শুক্রবার, ৩ মে, ২০১৩

মাধুরী দীক্ষিতের রূপ

অমর মিত্র
আলপনা জিজ্ঞেস করে, ওই লোকটার কি কোনও ক্লেইম আছে এই অফিসে ? বিমল পাল ঘাড় বাঁকিয়ে দেখল ঘরের বাইরে দাঁড়ানো লোকটাকে, মাথা দুলিয়ে বলল, ও তো নগেন নস্কর, ওর নামে একটা ফাইল ছিল, হ্যাঁ ওর একটা ক্লেইমও ছিল।
কী হল সেই ফাইল ?
আছে অফিসে, বলে বিমল পাল ঘুরে বসে, তোমার কী, যে ফাইল তোমার নয় তা নিয়ে কৌতূহল দেখাও কেন ?

বিমল পাল পঞ্চাশের উপর। আলপনা সবে পঁচিশ। সে এই আশ্চর্য অফিসে এসেছে ছ’মাস। তার চাকরিও ছ’মাসের। এই ছ’মাস ধরে দেখছে লোকটা আসছে। এসেই যাচ্ছে। প্রায় নিয়ম করে সপ্তাহে দু’দিন। মাথায় ফুট পাঁচেকের সামান্য বেশি। শীর্ণকায় মানুষটি ময়লা ধুতি, ময়লা শার্ট, ছেঁড়া চাদর আর হাওয়াই চটি নিয়ে একেবারে বিপন্ন মফস্‌সলি। প্রায়ই আসে, কিন্তু সংকোচ যায় না। একটু ঝুঁকে প্রায় জোড় হাতে এই টেবিল, ওই টেবিল, বড়বাবু, মেজবাবু কার কাছে না যায়! সেই ছ’মাস আগে আলপনা যখন নতুন নিয়োগপত্র নিয়ে এই অফিসে প্রবেশ করে, তখনই যেন এই ঘরে বিমল পালের সামনে দেখেছিল মানুষটিকে। তখন ছিল বর্ষার দিন। একদিন দেখেছিল বর্ষায় ভিজে স্নান করে এসেছে লোকটি। ভিজে জামাকাপড় শুকোচ্ছে পাখার তলায় দাঁড়িয়ে। সবাই দেখছে, কিন্তু কেউ গ্রাহ্য করছে না।
বিমল পাল জিজ্ঞেস করে, গজগামিনী দেখলে ? হে মাধুরী।
বিমল পাল কেন, আলপনার প্রেমিক অর্কও তো বলে আলপনার চোখ, হাসিতে মাধুরী দীক্ষিতের ছায়া। সেই রূপবতীকে আচমকা মনে পড়ে যায় নাকি আলপনার সঙ্গে কথা বলতে বলতে। আলপনা আজ আর ওই কথায় সাড়া দিল না। সে আন্দাজ করতে চাইছিল কত বয়স হতে পারে মানুষটার ? পঞ্চাশ, ষাট নাকি তার বেশি। বোঝা যায় না। অকালবার্ধক্য এসে ঘিরেছে ওই নগেন নস্করকে।
বিমল পাল সাড়া না পেয়ে বলল, তুমি নিশ্চয়ই ওই ফাইলের কথা ভাবছ। ওটা ছিল অলক মুখুজ্যের কেস। ও বদলি হয়ে যেতে ক’দিন আমাকে দিয়েছিল, এখন আর মুভমেন্ট নেই।
ছ’মাস ধরে দেখছি লোকটাকে।
হাসে বিমল পাল, তার আগে আরও ছ’বছর আছে।
ছ’বছর! আলপনা হিসেব কষে, ছ’বছর আগে তার উনিশ। বি এ ফার্স্ট ইয়ার। তার সেই আনন্দের দিন থেকে মুখ অন্ধকার করে ঘুরছে লোকটা। তারপর এখানেই বাঁধা পড়ে গেল। বিমল পাল বলছে, লোকটা শুধু শুধু আসে, কিছুই পাবে না।
আলপনা দেখছে ভিজিটরস বেঞ্চে পা গুটিয়ে নিথর হয়ে বসে আছে লোকটা। দেখে মনে হয় কারও জন্য অপেক্ষা করছে। অলক মুখার্জি কি ? যিনি বদলি হয়ে গেছেন, ফাইলটা নিয়ে ঘেঁটে দেখলে হয় কী আছে। শুধু শুধু ঘুরবে কেন লোকটা ? ওই যে লোকটা ঘাড় উঁচু করে জেগে উঠেছে যেন। চঞ্চল হয়ে পড়েছে। আশ্চর্য তাকেই দেখছে।
আলপনা টেবিলের অন্ধকার কাচে নিজের মুখ দেখতে লাগল। কী সুন্দর মুখখানি, অন্ধকারে চোখের তারা জ্বলজ্বল করছে। লোকটা যেন তাকে দেখছে। অপ্রয়োজনেও তো সুন্দর মুখ দেখে মানুষ। আলপনা নিজের হাসি দেখছিল অন্ধকার আয়নায়।
আচ্ছা, ও কি টের পেয়েছে আলপনা শুধু ওর কথাই ভাবছে। আলপনা উঠে পড়ল। ঘর থেকে বেরিয়ে লোকটাকে পার হয়ে ডান দিকে চলে গেল বড়বাবু নিমাই হালদারের কাছে। আলপনা রূপবতী। কমবয়সী। আলপনা গিয়ে দাঁড়ালে বছর পঁয়তাল্লিশের বড়বাবু নিমাই হালদার উঠে দাঁড়ান। কী ব্যাপার ম্যাডাম, ডেকে পাঠালেই পারতেন।
আলপনা বলল, ওই যে লোকটা, নগেন নস্কর না কী নাম যেন, ওর ফাইলটা কোথায় বড়বাবু?
নিমাই হালদার মাথা নাড়তে থাকে। কিস্যু করার নেই, পারুলদহ গ্রামের সিমেন্ট কারখানায় ওর জমি গেছে বলছে, কিন্তু জমি তো আসলে ওর নয়।
