ফ্ল্যাশ ফিকশনকে শুধু খুব ছোট গল্প বললে তার প্রকৃতি পুরো বোঝা যায় না। এর আসল শক্তি ছোট হওয়ার মধ্যে নয়, অল্প জায়গার মধ্যে অনেক কিছু ধরে রাখার মধ্যে। বড় গল্প বা উপন্যাস যেখানে চরিত্রের অতীত, ঘটনার কারণ, সম্পর্কের ইতিহাস, সময়ের বদল খুলে বলতে পারে, ফ্ল্যাশ ফিকশন সেখানে বেছে নেয় মাত্র কয়েকটি মুহূর্ত। অনেক কথা বাদ যায়। কিন্তু বাদ যাওয়া মানেই অনুপস্থিত নয়। সেই ফাঁকা জায়গাগুলোও গল্পের অংশ হয়ে ওঠে। পাঠককে সেখানে নিজের বোধ, স্মৃতি ও কল্পনা নিয়ে ঢুকতে হয়। কেলেব ক্রেইনের “Wishes and Fears” এমনই একটি গল্প। এখানে একটি কাহিনি শুরু হয়, শেষ হওয়ার আগেই আরেক কাহিনিতে চলে যায়। তারপর আবার লাফ। প্রথম পাঠে এই চলন খানিকটা এলোমেলোও মনে হতে পারে। দ্বিতীয় বা তৃতীয় পাঠে বোঝা যায়, দৃশ্যগুলো বিচ্ছিন্ন হলেও তাদের ভেতরে একই ভয়, একই আকাঙ্ক্ষা আর একই পালিয়ে থাকার চেষ্টা ঘুরে ফিরে আসছে।
সব ফ্ল্যাশ ফিকশন যে বহুবার না পড়লে বোঝা যায় না, তা নয়। অনেক গল্প প্রথম পাঠেই সরাসরি মনে লাগে। কিন্তু “Wishes and Fears”-এর মতো গল্পে প্রথম পাঠ আর পরের পাঠের অভিজ্ঞতা এক নয়। প্রথমবার আমরা এর ভয়, হাস্যরস, অস্বস্তি আর অদ্ভুত দৃশ্যগুলো অনুভব করি। পরে আবার পড়লে দৃশ্যগুলোর ভেতরের যোগ ধরা পড়ে। ফলে গল্পটি শুধু মাথার গল্পও নয়, শুধু হৃদয়ের গল্পও নয়। প্রথম পাঠে তার কিছু ছবি আমাদের মনে থেকে যায়। পরের পাঠে আমরা ভাবতে শুরু করি, ছবিগুলো কেন পাশাপাশি রাখা হয়েছে, কেন একটি ঘটনা শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি শুরু হয়েছে, কেন একই ধরনের ভয় বারবার অন্য রূপে ফিরে আসছে।
গল্পের শুরুটা খুব সাধারণ। কয়েকজন মানুষ একটি লম্বা টেবিল ঘিরে বসে উপন্যাসের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলছে। কথক একটু মজা করেই বলে, বিষয়টি বেশ নিরাপদ। এখন আর খুব বেশি মানুষ উপন্যাস পড়ে না। উপন্যাস কীভাবে তৈরি হয় বা ভবিষ্যতে অন্যভাবে কীভাবে তৈরি হতে পারে, তা নিয়ে মাথা ঘামায় আরও কম মানুষ। ফলে তারা যা-ই বলুক, তাতে কারও কিছু মনে করার সম্ভাবনা নেই।
এতক্ষণ পর্যন্ত দৃশ্যটি কোনো সাহিত্যসভা, লেখকদের আড্ডা বা সম্মেলনের মতো। কিন্তু পাশের খাবারঘরে আরেকটি দল বসে আছে। তাদের কথাবার্তার যতটুকু শোনা যাচ্ছে, তাতে কথকের মনে হয়, কোনো বিপদ যদি আসে, পাশের দলটির জন্যই আসবে। কী বিপদ, কে আসবে, কেন আসবে, এসব কিছু বলা হয় না। খুব সামান্য একটা সন্দেহ শুধু ঢুকে পড়ে। স্বাভাবিক দৃশ্যটি আস্তে আস্তে অন্য রকম হতে শুরু করে।
কথক তার উল্টো দিকে বসা একজনের সঙ্গে কথা বলে। আলোচনাটি মানুষ কী জানে আর কম্পিউটার কী জানে, তা নিয়ে। আগে ছিল তুমি কী জানো আর আমি কী জানি। এখন এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কম্পিউটার আমাদের সম্পর্কে কী জানে। কথক মনে করে, এই নতুন অবস্থাটি এখনো উপন্যাসে ঠিকমতো ধরা পড়েনি। সে কয়েক আসন দূরে বসা একজনের কথা তোলে। লোকটির নাম তারা জানে না। তার চেহারাও কিছুটা অদ্ভুত। টি-শার্টে লেখা NP4। কথক প্রশ্ন তোলে, লোকটি যদি NP4 হয়, তা অবিশ্বাস করার কারণই বা কী?
কয়েকটি সাধারণ বাক্যের মধ্যে বড় একটা প্রশ্ন চলে আসে। একজন মানুষকে আমরা কী দিয়ে চিনি? তার মুখ, নাম আর কথা দিয়ে? নাকি তার সম্পর্কে কোথাও জমে থাকা তথ্য দিয়ে? এমনও কি হতে পারে, কোনো যন্ত্র বা ব্যবস্থা আমাদের সম্পর্কে এমন কিছু জানে যা পাশের মানুষটিও জানে না? ক্রেইন এসব নিয়ে তত্ত্ব দাঁড় করান না। প্রশ্নটা রেখে এগিয়ে যান। অল্প কথায় বড় প্রশ্ন রেখে দেওয়ার এই ক্ষমতা ফ্ল্যাশ ফিকশনের একটি বড় শক্তি।
এরপর কথকেরা টের পায়, “ওরা” আসছে।
কিন্তু “ওরা” কারা, জানা যায় না। কোনো সরকারি বাহিনী? নজরদারির লোক? মানুষ নয় এমন কিছু? নাকি কথকের আতঙ্কেরই কোনো রূপ? প্রথমে সবাই ধরে নেয়, পাশের টেবিলের লোকজনের জন্যই ওরা আসছে। তবু কথকের দল উঠে একটু বাইরে হাঁটতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
ভয় বাড়তে থাকলেও হাসি থামে না। উল্টো দিকে বসা লোকটি জিজ্ঞেস করে, “দুই আর দুই কেন?” কথক পাল্টা বলে, “তোমার হাতে কত সময় আছে?” অঙ্ক থেকে বিরতি নেওয়ার কথা আসে। কথক জানায়, তার নিজের ক্ষেত্রেও একবার অঙ্ক থেকে বিরতি নেওয়া হয়েছিল, তারপর আর ফেরা হয়নি। সে উপন্যাস লিখতে চলে গিয়েছিল। চারপাশে কী ঘটছে কেউ জানে না, কিন্তু মানুষ এখনো ঠাট্টা করছে। এই স্বাভাবিক কথাবার্তার কারণেই অস্বস্তিটা আরও বাড়ে।
বাইরে যাওয়ার সময় তারা কোট আর ব্যাকপ্যাক টেবিলেই রেখে যায়। যেন দেখে মনে হয় তারা একটু পরেই ফিরে আসবে। সবাইকে একটি করে পিতলের পানির বোতল দেওয়া হয়েছে। কথক নিজেরটা খুঁজে পায় না। সঙ্গীর কাছে পাওয়া গেলেও হঠাৎ সেই নতুন বোতলটির ওপর তার সন্দেহ হয়। তার নিজের পুরোনো বোতলটাই চাই। বোতলটি একবার পড়ে গিয়ে তুবড়ে গেছে, বাইকের সঙ্গে বছরের পর বছর চলতে চলতে বেগুনি রং উঠে গেছে।
কথক আবার ভেতরে ফিরে যায় নিজের পুরোনো বোতল, কোট আর ব্যাকপ্যাক নিতে। কারণ এর মধ্যে তার সিদ্ধান্ত বদলে গেছে। সে আর ফিরবে না। সে পালাবে।
তারপর পানির কথাও মাথায় আসে। হয়তো রেস্তোরাঁর পানিতে কিছু মেশানো হয়েছে। হয়তো নিজের সঙ্গে আনা পানি খেয়েছে বলেই সে অন্যদের চেয়ে বেশি সতর্ক আছে।
