সোমবার, ২৪ জুন, ২০১৩

বিচ্ছেদ

কামাল রাহমান

কাচের টেবিলে গ্লাসটা উপুর করে রাখে অরূপ, কোনো কিছুই বলে না এখন এটার রমণীয় গড়ন। একটু ভেবে পকেট থেকে বের করে চাবির রিং, সোনালি রঙে গিলটি করা চেইন দিয়ে ঝোলানো ছোট্ট একটা ফুটবল, খুব সাধারণ একটা রিং, জিনির দেয়া উপহার, দুটো মাত্র চাবি ওটায়, সাদাকালো রঙের ফুটবলটাকে উল্টোনো গ্লাসের উপরে বসিয়ে চাবি দুটোকে পেছন দিকে ঝুলিয়ে দেয়। এবার একটা আকৃতি এসেছে, পেছনে ঝোলানো চাবি দুটোকে একগুচ্ছ চুল ভেবে নিলে ভাবনাটা স্থির হয়। পকেট থেকে মোবাইল বের করে একটা ছবি তোলে। বাহ্, বেশ ইনোভেটিভ! গ্লাসের শরীরের তুলনায় বল দিয়ে বানানো মাথাটা একটু ছোটো, কিছুই আসে যায় না, কল্পনায় সবই সম্ভব, টেক্সট করে ছবিটা পাঠিয়ে দেয় জিনির কাছে।

একটু পরেই জিনির ফোন, ‘কি সমস্যা তোমার?’ 
‘না, কিছুই না জিনি, তোমাকে মনে হলো...’
‘জালিও না, ঘুমোতে দাও, প্লীজ।’
‘ঠিক আছে।’ বলে ফোনটা কেটে দেয় অরূপ। 

অর্থহীন শূন্য এক দৃষ্টিতে পাবের ভেতরটায় চোখ বুলায়, বুকের ভেতর চেপে থাকা যন্ত্রণাটা হালকা করার চেষ্টা করে, এখানেই তো সবকিছু শেষ না। যে সব ভেবে এসেছে জীবনে, দেখতে চেয়েছে, বসে বসে এখন কল্পনায় দেখে সে-সব। জানালার কাছ ঘেঁসে বসায় ধূসর আকাশের অনেকটা দেখা যায়, পাবের বাইরে সীমানার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটা গাছের নিচে বসানো কাঠের টেবিল ও বেঞ্চ, গ্রীষ্মের সারাদিন ওখানে বসে বীয়ার পান করে অনেকে। তারপর ছোট্ট একটা নদী, ওটার জল এখন কালো, শুয়ে থাকা একটা কালো বেড়ালের মতো ওটার শরীর। জানালার ফ্রেমের ধারে  জমে উঠেছে কিছু সবুজ শ্যাঁওলা, আঙ্গিনার এক কোনায় ডাঁই করে রাখা বড় ও লম্বা কয়েক টুকরো কাঠ। নিজেকে এখন পরিত্যক্ত ওরকম একটা কাঠের টুকরোর মতো নি®প্রাণ মনে হয়। ওটাকে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলা হতে পারে এটার একটা ভালো পরিণতি। জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে জেতার ইচ্ছে ওর প্রবল, অথচ অস্থিমজ্জাহীন একটা কেঁচোর মতো মাটির গভীরে অলসভাবে কাটিয়ে দিতে পারলে যেনো ভালো হয়, এমন এক ভাব নিয়ে বসে রয়েছে এখন। কিছুণ পর আরেক পাইন্ট লাগা নিয়ে আসে কাউন্টার থেকে। আরো এক ঘণ্টা কেটে যায়, স্মৃতিগুলো ধীরে ধীরে ঝাঁপসা হতে শুরু করে, গত কয়েকদিনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো মাথার ভেতর আঁকাবাঁকা পথ ধরে গলিঘুঁজি খুঁজে দৌড়াতে থাকে অনেকটা এলোমেলোভাবে। মন চায় এখন বাইরে থেকে একটু ঘুরে আসতে, ভালো লাগে না একা একা, সঙ্গী ছাড়া ঘরের বাইরে কোথাও বেরোতে ইচ্ছে হয় না। জানালা দিয়ে দেখা যায় ফোটা ফোটা বৃষ্টি বাইরে, ওরকম বৃষ্টিতে ভয় নেই, ভয়  উত্তর থেকে আসা হিম-শীতল ঝঞ্ঝায়। 

পৃথিবীর কোনো কিছুই দ্রুত বদলায় না, শুধু ব্যক্তি-মানুষের ইচ্ছা, আকাঙ্খা পরিণতি পায় খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে। প্রতি মুহূর্তে ভিন্ন সময়ে বাস করছে এখন অরূপ, একেবারে এলোমেলো, অশান্ত বাতাসে একটা ঘুড়ির মতো অস্থির উড়ে চলেছে। হঠাৎ ছন্নছাড়া জীবনের কান্ত এই সময়টা কীভাবে উড়িয়ে দেয়া যায় ভেবে অস্থির হয়। পাবের দেয়ালে ঝোলানো প্রতিটা ছবির ফ্রেমে দেখে কীভাবে বাঁধা পড়েছে সময়, কারো না কারো আত্মার অনুধ্যান ওসব, কারো আবার অন্ধবিশ্বাসে অনাস্থা, অথচ কয়েকটা ছবিতে এসবের কি অসাধারণ প্রতিফলন! একটা জানালার ফ্রেমে বসানো ছোট্ট একটা গির্জা, ভালোভাবে দেখে অরূপ, সেইন্ট পল গির্জার মিনিয়েচার। কাচের বাইরে, মাত্র দেড় ফুট উঁচু ঐ গির্জার পেছনে ঝিরঝিরে বৃষ্টির ফোটায় এখন সড়কবাতির আলোর বিচ্ছুরণ। একটা কবিতার লাইন মনে পড়ে, ‘ভালোবাসা ঝরেছিলো সেরাতে প্রিয়বন্দনা বৃষ্টির মতো...’ মনে করতে চেষ্টা করে কবিতাটা কার। পাবের টেবিলগুলো ধীরে ধীরে নাচতে শুরু করে, পাব-ড্যান্সারের চটুল নাচের ছন্দে শত সহস্র মুদ্রা, ওসব গোনে এক এক করে। এতো দ্রুত ওগুলো মিলিয়ে যায়, গুনে শেষ করা যায় না। এক অফুরন্ত আহ্বান ওসবে, প্রতিটা টেবিলে দু জন, তিন জন, চার জন... শুধু একা অরূপ, নিঃসঙ্গ এই রাতের যন্ত্রণা, পাবের এরোটিক সুরের মূর্চ্ছনা, নর্তকীর কামনামদির ভঙ্গি, নাহ্, আর না, বাইরে বেরোতে হয় এখন, শীতল প্রকৃতির কমনীয় শরীর জড়িয়ে জ্যোৎøা, বৃষ্টির ফাঁকে ফাঁকে অনুগত পুলক। গতরাতেও ছিল এমন, আজ আরোও প্রখর। টেবিলে বিল রেখে গেছে ওয়েট্রেস, ওটার পেছনে একটা কবিতা লেখে অরূপ, কতটুকুই বা আর লেখা যায় ওখানে। কাগজের টুকরোটার তুলনায় বিলের অঙ্কটা অনেক বড়। পকেটে আলাদীনের কার্ড আছে একটা, অনেক মূল্য এটার এখন এই একুশ শতকে! বাইরে বেরিয়ে আসে অরূপ।

পাবের দরজা খুলতেই খুশিতে জড়িয়ে ধরে ঠাণ্ডা বাতাস, চোখে মুখে ভালুকের আঁচড় কেটে যায় বিচ্ছিন্ন বৃষ্টির বরফকুঁচি। পাহাড়ের নিচের দিকে রাস্তার একটা অংশ দেখা যায়, শুরুতেই ছোট্ট একটা ক্রসিং, তারপর অনেকটা লম্বা, বাঁকানো পথ, শেষ হয়েছে অন্ধকার এক খাঁড়িতে, উপর থেকে মনে হয় একটা চকচকে তরবারি। তরবারির উপমাটা মনে ধরে অরূপের, জীবনের এই জটিল সময়টায় ধারালো একটা তরবারির উপর দিয়ে হেঁটে চলেছে, ত-বিত হচ্ছে পা দুটো, রক্ত ঝরছে। 

বাইরের ঠাণ্ডা সইতে না পেরে আবার পাবে ঢোকে অরূপ, চেনা একটা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে দু পাক চক্কর কাটে, জিনির সঙ্গে বিয়ে হওয়ার আগে অনেকবার শুয়েছে ওর সঙ্গে, জিজ্ঞেস করে কিছু পান করবে কিনা, ‘না’ বলায় ওকে ছেড়ে দেয় ভিড়ের ভেতর। রাতটাকে এখন আর এতো মলিন মনে হয় না। বেশ আবেশ-জড়ানো, সুন্দর। অথচ এটাকে নিজের মনে হয় না, অন্য কারো রাত যাপন করে চলেছে! বীয়ারের গ্লাসটা তাড়াতাড়ি শেষ করে বাইরে বেরিয়ে আসে আবার। পকেটে হাত ঢুকিয়ে পেয়ে যায় দুপুরে পাওয়া এক ডাঁটি লাল কার্নেশান, রাস্তার পাশে একটা ঝোপের ভেতর ছুঁড়ে দেয় ওটা। ভাবনাগুলোকে মাথা থেকে সরিয়ে রাখতে চায়, রাতের সৌন্দর্য খোঁজ করে সে এখন। এই শীতের রাতে না থাকে আকাশে তারা, না প্রকৃতিতে কোনো ছন্দ, ঘরে যেয়ে যদি ঘুমোতে পারতো, ভালো হতো। সেটা হয় না, আগামী দিনটাকে অনেক দূরের মনে হয়। জিনির চিঠির শব্দগুলো একদল রোমান সৈন্যের মতো সারি বেঁধে এগিয়ে আসে অন্ধকারের ভেতর, ‘ভালোভাবে বিচ্ছিন্ন হতে চাই আমি। কারণ, সবকিছু নষ্ট হয়ে গেছে, আমার নোংরা অন্তর্বিশ্ব নিয়ে এরপর আমিই থাকবো একা, কাউকে বলবো না আর উঁকি দিয়ে দেখতে ছোট্ট ঐ জগৎটায়, বাজে রকম নোংরা এখন ওটা। দু জনে মিলে নষ্ট করে ফেলেছি সবকিছু, যথেষ্ট হয়েছে এসব।’

মেঘ সরে গেছে আকাশ থেকে, জ্যোৎøা আরো জাঁকালো, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে যায়, একেবারে তরবারির ডগায় এসে পৌঁছোয়, দাঁড়ায় ওখানে কিছু সময়, যাওয়ার নেই আর কোথাও, কোথায় যাবে সে, উদ্দেশ্যহীন পথ হাঁটা যায় কত আর! আবার বৃষ্টি নামে। ভেজা যাবে না এখন কোনোভাবে, অনেক বাকি রয়েছে রাত, কিছুটা দৌড়ে আরেকটা পাবে ঢোকে। একেবারেই ছোটো পাব, ফ্যামিলি বিজনেস, ভালোই লাগে অরূপের, কটা মাত্র টেবিল, তার অর্ধেকই খালি, একটা টেবিলে বসে গুম হয়ে থাকে। 

‘...আর কত কাস্তে চালাবো অন্য ধানের খেতে? মন উঠে গেছে, শূন্য হয়ে গেছে আধার, এখানে আর কিছু খোঁজার চেষ্টা অর্থহীন, চোখ সরাও এখন তুমি।’ অন্ধকার থেকে একটা কান্নার শব্দ যেনো ভেসে আসে, কেমন চেনা, শান্ত সুর, নীরব অশ্র“পাতের মতো, ‘ওটা ভুল, ওটা ভুল কান্না তোমার, আমাকে বুঝেছিলে তুমি, জিনি, আমিও বুঝেছিলাম তোমাকে, অথচ এই সত্যিটা বুঝতে পারো নি’ মনে মনে নিজেকে কথাগুলো শোনায় অরূপ। 

রাত বাড়তে থাকে, জিনি কি ঘুমিয়েছে? নিশ্চয় না। আরেকবার ফোন করলে কি খুব রাগ করবে? ফোন করেই বলে, ‘কিছু মনে করো না জিনি, অনেকদিন ছিলাম তো এক সঙ্গে, সম্পর্কটা ভেঙ্গে দিলেও বন্ধুত্বটা তো রাখা যায়, নাকি?’
‘তোমার সমস্যাটা তো বলবে?’
‘বলতে হবে কেন, জিনি!’
‘আমি জানি না, বলো কীভাবে সাহায্যে আসতে পারি?’

কিছু বলে না অরূপ, ফোন কানে লাগিয়ে বসে থাকে চুপচাপ। বৃষ্টি একটু বেড়েছে, জানালার কাচের ভেতর দিয়ে বাইরের ছবি ঝাঁপসা দেখায়। এসব যেনো কোনো কালে বদলাবে না আর, ঘরের দেয়ালে ঝোলানো ছবিগুলোর সঙ্গে ওসবের কোনো পার্থক্য নেই। মন চায় এখন চলচ্চিত্রের নায়কের মতো লাফিয়ে জানালার কাচ ভেঙ্গেচুরে বাইরে এসে দাঁড়ায় অত শরীরে। আর দেখে নিস্তব্ধ রাত, থেমে গেছে বাতাস, প্রখর চন্দ্রালোকের নিচে মধ্য-নিশীথের নীরবতা, রাতবিহারী পাখিদের নিঃশব্দ উড়ে যাওয়া, গাছের নিচে ছায়ার সঙ্গে ছায়া হয়ে মিশে থাকা জিনির বায়বীয় শরীর, সুইট-পীর তীব্র সৌরভ. . .

যা হয় না কখনো, সারাদিনে একবারও বাজে না যে ফোনটা, ওটাই বেজে ওঠে অসময়ে। ব্যাংক, অফিস, এরকম দু একটা জায়গা ছাড়া শুধু জিনি জানে ঐ নাম্বারটা, ইদানিং দিয়েছে তনুকে, চোখে একরাজ্যের বিরক্তি নিয়ে দেখে নাম্বারটা। জিনি বলেÑ
‘সম্ভবত তোমার সমাধান পেয়েছো, ছাড়ি।’ 
ফোনটা কেটে দেয়। বেজেই চলেছে ঐ ফোনটা, ধরবে না ঠিক করেও শেষ পর্যন্ত বলে, ‘হ্যালো’
‘ফোন ধরছো না কেন?’
‘ও রকম কোনো শর্ত তো নেই।’ কিছুটা বিস্মিত অন্য দিক।
‘না, তা থাকবে কেন, তোমার মন খারাপ থাকলে, বা ব্যস্ত থাকলে না হয় রেখে দেই।’ একটু ভাবে অরূপ, বলেÑ
‘থাক, রাখতে হবে না, বলো।’
‘তোমার কি মন খারাপ?’
‘হ্যাঁ।’
‘তাহলে চলে আসো।’
‘রাত হয়েছে বেশ।’
‘সেজন্যই তো আসবে।’
‘শরীরটা ভালো নেই তনু।’
‘আসো, শরীর ভালো করে দেবো।’
‘না তনু, থাক, মনের বাইরে কোথাও যেতে পারি না, জানোই তো। আমার মন বলছে: না।’ অনেকণ কথা বলে না তনু, চুপ করে থাকে অরূপ,  তারপর ডাকে, ‘তনু?’
‘ঠিক আছে অরূপ, ভালো থেকো। যদি কোনোভাবে হেল্প করতে পারি, ফোন করো, যত রাতই হোক।’
‘ঠিক আছে তনু, ঠিক আছে, ভালো থেকো।’

মনটা আরো খারাপ করে দিল তনু, এভাবে প্রত্যাখ্যান করে নিজেই কষ্ট পায় অরূপ, কোনোভাবেই নিজেকে নিয়ে যেতে পারছিল না ওখানে। হয়তো এভাবেই সবকিছু শেষ  হয়ে যায়, পানপাত্রের তলায় লেগে থাকা হলাহলের শেষবিন্দু, গোধুলি আলোর শেষ রশ্মি, চুমোর তপ্ত স্মৃতি, জীবনের অসংখ্য খণ্ডছবি, ভালোবাসা ও যন্ত্রণার ডোরাকাটা পারাপার। এরকম কোনো বোধের জগতে একজন কবির থাকে অন্ধকার ও মুখোমুখি বসিবার অজাগতিক কেউ, একজন স্থপতির না-পুরুষ না-নারীর আকাশ-ছোঁয়া স্ফিংস, অথবা একজন আঁকিয়ের রহস্য-হাসিমাখা কোনো নারী!

বৃষ্টি থেমে গেছে আবার, বাসায় ফিরে যেতে হয়। আবার চড়াই পেরোতে হবে, ভালোই হবে হয়তো, খোঁয়ারিটা কেটে যাবে, রাতে ঘুম হলে হতেও পারে, অর্ধেক পথ যেতেই বৃষ্টি নামে, কনকনে ঠাণ্ডা, নাহয় ভালোই লাগে অরূপের এই বৃষ্টিতে ভেজা। হঠাৎ ইচ্ছে হয় স্কুলের খেলার মাঠের পাশে দাঁড়ানো বিশাল কদম গাছটার তলায় যেয়ে ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’ খোঁজে, অলস দিনের বৃষ্টির দুপুরে ঘরে শুয়ে সুবিনয়ের গান শোনে, ‘এমন দিনে তারে বলা যায়, এমন ঘন ঘোর বরিষায়...’ এমন প্রাণজুড়ানো বর্ষা এখানে নেই, এখানে বৃষ্টি মানেই উৎপাত, কেউ ভালোবাসে না এখানের বৃষ্টি! একটু পরেই যাহোক, শেষ হয়ে যায় ঠাণ্ডা জলের এই বৃষ্টি। ঘরে ফেরে অরূপ, পরিপাটি হয়ে শোয় ঠাণ্ডা বিছানায়, অনেকটা পরিষ্কার এখন চিন্তাশক্তি।

খুব কি অন্যায় করেছে সে জিনির সঙ্গে, এতো ভালো বোঝে ওকে জিনি! তর্ক করতে যেয়ে একদিন বলেছিল, ‘যদি না বুঝতাম যে আমি ঠকছি, তাহলে হয়তো বিষয়টাকে অন্যভাবে নেয়ার চেষ্টা করা যেতো।’ 
‘না, এখনো ওটা বোঝো নি তুমি। ঠকা বা জেতার বিষয়টা সবাই বোঝে অনেক পরে। কারণ সবকিছুর সঙ্গেই অন্য অনেককিছু জড়িয়ে থাকে, শেষ পর্যন্ত ফলাফল কি দাঁড়ায় সেটাই আসল। যদি সেটা শূন্য হয়, তাহলে ওটা একটা প্রতিভাদীপ্ত ফলাফল, উভয় পরে জয়ের ভেতর দিয়েই ওটা সম্ভব।’
‘উভয় পরে পরাজয়ের ভেতর দিয়েও হতে পারে ওটা।’
‘কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে তুমি ওটা দেখছো তার উপর নির্ভর করে। আমি সদর্থকভাবে দেখতে চাই সবকিছু।’

একটা রাতের সময় তো কখনো আর একরাতের চেয়ে বেশি না, এক যুগ ধরে বয়ে যাওয়া নদীর মতো যদি সে বইতে থাকে তাহলে কান্তি যে-কাউকে বিপন্ন করতে পারে, ভীষণ বিচলিত করে তুলতে পারে। সব ভুলই একদিন ভাঙ্গে, আর যদি না ভাঙ্গে, তবে তা ভুলই না। একটা দিনের সূর্যাস্তের পর থেকে পরের দিনের সূর্যোদয়ের ব্যবধান একটা রাতের চেয়ে বেশি তো নয়, অথচ ওটাকেই অনন্ত ভেবে সবকিছু এলোমেলো করে ফেলে অরূপ।

না, ঘুম আসবে না আর, দরজা খুলে বাইরে খোলা আকাশের নিচে এসে দাঁড়ায়। সবই তো আছে, এই আকাশ-ভরা চন্দ্র তারা, মেঘ-জ্যোৎøা, হিমেল বাতাস, নিশি-নিসর্গ, সবই তো আছে! তবুও যেনো কি নেই, চারদিকে খুঁজে অরূপ, কি নেই, কি নেই! নিজেকে বলে, আছি, আমি আছি, আমি তো আছি, তবুও আছি, শেষ পর্যন্ত! কেন না, আর কিছুই করার নেই আমার, কোথাও যাওয়ার নেই আর, কাউকে কিছু বলার নেই, কারো কিছু নেই শোনার। 

বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে একটা কবিতা আসে মাথায়, ভুলে যাওয়ার আগে জিনিকে শুনিয়ে ফেলতে চায়। মনে মনে বলে, ‘আমি জানি ও কখনোই ভুলবে না আমার কবিতা।’ ফোন করে আবার। ফোন ধরে জিনি, অথচ বলে না, ‘হ্যালো’। অরূপ বলে, ‘জিনি একটা কবিতা এসেছে, শোনাবো তোমাকে?’ তবুও নিরুত্তর ওপাশে, তারপরও শুরু করে কবিতাটা. . . ‘জিনি, শোনছো জিনি?’ কখন লাইন কেটে দিয়েছে বুঝতে পারে নি অরূপ। চাঁদ, অথবা জ্যোৎøা বেরিয়ে এসেছে আবার মেঘের আড়াল থেকে, ওর মনে হয় আজ খুব নির্মম এই জ্যোৎস্না, এরকম জ্যোৎস্নায় কেউ বনে যায় না, ঘরেও থাকে না। অদ্ভুত এই জ্যোৎস্না নির্লিপ্ত, স্নিগ্ধ আলো আলোকিত করছে সবকিছু, শুধু অরূপের অনেক গভীর ভেতরের গোপন যন্ত্রণাটুকু ছাড়া, একটা কালো পাথর এখন রক্ত-রঙিন হয়ে আছে ওখানে। কবিতার একটা শিথিল বাঁধন ছিল ওদের ভেতর, ওটাও ছিন্ন হলো! ঘোরের ভেতর এসব মনে করে অরূপ, ঠাণ্ডা বরফ-জলের বৃষ্টিতে ভিজে সারারাত, শরীরের সবটুকু উত্তাপ নিঃশেষ হয়ে যায়, বুকের ভেতর জমাট বাধা বরফের মতো অসহ যন্ত্রণাটা থেকে যায় একই রকম, কঠিন ও কালো!


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন