ভিটেটা ছাড়া নারায়ণের এখন আর কিছুই নেই। তবে ছিল। একসময় বিঘে ছয়েক জমি ছিল নারায়ণের। কিন্তু একদিকে অভাব, আর অন্যদিকে ‘ইন্ডিয়ায় যখন চলেই যাব, তখন জমি রেখে আর লাভ কী’—এই মানসিকতায় দু-এক বিঘে করে বেচতে বেচতে নিজের বলতে এখন ওর শুধু ওই ভিটেটাই রয়েছে।
নারায়ণের ভিটেটা অবশ্য বেশি বড় নয়। পনেরো কাঠার মতো জায়গা। তার মধ্যে এক পাশে গোলপাতার ছোট দুটো ঘর। ঘরের পাশে ছোট একটা পুকুরও আছে। তবে যেটা ওর ভিটের বিশেষ বৈশিষ্ট্য, তা হচ্ছে, পুরো ভিটেটা জুড়েই ঘন সবুজ গাছপালা। এবং সব ভালো ভালো জাতের গাছ। আর এর জন্য ওর ঠাকুরমাকেই মূলত কৃতিত্বটা দিতে হয়। একাত্তর সালের যুদ্ধে ভারতে যাবার সময় ঝাউডাঙ্গা সীমান্তের কাছে নারায়ণের বাবা-মা গুলি খেয়ে মারা যাবার পর শিশু নারায়ণকে নিয়ে ঠাকুরমা ওদের নারকেলডাঙ্গা গ্রামের ভিটেটাতেই আবার ফিরে আসেন। সে সময়ের স্মৃতি হিসেবে নারায়ণের এটা মনে আছে যে ঠাকুরমা এর-ওর কাছ থেকে চেয়ে-চিন্তে নানা রকম চারাগাছ এনে সারাক্ষণ শুধু এ ভিটেটায় গাছ লাগাতেন। আর সবই ফলের গাছ—আম, লিচু, সফেদা, কাঁঠাল, আমলকী, জাম কিংবা জামরুল। এ ছাড়া উঠোনে আর ঘরের আশপাশে লাগাতেন ফুলের গাছ। বৈশাখে প্রথম বৃষ্টি নেমে মাটি কুমারী মেয়ের মতো নরম হয়ে উঠতেই ঠাকুরমা নারায়ণকে সঙ্গে নিয়ে গাছ লাগানো শুরু করতেন। নারায়ণেরও খুব উৎসাহ ছিল এ ব্যাপারে। বালক নারায়ণ তখন মাটি কোপাত, গর্ত করত, আর ঠাকুরমা একেকটা গাছের চারা পরম যত্নে সেসব গর্তে পুঁতে দিতেন। বর্ষার ছোঁয়া পেয়ে অচিরেই সেসব গাছ সবুজ পাতাসহ লকলক করে বেড়ে উঠত। ঠাকুরমা মারা গেছেন আজ বছর দশেক হলো। কিন্তু গাছ লাগানো আর গাছের পরিচর্যা করার এই বিশেষ স্বভাবটা ঠাকুরমার কাছ থেকে নারায়ণ ততদিনে বেশ ভালোভাবেই পেয়ে গিয়েছিল। ফলে আজও নারায়ণ পরম যত্নে ওর ভিটের গাছগুলোর পরিচর্যা করে থাকে। নতুন গাছও লাগায়। দিনের একটা বড় সময়ই ওর কাটে এসব গাছগাছালির দেখাশোনা করে। আর ওর এই অতিরিক্ত গাছপ্রীতির কারণেই বোধহয় নারায়ণের আর বিয়ে-থা বা ঘর-সংসার করা হয়ে উঠল না। ঠাকুরমাও আর নেই যে এ ব্যাপারে বলবেন। শোলমারী নদীর পারে ওদের গ্রামের রক্ষাকালী মন্দিরের পুরোহিত হরেন ঠাকুর অবশ্য মাঝে মাঝে বলেন, “ও নারায়ণ, বে-থা করলিনে, তোরে শেষ বয়সে দ্যাখবেনে কী-ডা? মুখে আগুন দেবেনে কী-ডা!” প্রাচীন এই রক্ষাকালীর মন্দিরটার অবস্থা একসময় বেশ রমরমাই ছিল। কিন্তু এ অঞ্চলের অধিকাংশ হিন্দু পরিবার গ্রাম ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়ায় বর্তমানে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে পুরোনো এই মন্দিরটা।