একটি পুরোনো পানির বোতল কত সহজে ভয়কে ধরে ফেলতে পারে, এই দৃশ্য তার ভালো উদাহরণ। নতুন পিতলের বোতল চকচকে, কিন্তু কথক তাকে বিশ্বাস করতে পারছে না। নিজের তুবড়ে যাওয়া, রং উঠে যাওয়া বোতলটি পরিচিত। চারপাশ যখন সন্দেহজনক হয়ে ওঠে, তখন পরিচিত জিনিসের দিকে মানুষের হাত যেতেই পারে। ক্রেইন এ কথা বলে দেন না। কথকের আচরণ থেকেই তা বোঝা যায়।
পাশের খাবারঘরের দিকে আবার তাকিয়ে কথক দেখে, সবাই স্বাভাবিকভাবে বসে কথা বলছে। একজন বয়স্ক মানুষ কমবয়সী একজনের বাহু ছুঁয়ে আছে। তাদের দেখতে একেবারে মানুষ বলেই মনে হচ্ছে। কথকের মনে হয়, হয়তো সে ভুল করছে। হয়তো কিছুই ঘটতে যাচ্ছে না।
ঠিক তখনই তার মনে হয়, বিপদকে এতক্ষণ ভুলভাবে ভেবেছে। ওরা একটা টেবিলের জন্য আসছে আর অন্যটাকে বাদ দিচ্ছে না। ওরা এর মধ্যেই সব টেবিলে আছে।
এই উপলব্ধির পর কথক বাইরে চলে যায়। নিজেকে বলে, চলতে থাকলে হয়তো আরও কিছু সময় ওদের আগে থাকা যাবে।
এখানে প্রথম কাহিনি থেমে যায়। “ওরা” কারা, কথক কোথায় পালাল, তাকে ধরা হলো কি না, কিছুই জানা যায় না। সাধারণ গল্পে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর আমরা আশা করি, ক্রেইন সেগুলোর দিকে আর ফেরেন না।
পরের দৃশ্যেই পৃথিবীর শেষ সময়।
কত সময় কেটে গেছে, আগের রেস্তোরাঁর সঙ্গে এই ঘটনার কোনো সম্পর্ক আছে কি না, বলা হয় না। কয়েকজন মানুষ একটি বড় পরিত্যক্ত বাড়িতে জড়ো হয়েছে। তারা জানে সবাই মরবে। কীভাবে বা কখন, শুধু সেটাই জানে না। তারা বসে সিনেমা দেখছে। তাদের ধারণা, সিনেমা শেষ হওয়ার আগেই হয়তো তারা মরে যাবে।
এই লাফটি গল্পের নির্মাণ বোঝার জন্য খুব জরুরি। আগের কাহিনি হারিয়ে গেলেও আগের ভয়টি হারায়নি। রেস্তোরাঁয় কথক বিপদ থেকে পালাতে চাইছিল। এখানে পৃথিবীই শেষ হয়ে যাচ্ছে, তবু মানুষ ভাবে কোথায় লুকিয়ে আরও কিছু সময় বেঁচে থাকা যায়।
সিনেমায় সবাই একটু ডুবে গেছে। এমন সময় বারান্দায় লুটেরারা আসে। সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে মানুষ মারে, জিনিসপত্র নিয়ে যায়। কথকের হঠাৎ মনে পড়ে, বাড়িটির বেসমেন্টে আরেকটি পুরো ফ্ল্যাট আছে। তারা যদি সেখানে বসে সিনেমা দেখত, লুটেরারা হয়তো বুঝতেই পারত না বাড়িতে কেউ আছে।
পরক্ষণেই কথক বোঝে, তাতেও খুব একটা লাভ হতো না। পৃথিবী শেষ হতে আর কয়েক ঘণ্টা মাত্র।
তবু ভাবনাটি খুব মানবিক। সব শেষ হয়ে যাচ্ছে জেনেও মানুষ আরেকটু সময় চায়। আরও পাঁচ মিনিট, আরও এক ঘণ্টা, আরও একটি বন্ধ দরজা তখনও মূল্যবান।
