শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ

একটি পুঁথি লেখা হচ্ছে ভূর্জপত্রে, খাগের কলমে। কাব্যই হোক কিংবা ভাষ্য, একজন লেখকের, এককালে একজন পাঠকের অথবা জনায়েক শ্রোতার বিষয়। তারপর? যদি সেই পুঁথি কেউ অনুকরণ না করে আর? সমকালে কিংবা পুঁথিটি টিকে থাকাকালীন পরবর্তীকালেও? অবলুপ্ত হয়ে যাবে সৃষ্টি। কে-ই বা বলতে পারে সেটি এমন এক সৃষ্টি ছিল না, যা আসলে সময়ের চেয়ে অগ্রসর, যাকে বলে যুগাতিশায়ী? কত লক্ষ পুঁথি এভাবে গিয়েছে, কে-ই বা জানে! কত পুঁথি, দেশে দেশে, কালে কালে, ক্ষমতার হস্তক্ষেপ পুড়িয়ে দিয়েছে, সে কথাই বা কে জানে! শুধুমাত্র যা অনুকৃত হয়েছে, আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে অন্য পুঁথিতেও, সঠিকভাবে হোক কিংবা বিকৃতভাবে; অংশবিশেষ রক্ষিত হয়েছে অন্য পুঁথিতে, এবং সেগুলো একশো, দু'শো বা পাঁচশো সংখ্যক অনুকৃত হয়ে ছড়িয়েছে নানা স্থানে; যেগুলির প্রজন্মান্তরেও অনুকরণ হয়ে চলেছিল, সেগুলোই টিকে গিয়েছে। তবু তার পাঠক সংখ্যা সীমিত ছিল—নানান দেশে, নানান ধর্মীয়-রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ফলে। সার্বজনীন ছিল না সেগুলি।

এমন অবস্থা খানিক ভেঙেছিল ছাপাখানা আসায়। মুদ্রিত বইয়ের স্থায়িত্ব বেশি বলেই নয়, একত্রে অনেক উৎপাদন করা যায়, হাতে হাতে ছড়ানো চলে এবং যে যার নিজের ভাষার অক্ষর তৈরি করে নিলেই বহুমুপ্রোৎপাদন সম্ভব, যা শাসনের তাৎক্ষণিক নিয়ন্ত্রণের বাইরেও কিছুটা যেতে পারে বলে কিঞ্চিত স্বাধীনতার হাওয়াও বয়েছিল। জাত-ধর্ম-শ্রেণী ইত্যাদিকে ছাড়িয়ে অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন মানুষমাত্রেরই পাঠযোগ্য হয়েছিল। অবশ্যই পুঁথির কালের মতো ছাপাখানার কালেও তাকে নিয়ন্ত্রণ করার নিত্যনতুন রাস্তা আবিষ্কার করেছিল শাসক। আইন-বেআইন সবের মাধ্যমেই করছিল এবং এখনো করছে। পৃথিবী জুড়ে করেছে এবং করছেও। এখনো কত বই কত কত রাষ্ট্রে নিষিদ্ধ! কত বইকে পরিবেশিত হতে না দিয়েই আটকে দেওয়া যায়, পুঁজির নিগড়ে কড়াভাবে নিগৃহীত ছাপাব্যবস্থাকে ব্যবহার করে, কত বইকে ছাপতেই দেওয়া হয় না ত্রাস সৃষ্টি করে, আমরা তো জানিই। স্বীকার করি বা না-করি, জানি।

এর মধ্যে অজস্র কাজকে সাহিত্যের স্বীকৃতি দেওয়া চলে। সাহিত্য মৌখিক এবং লিখিত—দুই প্রকারই হতে পারে। এই ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন অলংকারশাস্ত্রের কয়েকটি ব্যাখ্যা এখানে রাখি আগে।

সংস্কৃত আলংকারিক ও তাত্ত্বিক রাজশেখর তাঁর বিখ্যাত "কাব্যমীমাংসা" গ্রন্থে শব্দ ও অর্থের সুষমাময় সহাবস্থান এবং তার ভেতরের রসকেই মূলত কাব্য বা সাহিত্য বলে নির্দেশ করেছেন। তাঁর মতে, সাহিত্য বা কাব্যের স্বরূপ তিন বিষয়ের সংমিশ্রণ। প্রথম শরীর। কাব্য বা সাহিত্যের শরীর হলো শব্দ ও অর্থ ("শব্দার্থৌ তে শরীরম্")। অর্থাৎ শব্দ এবং অর্থ মিলেই সাহিত্যের রূপটি গঠিত হয়। সঙ্গে আছে ভাষাবৈচিত্র্য। তাঁর মতে, এই শব্দশরীর সংস্কৃত, প্রাকৃত, অপভ্রংশ কিংবা মিশ্র ভাষার হতে পারে। আর আছে আত্মা। শব্দ ও অর্থের এই দৈহিক কাঠামোর ভেতরে রস হলো তার আত্মা।

শব্দার্থবাদী ধারার আচার্যরা শব্দ এবং অর্থ—উভয়ের মিলনকেই কাব্যের মূল ভিত্তি হিসেবে দেখেছেন। আচার্য ভামহ লিখেছেন, "শব্দার্থৌ সহিতৌ কাব্যম্"। অর্থাৎ শব্দ এবং অর্থের সুন্দর সহাবস্থানই কাব্য। আচার্য মন্মট তাঁর 'কাব্যপ্রকাশ' গ্রন্থে বলেন—দোষহীন, গুণযুক্ত এবং ক্ষেত্রবিশেষে অলংকারহীন হলেও শব্দ ও অর্থের সংমিশ্রণই কাব্য।

আছে রসবাদী ধারা। এই ধারার পণ্ডিতরা বাহ্যিক রূপের চেয়ে কাব্যের ভেতরের আস্বাদন বা অনুভূতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। যেমন আচার্য বিশ্বনাথ কবিরাজের 'সাহিত্যদর্পণ' গ্রন্থের বিখ্যাত সংজ্ঞাটি হলো—"বাক্যং রসাত্মকং কাব্যম্"। অর্থাৎ রসপূর্ণ বাক্যই হলো কাব্য। এখানে রসকেই কাব্যের একমাত্র আত্মা বা প্রাণ বলে গণ্য করা হয়েছে।

রীতিবাদী ধারার আচার্য বামন জানাচ্ছেন—"রীতিরাত্মা কাব্যস্য", অর্থাৎ বিশিষ্ট পদরচনাই বা 'রীতি'-ই হলো কাব্যের আত্মা। অন্য ধারাও রয়েছে—ধ্বনি ও বক্রোক্তির ধারা। আচার্য আনন্দবর্ধনের কাছে কাব্যের ব্যঞ্জনার্থ বা অন্তর্নিহিত অর্থ প্রধান। তিনি লিখছেন—"কাব্যস্যাত্মা ধ্বনিঃ"। অর্থাৎ 'ধ্বনি' (শব্দের ভেতরের গভীর বা প্রচ্ছন্ন অর্থ) হলো কাব্যের প্রাণ। আচার্য কুন্তক আবার অন্য কথা জানাচ্ছেন। তাঁর মতে, "বক্রোক্তিঃ কাব্যজীবিতম্"। অর্থাৎ সাধারণ বা সোজাসাপ্টা কথার বাইরে যে বক্রোক্তি বা বৈচিত্র্যময় প্রকাশভঙ্গি, তা-ই কাব্যের জীবন।

বিশ্বের সাহিত্যের সংজ্ঞা ঘাঁটলে এমন অজস্র ভিন্ন ভিন্ন সংজ্ঞা পাওয়া যাবে। ভারতীয় উপমহাদেশের তাত্ত্বিকদের দিয়ে শুরু করি গদ্যসাহিত্যের কথা। ক্রমে পশ্চিমের কিছু সংজ্ঞাও জানাব। প্রাচীন ভারতীয় তাত্ত্বিক ও আলংকারিকেরা গদ্যকে কবিতার ঠিক বিপরীত হিসেবে দেখেছেন। আচার্য বিশ্বনাথ কবিরাজ 'সাহিত্যদর্পণ'-এ গদ্যের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন—"বৃত্তবন্ধোঝিতং গদ্যম্"। অর্থাৎ ছন্দের বা বৃত্তের বন্ধন যেখানে থাকবে না, তাকেই গদ্যকাব্য বা গদ্যসাহিত্য বলা হবে। দণ্ডী ও বামনেরা স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো নির্দিষ্ট ছন্দের তাল ছাড়াই যেখানে পদ বা শব্দের স্বাভাবিক প্রবাহ থাকে, তা-ই গদ্য।

আছে ল্যাটিন ও গ্রিক তাত্ত্বিকদের দৃষ্টি। পাশ্চাত্য সাহিত্যের ইতিহাসে গদ্যের সংজ্ঞা লুকিয়ে আছে এর শব্দের বুৎপত্তির মধ্যেই। ল্যাটিন ভাষার তাত্ত্বিকেরা গদ্যকে বলতেন "Prosa Oratio"। এর আক্ষরিক অর্থ হলো "Straightforward or direct speech" (সোজা সাপটা বা সরল বক্তব্য), যা কবিতার মতো জটিল রূপক বা অলংকারে মোড়ানো নয়। গ্রিক তাত্ত্বিকেরাও সংজ্ঞা দিয়েছেন। প্রাচীন গ্রিসের অ্যারিস্টটল থেকে শুরু করে পরবর্তী সমালোচকরা গদ্যকে মানুষের স্বাভাবিক চিন্তাভাবনার যৌক্তিক বহিঃপ্রকাশ ও দৈনন্দিন যোগাযোগের লিখিত রূপ হিসেবে দেখেছেন। আধুনিক সংজ্ঞাগুলিতে যাব না আর, কারণ এ লেখার উদ্দেশ্য অন্য।

এই যে নানান সংজ্ঞা, এর আড়ালে যেটি লুকিয়ে আছে, তা হলো মানুষের কথা বলার নানা রকম চাল। গদ্যই হোক কিংবা কাব্য, সবেতেই এ আছে। কেউ রসের কথা বলছেন তো কেউ গভীর প্রচ্ছন্ন অর্থাদির কথা। ছন্দ বা বৃত্তের বন্ধনকে পার করলেই উপমহাদেশের তাত্ত্বিকেরা গদ্য বললেও ল্যাটিনদের মতো স্পষ্ট কথার সোচ্চার উল্লেখ করছেন না। এসবের পেছনে আছে মানুষের কথা বলার ইচ্ছে এবং তার স্বপক্ষে বা বিপক্ষে যাওয়ার রাজনীতি। সোজা কথায়, সাহিত্য যেহেতু বিশ্বসংসারের সব ক্ষেত্রকেই স্পর্শ করতে সক্ষম, তাই তার অপার ক্ষমতা। আর এই স্বাধীন ক্ষমতাকে নানাভাবে বাড়ানো এবং খর্ব করার লড়াই সর্বক্ষণ চলেছে এবং চলছেও।

এইখানে ছাপাখানার পরের স্তর ইন্টারনেটের আবিষ্কার। অনেকগুলো কারণেই এই স্তরটি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৮৪ সালে শুরু হয়েছিল ইন্টারনেট বা যাকে আমরা অনলাইন বলি, সেখানে "SwiftCurrent" প্রথম অনলাইন সাহিত্য ম্যাগাজিন বা ই-জিন। তবে এটি অনেক বেশি পরিমাণে ছিল সাহিত্যের ডিজিটাল ডেটাবেস। তারপরে আসতে থাকে সাহিত্যনির্ভর ই-জিন। ছাপাখানার প্রকাশনার চাইতে অনেক কম খরচে, অনেক বেশি বৈচিত্র্যে একে সাজানো গিয়েছে। সর্বোপরি, অন্তত এর সারা বিশ্বে একই সময় ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাটি তাত্ত্বিকভাবেও রয়েছে। প্রায়োগিকভাবেও কিছুটা সম্ভব হয়েছে। ছাপাখানার সাহিত্যের রাষ্ট্রসীমানা থেকে শারীরিকভাবে নানাস্থানে পৌঁছোনোর যে আইনি এবং বিপুল খরচের সমস্যা, তা এখানে অনেকাংশে কম। সর্বোপরি এককালীন অজস্র পাঠকের কাছে দেশ-কাল সীমানার গণ্ডি ছাড়িয়ে এ চলে যেতে সক্ষম। অন্যদিকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সও যেভাবে উন্নত হচ্ছে, তাতে এমন দিন খুবই সম্ভব যে, কোনো একটি ভাষায় লেখা সাহিত্যের অনেক ভাষায় একই সঙ্গে আরও উন্নত অনুবাদ হয়ে পাঠকের কাছে যাবে। হ্যাঁ, মানবিক অনুবাদ এবং যন্ত্রের অনুবাদ এক সারিতে আসবে না, তবে এখনকার চাইতে অবশ্যই আরও উন্নত হবে। ফলে নানা ভাষার অনুবাদ পাওয়ার যে অত্যন্ত কঠিন সমস্যা, তা খানিক তো কমবে। অন্তত দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোও সম্ভব হবে।

এইটা আবার নানান রাষ্ট্রের শাসনও জানে। জানে বলেই তারা স্বাধীন ইন্টারনেট পছন্দ করে না। নানা রাষ্ট্র বা বেশিরভাগ রাষ্ট্র আইন করে একে তাদের শাসনসীমার মধ্যে আবদ্ধ রাখতে আজও অত্যন্ত সক্রিয়। আইন ছাড়াও হ্যাকার ব্যবহার করেও তারা আক্রমণ শানায়; তাতে অনেকাংশে সফলও। আবার নেটদুনিয়ার বাসিন্দারাও কিন্তু লড়ছেন। স্বাধীন রাখার জন্য তাঁদের পক্ষেও হ্যাকার রয়েছেন, কোডার রয়েছেন, ইন্টারনেটের নানা সুবিধার উন্মুক্ত ব্যবহারের সুযোগ থাকছে। এই সামগ্রিক লড়াইতে সাহিত্য অত্যন্ত শক্তিশালী একটি হাতিয়ার। ইন্টারনেট বা নেটদুনিয়ায় ই-জিনের সাহিত্যগুলির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।

হ্যাঁ, এ কথা সত্যি যে এই নেটদুনিয়াই আবার যাবতীয় ধর্মান্ধ, মতান্ধ উগ্র মতবাদের ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর সাহিত্যের দুর্বার শিকারক্ষেত্র। এই উপমহাদেশ তার আঘাতে আজ রক্তাক্ত। অন্ধত্ব, কুসংস্কার, কদাচার—সবই সে সব সাহিত্যের অন্তর্ভুক্তও বটে। কিন্তু জানালা-দরজা বন্ধ করে দিলে কিছু কীটপতঙ্গের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায় বটে, প্রাণবায়ুর চলাচল যে বিঘ্নিত হয়! কাজেই এসবের বিরুদ্ধেও শক্তিশালী সাহিত্যের প্রয়োজন আজ নেটদুনিয়ায়। সেও ধীরে ধীরে জন্মাচ্ছে। জগৎ তো চিরকাল দ্বন্দ্ব দিয়েই চলে, চলুক সে যুদ্ধ।

এবং একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—পুঁথি থেকে বই সব নষ্ট হয়ে যেতে পারে, হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু ইন্টারনেটে কিছুই হারায় না। সেখানে প্রকাশিত হলে কোথাও না কোথাও তা থেকেই যায়। ·