বহুমাত্রিক লেখক, গবেষক, গায়ক আবদুশ শাকুর চলে গেলেন আজ


আবদুশ শাকুর
 
জীবন-বৃত্তান্ত
জন্ম ২৫শে ফেব্রুয়ারি ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে, নোয়াখালী জেলার সুধারাম থানার রামেশ্বরপুর গ্রামে। বাবা মকবুল আহমাদ ও মা ফায়জুন্নিসা। দুই ভাই-এক বোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সসহ এম.এ এবং হল্যান্ডের আই.এস.এস থেকে উন্নয়ন অর্থনীতিতে এম.এস। প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী সাহিত্যের অধ্যাপনা, পরে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিসে যোগদান এবং বাংলাদেশ সরকারের সচিব হিসাবে অবসর গ্রহণ। পড়াশোনা করেন বিবিধ বিষয়ে এবং নানান ভাষায়। লেখেন গল্প, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধ। তবে রচনাসাহিত্যে তাঁর অবস্থান অবিসংবাদিতভাবেই শীর্ষস্থানীয়।
সাহিত্যকর্ম
দেশে এবং বিদেশে প্রাপ্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ছোটগল্পের ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ স্থান নির্দেশ করে। তাঁর পাঁচশতাধিক পৃষ্ঠার গল্পসমগ্রগ্রন্থটি কীর্তি হিসেবে বাংলা কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী হবার উপাদানে সমৃদ্ধ। খ. তাঁর পাঁচশতাধিক পৃষ্ঠার রম্যসমগ্রব্যাখ্যা করে কেন রম্যরচনার ক্ষেত্রে তিনি দেশের অগ্রগণ্য লেখক হিসেবে বরিত। গ. তাঁর গোলাপ-বিষয়ক গবেষণামূলক রচনাসমূহ বিশেষত গোলাপসংগ্রহগ্রন্থটি স্বক্ষেত্রে বাংলাভাষায় একক। শুধু পুষ্পরানী সম্পর্কেই নয়, পুস্তকটিতে রয়েছে মৌসুমী, বর্ষজীবী, দ্বিবর্ষজীবী, চিরজীবী পুষ্পবিষয়ক বিবিধ আলোচনাসহ বাংলাদেশের জাতীয় ফুল ও জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের উপর সারগর্ভ পর্যালোচনাও। ঘ. গবেষণামূলক সঙ্গীতলেখক হিসেবে দেশের সঙ্গীত ও সাহিত্যিক সমাজে তিনি অগ্রগণ্য। শুদ্ধসঙ্গীতের স্বর, সুর, কথা, হিন্দুস্তানীসঙ্গীত বনাম কর্ণাটকসঙ্গীত, ধ্বনিমুদ্রণ প্রযুক্তি, ধ্বনিসংস্কৃতি বনাম লিপিসংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ে গভীরচারী আলোচনার জন্য তাঁর সংগীত সংগীত’, রাগসঙ্গীতচর্চার সোনালী শতক সম্পর্কিত মহান শ্রোতাএবং সার্ধশত বর্ষের দেশাত্মবোধক সঙ্গীত পর্যালোচনা গ্রন্থ বাঙালির মুক্তির গানবিশেষজ্ঞমহলে সমাদৃত। ঙ. তাঁর মহামহিম রবীন্দ্রনাথ’, ‘পরম্পরাহীন রবীন্দ্রনাথএবং রবীন্দ্রনাথকে যতটুকু জানি’-নামক রবীন্দ্র-গবেষণামূলক গ্রন্থগুলি বোদ্ধা মহলে কবিগুরুর শেষহীন গুরুত্ব অনুধাবনে বিশেষ সহায়ক বলে বিবেচিত। চ. তাঁর উপন্যাসগুলি ভাষা ও উপজীব্যের দিক দিয়ে অভিনব বলেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণ : ‘ক্রাইসিস’, ‘সংলাপ’, ‘উত্তর-দক্ষিণ সংলাপ`ভালোবাসা'। ছ. মুখের ভাষার মতো তাঁর গদ্যও বুদ্ধিদীপ্ত, ক্ষিপ্র, কাব্যময়, রঙিন ও ক্ষুরধার। গদ্যশরীর যতখানি নিখাদ আর শাণিত হতে পারে, তাঁর ভাষা প্রায় তারই উপমা। বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ-এর ভাষায়, ‘আজ আমাদের চারপাশে অযত্ন আর অবহেলায় লেখা শিথিল গদ্যভাষার যে অলীক কুনাট্যরঙ্গমাথা উঁচিয়ে উঠেছে। আবদুশ শাকুরের গদ্য চিরায়ত গদ্যের পক্ষ থেকে তার শক্তিমান প্রতিবাদজ্ঞান, মেধা এবং মননের সমবায় তাঁর বৈদগ্ধ্যকে এমন এক পরিশীলিত শ্রী এবং উপভোগ্যতা দিয়েছে যার কাছাকাছি জিনিশ চিরায়ত বাংলাসাহিত্যের ভিতরেই কেবল খুঁজে পাওয়া যাবে’ (স্বনির্বাচিত প্রবন্ধ ও রচনা)।
কথাসাহিত্য
বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক ড. অমিয় দেব কলকাতার দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকার ২০০৪ সালের বিশেষ একটি সাহিত্যিক ক্রোড়পত্রে আবদুশ শাকুরের কথাসাহিত্য আলোচনাক্রমে লিখেছেন : “প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা তাঁর ছোটগল্পে এক অনুপম চারুতা ও প্রাসঙ্গিকতা যোগ করে। বাগ্মী এই কথাকোবিদের প্রতিটি রচনাকেই আলোকিত করে বিবিধ বিষয়ে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য। শাকুরের সমগ্র কথাসাহিত্যে বিশেষভাবে লক্ষণীয় বস্তুটি হল চিন্তাশক্তি আর কল্পনাশক্তির চমৎকার সমবায়।
সমসময়ের বহুলপঠিত কথাসাহিত্যিক, বিশ্বসাহিত্যের উৎসাহী পাঠক ও আদৃত অনুবাদক আন্দালিব রাশদি দৈনিক সমকাল পত্রিকার সাহিত্যপত্র কালের খেয়া”-য় আবদুশ শাকুরের উপন্যাস পর্যালোচনাকালে লেখেন : “তাঁর ভালোবাসাআর ক্রাইসিস’-নামের উপন্যাস দুটি মধ্যবিত্ত সমাজের প্রেমের গভীরচারী অধ্যয়ন। প্রতিপক্ষে সংলাপআর উত্তর-দক্ষিণ সংলাপ’-নামক দুটি উপন্যাস সমাজতন্ত্রের স্বরূপ বিশ্লেষণ করে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, সঠিক শব্দের উজ্জ্বল আলোকে।
রচনাসাহিত্য
বঙ্গবাসী কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ড. বিষ্ণু বেরা, কলকাতার মাসিক একুশ শতকপত্রিকায় ২০০৫ সালের এক সংখ্যায় আলোচনাকালে আবদুশ শাকুরের রম্যরচনা সম্পর্কে লেখেন : “অসাধারণ পাণ্ডিত্য ও সূক্ষ্ম রসবোধসম্পন্ন কথাশিল্পী শাকুর তাঁর রচনাসাহিত্যে নিজেকে এবং তাঁর প্রিয় বাংলাদেশ ও পরিবর্তমান বাঙালি সমাজকে বিশশতকের উত্তাল বিশ্ব ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে নানা রঙে নানা ভঙ্গিমায় স্থাপন করেছেন। মনন ও অভিজ্ঞতায় এই লেখক প্রকৃত অর্থেই একজন বিশ্বনাগরিক। বাংলাদেশের নাগরিক বৃত্তের উচ্চমহল সম্বন্ধে বিশদ ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় তাঁর জীবনপাত্র উছলে উঠে এক স্বতন্ত্র মাধুরীর ছবি ফুটিয়ে তুলেছে তাঁর গল্প-উপন্যাসে, বিশেষত রমণীয় রচনার ছোটগল্পরূপ উপস্থাপনায়। বিশ্ববিদ্যার নানা শাখায় অবাধ সঞ্চরণের ফলে তাঁর রচনার সঞ্চরণও প্রজ্ঞার এক দীপ্তিমান পরিসরে। মানুষের প্রতি গভীর ভালবাসা, সংসারের তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনাকে গভীর অন্তর্দৃষ্টির সাহায্যে অসামান্য তাৎপর্যময় করে তোলা এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ উপস্থাপনার নির্মোহ দার্শনিকতা তাঁর রচনাকে একান্তই নিজস্ব করে তুলেছে। শাকুর তাঁর চেনা সমাজের অন্তঃসারশূন্যতা ও স্ববিরোধিতা নির্দ্বিধায় অনাবৃত করেছেন কিন্তু নগ্ন বীভৎসতায় নামিয়ে আনেননি। বরঞ্চ সংবেদনশীলতার নক্সাকাটা চাদরে তাকে আদরে ঢেকে দিয়েছেন।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বাংলাদেশ’-এর সভাপতি অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তাঁর স্বনির্বাচিত প্রবন্ধ ও রচনা’-নামক গ্রন্থে আবদুশ শাকুরের রম্যরচনা’-শীর্ষক প্রবন্ধে (পৃ. ১৮০-১৮৮) লিখেছেন : “রম্যরচনার ক্ষেত্রে শাকুর একটি ভিন্ন ধারার প্রবর্তক। প্রতিটি লেখার সবখানে ঘাই-দেওয়া কাঁটাওয়ালা মাছের মতো ক্রূর আঘাতে যা পাঠককে নিরন্তর ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে যায় তা হল তাঁর দ্যুতিময় মননশীলতা। প্রতি পদে তাঁর ক্ষুরধার চিন্তার আঘাত পাঠককে আহত করে, জাগ্রত করে, আলোকিত করে এবং একটি নতুন দীপিত জগতে তুলে নেয়। একটি রম্যরচনার কাছ থেকে এতখানি প্রাপ্তি সত্যিকার অর্থেই দুর্লভ। এ দিক থেকে বাংলা হাস্যকৌতুকের ধারায় তাঁর স্থান তৃতীয় একটি বিন্দুতে। তিনি সেই দলের লেখক যাঁরা রম্যরচনার ছদ্মাবরণে উচ্চতর চেতনাসম্পদ উপহার দিয়েছেন সাহিত্যে। আবদুশ শাকুরকে তাই শুধুমাত্র রম্যরচনাকার হিসেবে চিহ্নিত করলে ভুল হবে। তিনি যা উপহার দিয়েছেন তা সঠিক অর্থে রম্যরচনা নয়, পরম রমণীয় রচনা। শাকুরের রম্যরচনার আর একটা দামি সম্পত্তি এর বৈদগ্ধ্য। এই রম্যরচনাগুলো হাতে নিলেই টের পেতে দেরি হয় না যে এই লেখকের পড়াশোনা বিস্তর এবং ওই জগতে তিনি নিদ্রাহীনভাবে জাগ্রত। ক্ষুরধার ধীশক্তির কারণে তিনি পারিপার্শ্বিক পৃথিবীকে দৃষ্টিপাতমাত্র নিজের ভেতর আত্মসাৎ করতে পারেন। তাঁর মেধা প্রখর, মনন জাগ্রত এবং চিন্তাপ্রক্রিয়া আধুনিক। জ্ঞান, মেধা এবং মননের সমবায় তাঁর বৈদগ্ধ্যকে এমন এক পরিশীলিত শ্রী এবং উপভোগ্যতা দিয়েছে যার কাছাকাছি জিনিশ খুঁজে পাওয়া যাবে কেবল চিরায়ত বাংলাসাহিত্যের ভেতরেই। তাঁর প্রতিটি বাক্য পরিশীলন ও মননের উদ্ভাসে আলোকিত এবং আকণ্ঠ উপভোগ্য। শাকুরের শব্দেরা সজাগ ও গতিময়। প্যারীচাঁদ ও কালীপ্রসন্ন মানুষের আটপৌরে জীবনকে উপহার দিয়েছিলেন কৌতুক রসের চটুল তারল্যে উপস্থিত করে। রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরী ভাবের আভিজাত্যকে উপহার দিয়েছিলেন তাঁদের বর্ণাঢ্য ভাষায়, কৌতুকের মার্জিত রস সংযোজন করে। শাকুরের এলাকা একটু আলাদা। মধ্যবিত্ত জীবনের দৈনন্দিন সমস্যা ও অসহায়তাকে তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর বৈদগ্ধ্যমণ্ডিত ভাষায়। কৌতুকাশ্রিত বাংলাসাহিত্যের ধারায় এটি একটি পৃথক পদপাত।
রবীন্দ্রনাথ
রবীন্দ্রজন্মের সার্ধশতবর্ষ উপলক্ষে কলকাতা থেকে ২০১০ সালে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথকে যতটুকু জানি’-শীর্ষক আবদুশ শাকুরের সর্বশেষ গ্রন্থটি সম্পর্কে মাসিক একুশ শতকপত্রিকায় আলোচনাকালে পশ্চিমবঙ্গের সুপরিচিত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক সৌমিত্র লাহিড়ি বিবেচ্য বিষয়ে লেখকের পর্যবেক্ষণ ও উপস্থাপনের তিক্ষ্নতা ও গভীরতার উদাহরণস্বরূপ নিচের উদ্ধৃতিগুলি ব্যবহার করেছেন : “রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি সবসময়ই আকস্মিক, অনুমিত সম্ভাবনার সকল সীমারই বাইরে। অন্যদের সঙ্গে তাঁর প্রতিভার তুলনার অবকাশই নেই কোনো। কেননা অন্যরা ব্যক্তি, রবীন্দ্রনাথ পরিব্যক্তি। উদ্ভিদবিদ্যায় পরিব্যক্তি হল মিউটেশন-এর পরিভাষা। পুষ্পজগতে প্রকৃতির এমনি খেয়ালী সৃষ্টিকে বলে স্পোর্ট। যেমন পিস’-নামক ঐতিহাসিক গোলাপটির বংশধারার পরম্পরাচ্যুত এক ব্যতিক্রান্ত নিদর্শনস্বরূপ গোলাপবিশ্বে শিকাগো পিস’-নামক গোলাপটি ফুটেছে প্রকৃতির আকস্মিক খেয়ালে, তেমনি মনুষ্যবিশ্বে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও জন্মেছেন স্রষ্টার আকস্মিক খেয়ালে এবং ডিজাইনারের কপির মতো দ্বিতীয়হীন। অন্যরা প্রতিভার বরপুত্র হলে, রবীন্দ্রনাথ প্রতিভার বিশেষ সংজ্ঞা। নবনবোন্মেষশালিনী প্রজ্ঞার মানুষী মূর্তি তিনি। তাই রবীন্দ্ররহস্যের যেদিকেই তাকাই কেবল এই সত্যই দেখতে পাই যে অনৈসর্গিক এই শিল্পীর সৃজনধর্মী চিত্তবৃত্তি সর্বদাই অন্যথাচারী এবং সর্বকালেই চিত্তহারী। তাই অদ্ভুতকর্মা এই সার্বক্ষণিক শিল্পীকে এক জন্মে নয়, বহু জন্মেও নয়; এক প্রজন্মে নয়, বহু প্রজন্মেও নয়; এক শতকে নয়, বহু শতকেও নয় ; এককথায় রবীন্দ্রনাথকে সম্পূর্ণরূপে জানা হয়তো সম্ভবই নয়। তাই আমাদের কেবল পড়েই যেতে হবে তাঁর সাহিত্য, শুনেই যেতে হবে তাঁর সংগীত, দেখেই যেতে হবে তাঁর চিত্র, নিয়েই যেতে হবে তাঁর শিক্ষা, ভেবেই যেতে হবে তাঁর কথা।
সংগীত
লেখক আবদুশ শাকুর একজন গায়কও। তাই সংগীতজ্ঞ এবং উচ্চমানের সংগীতালোচক তিনি স্বাধিকারবলেই। তাঁর সংগীত সংগীত’-শীর্ষক গ্রন্থের পরিচায়ক-পত্রে প্রসিদ্ধ সংগীততাত্ত্বিক ড. করুণাময় গোস্বামী লিখেছেন : “স্বয়ং গায়ক বলে শাকুর সংগীত বিষয়টিকে একেবারে ভেতর থেকে জানেন ও বোঝেন। ক্রিয়াপরতার চমৎকারিত্ব সম্পর্কে তিনি সম্যক অবহিত। হিন্দুস্তানি ও কর্ণাটকী মিলিয়ে ভারতবর্ষের রাগসংগীতকলার যে বিপুল বিস্তার, এদের বিকাশের যে বিস্ময়কর তরঙ্গভঙ্গ সে বিষয়ে সংগীতজ্ঞ হিসেবে শাকুরের পঠনপাঠন যে গভীর তা তাঁর লেখা থেকেই বোঝা যায়। সেজন্যে সংগীতের ক্ষেত্রে উপমহাদেশের যাবতীয় অর্জনকে তিনি ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করতে পারেন। যেহেতু গায়ক, কণ্ঠসংগীতে শাকুরের আগ্রহ প্রবল। তবে যন্ত্রকে ঘিরেও তাঁর রসপিপাসায় কমতি নেই। বাংলায় সংগীতালোচনার একাধিক রীতির উল্লেখ করা যায়। অমিয়নাথ সান্যালের একটি রীতি, যে-আলোচনারীতিতে সংগীত যেন একটি অনুভবনীয়, দর্শনীয় ও স্পর্শনীয় বিষয়ে পরিণত হয়। আরেকটি রীতি জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ ও কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের। ওঁদের ঢঙটি মজলিশি, গভীরে প্রবেশ করার চেয়ে জমিয়ে তোলার চেষ্টা বেশি। তৃতীয় রীতির প্রতিষ্ঠাতা রবীন্দ্রনাথ। দিলীপকুমার রায় ও ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁদের মতো করে রাবীন্দ্রিক রীতির অনুসরণ করেন এবং এই মহা তিনের প্রয়াসে তাঁদের ধরনের সংগীতালোচনার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে ওঠে। এই রীতির মূলে আছে শ্রবণেন্দ্রিয়কে অন্তরেন্দ্রিয়ের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া, পর্যবেক্ষণকে দর্শনচিন্তায় উজ্জ্বল করে তোলা, সংগীতের বিবর্তনকে সমাজবিবর্তনের সূত্র দিয়ে গ্রথিত করা। সংগীতালোচক আবদুশ শাকুর এ বিষয়টি অনিবার্যভাবে মনে করিয়ে দেন। অতি অল্প যে কয়েকজন বাঙালি সংগীতালোচক এই ধারাটিকে সফলভাবে বহন করে চলেছেন শাকুর তাঁদের অন্যতম। হিন্দুস্তানি গুরু ও লঘু সংগীতের রসে আবদুশ শাকুরের হৃদয় নিত্য সিঞ্চিত। বাংলা নাগরিক গান হিন্দুস্তানি গানের বৃত্তে থেকেও ঈষৎ পৃথক। এই পার্থক্যের স্বরূপ যে কি, আবদুশ শাকুর তা গভীরভাবে বোঝেন। নিজে যেহেতু গেয়ে, শুনে ও ভেবে কথা বলেন, বাংলা গান সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য গড়পড়তা কথাবার্তা থেকে খানিক পৃথক শোনায়। তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণকে যুক্তি ও নান্দনিক চেতনার আলোকে প্রতিষ্ঠিত করতে জানেন। আবদুশ শাকুর রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ ও নজরুলের সংগীত রচনার রীতি প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এঁদের গান নিয়ে আলোচনা যা কিছু হয়েছে তা যে যথেষ্ট নয় সে কথা বলাই বাহুল্য। রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে অনেক সন্দর্ভ রচিত হয়েছে, এর বাইরেও বই লেখা হয়েছে অনেক। মানের বিবেচনায় কিছু কাজ চমৎকার হয়ে উঠেছে। সে তুলনায় নজরুলের গান নিয়ে লেখা হয়েছে অনেক কম, মানের বিবেচনায় উত্তীর্ণ কাজ একেবারেই কম। আবদুশ শাকুর যে নজরুল সংগীতালোচনায় অভিনিবিষ্ট হয়েছেন এতে সংগীতামোদীদের বিশেষ প্রাপ্তিযোগ ঘটবে সন্দেহ নেই। বাংলা গানের বিকাশে নজরুলের অবদান সম্পর্কে শাকুরের বিবেচনা তাঁদের জন্যে অপরিহার্য পাঠ্য বিষয় হয়ে উঠবে। সাহিত্য রচনায় ও সাহিত্যলোচনায় তাঁর অর্জন অতি উচ্চ মানের। শাকুরের সাহিত্যবোধস্পৃষ্ট সংগীতালোচনা এমন মনোহর হয়ে ওঠে যে, মুগ্ধ হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। সংগীতালোচক যদি স্বয়ং গায়ক, সংগীতজ্ঞ ও সাহিত্যরচয়িতা হন এবং তাঁর যদি কলাবিদ্যার নানা শাখায় অধিকার থাকে, তাহলে তাঁর আলোচনায় যে মহাকাণ্ডটি ঘটা সম্ভব, আবদুশ শাকুরের সংগীতালোচনায় সেটিই ঘটেছে।
গোলাপ
কলকাতার স্বনামধন্য পত্রিকা প্রতিক্ষণ১৯৮৭ সালের এক সংখ্যায় আবদুশ শাকুরের গোলাপ বিসংবাদগ্রন্থটি আলোচনাকালে লিখেছে : “জ্ঞাত ইতিহাসে গোলাপের আবির্ভাবের মুহূর্তটি থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে কীভাবে আজকের বাগানশোভা পুষ্পরানি এতসব প্রকারে রূপান্তরিত হল তারই এক জ্ঞানগর্ভ অথচ মনোজ্ঞ আলোচনা রয়েছে এতে। লেখক মানুষকে আর গোলাপকে সুদীর্ঘ পথ পাশাপাশি হাঁটিয়ে নিয়ে গিয়েছেন তাঁর রসমণ্ডিত গল্পকথনে সম্মোহিত করে। অন্তে যোজিত গোলাপ নিয়ে সমাজতাত্ত্বিক বাহাসটি একান্তই অভিনব, তবে অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
গোলাপকে কেন্দ্রীয় চরিত্ররূপে পাওয়া যায় তাঁর কোনো কোনো গল্প এবং প্রবন্ধেও। কারণ গোলাপের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেবল পাঠের নয়, চাষেরও। তাঁর বাংলোর লনে এবং ছাদের বাগানে ৩৫০ প্রকার গোলাপের ৭৫০টি গুল্ম স্বহস্তে লালন করে তিনি লন রোজ গার্ডেন’-শ্রেণিতে দেশের বছর-সেরা গোলাপবাগান-লালকের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ জাতীয় গোলাপ সমিতির স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন ১৯৮৯ সালে।
দেশের শ্রেষ্ঠ নিসর্গবিদ, দ্বিজেন শর্মা আবদুশ শাকুরের গোলাপ বিষয়ক রচনাসংগ্রহের পরিচায়ক-পত্রে লিখেছেন : “সাহিত্যিকের এ এক অসাধারণ বিজ্ঞানলেখা। শাকুর গোলাপের অধরা মাধুরী ধরেছেন অনবদ্য এক ছন্দোবন্ধনে। এক তথ্যবহুল সাক্ষাতকারে পুষ্পোৎপাদনবিদ এই কথাসাহিত্যিক সাক্ষাতকারী কবি বেলাল চৌধুরীকে অনেক মনোহারী বিজ্ঞান-সংবাদ দিয়েছেন যা প্রথমে তাঁর সন্দ্বীপ’-শীর্ষক সাময়িকীতে এবং পরে আলোচ্য গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। এতে রয়েছে গোলাপ আর বুনোগোলাপ ছাড়াও বেশ কিছু বর্ষজীবী, দ্বিবর্ষজীবী, চিরজীবী পুষ্প সম্পর্কে অনেক চমকপ্রদ কথা এবং বাংলাদেশের জাতীয় ফুল ও জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। নির্দ্বিধায় বলা যায় বাংলাদেশের প্রকৃতিসাহিত্যে গোলাপপ্রেমী কথাশিল্পী আবদুশ শাকুরের গোলাপবিষয়ক যাবতীয় রচনা বাংলা সাহিত্যে মূল্যবান অবদান হয়ে থাকবে এবং প্রকৃতিবিপর্যয়ের এই দুঃসময়ে লেখক দীর্ঘদিন বাঙালির কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা কুড়াবেন।

প্রকাশিত গ্রন্থাবলী

উপন্যাস
·         সহে না চেতনা
·         ভালোবাসা
·         উত্তর-দক্ষিণ সংলাপ
·         সংলাপ
·         ক্রাইসিস
ছোটগল্প
·         শারীর
·         গল্পসমগ্র
·         নির্বাচিত গল্প
·         আক্কেলগুড়ুম (কিশোর গল্পগ্রন্থ)
·         আঘাত
·         ক্ষীয়মাণ
·         এপিটাফ
·         ধস
·         বিচলিত প্রার্থনা
·         শ্রেষ্ঠ গল্প : আবদুশ শাকুর (জাকির তালুকদার সম্পাদিত)
রম্যরচনা
·         ভেজাল বাঙালি
·         নির্বাচিত কড়চা
·         মধ্যবিত্তের কড়চা
·         চুয়াত্তরের কড়চা
·         আবদুশ শাকুরের কড়চা
·         সেরা রম্যরচনা : আবদুশ শাকুর (আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত)
·         রম্যসমগ্র
গবেষণামূলক
·         গোলাপসংগ্রহ (পুষ্পবিষয়ক)
·         বাঙালির মুক্তির গান (দেশাত্মবোধক গান সম্পর্কে)
·         সংগীত সংগীত (সংগীতবিষয়ক)
·         মহান শ্রোতা (সংগীতবিষয়ক)
·         মহামহিম রবীন্দ্রনাথ (রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক)
·         পরম্পরাহীন রবীন্দ্রনাথ (রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক)
·         রবীন্দ্রনাথকে যতটুকু জানি (রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক)
·         চিরনতুন রবীন্দ্রনাথ(রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক)
·         গোলাপনামা(পুষ্পবিষয়ক)
প্রবন্ধ
·         মহামহিম রবীন্দ্রনাথ
·         আবদুশ শাকুরের শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ
·         ভাষা ও সাহিত্য
·         পরম্পরাহীন রবীন্দ্রনাথ
·         সংগীতবিচিত্রা
·         নির্বাচিত প্রবন্ধ
·         সমাজ ও সমাজবিজ্ঞান
·         সঙ্গীত সংবিৎ (সংগীত গবেষণামূলক)
·         হিন্দুস্তানি যন্ত্রসংগীতের পঞ্চপ্রদীপ
·         রসিক বাঙালি
·         মহান শ্রোতা (শাস্ত্রীয় সংগীতচর্চামূলক)
·         সাংগীতিক সাক্ষরতা
·         মহাগদ্যকবি রবীন্দ্রনাথ
·         স্বর, সুর, শব্দ ও সংগীত
·         শ্রোতার কৈফিয়ত (সংগীত গবেষণামূলক)
আত্মজীবনী
·         কাঁটাতে গোলাপও থাকে(প্রথম খণ্ড)
·         কাঁটাতে গোলাপও থাকে(দ্বিতীয় খণ্ড)
·         কাঁটাতে গোলাপও থাকে (তৃতীয় খণ্ড)
প্রহসন
·         দুটি প্রহসন (ঝামেলা ও টোটকা)
সম্পাদিত গ্রন্থাবলী
(আবদুশ শাকুর সম্পাদিত ও তাঁর বিস্তারিত ভূমিকা সংবলিত এবং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র কর্তৃক প্রকাশিত গ্রন্থাবলী )
·         বাংলাসাহিত্যের নির্বাচিত রমণীয় রচনা (প্রথম খণ্ড)
·         বাংলাসাহিত্যের নির্বাচিত রমণীয় রচনা (দ্বিতীয় খণ্ড)
·         বাংলাসাহিত্যের নির্বাচিত রম্যরচনা ও গল্প (প্রথম খণ্ড)
·         বাংলাসাহিত্যের নির্বাচিত রম্যরচনা ও গল্প (দ্বিতীয় খণ্ড)
·         পরশুরামের সেরা হাসির গল্প
·         আসহাব উদ্দীন আহমদ : সেরা রম্যরচনা
·         অমিয়নাথ সান্যাল : স্মৃতির অতলে (রাগসংগীত বিষয়ক প্রবন্ধ)
·         ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় : সেরা রম্যগল্প
·         নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় : সেরা রম্যরচনা
·         সৈয়দ মুজতবা আলী : সেরা রম্যরচনা
·         সৈয়দ মুজতবা আলী : শ্রেষ্ঠ গল্প
·         সৈয়দ মুজতবা আলী : শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ
·         মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী
·         রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : আত্মপরিচয়
·         পরশুরামের শ্রেষ্ঠ গল্প
·         শিবরাম চক্রবর্তীর শ্রেষ্ঠ গল্প
·         শিবরাম চক্রবর্তীর মজার গল্প
·         নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠগল্প
·         হাস্যশিল্পী সুকুমার রায়
পুরস্কার
·         বাংলা একাডেমী পুরস্কার ১৯৭৯ [বাংলাদেশ]
·         অমিয়ভূষণ পুরস্কার ২০০৩ [পশ্চিমবঙ্গ, ভারত]
·         প্রথম আলো বর্ষসেরা বই পুরস্কার ২০০৪ [ঢাকা]
·         অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার ২০০৮ [ঢাকা]




আবদুশ শাকুরের গল্প


ঘোর


আবদুশ শাকুর


বেরুনোর মুখে মায়ের চোখের স্থিরদৃষ্টির মুখোমুখি এক যুগ তাকিয়ে থাকল ইশরাতঅতঃপর মুখ খুলল :
আমি তোমাদের সৃষ্টি ঠিকইতবে ঘটনাচক্রে। সুতরাং আমার ওপর কর্তৃত্ব করতে চেও না।
তার মানে?’
মানে তোমাদের চান্স-মিটিংয়ের ফসল আমি - 
তার মানে?’
মানেটা গভীরনিগূঢ় -
তবু আমার জানতে হবে - এত বড় একটা আদেশ দিয়ে ফেললি যখন।প্যানপ্যানে মা পেছনে লেগেই পড়েছেন যখন মেয়ের শেষ কথাটা আজ তাঁকে শুনতেই হবে। কুপিতা কন্যার শেষ কথাটি ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত :
মানেটা হচ্ছে - তোমাদের দুজনেরই যার যার সঙ্গে প্রেম ছিল তাদের সঙ্গে বিয়ে হলে সে-মিলনের সন্তান আমি হতাম না। সে অর্থে আমি তোমাদের পালিতা কন্যামাত্র। ভালোভাবে পালিতাও নই। তোমার হা পুত্র! হা পুত্র!’-ব্যারামের ঘোরে আমি এক উপেক্ষিতা কন্যামাত্র। অতএব আমার ওপর মালিকানা ফলাতে যেও না।
মালিকানা ফলাতে চাইলে তোকে ওই ঘরটিতে তালাবন্ধ করে রেখে দিতাম,সিনেমার মতো। কিন্তু এখন এটুকু তো অন্তত জানতে হবে - আমরা কখনো জন্মনিয়ন্ত্রণ করিনিতাহলে তৃতীয় সন্তান তুই আমাদের আকস্মিক মিলনের ফসল হলি কীভাবে?’
আকস্মিকমানে ঘটনাক্রমিক’ আরকি। তোমাদের এই তৃতীয় সন্তানটি কি আমি হতামতোমার মিলনটা খালেদ আংকেলের সঙ্গে হলেকিংবা বোরহান আংকেলের সঙ্গে হলেযাদের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিলবিয়ের সম্ভাবনাও সৃষ্টি হয়েছিল বলে বান্ধবীদের সঙ্গে গল্প করেছিলে?’
অন্যদের সঙ্গে বিয়ের সম্ভাবনা কি শুধু আমার জীবনেই সৃষ্টি হয়েছিলতোর বাবার জীবনে হয়নি?’





যেভাবে লেখা হল আমার গোলাপ বিসংবাদ

বিচিত্র বোধ হলেও ব্যাপারটা হুবহু এমনটিই ঘটেছিল। আরামবাগের প্যাপিরাস প্রেসের কর্ণধার তরুণ সাহিত্যপ্রেমী হেলালের অকালপ্রয়াণের বছর, ১৯৮৫ সালে, তাঁর টেবিলে আমি প্রথম দেখি মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার একেবারে প্রথম দিককার কোনো একটি কপি। বিশেষভাবে বীতশ্রদ্ধ বোধ করি নামটি দেখে। ধরেই নিয়েছিলাম যে পত্রিকাবান মীজানুর রহমান ছোকরাটা একটু বেশি ফাজিলই হবে। এমনিতেও প্রথম দর্শনে লিটলম্যাগ সাধারণত আমাকে আকর্ষণের চেয়ে বিকর্ষণই করে বেশি। দোষটা সম্ভবত আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার দৈন্যের। বেশিরভাগ ছোটকাগজকে ছোটপ্রতিভার ফসলরূপেই পেয়েছি আমি। কেউ হয়তো বড়র সাধ্যের অভাবেই ছোটতে সাধ মেটান। তবু শিল্পসাহিত্যের ভুবনে নবঅবদান যোজনের দেমাকও দেখান। পল্লবগ্রাহী পাণ্ডিত্যের আকর এসব কাগজের লেখকগণ সারবান পণ্ডিতদের প্রতি কৃপাবর্ষণের পুলকে দলেবলে মজে থাকেন। সে যাক। ইতোমধ্যে পত্রিকাটি আদ্যোপান্ত একবার উল্টিয়েই আমার মনের ভুলটা শুধরে গেল- না, এ-সম্পাদক আর যা-ই হন, অপরিপক্ক নন।
কিন্তু তাই বলে তাঁর প্রতিটি চুলই যে সুপরিপক্ক, তেমন ধারণাও আমার মনের কোনো সীমানাতেই ছিল না- আমার বাসার গেটের ওপর দিয়ে তাঁর তুষারশুভ্র মস্তকের জমজমাট পলিতকেশগুচ্ছ স্বচক্ষে দেখা পর্যন্ত। ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার দুনম্বর রোডের সরকারি বাংলোর বারান্দায় বসে এক বিকেলে আমার নয়নাভিরাম গোলাপবাগানটির উপর চোখ মেলে দিয়ে ক্লান্তিমোচন করছিলাম। ক্লান্তি ছিল দুটি খাত থেকে প্রবাহিত। প্রথমটি ছিল বছরের প্রথম সংসদ অধিবেশন অনুষ্ঠানের প্রশাসনিক ঝামেলাজনিত, আমি ছিলাম জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের যুগ্মসচিব। দ্বিতীয়টি ছিল ফুলের ভরা মৌসুমে সামগ্রিক ট্রিটমেন্টের জন্যে গোটা উদ্যানটির নিবিড় জরিপঘটিত ক্লিষ্টতাজনিত।
অনভিপ্রেত হলেও আমার প্রথম আচারণটিই ছিল জনৈক বুজর্গের প্রতি একান্ত অশোভন। উঠে গিয়ে গেট খুলে দেবার বদলে বসে থেকে গলাবাজি করলাম :
খোলা আছে, চলে আসুন।
চলে এসেই আগন্তুক বললেন :
আমি মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার সম্পাদক মীজানুর রহমান।
শুনেই ভিরমি খেলাম। মুখোমুখি চেয়ারে বসা আমার কল্পনার ফাজিল ছোকরাটার আবক্ষমস্তক দেহখানি- কমিয়ে বললে, বিজ্ঞতার বিজ্ঞাপন; বাড়িয়ে বললে চিত্তাকর্ষক ভাস্কর্য। ভদ্রলোককে একনজর দেখেই মনে হল তাঁর চুলগুলি, প্রত্যয়ী বৃদ্ধের ভাষায়, হাওয়ার বলে পাকেনি- বিনয়ী শিষ্যের ভাষায়, চর্চার বলে পেকেছে। সে যাক। বসেই তিনি বিনা ভূমিকায় বললেন :
আমি এসেছি আমার পত্রিকাটির জন্য আপনার কাছে গোলাপ বিষয়ে একটি লেখা চাইতে।
বললাম :
এ পর্যন্ত গোলাপবিষয়টি আমি কেবল পড়ছি। অবশ্য কিছু গোলাপ হাতেও ফোটাচ্ছি। তবে লেখার স্তরে পৌঁছাতে এখনও অনেক দেরি।
হতাশ হয়ে সম্পাদক যেন নিজেকেই বললেন :
এই একটি লেখার জন্যেই আটকে আছে আমার চার শতাধিক পৃষ্ঠার বৃক্ষ-সংখ্যাটি।
বলতে বাধ্য হলাম :
তবে তো লেখাটি আপনাকে অন্য কারো কাছ থেকে নিতে হবে।
বললেন :
দুজনের কাছে চাইবো ভেবেছিলাম। কিন্তু নাম শুনে বিজ্ঞগণ বারণ করলেন এবং পাঠিয়ে দিলেন আপনার কাছে।
বললাম :
তাঁরা কেবল চোখকলমের গোলাপ ফোটানোটাই দেখেছেন আমার। বিশ্বের একনম্বর হবিপ্লান্টের উপর কলম ঘোরানোর অক্ষমতাটা আঁচ করেননি।
তবু এ-বিষয়ে আপনার একটা লেখার কোনো বিকল্পই যে জানা নেই এ মুহূর্তে আমার।
বললাম :
যদি লিখতে পারি কখনো, প্রকাশনার জন্য প্রথমে আপনার পত্রিকারই দ্বারস্থ হব। এর বেশি আমারও এ-মুহূর্তে আর কিছুই বলার নেই।
দৈহিক ক্লান্তি নিয়েই তিনি আমার গৃহে আগমন করেছিলেন, নির্গমন করলেন তার সঙ্গে মানসিক ক্লান্তিও বাড়িয়ে। বিশ্রাম নিতেই হয়তো দুটি বাড়ির পরের বাড়ি ভারতীয় হাইকমিশনের ভারত বিচিত্রার সম্পাদক কবি বেলাল চৌধুরীর রুমে ঢুকে পড়েছিলেন মীজানভাই সেদিন। ঘটনাটা অনেক পরে আমি তাঁরই জবানি জানতে পারি। আমার সঙ্গে তাঁর নেতিধর্মী অভিজ্ঞতাটার বিবরণ শুনে বেলাল চৌধুরীও পূর্বোক্ত বিজ্ঞজনদের মতোই বলেছিলেন :
একেবারে সঠিক ঠিকানায় হানা দিয়েছেন। লেগে থেকে বসিয়ে দিতে পারলে আপনার মতো হার্ড টাস্কমাস্টারকেও পুরোপুরিই পুষিয়ে দেবেন তিনি। আমার অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে কখনো তাঁর বাগানে থেমে কখনো বারান্দায় বসে আলাপচারিতায় গোলাপ সম্বন্ধে তাঁর নিজস্ব উপলব্ধিসঞ্জাত যেসব ব্যাপক গভীর চিন্তাভাবনার প্রসাদ পাই, তা থেকেই এ ব্যাপারে আমি একেবারেই নিশ্চিত হতে পারি।
কিন্তু তিনি নিজে তো নিশ্চিত নন।
তার কারণ তিনিও আপনার মতোই টাফ কাস্টমার, বরং আরেক কাঠি বেশি।
অতএব লেগেই থাকলেন মীজানভাই। থাকতে অসুবিধেও ছিল না কোনো। কারণ আমার ধানমন্ডি ২ নম্বর রোডের বাসাটা ছিল তাঁর সাতমসজিদ রোডের পেছনের ধানমন্ডি ৯/এ-র বাসা থেকে হাটখোলার প্রেসে আসা-যাওয়ার পথের ধারে। এ-পর্যায়ে আমার ঘরের ভেতরেও সম্পাদকের পক্ষ নিলেন একজন, আমার স্ত্রী :
এত প্রবীণ একজন সম্পাদককে এতবার না-বলা ঠিক হচ্ছে না। বসে পড়লেই লেখা এসে পড়ে- এ আমার অনেকবারই দেখা আছে।
তবু অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গেই প্রবীণ সম্পাদককে শেষবারের মতো বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম যে, আমি সাহিত্যশিল্পী নই, সাহিত্যশ্রমিক। আরো জানিয়েছিলাম যে, আমার এ মাসের পুরো শ্রমটাই বুক হয়ে আছে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সার্বক্ষণিক কাজে, যেখানে এ মুহূর্তে সংসদের শীতকালীন অধিবেশন চলমান এবং আমি তার সাচিবিক দায়িত্বের পিভটাল অফিসার।
সম্পাদক বললেন :
সাবর্ক্ষণিক কাজে ফুরিয়ে যাওয়া অফিসারটির নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করার সাময়িক বিরতিগুলিতে অফিসে বসেই না-হয় একটু একটু করে লিখবেন।
তাঁর প্রস্তাবটা শুনে পত্নীর পরামর্শটাও মনে পড়ল।
বললাম :
একটু একটু করে নেবেন লেখাটা?
সানন্দে।
তাহলে পরশু আসুন।
এলেন। তিনটি স্লিপ দিয়ে বললাম :
পরশু আসুন।
এলেন এবং আরো তিনটি স্লিপ পেলেন। এমনি আরো দু কিস্তি নেবার পরের তারিখে এসে মীজানভাই বললেন :
এভাবে আর নেব না। একবার এসে সবটুকু একসঙ্গে নিয়ে যাব।
আঁৎকে উঠে জানতে চাইলাম :
কবে?
যবে লেখাটা শেষ হবে।
কতটুকু হলে চলবে?
যেভাবে লিখছেন, এভাবে লেখাটা যতটুকু গিয়ে শেষ হয়।
বিভ্রান্ত হয়ে বললাম :
মানে?
মানে আপনার কলম যেখানে গিয়ে থামে। জানালেই এসে বাকি লেখাটা আমি একসঙ্গে নিয়ে যাব।
বিব্রত হয়ে বললাম :
মীজানসাহেব! আন্তরিকতা সত্ত্বেও এর চেয়ে তাড়াতাড়ি কিছু লিখে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
না, না, শাকুরসাহেব, আমাকে ভুল বুঝবেন না। এ-রচনা যত দীর্ঘ হতে চায়, হোক। যত সময় নিতে চায়, নিক। আমি স্টপ প্রেস করে ওদের মেশিনে অন্য ম্যাটার তোলার অনুমতি দিয়ে দিয়েছি।
অভিভূত হয়ে আমি শুধু বলে উঠলাম :
কিন্তু বিশাল বৃক্ষ-সংখ্যাটির বিজ্ঞাপন?
মীজানভাই বললেন :
বড় বিজ্ঞাপন কিছু হারাব। ত্রৈমাসিকটির দুটি সংখ্যাও যুক্ত হয়ে একটি হয়ে যাবে। তবু সবই পুষিয়ে যাবে এ-লেখাটা পরিপূর্ণরূপে ছাপতে পারলে।
শুনে আমি বাক্যহারা হয়ে কেবলি ভাবছিলাম- তাহলে এ যুগেও এমন রসপwÐত একজন সম্পাদক আছেন যিনি এমন সমঝদার একটি পত্রিকার কাছে আপসহীনভাবে দায়বদ্ধ থাকেন। শ্রদ্ধাভরে বিনীতভাবে আমি কেবল জানতে চাইলাম :
লেখাটা কি এতই ভালো লাগছে আপনার?
শুধু আমার নয়, রচনাটা অসাধারণ বোধ হচ্ছে আমার পত্রিকার মুদ্রক, লেটারপ্রেসটির মালিক, সুপাঠক তরুণকুমার মহলানবিশেরও (যিনি পরবর্তীকালে প্রুফরিডার হিসেবে খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করেছেন)।
সে যাক। মীজানভাই পরিপূর্ণরূপেই ছেপেছিলেন তাঁর পত্রিকার ক্ষুদ্র হরফে আমার ৫৫ পৃষ্ঠা দীর্ঘ লেখাটা- রঙিন একটি আলাদা অনুপ্রচ্ছদ দিয়ে। যাতে কেউ চাইলে, রচনাটা প্রচ্ছদটিসহ বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে সুন্দরভাবে সংরক্ষণ করতে পারে। সম্পাদক প্রচ্ছদটির বিপরীত পৃষ্ঠায়, অর্থাৎ আখ্যানপত্রে, সোয়েডিশ বটানিস্ট কার্ল ভন লিনিয়াসের চমৎকার একটি ছবিও জুড়ে দিয়েছিলেন, যিনি জিনাস এবং স্পিশিস-এর ল্যাটিন নাম দিয়ে উদ্ভিদের শ্রেণী নির্দিষ্টকরণ প্রথাটির জনক। এই হল মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার অক্টোবর ১৯৮৬/ডিসেম্বর ৮৬ বৃক্ষ সংখ্যাটির জানুয়ারি ১৯৮৭/মার্চ ১৯৮৭ সংখ্যাটির সঙ্গে জুড়ে গিয়ে যুগ্মসংখ্যা হয়ে বেরুবার নেপথ্যকাহিনী।
গোলাপ বিসংবাদ-নামক আমার সে-রচনাটির অর্জিত অনেক খ্যাতির কথাই মীজানভাই তাঁর ব্যক্তিগত আনন্দের ভাগ দেবার খেয়ালে সময় সময় আমাকেও বলতেন। যেমন মস্কোবাসী নিসর্গকৃষ্ণ দ্বিজেন শর্মার লিখিতপত্রজনিত আনন্দ এবং কলকাতার প্রতিক্ষণ পত্রিকার প্রতিবেদনপ্রদত্ত আনন্দ। লেখাটিকে ভিত্তি করে প্রকাশিত আমার গোলাপসংগ্রহ ১৪১০ সনের বর্ষসেরা মননশীল গ্রন্থ হিসেবে প্রথম আলো কর্তৃক পুরস্কৃত হলে সবচেয়ে বেশি খুশি হন মীজানভাই এবং সঙ্গত কারণেই। বইটির উৎসর্গও আমি তাঁকেই করেছি এবং উৎসর্গপত্রে তাঁর সম্পর্কে কেবল সত্য কথাটাই লিখেছি : যিনি এই গোলপলালককে গোলাপলেখক বানিয়েছেন। উৎসর্গপত্রটি পড়ে মীজানভাই বলেছিলেন :
আমার ভাগ্যে উৎসর্গিত বই অনেকই জুটেছে। তবে এটি অমূল্য।
আর দ্বিজেনদা বলেছিলেন :
তোমার গোলাপসংগ্রহ মীজানকে উৎসর্গ করে তার চেয়ে বেশি খুশি করেছ তুমি আমাকে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