তার পাশে বসা রোগা কিশোরটির দিকে কথকের মন যায়। সিনেমায় তাদের দুজনের কারও কথা নেই বলে সে ভাবে, হয়তো কোনো বিস্ফোরণে দুজনই মারা যাবে, আর কেউ তাদের খবরও পাবে না। তখন তার মনে হয়, বিদায় হিসেবে ছেলেটিকে চুমু খাওয়া যায় কি না। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে দ্বিধা আসে। তাদের নতুন পরিচয়। ছেলেটি হয়তো এত কমবয়সী যে সে নিজেই জানে না এমন চুমু চাইবে কি না।
পৃথিবী শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেও মানুষের মাথায় এই দ্বিধা আছে। আকাঙ্ক্ষা আছে, আবার অন্য মানুষের ইচ্ছার কথাও আছে। মৃত্যু এগিয়ে আসছে, তবু মানুষ হওয়া শেষ হয়ে যায়নি। গল্পের নামের ইচ্ছা আর ভয় এই জায়গায় পাশাপাশি এসে দাঁড়ায়।
এই দৃশ্যটিও শেষ হয় না।
হঠাৎ আমরা রান্নাঘরে।
তিন দিকে জানালা, মাঝখানে বড় টেবিল। একজন রাঁধুনি ট্রাম্পের মাথা তৈরি করছে। চামচ দিয়ে তার ভেতরের অংশ চেঁছে বের করছে। কিছু অংশ গোলাপি আর ঘন, একটু ভালো মানের কুকুরের খাবারের মতো। নষ্ট হয়ে যাওয়া অংশ পচা আলুর ভর্তার মতো হলুদ আর তেলতেলে।
দৃশ্যটি হাস্যকর, ভয়ংকর এবং গা-গুলানো, সব একসঙ্গে।
কথক রাঁধুনিকে বোঝাতে চায়, সে এর কিছুই খেতে চায় না। রাঁধুনি বলে, তাহলে ট্রাম্প অপমানিত হবে। আরও অদ্ভুত ব্যাপার, যে নৈশভোজে তার মাথা পরিবেশন করা হবে, ট্রাম্প নিজেও সেখানে থাকবে। কথক বলে, সে নিরামিষাশী। এটা ট্রাম্পের মাথা না হলেও সে খেত না। তখন রাঁধুনি সাবধান করে বলে, সে যদি কিছু না খায়, ট্রাম্প যখন তার শহরে আসবে, তখন কী করতে হবে সে বুঝতে পারবে না।
এই কথায় কথকের সিগফ্রিডের কথা মনে পড়ে।
এই উল্লেখের পেছনে পুরোনো একটি নর্স-জার্মান কাহিনি আছে। নর্স ধারায় নায়কের নাম সিগুর্ড, জার্মান ধারায় তিনি সিগফ্রিড নামে পরিচিত। ড্রাগন ফাফনিরকে হত্যা করার পর তার হৃদয়ের স্বাদ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সিগফ্রিড পাখিদের ভাষা বুঝতে শুরু করে। পাখিরাই তাকে আসন্ন বিপদের খবর দেয়। অর্থাৎ ভয়ংকর প্রাণীটির শরীরের একটি অংশ গ্রহণ করার পর তার সামনে এমন এক জ্ঞান খুলে যায়, যা তার আগে ছিল না।
ক্রেইনের রান্নাঘরের অদ্ভুত দৃশ্যটির সঙ্গে সেই পুরোনো কাহিনির যোগ এখানেই। সিগফ্রিড ড্রাগনের হৃদয়ের স্বাদ নিয়ে বিপদের ভাষা বুঝতে পারে। কথককে বলা হচ্ছে, ট্রাম্পের মাথার কিছুটা না খেলে ট্রাম্প তার শহরে এলে কী করতে হবে সে বুঝতে পারবে না। দুই জায়গাতেই খাওয়ার সঙ্গে নতুন কিছু বুঝতে পারার সম্পর্ক আছে।
তবে ক্রেইন মিথটিকে হুবহু আনেননি। উল্টে দিয়েছেন। পুরোনো কাহিনিতে ভয়ংকর ড্রাগন মৃত। এখানে একজন জীবিত রাজনৈতিক নেতার মাথা রান্না হচ্ছে, অথচ সেই নেতাই আবার নিজের মাথা পরিবেশন করা নৈশভোজে উপস্থিত থাকবে। বাস্তবে অসম্ভব। স্বপ্নে একেবারে সম্ভব।
এই দৃশ্যটির রাজনৈতিক অর্থ আছে, কিন্তু তাকে একটিমাত্র ব্যাখ্যায় আটকে ফেললে গল্পের অদ্ভুততা কমে যায়। দৃশ্যটি এমন একটি প্রশ্নও তুলতে পারে: কোনো বিপজ্জনক ক্ষমতাকে মোকাবিলা করতে গেলে কি আগে তার চিন্তার ধরন বুঝতে হয়? তার মাথার ভেতরটা জানতে হয়? আবার এটাও হতে পারে, কথকের রাজনৈতিক ভয় স্বপ্নের মধ্যে এমন বিকৃত চেহারা নিয়েছে। ক্রেইন কোনো একটি উত্তর বেছে দেন না। সিগফ্রিডের মিথ দৃশ্যটির ভেতরে শুধু আরেকটি স্তর খুলে দেয়।
এই কাহিনিরও কোনো পরিণতি নেই। ট্রাম্পের মাথা সত্যিই পরিবেশন করা হলো কি না, কথক খেল কি না, নৈশভোজে কী ঘটল, আমরা জানি না।
গল্প আবার লাফ দেয়।
এবার একটি ভবন। কখনো সেটি মার্বেলের দেয়ালওয়ালা লাইব্রেরি। সেখানে একটি লিফট আছে, কাউকে না দেখিয়ে তাতে ঢুকতে হয়। কখনো সেটি পুরোনো ছাত্রাবাস, যেখানে কথক একসময় থাকত। এখন থাকার অধিকার নেই, কিন্তু চাবি এখনো তার কাছে আছে।
ভবন বদলায়, কিন্তু ওপরের দিকে সব সময়ই একটি গোপন ঘর থাকে। সেই ঘরের কথা আর কেউ জানে না।
সেখানে পৌঁছাতে কথক এমন সব জায়গা বেয়ে ওঠে বা টপকে যায়, যেখানে ওঠার ঝুঁকি নেওয়ার কথা বেশির ভাগ মানুষ ভাববে না। কেউ তাকে না দেখলে সেই ওঠার সাহস একসময় উড়ে যাওয়ার ক্ষমতায় বদলে যায়।
কথক বলে, স্বপ্নে উড়ে যাওয়ার অনুভূতিকে কেউ কেউ শিশুকালে কারও কোলে থাকার স্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। কিন্তু তার দাবি, সে সত্যিই উড়তে পারে, যদি কেউ তাকে না দেখে।
“কেউ না দেখলে” কথাটি পড়ার পর আগের দৃশ্যগুলো আবার মনে পড়ে।
গল্পের শুরুতেই ছিল কম্পিউটার আমাদের সম্পর্কে কী জানে। তারপর ছিল কে কাকে দেখছে, কে কাকে চিনছে। “ওরা” সব টেবিলে আছে। কথক পালিয়ে যায়। পৃথিবীর শেষের বাড়িতে সে এমন বেসমেন্টের কথা ভাবে যেখানে লুটেরারা বুঝবে না কেউ আছে। শেষ দৃশ্যে তার উড়ে যাওয়ার ক্ষমতাও নির্ভর করছে কেউ তাকে দেখছে কি না তার ওপর।
কথক বারবার মানুষের চোখের বাইরে যেতে চাইছে। তাকে যেন না দেখা হয়, না চেনা হয়, না ধরা হয়।
একসময় সে প্রতিদিন এই গোপন ঘরে আসত। এখন অনেক দিন আসেনি। অবহেলায় ঘরটির অবস্থা খারাপ। দেয়ালের সাদা রং গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। ডাকবাক্সে এত চিঠি আর বিল জমেছে যে খুলতে কষ্ট হয়। উত্তর দিতে এত দেরি হয়েছে যে কথক ভাবে, হয়তো না-দেখার ভান করাই ভালো।
ঘরের ভেতরে ঢুকলে সে সাধারণত নিরাপদ। কিন্তু নিরাপত্তাটাও পুরো নয়। ঘরটির ওপর তার কোনো অধিকার নেই। সে চুপিসারে ঢোকে। কাউকে ঘরটির কথা বললে হয়তো সেই মানুষটি এমন দু-তিনজনের কথা ভাববে, যাদের এই ঘরে থাকার অধিকার কথকের চেয়ে বেশি।
অথচ শুধু এই ঘরেই সে নিজের সত্যিকারের মানুষটি হয়ে উঠতে পারে।
এই জায়গায় গল্পটি হঠাৎ খুব ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে। যে জায়গায় মানুষটি নিজের মতো হতে পারে, সেই জায়গাটিই তার নয়। নিরাপদ হতে হলে তাকে লুকোতে হয়। নিজের মতো বাঁচতে গেলেও অন্যের চোখ এড়িয়ে থাকতে হয়। আশ্রয় আছে, কিন্তু আশ্রয়ের ওপর অধিকার নেই।
শেষে থোরোর একটি ঘটনার কথা আসে। বহু বছর আগে একটি বনভূমি জরিপ করার অনুমতি পেয়েছিলেন থোরো। পরে আবার সেই জায়গায় ফিরে গিয়ে তিনিও একবার ধরা পড়েছিলেন। কথকের নিজের গোপন আস্তানায় থাকার অনিশ্চয়তার সঙ্গে সেই স্মৃতি মিশে যায়।
তারপর গল্প শেষ।
“ওরা” কারা জানা গেল না। পৃথিবী কেন শেষ হলো জানা গেল না। ট্রাম্পের মাথার নৈশভোজ দেখা গেল না। গোপন ঘর সত্যি কি না জানা গেল না। কথক সত্যিই উড়তে পারে কি না তাও নয়।
এই না-জানাগুলো গল্পের ফাঁক। আর এই ফাঁকগুলোই পাঠককে আবার গল্পটির কাছে ফিরিয়ে আনতে পারে।
একবার পড়লে হয়তো আমরা চারটি অদ্ভুত দৃশ্য দেখি। আবার পড়লে দেখি, দৃশ্যগুলো বারবার একই জায়গায় ফিরছে। দেখা হওয়া, নজরে পড়ে যাওয়া, পালানো, লুকানো, আরেকটু সময় পাওয়া, নিজের জায়গা খোঁজা। তখন পুরোনো পানির বোতলও আর শুধু বোতল থাকে না। বেসমেন্ট শুধু বেসমেন্ট নয়। কেউ না দেখলে উড়ে যাওয়ার কথাটিও নিছক অদ্ভুত স্বপ্ন বলে মনে হয় না।
“Wishes and Fears” তাই এমন একটি ফ্ল্যাশ ফিকশন, যা বহুপাঠে আরও খুলে যায়। প্রথম পাঠেই গল্পটি কাজ করে, কারণ “ওরা”, বিষ মেশানো পানির সন্দেহ, পৃথিবীর শেষ, কিশোরকে চুমু খাওয়ার দ্বিধা, রান্না হতে থাকা মাথা, গোপন ঘর আর উড়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমাদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করে। কিন্তু আবার পড়লে বোঝা যায়, লেখক ঘটনা দিয়ে ঘটনা জোড়েননি, অনুভূতি দিয়ে জুড়েছেন।
রেস্তোরাঁ, পৃথিবীর শেষের বাড়ি, ট্রাম্পের মাথার রান্নাঘর আর গোপন ঘর বাইরে থেকে চারটি আলাদা কাহিনি। অথচ চারটিই একই মানুষের নিরাপত্তাহীনতার চারটি রূপ। প্রথমে সে বিপদ থেকে দূরে যেতে চায়। পরে আরও একটু বাঁচার জায়গা খোঁজে। তারপর রাজনৈতিক ভয় একটি দুঃস্বপ্নের চেহারা নেয়। শেষে সে এমন একটি ঘর পায় যেখানে নিজের মতো হওয়া সম্ভব, কিন্তু সেখানেও তার থাকার অধিকার নেই।
ফ্ল্যাশ ফিকশনের বর্জন এখানে শুধু জায়গা বাঁচানোর কৌশল নয়। সেটাই গল্পটির চলন। মাঝখানের যোগগুলো ক্রেইন লিখে দেননি। এক দৃশ্য থেকে আরেক দৃশ্যে লাফ দিয়েছেন। পাঠককেই সেই ফাঁক পার হতে হয়। সেই কাজ করতে গিয়েই পাঠক গল্পের ভেতরের যোগগুলো আবিষ্কার করেন।
এই কারণে “Wishes and Fears” প্রথম পাঠেই পুরো খুলে যায় না। কিন্তু তাকে শুধু মাথা দিয়ে সমাধান করার ধাঁধা ভাবাও ঠিক হবে না। কোনো বিশ্লেষণ করার আগেই গল্পের ভয়, হাসি, ঘৃণা, আকাঙ্ক্ষা আর অসহায়তা আমাদের ছুঁয়ে যায়। পরে চিন্তা এসে সেই অনুভূতির ভেতরের গঠনটি চিনতে সাহায্য করে।
প্রথম পাঠে গল্পটি আমাদের ভেতরে ঢোকে। পরের পাঠে আমরা গল্পটির ভেতরে ঢুকি।
আর সেখানে গিয়ে দেখা যায়, এত বিচ্ছিন্ন দৃশ্যের নিচে খুব পরিচিত একটি মানুষ আছে। সে ভয় পায়, পালাতে চায়, আরেকটু সময় চায়, একটু আড়াল চায়। সবচেয়ে বেশি চায় এমন একটি ছোট জায়গা, যেখানে অন্যের চোখ থেকে বাঁচিয়ে নিজের মতো থাকা যাবে। “Wishes and Fears” সেই চাওয়া আর সেই ভয়কেই কয়েকটি দ্রুত, অসম্পূর্ণ, স্বপ্নের মতো দৃশ্যের মধ্যে ধরে রেখেছে। গল্পটি শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তার ফাঁকগুলো তখনও খোলা থাকে। সেই কারণেই পাঠক আবার ফিরে আসতে পারেন, আর প্রতিবারই হয়তো একটু অন্য গল্প দেখতে পারেন। ·

0 মন্তব্যসমূহ