সোমবার, ২৪ জুন, ২০১৩

১ মিনিটে পড়ুন: ফ্লাস ফিকসন-কিচ্ছা: ৩২

দুপুর মিত্র

আমাদের পাশের ফ্ল্যাটের সামনেই আরেকটি ফ্ল্যাট। মুখোমুখি দরজা। আমি যখন বের হই, তখন যেমন আমাকে মনে হয় ওদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, আবার ওরা যখন বের হয়, তখন মনে ওরা আমাদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সেই ফ্ল্যাটেই নতুন ভাড়াটে এসেছেন। একদিন দরজা খুলে বের হতেই দেখলাম, অদ্ভুত সুন্দর এক মেয়ে। অনেকদিন এত সুন্দর মেয়ে আমি দেখিনি। পৃথিবীতে এত সুন্দর মেয়ে থাকতে পারে, তাকে দেখলে প্রথম প্রথম তাই মনে হবে। প্রথম দিন এক পলক দেখেই আমি সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করি। আমার মধ্যে কেমন একটা খুশি খুশি ভাব চলে আসে।
কোথ্থেকে অনকগুলো আনন্দ এক সাথে পেখম মেলে নাচতে শুরু করে। আমি সেই আনন্দ শরীরে নিয়ে অফিস করি, বাসায় ফিরি। বাসায় ফেরার সময় এখন আরেকবার খেয়াল করলাম, মেয়েটির দর্শন পাওয়া যায় কিনা। না পেলাম না। মনে মনে ভাবলাম, কাল সত্যি যেন মেয়েটাকে আবার দেখি। আমি অফিসে যাওয়ার জন্য বের হবার সময়ই যেন মেয়েটিও ওদের বাসার দরজায় দাঁড়ায়। আরেকবার দেখব মেয়েটিকে। আরেকবার দেখতে চাই মেয়েটিকে। পৃথিবীতে এত সুন্দর মেয়ে থাকতে পারে। আমি সেই সকাল বেলার সৌন্দর্য শরীরের মেখে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকাল হল। অফিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলাম আর ভাবলাম এইবার নিশ্চিত আমি মেয়েটিকে দেখতে পাবে। অবশ্যই দেখতে পাব। দেখা যেন হয়। এরকম বিড়বিড় করতে করতে, আমাদের বাসার দরজা খুলেতই দেখলাম ওদের বাসার দরজার সামনে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে ভেতরে সাহস সঞ্চয় করলাম। মেয়েটাকে ভাল ভাবে দেখব। গতকাল এক পলক দেখেছি। আজ একটু বেশি সময় ধরে দেখব। দেখলাম মেয়েটির সমস্ত শরীর কেমন শীতের রোদের মত নরম। ঠোঁটগুলো কেমন বুষ্টিতে ভেজা গাছের নরম পাতার মত। চোখগুলো কেমন মেঘের আকাশের মত যেন এই মাত্র বৃষ্টি নামবে আর হেসে উঠবে সমস্ত ধানক্ষেত। খুব বেশিক্ষণ তাকাতে পারিনি। যতটুকু দেখেছি, তাতে বারবার মনে হয়েছে, এই মেয়ের সৌন্দর্য এতটুকু দেখে শেষ হয়ে যাবার মত নয়। এইভাবে প্রায় প্রতিদিন আমাদের দেখা হয়, দেখা হয়ে যায় আর আমি ভিতরে ভিতরে ঠিক করতে থাকি, ভিতরে ভিতরে সিদ্ধান্ত নিতে তাকি এই মেয়েটির সাথে কথা বলব। বললেই বা কি। ওরা আমাদের পাশের বাড়িতেই থাকে। পাশের বাড়িতে কে ওঠল, এটা তো জেনে রাখা দরকার। একদিন জানতে হবে মানে এখনই জানব মানে ওদের ঘরের দরজায় টোকা দিলাম সাহস করে। ভেতর থেকে কথা বলে ওঠল- কে? সেই মেয়েটিই বোধহয়। এত সুন্দর করে কে বলে ওঠল, এত সুন্দর গলার কণ্ঠ- এ সেই মেয়েই হবে। দরজা খুলতেই বুঝতে পারলাম, এ সেই মেয়েটিই। আমি অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। নিজেই এসেছি , পাশের বাড়িতে কে থাকে এটা খুঁজ নেবার জন্য অথচ আমিই দেখেন অপ্রস্তুত। না বিষয়টা একদমই স্বাভাবিক না। আমাকে কথা বলতে হবে মানে আমি কথা বললাম সাহস করে। আমি আপনাদের পাশের ফ্ল্যাটেই থাকি। আপনাদের সাথে পরিচয় নেই তো অথচ পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন; তাই খোঁজ নিতে এলাম। মেয়েটি হাসল। এই হাসি নয়, গোধূলি বেলায় রোদের রং যেরকম নরম করে হাসে, সেটা। মেয়েটি বলল- ভিতরে আসুন। আসলে আমাদেরই দোষ। নতুন উঠেছি তো। সবকিছু গোছগাছ করা হয়নি। একদমই সময় পাচ্ছি না। তাই আপনাদের সাথে পরিচিত হওয়াও উঠেনি। বাসায় আমার হাসবেন্ড আছেন। উনাকে ডেকে দিচ্ছি। উনার সাথে কথা বলুন। আমি চা করে নিয়ে আসছি। আমি বললাম - আচ্ছা আর ভিতরে ভিতরে ভাবলাম- এ মেয়ে নয়, এ বউ। বউ এত সুন্দর হতে পারে! যে লোকটা তাকে বিয়ে করেছে, সে আসরে কতই না ভাগ্যবান। লোকটা আসল। আমরা অনেকক্ষণ আলাপ করলাম। লোকটা একসময় দাপুটে সাংবাদিক ছিল। বাংলাদেশের হেন জায়গা নেই যে দাপিয়ে বেড়ায় নি। সড়ক দুর্ঘটনায় এখন এক প্রকার অবশ হয়েই বসে থাকেন বাসায়। অনেক ভাল মানুষ। অনেক জানা-শোনা। মেয়েটি চারু-কলার ছাত্রী ছিল। পড়াশোনা শেষ। মাঝে মাঝে কিছু কাজ করে। আর ছেলেটি স্ক্রিপ্ট লিখে। এই দিয়েই সংসার চলে। এক প্রকার সংসারটা মেয়েটিই ধরে রেখেছে।

কেমন এলেমেলো হয়ে গেল। আমি ঘরে বসে ভাবলাম- কি যেন একটা হয়নি, কোথায় যেন কি একটা হয়নি, কি যেন একটা হওয়ার কথা ছিল কিন্তু হল না। একপ্রকার অস্থির লাগছিল বলা যায়। কিন্তু এই অস্থিরতা কোনও কারণ ছাড়া। কারণ ছাড়াও মানুষ অস্থির হয়ে ওঠে। অকারণে বিচলিত যাকে বলে। পরদিন সকালেও মেয়েটিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। সৌজন্যতার খাতিরে বললাম- কেমন আছেন? মেয়েটি বলল- হ্যাঁ আছি, ভাল আছি। আপনি? আমি বললাম - হ্যাঁ ভাল। অফিসে যাচ্ছি। আজ মেয়েটিকে ততটা সুন্দর মনে হল না। যতটা সুন্দর আগে তাকে মনে হয়েছে। এই গতকালও তাকে যতটা সুন্দর মনে হয়েছে, আজ কিন্তু তাকে তা মনে হল না। আমি অফিস করে বাসায় ফিরলাম দেখলাম মেয়েটিও তাদের বাসার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকদিন যাবত আবার মনে মনে একটা সন্দেহ দানা বেধে উঠল। আমি যখনই বরে হই, দেখি মেয়েটি ওদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে, আমি যখনই বাসায় ফিরি দেখি তখনও মেয়েটি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। মেয়েটি এত দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে কেন? অন্য সময় তো তাকে দেখা যায় না বা আদৌ দেখা যায় কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য আমি একদিন দুপুর বেলায় বাসায় ফিরলাম। দেখি আমি আমাদের বাসার সামনে দাঁড়াতেই মেয়েটি তাদের বাসার সামনের দরজা খুলল এবং বলল- কি ব্যাপার আজ দুপুরে বাসায় চলে এলেন। শরীর খারাপ নাকি? আমি হেসে বললাম না। অফিসে তেমন একটা কাজ নেই। তাই চলে এসেছি। এই প্রথম আমি বুঝতে পারলাম মেয়েটি আমাকে অনুসরণ করে। মেয়েটি আমাকে খেয়াল করে। আমি কখন ঘরে ফিরি। আমি কখন ঘর থেকে বের হই। এতদিন যে তাকে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি, তা আসলে তার অনুসরণেরই অংশ। সে আমাকে ফলো করে। কি ফলো করে? কেন ফলো করে। সন্দেহ বাড়তেই থাকল এবং আরও বেশি পাকাপোক্ত হতে থাকল সন্দেহ। আমার মনে হল আমার মেয়েটি জিজ্ঞেস করা উচিত, কেন সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু এটা কি করে বলা সম্ভব? ওদের বাসার সামনে ওরা দাড়াবে না তো কে দাঁড়াবে? এটা কি করে বলা যায়? এটা কি বলা যায় আদৌ? না বলা যায় না ? তাহলে কি বলা যায়? কিছুই খুঁজে পেলাম না। কিন্তু এটা ভাল খবর না যে আমার পাশের বাড়ির একজন মেয়ে আমাকে ফলো করে মানে আমি কখন বাড়ি থেক বের হয়, কখন ফিরি, কিভাবে ফিরি। হাতে কি থাকে? সব, সব? কিন্তু ফলো করলেই কি? আমি এমন কি করি যে তাকে ফলো করতে হবে? যার ইচ্ছে ফলো করার, সে করুক। তাতে আমার কি? কিন্তু অন্য কোনও কারণও তো থাকতে পারে? মেয়েটার হাজবেন্ড অসুস্থ। কাজ করে না। বলতে গেলে সংসারটা মেয়েটাই চালায়। তাহরে মেয়েটা কি অন্যকিছু চায়। অন্যকিছু, অন্যকিছু মানে শরীর। সে হয়ত দীর্ঘদিন এমন কিছু পায় না যা সে চায়। সে হয়ত দীর্ঘদিন এমন কিছু পায় না, যা তার পাওয়া উচিত। সে কি একটা সুযোগ খুঁজছে, সে কি একটা বিশেষ সময় খুঁজছে যে এই সময় পেলেই সে আমাকে একটা ইশারা দেবে। বা সে হয়ত ইশারাই দিয়ে গেছে এতদিন, কিন্তু আমি তা টের পাইনি। এটাও হতে পারে। কিন্তু এরকম একটা সুন্দর মেয়ে যদি আমাকে চায়, যদি সে এও বলে যে আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই, তাহলে আমার রাজি হয়ে যাওয়া উচিত। মনে মনে এই সিদ্ধান্ত নিলাম সে যদি সত্যিই আমাকে কিছু দিতে চায় বা পেতে চায় মানে শরীরের স্বাদ আমি তাকে দেব মানে আমিও নেব বা এর বদরে যদি আমাদের বিয়েও করতে হয় তাতে আমরা রাজি। এই সিদ্ধান্ত ভিতরে ভিতরে পাকাপোক্ত করে ফেললাম। আমার মনে হল আমার সিদ্ধান্ত টিক আছে। একদিন অফিস থেকে পিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল, এদিকে বাইরে ঝুম বৃষ্টি। আমি কোনও রকমে বাসায় দরজায় সামনে এসে দাঁড়িয়েছি, অমনি এত রাতে টের পেলাম একটি হাত। পেছনে থাকিয়ে দেখি মেয়েটা। বলে ফেললাম মানে মুখে চলেই এল- এত রাতে। মেয়েটা হাসল। এই হাসি এমন যে সে আমাকে নিশ্চিত চায়। আদ্যোপান্ত চায়। এই বৃষ্টিতে ভেজা ঠাণ্ডা শরীইটা কেমন গরম হয়ে ওঠল। সে আমার ঘরের ভেতরে এখন। আমি তোয়ালে দিয়ে গা মুছে, ফ্রেশ হয়ে সোফায় বসলাম। মেয়েটির সোফায় বসে আছে। একটা ম্যাগাজিন দেখছে। আমি মেয়েটির কাছে ঘেঁষে বসার চেষ্টা করলাম। মেয়েটি কিছু বলছে না। আমার শরীর তার শরীর কিছুটা ছুঁয়েছে। মেয়েটা তখন বলল- আমার হাজবেন্ড দীর্ঘদিন চাকরি-বাকরি পাচ্ছে না। অনেকদিন ধরেই ও ট্রাই করছে। শুনেছি, আপনার অনেক বন্ধু-বান্ধব অনেক ভাল ভাল জায়গায় কাজ করে। ওর জন্য আমি একটা কিছু করে দিতে পারবেন? আমি একটু দূরে সরে বসলাম। প্রচণ্ড গরমে এই বৃষ্টির রাতে যে শরীর কাঁপছিল, সেই শরীরটাই হঠাত করে কেমন শীতল হয়ে এল। আমি মাথা নিচু করে আচ্ছা বলতেই মেয়েটি উঠে ওদের বাসায় যাওয়ার জন্য দাঁড়াল এবং দরজায় বাইরে গিয়ে বলল দেখবেন কিন্তু।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন