রিটন খান
রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ নিয়ে লেখা হয়েছে। আরও লেখা হবে। এমন ভাব করারও উপায় নেই যে আমরা আজ এমন একটি গোপন সুড়ঙ্গ আবিষ্কার করতে যাচ্ছি যার মুখে এতদিন শান্তিনিকেতনের মালি টব বসিয়ে রেখেছিলেন। গল্পগুচ্ছ নিয়ে প্রবন্ধ আছে, গবেষণা আছে, থিসিস আছে, বই আছে, অধ্যাপকের বক্তৃতা আছে, পরীক্ষায় দশ নম্বরের প্রশ্ন আছে, এবং সেই প্রশ্নের উত্তর লেখার সময় ছাত্রও আছে যেন রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তিগত শত্রুতা করে ‘পোস্টমাস্টার’ লিখে গেছেন।
তার পরেও গল্পগুচ্ছ নিয়ে আবার কথা বলতে হয়। অন্তত আমি না বলে পারি না। কারণ কিছু বই আছে, যাদের সম্পর্কে সমস্ত কথা বলা হয়ে যাওয়ার পরেই আসল কথাবার্তা শুরু হয়।
ভাবুন একটু।
একজন বর্তমান গল্পলেখক বসেছেন। নিজের তিনটি গল্পগ্রন্থ আছে, দুটো পুরস্কারও হয়েছে, একটি গল্প নিয়ে শর্ট ফিল্ম হয়েছে, দুজন গবেষক ফোন করে বলেছেন আপনার গল্পে ‘urban alienation’-এর ব্যাপারটা খুব interesting। মানুষটির আত্মমর্যাদা মোটামুটি সুস্থ।
তার সামনে টুপ করে গল্পগুচ্ছ রাখা হল।
এ বার?
এই জায়গাটাতেই আমার কৌতূহল।
শ্রদ্ধা তো আছেই। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে শ্রদ্ধা বাঙালির মোটামুটি জন্মগত সাবস্ক্রিপশন। নামতা শেখার আগে থেকেই রবিঠাকুর মহামানব, ফলে যাঁরা পড়েননি তাঁরাও শ্রদ্ধা করেন। কিন্তু একজন গল্পকার যখন আর একজন গল্পকারকে পড়ছেন, তখন শুধু প্রণাম করে পালানো যায় না। একই ব্যবসার লোক। তাঁকে একটু দেখতে হয়, লোকটা কী করল? কী করে করল? কোথায় হাত দিল? কোথায় থামল? যে জায়গায় আমি তিন পৃষ্ঠা লিখে চরিত্রের psychological complexity প্রতিষ্ঠা করছি, সেখানে ভদ্রলোক তিনটে বাক্য লিখে চরিত্রটাকে বাপের নাম-সহ আমার মাথার মধ্যে বসিয়ে দিলেন কী করে?
এই মুখোমুখি হওয়াটাই আসল।
এখনকার গল্পকারেরা রবীন্দ্রনাথের দিকে যাচ্ছেন, আবার পড়তে পড়তে নিজেদের লেখার কাছেও ফিরে আসছেন। মাঝখানে একটা সেতু হচ্ছে। সেতুটার এক প্রান্তে উনিশ শতকের শেষের বাংলা, অন্য প্রান্তে আজকের বাংলা। মাঝখান দিয়ে গরুর গাড়ি যাচ্ছে, পালকি যাচ্ছে, ট্রেন যাচ্ছে, স্মার্টফোন হাতে বর্তমান পাঠকও যাচ্ছে। টোলট্যাক্স নেই।
প্রশ্ন হচ্ছে, এত বছর পরে গল্পগুচ্ছ পড়ে আমরা কী দেখি?
আরও মুশকিলের প্রশ্ন, নিজেদের কী দেখি?
কারণ গল্পগুচ্ছ শুধু রবীন্দ্রনাথের গল্পের সংগ্রহ হয়ে থাকলে ব্যাপারটা সহজ ছিল। পঁচানব্বইটি গল্প। পড়ুন, পছন্দের দশটার নাম লিখুন, ‘সমাপ্তি’তে মৃন্ময়ী, ‘কাবুলিওয়ালা’য় রহমত, ‘ছুটি’তে ফটিক, ‘শাস্তি’তে চন্দরা, হয়ে গেল।
হয় না।
বইটার একটা সামগ্রিক অস্তিত্ব তৈরি হয়েছে। বহুদিন ধরে পড়তে পড়তে মনে হয়, এই পঁচানব্বইটি গল্প যেন আলাদা আলাদা ফ্ল্যাট নয়, একই বাড়ির নানা ঘর। কোনও ঘরে আলো বেশি, কোনও ঘরে দুপুরের গুমোট, কোনও ঘরে সদ্য কেউ মারা গেছে, কোনও ঘরে বউ চিঠি লিখে সংসার ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, কোথাও একটা মেয়ে সারাক্ষণ কথা বলছে, কোথাও কেউ অপেক্ষা করছে এমন মানুষের জন্য যে আর ফিরে আসবে না।
বাড়িটা একটাই।
কারণ রবীন্দ্রনাথ গল্পগুচ্ছ নামে কোনও উপন্যাস লেখেননি। গল্পগুলো বিভিন্ন সময়ে লেখা, বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা। চরিত্রেরাও এক গল্প থেকে আর এক গল্পে পাসপোর্ট দেখিয়ে ঢোকেনি। ‘পোস্টমাস্টার’-এর পোস্টমাস্টার পরের গল্পে গিয়ে রাইচরণের মামাশ্বশুর হয়ে ওঠেননি।
তবু বইটা পড়তে পড়তে একধরনের ধারাবাহিকতার অনুভূতি হয়।
যেন কেউ একটাই দীর্ঘ কাহিনি বলে যাচ্ছেন। শুধু প্রতি কয়েক পৃষ্ঠা পরে নাম বদলাচ্ছে।
এই অনুভূতির সূত্র ধরতে গেলে একটু পিছিয়ে যেতে হবে।
১৮৯১ সাল। বাংলা ১২৯৮।
হিতবাদীতে বেরোল ‘দেনাপাওনা’।
তার পরে রবীন্দ্রনাথ হিতবাদীতে লিখলেন আরও ছ’টি গল্প: ‘পোস্টমাস্টার’, ‘গিন্নি’, ‘রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা’, ‘ব্যবধান’, ‘তারাপ্রসন্নের কীর্তি’, ‘খাতা’।
মোট সাতটি।
আজ এই নামগুলো শুনে আমাদের মনে হয়, আহা, সম্পাদক নিশ্চয়ই টেবিল চাপড়ে বলেছিলেন, রবি, আরও দাও, যত পারো দাও, কাগজ বন্ধ রেখে হলেও তোমার গল্প ছাপব।
ঘটনা তার উল্টো।
হিতবাদীর কর্তৃপক্ষ আর এই ধরনের লেখা বিশেষ চাইছিলেন না।
কেন?
কারণ ব্যাপারটা নাকি খুব ‘high class literature’ হয়ে যাচ্ছে। সাধারণ পাঠক বুঝবে তো?
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এ এক চমৎকার মুহূর্ত।
একজন সম্পাদক বসে আছেন, তাঁর সামনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ভবিষ্যৎ এখনও ঘটেনি। তিনি জানেন না, লোকটির গান একদিন দেশের জাতীয় সংগীত হবে, তার গল্প নিয়ে স্কুলে মাধ্যমিক পরীক্ষা হবে, তার ছবি সরকারি অফিসে ঝুলবে, এবং বাঙালি গরমে ফ্যানের নিচে বসে বলবে, রবীন্দ্রনাথ সব বলে গেছেন।
সম্পাদক বলছেন, দ্যাখো রবি, তুমি যা লিখছ লোকে বুঝবে?
এই জন্য ইতিহাস পড়তে ভাল লাগে। ইতিহাসে hindsight থাকে, চরিত্রগুলোর কাছে থাকে না।
রবীন্দ্রনাথ পরে, জীবনের একেবারে শেষ দিকে, ২৬ মে ১৯৪১-এ রানী চন্দের সঙ্গে কথোপকথনে এই প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। তাঁর কথার মধ্যে হাসিও আছে, একটু অভিমানও আছে। কৃষ্ণকমল তাঁকে বলেছিলেন, লেখাগুলো সাধারণ পাঠকের নাগালের বাইরে, ‘high class literature’। রবীন্দ্রনাথ নিজেই অনুমান করেছিলেন, হয়তো তখনও বঙ্কিমের যুগ, তাঁর গল্পে প্রচলিত অর্থে Romance-এর পরিমাণ কম, তাই গ্রহণ করা হয়নি।
ফলে তিনি গল্প লেখা বন্ধ করেছিলেন।
একটু ভাবা যাক।
রবীন্দ্রনাথ গল্প লেখা ছেড়ে দিয়েছিলেন।
বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাস একটা সম্পাদকের মন্তব্যে সামান্য এদিক-ওদিক হয়ে যেতে পারত।
সৌভাগ্যক্রমে সাধনা বেরোল।
অনুরোধ এল।
আবার গল্প লেখা শুরু হল।
আর তার পরে যা ঘটল, বাংলা সাহিত্যে তাকে মোটামুটি ছোটখাটো ভূমিকম্প বলা যায়।
১৮৯১ থেকে ১৮৯৫। মাত্র ৪১ মাস।
এই ৪১ মাসে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন চুয়াল্লিশটি গল্প। আজকের যুগে কেউ এত দ্রুত ৪৪টা গল্প লিখলে আপনারা ‘এ আই’ ‘এ আই’ বলে গলা ফাটিয়ে ফেলবেন।
গল্পগুচ্ছ-এর পঁচানব্বইটি গল্পের প্রায় অর্ধেক।
প্রথম সাতটি হিতবাদীতে, শেষের ‘ইচ্ছাপূরণ’ সখা ও সাথীতে, মাঝের অধিকাংশ সাধনা-য়, মাসে মাসে।
মাসে একটি করে গল্প।
আজকাল একজন লেখক মাসে একটি গল্প লিখলে ফেসবুকে আলাদা পোস্ট দিতে পারেন, ‘গত তিরিশ দিন আমার ভিতর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে।’ রবীন্দ্রনাথ সেই ঝড়ের মধ্যেই জমিদারি দেখছেন, চিঠি লিখছেন, কবিতা লিখছেন, গান লিখছেন, নৌকোয় চড়ছেন, পদ্মা দেখছেন এবং মাসে মাসে বাংলা ছোটগল্পের রক্তের গ্রুপ নির্ধারণ করে দিচ্ছেন।
আমরা অবশ্য এটাকে প্রতিভা বলে সামলে নিই।
প্রতিভা খুব সুবিধাজনক শব্দ। যে-কাজ কী করে সম্ভব হয়েছে বোঝা যায় না, সেখানে ‘প্রতিভা’ লিখে ফাইল বন্ধ করে দেওয়া যায়। এখন অবশ্য ‘প্রতিভা’র বিপরীতে চুগলখোর বাঙালি ‘এ আই’ তকমা দিয়ে দেয়। কারণ ‘প্রতিভা’য় তাদের চোখ জ্বালা করে।
কিন্তু ওই ৪১ মাস সত্যিই আশ্চর্য।
বাংলা ছোটগল্পের আজকের যে চেহারাটাকে আমরা স্বাভাবিক ভাবি, তার অনেকখানি তখন তৈরি হচ্ছে। ছোটগল্প কী করতে পারে, কোথায় থামতে পারে, কত কম কথায় একটি জীবনের অসহনীয় ভার দেখিয়ে দিতে পারে, গ্রামবাংলার এক সামান্য মানুষের দুঃখকে কীভাবে কোনও রাজা-বাদশা-যুদ্ধ ছাড়াই মহাকাব্যিক করে তোলা যায়, সেই সমস্ত পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে।
রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন, বাংলায় ছোটগল্পের আরম্ভ তিনি করেছিলেন।
আজ শুনলে একটু আত্মম্ভরী মনে হতে পারে। কিন্তু কথাটা সম্পূর্ণ উড়িয়েও দেওয়া যায় না।
কারণ তিনি একটা সাহিত্যিক মাধ্যমকে শুধু ব্যবহার করেননি, তাকে সামাজিক স্বীকৃতি দিয়েছেন, জনপ্রিয় করেছেন, তার সক্ষমতা দেখিয়েছেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ, বাংলার পল্লিজীবনকে এমনভাবে সাহিত্যের কেন্দ্রে এনেছেন, যা তার আগে এই আকারে ঘটেনি।
এখানে একটা বিষয় খেয়াল করা দরকার।
পল্লি মানেই প্রকৃতির রঙিন ব্রোশার নয়।
‘আহা কাশফুল, আহা নদী, আহা গরু ফিরছে, বাঁশি বাজছে, বঙ্গ আমার জননী আমার’ জাতীয় ব্যাপার রবীন্দ্রনাথ সহজেই করতে পারতেন। করেননি।
পল্লির মধ্যে মানুষ আছে। মানুষ থাকলেই পাওনা আছে, দেনা আছে, বিয়ে আছে, বউ আছে, অবহেলা আছে, শিশুমৃত্যু আছে, লোভ আছে, অপেক্ষা আছে, লজ্জা আছে, অন্যায় আছে, নীরব বিদ্রোহ আছে। অর্থাৎ গ্রামেও মানুষ দিব্যি মানুষ।
এই কথাটা আজ হাস্যকর। তখন সাহিত্যিক আবিষ্কার।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর গল্প সম্পর্কে বলেছিলেন, লেখার সময় তিনি খুব নিমগ্ন ছিলেন। গল্পগুলো হয়তো অকিঞ্চিৎকর, কিন্তু তার মধ্যে মানুষের হৃদয়ের স্পর্শ ছিল। সেই feeling তিনি নিজে পেয়েছিলেন, যদিও বাইরের সমর্থন দীর্ঘদিন পাননি।
এইখানেই গল্পগুচ্ছ-এর রহস্যের দরজাটা একটু খোলে।
ঘটনা খুব বড় নয়।
মানুষও খুব বড় নয়।
তার ভেতরের অনুভূতি বিরাট।
একজন পোস্টমাস্টার একটা গ্রামে এল। একটা অনাথ মেয়ে রতনের সঙ্গে তার সম্পর্ক হল। সে চলে গেল।
ব্যস।
এই গল্পের প্লট কাউকে সিনেমার প্রযোজকের কাছে বলতে গেলে তিনি মিনিট তিনেক চুপ করে থেকে বলবেন, তার পর?
তার পর কিছু নেই।
আর সেই ‘কিছু নেই’-এর ভিতরেই বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বিখ্যাত বিচ্ছেদগুলোর একটি তৈরি হয়ে গেল।
“পৃথিবীতে কে কাহার।”
তিনটে শব্দ।
আজও থাকে।
আবার ‘একরাত্রি’।
“সুরবালার সঙ্গে একত্রে পাঠশালায় গিয়েছি এবং বউ-বউ খেলিয়াছি।”
শুনলেই মনে পড়ে যায় যেখানে শৈশব, সম্ভাবনা, হারিয়ে যাওয়া প্রেম, সামাজিক সিদ্ধান্ত, এবং জীবনের সেই বিখ্যাত ‘যদি’ একসঙ্গে এসে বসে।
‘জীবিত ও মৃত’:
“কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল, সে মরে নাই।”
এ বাক্য বাংলা ভাষায় এত ঘুরেছে যে আলাদা করে গল্পের নাগরিকত্ব দেখানোর দরকার পড়ে না।
‘কাবুলিওয়ালা’য় মিনি।
“আমার পাঁচ বছর বয়সের মেয়ে মিনি এক দণ্ড কথা না কহিয়া থাকিতে পারে না।”
এমন মেয়ে পৃথিবীর প্রত্যেক পরিবারে অন্তত একজন আছে। নাম শুধু বদলে যায়।
তারপর রহমতের সেই “হামি সসুরকে মারবে।”
হাসি আছে। পরে সেই হাসিরই দাম দিতে হবে।
রবীন্দ্রনাথ এই কাজটা খুব ভাল জানতেন। প্রথমে আপনাকে একটু আরামে বসাবেন, পরে চেয়ারের পায়াটা সরিয়ে নেবেন।
‘ছুটি’:
“তেরো-চৌদ্দ বৎসরের ছেলের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই।”
এই বাক্য পড়ে তেরো-চৌদ্দ বছরের ছেলে রাগ করতে পারে। তার বাবা-মা বলবে, দেখেছ, রবীন্দ্রনাথও জানতেন।
কিন্তু ফটিকের গল্প শেষ হলে ওই বালাই-ই আপনার বুকের ভিতর ঢুকে বসে থাকে।
‘শাস্তি’তে চন্দরা।
ডাক্তার বলছে, স্বামী দেখতে চায়, ডেকে আনব?
চন্দরা বলল, “মরণ।”
বাংলা সাহিত্যে ‘মরণ’ শব্দ এত সংক্ষিপ্ত আর এত ধারালো কমই হয়েছে।
কোনও বক্তৃতা নেই। নারীস্বাধীনতার পঁচিশ দফা ঘোষণাপত্র নেই। চন্দরা শুধু একটা শব্দ বলছে।
এবং সেই শব্দে একটা পুরুষতান্ত্রিক সংসারের মুখে দরজা বন্ধ।
‘স্ত্রীর পত্র’-এর মৃণাল শেষ করছে:
“তোমাদের চরণতলাশ্রয়চ্ছিন্ন-মৃণাল।”
একটি চিঠি লেখার মধ্যে দিয়ে একজন নারী শতাব্দী পেরিয়ে হেঁটে বেরিয়ে যাচ্ছেন।
আর ‘ক্ষুধিত পাষাণ’?
“তফাত যাও, তফাত যাও! সব ঝুট হ্যায়, সব ঝুট হ্যায়!”
এই বাক্য জীবনের কত পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা যায় ভাবুন। প্রেমে, রাজনীতিতে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে, বিজ্ঞাপনে, আত্মজীবনীতে, নিজের পুরনো ফেসবুক পোস্ট পড়ে।
এই কারণেই গল্পগুচ্ছ-এর বাক্যগুলো গল্প ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে।
একটা সময়ের পর তারা উদ্ধৃতি থাকে না, লোকভাষার অংশ হয়ে যায়।
আমরা অনেক সময় গল্পের নাম ভুলে যাই, বাক্যটা মনে থাকে।
এটা খুব বিচিত্র ব্যাপার।
প্রথাগতভাবে গল্প এক আধার আর পঙ্ক্তি তার অভ্যন্তরীণ নির্যাস। কিন্তু এখানে অসংখ্য বাক্য সেই আধারের শাসন অস্বীকার করে আপন মহিমায় জনজীবনের অংশ হয়ে গেছে।
এই কারণেই গল্পগুচ্ছ নিয়ে নাড়াচাড়া করতে গেলেই একটা খটকা লাগে।
এটা কি নিছক পঁচানব্বইটি ছোটগল্পের সংকলন?
বইয়ের মলাট অবশ্য সেই সাক্ষ্যই দেবে।
তবে নিবিষ্ট পাঠকের অভিজ্ঞতায় ধরা পড়ে ভিন্নতর এক ব্যঞ্জনা।
মনে হয়, যেন এক অখণ্ড মহাকাব্যিক উপন্যাসের ভেতর দিয়ে হাঁটছি।
এখানে হয়তো তথাকথিত উপন্যাসের মতো নির্দিষ্ট কোনও নায়ক নেই, নেই কোনও কেন্দ্রীয় আখ্যান বা রৈখিক সময়ধারা। কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না।
উপন্যাসের যা কিছু সম্পদ, তার সবই তো এখানে মজুত। রয়েছে এক বিস্তৃত ভূখণ্ড। রয়েছে আস্ত এক সমাজব্যবস্থা। প্রাণের সঞ্চার আছে। আছে মৃত্যুর অমোঘ উপস্থিতি। শৈশবের চঞ্চলতা আছে। বার্ধক্যের স্থবিরতা আছে। অনুরাগের স্পন্দন আছে। পরিণয় আছে। আর আছে বিয়ের পর গলায় দড়ি হওয়ার মতো নিদারুণ সব হাহাকার। অন্দরমহলের সেই রুদ্ধশ্বাস যাতনা আছে। পুরুষের সেই প্রবাদপ্রতিম নির্বুদ্ধিতা আছে। নায়েব-জমিদারের প্রতাপ আছে। আজ্ঞাবহ ভৃত্য আছে। নিঃসঙ্গ পোস্টমাস্টারও আছেন। কাবুল থেকে আসা সেই ফলবিক্রেতা আছে। অমনোযোগী পাঠশালাফেরত ছাত্র আছে। বিধবার যাপিত জীবন আছে। বধূর অভিমানী সুর আছে। বাঁধনহারা পলাতক সত্তা আছে। অলৌকিক ছায়ার আনাগোনা আছে। আবার সেই অশরীরী ছায়ার চেয়েও ক্রূর কিছু আত্মজন আছে। আর এই সবকিছুর মাঝখানে বহমান এক অবিচ্ছিন্ন মানব অস্তিত্ব। চরিত্রগুলো ক্ষণিকের জন্য আলোকবর্তিকা হাতে আসছে, দৃশ্যান্তরে দাঁড়াচ্ছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে বিস্মৃতির অতলে।
উপন্যাসেও তো তাই হয়। টলস্টয়ের War and Peace কি শেষ পাতা পর্যন্ত সবাইকে বসার অনুমতি দেয়? দস্তয়েভস্কির গহন অরণ্যের মতো উপন্যাসে কি প্রত্যেকে সমপরিমাণ আলো পায়? মহাভারতের সেই মহাকাব্যিক রাজপথে কত বিচিত্র চরিত্র আসে, মাত্র দু-এক দৃশ্যে নিজেদের অস্তিত্বের ছাপ রেখে আবার জনসমুদ্রে মিশে যায়।
গল্পগুচ্ছ-এর অন্দরমহলেও ঠিক তাই ঘটে। সেই আত্মপরিচয়হীন পোস্টমাস্টার। নিষ্ঠাবান রাইচরণ। মৃত কি জীবিতের ধাঁধায় কাদম্বিনী। গিরিবালা। শশীভূষণ। চঞ্চলা মিনি। ফলওয়ালা রহমত। গুমরে মরা হৈমন্তী। মৃন্ময়ী। বিদ্রোহিনী মৃণাল। বাক্যহারা শুভা।আর্তনাদ করা মেহের আলি। সোহিনী। নামের তালিকা তো আকাশছোঁয়া।
যদিও প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন কাহিনীর বাসিন্দা, তবু দীর্ঘ অভিনিবেশে গল্পগুচ্ছ পড়তে পড়তে মনে হয়, এরা যেন একই মাটির সন্তান। এক বিশাল মহাকাব্যিক আখ্যানের বৈধ নাগরিক।
কেন এই অদ্ভুত একাত্মবোধ? এর পেছনে ভূগোলের একটা নিবিড় টান নিশ্চিত আছে। রবীন্দ্রনাথের সেই চিরচেনা শিলাইদহ-পতিসর-শাহজাদপুরের মায়াবী আবহাওয়া। গড়াই, পদ্মা কিংবা সেই উদাস যমুনা। জলের ওপর ভাসা নৌকো। নির্জন ঘাট। ধুলোমাখা পথ। অবহেলিত পল্লীগ্রাম। জমিদারির প্রাত্যহিক তাগিদে নিরন্তর পথচলা। আর সেই পথে অগুনতি সাধারণ মানুষের মুখোমুখি হওয়া।
রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের এক বিস্তৃত ভুবন যেন এই আসা-যাওয়ার স্পন্দনেই প্রাণ ফিরে পেয়েছে। তিনি কোথাও বসে ‘বাংলার পল্লিজীবন’ নিয়ে research project করছেন না। মানুষকে দেখছেন। তাঁদের ঘরে ঢুকছেন। চিঠিতে লিখছেন। নদীর উপর দিয়ে যাচ্ছেন। একটা ঘটনা শুনছেন। একটা মুখ মনে থাকছে। একটা মেয়ের কথা, একজন পোস্টমাস্টারের নিঃসঙ্গতা, কোনও দরিদ্র মানুষের অদ্ভুত মর্যাদা, কোনও শিশুর অসহায়তা। তারপর সাহিত্য।
ফলে গল্পগুচ্ছ-এর ভূগোল একদিকে খুব নির্দিষ্ট, অন্যদিকে আশ্চর্যরকম অনির্দিষ্ট। আপনি জানেন কোথায় আছেন। আবার মনে হয় পৃথিবীর যে-কোনও জায়গায় থাকতে পারতেন।
একটা মা তার সন্তান হারিয়েছে। সেটা শিলাইদহে ঘটুক বা শিকাগোতে, শোকের পাসপোর্ট লাগে না। একটা মেয়ে কথা বলতে পারে না। তার ভেতরের জগৎ আছে। ভাষাহীনতার কষ্ট আজও একই। একজন স্ত্রী সংসারের দীর্ঘ অবমাননার পরে বলছে, যথেষ্ট হয়েছে। আজকের পাঠক তার ভাষা বদলাতে পারেন, অভিজ্ঞতাটাকে চিনবেন। একজন মানুষ কাউকে ছেড়ে চলে যায়, পরে বুঝতে পারে সম্পর্কটা তার ধারণার চেয়ে গভীর ছিল। এটাও বহু পুরনো মানবিক দুর্ঘটনা।
এই জন্য রবীন্দ্রনাথের গল্পে পল্লি আছে, কিন্তু পল্লি তাকে আটকে রাখে না। লোকাল থেকে ইউনিভার্সাল হওয়া নিয়ে আমরা সাহিত্য আলোচনায় খুব কথা বলি। মাঝে মাঝে এমনভাবে বলি যেন লেখক প্রথমে একটা লোকাল গল্প লেখেন, তারপর কোনও সাহিত্যিক ইমিগ্রেশন অফিসে গিয়ে universal visa স্ট্যাম্প করিয়ে আনেন।
আসল সত্যটা বোধহয় একটু ভিন্ন খাতে বয়। যাঁকে আমরা রক্তমাংসের অবয়বে পূর্ণরূপে চিনতে পারি, তিনি তো স্বভাবতই মহীরুহ হয়ে ওঠেন। রতন যখন একান্তই সেই বালিকামাত্র না থেকে রতন হয়ে ওঠে, তখনই সে মহাকালের অগণিত নিরাশ্রয় মানুষের পরম আত্মীয়ের মর্যাদা পায়। চন্দরা যখন কেবল চন্দরা হয়ে ওঠে, তখনই তার কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয় ব্যক্তি-মর্যাদার লাঞ্ছনার বিপরীতে দাঁড়ানো এক অমোঘ বিদ্রোহ। রহমত যখন সেই বিশেষ কাবুলি ফলওয়ালা হয়ে ওঠে, তখনই তার বিষণ্ণতায় খুঁজে পাওয়া যায় নিজ আত্মজ থেকে বিচ্ছিন্ন এক চিরকালীন পিতৃত্বকে।
এই সুনির্দিষ্ট অস্তিত্বের টানই কাহিনীগুলোকে কালান্তরের সীমানা পার করিয়ে দিয়েছে। আরও এক আশ্চর্য সমাপতন আছে।
গল্পগুচ্ছ পাঠের প্রতিটি স্তরে আমাদের ব্যক্তিগত যাপনের সঙ্গে এক নিবিড় সংঘাত ঘটে। বইয়ের মাহাত্ম্য নিয়ে প্রথাগত পণ্ডিতি ভাষায় ‘human condition’ বা ‘existential predicament’-এর মতো গালভরা তত্ত্ব কপচানো যায়, অনেক সময় হয়তো তার প্রয়োজনও থাকে। তবে সৃষ্টির মধ্যে যদি প্রাণের স্পন্দন থাকে, তবে সে আপনার সেই অর্জিত পাণ্ডিত্যকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চায় না।
বরং সে আচমকা আপনার গৃহকোণের রুদ্ধ দ্বারে আঘাত করে। স্মৃতি খুঁড়ে বের করে আনে শৈশবের কোনও হারিয়ে যাওয়া সখাকে। কিংবা পিতার কোনও উচ্চারিত বাক্য। জননীর সেই দীর্ঘকালীন প্রতীক্ষার সুর। এমনকি আপনার নিজের মনের গহনে লুকিয়ে থাকা কোনও সুপ্ত নিষ্ঠুরতা। কারও আহ্বানে সাড়া দেবেন বলে আর কখনও যোগাযোগ করা হয়নি। আপনার পথের পানে চেয়ে কেউ পথশ্রম গুনেছিল। অথচ আপনি ব্যস্ত নাগরিক ইঁদুরদৌড়ে সামিল হয়েছিলেন।
ঠিক এই বিন্দুতেই ‘পোস্টমাস্টার’ আর কেবল উনিশ শতকের ধূসর কাহিনী হয়ে থাকে না। এক অদ্ভুত অস্বস্তি বুকের মধ্যে শিকড় গাড়তে শুরু করে। সাহিত্যের এই এক বড় নিষ্ঠুর রসিকতা। আপনি রচয়িতাকে বিচার করতে বসেছিলেন, অথচ অলক্ষ্যে সেই রচয়িতাই আপনাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিলেন।
‘হৈমন্তী’ পড়তে পড়তে আপনি হয়তো শ্বশুরবাড়ির নিদারুণ সমালোচনায় মুখর হলেন। কিছুক্ষণ বাদেই মনে কু ডাক দেবে—নিজের অন্দরে আমরাও কি কোনও মৃন্ময়ীকে তিলে তিলে পিষ্ট করছি না? ‘স্ত্রীর পত্র’-এর মৃণালের স্বাধীন সত্তাকে দূর থেকে অভিবাদন জানানো খুবই সহজসাধ্য কাজ। কিন্তু যখন নিজের ছাদের তলার মৃণাল স্বকীয় জীবন চেয়ে বসবে, তখনই শুরু হবে আপনার তথাকথিত প্রগতিশীলতার কঠিন পরীক্ষা।
‘ছুটি’র ফটিকের জন্য সমবেদনার অশ্রু ঝরানো সহজ। তবে তেরো বছরের অবাধ্য, বিভ্রান্ত কিশোরটির অন্তরের হাহাকারকে বালাই বলে ঝেড়ে না ফেলে চেনাটাই হলো আসল মুন্সিয়ানা।
এইভাবেই গল্পগুচ্ছ আমাদের মনের গোপন কুঠুরিতে কলকাঠি নাড়ে। সেজন্যই এটি কেবল ধুলোমাখা অতীতের সাহিত্যিক সম্পদ নয়। বরং এটি এক স্বচ্ছ দর্পণ। আয়নার সেই সনাতন বিড়ম্বনা—রবীন্দ্রনাথকে দেখতে চেয়ে দাঁড়ালেন, আর প্রতিফলনে ভেসে উঠল আপনারই নিজস্ব অবয়ব। এই নিরবচ্ছিন্ন গল্পের স্রোতে যে মূল সুরটি খেলা করে, তা একান্তই মানুষের। ভীষণ সাদামাটা এক অভিধা। কেবলই ‘মানুষ’।
এই একটি শব্দ নিয়ে কোনো এক সাহিত্যবাসরে দীর্ঘ বক্তৃতা ঝাড়লে শ্রোতাকুলের চোখের পাতা যে দ্রুত ভারী হয়ে আসবে, তা নিয়ে বাজি ধরা যায়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের যাদুটি অন্যখানে; তিনি সেই রক্ত-মাংসের মানুষকে এমন সব বিচিত্র ঘূর্ণাবর্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন যে শব্দটা যেন নতুন করে নিঃশ্বাস নিতে শুরু করে।
মানুষের সেই অমোঘ নিষ্ঠুরতা। তার সেই করুণ আর্তনাদ। প্রবাদের মতো সেই চিরকালীন নির্বুদ্ধিতা। কখনও সে নিজের যৎসামান্য স্বার্থটুকুও বুঝে উঠতে পারে না। হৃদয় দিয়ে ভালোবাসলেও মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকে। আর যখন মুখ খোলে, ততক্ষণে সময়ের ট্রেন অনেক দূরে চলে গেছে।
সমাজের অনুশাসন পালন করতে গিয়ে মানুষটা নিজেই কেমন খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায়। আবার কখনও বা সমস্ত শাসনের মুখে এক অবজ্ঞার ‘মরণ’ ছুড়ে দিয়ে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করে।
আর প্রেমের কথা বলছেন? রবীন্দ্রনাথের অন্দরমহলে প্রেম মানে কেবল কাশফুল, জ্যোৎস্না আর হারমোনিয়ামের মিষ্টি সুর নয়। বরং সেখানে ছায়ার মতো লেপ্টে থাকে সামাজিক অন্তরায়, সময়ের ভুল হিশেব, অসহ্য অপূর্ণতা আর অব্যক্ত কথা।
মানুষ তো সাধারণত মাহেন্দ্রক্ষণে জরুরি কথাটি বলতেই ভুলে যায়। মানবিক এই বিচিত্র রোগটি রবীন্দ্রনাথের নখদর্পণে ছিল। তাই তো তাঁর কাহিনীর ভাঁজে ভাঁজে দেখা যায়, সম্পর্কগুলো বিচ্ছেদের অতলে তলিয়ে যাওয়ার পরেই তাদের আসল ওজন অনুভূত হয়।
আমাদের প্রাত্যহিক যাপনও তো এই একই জ্বরে আক্রান্ত। কাছের মানুষটি যতক্ষণ চোখের সামনে ঘোরে, মনে হয় এ তো থাকবেই। সে যেমনি ওপারে চলে যায়, তখনই বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে—সর্বনাশ, লোকটা কি তবে এতটাই ছিল?
এই যে ‘দেরি হয়ে যাওয়া’, এর ওপরেই তো দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বসাহিত্যের বিশাল এক ইমারত। গল্পগুচ্ছ যেন সেই হাহাকারের এক অঘোষিত সদর দফতর। আবার সেখানে নিখাদ সামাজিক কাঠিন্যও বর্তমান। পণের সেই রক্তচোষা দাবি। অকালপক্ব বাল্যবিবাহ। লাঞ্ছিত নারীর অন্তর্বেদনা। বিধবার সেই ধূসর যাপিত জীবন। শ্রেণিভেদ। শিক্ষার দম্ভ। শহর আর গ্রামের সেই চিরস্থায়ী ফাটল। ক্ষমতার আস্ফালন। পারিবারিক কাঠামোর সেই রুদ্ধশ্বাস যাতনা।
রবীন্দ্রনাথ এদের নিয়ে রাজপথে কোনো লিফলেট বিলি করছেন না। তিনি শুধু চরিত্রের নাড়ি টিপে এমন এক সন্ধিক্ষণে তাঁদের দাঁড় করাচ্ছেন, যেখানে ব্যবস্থার কদর্য চেহারাটা পাঠকের সামনে আপনিই উদোম হয়ে যায়।
কৌশলটা মারাত্মক রকমের জোরালো। কেননা চড়া সুরের বক্তৃতার পিঠে পাল্টা যুক্তি সাজানো যায়।
কিন্তু চন্দরা যখন কেবল অভিমানে নিজের স্বামীকে দেখার চেয়ে মৃত্যুকে পরম সখা বলে আলিঙ্গন করে, তখন সেই তর্কের বাতি নিভে যায়। এই যে ব্যক্তিজীবন আর সমাজব্যবস্থা একে অন্যের গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, এই সংঘাতটাই আসল।
তাই নিবিষ্ট মনে পড়লে বোঝা যায়, গল্পগুচ্ছ কেবল কতগুলো গল্পের ভিড় নয়, বরং আস্ত এক সভ্যতার জীবন্ত দলিল। যদিও ‘দলিল’ শব্দটা শুনলে আবার এক ধরণের মিউজিয়াম-মিউজিয়াম গন্ধ নাকে আসে। কিন্তু এই বই আজও বহমান।
কারণ মানুষের আদি অকৃত্রিম যে সংকটগুলোকে রবীন্দ্রনাথ শনাক্ত করেছিলেন, তার বাহ্যিক খোলস বদলেছে ঠিকই, কিন্তু ভেতরের কঙ্কালটা সেই আগের মতোই আছে।
আজকের দিনে হলে পোস্টমাস্টার হয়তো রতনকে খুব সহজেই হোয়াটসঅ্যাপে ‘ব্লক’ করে দিয়ে শহরের নতুন স্ট্যাটাস দিত। রতন হয়তো দিনভর ‘লাস্ট সিন’ দেখে চোখের জল ফেলত। যন্ত্রণার ধরণটা কিন্তু বিন্দুমাত্র বদলাত না।
মিনি ভিডিও কল করে হয়তো রহমতকে জ্বালিয়ে মারত। রহমত হয়তো বিজনেস ক্লাসের টিকেট কেটে ফিরতে চাইত কাবুলে। চন্দরা হয়তো জাস্টিসের সামনে দাঁড়িয়ে সেই একই অব্যর্থ শব্দ বাণ ছুড়ত। মৃণাল হয়তো ঝরঝরে ভাষায় একটা ইমেইল টাইপ করত। আর হৈমন্তীর সেই সুখী পরিবারের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে হয়তো রোজ সকালে ‘গুড মর্নিং’ মেসেজের তলায় চাপা পড়ে যেত একটা মেয়ের দীর্ঘশ্বাস।
মানুষের ট্র্যাজেডি কেবল নতুন ডিজিটাল লেবাস পেয়েছে মাত্র, ভেতরের অপারেটিং সিস্টেমটা সেই মান্ধাতা আমলেরই রয়ে গেছে।
তবে গল্পগুচ্ছ-এর সবচেয়ে বড় ভেলকি বোধহয় তার পরিমিতিবোধে। জীবন যেখানে সমুদ্রের মতো বিশাল, রবীন্দ্রনাথ সেখানে কতখানি সংযত।
আধুনিক সাহিত্যে আমরা আবার সবকিছুর ব্যাখ্যা দিতে বড় ভালোবাসি। চরিত্রটা কেন একা, লেখক সেখানে দীর্ঘ টিকা দেবেন। কেন তার বিচ্ছেদ হলো, তার পেছনে থাকবে চাইল্ডহুড ট্রমার ফর্দ। পাছে পাঠক নিজ বুদ্ধিতে কিছু বুঝে ফেলে বই বন্ধ করে দেয়, সেই ভয়ে আমরা সব একদম চিবিয়ে দিই।
রবীন্দ্রনাথ কিন্তু পাঠকের কল্পনাশক্তির ওপর এক ধরণের বিপজ্জনক ভরসা রাখতেন। তিনি ঠিক সময়ে কলম থামিয়ে দেন। বাকিটুকু আপনার অনুভবের। এই থেমে যাওয়ার কৌশলটিই তো ছোটগল্পের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। আর এই কারণেই কাহিনীগুলো শেষ পাতায় গিয়েও ফুরিয়ে যায় না। তারা পাঠকের মনের আয়নায় রিহার্সাল দিতে থাকে। পোস্টমাস্টার তো চলে গেলেন। রতনের শেষটা কী হলো? আমরা জানি না।
আর এই ‘না-জানা’র রহস্যটাই চরিত্রটিকে আমাদের যাপনের পরম আত্মীয় করে রাখে। সব হিশেব কি লেখককেই মিলিয়ে দিতে হবে? বাস্তবে কি তা হয়?
বাসের পাশের সিটে বসা লোকটির কাহিনী কি আপনি পুরোটা জানেন? ট্রেনের জানালায় উদাস তাকিয়ে থাকা সেই মেয়েটি কোন স্টেশনে নিরুদ্দেশ হলো, তার হদিস আছে কি? অগণিত মানুষ আমাদের জীবনের মাঝপথে উদয় হয় এবং কোনো উপসংহার ছাড়াই আবার ভিড়ে মিশে যায়। গল্পগুচ্ছ জীবনের সেই অমোঘ সত্যকেই কুর্নিশ করে।
এখানেই তো বইটা একই সঙ্গে উপন্যাসের মতো মহাকাব্যিক আবার বাস্তবের মতো অমীমাংসিত। এখানে কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। শিলাইদহ থেকে শাহজাদপুর কিংবা কলকাতা—আপনার এই বিচিত্র যাত্রাপথে কেবল মুখগুলো পাল্টায়। মানুষের অবয়ব বদলায়। কাহিনীর বুনন বদলায়। কিন্তু অন্তঃসলিলা সেই সুরটি একই থেকে যায়। ঠিক যেন বহমান নদী। তরঙ্গগুলো হয়তো নতুন, কিন্তু নদীটা তো সেই প্রাচীন। সেই নোনা জলের নদীর নামই তো মানবজীবন।
এই কারণেই তো বিশ্বসাহিত্যের যে কোনো ধ্রুপদী উপন্যাসের পাশে গল্পগুচ্ছ বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারে। কখনও বা তা উপন্যাসের চেয়েও বড় মাপের প্রশ্নবাণ ছুড়ে দেয়। কেননা উপন্যাস আপনাকে কেবল একটি গণ্ডিবদ্ধ জগতের কাহিনী শোনায়, আর গল্পগুচ্ছ আপনাকে গোটা অস্তিত্বের দর্পণে দাঁড় করিয়ে দেয়।
গল্পগুচ্ছ যেন এক জাদুকরী লেন্স, যা প্রতিবার পাঠে আমাদের দেখার জগতটাকে ওলটপালট করে দেয়। ক্ষণিকের তরে আপনি সেই নিঃসঙ্গ পোস্টমাস্টারের ছায়াসঙ্গী। পরক্ষণেই নিষ্ঠাবান রাইচরণের করুণ আত্মত্যাগ। কাদম্বিনীর সেই অমীমাংসিত অস্তিত্বের ধাঁধা। চঞ্চলা মিনির শৈশব। ফটিকের সেই বালাইরূপী অন্তর্বেদনা। চন্দরার সেই অমোঘ ‘মরণ’বাণ। বিদ্রোহিনী মৃণালের সেই অদম্য চিঠি।
প্রতিটি গল্পের বাঁকে আপনাকে নতুন করে অনুভূতির মানচিত্রে নাম লেখাতে হয়। এ যেন আস্ত এক মানব-অস্তিত্বের ইমিগ্রেশন কাউন্টার। পৃষ্ঠা উল্টালেই বদলে যাচ্ছে ভূখণ্ড। কিন্তু আপনার পরিচয়পত্রটি সেই চিরন্তন। খোদ আপনিই।
এই বিন্দুতেই সেই আদি প্রশ্নটি আবার উঁকি দেয়। বর্তমান সময়ের একজন কথাসাহিত্যিক যখন গল্পগুচ্ছ-এর মুখোমুখি হন, তখন তাঁর মনে ঠিক কী খেলা করে? হয়তো বুকের ভেতর সামান্য কাঁপুনি।
সুস্থ শিল্পীর মনে কিঞ্চিৎ সৃজনশীল ঈর্ষাও দানা বাঁধতে পারে। কেবল ভক্তির চাদরে গা ঢাকলে সৃজনের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। স্বজাতীয় মাধ্যমের এমন শিখরস্পর্শী কাজ দেখে যদি মনে প্রশ্ন না জাগে—ভদ্রলোক এমন দুর্লভ কাজ এত অবলীলায় সারলেন কী করে—তবে বুঝতে হবে আপনি হয়তো শিল্পবোধহীন, নয়তো অসম্ভব আত্মতুষ্ট।
ঈর্ষার পর আসে পাঠ গ্রহণ। কখনও বা দেখা দেয় একধরণের বিরক্তিও। পঁচানব্বইটি গল্পের রসাস্বাদন তো আর এক ধাঁচের হতে পারে না।
সেদিনের বহু দৃষ্টিভঙ্গি আজকের ডিজিটাল যুক্তির ছকে মিলবে না। রবীন্দ্রনাথকে সিংহাসনে বসিয়ে দেবতা বানিয়ে দিলে তাঁর সাহিত্যপাঠের দরজাটাই বন্ধ হয়ে যায়। দেবতার গদ্যশৈলী নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলে না, তাঁর চরণে ধূপের ধোঁয়া দেওয়া যায় মাত্র। একজন লেখক যখন অন্য লেখকের কারিগরি দেখেন, তখনই আসল সংঘাত শুরু। তখন মনে হাজারো কৌতূহল ভিড় করে। এই বাক্যের বুনন কেন এমন হলো? কলমটা ঠিক এইখানেই কেন থামল? চরিত্রের আরও গহীনে কেন ডুব দিলেন না? উপসংহারটা কি অন্যরকম হতে পারত? একদম তুচ্ছ একটা ঘটনাকে কেন এমন গুরুত্ব দিলেন? এই সব দ্বিধাদ্বন্দ্বই বর্তমান কারিগরকে নিজের খাতার কাছে আবার ফিরিয়ে আনে।
সেই দুই বাংলার মাঝখানের সেতুটির কথা ভাবুন। শ্রদ্ধার ভেলা নিয়ে আমরা ঠাকুরবাড়ির দিকে যাচ্ছি। আবার ওপাশ থেকে কিছু কঠোর প্রশ্নবাণ আমাদের দিকেই ধেয়ে আসছে। তুমি নিজের চারপাশটা কতটা খুঁটিয়ে দেখছ? মানুষকে কি আসলেও চেনা হলো? তোমার গল্পের পাত্রপাত্রীরা কি কেবল তত্ত্বের পুতুল, না কি জ্যান্ত মানুষ? তাদের মুখের ভাষা কি স্বকীয়, না তোমার চাপানো গদ্য? অপরের দুঃখকে কি আপন মর্যাদায় তুলে ধরছ, না কি নিজের পাণ্ডিত্য জাহিরের সরঞ্জাম বানাচ্ছ? সংযমের সেই শেষ সীমাটা কি তোমার চেনা? অতি সাধারণ মুহূর্তের গহনে কি মহাকাব্যিক জীবন খুঁজে পাও?
এই সব প্রশ্নের জবাব কোনো গবেষণাগ্রন্থে মেলে না। এর ফয়সালা করতে হয় নিভৃত সৃজনের টেবিলে। পাঠকের জন্যও গল্পগুচ্ছ কোনো নিশ্চিন্ত আরামদায়ক শয্যা নয়। দশ বছর অন্তর পড়লে মনে হয়, গল্পগুলো যেন বদলে গেছে। আসলে গল্পের পরিবর্তন হয় না, পাঠক নিজেই পাল্টে যায়। কৈশোরে ‘ছুটি’ পড়লে আপনি সেই বিভ্রান্ত ফটিক। সংসারী বয়সে পড়লে আপনি ফটিকের সেই অসহায় মা। ছেলেবেলায় রহমত কেবল এক মজার কাবুলিওয়ালা। পিতৃত্বের স্বাদ পেলে রহমতের বিষণ্ণতা অন্য এক ব্যঞ্জনা পায়। অল্প বয়সে ‘স্ত্রীর পত্র’ মানে স্রেফ বিদ্রোহের সুর। বিবাহিত যাপনে সেই চিঠি পড়লে নিজের অন্দরমহলটা নতুন করে চিনতে হয়।
কালজয়ী সৃষ্টির প্রধান ধর্মই সম্ভবত এই। বইটা স্থির থাকলেও আপনার বিবেকের বিরুদ্ধে সে নিত্যনতুন অভিযোগ দায়ের করে চলে। গল্পগুচ্ছ পাঠ তো শেষ করা যায়। কিন্তু তার রেশ ফুরিয়ে যায় না।
সূচনা থেকে ‘মুকুট’ কিংবা তারও ওপারে ‘লিপিকা’ আর ‘সে’-এর রাজ্যে ঢুকলে রবীন্দ্রনাথের কথাসাহিত্যের ব্যাপ্তি আরও বিশাল হয়ে ধরা দেয়। এই সংকলনের সীমানার বাইরেও তাঁর রচনার পরিধি বিপুল। অর্থাৎ যেটুকু আমরা গল্পগুচ্ছ বলে আয়ত্ত করেছি, তার বাইরেও অধরা রয়ে যায় অনেকখানি।
রবীন্দ্রনাথের জাদুটাই এমন। তাঁকে এক কোণে বাঁধতে গেলেই নতুন এক সত্তা বেরিয়ে আসে। গানের সুর ধরলে কবিতার টান বাকি থাকে। কবিতা ছুঁলে গল্পের আহ্বান। গল্প ধরলে উপন্যাসের হাতছানি। উপন্যাস পার হলে প্রবন্ধের গাম্ভীর্য। প্রবন্ধ শেষে ব্যক্তিগত চিঠিপত্র। বাঙালি পরিশ্রান্ত হয়ে তাই একটা বাঁধানো ছবি টাঙিয়ে হাঁপ ছাড়ে।
অথচ গল্পগুচ্ছ কোনো দেয়ালে বন্দি থাকে না। সে মলাট থেকে নেমে আসে। আপনার পাশে এসে বসে। চেনা মানুষের অবয়ব নেয়। মাঝে মাঝে আয়নার মতো নিজের মুখটাই সামনে ধরে। এই বই পড়া মানে কোনো ধুলোমাখা স্মৃতিসৌধে ঘোরা নয়, বরং এক কর্মচঞ্চল রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা। যেখানে নিরন্তর মানুষের মেলা—কান্না, ক্রোধ, প্রতীক্ষা আর পলায়নের এক বিচিত্র কোলাহল।
আপনি হয়তো ভাবছেন, আমি কেবল এক কৌতূহলী দর্শক মাত্র। একটু পরেই সম্বিৎ ফিরবে—আপনার নামেই পরবর্তী ট্রেনের ঘোষণা হচ্ছে। বোধহয় গল্পগুচ্ছ-এর সার্থকতা ঠিক এইখানেই। সে আমাদের চোখের সামনে রবীন্দ্রনাথকে হাজির করে। আর মুহূর্তকাল না যেতেই, অত্যন্ত বিনীত অথচ নির্মমভাবে, আমাদেরই নিজস্ব অস্তিত্বের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। ·

0 মন্তব্যসমূহ