খুলে বলুন দেখি।
সব জানতেন অলক মুখার্জি সাহেব। তাঁরই কেস ছিল ওটা।
ফাইলটার অবস্থা কী ?
ফাইলে মাঝে মধ্যে ওই নগেন নস্করের পিটিশন এসে জমা হয়, একটা এনকোয়ারি রিপোর্টও আছে, ওর ফেভারে নেই, কী করা যাবে, জমি তো সরকারি খাস, ও দখল করে ছিল।
আলপনা উঠে পড়ল, আপনি ফাইলটা পাঠাবেন, একটু দেখব, যদি কিছু করা যায়।
আলপনা ফিরে এল নিজের চেয়ারে। দেখল লোকটা নেই কাছে পিঠে। তখন বিমল পাল আবার বলল, নগেন নস্কর নিয়ে মাথা ঘামিও না। আসলে অলক মুখার্জিই ঘটনাটা পাকিয়ে গেছে। ও বলেছিল তিন লাখ পাইয়ে দেবে, কিন্তু আইনে তা সম্ভব নয়।
কেন বলেছিল, আশ্চর্য!
বিমল পাল সিগারেটে আগুন দিতে দিতে বলল, তখন দরকার পড়েছিল, অলক মুখার্জি খুব এফিসিয়েন্ট অফিসার। সিমেন্ট ফ্যাক্টরির জন্য প্রায় একশো বিঘে জমি নিতে হয়েছিল, তার ভিতরে ওর ছিল বিঘে দেড়েক। জমি পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সব দো-ফসলি চাষের জমি, চাষিরা রুখে দাঁড়িয়েছিল, সেই সময় ওই নগেন নস্কর ছিল ভরসা।
আলপনা শুনছিল বিমল পালের কথা। শুনতে শুনতে বাইরে তাকিয়ে দেখে, আধো অন্ধকারে লোকটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। চলে যায়নি তা হলে। অদ্ভুত! আলপনার আবার মনে হল লোকটা টের পেয়েছে তাকে নিয়ে ভাবা হচ্ছে এই অফিসে।
বিমল পাল বলছিল, গাঁয়ের লোক যখন একজোট হয়ে জমি রক্ষার জন্য রুখে দাঁড়াল, কেউ ক্ষতিপূরণ নিয়ে জমি ছাড়বে না বলে পণ করেছে, তখন দরকার ছিল ওই জোট ভাঙা। দু-একজনের হাতে টাকা তুলে দেওয়া, আর সেইটা ফলাও করে প্রচার করে দেওয়া। একজন লোকও যদি টাকা না নেয় তবে জমির দখল নিতে পারা যাবে না। সেই সময় অলক মুখার্জি খুঁজে বের করেছিল নগেন নস্করকে। ওই দেড় বিঘে সরকারি জমি বাদে নিজের তিন কাঠার একটা বাস্তুভিটে ছিল লোকটার। তার দাম হল হাজার কুড়ির মতো। সেই টাকা নিল নগেন, সেই প্রথম ব্যক্তি যে ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করল, আসলে ওকে বলা হয়েছিল দেড় বিঘের জন্য তিন লাখ টাকা, আর ফ্যাক্টরিতে ছেলের চাকরি — লোভে পড়ে ও আমাদের হয়ে দালালি করেছিল তখন।
আলপনা বুঝতে পারছিল কী হয়েছিল সেই সময়। এই অফিসে অলক মুখার্জির খুব নাম। তিনি না থাকলে সিমেন্ট ফ্যাক্টরিকে সরকার জমি দিতেই পারত না। ওখানে নাকি খুব হাঙ্গামা হয়েছিল, গুলি চলেছিল, লাঠি চলেছিল। আলপনা দেখেনি মুখার্জি সাহেবকে। তিনি বিমল পালেরই সমসাময়িক। তার মানে বছর পঞ্চাশ, চুলে পাক। বয়স না হলে বুদ্ধি অত পাকে কীভাবে ? এই অফিসে তার বয়সী একজনও নেই। ধুলোময়লা আর ইঁদুর আরশোলার গন্ধেভরা পুরনো ফাইলের সঙ্গে চমৎকার মানানসই মানুষগুলো। সব সময় ঝিমিয়ে আছে অফিস। বাড়িতে অফিসের কথা বললে, মা বলে, অদ্ভুত! কার সঙ্গে তা হলে তোর বন্ধুতা হবে, অত বড় বড় লোকগুলোর সঙ্গে কী করে কাজ করিস!
কথা শেষ করে বিমল পাল আবার উপদেশ দিল, ও ব্যাপারে তোমার মাথা গলানো ঠিক হবে না।
আলপনা মুখ তুলে বলল, মায়া হয় লোকটাকে দেখে, এমন ভাবে তাকিয়ে থাকে।
বিমল পাল সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে বলল, তাকাবেই তো, ঘর আলো করে বসে আছ, তোমার হাসির ভিতর কিন্তু মাধুরীর ছায়া আছে, গজগামিনী দেখবে না ?
আলপনা অস্ফুটস্বরে বলল, লোকটা কেন শুধু শুধু ঘুরবে, আমরা খুব নিষ্ঠুর, না ?
হাসল বিমল পাল, বলল, বাদ দাও তো, আমার এক বন্ধু গজগামিনী দেখেছে...


আলপনা মুখ ঘুরিয়ে নিল। ভাল লাগছে না। এই ছ’মাসে এই অফিসের একটা আদল সে জেনে গেছে। বয়স্ক, প্রায় বয়স্ক মানুষজন কেমন নিরুত্তাপ, নিস্তেজ, আবেগহীন। জীবনের সব লেনদেন ফুরায়ে বসে আছে যেন। এদের ভিতর কেউ কেউ যে অন্য রকম নয়, তা নয়। বড়বাবু নিমাই হালদার ছোটাছুটি করে খুব। ছিল একজন অরুণ সেনগুপ্ত! রিটায়ার করার আগের দিন পর্যন্ত কাজ নিয়ে ভেবেছিলেন। বাকি সব মানুষ, শীতে যেন জবুথবু। এখন তো শীতই চলছে। এ বার শীত টানল অনেক দিন। এই আধো অন্ধকারে তাপমাত্রা যেন দু-এক ডিগ্রি কমেও। বসে থেকে থেকে হাত পা ঠাণ্ডা মেরে যায়।


বড়বাবু নিমাই হালদার ফাইল নিয়ে এলেন, দেখুন ফাইলটা, শুধু ওর পিটিশনে ভর্তি, মুখ্যমন্ত্রী, ভূমিমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী, জেলাশাসক, এস পি, এম এল এ কতজনকে যে দরখাস্ত করেছে কত বার, আমাদের কিছু করার নেই, ও এক পয়সাও পাবে না।


আলপনা ফাইল খুলতে লাগল একা একা। খুলতে খুলতে টের পায় লোকটা বোধহয় ঘরে ঢুকে পড়েছে। সে ফাইলে ডুবে গেল। নগেন নস্কর দাবি করেছে ওই জমি তার পৈতৃক। ঠাকুরদার আমল থেকে ওই জমিতে তাদের দখল। তিন লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ তার প্রাপ্য, এবং একটি চাকরি। ঘরে তিনটি বয়স্থা কন্যা, দুই পুত্রই বেকার...কন্যার বিবাহ স্থির হইয়াছে আগামী বৈশাখের পঁচিশে, তৎপূর্বে টাকা না পাইলে অধীন বিপন্ন হইবে...। আলপনা দেখল ওই পঁচিশে বৈশাখ চার বছর আগে চলে গেছে। তিন মাস বাদের আর একটি দরখাস্তেও ওই একই কথা। আলপনার মনে হচ্ছিল তার টেবিলের ও ধারে কেউ দাঁড়িয়ে।


না, কেউ নেই, কিন্তু দরজার মুখেই লোকটা। ঢুকতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে বোধহয়। ফাইলটা যে এই ঘরে এসেছে তা কি জেনে গেছে ? শীতে কুঁকড়ে আছে মানুষটা। তাকে দেখে দূর থেকে হাসল। আলপনা মাথা নামিয়ে আবার ফাইলে মনোযোগী হল। কত দরখাস্ত। সব পড়ে আছে ফাইলবন্দি। একটি দরখাস্তে আছে স্ত্রীর অসুখ, চিকিৎসার জন্য অর্থ প্রয়োজন, সুতরাং...। আবার একটি দরখাস্তে মাঘে কন্যার বিবাহের কথা...। আলপনা বুঝে উঠতে পারে না মেয়েটির বিয়ে হয়েছে কি না, স্ত্রীর অসুখ সেরেছে কি না, বেকার ছেলেরা চাকরি পেয়েছে কি না, মাথা তুলল সে গভীর নিশ্বাসের শব্দে। দেখল নগেন নস্কর এসে দাঁড়িয়েছে তার সামনে, হাসল লোকটা, এ বার হয়ে যাবে।


কী হবে ?


ঠিক জনের হাতে পড়েছে, মেয়েদের মনে দয়ামায়া থাকে, আপনি একটু দেখুন দিদি, দরখাস্তে সব বলা আছে, অলক সাহেব বলল তিন লাখ আমি পাবই, অলক সাহেব বদলি না হয়ে গেলে এত দিনে পেয়েও যেতাম।


আলপনা জিজ্ঞেস করে, মেয়ের বিয়ে হয়েছে ?


আরও তো দুটো রয়েছে।


তা হলে প্রথম জনের হয়েছে। আলপনা ফাইল দেখতে দেখতে বলল।


একটু চুপ করে থেকে নগেন নস্কর শেষে বলল, দিতে পারিনি, পালিয়েছে।


পালিয়েছে মানে ? আলপনা চমকে উঠেছে, কী বলছেন আপনি ?


সিমেন্ট কোম্পানির ঠিকাদারের লোক নিয়ে গেল। বিড়বিড় করতে থাকে মানুষটা, যে যার কপালে বাঁচে, আমি কী করব দিদিমণি, টাকাটা পেলে খুঁজতে যাই মেয়েটারে।


আলপনা মাথা নামিয়ে থাকে। টের পায় লোকটা টাকা না নিয়ে ছাড়বে না। টাকা পেলেই যে তার সমস্যা মিটে যাবে তাও ধরে রেখেছে, সে বলল, আজ আসুন, দেখি কী করা যায়।


অনেক সময় দাঁড়িয়ে থেকে লোকটা চলে যায়। তখন আলপনা মুখ তুলে দেখে লোকটা পা টেনে টেনে হাঁটছে। সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে মানুষটা। নগেন নস্কর বেরিয়ে যেতে বিমল পাল বলল, শুধু শুধু ঝামেলা কাঁধে নিলে।


আলপনা বলল, ও তো আমাদের সাহায্য করেছিল, যদি কিছু দেওয়া যায়।


দু-পুরুষ ধরে সরকারি জমি ভোগ করছিল, অলক মুখার্জি কাজটা করেছিল এফিসিয়েন্টলি, খোদ মন্ত্রীর নজরে পড়েছে ও, লোকটা আইনত এক পয়সাও পেতে পারে না।


আলপনা ফাইলের দিকে চেয়ে বলল, সব কথা লিখেই স্পেশাল সেক্রেটারির কাছে ফাইল পাঠাব।


কিছুই হবে না, ও লিগালি কিছু পেতে পারে না, অলক মুখার্জিও যাওয়ার সময় সেই নোট রেখে গেছে, অদ্ভুত! লোকটা তা বিশ্বাস করে না, মুখুজ্যে ওকে ডায়েরি, ক্যালেণ্ডার দিয়েছিল তো, মুখুজ্যের সম্বন্ধে ওর ধারণা খুব উচ্চ।


বিমল পালের কথাগুলো খুব কঠিন মনে হয়। আলপনা ক’দিন ধরে ভাবতে লাগল এই স্থবির, ধুলোমাখা, ইঁদুরের গায়ের গন্ধভরা ফাইলটিকে আবার কী করে চালু করবে! তার নতুন চাকরি, জানেই না মরা ফাইল কী করে বাঁচিয়ে তুলতে হয়। ফাইল নিয়ে সে চলে যায় স্পেশাল সেক্রেটারির কাছে। সমস্তটা শুনে তিনি হাসতে লাগলেন, বললেন, মুখার্জি ট্যাক্টফুলি ঝামেলাটা ম্যানেজ করেছিল, তুমি এ বার লোকটাকে বুঝিয়ে দাও ও কিছু পাবে না।


আমি! ভয় পায় আলপনা।


হ্যাঁ, তোমার কাজটি তুমি করো, অলকের কাজ অলক করেছিল, লোকটার অফিসে আসা বন্ধ করো।


কিন্তু স্যার, লোকটাকে তো বলা হয়েছিল।


ফাইলে তেমন কোনও কথা নেই, অলক মুখার্জি তা স্বীকারও করেনি, তোমার কাজ গভর্নমেন্ট ইন্টারেস্ট দেখা, দেখো সরকারি কাজ আইনে চলে, এর সঙ্গে জনসেবার কোনও সম্পর্ক নেই, তুমি এই চ্যাপ্টার ক্লোজ করে দাও, লোকটাকে বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব তোমার।


আলপনার মুখ অন্ধকার। সে যা করতে চায়, তার বিপরীত কিছু করতে হবে। সে অফিসে আসতে লাগল ভয়ে ভয়ে। লোকটাকে সত্যটি বুঝিয়ে দিতে হবে। সত্যের ভার যে হিমালয়, তা সে আগে জানত না। ফাইল আলপনার আলমারিতে ঢুকে গেল। লোকটা একটু কুঁজো হয়ে গেছে যেন, তার টেবিলের উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে হাসল, নমস্কার দিদি, উলুবেড়ের একটা লোক খবর দিয়েছে মেয়ে নাকি খড়্গপুরের দিকে আছে, টাকাটার সুরাহা হল ?


দেখি কী হয়, আপনি মেয়ের খোঁজ করুন।


লোকটা বহু সময় থাকল। ঘুরল এ দিক ও দিক, আবার এল, আবার গেল। তারপর কখন যে চলে গেল আলপনা জানে না। আলপনা ভাবছিল কেন সে এ কাজে জড়িয়ে গেল। বিমল পাল বলছে, আইনের সঙ্গে হৃদয়ের কোনও যোগ নেই, আলপনা শুধু শুধু চেষ্টা করছে, হবে না বলে দিক লোকটাকে।


নগেন নস্কর আসতে লাগল। আলপনার কাছে এসে দাঁড়াতে লাগল। চলে যেতে লাগল, আবার ফিরে আসতে লাগল। মেয়ের কথা বলতে লাগল। যে মেয়ের বিয়ে হয়নি তার বিয়ের কথা বলতে লাগল। এই করতে করতে আচমকা আসা বন্ধ করল। আলপনা তাকে কোনও কথাই বলতে পারেনি। প্রায় দিন কুড়ি বাদে লোকটা এল আবার। আরও কুঁজো হয়ে, চাদর মুড়ি দিয়ে, এসে বলল, আসতে পারিনি দিদি, খবরও যে পাঠাব উপায় নেই, আমারে ভীমরুলে ছেঁকে ধরেছিল।


সে কী! কী করে!


কারা চাকে ঘা দিয়েছিল, আমি গিয়ে পড়ি সেখানে, চোখে ততটা দেখিনি, ছোটছেলেদের কাণ্ড, ওফ্‌! সে কী যন্ত্রণা! এখন ভাল আছি, আমার কী হল ?


হয়নি কিছু, হচ্ছে না যে ।


আপনি করলে হবে, আপনি বড় অফিসার, এই বয়সে পনেরো হাজার বেতন পান, আপনি না পারলে কে পারবে, আমার ও দিকে যতীন মাস্টারের ছেলে ফার্স্ট হত কেলাসে, এখন মাত্তর দেড় হাজার পায়।


আলপনার মুখ কালো হয়ে গেল। মাথা নামিয়ে বসে থাকল। কী অদ্ভুত এই অফিস, এর মানুষজন। সকলে বাঁকা চোখে দেখছে তাকে। বাইরে বাতাস গরম হয়ে গেছে। এই শহরে ঢুকে পড়েছে বসন্ত, কিন্তু অফিসের ভিতরে তা বোঝার উপায় নেই। নগেন নস্কর চলে গেলে আলপনা ক’দিন বাদে ফাইলটা ফেরত দেয়। স্পেশাল সেক্রেটারির কথা মতো সে লোকটাকে কিছুই বলতে পারেনি। কত টাকা মাইনে দেয় কর্তৃপক্ষ, কিন্তু কর্তৃপক্ষের কথামতো কাজটা করে উঠতে পারেনি। কত টাকা মাসান্তে হাতে পায় কতটা ক্ষমতার অধিকারিণী হয়ে, কিন্তু সেই ক্ষমতায় নগেন নস্করের জন্য কিছু করার উপায় নেই।


নগেন নস্কর আসা বন্ধ করেনি। আসলে বেঁচে ওঠার অন্য কোনও উপায় জানা নেই লোকটার, তাই আসছে। বলছে, পরের আষাঢ়ে একটা মেয়ের বিয়ে দেবে, তার আগে টাকা হয়ে গেলে তার চিন্তা যায়।
বলছে, টাকাটা পেলেই স্ত্রীর চিকিৎসা করাবে। বলছে, টাকাটা পেলেই ছেলেকে একটা দোকান করে দেবে। বলছে, তার চোখে ছানি পড়েছে, টাকা না পেলে কাটানো যাচ্ছে না। এই সব কথা বলতে বলতে একদিন যাওয়ার সময় নগেন বলল, পঞ্চাশটা টাকা হবে দিদি, একটা ওষুধ কিনে নিয়ে যেতে হবে, টাকাটা পেলেই শোধ দেব, আমি মেরে খাওয়ার মানুষ না।
বাঁচল আলপনা। তার মনে হচ্ছিল এই টাকা নিয়ে আর এ দিকে আসবে না লোকটা। তা হলে তো সে নিজে বাঁচে। নিশ্চিন্তে ক’দিন অফিস করতে লাগল সে। এর ভিতরেই আবার এল লোকটা। মলিন মুখে হাসল, টাকাটা হলেই আপনারটা শোধ দিয়ে দিতে পারি, আরও বিশটা টাকা দেবেন দিদি, ট্যাবলেট কিনতে হবে ক’টা।
দিতে হল। না দিয়ে উপায় নেই। সমস্তটা লক্ষ করে বিমল পাল একদিন হাসতে হাসতে বলল, এ ভাবে সমস্ত জীবন ধরে তিন লাখ টাকা শোধ হবে ? লোকটা খুব চতুর।
আলপনা চুপ করে থাকে। এক এক সময় মনে হয় লোকটা জানে কিছুই পাবে না। তাই সুযোগ নিচ্ছে তার ভালমানুষির। তার পর মনে হয় অন্য কথা। তিন লাখ টাকার স্বপ্ন দেখিয়ে গেছে একজন, স্বপ্নটা ত্যাগ করলে কী নিয়ে বাঁচবে ? হাঁটতে হাঁটতে একদিন না একদিন টাকাটা আদায় হবেই। সরকারি টাকা পেতে তো এমনি দেরিই হয়। কত ছুটিছাটা, অফিসার বদলি, ফাইল হারানো...এত সহজে কি সব কিছু হয় ? প্রতি বারই যে নতুন করে আরম্ভ হয় ফাইলের কাজ।
শেষ বার আরও পঁচিশ টাকা নিয়ে লোকটা আর আসছে না। অনেক দিন গেল। শীত গেল, বসন্তও। আলপনা নিশ্চিন্ত হয়ে ভুলতে লাগল নগেন নস্করকে। তারপর গ্রীষ্ম যখন যায় যায়, বর্ষার মেঘের আনাগোনা শুরু হল এই শহরে, তখন নতুন একজন এল আলপনার কাছে। তাকে তার বাবা শ্রীযুক্ত নগেন নস্কর পাঠিয়েছেন।
আলপনা শঙ্কিত হল, মাথা না তুলে জিজ্ঞেস করে, কী চাই ?
আজ্ঞে বাবা পড়ে গিয়েছিল রেললাইনে মাথা ঘুরে, এখন শয্যাশায়ী, লোকজন চিনতে পারছেন না, শুধু বলছেন আলপনাদিদির কাছে টাকা আছে।
কোন টাকা ?
জমির তিন লাখ, মুখার্জি সায়েব, তারপর আলপনা ম্যাডাম বলেছিলেন, টাকা হয়ে যাবে।
আপনি চলে যান, তিনি বদলি হয়ে গেছেন।
আপনি আলপনা শুর নন ?
মাথা নাড়তে থাকে আলপনা। দেখল তার বয়সী যুবকের চোখে কী ভয়ানক অবিশ্বাস! ধীরে ধীরে যুবকটি পিছনে হাঁটছে, বিড়বিড় করছে, বাবা যেন বলে দিল...।
বলছি তো তিনি বদলি হয়ে গেছেন গত মাসেই। বলতে বলতে আলপনা ঘুরে ডাকে বিমল পালকে, দাদা, গজগামিনী দেখেছেন, মাধুরী কী সুন্দর বলুন দেখি...।

আশ্চর্য! বিমল পাল সাড়া দিল না। মুখটা তুলেও নামিয়ে নিল। আলপনা মাথা নামায় আস্তে আস্তে। টেবিলের কাচের নীচে সবুজ ম্যাট, এই আয়নায় মুখ দেখেই তো সময় কাটে। মুখে হাসি ফোটায় আলপনা। মনে মনে মোহিনী হয়ে উঠে কাচের ভিতর ভাসিয়ে দেয় মুখখানি। চোখদুটি মেলে ধরেই কেঁপে ওঠে আলপনা। আবছা অন্ধকারে ও কার মুখ ? থরথর করে কাঁপতে থাকে মাধুরী দীক্ষিতের মতো রূপসী কন্যা। লোলচর্মসার ওই বুড়ি মেয়েমানুষটা কে ? সে মাথা ঝাঁকাতে থাকে। অন্ধকার আয়নায় তার প্রতিবিম্ব আরও প্রকট হয়ে উঠতে থাকে। দুটি হাতে টেবিলের কাচে ভর দিয়ে সে মুখ নামিয়ে আনে। ভুল দেখছে না তো। একই মুখ। ভয় পেয়ে আলপনা মুখ তুলে দেখল দরজার মুখে যুবকটি ঠিক তার বুড়ো বাবা নগেন নস্করের মতো তাকিয়ে আছে। না, ও তো বুড়ো নগেনই। তার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে বিড়বিড় করছে। কী বলছে! অভিশাপ দিচ্ছে! এত দিনে কি সব টের পেয়ে গেল! ভয়ার্ত আল্পনা দু’হাতে বার্ধক্যের ছায়ায় ঢাকা নিজের চোখমুখ ঢাকতে থাকে। তার মাথাটা পড়ল কাচের উপর, চড়চড় শব্দ হয়। ভাঙা আয়নার উপর আরও বয়স নিয়ে, বয়স টানার ক্লান্তি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে চায় আলপনা। *

লেখক পরিচিতি
অমর মিত্র

গ্রন্থ : ধনপতির চর। অশ্বচরিত।
পুরস্কার : একাডেমী।

লিঙ্ক : http://forum.banglalibrary.org/viewtopic.php?id=1899, http://banglalibraryresearchorganisation.in

1 টি মন্তব্য: