গভীর রাত্তিরে সমস্ত শহর চুপ। ঠান্ডাও পড়েছে আজ খুব। পুলিশের কন্ট্রোল রুম, সারি সারি বক্স সাজানো। বাক্স তো নয়, মনিটর। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ক্যামেরা, সেই ছবিগুলো এখানে পরপর। এ কী দৃশ্য! এ কী দৃশ্য! ছানাবড়া হয়ে যাওয়া চোখ কচলে নেয় ডিউটি অফিসার। কুয়াশার ভিতর দিয়ে হেঁটে আসছে একটি প্রাণী। মানুষের মতোই, হ্যাঁ, মানুষেরই মতো। দুইটি পা, দুইটি হাত, দুইটি চোখ, একটি নাক...। আলুর দমের মতো বড় বড় দুইখানি চোখ, দুই হাতে বড় বড় নখ, খালি গা, গায়ে বড় বড় রোম। কোমরে জড়ানো পশুচামড়ার মতো কিছু। চামড়া, নাকি সিনথেটিক? কী করে বোঝা যাবে এই মনিটারে? বেশ লম্বা। কত ফুট হতে পারে, ছবিতে বোঝা যাচ্ছে না। থপ থপ হেঁটে যাচ্ছে, যেন কুয়াশা সরিয়ে সরিয়ে। ঘড়িতে এখন বাজছে দুটো আটত্রিশ। বাইরের তাপমাত্রা বারো পয়েন্ট তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস। গতকাল সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল দশ ডিগ্রি। এই সহরে এর নাম কনকনে শীত। প্রাণীটির গায়ে জামা নেই কোনো। তবে কোমরে জড়ানো কেন ওই আবরণ? ‘প্রাণীটি’ না বলে একে লোক বলা যায়, এখন?

ডিউটি অফিসার সুপার ভাইজারকে ডাকে। সুপার ভাইজার ঘুমোচ্ছিল টেবিলে মাথা দিয়ে এবং সম্ভবত স্বপ্নে ছিল, নইলে সে একা একা বলবে কেন, “নাচো, কোমর দুলিয়ে নাচো...”। ডিউটি অফিসার গলার স্বরে দুচামচ অসহায়তা মাখিয়ে বলল, “স্যার, ও স্যার...” ডিউটিরত সুপার ভাইজারের স্বপ্ন ব্যাহত করে গায়ে ঠেলা দেওয়াটা কি ঠিক হবে! সাব-অর্ডিনেট সুলভ হবে তো! কিন্তু উপায় নেই, না জানানোটা ল্যাপস অফ ডিউটি হয়ে যাবে। ডিউটি অফিসার আবার ডাকে, “স্যার, মনিটার হলে আসুন স্যার একবার।”

সুপার ভাইজার স্যার টেবিল থেকে মাথা তুলে বলল, “যাঃ। ট্যাঙ্কির ভিতরে নেমে গেল।”

— কে নেমে গেল স্যার!

— পরী, পরী। বাড়ির জলের ট্যাঙ্কির উপরে দুটো পরী। ট্যাঙ্কিটা হেভেন কোম্পানীর, পি.ভি.সি ট্যাঙ্কি। আরেক রাত্তিরেও এসেছিল, আকাশে চাঁদ ছিল। সেবার অনেকক্ষণ নেচেছিল। সূর্য ওঠার আগেই উড়ে গেল। যাক গে। ট্যাঙ্কি থেকে যখন উঠবে ফের, এক্কেবারে সিক্ত বসনা। ওই রূপটা দেখবো, দেখতে হবে না?

বলেই টেবিলের উপর দুটো ফাইল একসাথে করে আবার মাথা টেবিলে। ডিউটি অফিসার বলে, “স্যার, স্যার, ওদের ট্যাঙ্কির জলেই কিছুক্ষণ থাকতে দিন এখন। একটু ঝাঁপাঝাঁপি করুক, জলে খুব সুন্দর গন্ধ হয়ে যাবে। এখন একটু আসুন স্যার, দেখুন স্যার, রাস্তায় কী হচ্ছে!”

— কী হচ্ছে?

— রাক্ষস নেমেছে স্যার।

— কী হচ্ছে বল তো... এটা কী রূপকথার দেশ হয়ে গেল নাকি? পরী, রাক্ষস, এরপর রাজা-রাণী-রাজপুত্র-রাজকন্যে...

যে মনিটরটায় এই দৃশ্য ছিল, সেখানে শুধুই কুয়াশা জড়ানো রাস্তার আলো। ও হ্যাঁ, চাঁদও আছে মোটামুটি একটা।

এই রে, কী হবে এবার, পরী সঙ্গ ছিনিয়ে আনা হয়েছে। শো-কজ করে দেবে না তো!

যাক। বাঁচা গেল। অন্য মনিটরে আছে। “এই যে, এই যে দেখুন স্যার, এখানে।” বস বলল, “তাই তো, তাই তো। রাক্ষসই তো মনে হচ্ছে। খোক্ষসও হতে পারে। তুমি কখনো খোক্ষস দেখেছো পালিত? রাক্ষস আর খোক্ষসের মধ্যে তফাৎ জানো?”

— না স্যার, কিচ্ছু জানি না। আপনি তো তাও পরী দেখেন। আমি তো সেটাও দেখি না।

— কোথায় রয়েছে এখন? কোন এরিয়া?

— ময়দান স্যার, ময়দান।

খবর গেল উপরে। উপর থেকে আরও উপরে। অনেক পুলিশ, ঘোড়া পুলিশ, সার্চলাইট...। পুলিশকর্তা বললেন, “এটা আমাদের কাজ নয়। দমকলের কাজ। মিনারের মাথায় উঠে ঝাঁপ দেবো, ঝাঁপ দেবো বলে যে পাগল, তাকে কে নীচে নামায়? দমকল না!”

দমকল কর্তা বলে, “এটা মোটেই দমকলের কাজ নয়। বন্যপ্রাণী দপ্তর দেখবে ব্যাপারটা, কারণ রাক্ষস বনেই থাকে। রামায়ণ-মহাভারতে তাই লেখা আছে। রামায়ণ-মহাভারত-পুরাণ-কোরানে যা লেখা আছে, সব সত্যি। এই দুনিয়ায় ভাই, সবই হয়, সব সত্যি। ঘুরিয়েই দুনিয়ার লাট্টু ভগবান হারিয়েছে লেত্তি। সব সত্যি।”

এই সব হতে হতে রাত্রি কাবার। ময়দান ঘিরে রাখা হয়েছে। পুলিশ বন্দুক উঁচিয়ে রেখেছে। ওই রাক্ষস থপ থপ করে হেঁটে বেড়াচ্ছে ময়দানের মাঠ। দু-তিনটে গাছ উপড়ে দিয়েছে রাগে। টিভিওয়ালারা এসে গেছে ওদের ভ্যান নিয়ে। একটা গন্ডী কাটা হয়েছে, সেই গন্ডী ছাড়ানো যাবে না। ড্রোন উড়িয়ে দিয়েছে। সেই ছবি টেলেকাস্ট হচ্ছে চ্যানেলে চ্যানেলে। এই এখন দেখাচ্ছে, একটা পাতা খসে যাওয়া নিস্পত্র বৃক্ষের তলায় মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। টেলিভিসনে ভীষণ আলোচনা চলছে। আলোচনা নাকি ডিবেট! জীববিজ্ঞানী, শিববিজ্ঞানী, রণবিজ্ঞানী, বনবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানীরা আছেন। সমাজবিজ্ঞানী, জ্যোর্তিবিজ্ঞানী, এরকম নানা বিজ্ঞানীরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বিভিন্ন চ্যানেলে। আর প্যানেলে নেতা থাকবেন না, তা কি হয়? তেঁনারাও আছেন। ও হ্যাঁ, শিববিজ্ঞানী মানেটা এখনো অনেকের জানা নেই। শিববিজ্ঞানী মানে রাক্ষস বিশারদ, কারণ ভূত-প্রেতরাই হল শিবের সিকিউরিটি গার্ড। শিবের ব্ল্যাক ক্যাট। দু-একটা রাক্ষসও ছিল শিবের চামচে। চামচ না বলে বরং অনুচর বলি। তা ছাড়া অনেক রাক্ষসকে শিব বর দিয়েছিলেন। যেমন রাবণ, যেমন অন্ধকাসুর, যেমন ভস্মাসুর।