তবে বিয়ে বা সংসার করে থিতু হওয়া—এসব ব্যাপারে নারায়ণেরও খুব একটা উৎসাহ আছে বলে মনে হয় না। বরং সারাদিন মাঠে-ঘাটে কামলা খেটে বা কারও ঘেরে মাছ ধরার কাজ সেরে ও যখন শেষ বিকেলে নিজের ভিটেয় ফিরে আসে, তখন এক অনাবিল আনন্দে ভরে ওঠে ওর মনটা। নানা রকম পাখি বাস করে নারায়ণের ভিটের পুরোনো গাছগুলোতে। তাদের কলকাকলিতে গোটা এলাকাটা হয়ে ওঠে মুখর ও আনন্দময়। বিশেষ করে ভোরে ও বিকেলে। নিজের প্রিয় ভিটের ঘন নিবিড় সবুজ গাছপালাগুলো যেন ছায়া দিয়ে আশ্রয় দেয় ওকে। মায়ের গর্ভের মতোই নিরাপদ একটা আশ্রয়ের বোধ যেন এ সময়ে জেগে ওঠে নারায়ণের মনে। আর উঠোনের চারপাশে লাগানো জবা, টগর আর নয়নতারা ফুলগুলো বাতাসে দুলতে থাকলে স্ফূর্তির একটা বিশেষ অনুভূতিও জেগে ওঠে ওর মনে।
এসব সময়ে নারায়ণের মনে কোনো ভয় থাকে না। এই ভয় পাওয়া বা না-পাওয়া কিংবা নিরাপত্তার প্রশ্নটা এসেই যায়, কারণ মাস ছয়েক আগে যখন ওদের গাঁয়ের মন্দিরটাতে হামলা হলো এবং বেশ কয়েকটা প্রতিমা ভাঙচুর করা হলো, তখন হরেন ঠাকুরসহ গ্রামের শেষ যে কয়েকটি হিন্দু পরিবার ছিল, তারা সবাই গ্রাম ছেড়ে ভারতে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিল। এবং দুর্গাপূজার পরে একে একে সবাই চলেও গেল। নারায়ণও চলে যাবে বলে মনস্থির করেছিল এবং দক্ষিণের চকে ওর যে শেষ তিরিশ শতক জমি ছিল, সেটাও বেচে দিল। এ অঞ্চলে জমি কেনাবেচা যার নিয়মিত কাজ, এবং নারায়ণের আগের জমিসহ শেষ জমিটাও নারায়ণ যাকে বিক্রি করেছিল, সেই শামসুদ্দীন ব্যাপারীকে নারায়ণ বলেওছিল, “ভিটেটাও বেচে দেব শামসু মিয়া। ও আর রেহে করব কী!” শামসু ব্যাপারীর চোখ দুটো কি কিছুটা জ্বলে উঠেছিল খুশিতে? কারণ অনেক ভালো ভালো জাতের গাছপালায় ভরা নারায়ণের মায়াময় ভিটেটার প্রতি লোভ তো এ অঞ্চলের অনেকেরই ছিল। আর জমি-ভিটের পাকা জহুরি শামসু ব্যাপারীর তো সেটা থাকতেই পারে।
একটা দামও বলেছিল নারায়ণ। ওর অন্য জমির দামের ব্যাপারে শামসু ব্যাপারীর নখরার কোনো শেষ ছিল না; “কী কও নারায়ণদা! ও জমি তো তোমার বিলেন জমি। ওর আর দাম কী?” কিংবা, “কী ক’লে? ওই বেলে মাটির জমির দাম চাচ্ছ শতক তিন হাজার! ...ওহানে তো তিল ছাড়া আর কিছুই বুনা যাবে নানে।” কিন্তু ওর ভিটেটার ক্ষেত্রে নারায়ণের চাওয়া দামটার ব্যাপারে শামসু ব্যাপারী কোনোই আপত্তি তোলেনি। বরং গত হাটে নারায়ণকে এক পাশে ডেকে নিয়ে বলেছিল, “তা রেজিস্ট্রিডা কবে করবা নারায়ণদা? টাহা কিন্তু রেডী। কও তো কিছু বায়না দেই।”
তো সেই শামসু মিয়াকে নারায়ণ আজ সঙ্গে নিয়ে এসেছে। আজকেই সবকিছু চূড়ান্ত করে ফেলতে চায় ও। চলেই যখন যাবে, তখন শুধু শুধু ভিটের মায়া বাড়িয়ে আর লাভ কী?
দুজন একসঙ্গে হাট থেকে বেরিয়ে শোলমারী নদীর খেয়াটা পার হলো। শামসু ব্যাপারীকে আজ বেশ খুশি খুশি দেখাচ্ছিল। বহুদিন ধরেই তো ও নারায়ণকে বলে আসছে ভিটেটা রেজিস্ট্রি করে দিতে। আর নারায়ণ যখন ভারতে চলেই যাবে, তখন ওই ভিটেটুকু রেখেই বা ও করবে কী? আসলে ভিটেটা বেচতে নারায়ণের এত কেন দ্বিধা, শামসু মিয়া সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। কই, আগের ধানিজমিগুলো বেচার সময় তো নারায়ণের কোনো দোনোমোনো ভাব দেখেনি শামসু মিয়া। বরং নারায়ণ নিজেই হাটে এসে শামসু মিয়ার খোঁজ করে বলেছে, “খালের ধারের দেড় বিঘে জমিটা আমি বেচে দেব শামসু মিয়া” কিংবা, “বিলের কোণের ওই বিশ শতকও আর রাখব না। তুমি টাকার জোগাড় কর।” টাকার জোগাড় করতে অবশ্য শামসু ব্যাপারী দেরি করে না। কারণ গত কয়েক বছরে কম হিন্দু পরিবার তো জমি-বাড়ি সব বেচে দেশত্যাগ করেনি। আর শামসু মিয়া তাদের অনেকেরই জমি আর ভিটে কিনেছে। আর কিনেছে বেশ সস্তাতেই। পরে তা চড়া দামে অন্য কাউকে বেচেছে কিংবা বর্গা দিয়ে চাষ করাচ্ছে। নারায়ণের চাষের জমিগুলো এভাবেই ধীরে ধীরে কিনেছিল শামসু মিয়া। নারায়ণের ভিটেটাও যে একদিন কিনে ফেলতে পারবে, এ বিশ্বাস ওর ছিল। তাই নারায়ণ সেদিন যখন নিজ মুখে ওর ভিটেটা বিক্রির কথা তুলল, শামসু ব্যাপারী খুব একটা বিস্মিত হয়নি। আর টাকার জোগাড় ওর আছে। আসলে জমি কেনাবেচার কারবারটা শামসু ব্যাপারীর ইদানীং এত ভালো যাচ্ছে যে দু-এক লক্ষ টাকা হঠাৎ বের করা ওর জন্য এখন কোনো ব্যাপারই নয়। শামসু ব্যাপারীর এরকম তরক্কি দেখেই শোলমারীর খেয়াঘাটে আহমেদ মেম্বার তো সেদিন বলেই ফেলল, “অযোধ্যায় মসজিদ ভাঙল মালায়নরা, আর তুমি শামসু মিয়া দেহি এহানে সস্তায় জমি কিনে লাল হয়ে গেলে!”
পথের দুপাশের ক্ষেতে আমন ধান সবে পাকতে শুরু করেছে। ধান পাকার আয়েশি একটা গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে গাঁয়ের বাতাসে। কাছের কোনো ডোবা থেকে একটা ডাহুক পাখি ডাকছে। ধানক্ষেতের মাঝের আলপথটা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে শামসু ব্যাপারী ও নারায়ণ। নারায়ণ আগে, শামসু ব্যাপারী পেছনে। বিষয়টার একটা ফয়সালা আজই করে ফেলবে বলে ঠিক করেছে দুজনেই। দুজনের হাঁটার মধ্যে তাই বেশ একটা গতিও আছে। দুজনেই জানে, সুনির্দিষ্ট একটা লক্ষ্যের দিকে হাঁটছে ওরা। নারায়ণের ভিটেটা অবশ্য আগেও কয়েকবার দেখেছে শামসু মিয়া। তবে কেনার আগে আজ একবার শেষ দেখে নেবার আগ্রহ ওর। তাছাড়া গাছগুলো গুনে নেবার ব্যাপার আছে। ভিটেটা কেনা বাবদ বায়নার কিছু প্রস্তুতিও নিয়ে এসেছে শামসু ব্যাপারী। হাতের চামড়ার ব্যাগটাতে হাজার দশেক টাকা সঙ্গে নিয়ে চলেছে ও।
হাট থেকে নদীর পার পর্যন্ত নারায়ণ অনেক কথাই বলছিল। কিন্তু খেয়ানৌকায় নদী পার হয়ে গাঁয়ের পথটাতে ঢুকতেই কথা যেন একটু কমে যায় নারায়ণের। কথা যা বলার, শামসু মিয়া শুধু একাই এখন বলতে থাকে। আর ভিটেটা কেনার আনন্দে বা উত্তেজনায় শামসু মিয়া কথা যেন একটু বেশিই বলে চলে। শামসু মিয়া বলে,
“ও তুমি কিছু ভেবো না নারায়ণদা। ...ইন্ডে থেহে যদি কহনও আস ...আমার বাড়ী থাকবা। তোমার ভিটে নেই বলে কী এ দেশে তোমার থাকার জায়গা আর থাকবে না ভাবিছ? আমরা আছি না!”
নারায়ণ নিরুত্তরই থাকে। শামসু মিয়া অবশ্য এটা-ওটা নানা কথা বলে যেতেই থাকে। ভিটেটা কিনতে পারার অপার খুশিতে ও যদি বুঁদ হয়ে না থাকত, তাহলে দেখতে পেত নারায়ণ শুধু চুপ করেই নেই, ওর মুখের ভাবেও যেন ক্রমে একটা পরিবর্তন আসছে। কী যেন গভীরভাবে ভাবছে নারায়ণ।
চারপাশের ধানক্ষেত থেকে নারায়ণের ভিটেটা কিছুটা উঁচুতে। অনেক দূর থেকেই ঘন সবুজ গাছপালায় ঘেরা ভিটেটা সবারই চোখে পড়ে। কিছুটা উঁচু বলে খালের পার দিয়ে কিছুটা ঢাল বেয়ে নারায়ণের ভিটেটায় উঠতে হয়। ভিটেয় ওঠার মুখটাতে একটা পুরোনো আমগাছ। নারায়ণের ঠাকুরমারই লাগানো। আর ভিটেয় ওঠার ঠিক মুখেই একটা বেশ বড় শিউলি গাছ। তার পাশেই জবা ফুলের একটা গাছে বেশ কয়েকটা লাল টকটকে জবা ফুল ফুটে রয়েছে।
ধাপ বেয়ে ধীরে ধীরে ভিটেয় উঠতে থাকে নারায়ণ। ওকে এখন বেশ চিন্তামগ্ন লাগে। নিজের মনে কী যেন ভেবে চলেছে ও। এদিকে শামসু মিয়া তখনও এটা-ওটা কথা বলেই যেতে থাকে। শুধু খেয়াল রাখে, পাছে নারায়ণের ভিটেটার ও যেন বেশি প্রশংসা না করে বসে। বলা তো যায় না, তা শুনে নারায়ণ যদি দামটা আরও বাড়িয়ে দেয়! খদ্দেরের তো অভাব নেই! এ ভিটেটার ওপর তো অনেকেরই লোভ। তো ভিটেটার ওপর উঠে নারায়ণ হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে একটু থেমে থেমে বলে, “বেচব না ...এ ভিটে আমি ...বেচব না ...শামসু মিয়া।”
শুনে শামসু ব্যাপারী চমকে ওঠে, “সে কী! ...কী কও?” নারায়ণ এবার অপেক্ষাকৃত স্পষ্ট গলায় বলে, “ভিটে আমি বেচব না শামসু ভাই।” শামসু মিয়া এবারে রীতিমতো ক্ষেপে ওঠে, “কচ্ছ কি নারায়ণদা? ...বেচবা বলেই তো আমারে এদ্দুর টেনে আনলা। ...কদ্দিন ধরে কথা চলতিছে! ...বায়নার টাকা নিয়ে আইছি!”
নারায়ণের গলাটা এখন যেন একটু অন্য রকম শোনায়। হাটে, খেয়ানৌকায় বা আলপথে নারায়ণের যে ম্রিয়মাণ গলা সচরাচর শোনা যায়, এ যেন সে গলা নয়। যেন অন্য কেউ একজন, বহু দূর থেকে নারায়ণের গলায় কথা বলছে। এবং সে গলা দৃঢ় এবং সুস্পষ্ট। এতক্ষণ অন্যদিকে তাকিয়ে নারায়ণ কথাগুলো বলছিল। এবার সরাসরি শামসু মিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে,
“না, শামসু মিয়া। ...ভিটে আমি বেচব না। তুমি আস গিয়া।”
তারপর ভিটের উঁচুটায় দাঁড়িয়ে বলে, “এইডাই আমার শেষ কথা।” তারপর মাথা নাড়তে নাড়তে হেঁটে ভিটের ঘন গাছপালার মাঝে ঢুকে পড়ে নারায়ণ। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কিছুটা হতবুদ্ধি শামসু ব্যাপারী অপসৃয়মাণ নারায়ণের মিলিয়ে যেতে থাকা কণ্ঠের একটা কথাই কেবল অনুরণিত হতে শোনে, “এ ভিটে আমি বেচব না। ...কোনো দিন না ...ভিটে আমি ছাড়ব না।” ·

0 মন্তব্যসমূহ