সাগুফতা শারমীন তানিয়া
গল্পপাঠে লিখছি বোধ হয় ২০১৩ সাল থেকে, ‘দেয়ালা’, ‘শরীর। শরীর’ এইসব ছোটগল্প তখন যত্ন করে ছাপানো হয়েছিল। ‘লুনার কাছে চিঠি’ গল্পটা নিয়ে একটা সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল ওখানে; প্রগলভ স্বগতকথনের মতো করে লেখা গল্প—সেটা নিয়ে গল্পপাঠের ঔৎসুক্য আমার খুব ভালো লেগেছিল। এরপর আরো অনেক গল্প। বলতে গেলে, আমার গল্পের অনেকগুলোই গল্পপাঠের কারণে খুঁজে পাওয়া যাবে। খবরের কাগজের আর্কাইভে অনেক সময়ই লেখাগুলো হারিয়ে যায়, কেমন করে তা জানি না।
আমার সঙ্গে বারো-তেরো বছরের সম্পর্ক গল্পপাঠের। বলতে গেলে, গল্পপাঠ বাংলা সাহিত্যের ওয়েবজিন হিসেবে একটি অনন্য জায়গায় আছে। তার একটা বড় কারণ বোধ হয় এটা যে, সাহিত্যবোধসম্পন্ন মানুষ শুধু নন, সাহিত্যের একান্ত পাঠক আর সাহিত্যিক উভয়েই এই ওয়েবজিনের পেছনে জড়িত আছেন। একবার অন্যত্র ছাপা হওয়া গল্পও এখানে ছাপা হয়—অর্থাৎ একটা আর্কাইভের কাজ তো হয়েই যায় তাতে। আবার দেখেছি, এখানে পুরোনো গল্পকারদের বহু চমকপ্রদ গল্প ছাপা হয়, যাঁদের গল্প পাঁড় পাঠক ছাড়া আজকাল আর কেউ খুঁজেই পাবেন না। এই খারিজ করার জমানায় চিরায়ত গল্পের পাঠ দান করার এই কাজটুকু করে ‘গল্পপাঠ’ নিজের নামকরণ সার্থক করেছে। শুধু তাই নয়, সেসব গল্পের কলকবজা নিয়েও আলাপ ছাপা হয়, যেটা একেবারে হাতেকলমে লেখা শিখবার জন্য জরুরি, ভাবনার ইন্ধন জোগানোতে জরুরি।
সাহিত্যের পাঠ যে কত জরুরি, সাহিত্যমনস্ক মানুষের মমতা আর মানবিকতা ছাড়া যে মানুষের সমাজ আর তার শুভশক্তি গড়ে তোলা যায় না, তা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। শিক্ষিত মানুষ একান্ত প্রয়োজন, সাহিত্যশিক্ষিত মানুষ আরো বেশি প্রয়োজন। বাংলা মিডিয়াম স্কুলের পাঠ্যবই যে কাজটি করতে করতে একদিন ছেড়ে গেছে, সেই কাজটি গল্পপাঠ আপন দায়িত্বজ্ঞানে কাঁধে তুলে নিয়েছে। সেজন্য সাধুবাদ তো তাকে জানাতেই হবে। একটি অস্থির কালের ওপর দাঁড়িয়ে বারো-তেরো বছর একটি কাজ করে যাওয়ার অর্থই হচ্ছে, সেখানে সাগ্রহ আন্তরিকতা আছে, ধারাবাহিকতা আছে। আগের চেয়ে যথারীতি এর রূপ বদলেছে, ডিজাইন ঝাঁ-চকচকে হয়েছে—সেটা সময়ের দাবি। সম্পাদক-কণ্ঠটি একই মূল্যবোধে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, সেটা আশ্বাসের কথা।
দুর্বলতার কথা যদি বলতেই হয়, হয়তো কদাচিৎ বানানবিভ্রাট অথবা অনুচ্ছেদ ভেঙে যাওয়াটা চোখে পড়েছে; ও এমন কিছু নয় যা শুধরে দেওয়া যায় না। এখন তো হাতে হাতে গ্যাজেট, ফোন স্মার্ট হয়েছে বিধায় মানুষ আনস্মার্ট হয়ে যাচ্ছে। আগে বিলেতে ট্রেনের কামরায় ঢুকলেই দেখতাম—প্রায় সবার হাতে বই, এখন তাদের হাতেও কেবলই ফোন। পাঠাভ্যাস বদলের এই সময়ে (দুঃসময় লিখলাম না, এখনো আশা আছে বলে) মানুষের কাছে পৌঁছবার নানান উপায় তৈরি হয়েছে। যে ট্যাক্সিচালক বই পড়ার সময় পায় না, আমি একাধিকবার তেমন মানুষকে অডিবলে গল্প চালিয়ে ট্যাক্সি চালাতে দেখেছি। মানুষের আদিম ও দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা গল্প শোনা আর শোনানো। সিবিবিসিতে যখন বাছাই করা আবৃত্তিকার ও অভিনয়শিল্পীরা বই হাতে নিয়ে গল্প পড়ে শোনান—সঙ্গে স্লাইড বদল হয়, সেটা ছোট ছোট শ্রোতাদের ব্যগ্র হয়ে গল্প শুনতে বাধ্য করে। পুরোনো গল্পগুলো নিয়ে গল্পপাঠ এমন কাজ করতে পারে কি? জানি ইউটিউবে এমন কিছু গল্প তোলা হচ্ছে, কিন্তু পাঠের মান অত ভালো নয়, স্লাইডগুলোও সস্তা এআই।
সাহিত্য শিশুকেই প্রথম আক্রমণ করে, সেই আক্রমণ একান্ত অভিপ্রেত। বাঙালি শিশুদের একটি বিরাট অংশ জন্মায় ও বড় হয় অভিবাসী মা-বাবার ঘরে। এদের সাহিত্যপাঠদানের ব্যাপারে গল্পপাঠ অগ্রসর হতে পারে কি? আজও আমরা হাট্টিমাটিমটিম প্রাণীটির একটি আদুরে মজার ছবি অবধি আঁকতে পারলাম না, আমাদের কলমে কিংবা যন্ত্রকলমে স্বাদের সরসতার এতই অভাব! শিশুতোষ বইয়ের বেলায় কি গল্পে কি অলংকরণে বাংলা অনেক পিছিয়ে রয়েছে, ফলে বাংলাভাষী অভিভাবকদের একা তরী বাওয়া ছাড়া উপায় থাকছে না।
শেষ করব আরেকটি অনুরোধ করে। এই ওয়েবজিনের কল্যাণে আমার প্রিয়তম লেখকদের একজন—অবন বসুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছি, সেটা আমার সৌভাগ্য। গল্পপাঠ যদি এভাবে আরো অনেক পাঠক-সাহিত্যিক-শিল্পীকে একটি চক্রে ফেলতে পারে, আদান-প্রদান ও বিক্রিয়া নিশ্চিত করতে পারে, সেটা খুব ভালো হবে বলে মনে করি। ·

0 মন্তব্যসমূহ