিত্য বাংলায় অনুবাদ করতে চাই’, তাঁকে প্রথমে কী কী করতে বলবেন?
আলম খোরশেদ :
তাকে প্রথমত নিজের ভাষা তথা বাংলাটিকে ভালোমতো রপ্ত ও চর্চা করতে বলব। সেইসঙ্গে অবশ্যই যে দেশ, ভাষা ও সংস্কৃতির সাহিত্যিককে তিনি অনুবাদ করতে চান, তাঁর বিষয়ে যথাসাধ্য পড়াশোনা ও খোঁজখবর নিয়ে তাঁর পটভূমি, পরিপ্রেক্ষিত ও মনোজগৎটিকেও যথাসম্ভব অনুধাবনের চেষ্টা করতে বলব।
স্বকৃত নোমান :
কোন লেখকদের অনুবাদ করা আপনার কাছে সবচেয়ে কঠিন বলে মনে হয়েছে? কেন?
আলম খোরশেদ :
কঠিন না বলে চ্যালেঞ্জিং বলা যেতে পারে। বোর্হেস ও ভার্জিনিয়া উলফ। প্রথমোক্তজন তাঁর গদ্যের ক্লাসিকধর্মিতা ও বহুমাত্রিকতার জন্য; যেখানে ইতিহাস, ভূগোল, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব সব মিলেমিশে এক বহুস্তর টেক্সটের জন্ম হয়। আর ভার্জিনিয়া উলফ মূলত তাঁর ভাষার কবিত্ব, চেতনাপ্রবাহ রীতির ব্যবহার ও গভীর মনস্তাত্ত্বিক মাত্রাটুকুর জন্য।
স্বকৃত নোমান :
এমন কোনো লেখক আছেন, যাঁকে খুব ভালোবাসেন কিন্তু অনুবাদ করতে ভয় পান?
আলম খোরশেদ :
না, ঠিক ভয় নয়, তবে মনে হয় একধরনের সংকোচ ও সমীহের কারণে লাতিন আমেরিকার বুম পর্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক, আর্হেন্তিনার হুলিও কোর্তাসারকে (Julio Cortazar, 1914-1984) আমার একান্ত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অদ্যাবধি অনুবাদ করা হয়ে ওঠেনি। তবে প্রায় চার দশক পূর্বে প্রকাশিত আমার সম্পাদিত লাতিন আমেরিকার গল্পসংকলন ‘জাদুবাস্তবতার গাথা’র জন্য আমাদের একজন প্রবীণ সাহিত্যিক, শ্রদ্ধেয় জ্যোতিপ্রকাশ দত্তকে দিয়ে তাঁর একটি বিখ্যাত গল্পের অনুবাদ করিয়েছিলাম বলে মনে পড়ে।
স্বকৃত নোমান :
কোন লেখক বা কোন ধরনের সাহিত্য বাংলায় আরও বেশি অনুবাদ হওয়া দরকার বলে মনে করেন?
আলম খোরশেদ :
আমাদের এখানে প্রধানত ইংরেজি এবং ইউরোপীয় সাহিত্যের অনুবাদটাই বেশি হয়ে থাকে। লাতিন আমেরিকার সাহিত্যও বেশ জনপ্রিয় এখানকার অনুবাদকদের কাছে। কিন্তু এর বাইরে আফ্রিকা, আরব বিশ্ব, দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়াতেও প্রচুর ভালো কাজ হচ্ছে; সেখানেও রয়েছেন বিশ্বমানের অনেক লেখক। সেদিকেও আমাদের নজর ফেরানো উচিত বলে মনে করি। এই মুহূর্তে আমার বেই দাও, কো উন, শুনতারো তানিকাওয়া, কফি আউনর, মারিস কোন্দে, নাওয়াল আল সাদাবি, আসিয়া জেব্বার, কবিতা সিংহ, সুবিমল মিশ্র, নবারুণ ভট্টাচার্য, শাহীন আখতার, শিবব্রত বর্মণ প্রমুখ শক্তিমান সাহিত্যিকদের নাম মনে আসছে।
স্বকৃত নোমান :
এত পড়াশোনা, অনুবাদ, প্রবন্ধ ও সমালোচনার মধ্যে নিছক পাঠের আনন্দ কি ধরে রাখা যায়? এখনো কি কোনো বই শুধু আনন্দের জন্য পড়তে পারেন?
আলম খোরশেদ :
তা যায় নিশ্চয়ই। কেননা সব অনুবাদই তো আর ফরমায়েশি কিংবা দায়িত্ববোধ থেকে সংঘটিত হয় না। প্রায়শই একটি বইয়ের আনন্দপাঠ থেকেই সেটি অনুবাদের প্রণোদনা জাগে, মূলত আমার সেই ব্যক্তিগত পাঠসুখটুকু বৃহত্তর পাঠকের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার তাগিদে।
স্বকৃত নোমান :
সবশেষে, আপনার কাছে একজন সাহিত্য-অনুবাদকে আসলে কে? তিনি কি শুধু এক ভাষার লেখা আরেক ভাষায় নিয়ে যান, নাকি দুই ভাষা, দুই সাহিত্য ও দুই সংস্কৃতির মধ্যে নতুন একটি সম্পর্ক তৈরি করেন?
আলম খোরশেদ :
আপনার প্রশ্নের মধ্যেই কিন্তু এর উত্তর নিহিত রয়েছে। এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় অনুবাদ তো আজকাল যন্ত্রই খুব ভালো করতে পারে। কিন্তু এই দুই ভাষার মানুষ ও তার মনোজগৎ, তার ইতিহাস ও সংস্কৃতির মাঝখানে এক সুস্থ, সুন্দর ও সম্প্রীতির সেতুবন্ধন তৈরিটাই আসলে এখন একজন সচেতন, দায়িত্বশীল অনুবাদকের কাজ ও লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস। ·
সাক্ষাৎকার গ্রহণের কাল : সেপ্টেম্বর, ২০২৬


0 মন্তব্যসমূহ