এক শিববিজ্ঞানী বললেন, “ব্রহ্মা যখন নিদ্রা গিয়েছিলেন, তখন তাঁর নিঃশ্বাস থেকে রাক্ষস জাতি জন্মায়। এবং জন্মেই সৃষ্টিকর্তাকেই খেয়ে নিতে চায়। ব্রহ্মা চিৎকার করেন—রক্ষ মাম, রক্ষ মাম। এই আর্তনাদ থেকেই এদের নাম হয় রাক্ষস। এই রাক্ষসরা আবার জাদুও জানে। ওরা নিজেদের আবার পাল্টে ফেলতেও জানে। শুধু কী তাই? অদৃশ্যও হয়ে যেতে পারে।”

কোনও বিজ্ঞানী বলছেন, “এটা রাক্ষস নয়, অন্য গ্রহের প্রাণী।” কোনও বিজ্ঞানী বলছেন, “এই হল গে ইয়েতি। বরফ মাখা পাহাড়ে যাদের পায়ের ছাপ দেথা গেছে বলে দাবী করেন হিমালয় অভিযাত্রীরা।”

নেতারা সবসময়ে দেশপ্রেমী হয়ে থাকেন, আর দেশপ্রেমী হতে গেলে পরদেশ বিদ্বেষী হতে হয়। এই পরদেশ নিয়ে আবার সমস্যা আছে। কোন দল কোন পরদেশ বিদ্বেষী হবে, সেটা আবার দলের বসগণ গণতান্ত্রিক উপায়ে ঠিক করেন। কোনও নেতা বলছেন, “এটা একটা ভাইরাস ভরা কৃত্রিম প্রাণী, অমুক দেশ পাঠিয়েছে।” আবার অন্য নেতা বলছেন, “ভাইরাস ভরা প্রাণী হতেই পারে, ফুসফুস ভরা ভাইরাস। কিন্তু এটা অমুক দেশ নয়, তমুক দেশের কুকম্ম।”

একজন নেতা আবার বক্তব্য শেষ করে ‘কবিতা’ বলেন। আজ বললেন—

জানি জানি জানি
পাঠিয়েছো প্রাণী
ভরিয়া ভাইরাস ভুঁড়িতে...
শুন অর্বাচীন
বানিয়ে ভ্যাক্সিন
জিতিয়া যাইব তুড়িতে।

টিভিতে কোন্দল শো খুব জনপ্রিয়। আলোচনাকে ডিবেট বলা হচ্ছিল, এখন কোন্দল শো বলা হয়। এই শোয়ে মধু-বিধু জুটির টি.আর.পি খুব বেশি। মধু-বিধু হচ্ছেন মধুসূদন গড়াই ঈর বিধুভূষণ গড়াই। ওদের দেহ একটাই, মুখ দুটো আলাদা। তার মানে মাথাও আলাদা। বিজ্ঞানীরা এদের বলেন “সিয়ামিজ”। পৃথিবীতে অতি বিরল। যুগে যুগে ভগবান পৃথিবীতে দু-একজন এমন পাঠান। মধুর গোঁফ নেই, বিধুর তাগড়াই গোঁফ। মধুর নিরামিষ আহার, কিন্তু বিধু প্রচণ্ড মাংসভুক। কিন্তু পেটে গ্যাস হলে দুজনই ঢেকুর তোলে। কোষ্ঠকাঠিন্য হলে—দুজনেরই হয়। কারণ একটাই তো পেট। সত্বগুণের খাদ্য ও তমোগুণের খাদ্য একই পেটে পরিপাক হয় এবং বর্জ্য পদার্থগুলি একই দ্বার দিয়েই নিষ্ক্রান্ত হয়। এবং ওঁরা দুজনেই বিবাহিত, কিন্তু স্ত্রী একজনই। কারণ তো বোঝাই যাচ্ছে, তলপেটও একটি। টেলিভিসনের কোন্দল অনুষ্ঠানে দুজনের জন্য একটিই চেয়ার। ওদের একটা মুখ যখন বলে, “এই ভাইরাস ভরা ভুঁড়ি অমুক দেশের চক্রান্ত,” অন্য মুখ বলে, “না, এটা তমুক দেশের কাজ। আপনি পুরোই ভ্রান্ত।”

মধু বলে, “এই প্রশাসন এক্কেবারে জিরো।”

বিধু বলে, “ভুল বকছেন, পুলিশমন্ত্রী হিরো।”

মধু বলে, “কী করছিল গোয়েন্দা দপ্তর!”

বিধু বলে, “অ্যাকশন তো নিয়েছে সত্ত্বর।”

এই সব দামী আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে এই জীবটিকেও দেখাচ্ছে। টেলিভিসন বলছে, “একেবারে জিরো পয়েন্টে পৌঁছে গিয়েছেন আমাদের প্রতিনিধি। এই অদ্ভুত প্রাণীটি, এখনো জানিনা ইনি রাক্ষস না পথভোলা কোনো ইয়েতি, না অন্য গ্রহের প্রাণী, নাকি শত্রু দেশের চক্রান্ত। সবই জানা যাবে, আমরা দেখিয়ে যাবো, আমাদের সঙ্গে থাকুন।”

এতক্ষণ গাছের তলা মাথায় হাত দিয়ে বসেছিলেন উনি। এই মাত্র উঠে দাঁড়ালেন। চারিদিকে তাকাচ্ছেন। লম্বায় মোটামুটি কুড়ি ফিট। মুখের দুপাশের দাঁত দুটো ফুটখানেক করে হবে। আমরা এখন এনাকে রাক্ষস বলেই ডাকছি। অন্য কিছু কিনা, সেটা তদন্ত সাপেক্ষ। রাক্ষস হাঁ করলেন। বোধ হয় হাই তুললেন। ক্যামেরাকে আর একটু জুম করতে বলছি। হ্যাঁ, হ্যাঁ, দেখুন দুপাটির দাঁত। হলুদ হলুদ ছোপ। বোধহয় রাক্ষসরা দাঁত মাজেনা।

টিভির অ্যাঙ্কর বললেন, “একটু ময়দান থেকে সরে আসছি। আমরা পেয়ে গেছি স্বামী নিগূঢ়ানন্দ মহারাজকে। নমস্কার স্বামীজী, এই রাক্ষস সম্পর্কে কিছু ভেবেছেন!”

স্বামী নিগূঢ়ানন্দ—“কোন গূঢ় কার্যকারণ আছে। কলিকালের শেষে কল্কি অবতার আবির্ভূত হবেন, এমন কথাই শাস্ত্রে আছে। এই আপাত রাক্ষস তেমন কিছু হতে পারেন।”

অ্যাঙ্কর—“আমরা এসেছি মৌলনা কেরামতুল্লা আহমেদ বিন ইউসুফ-এর কাছে।”

ইউসুফ—“কেয়ামত আসতে আর বেশি দেরি নেই। কেয়ামতের অনেক আলামত আমরা দেখতে পেয়ে গেছি। বেপর্দা নারীর সংখ্যা বেড়ে গেছে। গান-বাজনা, গায়িকা অনেক বেড়েছে। মদ্যপানও হালাল মনে করা হচ্ছে। তারপর ধরুন নানা রকম আজাব নেমে আসছে। বন্যা, ভূমিকম্প এই সব। অসময়ে বৃষ্টি হচ্ছে। এই সবের পর দাজ্জালের আবির্ভাব হবে। এই দাজ্জাল সব লন্ডভন্ড করে দেবে। এ হচ্ছে সেই দাজ্জাল।”

অ্যাঙ্কর—“আকাশে হেলিকপ্টার। এটা বায়ুসেনার হেলিকপ্টার। প্যারাসুটে কয়েকজন সেনাকর্মী নামলেন, দেখা যাচ্ছে। ওদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। এই আশ্চর্য প্রাণীটি ওদের দিকে একবার তাকালো। দেখুন, কী নিরাসক্ত চাহনি, ভ্রূক্ষেপ নেই কোনো।”

বনকর্মীরাও চলে এসেছেন কয়েকজন। এঁরা ঘুম পাড়ানোর বিশেষজ্ঞ। বাঘ সিংহদের ঘুম পাড়ানোর গুলি ছুঁড়ে ঘুম পাড়ান। গুলি ছোঁড়া হল। গুড়ুম গুড়ুম, চারবার। রাক্ষস হা হা হেসে উঠল। কাক-পক্ষী উড়ে গেল।
******
অতি জরুরী মিটিং ডেকেছেন মুখ্যমন্ত্রী। শুধু ক্যাবিনেট মন্ত্রীরাই নয়, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিনিধি এসেছেন। চিড়িয়াখানার কর্তা এসেছেন। দমকল কর্তা আছেন, আরও নানা রকম কর্তা। অ্যাকশন প্ল্যান নিতে হবে।

এক মন্ত্রী বললেন, “প্রথমে আমাদের এই অপারেশনটার নাম দিতে হবে। আগে নাম, পরে কাম।”

বিভিন্ন কর্তাদের আলাপ-বিলাপ-সংলাপ এরকম—

— নাম দেওয়া হোক অপারেশন ঘটোৎকচ।

— রামায়ণ টামায়ণের লিংক রাখা ঠিক হবে না।

— রামায়ণ! ভাগ্যিস ক্লোজ ডোর মিটিং, মিডিয়া নেই, নইলে আবার এই নিয়ে ঘন্টাখানেক ভুবন হয়ে যেত! ঘটোৎকচ রামায়ণের কোনো চরিত্র নয়, মহাভারতের। হিড়িম্বার গর্ভে ভীমের পুত্র।

— ঠিক আছে, মহাভারত-রামায়ণ একই ব্যাপার। অন্য নাম ভাবা হোক।

— আমি প্রস্তাব করছি অপারেশন রিলিফ।

— সরি, দিস ইজ নট অ্যাট অল এ সুইটেবল নেম। আমি প্রোপোজ করছি অপারেশন ফাইভ স্টার।

— এটা কি হোটেল নাকি? হোয়াই স্টার? অন্য নাম... অন্য নাম।

— অপারেশন মুক্তি।

— এই অপারেশনটার একটা ইন্টারন্যাশনাল ভ্যালু আছে। মুক্তি বললে বিদেশীরা কেউ বুঝবে!

— দেন অপারেশন হোপ?

এরকম জরুরী সংলাপ-টংলাপের পর ঠিক হল—এই কার্য্যক্রমটির নাম হবে অপারেশন মিস্ট্রি। এর পরের অ্যাজেন্ডা হল, এই প্রাণীটিকে কব্জা করা যাবে কী ভাবে? চার চারটে ঘুমপাড়ানি গুলি হজম করে ফেলেছে। সেনাবাহিনীর বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কিছু কমান্ডো আছে, ওদের দিয়ে নেটবন্দী করা যেতে পারে। জালবন্দী।

অন্য এক কর্তা বলেন, “এত ঝামেলা কেন? এনকাউন্টার। এনকাউন্টার। স্টেনগান চালিয়ে...”

চিড়িয়াখানার কর্তা বললেন, “না, না, এনকাউন্টার হলে তো হয়েই গেল। সব শেষ। আমরা চিড়িয়াখানায় নিয়ে যেতে চাই। প্রচুর দর্শক হবে। হাতি কিংবা জিরাফের ব্লক থেকে কিছু স্পেস আলাদা করে টেম্পোরারিলি। পরে রাক্ষস প্যাভিলিয়ন বানিয়ে নেবো। রাক্ষস দেখার আলাদা চিকিট রাখবো। রাক্ষসের লাঞ্চ টাইমে টিকিটের দাম চারগুণ হবে। রাক্ষস যখন ছাগলের পেটটাকে নখ দিয়ে চিরে কলজে বার করে রক্ত মাখা হাতে খাবে, বুক থেকে ফুসফুস...”

— হ্যাঁ, হ্যাঁ, দারুণ। মানুষ খুব ভায়োলেন্স ভালোবাসছে।

— রাক্ষসটা তারপর রক্ত মাখা হাতটা যদি চাটতে শুরু করে দেয়... তবে তো...

— গ্যালারি করে দেওয়া যাবে। কলোসিয়াম যেমন...

— টিকিট ব্ল্যাক হবে...

— রাক্ষসকে দিয়ে যদি নরমাংস ভক্ষণ করানো যায়...। ব্যাপারটা দারুণ হবে। পৃথিবীতে প্রথম আমরা এই শো দেখাতে পারবো। এই সময়ে দাঁড়িয়ে আর কেউ, আর কোনো কান্ট্রি...

একজন কর্তা বললেন, “আপনারা কী করে ধরে নিলেন এটা রাক্ষস! অন্য গ্রহের প্রাণী হতে পারে, ইয়েতির সম্ভাবনা বলেছিল কেউ, আর্টিফিসিয়াল কিছু হতে পারে। সিলিকোন মেড রোবট হতে পারে। সুতরাং আমাদের জিন চিত্রটা চাই, ক্রোমোজম ক্যারিওটাইপটা দেখতে হবে।”

অপারেশন মিস্ট্রির কার্য্যক্রমের ছক তৈরী হয়ে গেল। জ্যান্ত অবস্থায় বন্দী, শরীরের রক্ত আর টিস্যু নিয়ে ল্যাবরেটরিতে পাঠানো, রাক্ষস প্রমাণিত হলে চিড়িয়াখানা, গ্যালারি বানানো, স্পেশ্যাল শো, রোবট হলে মিউজিয়াম, তারপর গিনেস বুক, তারপর ইলেকশনের আগে ছবি-সহ সাফল্যের হোর্ডিং, তারপর...।
******
হেলিকপ্টার থেকে কমান্ডো নামলো। ওদের সঙ্গে খুব কোমল অথচ কঠিন জাল। রাক্ষস ওদের কিছু বলল। রাক্ষসের ভাষা মানুষ জানে না। তবে ওর কথার মধ্যে মা কুরু, কত্যব্যম, কো দসু—এই সব শব্দও ছিল। গতকালও এই রাক্ষস কথা বলেছে। রেকর্ডও করা হয়েছিল। একজন ভাষাবিদ বললেন, “এটা ‘প্রাকৃত’ ভাষা। ভারতীয় রাক্ষসেরা এই ভাষাতেই কথা বলতো।”

যখন কালো পোষাকের কমান্ডোরা নামলো, ঠিক সেই সময়েই সাদা পোষাক পরা পরীরাও নামলো। এক ঝাঁক পরী। ওরা কমান্ডোদের থেকে ছিনিয়ে নিল ওই বিশাল জাল এবং পরীরা সব সমবেত উড়ানে জালটা নিয়ে ডেকে দিল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। রাক্ষস হাততালি দিল। কিছু কথাও বলল, মানুষ বুঝলো না। রাক্ষস উঠে দাঁড়িয়ে হাতছানি দিল আকাশে। পরীরা নামলো। রাক্ষসকে ঘিরে পরীরা নাচলো। পরীরা নাচতে নাচতে গানও গাইলো।

তখন তোমার একুশ বছর বোধহয়
আমি তখন অষ্টাদশীর ছোঁয়ায়
লজ্জা জড়ানো ছন্দে কেঁপেছি
ধরা পড়ি ছিল ভয়...।

রাক্ষসও নাচলো ওদের সঙ্গে। একজন পরী রাক্ষসের কাঁধে চেপে কানে কানে কিছু বলে। রাক্ষস ঘাড় নাড়িয়ে বলে, “বুঝেছি, বাংলা, বাংলা।”

রাক্ষস গাইলো—
বনে নয়, মনে নয়, পাপিয়া গান গায়
এই ঝিরি ঝিরি হাওয়ায় দোলা দিয়ে যায়...

তারপর রাক্ষস বলল, “ক্ষুধা, ক্ষুধা। খিদে পেয়েছে।”

অপারেশন মিস্ট্রি কাছাকাছি তাঁবু খাটিয়েছে কয়েকটা। রাক্ষসকে খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। জ্যান্ত মুরগি দেওয়া হয়েছিল, ছুঁড়ে দিয়েছে। রান্না করা চিকেন দেওয়া হয়েছিল, একটু মুখে দিয়েই গামলাটা ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে। তবে কি এটা ভেজিটেরিয়ান রাক্ষস? রাক্ষস কি ‘ভেজ’ হয় কখনো? এক হাঁড়ি রসগোল্লাও দেওয়া হল। গোটা চারেক খেয়ে আর খায়নি।

এই সব বৃত্তান্ত পরীদের বলা হল। একটা পরী বলল, “সুজি দিয়ে ভেজে, চিনি, কাজু এই সব দিয়ে সেদ্ধ করে দিলে কী হয়? হালুয়া তো? হালুয়ার মধ্যে প্রচুর ভালোবাসা মিশিয়ে দিয়ে নেড়ে যেটা হয়, তার নাম মোহনভোগ। ইনি হালুয়া খান না। মোহনভোগ খান। ওর জন্য আমরা রান্না করে দিচ্ছি।”

দুজন পরী রান্না-তাঁবুতে গেল। পরীদের গায়ে এক আশ্চর্য সুগন্ধ। আটা মাখতে মাখতে গাইলো, “নীড় ছোট, ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়।” তারপর, “তুমি যে আমার, ওগো তুমি যে আমার, কানে কানে শুধু একবার বলো, তুমি যে আমার...” কথাগুলো যেন বুড়ো আঙুল দিয়ে ঠেসে রুটির গোল্লার মধ্যে ঢোকাচ্ছে। কুমড়োর তরকারির মধ্যে ঢেলে দিল, “এই যে হেথায় কুঞ্জ ছায়ায় স্বপ্ন মধুর মোহে, এই জীবনে যে কটি দিন পাবো, তোমায়-আমায় হেসে খেলে কাটিয়ে যাবো দোঁহে।” পায়েস নাড়তে নাড়তে গাইলো, “আজ নিখিলের আনন্দধারায় ধুইয়ে দাও, মনের কোণের সব দীনতা মলিনতা ধুইয়ে দাও।”

খাবার সাজিয়ে আনা হলো। রাক্ষস প্রথমেই বেরিয়ে আসা দাঁত দুটোকে ঠেলে ঢুকিয়ে দিল ভিতরে। নখগুলোও। বেশ তৃপ্তি করেই খেলো। একজন পরী বলল, “এবার ওঁকে একটু ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি।”

রাক্ষস শুয়ে পড়ে সবুজ ঘাসে। একজন পরী সেই হারানো পুরোনো সুরে গান গায়—

ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি
মোদের বাড়ি এসো
খাট নাই, পালঙ নাই
খোকার চোখে বসো
বাটা ভরা পান দিব
গাল ভরে খেয়ো
খোকার চোখে ঘুম নাই
ঘুম দিয়ে যেও...।

কয়েকবার গানটা গাইতেই রাক্ষস ঘুমিয়ে পড়লো। এক্কেবারে খোকার মতোই, যে খোকা ঘুমোলে পাড়া জুড়িয়ে যায়। রাক্ষস খোকামণির মুখে শালুক ফুলের সারল্য। দুজন পরী মাথার দুপাশে। পরীদের গায়ে এক আশ্চর্য সুগন্ধ।

কমান্ডোরা মহা গন্ডগোলে। কী করা উচিৎ? হতভম্ব বড়ই। অপারেশন-চিফ ভাবছেন, হচ্ছেটা কী? হাতে ওয়াকিটকি, কিন্তু টকলেস একদম। দুজন সাদা অ্যাপ্রন পরা লোক এগিয়ে এলো, পরীদের বলল, “একটু ব্লাড নেবো ম্যাডাম...।”

এক পরী বললো, “নিয়ে নিন, ঘুমোবার আগেও নিতে পারতেন। চাইলেই বাড়াতেন হাত।”

রাক্ষসের ঘুম ভেঙে গেল। মৃদু হেসে বললেন, “টিস্যুও তো চাই, তাই না? জিভ থেকে নিয়ে নিন।” বলেই মুখ ব্যাদান, মানে হ্যাঁ।

সাদা অ্যাপ্রন দুজন “থ্যাংকিউ স্যার” বলতে চেয়ে অন্য কী যেন বলে ফেললেন। তার উত্তরেই হয়তো বা বললেন, “তোমাদের সুমতি হোক।”

এই বার্তা রটে গেল দ্রুত।

মিডিয়ার লোকজন বুম বাগিয়ে এগিয়ে এল। অপারেশন চিফ অনেকক্ষণ পর কিছু কথা বললেন, কমান্ডোদের কমান্ড করলেন, “ডোন্ট অ্যালাও দেম।”

মিডিয়ার লোকজন বলল, “এ সুযোগ পাবো না আর। ইন্টারভিউ নেবোই নেবো। করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে।”

রাক্ষস ওদের হাতছানি দিয়ে ডাকলো। গেয়ে উঠলো, “যদি দানব কখনো বা হয় মানুষ লজ্জা কি, তুমি পাবে না! ও বন্ধু... মানুষ মানুষের জন্য...।”

সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেই চলেছে। প্রশ্নে প্রশ্নে ঘাটাঘাটি। প্রশ্নে প্রশ্নে কাটাকুটি। রাক্ষস বলল, “তো্মাদের সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিচ্ছি আমি। শোন। আমি অনেক মানুষকে দেখলাম, যাদের গায়ে জামা নেই, আবার অনেক জামাকেও দেখলাম, যাদের ভিতরে মানুষ নেই। অনেক রাক্ষস আছে মানুষের বেশে। আমার আর কোনো কথা নেই।”

সূয্যিমামা অস্ত গেলেন। কুয়াশা নামলো ঘন হয়ে। চাঁদও উঠে গেল। রাক্ষস বলল, “আমার কাজ শেষ। চল এবার যাই। আয় তবে সহচরি, হাতে হাতে ধরি ধরি...”

রাক্ষসটা নিজের আকৃতি ছোট করে ফেললো। আর পরীরা সব হাতে হাতে ধরি ধরি উড়িয়ে নিয়ে চলল জোছনা মাখানো কুয়াশায়।

পরদিন সারা শহর তোলপাড়। রাক্ষসের জিন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মানুষ এবং রাক্ষসের জিন একই রকম।

আর একটা আশ্চর্য ব্যাপার। শহরের অনেকের বাড়ির জলের কলে, বাথরুমের শাওয়ারের জলে, এক অলৌকিক সুগন্ধ।